চির-সাহচর্যের বিরল নমুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

চির-সাহচর্যের বিরল নমুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

চির-সাহচর্যের বিরল নমুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

আল্লামা হাফেজ আনিসুজ্জমান

মহান রাব্বুল আলামীন ঈমান ও নেক আমলের ভিত্তিতে পরকালের মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরকালে বিশ্বাসী মাত্রই স্বীকার করেন যে সে কালের সাফল্যই চুড়ান্ত সাফল্য। আল্লাহর ফরমান, ‘‘তোমাদের নিকট যা আছে, তা নিঃশেষিত হবে, আর যা আল্লাহর নিকট আছে, তা থাকবে চিরস্থায়ী।’’ যা উৎকৃষ্ট, উত্তম, অফুরন্ত, অপরিমেয় সে প্রাপ্তিই তো অতুলনীয়। এই অনন্ত সুখের ঠিকানা যাঁদের জন্য আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন প্রিয় নবীর সরাসরি সাহচর্য ধন্য, তাঁরই তত্ত্বাবধানে নিখুঁতভাবে প্রশিক্ষিত সাহাবায়ে কেরাম, যাঁদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে। [দ্র. ৯ঃ১০০] আল্লাহ্ তা‘আলা সত্য। মিথ্যার প্রতি তাঁর অভিসম্পাত। তাঁর রসূল সত্য। তাঁর বাণীও সত্য। তিনি ইরশাদ করেন, ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁদের মধ্যে ঈমানদার ও সৎকর্ম-পরায়ণদের ক্ষমা ও মহান প্রতিদানের ওয়াদা দিয়েছেন।’’
[৪৮:২৯] এ ওয়াদা ঈমান ও সৎকাজের ভিত্তিতে প্রযোজ্য হবে। এ দু’টি বৈশিষ্ট্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। তাই এ ওয়াদাও তাঁদের সকলের জন্য সাব্যস্থ। (খাযায়েন) আয়াতস্থিত ‘মিন’ শব্দটি আংশিকতার অর্থে নয়; বরং বর্ণনামূলক। অর্থাৎ তাঁরা এ বৈশিষ্ট্যের ধারক। আর আয়াতের প্রথমে তাঁদের প্রসংগই উত্থাপিত। যথা-‘মুহাম্মদ হলেন আল্লাহর রসূল। আর তাঁর সহচরবৃন্দ কাফিরদের প্রতি কঠোর, পরস্পরের প্রতি কোমল চিত্ত। আপনি তাঁদেরকে রুকুরত, সিজদাবনত হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি তালাশ করতে দেখবেন।’’ এ আয়াতের শেষ প্রান্তেই রয়েছে প্রাগুক্ত সেই বিবরণ, আল্লাহ্ তাঁদেরকে ক্ষমা ও মহান পুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন।
আয়াতে বর্ণিত সাহাবায়ে কেরাম’র উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলোঃ ক. তাঁরা প্রিয় নবীর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত, খ. কাফির অর্থাৎ আল্লাহ্ ও রাসূলের শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোরচিত্ত, গ. মু’মিন তথা নিজেদের প্রতি কোমল চিত্ত এবং ঘ. আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির তালাশে রিয়াযত-সাধনায় মগ্ন। সমুদয় গুণাবলী প্রিয় নবীর সকল সাহাবীর মধ্যেই বিদ্যমান। এ কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র ফরমান রয়েছে যে, আমার সাহাবীগণ প্রত্যেকই ন্যায়নিষ্ঠ। বিশেষতঃ উল্লেখিত চার বৈশিষ্ট্য চার খলীফার মধ্যে বিশেষ স্বাতন্ত্র নিয়ে দেদীপ্যমান। যেমন সাহচর্য আর সখ্যতার নজীর হয়ে আছেন সিদ্দীকে আকবর, আল্লাহ-রসূলের শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রচ- দ্রোহের নমুনা যেন ফারূকে আ’যম, দয়ার্দ্র চিত্ত, কোমলমতি সাহাবীর উদাহরণ ওসমান গণী যুননূরাইন, আর রিয়াযতে দৃঢ়চিত্ত, আধ্যাত্মিক সাধনার মূর্তপ্রতীক হলেন শেরে খোদা মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম।
আলোচ্য বিষয় প্রিয় নবীর সাহাবিয়্যাত অর্থাৎ সাহাবী হওয়া, যা ‘সুহবৎ’ হতে উৎকলিত। সাহাবায়ে কেরাম উম্মতের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় সমুন্নত, সর্বশ্রেষ্ঠ। তথাপি প্রথম সারির সাহাবীগণ অন্য সবার চেয়ে আলাদা ফযীলতে অনন্য। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন, ‘‘তাঁরা তোমাদের সমমর্যাদার নন, যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে (দ্বীনের স্বার্থে) অর্থ ব্যয় করেছেন এবং (আল্লাহর বাণী সমুন্নত করতে) সংগ্রাম করেছেন। তাঁরা ওইসব লোকদের চেয়ে মর্যাদায় মহত্তর, যাঁরা মক্কা বিজয়ের পরেই অর্থ ব্যয় ও জেহাদ করেছেন।’’ [৫৭:১০] শুধু মক্কা বিজয়ের পরই নয়, সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ছিলেন সকলেরই আগে ঈমানদার ও সাহাবী। ইসলামী দুনিয়া একথায় একমত যে, নবীগণের পর শ্রেষ্ঠতম হলেন আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু।
