আউলিয়ায়ে কেরামের দর্শনে আল্লাহর স্মরণ

আউলিয়ায়ে কেরামের দর্শনে আল্লাহর স্মরণ

আউলিয়ায়ে কেরামের দর্শনে আল্লাহর স্মরণ

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

عَنْ ابن عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ سُئِلَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عليهِ وَسَلَّمَ عَنْ اَوْلِيَاءِ اللهِ! فَقَالَ اللَّذِيْنَ اِذَا رُؤُوْا ذُكَرَ الله عَزَّ وَجَلَّ – (رواه النسائى)
عَنْ اَسْمَاء بِنْتِ يَزِيْدَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ : اَلَا اُنَبِئكُمْ بِخِيَارِكُمْ؟ قَالُوْا بَلَى يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خِيَاركُمْ اللذِيْنَ اِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ- (رواه البن ماجه و احمد)

অনুবাদ: হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ওলী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে নবীজি এরশাদ করেন, যাঁদের দর্শনে আল্লাহ্র স্মরণ হয়। [নাসাঈ শরীফ: হাদীস- ১১২৩৫]
হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সংবাদ দিব না? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্, নবীজি এরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তাঁরা যাদের দেখলে মহান আল্লাহ্র স্মরণ হয়। [ইবনে মাযাহ্: হাদীস নং ৪১১৯, মুসনাদে আহমদ: হাদীস নং ২৭৬৪০]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
বর্ণিত হাদীস শরীফে আল্লাহর ওলীদের পরিচয় ব্যক্ত হয়েছে। হযরত শাহ্ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির বর্ণনা মতে প্রকৃত শায়খ বা মুরশিদগণ মুরাকাবা মুশাহাদার মাধ্যমে মহান আল্লাহ্র পবিত্র সত্তার নূর বা জ্যোতি প্রাপ্ত হন। তাঁদের সান্নিধ্যে এলে আল্লাহর স্মরণ অন্তরে জাগ্রত হয়। আত্মা পরিশুদ্ধ হয়, হাদীস শরীফে আল্লাহ্র ওলীর পরিচয় প্রসঙ্গে উল্লেখ হয়েছে- هُمْ جُلسَاءَ اللهِ তাঁরা আল্লাহ্র সান্নিধ্য অর্জনকারী হয়ে থাকেন।
আল্লাহর ওলী তাঁরাই যাঁদের সুহবতে বসলে যাঁদের প্রদর্শিত পথে চললে, মানুষ আল্লাহ্র দ্বীনের পথিক হয়ে যায়। বদকার মানুষ নেক্কার হয়ে যায়, বেনামাযী নামাযী হয়ে যায়, অসৎ মানুষ সৎ ও আদর্শ মানুষে পরিণত হয়। আউলিয়ায়ে কেরামের সাথে সম্পর্ক স্থাপনকারী সহীহ বিশুদ্ধ আক্বিদার অনুসারী তরীক্বতের শায়খ পীর মুর্শিদের প্রদর্শিত পথে জীবন পরিচালনাকারী ব্যক্তিবর্গ অন্যায় ও অনৈতিক কাজ, শরীয়ত পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারে না। মুসলিম শরীফে আল্লাহর ওলীর পরিচয় ব্যক্ত হয়েছে এভাবে যে- هُمْ قَوْمٌ لَا يَشْقى جَلِسُهُم অর্থাৎ ওলীগণ এমন শ্রেণিভুক্ত সম্প্রদায় যাঁদের সুহবত অর্জনকারী তাদের মজলিসে অবস্থানকারী ব্যক্তিগণ পাপী থাকেন না আল্লাহ্র রহমত থেকে বঞ্চিত হয় না। [মুসলিম শরীফ: খণ্ড- ৭, পৃষ্ঠা-১৯৯ ইফা, আল্ কাউলুল জামীল কৃত: শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রাহ. পৃষ্ঠা-৬০]

নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধ:পতনের এই নাজুক সন্ধিক্ষণেও এ কথা বাস্তব সত্য ও প্রমাণিত যে, সমাজের অসংখ্য মানুষ আল্লাহর প্রকৃত ওলীদের সান্নিধ্যে এসে তাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। আমলে-আখলাকে, ধর্মে-কর্মে পরিবার, সমাজ ও জীবনের বৃহত্তর আঙ্গিকে আল্লাহর ওলীর আদর্শ অনুসরণ করে নিজেদের জীবন ধন্য করেছে।

