যুগবরেণ্য মুহাদ্দিস শেরে মিল্লাত মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী

যুগবরেণ্য মুহাদ্দিস শেরে মিল্লাত মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী

যুগবরেণ্য মুহাদ্দিস শেরে মিল্লাত মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী

যুগবরেণ্য মুহাদ্দিস শেরে মিল্লাত মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী
রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি
মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ সোলাইমান আনসারী
হাদীস (حديث) শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। নবী করীম রউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র নূরানী মুখনিঃসৃত বাণী, তার কাজ, কর্ম ও মৌন সম্মতিকে অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কেরামের কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে এবং তাবি’ঈনে ইযাম রহমাতুল্লাহি আলায়হিমার কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে হাদীস বলা হয় ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়।
মূলত حديث শব্দটি আল-কুরআনের বাণী وَاِمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ (আর আপনার রবের নে’মাতের কথা খুব প্রচার করুন, ৯৩:১১) থেকে নির্গত। হাদীস শব্দটি ক্বাদীম বা পুরাতনের বিপরীত অথবা হাদীস অর্থ নশ্বর, ক্বাদীম অর্থ অবিনশ্বর। আর মুহাদ্দিস বলতে আমরা বুঝি।
المحدث هو من يشتغل بعلم الحديث رواية ودراية ـويطلع على كثير من الروايات واحوال رواتها ومن ابرزهم البخارى ومسلم وابوداؤد والترمذى وابن ماجه وغير من ذلك
অর্থাৎ তিনি ইলমে হাদীস বিশেষত: হাদীস বর্ণনা, হাদীসের সুক্ষ্মাতি-সুক্ষ্ম বিষয় নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন। তিনি বেশি পরিমাণ হাদীস সম্পর্কে, হাদীসের বর্ণনাকারী সম্পর্কে অবগত থাকেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম ইবনে মাজাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি অধিক প্রসিদ্ধ।’ اَلْمُحَدِّثُ এখানে (د) বর্ণের উপর যের দিলে হাদীস বিশারদ, হাদীসবেত্তা, হাদীস গবেষক ইত্যাদি অর্থ হয়ে থাকে। আর যদি (د) বর্ণের উপর যবর দিয়ে পড়া হয় اَلْحُحَدَّثْ তখন হবে, ইলহাম অর্থাৎ সাহিবে কাশফ। মুহাদ্দিসকে আবার শায়খুল হাদীস (شيخ الحديث)ও বলা হয়। মূলত: شيخ শব্দটি একবচন, বহুবচনে شيوخ বলা হয়। এর অর্থ বয়োবৃদ্ধ, ভদ্রলোক, সম্মানিত ব্যক্তি উস্তাদ ও অধ্যাপক ইত্যাদি। ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন,” বয়স্ক লোক, প্রধান ব্যক্তি শেখ, সিনেট-সদস্য সিনেটর প্রভৃতি ।
Hans Wehr বলেন, Title of the ruler of any one of sheikh do me along the persian gulf, professor of spiritual Institutions of higher learning Title of the Grand Mufti, The spiritual head of Islam.
