মসজিদ-ই নবভী শরীফ: আসহাবে সুফ্ফাহ্ ও ইলমে তাসাঊফ

মসজিদ-ই নবভী শরীফ: আসহাবে সুফ্ফাহ্ ও ইলমে তাসাঊফ

মসজিদ-ই নবভী শরীফ: আসহাবে সুফ্ফাহ্ ও ইলমে তাসাঊফ

মসজিদ-ই নবভী শরীফ:
আসহাবে সুফ্ফাহ্ ও ইলমে তাসাঊফ
ড. আবদুল্লাহ্ আল্ মা’রূফ
১৯৮৩ সালে আমি ‘‘সুফ্ফাহ্’’ প্রথম দেখি। মসজিদে নবভীর মূল অংশে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতে থাকি- এই উঁচু ভিটাটিতে যেন বসে আছেন হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। তাঁর পাশে আরও অনেকেও যেন শুয়ে-বসে আছেন। কেউ কালো, কেউ সাদা। গায়ে সস্তা কাপড়-চোপড়। দারিদ্র্য ক্লিষ্ট অবয়বেরও কী নূরানী উদ্ভাস! প্রায় দেড় হাজার বছর পর লোক বদলেছে, কিন্তু ওই স্থান বদলায়নি। আশেপাশেই ছিলেন সাইয়্যেদুনা আবু বাকর, উমার, উসমান, আলী, তালহা, যুবায়ের, জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম আরও কত সাহাবা। তাদের কেউ সেনাপতি, কেউ কাতেবুল ওয়াহ্য়ি, কেউ ক্বারী, আবার কেউ তো ব্যবসায়ী, অথবা কৃষক। তাঁরা মধুর সন্ধানে দূর থেকে উড়ে আসা মৌমাছির মত। মধু সংগ্রহ করে আপন ঘর মৌচাকে ফিরে যায়। অহির জ্ঞান-মধু আহোরণ করতে কেউ তো এক দিন পরপর আসেন, আনসার ভাই অন্যদিন সেখানে যান। সবারই স্ত্রী-পরিবার, ঘর সংসার আছে। একটি সমাজ তারাই প্রাণময় করে রেখেছেন উৎপাদন, সরবরাহ, বেচা-কেনা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে।
কিন্তু কিছু লোক ছিলেন, মসজিদের চত্বরের কবুতরে মত। এখানেই উড়াউড়ি করে। খাবার খায় এবং মসজিদ ঘিরেই ঘুরপাক খায়। সুফ্ফায় যারা রাতে ঘুমান, ইবাদত করেন, তারাই নবীজির প্রতিটি বাক্য ও কর্ম দেখা আর শোনার জন্য সদা উৎকের্ণ ও ব্যাকুল থাকেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যা হাদিয়া আসতো, তা থেকে তাদের দিতেন। তারা যেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিদিনের মেহমান।
মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর মসজিদে একদল লোক দেখেন জিকির করছেন, আরেকদল ক্বোরআন মাজিদ মুখস্থ করছেন, তাফসীর শোনছেন। আরেক দল মাস্আলা-মাসায়েল শিক্ষায় ব্যস্ত। আসহাব সুফ্ফাহ্ বা সুফ্ফা ওয়ালাগণ যেন সব কিছুতেই আছেন। বিশেষ করে তারা যেন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পেই রয়েছেন। সব সময় এখানে থাকার সুবিধার্থে বা সামর্থের অভাবে তাঁদের কেউ কেউ বিয়ে-শাদীও করতেন না। এ ছিল সাধারণ অবস্থা। পরবর্তীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিবাহের তাকিদ দেওয়াতে তাঁরা ওদিকেও গেছেন।
ইবাদতের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবীদের সাদাসিধে জীবন যাপনকে লক্ষ করেই পরবর্তীতে অনেকেই বলেছেন যে, ‘সুফী’ শব্দটি আহল্-আস্-সুফ্ফাহ্ (اهل الصفة) শব্দ থেকে উৎকলিত হয়েছে। নামটি আদৌ সুফ্ফাহ্ থেকে এসেছে কিনা এ নিয়ে দু’কথা থাকলেও তাসাওউফের মূল চেতনার সাথে যে সুফ্ফাবাসীর জীবনযাত্রার সাথে মিল আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। অল্পে তুষ্টি হচ্ছে সুফিদের ভূষণ। সামর্থ্য থাকলেও কম খাওয়া, কম ঘুমানো এবং আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা সুফিদের অভ্যাসে থাকে। নিজেদের দেহকে শাসন করে মনের ওপর রাজত্ব বিস্তার করতে দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করা তাঁদের পথ ও পদ্ধতি, যার মাধ্যমে তাঁরা অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন।