হুযূর গাউসুল আযম দস্তগীরের মজলিসে হাজার হাজার মানুষ আল্লাহ্র স্মরণে বিভোর হয়ে যেতো; শাহেন শাহে বাগদাদ গাউসুল আযম দস্তগীরের নূরানী তকরীরের প্রভাব এতো ব্যাপক কার্যকর ছিলো, হাজার হাজার গুনাহ্গার, বদকার, পাপী-তাপী বান্দারা তাঁর নূরানী হাত মুবারকে তাওবা করে দ্বীনদার, পরহেজগার, নেক্কার বান্দাতে পরিণত হয়েছে। তাঁর তাকরীরের প্রভাব এমন শক্তিশালী ছিলো অসংখ্য মানুষ ঈমানী চেতনা ও জযবায় উজ্জীবিত হয়ে যেন সাগরে বিমোহিত হয়ে পড়তো।

মাহফিলের রূহানিয়াতের অবস্থা এতো উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিকতায় উপনীত হতো যে, মাহফিল শেষে দেখা যেত জযবার হালতে অনেকে বেহুশ হয়ে যেত। অনেক জানাযা প্রস্তুত হয়ে যেতো, গাউসে পাকের তকরীরে মুসলমান ছাড়াও অসংখ্য ভিন্ন ধর্মাবলম্বী উপস্থিত হতো, অসংখ্য কাফির-মুশরিক, ইহুদী, খ্রিস্টান কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতো। [বাহ্যাতুল আসরার: পৃষ্ঠা ২৮১, কালায়েদুল জাওয়াহির: পৃষ্ঠা- ২১২]

ফেরেশতাগণও ওলীদেরকে সম্মান করে। হুযূর গাউসে আযম দস্তগীর বর্ণনা করেছেন, দশ বৎসর বয়সে আমি আমার বেলায়ত সম্পর্কে জানতে পেরেছি, আমি যখন মক্তবে যাতায়াত করতাম রাস্তায় চলার পথে আমার পেছনে পেছনে ফেরেশতা দৃষ্টি গোছর হতো, আমি যখন মক্তবে পৌঁছে যেতাম, ফেরেশতারা বলতে শুনতাম- اِفْسَحُوْا لِوَلِىَّ اللهِ অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ্র ওলীর জন্য রাস্তায় জায়গা করে দাও, এ আওয়াজ মক্তবে উপস্থিত সকলে শুনতে পেতেন। [বাহযাতুল আসরার: পৃষ্ঠা-৪৭, যুবদাতুল আছার: পৃষ্ঠা-৭৯]

হুযূর গাউসে পাক ইলমে জাহের ইলমে বাতেন অর্জনের জন্য গোটা জীবন যিকর ও সাধনাতে অতিবাহিত করেন। হুযূর গাউসে পাক রাহমাতুল্লাহি আলায়হি শরীয়ত-তরীক্বত, হাকীক্বত মারিফাত, ইলমে জাহের, ইলমে বাতেন অর্জন শেষে বৎসরের পর বৎসর বিভিন্ন পাহাড় পবর্তে চিল্লা মুরাকাবা-মোশাহাদা, ইবাদত-বন্দেগী, রিয়াযত, তিলাওয়াত, যিকর আযকারে বিভোর থাকতেন। কখনো কখনো একাধারে চল্লিশ দিন পাহানার ব্যাতিরেকে নিজেকে আল্লাহ্র ধ্যানে স্মরণে উৎসর্গ করত। হযরত আহমদ ইবনে ইয়াহিয়া বর্ণনা করেন, আমি স্বয়ং হুযূর গাউসে পাককে বলতে শুনেছি যে, আমি একাধারে চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত এশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত প্রতিদিন বিরতিহীন এক খতম ক্বোরআন মজীদ তিলাওয়াত করতাম। [বাহ্যাতুল আসরার: পৃষ্ঠা-২৪৯. আনোয়ারুল বয়ান: খণ্ড-১ম, পৃষ্ঠা-৫৪০]

প্রকৃত ওলীগণ অত্যাচারী পাষণ্ডকে ভয় করে না
সত্যের ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সদা সত্যের উপর অটল অবিচল থাকা, সত্য কথা বলা, সত্য মেনে চলা, একজন প্রকৃত মু’মীনের জীবনের অমূল্য সম্পদ। নবীজি এরশাদ করেছেন, অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সবচেয়ে বড় জিহাদ। হুযূর গাউসে পাক সত্য প্রচারে সত্য কথা বলতে নির্ভীক ও আপোষহীন ছিলেন। একদা বাগদাদের গভর্ণর ‘‘আবুল ওয়াফা ইয়াহিয়া’’ নামক এক জালিম অত্যাচারী ব্যক্তির উপর বিচারকের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করলো, হুযূর গাউসে পাক মিম্বর শরীফে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও কঠোর সমালোচনা করলেন, পরিষ্কার ভাষায় সাবধান বাণী উচ্চারণ করলেন, হে খলিফা! তুমি এক অত্যাচারী লোককে আল্লাহ্র বান্দাদের বিচারক নিয়োগ দিয়েছো! তুমি আল্লাহ্র কঠিন শাস্তির জন্য প্রস্তুত থাক। এ অপকর্মের জন্য তোমাকে জবাবদিহী করতে হবে। হুযূর গাউসে পাকের কঠোর হুশিয়ারীর কারণে গভর্ণরের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হলো, লজ্জিত হলো, অনুতপ্ত হলো, নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিলো, আবুল ওয়াফা ইয়াহিয়াকে তৎক্ষণাৎ বিচারকের পদ থেকে অপসারণ করলো।
[হায়াতে তৈয়্যবাহ্: পৃষ্ঠা- ৪৬, আনোয়ারুল বায়ান: খণ্ড-১ম, পৃষ্ঠা-৫৪৫]

যাঁদের দর্শনে আল্লাহ্র স্মরণ দৃঢ়, তাঁদের মর্যাদা ও ক্ষমতা
একদা শাহেন শাহে বাগদাদ হুযূর গাউসে পাক কতিপয় ভক্ত মুরিদ নিয়ে একটি মহল্লা অতিক্রম করছিলেন, পথিমধ্যে দেখলেন একজন মুসলমান ও একজন খ্রিস্টান পরস্পর বিবাদ বিতর্কে লিপ্ত। গাউসে পাক ঝগড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে, মুসলমান বললেন এই খ্রিস্টান লোকটি দাবী করছে, হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম আমাদের নবী থেকে শ্রেষ্ঠ। হুযূর গাউসে পাক খ্রিস্টানকে জিজ্ঞেস করলেন আপনি কোন কারণে ঈসা আলায়হিস সালামকে শ্রেষ্ঠ দাবী করছেন!

খ্রিস্টান লোকটি উত্তর দিলো, যহরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন। হুযূর গাউসে পাক উত্তর দিলেন, আমি নবী নই, বরং নবীর একজন আওলাদ ও উম্মত হই। যদি এই মুহূর্তে আমি কোন মৃতকে জীবিত করি তুমি কি আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিবে? খ্রিস্টান লোকটি উত্তর দিলো অবশ্যই স্বীকার করবো, হুযূর গাউসে পাক তাঁকে বললো, তোমার জানা-শুনা কোনো পুরাতন কবরের পাশে আমাকে নিয়ে চলো, গাউসে পাককে নিয়ে গেলেন, গাউসে পাক বহু প্রাচীন এক কবরের দিকে ইঙ্গিত করলেন এবং বললেন এই কবরে কবরস্থ লোকটি জীবদ্দশায় গানবাজনা করে জীবিকা নির্বাহ্ করতো, আপনি যদি চান আমি এই মুর্দাকে গায়ক অবস্থায় কবর থেকে তুলে আনতে পারি, খ্রিস্টান উত্তর দিলো, এটাতো আরো বিস্ময়কর তা-ই কারুন। হুযূর গাউসে পাক কবরের দিকে দৃষ্টি দিলেন বললেন, قُمْ بِاِذْنِ اللهِ আল্লাহর অনুমতিক্রমে দাঁড়াও তৎক্ষণাৎ কবর ফেটে গেল, মুর্দা জীবিত হয়ে গায়ক অবস্থায় বেরিয়ে আসলো। গাউসে পাকের এ কারামতি দেখে খ্রিস্টান লোকটি তাওবা করলেন এবং মুসলমান হলেন আউলিয়ায়ে কেরামের ক্ষমতা ও খোদা প্রদত্ত অসাধারণ মর্যাদা হয়ে থাকে। [তাফরীহুল খাওয়াতির, আনোয়ারুল বয়ান: খণ্ড-১ম, পৃষ্ঠা-৫৬৪]
আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে আউলিয়ায়ে কেরামের পদাঙ্ক অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আ-মী-ন।

লেখক: অধ্যক্ষ- মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম।

Share:

1 Comment

  1. Amina Salehaton Noor

    Says November 22, 2022 at 11:12 am

    ما شاء الله

Leave Your Comment