ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে নামায-রোযার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে নামায-রোযার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে নামায-রোযার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আল-ক্বাদেরী 
আল্লাহ তা‘আলার জন্য সকল প্রশংসা, যিনি আমাদেরকে মুসলমানরূপে সৃষ্টি করেছেন। সাথে সাথে সৃষ্টির সেরা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করে বিজয়ী ইসলামকে আমাদের দ্বীন হিসেবে প্রদান করেছেন। আর ইসলামই একমাত্র ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা, যা স্বয়ং আল্লাহরই মনোনীত। আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন-اِنَّ الدِّىْنَ عِنْدَ اللهِ الْاِسْلاَمُ অর্থাৎ ইসলামই আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম বা জীবন-ব্যবস্থা। আর নামায এবং রোযা হচ্ছে ইসলামের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রুকন বা স্তম্ভ। ঈমানের পরপরই রয়েছে নামায। রোযাও এ পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম। এ নিবন্ধে এ দু’টি স্তম্ভ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি-
।। এক।।
নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ঈমানের পরই রয়েছে নামাযের গুরুত্ব। বান্দার জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের উত্তম উপায় হচ্ছে নামায। নামাযের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর কাছে সরাসরি আরজি পেশ করতে পারে। ক্বোরআনুল কারীমের এমন অনেক আয়াত শরীফ রয়েছে, যেগুলো দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের নামায আদায় এবং নামাযের প্রতি যতœবান হওয়ার জন্য নির্দেশ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করেছেন। হাদীসে পাকেও মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নামায কায়েম করার প্রতি তাকিদ প্রদান করেছেন এবং নামাযের ফযীলত ও গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। নামায অন্যতম ফরয এবাদত। ক্বোরআন-ই পাকের অনেক জায়গায় নামাযের কথা অতি গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পবিত্র ক্বোরআনুল করীমে মুত্তাক্বী বান্দাগণের পরিচয় প্রদান করে ইরশাদ করেন-
هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ ﴿٢﴾ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ﴿٣﴾
তরজমা: এ কিতাব ক্বোরআন হিদায়তকারী মুত্তাক্বীদের জন্য; মুত্তাক্বী তারাই, যারা না দেখে আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং নামায ক্বায়েম রাখে আর আমার প্রদত্ত জীবিকা থেকে আমার পথে ব্যয় করে। [সূরা বাক্বারা, আয়াত ২-৩] নামায প্রাপ্ত বয়স্ক, বিবেকসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয। রাব্বুল আলামীন আরো এরশাদ করেন-
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَاٰتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ ﴿٤٣﴾
অর্থাৎ এবং তোমরা নামায ক্বায়েম করো ও যাকাত দাও এবং যারা রুকূ’ করে, তাদের সাথে রুকূ’ করো। [সূরা বাক্বারা, আয়াত-৪৩] এ আয়াতে কারীমায় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলা নামাযকে ক্বায়েম বা প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন। নামায কখন ও কীভাবে ক্বায়েম করা যাবে? প্রথমতঃ নামায ক্বায়েম করার মূল দাবী হচ্ছে জামা‘আত সহকারে সম্পন্ন করা। এর ফলে নামাযের সাওয়াবও ২৫ কিংবা ২৭ গুণ বেশী পাওয়া যায়। তাছাড়া, জামা‘আতের ফলে জামা‘আতে অংশগ্রহণকারী সকলের নামায ক্ববূল হওয়ার আশা করা যায়।
[তাফসীরে খাযা-ইনুল ইরফান, কৃত. সদরুল আফাযিল সৈয়দ নঈম উদ্দিন মুরাদাবাদী ও আহকামুল ক্বোরআন] নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে সাহায্য প্রার্থনারও নির্দেশ রয়েছে। ক্বোরআন পাকে এরশাদ হচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿١٥٣﴾
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। [সূরা বাক্বারা, আয়াত-১৫৪] এ আয়াত থেকে একটি বিষয় প্রতীয়মান হলো যে, ধৈর্যশীল মু’মিন কৃতজ্ঞ মু’মিন অপেক্ষা উত্তম। কেননা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীর জন্য নি’মাত বৃদ্ধির ওয়াদা রয়েছে, কিন্তু ধৈর্যশীলদের সাথে মহান রবই রয়েছেন।
কোন বিশেষ ওযর (যেমন নাবালেগ, পাগল ও অজ্ঞান হওয়া) ব্যতীত নামায ছেড়ে দেওয়ার বিধান নেই। তাছাড়া, সকলের জন্য নামায সহজ ইবাদত হবে, যদি নামাযে ধৈর্য, আন্তরিকতা এবং একাগ্রতা থাকে; অন্যথায় নামাযকে কিছু কিছু মহলের জন্য কষ্টসাধ্য বা ভারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন- আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন-وَاِنَّهَا لَكَبِيْرَةٌ اِلاَّ عَلَى الْخَاشِعِيْنَ তরজমা: নিশ্চয় (নামায) ভারী ও কষ্টসাধ্য, কিন্তু আন্তরিকভাবে যারা আমার প্রতি বিনয়ী, তাঁদের জন্য নয়। [সূরা বাক্বারা, আয়াত-৪৫] সুতরাং নিয়মিতভাবে যথা নিয়মে নামায আদায় করা ঈমান ও অন্তরের বিনয়েরই চিহ্ণ। আর শর‘ঈ ওযর ব্যতীত নামাযের প্রতি উদাসীনতা ও অবহেলা প্রদর্শন করা মারাত্মক অপরাধের শামিল। নামাযের প্রতি উদাসীন না হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে এবং উদাসীনতার প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ ﴿٤﴾ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ ﴿٥﴾
অর্থাৎ দূভোর্গ (আযাব) রয়েছে ওই সব নামাযীর জন্য, যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর, উদাসীন। [সূরা মা’ঊন, আয়াত-৪-৫] এখানে ‘নামাযীগণ’ মানে ওই সকল নামাযী, যারা শুধু নামায আদায় করে; কিন্তু অন্তরে ইখলাস বলতে কিছুই নেই। নিষ্ঠা, একাগ্রতা, ন¤্রতা ও বিনয় (خشوع وخضوع) হচ্ছে- নামায ক্ববূল হওয়ার পূর্বশর্ত। একাগ্রতা ও ন¤্রতা, যা ব্যতীত নামায নিষ্ফল আর উদাসীনভাবে নামায আদায় করলে ইহ ও পরকালীন অনিষ্টের কারণ হয়, যা ويل নামক ‘দোযখের সর্বনি¤œ স্তরে’ নিয়ে যাবে।
নামাযের প্রতি উদাসীন ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে পবিত্র ক্বোরআনে আরো এরশাদ হয়েছে-
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ
فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا ﴿٥٩﴾
তরজমা: অতঃপর তাদের পরে তাদের স্থলে ওই সকল উত্তরাধিকারী এলো, যারা নামায নষ্ট করেছে এবং নিজেদের কুপ্রবৃত্তিগুলোর অনুসরণ করেছে, সুতরাং অবিলম্বে তারা দোযখের মধ্যে ‘গায়্যি’ নামক উদ্যানে মিলিত হবে। [সূরা মরিয়ম, আয়াত-৫৯] এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, নামাযের বেলায় অবহেলা ও অলসতা করা বড় অন্যায় এবং ইহুদী ও খ্রিস্টানদের আলামত; প্রকৃত মু’মিনদের নয়।
এ অলসতা কয়েক ধরনের হতে পারে- নামায না পড়া, ওয়াক্¡ত চলে গেলে বা নিষিদ্ধ সময়ে অবহেলা বশত নামায আদায় করা, বিনা কারণে জামা‘আত ত্যাগ করা, নামায না পড়তে থাকা, অথবা রিয়াকারী বা লোক দেখানোর জন্য নামায পড়া ইত্যাদি। আর ‘গায়্যি’ (غَىِّ) হলো জাহান্নামের এমন একটি উদ্যানের নাম, যার উত্তাপ থেকে জাহান্নামের অন্যান্য স্তরগুলোও পানাহ্ চায়। [তাফসীরে কবীর ও রুহুল বয়ান] এ আয়াতে কারীমাগুলোর আলোকে নামায আদায়ের গুরুত্ব ও সালাত বর্জনকারী বা সালাতের প্রতি উদাসীনতার অশুভ পরিণতি, পরকালীন কঠিন আযাব ও মর্মান্তিক শাস্তির কথা প্রমাণিত হলো। এ ছাড়া আরো বহু আয়াতে পাক রয়েছে, যেগুলোতে আল্লাহ্ তা‘আলা নামায আদায়ের প্রতি তাকিদ প্রদান করেছেন। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۗ
নিশ্চয় নামায যাবতীয় অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। [সূরা আনকাবূত, আয়াত-৪৫] বস্তুত: যে সব মু’মিন নর-নারী পরিশুদ্ধ নিয়তে যথাযথ আদব ও হৃদয়ের একাগ্রতা সহকারে নামায আদায় করে সে যাবতীয় অশ্লীলতা ও গর্হিত কর্মসমূহ থেকে অবশ্যই মুক্ত থাকবে। এ ছাড়া পবিত্র হাদীসে পাকেও নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে বহু বর্ণনা এসেছে।