অনুরূপ আহলে সুফ্ফাহ্ বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্র থেকে আসা একদল লোক ছিলেন যারা স্বচ্ছল ঘরের সন্তান ছিলেন। ইসলামের টানে ঘর ছেড়েছেন। সংখ্যায় তারা প্রায় ৪০০ জন হলেও একই সঙ্গে ছিলেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন মিশন বা অপারেশনে পাঠাতেন। জিহাদের সময় তাঁরা জীবন তুচ্ছ করে প্রথম কাতারে থেকে লড়তেন। এখনকার তথাকথিত কিছু সুফির মত আয়েশী ও পলায়নপর মানসিকতার লোক ছিলেন না তাঁরা।
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যখন সুফ্ফায় থাকতেন তখন তাঁর সাথে প্রায় ৭০ জন সাহাবী ছিলেন। তাঁদের কারও কারও পরনে কেবল হাঁটু পর্যন্ত ঢাকে এমন একখণ্ড কাপড় ছিল। রুকুতে গেলে সতর খুলে যাবে ভয়ে হাতে চেপে ধরতেন। অধিকাংশ সময় খেজুরই ছিল তাঁদের তিনবেলার আহার। কিন্তু তাঁদের এই সবর ও ধর্মপ্রীতির জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, দারিদ্রে থেকেও হৃষ্টচিত্তে এই যে তোমাদের প্রচেষ্টা এর ওপর টিকে থাকলে তোমরাই হবে বেহেশতে আমার সাথী।
اَبْشِرُوْا يَا اَصْحَابَ الصُّفَّةِِ فَمَنْ بَقَىَ مِنْكُمْ عَلَى النَعْتِ الَّذِىْ اَنْتُمْ عَلَيْهِ اَلْيَوْمَ رَاضِيًٍا بِمَا فِيْهِ فَاِنَّهُمْ مِنْ رُفَقَائِيْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ-
কিন্তু শাব্দিকভাবে ‘‘صوف’’ শব্দমূলের সাথে صُفْفَة শব্দের মিল এত ঘনিষ্ট নয়। যারা মিল খুঁজেছেন তারা তা কষ্টকল্পিতভাবেই করেছেন। صوف শব্দের অর্থ পশম। পশমী জামার এই আবরণকে নির্ভর করে যারা তাসাওউফ শব্দ আবিস্কারের দাবী করেন তাদেরকে বলব, তাহলে তো একটি ভেঁড়াই বড় সুফি। তার গায়ে কেবল সুফ-ই সুফ- পশম-ই পশম। হ্যাঁ শীতকালে অনেকেই সুফি হয় আর শীত প্রধান দেশে তো সবাই সুফি! তাছাড়া আরবী ব্যাকরণ অনুসারে সুফ্ফার প্রতি সম্পৃক্ত করে শব্দ গঠন করলে হয়- ‘সুফ্ফী’; সুফি হয় না।
গবেষণার ফল স্বরূপ আমরা তাসাওউফ-এর মূল শাব্দিক অর্থ, যা গ্রহণীয়, তা বলতে চাই। দামেশকের প্রখ্যাত আলেম শেখ আরসেলান বলেছেন-
ان التصوف كلمة اشتقت من الصفا-
تصوف শব্দটি صفا অর্থ (পরিশুদ্ধতা বা সাফ করা) থেকে উৎকলিত। এ অর্থটি পবিত্র ক্বোরআনের تزكيه বা পরিশুদ্ধতা-এর সাথে হুবহু মিলে যায়। তাযকিয়া শব্দটি তাসফিয়ার সমার্থক। তাই এ মতের পক্ষেই পণ্ডিতগণ সমর্থন দিয়েছেন। শব্দের পিছে না পড়ে, এই পরিভাষার অন্তরালে যে মর্ম আছে তা আমাদেরকে দেখতে হবে। কারণ, এমন অনেক নাম আছে যা জন্মের বহু পরে রাখা হয়েছে। যেমন আরবী ব্যাকরণ-এর নাম নাহ্ভ ও সারফ বা ‘আরূদ্ব রাখার বহু আগেও এর অস্তিত্ব ছিল। কারণ ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে আসে। ব্যাকরণ ভাষাকে পরিবর্তন করে না বরং ভাষাকে পর্যবেক্ষণ করেই কিন্তু ব্যাকরণ আবিস্কার করা হয়ে থাকে।
আমরা যখন ৭ দিন বয়সে নবজাতকের জন্য আকীকা করি, নাম রাখি তখন কেউ তো বলে না যে, বিগত ৭ দিন এই শিশুর অস্তিত্ব ছিল না। তেমনি ‘তাসওউফ’ নামটি পরে রাখা হলেও ‘তাযকিয়া’ এর আগে থেকে শুরু হয়। তবে আহলে সুফ্ফাহ্ থেকে সুফি বা ‘তাসাওউফ’ নামটি শুরু হলে তো আর বলার কিছুই নেই।
ঈমানকে আমরা এখন আকীদা বলি, ইসলামকে শরীয়ত বলি আর ইহসানকে বলি তাসাওউফ। এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই দ্বীন ইসলাম গঠিত। এ বিষয়টি উম্মতকে শেখানোর জন্যই জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম, মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে কার্যত দেখিয়েছেন। তিনি তাকে তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলে জিব্রাঈল প্রতিবারই বলেছিলেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। উপস্থিত সাহাবীগণ বিস্ময় প্রকাশ করলেন। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘‘এ তো তোমাদের ভাই জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম, তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।’’ [বুখারী: হাদীসে জিব্রাঈল] এ তিনটি প্রশ্নোত্তরের মধ্যে গোটা ইসলাম ধর্ম ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আহলে সুফ্ফাহ্ তো ঈমান গ্রহণ করেছেন স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে, তারা ইসলাম অনুশীলন করেছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লা বলেছিলেন: সালাত কর, যেভাবে আমাকে সালাত করতে দেখ। তারা এমনভাবে ইবাদত করতেন যেন আল্লাহকে দেখছেন। সেজন্যই এই সুফিরা না খেয়ে থাকতেন, আবার জিহাদ করতেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্ণর হয়েছিলেন, যেমন আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। আহলে সুফ্ফাহ্-এর আদর্শ তাই না খেয়ে থাকা বা তালি দেওয়া জামা পরা নয়। তাদের আদর্শ ছিল মহান আল্লাহর সান্নিধ্য ও নবীজির ভালোবাসা লাভের জন্য গভীর সাধনায় নিমগ্ন থাকা। কেবল ময়লাযুক্ত জামা পরে নিছক চোখ বন্ধ করে বসে থাকা কখনও তাসাওউফ হতে পারে না।
আহলে সুফ্ফার ওই জায়গাটা এখনও সমতল থেকে একটু উঁচু স্থান হিসেবে বিদ্যমান। যিয়ারতকারীগণ ওখানে নামায-তিলাওয়াত করে বরকত লাভ করেন। এখন তাসাওউফ পন্থি আছে, কিন্তু জীবনে কি একবারও জিহাদ করেছে? সর্বোচ্ছ জিহাদ হচ্ছে প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করা। আমরা কি সুদের সাথে যুদ্ধ করেছি? আমরা কি কোন যৌতুক বন্ধ করেছি? আমরা কি ঘুষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি। আমরা কি অন্যায় আবদারকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা কি নিজের সন্তানকে নামাযি বানাবার চেষ্টা করেছি? আমরা কি কোন অপরিচিত মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছি? আমরা কি নিষ্ঠার সাথে কোন রোগীকে সহানুভূতি জানিয়েছি? আমরা কি বিপদে পড়ে আল্লাহকে স্মরণ করেছি! আমরা কি স্ত্রীর ভাল ব্যবহারের জন্য তাকে ধন্যবাদ বা স্বীকৃতি দিয়েছি? তার খারাপ ব্যবহারে ধৈর্য ধরে তাকে বুঝাতে চেষ্টা করেছি? আমরা কি সমাজের অভাবী মানুষকে ভাল পরামর্শ দিয়েছি? আমরা কি নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও পরের উপকার করেছি?
