ভারতবর্ষের রাজাধিরাজ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি

ভারতবর্ষের রাজাধিরাজ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি

ভারতবর্ষের রাজাধিরাজ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি

আবু নাছের মুহাম্মদ তৈয়ব আলী

ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারে আউলিয়া-কেরাম, সুফী দরবেশগণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা ধর্ম প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে বহু কষ্ট শিকার করেছেন। তাঁদের সহজ সরল চালচলন, সুমধুর ব্যবহার, অনাড়ম্বর জীবনযাপন এখানকার সাধারণ নির্যাতিত নিপীড়িত জনগণকে আকৃষ্ট করে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার এক বিশাল জনগোষ্ঠী সুফি সাধকদের পবিত্র সান্নিধ্যে এসে মুক্তির দিশা খুঁজে পায়।
আউলিয়াই কেরামগণ ইসলামের মর্মবাণী সাধারণ মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। সুফি সাধকগণের প্রভাব সমাজ জীবনে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষের মনে তাঁদের অলৌকিক বাণী মর্মে মর্মে গ্রথিত হয়। তাঁরা আল্লাহ্ প্রদত্ত বেলায়তি শক্তির মাধ্যমে নিপীড়িতকে নিরাময়, শোকাতুরকে সান্ত¦না এবং সামাজিক চাহিদা পূরণ করে অসংখ্য মানুষকে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করেন। এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারক আউলিয়া কেরামদের মধ্যে হযরত খাজা মুঈন উদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলায়হির অবদান সবচেয়ে বেশি।
গরীব নাওয়াজ, সুলতানুল হিন্দ, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.) পাক ভারত উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানদের হৃদয়ে গ্রথিত একটি শ্রদ্ধেয় নাম। ইসলামের এ উপমহাদেশে ইসলামের আলো বিকিরণে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। এ মহান আধ্যাত্মিক সাধক কোন রকম জোর-জবরদস্তি কিংবা তলোয়ারের জোরে নয় বরং আল্লাহ্-রসূলের মহব্বত, কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ, মানুষের প্রতি ভালবাসা, মানবসেবার মাধ্যমে গণ মানুষের হৃদয় জয় করে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন আজও তিনি হিন্দু-মুসলিম ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অন্তরে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। হিন্দুস্তানের আপামর জনসাধারণের নিকট গরীব নাওয়াজ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলায়হি সুলতানুল হিন্দ বা সমগ্র ভারতবর্ষের রাজাধিরাজ সুলতান হিসেবে সমাদৃত।
এ মহান সাধকের বহুমুখী সংস্কার কর্মের ইতিহাস বিস্ময়কর। হযরত খাজা গরীব নাওয়াজের বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতি আলোকপাত করতে গিয়ে ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ গ্রন্থের লেখক মীর খোর্দ সে যুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতবর্ষের চিত্র তুলে ধরে বলেন, সে সময় কুফর ও কুসংস্কারের রাজত্ব ছিল। মানুষ, গাছপালা, পাথর ও পশু ইত্যাদির প্রতি প্রণতি জানাতো। সবই ছিল আল্লাহর একত্ববাদ ও দ্বীনি বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ ও বেখবর। তিনি আরও বলেন, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রকৃতপক্ষেই দ্বীনের ‘মুঈন’ অর্থাৎ সাহায্যকারী। তাঁর পবিত্র কদম এ দেশের মাটিতে পড়া মাত্রই এদেশের অন্ধকাররাশি দূরিভূত হলো এবং ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে গেল। তারপর মীর খোর্দ একটি কবিতা উদ্ধৃত করেন, ‘‘যেখানে ছিল গির্জা ও মন্দিরের ছড়াছড়ি, সেখানে আজ দৃষ্টি গোচর হতে লাগলো মসজিদ, মিহরাব ও মিম্বর। এসব হচ্ছে হযরত খাজা গরীব নাওয়াজের বরকত ও সাধনার ফসল। ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ নামক গ্রন্থে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উল্লেখ রয়েছে, এ দেশে যাঁরা মুসলমান হয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত যাঁরা মুসলমান হবেন আর কিয়ামত পর্যন্ত দাওয়াতের মাধ্যমে যাঁদের মুসলমান করা হবে তাঁদের সবার সওয়াব হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন হাসান চিশতির আমলনামায় পৌছবে। কারণ এসব তাঁরই সাধনা ও সংগ্রামের ফল।’
মীর খোর্দ বলেন, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর পবিত্র কদম এ দেশের মাটিতে পড়াতে এ দেশের অন্ধকাররাশী দূর হলো এবং ইসলামের নূরে এদেশ আলোকিত হলো’ গরীব নাওয়াজের সংস্পর্শে অগণিত লোক দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলো।
হযরত খাজা গরীব নাওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলায়হির এ সাফল্যের মূলে রয়েছে প্রথমত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত নূরানী নির্দেশের ফল। হুজুর পাক তাঁকে গায়েবী নির্দেশ দিয়ে হিন্দুস্তানে ইসলাম প্রচারের নির্দেশনা দেন। দ্বিতীয়ত তাঁর অসাধারণ সাফল্যের মূলে রয়েছে ঈমান, ইয়াকিন, সাধনা ও আমল। কুরআন-হাদীসের সাথে গভীর সম্পর্ক। তেজোদীপ্ত রূহানী শক্তি, আল্লাহ্ ও রসূলের প্রতি অসাধারণ ভালবাসা, বিনয়, নিঃস্বার্থ মানবসেবা, মুর্শিদের শিক্ষা, আদর্শ ও তরিকার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রভৃতি গুণ। এ সব গুণাবলী অর্জন করতে তাঁকে বহু সাধনা করতে হয়েছে, ইতিহাস থেকে জানা যায় খাজা গরীব নাওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর পীর মুর্শিদ হযরত খাজা ওসমান হারুনী রহমাতুল্লাহি আলায়হির নিকট মুরিদ হয়ে তাঁর রূহানী ফয়েজ লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি আরো বহু আউলিয়া কেরামের ফয়েজ লাভ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি বাগদাদ, মদীনা শরীফ, মাক্কাতুল মুকাররমা সফর করেন। বিভিন্ন পূণ্যভূমি সফরের পর তিনি নিজ ইচ্ছাই নয় বরং অলৌকিকভাবে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি এ ভারত উপমহাদেশে তশরিফ আনেন।
আতায়ে রসূল হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর জীবৎকালে যেমন জনসাধারণের নিকট অতিপ্রিয় ছিলেন; ওফাতের পরও প্রিয় রয়েছেন। আজমীরের মাজার শরীফে প্রতিনিয়ত লাখো লাখো আশেকানের উপস্থিতি, যিয়ারত, ভালবাসার শ্রদ্ধা নিবেদন-এর বাস্তব প্রমাণ। শুধু আজমীর নয় গোট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃতজ্ঞ মুসলমানেরা আজো তাঁর স্মরণে আলোচনা, মিলাদ- মাহফিল কোরআনখানি আয়োজনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকেন ধনী গরীব, রাজা প্রজা মুসলিম, অমুসলিম কোন ভেদাভেদ দেখা যায় না তাঁর মাজার শরীফে। দেখা যায় না সাম্প্রদায়িকতার কোন চিহ্ণ। তাঁর মাজার শরীফে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন স¤্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব, পন্ডিত নেহেরুসহ আরো অনেক আমির ওমারা। রাজা বাদশাহ্ এবং রাষ্ট্র প্রধান। লর্ড কার্জন হযরত খাজা গরীব নাওয়াজের এ জনপ্রিয়তা দেখে মন্তব্য করেছেন, প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষের উপর একটি মাজারের আধিপত্য বিরাজিত। এ মাযারই ভারতবর্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এবং সে মাযারটি হচ্ছে হযরত গরীব নাওয়াজের মাযার।
[সূত্র. মাসিক তরজুমান জুন ২০২০ সংখ্যা, গরীব নাওয়াজ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) কৃত. শেখ মুহাম্মদ ইব্রাহীম।]

লেখক: সহকারি সম্পাদক, মাসিক তরজুমান, চট্টগ্রাম।