মুফতি আমীমুল ইহসান রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ইলমে হাদীসের পরিভাষায়, শায়খ ওই হাদীস বিশারদকে বলা হয়, যিনি পূর্ণজ্ঞান সম্পন্ন, অধিকাংশ সময় হাদীস শিক্ষা গ্রহণে, হাদীস গ্রন্থাবলী অধ্যয়নে এবং হাদীস শিক্ষাদানে নিমগ্ন থাকেন, নিজের উস্তাদগণের নিকট থেকে হাদীস শিক্ষাদানের অনুমতিপ্রাপ্ত, হাদীসের নিগূড় অর্থ সম্পর্কে যাঁর অগাধ পান্ডিত্য রয়েছে। এরূপ হাদীস বিশেষজ্ঞকে মুহাদ্দিস বা ইমাম ও বলা হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ তা’আলার বড় ইহসান হল নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীস তথা কথা বাণীসমূহ অবিকল আমাদের পর্যন্ত পৌছা, বিশেষ করে নির্ভরযোগ্য সিক্বা রাবীর মাধ্যমে বিশুদ্ধ মুত্তাসিল-সংযুক্ত সনদ তথা বর্ণনাকারী পরম্পরায় হাদীসে নববী আমরা পেয়েছি। আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি কুতুবুল আউলিয়া, গাউছে যামান সৈয়দ আহমদ সিরিকোট রহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রতি যিনি এশিয়াখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা করে নুরাণী নবীর ইলমের নূরের মশাল প্রজ্জ্বলিত করেছেন। সে নূরের আলোয় নিজের অস্তিত্বকে বিলিন করে ফানা ফীশ শায়খ স্তরে উপনীত হয়ে অমর হয়ে রয়েছেন, আমাদের শ্রদ্ধেয় শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর. খোদাভীতি, নবীপ্রেম, হুব্বে রাসূল, হাদীসে রাসূলের প্রতি আন্তরিক মুহাববত, খুলুসিয়াত, জামেয়া, আনজুমান, সিলসিলা, গাউছিয়া কমিটি, মসলকে আলা হযরত, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আকীদার উপর এস্তেকামাত, মুক্তিযুদ্ধে জনমত গঠনে তাঁর ভূমিকা আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছে। খানেকায়, মসজিদে, মাঠে-ময়দানে, সুন্নী সংগঠন প্রতিষ্ঠায় দ্বীন ও মাযহাবের কল্যাণ সাধনায় তার তাকরিরাত, ওয়ায-নসীহতে এক অনন্য ভূমিকা রাখলেও তিনি যে কারণে স্বমহিমায় ভাস্বর তাহল ইলমে হাদীস প্রচার-প্রসারে তার কালজয়ী কীর্তিমান অবদান। তিনি ১৯৬৬ খৃ. সাল থেকে ছাত্রদেরকে ইলমে দ্বীন তথা কুরআন, হাদীস, আকাইদ, ফিকহ, ফাতওয়া শিক্ষা দিয়েছেন আন্তরিকতার সাথে। বিশেষ করে ১৯৬৮ খৃ. সালে এশিয়াখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ায় যোগদান করে এক অনবদ্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এ জামেয়াতে তিনি ৫২ বছর ব্যাপী ছাত্রদের ইলমে দ্বীন শিক্ষা দিয়েছেন। বিশেষ করে ইলমে হাদীস বিষয়ে তাঁর পান্তিত্য ও দক্ষতা দেখার মত। তাঁর বিশুদ্ধ সনদে হাদীসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পঠন-পাঠনে তাঁর চমৎকার বর্ণনাশৈলী ছাত্রদেরকে বিমোহিত করেছে। প্রথমতঃ তালেবে হাদীস তার সামনে হাদীসের ইবারত পাঠ করতেন। তিনি সেগুলোর তরজমা, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, দ্বন্দযুক্ত হাদীসের চমৎকারভাবে সমাধান দিতেন, হাদীসের সনদের বর্ণনা দিতেন, রাবী বা বিভিন্ন পরিভাষা বলতেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পক্ষে যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করতেন, বিরুদ্ধবাদীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন। মিশকাত শরীফ, নাসাঈ শরীফ, বুখারী শরীফ, ও তাহাভী শরীফ তাঁর পাঠ্য