মহান সাহাবী হযরত আমীর মু‘আভিয়া’র বিরুদ্ধে আনীত কতিপয় আপত্তি ও সেগুলোর দাঁতভাঙ্গা জবাব 

মহান সাহাবী হযরত আমীর মু‘আভিয়া’র বিরুদ্ধে আনীত কতিপয় আপত্তি ও সেগুলোর দাঁতভাঙ্গা জবাব 

মহান সাহাবী হযরত আমীর মু‘আভিয়া’র বিরুদ্ধে আনীত কতিপয় আপত্তি ও সেগুলোর দাঁতভাঙ্গা জবাব 

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
محمد صلى الله عليه وسلم كي محبت دين حق كى شرط اول هے
اسى ميں هو ‏اگر خامى تو سب كچھ نا مكمل هے
অর্থ: হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালবাসা সত্য দ্বীনের প্রথম পূর্বশর্ত। এ’তে যদি কোন ত্রুটি থাকে, তবে সবকিছু অসম্পূর্ণ, অগ্রহণীয়।
হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমায়েছেন-
لاَ يُؤْمِنُ اَحَدُكُمْ حَتّى اَكُوْنَ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِنْ وَّالِدِه وَوَلَدِه وَالنَّاسِ اَجْمَعِيْنَ ـ
অর্থ: তোমাদের মধ্যে কেউ মু’মিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তানগণ এবং সব মানুষ থেকে বেশী প্রিয় হই। [বোখারী, মুসলিম ও মিশকাত, পৃ. ১২] বস্তুতঃ হুযূর-ই আক্রামের প্রতি ভালবাসার সাথে সমস্ত সাহাবীর প্রতি ভালবাসা ও অপরিহার্য। কেননা, সমস্ত সাহাবী হুযূর-ই আক্রামের প্রিয়পাত্র। আর মাহবূবের মাহবূব মাহবূবই হয়ে থাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি হুযূর-ই আক্রামের প্রতি ভালবাসার দাবী করে এবং তাঁর সাহাবীদেরকে ভালবাসে না সে ঈমানের দাবীতে মিথ্যুক। হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
اَللهَ اَللهَ فِىْ اَصْحَابِىْ لاَ تَتَّخِذُوْهُمْ غَرْضًا بَعْدِىْ ـ فَمَنْ اَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّىْ اَحَبَّهُمْ وَمَنْ اَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِىْ اَبْغَضَهُمْ وَمَنْ اٰذَاهُمْ فَقَدْ اٰذَانِىْ وَمَنْ اٰذَانِىْ فَقَدْ اٰذَى اللهَ وَمَنْ اٰذَى اللهَ يُوْشِكُ اَنْ يَأْخُذَهٗ ـ رَوَاهُ التِّرْمِذِىُّ
অর্থ: আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় করো! আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় করো! আমার পরে তাঁদেরকে কোনরূপ আপত্তির নিশানা বানিওনা। যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালবেসেছে, সে আমাকে ভালবাসার কারণে তাদেরকে ভালবেসেছে। আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ রেখেছে, সে আমার প্রতি বিদ্বেষ রাখার কারণে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছে। যে ব্যক্তি তাদেরকে কষ্ট দিয়েছে, সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আর যে আমাকে কষ্ট দিয়েছে, সে আল্লাহ রাব্বুল ইয্যাতকে কষ্ট দিয়েছে। বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা‘আলাকে কষ্ট দিয়েছে, তাহলে এ কথা দূরে নয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে নিজের পাকড়াওয়ে নিয়ে নেবেন। [তিরমিযী শরীফ, পৃ. ৫৫৪] এ কথা আজ মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, হযরত আমীরুল মু’মিনীন মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও একজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবী-ই রসূল। রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। সুতরাং যে-ই রসূল-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান এনে তাঁর প্রতি ভালবাসার দাবী করবে, তাকে হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে ভালবাসা এবং তাঁর প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষ কিংবা আপত্তির বাণ নিক্ষেপ না করা একান্ত অপরিহার্য।