কুপ্রবৃত্তি সব সময় ভাল কাজে বাধা দিয়েছে, অলক্ষে শয়তান ওয়াস্ওয়াসাহ্ দিয়েছে। আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করে সত্য সুন্দর ও মঙ্গলের পথে যাত্রা অব্যাহত রেখেছি? অথচ আহলে সুফ্ফাহ্ নতুন বিশ্বসভ্যতার সূচনাকারী মহান রাসূলুল্লাহকে অনুকরণ করে জীবন পথে এগিয়ে গেছেন তাদের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি হাজার হাজার হাদীস। আসহাবে সুফ্ফার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনাকারী। কত বড় কাজ করে গেছেন তাঁরা! সব সময় বান্দার কলবের অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও মসজিদে ভাল কাপড়-চোপড় পরে আসার জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন-خُذُوْا زِيْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ-
তোমরা প্রতিটি সাজদার সময় তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর। এর অর্থ এভাবে করা যায়: তোমরা প্রত্যেক মসজিদে সুন্দর পোশাক পর। প্রথম তরজমাটি বেশি মূলানুগ। কারণ মসজিদ ছাড়াও যেখানেই নামায পড়ি না কেন সুন্দরপরিপাটিভাবে নিজেকে সাজিয়ে আল্লাহর সামনে দাড়ানো উচিত।
যা হোক, মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তখন সবাইকে এমন ভাল কাপড়-চোপড় পরতে বলেননি, যা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু তিনি বলেছেন, ফরয সালাত শেষে তোমরা স্থান বদল করে সুন্নাত পড়বে। যাতে গুমটভাব না থাকে। আতর-খুশবু মেখে না আসতে পারলে যেন সুগন্ধি তেল মেখে আসে। দাঁত মাজার (মিসওয়াক) তাগিদ দিয়েছেন। কুলি করা, নাকে পানি দেওয়াও পরিচ্ছন্নতার জন্যই তিনি বলেছেন। কাঁচা পেয়াজ খেয়ে আমার মসজিদে আসবে না। তিনি বলেছেন- أَئْرِمُوْا شَعْرَكُمْ তোমাদের চুল দাড়ির যতœ নেবে। এভাবে তার উদ্দেশ্য ছিল বাহ্যিক সৌন্দর্যও যেন বজায় থাকে। তাঁর এই চেতনা বুঝতে না পেরে অনেকেই পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে আসে না বটে, কিন্তু মোজার গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। আরেক জনের মুখের ওপর সজোরে হাঁিচ দেয়। ঘর্মাক্ত মলিন কয়েক দিনের ব্যবহৃত জামা নিয়ে মসজিদে আসে। আর বলে, এটি নামাযের জামা।
বস্তুত পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরলে মানুষের মনের মধ্যে একটি পবিত্রতার ভাব আসে, যা সামাজিক সমাবেশে বা মসজিদে নামাযের জামাতে অংশগ্রহণের জন্য খুবই উপযোগী। আসহাবে সুফ্ফাহ্ যেহেতু মসজিদের ভেতরেই থাকতেন তাই তারা সাধ্যমত সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকতে সচেষ্ট ছিলেন। তাদের মধ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সকল শিক্ষার প্রতিফলন ছিল। যা হোক, বান্দা তো কালবের অবস্থার ওপর পুরস্কার কিংবা তিরস্কার পাবেন। মহান আল্লাহ্ বলেন-
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُوْنٌ اِلَّا مَنْ اَتَى اللهَ بَقَلْبِ سَلِيْمٍ-
তরজমা: ‘‘সেই (কেয়ামতের ভয়াবহ্) দিনে সম্পদ অথবা সন্তান কোন উপকারে আসবে না, তবে সেই (পরিত্রাণ পাবে) যে আল্লাহর কাছে নির্ভেজাল অন্তর (ক্বলব) নিয়ে উপস্থিত হবে।’’
ক্বলবকে ‘সালীম’ বা সহি-সালামতে রাখতে হলে অবশিষ্ট ৬টি অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। আবার ক্বলব যদি সালীম থাকে তাহলে ওই অঙ্গগুলোও নিয়ন্ত্রিত থাকে। মূল নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র হচ্ছে ক্বলব। চোখ, কান, হাত, পা, পেট ও গোপনাঙ্গ এই সব অঙ্গ আমাদেরকে অনেক সময় গোনাহে লিপ্ত করতে চায় তখন ক্বল্ব তাতে বাধা দেয়। কিন্তু নাফ্স বা কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানের প্ররোচনায় যখন কোন গোনাহ্ হয়ে