ছিল। একজন যোগ্য শায়খুল হাদীসের যত গুণাবলী থাকার দরকার সবগুলোই তাঁর মধ্যে ছিল। তিনি একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন। আমার বড় সৌভাগ্য হল ১৯৮২ খৃ. সাল থেকে তাঁর সাথে এ জামেয়াতে খেদমত করার সুযোগ লাভ করা। তাঁর কথাবার্তা, চলা-ফেরা, উঠা-বসা, আদব-লেহায, বিনয়-ন¤্রতা, সহপাঠিদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভক্ত-অনুরক্তদের প্রতি মায়া মাখা কথা সবই তাঁকে করেছে অসাধারণ। তিনি আমাদের অভিভাবকতুল্য ছিলেন। তাঁকে হারিয়ে আমরা মুরব্বি হারা হয়ে গেলাম। এখানে একথা বলা সঠিক হবে যে, জামেয়াকে পেয়ে শেরে মিল্লাত যেমন ধন্য হয়েছেন ঠিক তেমনি নঈমী সাহেবকে পেয়ে জামেয়াও ধন্য হয়েছে। তিনি ২০০৮ খৃ. সালে সরকারীভাবে অবসর নিলেও হুযুর কেবলা (মু.জি.আ.) ও আন্জুমান কর্তৃপক্ষ তাঁকে অবসর দিতে সম্মত হননি। বরং তাঁকে আজীবন জামেয়াতে শায়খুল হাদীস পদে সমাসীন করে দিয়েছেন। তিনিও আন্তরিকতার সাথে সে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইলমে হাদীসের দরস, সকাল ৮ ঘটিকায় তাখাস্সুস ঘন্টা, ক্লাস টাইমে সিডিউল ক্লাস, আবার মাগরিবের পর আলমগীর খানেকা শরীফে বুখারী শরীফের দরস দিতেন রাত ১০/১১টা পর্যস্ত। তার মাঝে আমরা ক্লান্তি বা অলসতা কখনো দেখিনি । মূলত : তাঁর বড় একটা যোগ্যতা হল সারা রাত জেগে মাহফিল করা, কিতাব দেখা আবার দিনভর ক্লাস করা, বড় আশ্চর্যের বিষয় বটে। মাশায়েখে কেরামের এটা নেগাহে করম।
আমি তাঁর সাথে ১৯৮২ খৃ. সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ বছর যাবৎ এক সাথেই ছিলাম। বোখারী শরীফের খতমে আমি অনেক সময় ফজিলত বর্ণনা করতাম। তিনি মুনাজাত করতেন। ত্রা মধ্যে যে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটেছে তা একজন আলেমে দ্বীন, মুহাক্কিক, মুদাক্কিক, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির, মুফতি, ফকীহ, মুনাযির ও মুত্তাকী হিসেবে বিবেচিত। তাঁর ইন্তেকালে আমাদেরকে শোকাহত করেছে বটে তবে তাঁর যোগ্য ছাত্রদের পদচারণায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মাদরাসা, কলেজ, ইউনির্ভাসিটি, জজকোর্ট, হাইকোর্টসহ প্রতি সেক্টরে মুখরিত তিনি যে মশাল প্রজ্জ্বলিত করে গেছেন তাঁর আলোয় উদ্ভাসিত ধরণীতল।
পরিশেষে বলতে পারি শেরে মিল্লাত শায়খুল হাদীস মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন একজন আলোকিত সাদা মনের মানুষ। তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য আমাদেরকে বিমোহিত করেছে, তার খোদাভীতি, ত্যাগ তিতিক্ষা একনিষ্ট খুলুছিয়াত, ভাবগাম্ভীর্যতা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর ইশকে রাসূল নবী প্রেম ও একাগ্রতা আমাদেরকে বিমুগ্ধ করেছে। তিনিই আমাদের যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসে আযম শাইখুল হাদিস মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী রহমাতুল্লাহি আলায়হি। তাঁর প্রথম ওফাতবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এবং রফদে দারাজাত কামনা করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসে আ’লা মকাম নসীব করুন। আমিন। বেহুরমতে সাইয়্যিদিল মুরসালিন ওয়া আলিহি ওয়া আসহাবিহী আজমাঈন।
লেখক: শায়খুল হাদীস, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম।