রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র চার কন্যার জীবন পরিক্রমা

রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র চার কন্যার জীবন পরিক্রমা

রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র চার কন্যার জীবন পরিক্রমা

রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র চার কন্যার জীবন পরিক্রমা-
তাহিয়্যা কুলসুম ?

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ্র, যিনি মহানবী সরওয়ারে কায়েনাত হুযূর মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র নূর মোবারক থেকে সমগ্র বিশ্ব জগত সৃষ্টি করেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানী বংশে আবির্ভাব হয় হুযূর তনয়া খাতুনে জান্নাত সৈয়্যদা ফাতিমাতুয যাহ্রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার, যিনি নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বংশধারা পৃথিবীব্যাপি প্রসারের মধ্যমণি। পবিত্র ক্বোরআনে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন- ‘‘হে নবী! আপন বিবিগণ, সাহেবযাদীগণ ও মুসলমানদের নারীগণকে বলে দিন যেন তারা নিজেদের চাদরগুলোর একাংশ স্বীয় মুখের ওপর ঝুলিয়ে রাখে।’’[২৩: ৫৯]

পবিত্র ক্বোরআনের উক্ত আয়াতে (বানা-তিকা) সাহেবযাদীগণ উল্লেখের ক্ষেত্রে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অতএব, বুঝা যায় যে, মা ফাতেমাতুয যাহ্রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা ছাড়াও মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আরও কন্যা রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আলেমদের বর্ণনা মতে, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাহেবযাদী চার জন। স্বল্প পরিসরে তাঁদের স্মরণের মাধ্যমে সৌভাগ্য লাভে ব্রতী হলাম।

১. হযরত যয়নব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)
হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর চার কন্যার মধ্যে বড় ছিলেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুবূয়ত প্রকাশের দশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বেই তিনি আপন খালাতো ভাই (হযরত খাদিজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা)-এর বোন হিন্দ বিনতে খুয়াইলদের পুত্র আবুল আস বিন রবী’র সাথে বিবাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নুবূয়তের ত্রয়োদশ বছরে যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন তখন হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা মক্কায় স্বীয় শ্বশুরালয়ে ছিলেন। তাঁর স্বামী আবুল আস মুসলমানদের বিপক্ষে মক্কার মুশরিকদের সাথে বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। মুসলমানরা বিজয়ী হলে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আবুল আসও আটক হয়।

বন্দীদের খবর মক্কায় পৌঁছালে তারা বন্দীদের মুক্তির জন্য ফিদইয়া প্রেরণ করে। হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাও স্বা মীর মুক্তির জন্য দেবরের মাধ্যমে একটি হার প্রেরণ করে, যা খদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা তাঁকে বিবাহের সময় উপটৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। হারটি প্রত্যক্ষ করা মাত্রই মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হযরত খদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার কথা মনে পড়ে গেল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, ‘‘যদি তোমরা ভালো মনে কর, তাহলে যয়নব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)-এর স্বামীকে মুক্ত কর এবং হারটি ফিরিয়ে দাও।’’ যেস্থানে সকল বন্দীর মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করা হলো, সেস্থানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জামাতা হিসেবে বিনা ফিদইয়ায় আবুল আস মুক্তি পাবে তা শানে নুবূয়তের বিরোধী ছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আবুল আসের জন্য ফিদইয়া নির্ধারণ করে দিলেন- তিনি যেন মক্কায় ফিরে গিয়ে হযরত যয়নব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)কে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। তা ছিল ফিদইয়ার বিকল্প।

রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)কে আনয়নের জন্য আবুল আসের সাথে হযরত যায়েদ বিন হারেছা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে প্রেরণ করেন। হযরত যায়েদ বিন হারেছা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি নির্দেশ ছিল তিনি যেন মক্কায় প্রেবেশ না করেন এবং ‘বতন’ নামক স্থানে অপেক্ষা করেন। আবুল আস মক্কায় প্রবেশ করে আপন ভ্রাতা কেনানার মাধ্যমে হযরত যয়নব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)কে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাঁরা বের হওয়ার পরে পথিমধ্যে মুশরিকদের আক্রমণের শিকার হন। এক কাফির হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে বর্শা দ্বারা আঘাত করেন এবং তিনি উট থেকে পড়ে যান। হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা গর্ভবতী ছিলেন এবং আঘাতের কারণে তাঁর সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা’র দেবর কেনানা বীরবিক্রমে হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে ‘বতন’ নামক স্থানে নিয়ে এসে হযরত যায়েদ বিন হারেছা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নিকট সোপর্দ করেন। এভাবে হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা তীব্র কষ্ট স্বীকার করে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। পরবর্তীতে হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার স্বামীও ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। মেয়ের নাম ছিল উমামা ও ছেলের নাম আলী। হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ৮ম হিজরী সনে ওফাত বরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং তাঁর কবরে অবতরণ করেন এবং নিজ হাতে তাঁকে কবরস্থ করেন।

২. হযরত রুক্বইয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)
হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা নবুয়ত প্রকাশের সাত বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বেই রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আবু লাহাবের পুত্র উতবা’র সাথে হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বিবাহ্ দেন। নুবূয়তের পর যখন সূরা লাহাব অবতীর্ণ হয়, তখন আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী পুত্র উতবাকে হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে তালাক প্রদানের নির্দেশ দেয়। উতবা বিন লাহাব অবশেষে পিতা-মাতার আদেশে হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে তালাক দেয়। উল্লেখ্য, মক্কার কুরাইশরা হযরত আবুল আসকেও হযরত যয়নব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে তালাক দেওয়ার জন্য জোর করেছিল, কিন্তু তিনি তা মেনে নেননি।

হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা তালাক প্রাপ্ত হওয়ার পর হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সাথে তাঁকে পুনর্বার বিবাহ্ দেন। কোন কোন ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন যে, হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার দ্বিতীয় বিবাহ্ও জাহেলি যুগে হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ বর্ণনাটি মেনে নেননি, তাদের মতে দ্বিতীয় বিয়ে ইসলাম আগমনের পরে হয়েছিল।

হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা প্রথমে মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় এবং পরবর্তীতে আবার মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা-এর একটি মাত্র পুত্র সন্তান ছিল, যার নাম ছিল আবদুল্লাহ্। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তার জানাযার নামাযে ইমামতি করেছিলেন। এরপর রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার অন্য কোন সন্তান হয়নি।

হিজরী দ্বিতীয় বর্ষে বদর যুদ্ধের সময় হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা অসুস্থ ছিলেন। তাঁর যতœ করার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করে মদীনায় রেখে গেলেন। কিন্তু তাঁকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গণ্য করা হয় এবং গণীমতের একটি অংশও তাঁকে প্রদান করা হয়। হযরত যায়দ বিন হারেছা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের খবর নিয়ে যেদিন এসেছিলেন সেদিনই হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ইন্তেকাল করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের ব্যস্ততার কারণে দাফন কার্যে অংশ গ্রহণ করতে পারেননি।

৩. হযরত উম্মে কুলসুম (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)
হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তৃতীয় কন্যা ছিলেন হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা। নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বে আবূ লাহাবের পুত্র উতাইবার সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। নুবূয়ত পরবর্তী সূরা লাহাব নাযিল হওয়ার পর পিতা-মাতার নির্দেশে উতাইবা হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে তালাক দেয়। হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাও হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা উভয় বোন এক সাথে তালাক প্রাপ্ত হন।
হযরত রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার ইন্তেকালের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সাথে হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বিবাহ্ দেন। এরপর থেকে তিনি ‘যুন নূরাইন’ বা দুই নূরের অধিকারী উপাধিতে ভূষিত হন।