এ কথাও দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পিতার দিক দিয়ে পঞ্চম পুরুষ আর মায়ের দিক দিয়ে পঞ্চম পুরুষ হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বংশে তাঁর চতুর্থ দাদা আবদে মান্নাফের সাথে মিলিত হন। এ থেকে একথা প্রকাশ পায় যে, তিনি বংশের দিক দিয়েও হুযূর-ই আক্রামের সাক্ষাৎ শ্যালক। কারণ, উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে হাবীবাহ্ বিনতে আবী সুফিয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা, যিনি হুযূর-ই আক্রামের পবিত্র স্ত্রী, হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সহোদরা (বোন)। এ জন্য আরিফ বিল্লাহ্ মাওলানা রূমী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর মসনভী শরীফে তাঁকে ‘সমস্ত মু’মিনের মামা’ লিখেছেন।
একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, হযরত আমীর মু‘আভিয়া ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়ার ঐতিহাসিক সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিনে তা প্রকাশ করেছেন; যেভাবে হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বদরের যুদ্ধের দিনেই ঈমান এনেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের দিনে তা প্রকাশ করেছিলেন। হযরত আমীর মু‘আভিয়ার ইসলাম গ্রহণ করে শীর্ষস্থানীয় সাহাবীর মর্যাদা লাভ করা অনেক বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ ও ঐতিহাসিক প্রমাণাদি দ্বারা প্রমাণিত। সহীহ্ বোখারী শরীফেও এ প্রসঙ্গে বহু সহীহ্ হাদীস মওজূদ রয়েছে। আর ‘সাহাবী’ হলেন ওই সৌভাগ্যবান মুসলমান যিনি ঈমানের সাথে, মু’মিন অবস্থায় হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন তারপর ঈমানের উপর তিনি শেষ নিঃশেষ ত্যাগ করেছেন। আর সাহাবী হওয়াও এমন উচুঁ মর্যাদা, যেখানে কোন গাউস, ক্বুত্বব ও ওলী পৌঁছতে পারেন না। সাহাবীর ফযীলত প্রসঙ্গে অনেক আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে। ওইগুলোর মধ্যে একটি হলো- وَكُلَّا وَعَدَ اللهُ الْحُسْنى (এবং তাদের প্রত্যেকের সাথে আল্লাহ্ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন)। অন্য আয়াতে এরশাদ করেছে- رَضِىَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْ عَنْهُ (আল্লাহ্ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট)।
অন্য আয়াতে এরশাদ করেন- اَعَدَّ لَهُمْ جَنّتٍ تَجْرِىْ تَحْتِهَا الْاَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا اَبَدًا ط ذلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمِ [তিনি তাদের জন্য এমন সব জান্নাত তৈরী করেছেন, যেগুলোর পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, তারা তাতে চিরদিন (স্থায়ীভাবে) থাকবে। এটাই হচ্ছে বড় সাপল্য]।
সুতরাং এ আয়াতগুলোতে সাহাবা-ই কেরামের মর্যাদা ও আল্লাহর দরবারে তাঁদের শুভ পরিণতি সম্পর্কে সুসংবাদ রয়েছে। হযরত আমীর মু‘আভিয়াও ওইসব সাহাবীর অন্যতম। তাঁর ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে বহু বিশুদ্ধ হাদীসও। তাঁর সুশাসনের পক্ষে ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে। তাই নির্দ্বিধায় তাঁকে সম্মান করা এবং তাঁর বিপক্ষে কোনরূপ বিষোদগার না করাই মু’মিনের পরিচয়।