সালাত তথা নামায আদায়কারী ব্যক্তির গুনাহ্সমূহ আল্লাহ্ তা‘আলা নিশ্চিহ্ণ করে দেন।
যেমন, মেশকাত শরীফে বর্ণিত আছে-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَلصَّلَواتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ اِلى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ اِلى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ اِذَا اجْتُنِبَتِ الْكَبَائِرُ [رَوَاهُ مُسْلِمٌ] অর্থাৎ হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমা হতে অপর জুমা এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান মাঝখানে সংঘটিত গুণাহ্র কাফ্ফারা হয়ে যায়, যদি কবীরাহ্ গুনাহ্সমূহ হতে বিরত থাকা যায়। [মুসলিম শরীফ, মেশকাত শরীফ, হাদীস নম্বর ৫১৮] উক্ত হাদীস শরীফ থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, নামায যাবতীয় সগীরা (ছোট) গুনাহ্সমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। অবশ্য যদি নামাযের পূর্বাপর দো‘আ-মুনাজাতে খালিস নিয়তে গুনাহ কবীরা (বড়) গুনাহ্সমূহ হতে তাওবা করে, তবে কবীরা গুনাহও মাফ হয়ে যায়।
পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে সরওয়ারে দু’জাহান হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهْرًا بِبَابِ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ مِنْهُ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسًا هَلْ يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ ؟ قَالُوا : لَا يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ ، قَالَ : فَذٰلِكَ مَثَلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ ، يَمْحُو اللَّهُ بِهِنَّ الْخَطَايَا ” [مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ] অর্থাৎ হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা কি মনে কর? যদি তোমাদের কারো ঘরের দরজায় একটি নদী থাকে, আর সে ওই নদীতে প্রতিদিন পাঁচবার করে গোসল করে, তবে তার গায়ে কি কোন ময়লা থাকবে? উপস্থিত সাহাবা-ই কেরাম উত্তর দিলেন, ‘‘কোন ময়লা থাকবেনা।’’ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উদাহরণ এরূপই। এর দ্বারা আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা গুনাহ্সমূহ নিশ্চিহ্ণ করে দেন। [বোখারী ও মুসলিম এবং মিশকাত শরীফ] মুহাদ্দিসীন-ই কেরাম (হাদীস বিশারদগণ)-এর দৃষ্টিতে এরূপ উপমাদানের কারণ হলো-গোসল যেভাবে শরীরের ময়লা দূর করে দেয় তেমনি নামাযও নামাযী বান্দার গুনাহসমূহ দূর করে দেয়। তাই নামায গুনাহ্ ও পাপ হতে পবিত্র হওয়ার মহান ওসীলা বা মাধ্যম।
অপর এক হাদীসে এসেছে-
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلاةِ [رَوَاهُ مُسْلِمُ] অর্থাৎ হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, মু’মিন বান্দা ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামায ত্যাগ করা। [মুসলিম শরীফ ও মেশকাত শরীফ] অর্থাৎ প্রকৃত মু’মিন নর-নারী অবশ্যই নামায আদায় করেন আর কাফির ও নাফরমান নামায আদায় করে না।
নামাযের ফযীলত ও গুরুত্ব এবং তা পরিত্যাগকারীর পরিণাম প্রসঙ্গে প্রিয়নবী রাসূল-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو بْنِ الْعَاصِ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ ذَكَرَ الصَّلاَةَ يَوْمًا فَقَالَ: مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا كَانَتْ لَهُ نُورًا وَبُرْهَانًا وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يُحَافِظْ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهُ بُرْهَانٌ وَلاَ نُورٌ وَلاَ نَجَاةٌ، وَكَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ قَارُونَ وَهَامَانَ وَفِرْعَوْنَ وَأُبَيِّ بْنِ خَلَفٍ.
অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনে আস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম একদা নামাযের আলোচনা প্রসঙ্গে এরশাদ করলেন, যে ব্যক্তি নামায যথাযথভাবে যতœ সহকারে সম্পন্ন করবে ক্বিয়ামতের দিন তা তার জন্য নূর, অকাট্য প্রমাণ ও মুক্তির গ্যারান্টি ও কারণ হবে। আর যে ব্যক্তি নামাযের প্রতি যতœবান হবে না, ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য তা না নূর হবে, না অকাট্য দলীল হবে, না হবে মুক্তির কারণ এবং ক্বেয়ামতের দিন সে শ্রেষ্ঠ জালিম ক্বারূন, ফির‘আউন, হামান ও উবাই ইবনে খালাফের সাথে তার হাশর হবে।
[ইমাম আহমদ, দারেমী এবং বায়হাক্বী তাঁর শু‘আবুল ঈমানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, মেশকাত শরীফেও হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে।] তাইতো আহকামুল হাকেমীন আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু স্বীয় কালামে মজীদে ঘোষণা করেছেন-
اِنّىْ مَعَكُمْ لَئِنَ اَقَمْتُمْ الصَّلواة…ط
অর্থাৎ আমি তোমাদের সাথে আছি; যদি তোমরা নামায ক্বায়েম করো…। [সূরা মা-ইদাহ্: আয়াত-১২] পাঞ্জেগানা নামায আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের নূরানী আমলের অনুকরণের এক মহান সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা আমাদের পাপী-তাপী উম্মতের জন্য বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার। একদিকে দয়াময় আল্লাহর আদেশ পালন, অন্যদিকে প্রিয়নবী ইমামুল আম্বিয়া আক্বা ও মাওলা হুযূর পূরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের অনুকরণও।
তাফসীরে নঈমী ১ম পারায় হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী, তাফসীরে রুহুল বয়ানের বরাতে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার সারমর্ম হল- সর্বপ্রথম যমীনে নামায-ই ফজর আদায় করেছেন আদিপিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম, নামায-ই যোহর আদায় করেছিলেন হযরত খলীলুল্লাহ্ ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম, নামায-ই আসর আদায় করেছিলেন হযরত ইয়ূনুস আলায়হিস্ সালাম, নামায-ই মাগরিব আদায় করেছিলেন হযরত মূসা কলীমুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাম এবং নামাযে এশা আদায় করেছিলেন রূহুল্লাহ্ হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম। [তাফসীরে নঈমী, ১ম পারা, সূরা বাক্বারা, পৃ. ১১৮] বস্তুত: নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক, বিশাল। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে নামায ক্বায়েম রাখার তাওফীক্ব দিন! আ-মী-ন।

।। দুই।।
রোযার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের ৩য় স্তম্ভ হচ্ছে সাওম বা রোযা। নামাযের পর আর এক শারীরিক ইবাদত সাওমের অবস্থান বা গুরুত্ব। ধনী-গরীব সবার জন্য এ রোযাকে ইসলামী শরীয়ত ফরয করেছে নামাযের ন্যায়। রোযা দ্বারা দারিদ্র ও ক্ষুধার মূল্যায়ন হয় এবং সমাজে দরিদ্রকে সাহায্য করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। রোযা দ্বারা নিজের বন্দেগী এবং মহান রবের মালিকানা প্রকাশ পায়। আরবী বার (১২) মাসের মধ্যে ‘রমযান মাস’ হলো নবম মাস। রমযান ব্যতীত কোনো মাসের নাম আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বোরআনে উল্লেখ করেনি।
সুতরাং এটাও মাহে রমযানের অশেষ গুরুত্ব, ফযীলত, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রকৃষ্ট প্রমাণ। মূলত এ মাসের রোযা বা সিয়াম সাধনা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি অনন্য নি’মাত, যা আমরা শাফা‘আতের কান্ডারী, রহমতে দো‘আলম ও সাইয়্যিদুল আরব ওয়াল আজম আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বদৌলতে উপহারস্বরূপ পেয়েছি। পূর্বেকার কোন নবী-রাসূল স্বীয় উম্মত ও জাতিকে নির্দিষ্ট করে কোন সময় বা মাস দান করেননি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, রজব মাস হলো আল্লাহ তা‘আলার, শা’বান মাস আমি নবীর এবং রমযান মাস হলো আমার উম্মতের। আল্লাহ তা‘আলা পূর্বেকার সকল উম্মতের উপরই রোযার বিধান দিয়েছেন। এর প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন-
يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ
عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴿١٨٣﴾
তরজমা: হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিলো, যাতে তোমরা পরহেযগারী লাভ করতে পারো। [সূরা বাক্বারা: আয়াত-১৮৩] এ আয়াতে পাক থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, শারীরিক ইবাদতসমূহের মধ্যে অত্যন্ত কষ্টকর এ রোযা শুধু উম্মতে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ফরয করা হয়নি; বরং তা পূর্বেকার নবী-রাসূলের উম্মতের উপরও ফরয করা হয়েছিলো।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্ তা‘আলার বড় দয়া হয়েছে। আমাদের উপর রমযানুল মুবারকের রোযা ফরয করে মূলত: আমাদের জন্য তাক্বওয়া ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং সাথে সাথে তা পালনেরও নির্দেশ প্রদান করেছেন।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,
فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَن كَانَ
مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ
তরজমা: সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন অবশ্যই এ মাসের রোযা পালন করে। আর যে কেউ অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে, তবে ততসংখ্যক রোযা অন্য দিনগুলোতে ক্বাযা করবে। [সূরা বাক্বারা, আয়াত-১৮৫] রমযান মাসের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এ মাসে মহাগ্রন্থ ক্বোরআনুল কারীম অবতীর্ণ হয়েছে, মানব জাতির হিদায়ত স্বরূপ এবং পথ নির্দেশনা হিসেবে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى
لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ
তরজমা: রমযানের মাস, যাতে ক্বোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, মানুষের জন্য হিদায়ত ও পথ-নির্দেশ এবং মীমাংসার সুস্পষ্ট বাণীস্বরূপ।[সূরা বাক্বারা, আয়াত-১৮৫] এ রমযানের আর একটি বরকত হচ্ছে, পবিত্র ‘ক্বদর রাত’, আর ক্বোরআনকে আল্লাহ্ তা‘আলা এ রাতেই অবতীর্ণ করেছেন, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ ﴿١﴾
তরজমা: নিশ্চয় আমি সেটা (ক্বোরআন) ক্বদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।
[সূরা ক্বদর, আয়াত-১] আর এ ক্বদর রাত্রির পরিচয় এবং ফযীলত গুরুত্ব বর্ণনা করে রাব্বুল ‘আলামীন এরশাদ করেছেন-
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ ﴿٣﴾
তরজমা: ক্বদরের রাত হলো হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। [সূরা ক্বদর, আয়াত-৩] রমযান মাস প্রকৃত অর্থে ইহকালীন জীবনে তাক্বওয়া-পরহেযগারী এবং আল্লাহর অশেষ রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাত লাভের মাস। এ মাস অসংখ্য সাওয়াব অর্জনেরও উপযুক্ত সময়। শুধু ক্বদরের এক রাতেই ৮৩ বছর চার মাস ইবাদতের সাওয়াব আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাকে দান করেন। তাছাড়া, ত্রিশটি রোযার সাওয়াব, ই’তিকাফের সাওয়াব এবং অন্যান্য দান-সাদ্ক্বার সাওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হয়। তাই ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি লাভের মাস রমযানের গুরুত্ব ইসলামে অত্যোধিক।
বহু বিশুদ্ধ হাদীস শরীফে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পবিত্র রমযান মাস এবং রোযার ফযীলত ও গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। আর রোযাদারের মর্যাদা এবং সাওয়াবও অপরিসীম।
মাহে রমযানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য প্রসঙ্গে প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَا دَخَلَ رَمَضَانُ فُتِحَتْ اَبْوَابُ السَّمَآءِ وَفِىْ رِوَايَةٍ فُتِحَتْ اَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ اَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِىْنُ وَفِىْ رِوَايَةٍ فُتِحَتْ اَبْوَابُ الرَّحْمَةِ [مُتَّفَقٌ عَليْهِ] অর্থাৎ মহা মর্যাদাবান সাহাবী হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যখন রমযান মাস আগমন করে, তখন আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, অপর এক বর্ণনায় আছে, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানকে বন্দী করা হয়, অন্য এক বর্ণনায় আছে, রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। [বোখারী, মুসলিম ও মেশকাত শরীফ] মূলত শয়তানকে বন্দী করার মধ্যে আল্লাহ্র মর্জি হলো বান্দা যেন তাঁর ইবাদত একাগ্রতার সাথে করতে পারে। অপর এক হাদীস শরীফে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
عَنْ اِبْنِ عُمَرَ اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اِنَّ الْجَنَّةَ تُزَخْرَفُ لِرَمَضَانَ مِنْ رَأْسِ الْحَوْلِ إِلى حَوْلٍ قَابِلٍ قَالَ فَإِذَا كَانَ أَوَّلَ يَوْمٍ مِنْ رَمَضَانَ هَبَّتْ رِيْحٌ تَحْتَ الْعَرْشِ مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ عَلَى الْحُوْرِ الْعِيْنِ فَيَقُلْنَ يَارَبِّ اِجْعَلْ لَنَا مِنْ عِبَادِكَ أَزْوَاجًا تَقِرُّبِهِمْ أَعْيُنُنَا وَتَقِرُّ أَعْيُنُهُمْ بِنَا [رَوَاهُ الْبَىيْهَقِىُّ فِىْ شُعَبِ الْاِيْمَانِ] অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, বছরের প্রথম হতে পরের বছর পর্যন্ত মাহে রমযানের জন্য জান্নাতকে সাজানো হয়ে থাকে। অতঃপর যখন রমযান মাসের প্রথম দিন হয়, তখন আরশের নিচে জান্নাতের গাছের পাতা হতে আয়াতলোচনা হুরদের প্রতি এক (প্রকার) মনোরম হাওয়া প্রবাহিত হয়। তখন তারা (হুরগণ) বলে, ‘‘হে প্রতিপালক! তোমার বান্দাদের মধ্য হতে আমাদের জন্য এমন স্বামী নির্ধারণ করো, যাদেরকে দেখে আমাদের চক্ষু শীতল হবে আর আমাদেরকে দেখে তাদের চক্ষু শীতল হবে। হাদীসটি ইমাম বায়হাক্বী তাঁর শু‘আবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন। [মিশকাত শরীফ] আর রোযার প্রতিদান প্রদানেরও আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যান্য ইবাদতের প্রতিদানের ভার ফেরেশতাদের উপর ন্যস্ত থাকে। রোযাই একমাত্র ইবাদত, যার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা প্রদান করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। হাদীসে পাকে প্রিয় নবী সরকারে দো‘আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
كُلُّ عَمَلِ ابْنِ اٰدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : إِلاَّ الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ … الحديث
অর্থাৎ আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমল দশগুণ হতে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘রোযা তার ব্যতিক্রম। কেননা, রোযা একমাত্র আমারই জন্য রাখা হয়, আর আমিই এর প্রতিদান দেবো। [মিশকাত শরীফ] এ হাদীস শরীফ থেকে একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, অন্যান্য ইবাদতে রিয়া থাকলেও রোযাই একমাত্র ইবাদত যেখানে লোক দেখানোর কোন অবকাশ নেই। তাই এ ইবাদতে বান্দার প্রতি আল্লাহ খুশি হয়ে নিজেই তার প্রতিদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- لَيْسَ فِى الصَّوْمِ رِيَاءٌ অর্থাৎ রোযাতে কোন প্রকার রিয়া নেই। অন্য দিকে রোযা মানুষকে যাবতীয় খারাপ কাজ থেকে, যে কোন অপরাধ থেকে বিরত রাখে। তাই বলা হয়েছে- اَلصَّوْمُ جُنَّةٌ অর্থাৎ রোযা ঢাল স্বরূপ।
আর এ রিয়ামুক্ত, একনিষ্ঠভাবে ইবাদতকারী তথা রোযাদারের সম্মান ও মর্যাদা ও অত্যোধিক। এ প্রসঙ্গে হাদীসে পাকে এসেছে-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاِحْتِسَابًا غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ , وَمَنْ قَامَ رَمَضَانَ اِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهٖ وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاِحْتِسَابًا غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهٖ ـ
অর্থাৎ সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমযানের রোযা পালন করে, তার পূর্বের সমূদয় গুনাহ্ (সগীরা) মাফ করে দেওয়া হবে, আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমযানের রাত ইবাদতে কাটাবে তারও পূর্ববর্তী গুনাহ্ মাফ করা হবে, আর যে ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় ক্বদরের রাত ইবাদতে কাটাবে তারও পূর্ববর্তী সমূদয় গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হবে। [বোখারী, মুসলিম ও মেশকাত শরীফ] আর ক্বোরআনে পাক ক্বদরের রাতে ইবাদত করাকে তিরাশি বছর চার মাস অপেক্ষা উত্তম বলেছেন। আর রোযাদারের মুখের গন্ধও রাব্বুল আলামীনের কাছে মিশ্কের সুগন্ধি হতে অধিক সুগন্ধময়। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ اَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِّيْحِ الْمِسْكِ
অর্থাৎ রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট মেশক আম্বরের সুগন্ধির চেয়েও উৎকৃষ্ট। (আল হাদীস) অর্থাৎ সুগন্ধিকে মানুষ যেভাবে কাছে টেনে নেয়, তেমনি রোযাদারকে আল্লাহ্ তা‘আলা নৈকট্য দান করেন। এছাড়াও হাদীসে পাকে এসেছে রোযাদারের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি-
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ فَرْحَةٌ عِنْدَ فَطْرِه وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبّهِ
অর্থাৎ রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছেঃ এক. তার ইফতারের সময়, দুই. (পরকালে) তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাত লাভের সময়।
[আল হাদীস, মেশকাত শরীফ] বেহেশতে এমন একটি দরজা আছে, যে দরজা দিয়ে শুধু রোযাদারগণই প্রবেশাধিকার লাভ করবেন।
হাদীস শরীফে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِى الْجَنَّةِ ثَمَانِيَةُ اَبْوَابٍ مِنْهَا بَابٌ يُسَمَّى الرَّيَّانَ لاَ يَدْخُلْهُ اِلاَّ الصَّائِمُوْنَ [مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ] অর্থাৎ হযরত সাহ্ল ইবনে সা’দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। তন্মধ্যে একটি দরজার নাম হলো ‘রাইয়্যান’। আর ওই দরজা দিয়ে শুধু রোযাদারগণই প্রবেশ করবেন। [বোখারী ও মুসলিম] এভাবে অসংখ্য নি’মাতদানসহ রোযাদারগণকে পুরস্কৃত করা হবে এবং মর্যাদা প্রদান করা হবে।

ইসলামী শরীয়তে মাহে রমযানে রোযার বিধান প্রবর্তনের পেছনেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিকমত বিদ্যমান। তন্মধ্যে- কয়েকটা নি¤œরূপ:
ক. বান্দার তাক্বওয়া অর্জন,
খ. রোযা শয়তানের প্ররোচনা প্রতিহত করার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।
গ. গুনাহ্সমূহ মাফ হয়ে যায়।
ঘ. রোযা জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম।
ঙ. আল্লাহর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভের উপায়।চ. অবিরত রহমত লাভ করা।
ছ. ক্বোরআন নাযিল করার মাস এবং তার ফযীলত লাভ।
জ. বিশ্বজনীন সাম্য, মৈত্রী, ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হয়।
ঝ. দুঃখী মানুষের দুঃখ অনুভবের সুযোগ হয়।
ট. চরিত্র হননকারী কু-প্রবৃত্তির দমন হয় এবং বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক রোগ নিরাময় হয় এই মাসে রোযা পালনের মাধ্যমে।