যায় এতে ক্বলবের ডিসপ্লে বোর্ডে একটি কালো দাগ পড়ে। এভাবে দাগ বা কালো ফোঁটা পড়তে পড়তে ক্বল্ব তার কার্যকারিতা প্রায় হারিয়ে ফেলে। এটাকে বলা হয় ক্বল্ব মরে গেছে। এ সময় বান্দা কেবল গোনাহ্ করতেই মজা পায়। কেউ তাকে নসিহত করতে আসলে তাকে অসহনীয় মনে হয়। তবে যদি নসিহতের শক্তি বেশি হয় তাহলে দিলে আবার হেদায়াতের নূর পয়দা হয়। কাপড়ের দাগ গভীর হলে যেমনি বেশি শক্তিশালী ডিটারজেন্ট পাউডার বা ব্লিচিং পাউডার যোগ করা হয়। দিল পরিস্কারের জন্যে আল্লাহর যিক্র হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর। এই ব্যবস্থা পত্র আমাদের নবীজি দিয়ে গেছেন।
তাসাওউফের প্রধান কাজ তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি। লোভ, কাম, ক্রোধ ইত্যাদি রিপু আমাদেরকে প্রতিনিয়ত ভুল পথে নিয়ে যেতে চায়। এ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মুখে নসিহত করেছেন আবার ব্যবহারিকভাবেও চর্চা করিয়েছেন। তিনি বলেছেন- اَلْحَرِيْصُ مَحْرُوْمٌ লোভীরা বঞ্চিত হয়।
مَنْ يَضْمَنُ لِىْ مَا بَيْنَ شَفَتَيْهِ وَمَابَيْنَ فَخِذَيْهِ اَضْمَنُ لَهُ الْجَنَّةَ-
‘‘যে আমাকে তার দু’ঠোঁটের মাঝখানের বস্তু এবং দুই উরুর মাঝখানের বস্তুর গ্যারান্টি দেবে আমি তাকে বেহেশতের গ্যারান্টি দেব।’’ তিনি বলেছেন-
اَلْغَضُبَ يَاْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ-
অর্থাৎ ‘‘ক্রোধ সুন্দর কর্মগুলোকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যেমনি আগুন লাকড়িকে পুড়িয়ে দেয়।’’ লোভ, কাম, ক্রোধ সম্পর্কে কেবল এই মূল্যবান বাক্য বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি। তার কাছের লোকদের তিনি তা হাতে কলমেও শিক্ষা দিয়েছেন। যারা অল্প একটু সময়ের জন্য হলেও তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন জীবনের মোড় ঘুরে গেছে তাদের। তবে আসহাবে সুফ্ফাহ্ এই সুহবত পেয়েছিলেন অনেক বেশি। আর তাই ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সুহবত (সৎসঙ্গ) এতই প্রয়োজনীয় যে, মহান আল্লাহ্ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন-
يَااَيُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ وَكُوْنُوْ مَعَ الصَّادِقِيْنَ-
অর্থাৎ ‘‘ওহে যারা ঈমান এনেছ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যনিষ্ঠদের সাথে থাকো।’’
সত্যনিষ্ঠ- যারা বিশ্বাসকে বাস্তবরূপ দিয়েছে- তাদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থেকে ঈমান ও তাক্বওয়া পরিপূর্ণতা অর্জন কর। একটি মডেল সামনে রেখে চল। একজন মুর্শিদ তোমাকে প্রতিনিয়ত সঠিক কাজটি করার পরামর্শ দেবেন। এমনি একটি ঘটনা আমরা দেখি মসজিদে নবভীতে। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে একজন মুসল্লি সবেমাত্র অযু করে নামায পড়লো। তিনি বললেন- اِرْجِعْ فَصَلِّ فَاِنَّكَ لَمْ يُصَلِّ -‘‘ফিরে গিয়ে নামায পড়, কারণ তুমি নামায পড়নি।’’ এভাবে তৃতীয়বার বললেন। এবার কারণটা খোলাসা করে দিলেন। সাহাবী বললেন, তুমি অযু করার সময় পায়ের গোড়ালি ভিজেনি। তোমার অযুই হয়নি নামায কিভাবে হবে? এটি ছিল ট্রেনিং। তার জন্য এবং যারা সেখানে ছিলেন সবার জন্য। কারণ শুষ্ক আবহাওয়ার আরব দেশে পা ভাল করে ধোয়া মনযোগ সাপেক্ষ ব্যাপার। এই ভুল প্রায় হতে পারতো। তাই এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন।