কিছু হতভাগা লোক আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর এসব ফযীলতকে অস্বীকার করে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটা আপত্তি উত্থাপন করে থাকে। এ নিবন্ধে সেগুলোর খ-ন করার প্রয়াস পাচ্ছি-
প্রথম আপত্তি
আমীর মু‘আভিয়া নাকি হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করেছেন ও করিয়েছেন। তিনি যদি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করতেন, তবে মুসলমানদের এ হত্যাকা- হতোনা। মু’মিনদেরকে হত্যা করার পরিণতি জাহান্নাম বলে ক্বোরআন শরীফের পঞ্চম পারার দশম রুকূ’তে এরশাদ করা হয়েছে।
খণ্ডন
উক্ত আপত্তির প্রথম (ইলযামী) জবাব হচ্ছে- যুদ্ধগুলোতে সংঘটিত হত্যাকা-ের জন্য হযরত আমীর মু‘আভিয়াকে দোষারোপ করা হলে হযরত আয়েশা, হযরত তালহা এবং হযরত যোবায়র রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমকেও দোষারোপ করতে হবে। কারণ, তাঁরা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন (উষ্ট্রের যুদ্ধে)। অথচ হযরত আয়েশার জান্নাতী হওয়া তেমনি সত্য, যেমন জান্নাত থাকা সত্য। কারণ, তাঁর জান্নাতী হওয়া পবিত্র ক্বোরআন দ্বারা প্রমাণিত। হযরত তালহা এবং যোবায়রও জান্নাতী। কারণ, তারা ‘আশ্রায়ে মুবাশ্শারা’র অন্তর্ভুক্ত।
এ আপত্তির দ্বিতীয় (দলীলভিত্তিক) জবাব (খ-ন) হচ্ছে- মু’মিনকে হত্যার তিন অবস্থা-
১. তাঁকে হালাল জেনে হত্যা করা। এটা কুফর। কারণ, মু’মিনকে হত্যা করা অকাট্য হারাম। অকাট্য (ক্বত্ব‘ঈ) হারামকে হালাল জানা কুফর। উপরোক্ত আয়াতে এ প্রকারের হত্যার কথা এরশাদ হয়েছে, কারণ, কাফিরই স্থায়ীভাবে জাহান্নামে যাবে।
২. মু’মিনকে হত্যা করাকে হালাল জানে না, কিন্তু পার্থিব ঝগড়া-বিবাদে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এটা কুফর নয়; বরং ফাসেক্বী ও কবীরাহ্ গুনাহ্। যেমন হালাল না জেনে মদ্যপান করা; ইচ্ছাকৃতভাবে নামায না পড়া ইত্যাদি।
৩. ইজতিহাদের ভুলবশতঃ এক মু’মিনকে অন্য মু’মিন হত্যা করা। এটা কুফরও নয়; ফাসেক্বীও নয়। হযরত আমীর মু‘আভিয়ার এ যুদ্ধও এ তৃতীয় প্রকারে পড়ে। তিনি নিঃসন্দেহে ‘মুজতাহিদ’ ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা তাঁকে মুজতাহিদ বলেছেন। মুজতাহিদ তাঁর ইজতিহাদে ভুল করলে তজ্জন্য কোন পাকড়াও নেই। এটা যেমন হযরত আমীর মু‘আভিয়ার বেলায় প্রযোজ্য। তেমনি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমার বেলায়ও প্রযোজ্য হবে। কারণ, তিনিও হযরত আয়েশা এবং হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন যথাক্রমে উষ্ট্রের যুদ্ধে ও সিফ্ফিনের যুদ্ধে। এ যুদ্ধেও অনেক মুসলমান শহীদ হয়েছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বুঝার সামর্থ্য দান করুন।
দ্বিতীয় আপত্তি
হযরত আমীর মু‘আভিয়ার হৃদয়ে নাকি আহলে বায়তের প্রতি শত্রুতা ছিলো। এ কারণে আহলে বায়তকে নির্যাতন করেছেন। হাদীস শরীফে আছে- যে (হযরত) আলীকে কষ্ট দিয়েছে, সে হুযূর-ই আক্রামকে কষ্ট দিয়েছে। আমীর মু‘আভিয়া নাকি আহলে বায়তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সুতরাং হুযূর-ই আক্রামকে কষ্ট দিয়ে কেউ মু’মিন কিভাবে থাকতে পারে?
খণ্ডন
এ আপত্তির প্রথম (ইলযামী) খ-ন এ যে, হযরত আয়েশা, হযরত তালহা ও হযরত যোবায়য়ের বিপক্ষেও একই আপত্তি আসতে পারে। কারণ, তাঁরাও হযরত আলীর বিপক্ষে যুদ্ধ করেছেন। সুতরাং কোন অবিবেচক বিরুদ্ধবাদীও একথা বলতে পারে যে, হযরত আলীর হৃদয়ে হযরত আয়েশা ও হযরত তালহার প্রতি দুশমনী ছিলো। মা‘আযাল্লাহ্।
মোটকথা, হযরত আমীর মু‘আভিয়ার বিপক্ষে উক্ত আপত্তি উত্থাপন করলে অনেক সাহাবী এবং আহলে বায়তের বিপক্ষেও উক্ত আপত্তি উত্থাপিত হবার ভুল পথটি খুলে যাবে। আল্লাহ্ ওই সব বিরুদ্ধবাদীদের হিদায়ত করুন।
এ আপত্তির দ্বিতীয় (দলীল ভিত্তিক) খ-ন এ যে, আহলে বায়তের বিরোধিতাও তিন প্রকারেরঃ ১. তাঁরা হুযুর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আহ্ল-ই বায়ত বলেই তাঁদের প্রতি শত্রুতা রাখা, বিরোধিতা করা, এটাও কুফর। কারণ, হুযূর-ই আক্রামের সাথে পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ দুশমনী কুফরই।
দ্বিতীয় প্রকার এ যে, তাঁদের প্রতি কোন দুনিয়াবী কারণে নারায হওয়া। যদি তাতে নাফসানিয়াত বা ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকে তবে তা গুনাহ্। অন্যথায় নয়। যেমন- হযরত আলী ও হযরত ফাতিমার মধ্যে পারিবারিক বিষয়াদিতে বহুবার বিরোধ হয়েছিলো। মান-অভিমানও হয়েছিলো, এগুলোর কোনটাই ধর্তব্য নয়।
তৃতীয় প্রকার এ যে, ইজতিহাদী ভুলের ভিত্তিতে আহলে বায়তের সাথে অমিল হওয়া, এটা না কুফর, না গুনাহ্।
হযরত আমীর মু‘আভিয়া ও হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা’র সমস্ত যুদ্ধ এ তৃতীয় প্রকারের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছিলো। বস্তুতঃ তাঁদের সবার বক্ষ পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র ছিলো।
‘মুসনাদে ইমাম আহমদ’-এ বর্ণিত হয় এক ব্যক্তি হযরত আমীর মু‘আভিয়াকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলো। তিনি বললেন, “أِسْأْلْ عَنْها عَلِيًّا فَهُوَ اَعْلَمُ মাসআলাটা হযরত আলী থেকে জেনে নাও, কারণ, তিনি আমার চেয়ে বেশী জ্ঞানী।” লোকটি বললো, “আপনিই সমাধান দিন। আপনার সমাধান আমার নিকট তাঁর সমাধান প্রদান থেকে অধিকতর পছন্দনীয়।” হযরত আমীর মু‘আভিয়া বললেন, “তুমি অতি মন্দ কথা বলেছো। তুমি কি তাঁকে অপছন্দ করছো, যাঁকে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্মান দিতেন?
যাঁর সম্পর্কে হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করেছেন-
اَنْتَ مِنِّىْ بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنْ مُوْسى اِلاَّ اَنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ
অর্থাৎ হে আলী! তুমি আমার জন্য তেমনি, যেমন হযরত মূসার জন্য হযরত হারূন; কিন্তু আমার পর কোন নবী নেই।
তারপর হযরত আমীর মু‘আভিয়া ওই প্রশ্নকারীকে বললেন, “হযরত আলীর মহত্বের অবস্থা এ যে, যখন হযরত ওমর ফারূক্ব-ই আ’যম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সামনে কোন জঠিল বিষয় আসতো তখন তিনি হযরত আলী থেকে সেটার সমাধান নিতেন।” একথা বলার পর তিনি ওই লোককে নিজের মজলিস থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
তৃতীয় আপত্তি
এটাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তা হচ্ছে- হযরত আমীর মু‘আভিয়া নিজের জীবদ্দশায় ইয়াযীদকে খলীফা নিয়োগ করেছিলেন। এ’তে নাকি তিনি তিনটি ভুল করেছিলেন,
১. খলীফা নির্বাচন সাধারণ জনগণের অভিমত নিয়ে করা চাই। তিনি ইয়াযীদকে নিজে কেন খলীফা নিয়োগ করলেন?
২. নিজের পুত্রকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করা ইসলামী বিধানের পরিপন্থী এবং
৩. ইয়াযীদের মতো ফাসিক্ব-পাপাচারীর হাতে শাসনভার ন্যস্ত করা তাঁর সর্বাধিক বড় ভুল ছিলো, কারবালার সমস্ত ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী। কারণ তিনি যদি ইয়াযীদকে খলীফা না বানাতেন, তবে কারবালার এমন বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটতো না। যেখানে ইয়াযীদের মতো ফাসিক্বকে নামাযের ইমাম বানানো জায়েয ছিলো না, সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের একচ্ছত্র খলীফা বানানো কিভাবে বৈধ হতে পারে?
খণ্ডন
নিজের জীবদ্দশায় কাউকে খলীফা বানানো জায়েয। কারণ, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব আপন জীবদ্দশায় হযরত ওমরকে (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা) খলীফা নিয়োগ করেছিলেন। বাকী রইলো নিজের পুত্রকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করা। এটাতো ক্বোরআন ও হাদীসে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি। এ কারণে আজকাল আমভাবে ত্বরীক্বতের শায়খগণ নিজ নিজ পুত্রকে খলীফা বা জা-নশীন (স্থলাভিষিক্ত) করে আসছেন। সুতরাং যারা নিজের জীবদ্দশায় খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ করার উপর আপত্তি উত্থাপন করে, তারা ক্বোরআন ও হাদীস শরীফের অনুমতির কি জবাব দেবেন? আর যদি বলা হয় ইসলামের প্রথম খলীফাগণ তা করেননি, তবে বলা হবে, এটা তাঁরা না-জায়েয বলে করেন নি তা নয়; বরং অন্য কারণে করেননি। এটাকে দলীল হিসেবে দাঁড় করালে ইসলামের বহু বিষয় সম্পর্কে আপত্তি অপরিহার্য হয়ে যাবে। যেমন- তাঁরা তো ক্বোরআন মজীদের ইবারতগুলোতে ই’রাব (যের, যবর, পেশ) লাগাননি, হাদীস শরীফগুলোকে কিতাবাকারে সংকলন করেননি, ফিক্বহ্ শাস্ত্রকে একটি বিশেষ শাস্ত্র হিসেবে বিন্যস্থ করেননি ইত্যাদি। তখনতো এসব বিষয়ও না-জায়েয হয়ে যাবে। সুতরাং আপত্তিকারীরা এর কি জবাব দেবেন?
বাকী রইলো ইয়াযীদের পাপাচারিতা। এর জবাব হলো- একথা তো কোথাও প্রমাণিত নয় যে, হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর জীবদ্দশায় ইয়াযীদকে ফাসিক্ব বা পাপাচারী বলে জানা সত্ত্বেও তাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। ইয়াযীদের ফাসেক্বী বাস্তবিকপক্ষে হযরত আমীর মু‘আভিয়ার ওফাতের পরেই সংঘটিত হয়েছিলো, কাউকে তার ফাসেক্বী প্রকাশ পাবার পূর্বেই ফাসিক্ব হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়; এর পূর্বে নয়। দেখুন, অভিশপ্ত ইবলীস প্রথমে ফেরেশতাদের মু‘আল্লিম ছিলো, আবিদ ছিলো, তারপর যখন তার কুফর প্রকাশ পেলো, তখন তাকে কাফির সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইয়াযীদও তেমনি ছিলো। সুতরাং পরবর্তী অবস্থাদির জন্য হযরত আমীর মু‘আভিয়ার বিপক্ষে কিভাবে তজ্জন্য আপত্তি উত্থাপন করা যাবে? মোটেই যাবে না।
আর কারবালার ঘটনার জন্য হযরত আমীর মু‘আভিয়াকে কেউ দায়ী বলতে পারে না। কারণ, এমনটি করা হলে তো একই আপত্তি ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বিপক্ষেও করতে হবে। কারণ, যখন ইমাম হাসানের হাতে ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) মুসলমান বায়‘আত গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর পক্ষ হয়ে তাদের প্রাণোৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন, তখন তিনি (ইমাম হাসান) যদি তাদেরকে সাথে নিয়ে হযরত আমীর মু‘আভিয়ার সাথে মোকাবেলা করতেন, তখন ওই সময়েই আমীর মু‘আভিয়া নিশ্চিহ্ণ হয়ে যেতেন, আর ইয়াযীদের মতো লোককে খলীফা বানানোর কিস্সাই খতম হয়ে যেতো। কিন্তু তদস্থলে ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কে খিলাফত হযরত আমীর মু‘আভিয়ার হাতে ন্যস্ত করে দিয়েছিলেন। সুতরাং কারবালা ইত্যাদির ঘটনার জন্য কি বিরুদ্ধবাদীরা ইমাম হাসানকে দায়ী করবে? মোটেই না।