সাহাবীদের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান কারণ হল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রতি তাঁর অনুরাগ ও নিবিড় সান্নিধ্য। সাহচর্যের দাবী যথার্থ পূরণ করেছেন আবু বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। কেননা ইসলাম গ্রহণ, এমনকি নবীজির নবুওয়ত ঘোষিত হওয়ার আগেই তিনি অন্তরে তাঁর সখ্যতার যে অদৃশ্য আকাংখা অনুভব করেছিলেন তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পেয়েছিল, যার অব্যাহত ধারা অনন্ত সুখের কানন জান্নাতে গিয়ে আরো নিবিড়তা পাবে। সুরা আহকাফের ১৫তম আয়াতের তাফসীরে সদরুল আফাযিল সায়্যিদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন, ‘‘এ আয়াত হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। তাঁর বয়স সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র (জাগতিক বয়স’র) চেয়ে দু’ বছর কম ছিল। যখন হযরত সিদ্দীক-ই আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বয়স আঠার বছর, তখনই তিনি সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সঙ্গ নিলেন। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র (ইহজীবনের) বয়স বিশ বছর। তাঁর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সফরসঙ্গী হয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া ভ্রমণ করেন, এক স্থানে এসে যাত্রা বিরতি করলেন। সেখানে ছিল একটি বড়ই গাছ। হুযূর সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’-এর ছায়ায় তাশরীফ রাখলেন। নিকটেই একজন পাদ্রী থাকতো, হযরত সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তার নিকট চলে গেলেন। পাদ্রী তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, ‘‘ওই বড়ই গাছের ছায়ায় বিশ্রামরত ভদ্রলোকটি কে?’’ হযরত সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘‘ইনি হলেন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) যিনি আবদুল্লাহর পুত্র এবং আব্দুল মুত্তালিবের পৌত্র।’’ পাদ্রী বলল, ‘‘খোদার কসম, উনি একজন নবী এই বড়ই গাছের ছায়ায় হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম’র পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি ছাড়া আর কেউ বসেননি। ইনিই হবেন শেষ নবী।’’ পাদ্রীর কথাগুলো হযরত সিদ্দীকে রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর অন্তরে প্রভাব বিস্তার করল। আর নবুওয়তের নিশ্চয়তা তাঁর মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল। আর সেই থেকে তিনি তাঁর পবিত্র সান্নিধ্য অবলম্বনকে অপরিহার্য করে নিলেন। দেশে-বিদেশে কোথাও তাঁর কাছ ছাড়া হতেন না। সিরিয়ার এক বাণিজ্য সফরে থাকাকালীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেন। দেখলেন, আসমান থেকে সূর্য ও চাঁদ নেমে এসে তাঁর কোলে বসল। তিনি স্বীয় চাদর দিয়ে ঢেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। সেখানকার একজন স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারের নিকট গিয়ে এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন, তিনি তাঁর নাম, গোত্র, পেশা, নিবাস-এসব জানতে চাইলেন। সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু জবাব দিলে উনি বললেন, ‘‘আপনি সৌভাগ্যবান। আপনার গোত্রে প্রতিশ্রুত শেষ পয়গম্বরের আবির্ভাব ঘটবে। তিনি না এলে আল্লাহ্ আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতেন না, তিনি নবী-রসূলগণের সরদার হবেন, তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারি দেখে তাঁকে সকলে আল আমীন বলে ডাকবে। আপনার স্বপ্ন ব্যাখ্যায় বলা যায়, তাঁর ওপর আপনিই প্রথম ঈমান আনবেন। ‘‘তার কথার পরে সিদ্দীকে আকবর নবীয়ে রহমতকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তাঁর সাক্ষাতে আসার পর তিনি ঈমান আনলেন এবং নবীর সাথে প্রিয়তম চিরসঙ্গীর অভিষেক হয়ে গেল। এপর থেকে একে অপরকে না দেখলে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন।
[জামেউল মু’জিযাত’র বরাতে সাচ্চী হেকায়ত] ইসলাম প্রচারে রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দমাতে না পেরে কুরাইশদের এক অমানবিক পদক্ষেপ ছিল বয়কট কর্মসূচী। বনু হাশীমের সাথে কুরাইশদের সফল শাখাগোত্র এক যোগে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। শিআবে আবু তালেব উপত্যকায় বনু হাশেম অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে তিন বছর অতিক্রম করেন। এ অবরুদ্ধ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহর প্রিয়তম সহচর চুক্তির বাইরে থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় অবরোধ বরণ করেন। কারণ নবীজির সান্নিধ্য ছাড়া এ সঙ্গী কিছুতেই স্বস্তি পান না। বরং সেখানে তিনি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রাখতেন। যাতে শত্রু তাঁর কোন ক্ষতি করতে না পারে। [মুসনাদে আহমদ] হিজরতের সময় নবীর একমাত্র সঙ্গীটি ছিলেন সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। যেখানে তিনি নবীর সঙ্গে জীবনবাজি রেখেছেন। মে’রাজের রাতে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে গমনকালে একাকিত্ব অনুভাব করায় আল্লাহ্ তা‘আলা সেখানেও তাঁর রসূলের কানে আবু বকরের শব্দ শুনিয়েছেন, বদর যুদ্ধে প্রিয়নবীর দেহরক্ষীর ভূমিকায় জীবন ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন খলীফাতুর রসূল আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। অন্তিম শয্যায়ও সঙ্গী, হাশরে উত্থিত হওয়ার সময়েও সঙ্গী, জান্নাতের অনন্ত জীবনেও সঙ্গী হয়ে রইবেন সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু।
জন্মিলে মরিতে হইবে- এ আপ্তবাণী স্বীকার করে না, এমন মানুষ নেই। প্রত্যেক প্রাণীর জন্যই কথাটি প্রযোজ্য। মৃত্যু সবার জন্য থাকলেও মৃত্যু সবার জন্য এক রকম নয়, প্রত্যেকের মৃত্যুও সমান নয়। আর মৃত্যুর আগে জীবদ্দশাতেই যাঁরা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হন, তাঁদের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির ঘোষণা দুনিয়াতে পেয়ে গেলে তো কথাই নেই। সাহাবায়ে রাসূল তেমনি সৌভাগ্যবানদের শীর্ষস্থানীয়। সে রকম পরম সৌভাগ্যের এক মহা শুভ বারতার বর্ণনা দিয়েছেন জনৈক সাহাবী। নাম তাঁর সাঈদ বিন জুবাইর। তাঁরই জবানীতে শোনা যাক। ‘‘একদিন আল্লাহর রাসূলের সামনে আমি পবিত্র কুরআনের একটি অংশ তেলাওয়াত করি। যার অর্থ ‘‘হে প্রশান্ত চিত্ত, ফিরে যাও তোমার পালনকর্তার দিকে, এমন অবস্থায় যে, তুমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তিনিও তোমার প্রতি প্রসন্ন’’ আমার খাস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবিষ্ট হও। [সূরা ফজর: আয়াত-২৭, ২৮] শুনে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, ‘‘চমৎকার আয়াত।’’ তখন তাঁর উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূল এরশাদ করলেন, ইন্তেকালের মুহূর্তে এ আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে ফেরেশতা তোমাদের আত্মাগুলোকে আহ্বান করবেন।’’ ঈর্ষনীয় এক সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলেন সিদ্দীকে আকবর। ওফাতের সময়ও তিনি প্রমাণ করেছেন, নবীগণের পর উম্মতের মধ্যে তিনিই সর্বোত্তম।
হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু জুমাদাল উখরা চাঁদের সাত তারিখ ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন। সনটি ছিল ত্রয়োদশ হিজরী। একটানা অর্ধ মাসের কঠিন জ্বরে থেকে জীবনের আশা ক্ষীণ হয়ে আসে। তখন ইসলামী শিশু রাষ্ট্রের অবস্থাও ছিল শোচনীয় রকম বিপর্যস্ত। সিরিয়ায় যুদ্ধ চলছে। রোমান ও ইরানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে মুসলিমবাহিনী প্রচন্ডভাবে লড়ছেন। হিরাক্লিয়াসের দু’ লক্ষাধিক সৈন্যের বিরুদ্ধে চল্লিশ হাজার মুসলিম বাহিনীর প্রাণপণে দূর্দান্ত ও সংঘবদ্ধ আক্রমণেও চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছিল না। মুসলিম সেনাদের অন্তরে উৎকণ্ঠা। ইয়ারমূকের এ যুদ্ধ ঐতিহাসিক। হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ একরাতে স্বপ্নে দেখেন, আল্লাহর রসূল তাঁবুতে তাশরীফ আনলেন, আর এরশাদ করলেন, ‘‘হে আবু উবায়দাহ্! মুসলিম সেনাদের জানিয়ে দাও, ইনশাআল্লাহ্! আজই তোমাদের হাতে সিরিয়া বিজিত হবে। আশ্বস্থ থেকো।’’ এটা বলে প্রিয় নবী তাড়াতাড়ি ফিরতে চাইলে আবু উবায়দাহ্ আরয করলেন, ‘‘এটা বলে প্রিয় নবী তাড়াতাড়ি ফিরতে চাইলে আবু উবায়দা আরয করলেন, ‘‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্, ব্যস্ততা কেন?’’ তখন হুযূর বললেন, ‘‘আজ আবু বকর’র ওফাত হয়েছে, আমাকে সেখানে যেতে হবে।’’ [সীরাতুস্ সালেহীন) তখনও যুদ্ধ অব্যাহত ছিল।
একদিকে ইরাক অভিযান, আবার সিরিয়ার নিকটবর্তী ইয়ারমুখে রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচন্ড যুদ্ধ। এমনই নাজুক পরিস্থিতিতে খলীফায়ে রাসূল হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হয়ে পড়লেন গুরুতর অসুস্থ। এ পরিস্থিতি দৃষ্টে অধিকাংশ সাহাবী মত প্রকাশ করলেন যে, খলীফার উপস্থিতিতেই যথাসময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের হাল ধরার জন্য, ভবিষ্যত নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য প্রতিনিধি বা পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হয়ে গেলে উত্তম হত। কথাটি সমর্থন করে সিদ্দীকে আকবর গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীদের ডেকে পরামর্শ চাইলেন। সবার কাছে তিনি নিজেই হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর প্রস্তাব দিলে অধিকাংশই তা পছন্দ করলেন। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কিছু সাহাবীর পক্ষে দ্বিমত করে বললেন, ব্যক্তিগত ওমর উত্তম বটে, তবে কঠোর স্বভাব বিধায় নমনীয়তার অভাবে অনেকে অপছন্দ করতে পারে।’’ সিদ্দীকে আকবর বললেন, খেলাফতের দায়িত্ব কাঁধে এলে কঠোরতা থাকবে না। এ ক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ সবাই একমত হয়ে যান। তখন তিনি হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর খেলাফত সম্পর্কিত একটি চুক্তিপত্র লিখার নির্দেশ দিলেন। এরপর সাধারণের উদ্দেশ্যে তা শুনিয়ে দেয়া হল। সবাই তা মেনে নিলে তাতে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সীল লাগানো হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিল খেলাফতের প্রথম লিখিত চুক্তিপত্র। সবশেষে তিনি হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আল আনহুকে ডেকে অন্তিম অনুরোধসহ ইনসাফের অসীয়ত করলেন। এ দায়িত্ব সম্পন্ন করে খলীফাতুর রসুল হযরত সিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু পরিবারের সদস্যদের নির্দেশ দিলেন। ‘‘আমার যে জমিটা আছে তা বিক্রি করে প্রাপ্ত মুদ্রা হতে খেলাফতের ভাতা যা আমি নিয়েছিলাম সে পরিমাণ অর্থ বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবে। আমার পরণের কাপড়টা ধৌত করে প্রয়োজন হলে আরেকটা কাপড় দিয়ে আমার কাফন দিও। বাকী যা কিছু আমার অতিরিক্ত সামগ্রী পাবে, তা খলীফা ওমরের কাছে পাঠিয়ে দিও, তিনি তা বায়তুল মালে জমা দেবেন। তার পরবর্তীতে দেখা গেছে দু’টি উট ও একজন দাসী ছাড়া আর কিছুই উদ্বৃত্ত পাওয়া যায়নি।
[তারীখে ইসলাম]

লেখক: আরবি প্রভাষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম।