কীর্তিমান পুরুষ ওয়াজের আলী সওদাগর আলকাদেরী (রহ.)

কীর্তিমান পুরুষ ওয়াজের আলী সওদাগর আলকাদেরী (রহ.)

কীর্তিমান পুরুষ ওয়াজের আলী সওদাগর আলকাদেরী (রহ.)

তরজুমান ডেস্ক

আউলিয়ায়ে কেরামগণ পথহারা মানবজাতিকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দেন। সরলপ্রাণ মুসলমানদের সত্যিকার আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা-আমল শিক্ষা দিয়ে বাতিলের খপ্পর থেকে রক্ষা করেন। দ্বীন ইসলামের খেদমতে নিজ জীবন বিলিয়ে দেন।
আওলাদে রসূল, কুতুবুল আউলিয়া বাণীয়ে জামেয়া আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন এমন একজন বরেণ্য ওলী। তাঁর মাধ্যমে এ উপমহাদেশে এবং বিশ্বের বহু দেশে সিলসিলা-এ আলিয়া কাদেরিয়ার প্রসার লাভ করে। তাঁর সান্নিধ্য অর্জনের মাধ্যমে সোনার মানুষে পরিণত হন অনেকেই। এসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরাই এ সিলসিলার মিশন প্রচার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। হযরত সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির নৈকট্যধন্য ব্যক্তিদের মধ্যে আলহাজ ওয়াজের আলী আলকাদেরি প্রকাশ উজির আলী সওদাগর অন্যতম। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য তুলে ধরার প্রয়াসঃ মুহাম্মদ ওয়াজের আলী ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ২০ ডিসেম্বর নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার তালুয়া চানপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

পিতা মরহুম আশরাফ আলী মিয়া, মাতা মরহুমা আবু জান বিবির দ্বিতীয় সন্তান মোহাম্মদ ওয়াজের আলী। শৈশবকাল থেকে ধর্মানুরাগী ও তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে মক্তব ও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম এসে নগরীর প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র আছাদগঞ্জের বিখ্যাত আবদুস সোবহান সওদাগর (প্রকাশ রাজা মিয়া) এর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। কয়েকবছর চাকরির পর তিনি তার অন্য ভাইদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন এবং এখানে স্টেশন রোডে মেসার্স মোহাম্মদ ওয়াজের আলী সওদাগর এন্ড ব্রাদার্স নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এখান থেকে তাঁর একাগ্রতা, কর্মনিষ্ঠা, সততা দ্বারা পরিচালিত ব্যবসা ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হয় এবং অতি অল্প সময়ে রিয়াজ উদ্দীন বাজার মোহাম্মদীয়া বোডিং, স্টেশন রোডে মেসার্স এস.এস. কর্পোরেশন নামে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় স্থায়ী নিবাসও প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর মরহুমা ছাদিয়া বেগমের সাথে তিনি বিবাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনের মাত্র কয়েক বছর পর ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আওলাদে রসূল, কুতবুল আউলিয়া, আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির হাতে বায়আত গ্রহণ করে ভাগ্যের পরশপাথর কপালে লেপন করেন। এ সময় সিরিকোটি হুজুর দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক রহমাতুল্লাহি আলায়হির কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেসের উপর অবস্থান করতেন এবং এটিকে খানকাহ্ হিসেবে ব্যবহার করে ইসলাম-ঈমান ও আক্বীদার প্রচার-প্রসারে লিপ্ত থাকতেন। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সাথে আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ সওদাগর আলকাদেরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, আলহাজ্ব সুফি আব্দুল গফুর রহমাতুল্লাহি আলায়হি, আলহাজ্ব আমিনুর রহমান আলকাদেরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, আলহাজ্ব আবদুল জলিল চৌধুরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, আলহাজ্ব ডা. টি হোসেন চৌধুরী ও আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম সওদাগরসহ চট্টগ্রামের খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির সান্নিধ্য গ্রহণ করে সিলসিলায়ে আলীয়া কাদেরিয়ার খিদমতে নিজেদের ন্যস্ত করেন।
শাহেনশাহে সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির সান্নিধ্যে যাওয়ার পর মূলত জীবনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকে ওয়াজের আলীর। ব্যবসায়িক উন্নতি, মনের প্রফুল্লতা অধিকন্তু আধ্যাত্মিক জাগরণ তাঁকে এক সময় সংসার বিমুখেও উৎসাহিত করে তুলেছিল। কিন্তু যে পীরের চরণে ওয়াজের আলীর আত্মসমর্পণ তিনি যে বৈরাগ্যবাদী নন; বরং শরীয়ত ও ত্বরীকতের শেখ। তাই নিজের মুরীদকে জন-মানবশূন্য পাহাড়ে না গিয়ে কোলাহলে আল্লাহর ইবাদত ও সংসারে দায়িত্ববান হবার তাগিদ দিয়েছিলেন।

১৯৫৮ সালে হুযূর কিবলা আওলাদে রসূল, শাহেনশাহে সিরিকোট আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হির নেতৃত্বে হাদীয়ে দ্বীন ও মিল্লাত, কুতবুল এরশাদ আল্লামা হাফেজ কারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হিসহ বাংলাদেশের বহু পীর ভাই এবং হুজুর কেবলা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মু.জি.আ.)ও হারামাঈন শরীফে হজ্ব সম্পাদনে গিয়েছিলেন। এ সময় মদিনা শরীফে রওজায়ে আক্বদাসে হুযুর করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যিয়ারত ও সালাতু সালাম পরিবেশনের এক পর্যায়ে ডা. টি. হোসেন (তোফাজ্জল হোসেন)-এর সাথে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দিদার লাভ হয়। ঠিক এ সময় হুজুর সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি টি হোসেন সাহেবকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘ডাক্তার সাহেব এখন একদিকে আপনার সাথে সরকারে দো‘আলমের দিদার চলছে অন্যদিকে এখন থেকে সিলসিলার এগার সবক পালনের নির্দেশ হচ্ছে। ঘটনাটির অন্তর্নিহিত রহস্য লক্ষ্যণীয়। যিয়ারত চলছিল সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির নেতৃত্বে। দিদারে মুস্তফা নসীব হচ্ছিল ডা. টি হোসেনের এবং ঐ সময়েই হুজুর সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি টি হোসেনকে দিদারে মুস্তফা ও অতিরিক্ত এগার সবকের কথা বলছিলেন। (সুবহানাল্লাহ) আর এ দিদারে মুস্তফার মধ্যমণি ছিলেন সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি। এ ঘটনা শুনার পর মোহাম্মদ ওয়াজের আলী সওদাগর আর স্থির থাকতে পারেননি; রীতিমতো নাছোড়বান্দা স্বীয় মুর্শিদের দরবারে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিনতি ডা. টি হোসেনের মতো তাঁরও যেন হুজুর করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দিদার নসীব হয়। অন্যথায় তিনি আর দেশে ফিরবেন না। ছাহেবে কাশ্ফ ও কারামত, আওলাদে রসূল আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি অবশেষে ওয়াজের আলী সওদাগরকে নিয়ে আবারও রওজা মোবারক যিয়ারতে গেলেন এবং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দিদার নসীবের মাধ্যমে তাঁর আশা পূর্ণ করলেন।

এ ঘটনাটি থেকে বুঝা যায় ওয়াজের আলী সওদাগর কতটুকু ফানা ফিশ্ শেখ ও আশেকে রসূলে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি জীবনে যতদিন বেঁচেছিলেন মুহূর্তের জন্য দ্বীন, সিলসিলা ও পীরের সান্নিধ্য ও ধ্যান বিমুখ হননি। ফলে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কীর্তিমানের উপযুক্ত পরিণাম প্রদান করলেন কুতবুল এরশাদ হাদিয়ে দ্বীন ও মিল্লাত আল্লামা হাফেজ কারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি।

১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ ওয়াজের আলী সওদাগর হুজুর কেবলা কর্তৃক খিলাফতপ্রাপ্ত ‘আলকাদেরী’ খেতাব লাভে ধন্য হন। আলহাজ্ব ওয়াজের আলী সওদাগর জীবনে মোট আটবার হজ্ব করেন। তিনি বায়াত গ্রহণের পর থেকে আনজুমান এবং জামেয়ার খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের সদস্য ও প্রথম ফাইন্যান্স সেক্রেটারি ছিলেন। ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠা ও সততার সাথে। তাছাড়া তিনি নোয়াখালী নিজ গ্রামে মোহাম্মদীয়া সৈয়্যদীয়া ওয়াজেরিয়া নামক একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদ, তিনপুল জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি, ঢাকা-নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সেবা ও মানবকল্যাণমূলক সংগঠন সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত খাদেমুল হজ্ব কমিটির সদস্য হিসেবে হাজী সাহেবানদের খিদমত করে গেছেন।

১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ, ২৮ রবিউস্ সানি ১৪০০ হিজরী রবিবার ভোর সাড়ে চারটায় এ মহান ব্যক্তিত্ব সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে আল্লাহ্ ও রসূলের সান্নিধ্যে যাত্রা করেন। ভাগ্যবান এ মহান ব্যক্তির প্রথম জানাযা হয়েছিল লালদীঘি ময়দানে। যাতে ইমামতি করেছিলেন আওলাদে রসূল, হাদিয়ে দ্বীনও মিল্লাত আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি, পরে জামেয়া ময়দানে দ্বিতীয় জানাযা মরহুম অধ্যক্ষ আল্লামা জালাল উদ্দীন আলকাদেরীর ইমামতিতে জানাযা শেষে জামেয়া সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

আলহাজ্ব মোহাম্মদ ওয়াজের আলী সওদাগর রহমাতুল্লাহি আলায়হি মৃত্যুকালে উপযুক্ত সাত ছেলে তিন কন্যা রেখে যান। সন্তানদের মধ্যে দ্বিতীয় আলহাজ্ব মোহাম্মদ সামশুদ্দীন সিলসিলার কার্যক্রমে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন। তিনি আনজুমানের এডিশনাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর পরিবারের সকলেই আন্তরিকতার সাথে এ তরিকার খেদমতে নিয়োজিত আছেন। তাঁর নাতি মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন গাউসিয়া কমিটি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাথে সম্পৃক্ত থেকে খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে সিলসিলায়ে আলিয়ার খিদমত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Share:

Leave Your Comment