এ প্রসঙ্গে হুযূর-ই আক্রামের চাচী হযরত আব্বাসের স্ত্রী (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)’র ঘটনা প্রণিধানযোগ্য। হযরত উম্মুল ফযল রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার যখন সন্তান জন্মগ্রহণ করলো, তখন তিনি সন্তানটাকে হুযূর-ই আক্বদাসের নিকট নিয়ে গেলেন। তখন হুযূর-ই আক্রাম শিশুটির নাম রাখলেন ‘আবদুল্লাহ্’ (হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস)। আর বললেন- اِذْهَبِىْ بِاَبِىْ الْخُلَفَآءِ (খলীফাদের পিতাকে নিয়ে যাও)! তারপর এরশাদ করলেন-
هذا اَبُوْ الْخُلَفَآءِ حَتّى يَكُوْنَ مِنْهُمُ السَّفَّاحُ حَتّى يَكُوْنَ مِنْهُمْ الْمَهْدِىُّ
অর্থাৎ এ হচ্ছে খলীফাগণের পিতা; তাদের মধ্যে সাফ্ফাহ্ (রক্ত প্রবাহকারী)ও হবে, তাদের মধ্যে মাহদীও হবে।
[সূত্র. দালাইলুন্ নুবূয়ত: আদ্দাওয়াতুল মক্কিয়াহর বরাতে, পৃ. ১৫৪] দেখুন, হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ঔরশে অনেক বছর পরে জন্মগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বলে দিয়েছেন- তারা খলীফা হবে। তাদের নামও বলে দিয়েছিলেন (সাফ্ফা, মাহদী)। অনুরূপ হুযূর-ই আক্রাম ভালভাবে জানতেন যে, হযরত আমীর মু‘আভিয়ার ঔরশে ইয়াযীদ পয়দা হবে। সুতরাং তিনি আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে কেন ওসীয়ৎ করেননি- তুমি তোমার পুত্র ইয়াযীদকে খলীফা নিয়োগ করবে না, এসব কথা জানা সত্ত্বেও যেহেতু হুযূর-ই আক্রাম ওই নসীহত করেননি, সেহেতু বিরুদ্ধবাদীরা কারবালাসহ যাবতীয় অঘটনের সমস্ত দায় দায়িত্ব হুযূর-ই আক্রামের উপর আরোপর করার মতো জঘন্য ও কুফরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না তো? আর একথাও বলে দেবে না তো যেহেতু আল্লাহ্ তা‘আলা ইয়াদীদকে পয়দা করেছেন, সেহেতু তিনিই তজ্জন্য দায়ী- না‘ঊযুবিল্লাহ্!
পরিশেষে, বলতে হয় ইয়াযীদের সব কুকর্মের জন্য ইয়াযীদই দায়ী। এ প্রসঙ্গে গাউসে পাকের গুনিয়াতুত্ তালেবীনের বক্তব্যই নিরাপদ আমলযোগ্য। তিনি বলেছেন- সমস্ত আহলে সুন্নাতের একথার উপর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সাহাবা-ই কেরামের যুদ্ধগুলোর আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাঁদেরকে মন্দ বলা যাবে না। বরং তাঁদের ফযীলতগুলোই বর্ণনা করতে হবে। তাঁদের মতবিরোধগুলোকে আল্লাহ্ তা‘আলারই ক্বুদরতের হাতে সোপর্দ করতে হবে। (তাঁদের কোন ভুলই ইজতিহাদী ভুলের বাইরে নয়, যা গুনাহ্ও নয়; বরং প্রতিদান পাবার যোগ্য।)
ইমাম-ই আ’যম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন-
نَتَوَلَّهُمْ جَمِيْعًا وَلاَ نَذْكُرُ الصَّحَابَةَ اِلاَّ بِخَيْرٍ ـ
(আমরা আহলে সুন্নাত সমস্ত সাহাবীকে ভালবাসবো, তাঁদেরকে উত্তমরূপেই স্মরণ করবো)।
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন- ‘সাহাবা-ই কেরামের যুদ্ধ-বিগ্রহ নাফসানিয়াত (মনের কুপ্রবৃত্তি’র ভিত্তিতে ছিলোনা, কারণ, তাঁরা হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গ-এর বরকতে পবিত্র আত্মার অধিকারী হয়েছেন।
[মাকতূবাত: প্রথম খন্ড: পৃ.৮৬] মহান আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে এভাবে আমল করার তাওফীক দিন! আ-মী-ন।
-০-
লেখক: মহাপরিচালক-আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।