আরেকবার এক সাহাবী মসজিদে নবভীতে দৌঁড়ে এসে কোন রকমে রুকুতে গিয়ে ইমামের সাথে নামাযে যোগ দিয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, زَادَ اللهُ حِرْصًا فَلَا تَعُدْ অর্থাৎ আল্লাহ্ তোমার আগ্রহ বাড়িয়ে দিন, তবে এভাবে আর করনা। অথবা বলেছেন- এভাবে হাঁপিয়ে দৌঁড়ে এসো না স্বাভাবিকভাবে আসবে। [فَلَا تَعُدْ বা فَلَاتَعَدُوْ (এভাবে দৌঁড়িও না) দু’ভাবে পড়া যায়।] এখানেও সাহচর্যের বরকতে এভাবে প্রতিটি হরকত, প্রতিটি পরতে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তারা মহাভাগ্যবান যাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে শুধরে দিয়েছেন। তবে কেউ বিব্রতবোধ করতে পারেন এ ভেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময়ে ব্যক্তি বিশেষের নাম উল্লেখ না করে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে বলতেন- ‘‘তোমাদের কী হয়েছে, তোমাদের মধ্যে অমুক কাজটি হতে দেখা যায়, এটি ঠিক নয়। এভাবে ব্যাপক ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে সম্বোধন করে বলতেন।
মানুষকে বিব্রত করা তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন- কারো বাড়িতে দাওয়াতে গিয়ে খাওয়ার পাতে বসে জিজ্ঞেস করবে না- এটা হালাল না হারাম। কারণ মুসলমানদের প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করা ঈমানের আবেদন। হারাম জানা থাকলে অবশ্যই ওই হারাম খাদ্য, বস্ত্র, টাকা-পয়সা গ্রহণ করা হারাম। কিন্তু বেশি পরহেযগারী দেখানো অবাঞ্ছনীয়।
এই যে আচরণ বিধি, তা মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশ্ববিদ্যালয়- ওই মসজিদে নবভীতেই শেখার সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল। আসহাবে সুফ্ফাহ্ তাই ধন্য মানবগোষ্ঠী যারা নতুন বিশ্বসভ্যতার প্রতিষ্ঠাতার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন। এজন্য আমরা দেখতে পাই, একজন গ্রাম্য চাষাভুক্ষ লোকও যখন একজন পীরের দরবারে কিছুদিন থাকেন তার সিরাত-সুরাত, ভদ্রতা-শিষ্টাচার, জীবন দর্শন কীভাবে পরিবর্তিত হয় যায়। পীর বলতে আমরা তাসাওউফের শিক্ষক বুঝে থাকি। একজন ফিজিক্যাল ফিটনেসের শিক্ষক যেমন প্রথমে নিজে ফিট থাকে, তারপর অন্যকে শরীর ভাল রাখার তালিম দেন। তেমনি একজন পীর বা মুর্শিদ প্রথমে নিজে পূর্ণ-পরিণত (কামেল) হবেন তারপর অন্যকে ‘পূর্ণ-পরিণত করতে সচেষ্ট’ (মুকাম্মেল) হবেন।
একজন কামেল পীর তার খানকায় রেখে কিছু লোককে একেবারে সোনার মানুষ বানিয়ে তারপর খেলাফত দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। এটি কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষ শিষ্য এই আসহাবে সুফ্ফার অনুসরণেই করে থাকেন।
তাফওউফ বলতেই যুহদ বা অল্পে তুষ্ট থেকে কঠোর সাধনা বোঝায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ধনী সাহাবীগণও এই যুহদ অবলম্বন করতেন। আসহাবে সুফ্ফাহ্ যেন এই যুহ্দকে তাদের দেহের ভূষণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী আলোচকগণ এই আসহাবে সুফ্ফাহ্-এর আলোচনা বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই বিশেষ দিকটি তাই মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আলোচনার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে আসে। আজকের ভোগের দুনিয়ায় ত্যাগের ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদেরকে সত্যনিষ্ঠার আদর্শে প্রণোদনা দেবে এবং অতি লোভের ফাঁদে পড়া থেকে রক্ষা করবে, আশা করা যায়। জীবনের মহান লক্ষ্য অর্জনে যে নির্মোহ সাধনার প্রয়োজন তা আমরা পাব সে যুগের আহলে সুফ্ফাহ্ আর এ যুগের হক্কানী তাসাওউফ চর্চাকারীদের জীবন-দর্শনে, তাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা ও দীক্ষায় উজ্জীবিত উম্মাহ চেতনায় জীবন পথে এগিয়ে যাবার তাওফীক দিন। আ-মী-ন।
وَصَلَّ اللهُ عَلَىِّ النَّبِيُّ الْكِرٍيْمِ وَاَلِهِ وَاَصْحَابِهِ اَجْمَعِيْنَ-
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক কর্মকর্তা।