নবম হিজরীর শাবান মাসে হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা ইন্তেকাল করেন। হযরত উম্মে আতিয়া, আসমা বিনতে উমাইস এবং আরো অন্যান্য মহিলা সাহাবী তাঁকে শেষ গোসল করান। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাযে ইমামতি করেন। হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, ‘‘হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে দাফন করার সময় রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগলো।’’ হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা-এর কোন সন্তান-সন্ততি ছিল না। হযরত উম্মে কুলসুম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার ওফাতের পর রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে বলেন, ‘‘যদি আমার আরও একটি কন্যা থাকত তবে তাকেও আমি তোমার সাথে বিবাহ দিতাম।’’

৪. হযরত ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)
হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম- এর চতুর্থ কন্যা হলেন খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমাতুয্ যাহ্রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা। তিনি সমগ্র নারী জাতির সর্দার এবং জান্নাতী নারীদের প্রধান। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কলিজার টুকরা হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করার সাধ্য এই অধমের নেই। তাঁর সম্পর্কে সামান্য বর্ণনা করে কিছু নেকী অর্জনের প্রচেষ্টা চালালাম মাত্র।
সৈয়্যদা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ৪১তম বছরে অর্থাৎ নুবূয়ত প্রকাশের পরবর্তী বছর জন্মগ্রহণ করেন। হুযূর হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের রমজান মাসে বদর যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র সাথে মা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বিবাহ্ দেন। বিবাহের সময় সৈয়্যদা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বয়স ছিল ১৫ বছর সাড়ে ৫মাস এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বয়স ছিল ২১ বছর ৫ মাস, সৈয়্যদা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার গর্ভে ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইন, মুহসিন, যয়নব, উম্মে কুলসুম ও রুক্বইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বর্ণনা করেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম চাদর পরিহিত অবস্থায় বাহিরে গেলেন। হযরত হাসান (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) আসলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁকে চাদরে ঢুকিয়ে নিলেন। এরপর হযরত হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আসলেন তাঁকেও তিনি চাদরে ঢুকিয়ে নিলেন। এভাবে হযরত আলী ও সৈয়্যদা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমাকেও চাদরাবৃত করলেন এবং বললেন, ‘‘তোমরা হলে আহলে বায়ত। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের থেকে সকল অপবিত্রতা দূর করে পবিত্র করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তোমরা চার জনের সাথে যারা যুদ্ধ করবে তাদের সাথে আমি যুদ্ধ করব এবং তোমাদের সাথে যারা উত্তম ব্যবহার করবে আমিও তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করব।’’

হযরত সওবান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন কোন ভ্রমনে বের হতেন, সর্বশেষ তিনি হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বিদায় নিতেন এবং যখন ফিরে আসতেন তখন সর্বপ্রথম হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার সাথেই সাক্ষাৎ করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘যে ব্যক্তি ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকে কষ্ট দিল।’’

খাতুনে জান্নাত সৈয়্যদা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা অধিকাংশ সময়ই মহান আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতেন। তাঁর দানশীলতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সহনশীলতা, সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত অনন্য। পারিবারিক দায়িত্ব পালনেও ছিলেন নিষ্ঠাবান। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘‘ইবাদত বন্দেগিতে রত থাকা সত্ত্বেও তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে কোন পারিবারিক ঝামেলা সহ্য করতে হয়নি।’’ নারী জাতির আদর্শ সৈয়্যদা ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা দুনিয়া থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্দা গ্রহণের ছয় মাস পরই ইন্তেকাল করেন। হযরত আসমা বিনতে উমাইস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা তাঁকে গোসল দেন এবং আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু জানাযার ইমামতি করেন। তাঁর অসীয়ত মোতাবেক রাতের বেলা তাঁকে দাফন করা হয়। সরওয়ারে কায়েনাত হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যাগণ সমগ্র বিশ্বের নারী সমাজের জন্য আদর্শ স্বরূপ। মহান আল্লাহ্ মুসলিম নারীদের আমৃত্যু নবী তনয়াদের আদর্শ অনুকরণেল সক্ষমতা দান করুন। আ-মী-ন।[তথ্য সূত্র: শাহ্ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভী (রাহ.) কৃত মাদারেজুন নবুওয়্যত]

লেখিকা: শিক্ষার্থী, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা ফাযিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম