পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন

পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন

পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন

আলহাজ্ব মুফতি কাজী মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াজেদ
।। এক।।
পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন
ميلاد (মীলাদ) শব্দটি আরবী। আরবী পরিভাষায় مصدر ميمى (মীম বিশিষ্ট মাসদার)। অন্য আরেকটি শব্দে مَوْلِدْ আছে। এর আভিধানিক অর্থ- জন্ম, জন্মস্থান। এ জন্য মক্কা শরীফে মারওয়া পাহাড়ের পার্শ্বে ‘মাকতাবাতু মাক্কাহ্ আল- মুর্কারামা’ সাইন বোর্ড সম্বলিত দালানটিকে مَوْلِدُ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (মাওলেদুন্নবিয়্যি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলা হয়। আহমদ মুহাম্মদ ইলিয়াস গণি তাঁর রচিত تاريخ مكة المصور গ্রন্থেরمَكْتَبَةُ مَكَّةَ الْمُكَرَّمَةِ (اَلْمَوْلُدِ) অংশে সচিত্র উল্লেখ করেন,
وَهِىَ دَارُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ وُلِدَ فِيْهَا سَيِّدُنَا مُحَمَّدٌ خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থাৎ এটা হচ্ছে খাজা আবদুল্লাহ্ ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বাড়ী। এখানে আমাদের সরদার সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন।
পরিভাষায়, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভ জন্ম বৃত্তান্তকে مِيلاد (মীলাদ) বলা হয়।
আমাদের সঠিক ইসলাম, যাকে আল্লাহ্ তা‘আলা اِنَّ الدِّيْنِ عِنْدَ اللهِ الْاِسْلاَمُ বলে আখ্যায়িত করেছেন, ওই ইসলামের আলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে মীলাদ শরীফ পাঠ করা, ক্বায়েম করা এবং হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মীলাদে পাকের কথা স্মরণ করে তাঁর সম্মানার্থে ক্বিয়াম করে সালাম পেশ করা শুধু বৈধ নয়; বরং উত্তম ও সাওয়াবের কাজ। যেহেতু, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মুহাব্বত করা এ উম্মতের উপর ফরয এবং সর্বাবস্থায় সম্মানের আক্বীদা রাখা, সম্মান প্রদর্শন করা ফরয; যেমন, ক্বোরআনুল করীমের নির্দেশ وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ তোমরা তাকে সাহায্য করবে এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে), সেহেতু মীলাদ-ক্বিয়ামের মাধ্যমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সম্মান দেখানো উত্তম ও সাওয়াবের কাজ। এগুলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কর্মকান্ড হিসাবে আক্বীদা রাখা ফরয, যাকে ফিক্বহ্ শাস্ত্রের পরিভাষায়, ফরযে এ’তেক্বাদী (فرض اعتقادى) বলা হয়।
বর্তমান মীলাদ শরীফ উদ্যাপন করার ব্যাপারে বাতিল মতবাদীদের অনেক আপত্তি রয়েছে। ক্বোরআন, হাদীস ও সলফে সালেহীনের মধ্যে নেই বলে তারা দাবী করে; অথচ ক্বোরআনুল করীম-এর পক্ষে প্রমাণ রয়েছে। পবিত্র ক্বোরআনে এ সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বোরআনকে تِبْيَانٌ لِكُلِّ شَئٍ (প্রত্যেক কিছুর বর্ণনাকারী) বলেছেন। আর ক্বোরআনে করীমে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তা’যীম, প্রশংসা, গুণগান ও উত্তম চরিত্র বর্ণনার্থে নাযিল হয়েছে। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন اِنَّكَ لَعَلٰى خُلُقٍ عَظِيْمٍ (নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর আছেন। [সূরা ক্বলম: আয়াত: ৪] হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বর্ণনায়خُلُقُه̒ صَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ الْقُرْاٰنُ এসেছে। তাই মীলাদ ও ক্বিয়াম শরীফও হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তা’যীমরূপী কর্মকান্ডের বাইরে নয়; এর মাধ্যমে পবিত্র ক্বোরআন নাযিল হবার অন্যতম উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হয়।
মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আমি একখানা গ্রন্থ রচনা করেছি। ‘সকল ঈদের সেরা ঈদ ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ নামক বইটিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র আগমন তথা ‘মীলাদ’ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ ক্বোরআনের বহু আয়াত প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ সবিস্তারে উল্লেখ করেছি। ওইগুলো পবিত্র মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনের পক্ষে প্রণিধানযোগ্য। এ নিবন্ধে ক্বোরআনের কিছু আয়াতে কারীমা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি, যেগুলো দ্বারা হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মীলাদ শরীফ পালন করা শুধু বৈধ বলে প্রমাণিত হয় না, বরং সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হিসেবে হয়েছে। যেমন-
قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهٖ فَبِذلِكَ فَلْيَفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ ﴿٥٨﴾
তরজমা: হে হাবীব, আপনি বলুন, আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া এবং সেটারই উপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিৎ; তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়। [সূরা ইয়ূনুস: আয়াত-৫৮, কান্যুল ঈমান] وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ
তরজমা: এবং তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিলো, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন…আল আয়াত। [সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত-১০৩, কান্যুল ঈমান] وَإِذْ أَخَذَ اللَهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهٖ وَلَتَنصُرُنَّهُ ۚ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَىٰ ذَ‌ٰلِكُمْ إِصْرِي ۖ قَالُوا أَقْرَرْنَا ۚ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ ﴿٨١﴾
তরজমা: এবং স্মরণ করুন যখন আল্লাহ্ নবীগণের নিকট থেকে তাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের নিকট রসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁকে সাহায্য করবে। এরশাদ করলেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ সম্পর্কে আমার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করলে?’ সবাই আরয করলো, ‘‘আমরা স্বীকার করলাম।’ এরশাদ করলেন, ‘তবে (তোমরা!) একে অপরের উপর সাক্ষী হয়ে যাও এবং আমি নিজেই তোমাদের সাথে সাক্ষীদের মধ্যে রইলাম।’ [সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত-৮১, কানযুল ঈমান] قَدْ جَآءَكُم مِّنَ اللَهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ ﴿١٥﴾
তরজমা: নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা নূর এসেছে এবং স্পষ্ট কিতাব। [৫:১৫] لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿١٢٨﴾
তরজমা: নিশ্চয় তোমাদের নিকট তাশরীফ এনেছেন, তোমাদের মধ্য থেকে ওই রসূল, যাঁর নিকট তোমাদের কষ্টে পড়া কষ্টদায়ক, তোমাদের কাল্যাণ অতিমাত্রায় কামনাকারী, মু’মিনদের উপর পূর্ণ দয়ার্দ্র, দয়ালু। [৯:১২৮] لَقَدْ مَنَّ اللَهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ﴿١٦٤﴾
তরজমা: নিশ্চয় আল্লাহর মহা অনুগ্রহ হয়েছে মু’মিনদের উপর যে, তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন; যিনি তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন এবং তারা নিশ্চয় এর পূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিলো। [৩:১৬৪] ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন হুযূর-ই আক্রামের আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন,
أَطِيعُوا اللَهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ
তরজমা: আনুগত্য করো আল্লাহর, অনুগ্রত করো রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তাদের। [৪:৫৯, কান্যুল ঈমান] যাদের হাতে ঈমান-ইসলামের ক্ষমতা রয়েছে (তথা ইমাম, মুজতাহিদ, শরীয়তের আইনজ্ঞ, মাযহাবের ইমামগণ, তরিক্বতের ইমামগণ) তাদের আনুগত্য করো।
মূলত, আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর মহান নি’মাত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَاِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَةَ اللهِ لاَ تُحْصُوْهَا [سورة ابراهيم اية ـ ৩৪] অত্র আয়াতের নি’মাতের কৃতজ্ঞতা আদায় করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যা অন্যতম ফরয। মিলাদে পাক উদ্যাপন করার মাধ্যমে আল্লাহর ওই নি’মাতের কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়। সুতরাং এটা আল্লাহর নির্দেশ অনুপাতে মহান ইবাদতে পরিণত। অতএব, এটা ইবাদত, বিদ‘আত নয়। যদিও বাতিল ফিরক্বার ধর্মে বিদ‘আত বলা হয়।
হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম হতে হযরত আব্দুল্লাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পর্যন্ত যুগে যুগে যাঁদের মাধ্যমে হুযূর-ই আক্রামের নূর মুবারক স্থানান্তরিত হয়েছিলো প্রত্যেকে ওই নূরে পাককে নিয়ে আপন পরিবেশে মিলাদ পালন করেছেন।
হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবা-ই কেরাম কর্তৃক যুগে যুগে এ মিলাদ পালিত হয়ে আসছে। হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মিলাদ বর্ণনাপূর্বক হাদীস বর্ণনা করেন,
خَرَجْتُ مِنْ نِكَاحٍ وَلَمْ اَخْرُحْ مِنْ سَفَاحٍ مِنْ لَّدُنْ ادَمَ اِلى اَنْ وَلَدَنِىْ اَبِىْ وَاُمِّىْ
অর্থাৎ আমি ইসলামী নিকাহ’র তরীকা অনুযায়ী জন্মগ্রহণ করেছি এবং হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম হতে আমার পিতা-মাতা পর্যন্ত কারো নিকট কখনো ব্যভিচার পাওয়া যায় নি। [ত্বাবরানী, ইবনে আবী শায়বাহ্ দায়লামীর মুসনাদুল ফিরদাউস] হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের মীলাদ শরীফ নিজেই উদ্যাপন পূর্বক বর্ণনা করেন,
اَنَا مُحَمُّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ بْنِ هَاشِمِ بْنِ عَبْدِ مَنَافِ بْنِ قُصَىِّ بْنِ كِلاَبِ بْنِ مَرَّةَ بْنِ مَدْرَكَةَ بْنِ الْيَاسِ بْنِ مُضَرَ بْنِ يَزَارَ وَمَا افْتَرَقَ النَّاسُ فِرْقَتَيْنِ اِلاَّ جَعَلَنِىَ اللهُ فِىْ خَيْرِهِمَا ـ فَاُخْرَجْتُ مِنْ بَيْنَ اَبْوَيْنِ فَلَمْ يَصِبْنِىْ شَئٌ مِّنْ مَهْرِ الْجَاهِلَيَّةِ وَخَرَجْتُ مِنْ نِكَاحٍ وَّلَمْ اُخْرَجْ مِنْ سَفَاحٍ مِّنْ لَّدُنْ ادَمَ حَتّى انْتَهَيْتُ اِلى اَبِىْ وَاُمِّىْ فَاَنَا خَيْرُكُمْ نَفْسًا وَخَيْرُكُمْ اَبَا
[بَيْهَقِىُّ وَالْبِدَايَةُ وَالنِّهَايةُ] অর্থাৎ …সমস্ত মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত, আল্লাহ্ আমাকে তাদের মধ্যে উত্তম ভাগে রেখেছেন। আমি মাতাপিতার গর্ভে ও ঔরশে জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু আমাকে জাহেলী যুগের কোন অশ্লীলতা স্পর্শ করেনি। আমি আমার মাতাপিতার বিবাহের ফসল। আমি কোন ব্যভিচারের ফসল নই। হযরত আদম থেকে বংশ পরস্পরায় আমার পিতামাতা পর্যন্ত আমি এসেছি। সুতরাং আমি তোমাদের মধ্যে সত্তার দিক দিয়েও উত্তম এবং তোমাদের মধ্যে পিতার দিক দিয়েও উত্তম।
[বায়হাক্বী আল বিদায়া, ওয়ান্নিহায়া] হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের মিলাদ সম্পর্কে আরো বর্ণনা করেন,
اِنِّىْ عِنْدَ اللهِ مَكْنُوْنٌ خَاتَمِ النَّبِيْيْنَ وَاِنَّ ادَمَ لَمُنْجَدِلٌ فِىْ طِيْنَتِه وَسَأُ خُبِرُكُمْ بِاَوَّلِ اَمْرِىْ دَعْوَةُ اِبْرَاهِيْمَ وَبَشَارَةُ عِيْسى وَرُؤْيَا اُمِّىْ الَّتِىْ أَتْ حِيْنَ وَضَعَتْنِىْ قَدْ خَرَجَ لَهَا نُوْرٌ اَضَاءَ لَهَا مِنْهُ قُصُوْرُ الشَّامِ [بَيْهَقِىُّ وَمَسْنَدُ اَحْمَدُ] অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট, শেষ নবী হিসেবে গোপন ছিলাম। তখন হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম তাঁর দৈহিক উপাদানে মিশ্রিত ছিলেন আর আমি এখন আমার প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে বলব- আমি হযরত ইব্রাহীমের দো‘আ, হযরত ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মায়ের ওই চাক্ষুষ দৃশ্য, যা তিনি আমার জন্মের সময় দেখেছিলেন, তাঁর সামনে একটি নূর উদ্ভাসিত হয়েছিলো, যার আলোয় তিনি সিরিয়ার প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছিলেন। [বায়হাক্বী, মুসনাদে ইমাম আহমদ] হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের মিলাদ বর্ণনাপূর্বক নিজ সৃষ্টির শুরু সম্পর্কে বর্ণনা করেন,
اِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَئَلَ جِبْرَآئِيْلَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَالَ يَا جِبْرَائِيْلُ كَمْ عُمْرُكَ مِنَ السِّنِيْنِ؟ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ لَسْتُ اَعْلَمُ غَيْرَ اَنَّ فِىْ الْحِجَابِ الرَّابِعِ نَجْمًا يَطْلَعُ فِىْ كُلِّ سَبْعِيْنَ اَلْفَ سَنَةٍ مَرَّةً وَرَأَيْتُه اِثْنَيْنِ وَسَبْعِيْنَ اَلْفَ مَرَّةً فَقَالَ يَا جِبْرَائِيْلُ وَعِزَّةِ رَبِّىْ جَلَّ جَلاَلُه اَنَا ذَالِكَ الْكَوْكَبُ [السيرة الحلبية نقل عن كتاب تشريفات رواه البخارى] অর্থাৎ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে জিব্রাঈল, তোমার বয়স কত? তিনি বললেন, আমি তো জানি না, তবে এতটুকু জানি যে, চতুর্থ পর্দায় একটি তারকা সত্তর হাজার বছরের মাথায় একবার উদিত হতো। আমি সেটাকে বাহাত্তর হাজার বার দেখেছি। অতঃপর হুযূর-ই আক্রাম বললেন, হে জিব্রাঈল আমার মহান রবের ইয্যাতের শপথ! আমি হলাম ওই তারকা। [সীরাতে হালবিয়া] এভাবে হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মীলাদ বর্ণনা পূর্বক অসংখ্য হাদীসে পাক রয়েছে। আমার রচিত ‘সকল যুগের সেরা ঈদ ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ নামক কিতাবে আমি ১৩টি হাদীস উল্লেখ করেছি। প্রয়োজনে সংগ্রহ করে পড়ার পরামর্শ রইলো।
সাহাবা-ই কেরামের মধ্যেও ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনের বিবরণ অসংখ্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আবুদ্ দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত,
اِنَّه مَرَّ مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلى بَيْتِ عَامِرٍ الْاَنْصَارِىِّ وَكَانَ يُعَلِّمُ وَقَائِعَ وَلاَدَتِه عَلَيْهِ الصَّلوةُ وَالسَّلاَمُ لِاَبْنَائِه وَعَشِيْرَتِه وَيَقُوْلُ هَذَا اَلْيَوْمُ فَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلوة وَالسَّلاَمُ اَنَّ اللهَ فَتَحَ لَكَ اَبْوَابَ الرَّحْمَةِ وَالْمَلاَئِكَةُ كُلَّهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ لَكَ مَنْ فَعَلَ فِعْلَكَ نَجى نَجَاتَكَ
[التنوير فى مولد البشير والنذير] অর্থাৎ নিশ্চয় তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমির আনসারীর ঘরে গেলেন। তিনি তখন তার পুত্রদের ও গোত্রীয় লোকদেরকে হুযূর-ই আক্রামের বেলাদত শরীফের বর্ণনাবলী শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আর বলছিলেন, ‘আজকের এ দিন।’ অতঃপর হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার জন্য রহমতের দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন, ফেরেশতারা সবাই তোমার জন্য মাগফিরাত কামনা করছে। যে ব্যক্তি তোমার মতো কাজ করবে, সে তোমার মতো মুক্তি পাবে।
[আত্তানভীর ফী মওলেদিল বশীরিন নাযীর]
মীলাদুন্নবী উদযাপন প্রসঙ্গে ইমামগণের অভিমত
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী ‘হাসানুল মাক্বসাদ ফী আমলিল মাওলেদ’ (حسن المقصد فى عمل المولد)-এর মধ্যে বর্ণনা করেন-
فَظَهَرَ لِىْ تَخْرِيْجُه عَلى اَصْلٍ اٰخَرَ وَهُوَ مَا اَخْرَجَهُ الْبَيْهَقِىُّ عَنْ اَنَسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ اَنَّ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَّ عَنْ نَفْسِه بَعْدَ النَّبُوَّةَ مَعَ قَدْ وَرَدَ عَنْ جَدِّه عَبْدِ الْمُطَّلِبِ عَقَّ عَنْهُ فِىْ سَابِعِ وِلاَدَتِهِ وَالْعَقِيْقَةُ لاَ تُزَادُ مَرَّةً ثَانِيَةً فَيُحْمَلُ عَلى اَنَّ الَّذِىْ فَعَلَهُ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِظْهَارُ الشُّكْرِ عَلى اِيْجَادِ اللهِ اِيَّاهُ رَحْمَةً لِّلْعَالَمِيْنَ وَتَشْرِيْعِ لِاُمَّتِه كَمَا كَانَ يُصَلِّىْ عَلى نَفْسِه لِذَالِكَ فَيَسْتَحِبُّ لَنَا اَيْضًا اِظْهَارُ الشَّكْرِ بِمَوْلِدِه بِالْاِجْتِمَاعِ وَاِطْعَامِ اَلطَّعَامِ وَنَحْوِ ذَالِكَ بِوُجُوْهِ الْقُرْبَاتِ وَاِظْهَارِ الْمُسَرَّاتِ
অর্থাৎ আমার নিকট এ হাদীসের বর্ণনার জন্য একটি সনদ প্রকাশ পেয়েছে। তা হচ্ছে ওই হাদীস, যা ইমাম বায়হাক্বী হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের আক্বীক্বা নিজে করেছেন নুবূয়ত প্রকাশের পর। এতদ্সত্ত্বেও তাঁর দাদা খাজা আবদুল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর বেলাদত শরীফের সপ্তম দিনে তাঁর পক্ষ থেকে আক্বীক্বা করেছেন অথচ আক্বীক্বা একবারের বেশী করা হয় না। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন, তার ব্যাখ্যা এটা দেওয়া হবে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে রাহমাতুল্লিল আলামীন হিসেবে পয়দা করেছেন বিধায় সেটার শোকরিয়া প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তা করেছেন আর তেমন কাজ শরীয়তের বিধিভুক্ত করার জন্য, যেমন তিনি তজ্জন্য নিজে দুরূদ পড়েছেন। সুতরাং আমাদের জন্যও হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মীলাদ শরীফের শোকরিয়া আদায় করা মুস্তাহাব; তাও মাহফিলের আয়োজন ও খানা খাওয়ানো ইত্যাদির মাধ্যমে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও তাঁর নি’মাত প্রাপ্তিতে খুশী প্রকাশের নিমিত্তে।)
পাক ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘মা-সাবাতা বিস্সুন্নাহ্’ (ما ثبت بالسنة)-এর মধ্যে এভাবে বর্ণনা করেন-
لايزال اهل الاسلام يحتفلون بشهر مولد النبى صلى الله عليه وسلم ويعملون الولائم ويصدقون فى لياليه بانواع الصدقات ويظهرون السرور فى المبرات ويعتنون بقراء مولده الكريم (ماثبت بالسنة)
অর্থাৎ মুসলমানগণ মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে মাহফিল করে আসছেন, খাবারের আয়োজন করেন, সেটার রাতগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সাদক্বাহ্-খায়রাত করেন এবং খুশী প্রকাশ করেন দান-খায়রাত ও মীলাদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে।
এভাবে মিশরও সিরিয়ার মধ্যে মিলাদ পালন প্রসঙ্গে فاكثر هم بذالك عناية اهل مصروالشام অর্থাৎ সুতরাং মিশর ও সিরিয়াবাসীরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তা পালন করে থাকে।
দেওবন্দীদের অন্যতম মৌলভী আশরাফ আলী থানভী কর্তৃক রচিত ‘মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ নামক কিতাবের ১৯২ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন, ‘ক্বোরআনের আয়াত- ذَكِّرْهُمْ بِاَيَّامِ اللهِ (তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিন আল্লাহর দিনগুলোকে)-এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেন, ‘‘এ কথা সুস্পষ্ট হল যে, নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি-আনন্দ করা বৈধ। শুধু তা নয়, বরং তা বরকত হাসিলের বড় উপায়ও।
রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ওস্তাদ মীলাদ সম্পর্কে বলেন, এ কথা হক ও সত্য যে, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামা-এর মিলাদ শরীফ পালন এবং ঈসালে সাওয়াবের আয়োজন করা মানবের পরিপূর্ণ কল্যাণের একটি সোপান। বাস্তব এ যে, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মীলাদ পালন করার মধ্যে এবং ঈসালে সাওয়াব উপলক্ষে ফাতেহা পড়া আপন মীলাদের খুশি উদ্যাপন করেছেন পুরোটাই মানবের জন্য মঙ্গল।
[শেফাউল সায়ের, কৃত. শাহ্ আবদুল গণী দেহলভী] উপরোক্ত দলীলাদির আলোকে সাব্যস্ত হল যে, ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করা এ উম্মতের জন্য সর্বোত্তম ইবাদত; যার মাধ্যমে আল্লাহর মহান নি’মাতের শোকর আদায় হয়। আর নি’মাতের শোকর আদায়ের জন্য স্বয়ং আল্লাহরই হুকুম বিদ্যমান। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন, وَاشْكُرُوْا لِىْ وَلاَتَكْفُرُوْنَ অর্থাৎ ‘‘তোমরা আমার নি’মাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং নাফরমানী করো না।’’ সুতরাং, যারা আল্লাহর মহান নি’মাতের শোকর আদায়ার্থে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করে, তারা আল্লাহর হুকুমই বাস্তবায়ন করলো। আর আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন ও পালন তারাই করবে, যারা ঈমানদার। তাই ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করা ঈমানদারের কাজ ও পুণ্যময় আমল, যা করলে পুণ্য ও সাওয়াব পাওয়া যায়। আর যারা ঈমানদার নয়, তারা ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করার প্রশ্নই আসে না। এমনকি যারা ঈমানদার নয়, তারা যদি ভক্তি সহকারে তা পালন করে, তবে তারা অবশ্যই সুফল পাবে। যেমন, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আবূ লাহাবকে হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু স্বপ্নে দেখলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার অবস্থা কি? সে উত্তরে বললো, ‘‘ঈমান ছাড়া মৃত্যুবরণের কারণে বর্তমানে আমার অবস্থান জাহান্নামে, কিন্তু প্রতি সোমবার রাতে আমার আযাব হালকা হয়ে যায় এবং আমি আমার এ দু‘আঙ্গুল থেকে ঠান্ডা পানি পান করতে থাকি। আর এ আযাব হালকা হওয়া এবং ঠান্ডা পানি পাবার কারণ হলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের বেলাদত শরীফের শুভ সংবাদ দিয়ে আমার দাসী সুয়াইবা আমাকে অবহিত করলে আমি তাকে আনন্দে দু’ আঙ্গুলে ঈশারা করে মুক্ত করে দিয়েছিলাম এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দুধ পান করানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে ইমাম শামসুদ্দীন জাযারী (জন্ম ৬৬০ হি.) তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘উরফুত তা’রীফ বিল মাওলিদিশ শরীফ’ এর মধ্যে এ মন্তব্য করেন-
فَاِذَا كَانَ اَبُوْ لَهَبٍ الْكَافِرُ الَّذِىْ نَزَلَ الْقُرْانَ لِذَمِّه جُوْزِىَ فِى النَّارِ بِفَرْحَةِ لَيْلَةِ مَوْلِدِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِه فَمَا حَالُ الْمُسْلِمِ الْمُوَحِّدِ مِنْ اُمَّةِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسُرُّ لِمَوْلِدِه وَيَبْذُلُ مَا تَصِلُ اِلَيْهِ قُدْرَتُه فِيْ مَحَبَّتِه لَعَمْرِىْ اِنَّمَا يَكُوْنُ جَزَائُه مِنَ اللهِ اَلْكَرِيْمِ اَنْ يُدْخِلَه بِفَضْلِه جَنَّاتِ النَّعِيْمِ (عُرْفُ التَّعْرِيْفِ بِالْمَوْلِدِ الشَّرِيْفِ لِلْجَزَرِىّ وَحَسَنِ اَلْمَقْصِدِ فِىْ عَمَلِ الْمَوْلِدِ لِلسُّيُوْطِىِّ
অর্থাৎ আবূ লাহাব, যার মৃত্যু কুফরী অবস্থায় হয়েছে এবং যার দুর্নামের জন্য সূরা লাহাব ক্বোরআনে নাযিল হয়েছে, সে মৃত্যুর পর জাহান্নামের আগুনের মধ্যে রয়েছে; কিন্তু হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মীলাদে পাকের রজনীতে (৫৭০ খ্রি.) হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শুভাগমনের উপর খুশি উদ্যাপন করার কারণে প্রতি সোমবার আযাব থেকে মুক্তি এবং ঠান্ডা পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। আর এ উম্মতের ঈমানদারের অবস্থা কিরূপ হবে, যারা হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মিলাদের উপর খুশি উদ্যাপন করে এবং নবী প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার সার্মথ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে? আমার জীবনের শপথ! অবশ্যই এটার প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জান্নাতুন্ না‘ঈমের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। [উরফুত্ তা’রীফ বিল মাওলিদিশ্ শরীফ, কৃত. শামসুদ্দীন জাজরী এবং হাসানুল মাক্বসাদ, কৃত. জালালুদ্দীন সূয়ূত্বী]
ক্বোরআন, সুন্নাহ্ ও আইম্ম্যা-ই মুজতাহিদীনের মতামতের ভিত্তিতে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করা শুধু বৈধই নয় বরং আল্লাহর নি’মাতের শোকর আদায়ার্থে উত্তম ইবাদতও। এ কাজ ইসলামেরই অংশ বিশেষ। সুতরাং এটা ইহুদী, খ্রিস্টান, কাফেররা করার প্রশ্নই ওঠে না।
যারা একথা বলে, তারা ইসলাম ধর্মে তো নেই, এমনকি অন্য কোন ধর্মে তাদের অবস্থান আছে কি না, তা আমার জানা নেই। মুসলমান হয়ে নবীর উম্মত দাবী করে, নবীর মীলাদের বিপক্ষে অবস্থান নেবে এ ধরনের মুসলমানের স্থান এ উম্মতের মধ্যে নেই। হ্যাঁ, যে জনগোষ্ঠীকে খারেজী নাম দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে, এরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।
খারেজী ছাড়া এ ধরনের কথা আর কেউ বলতে পারে না। খারেজী সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমার অভিমত হচ্ছে ‘মাখলুক্বাতের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ও নিকৃষ্ট সম্প্রদায় হচ্ছে খারেজী’। [সহীহ্ বুখারী] বর্তমানে যারা খারেজী দলের অন্তর্ভুক্ত, তারা হে মীলাদ শরীফ উদ্যাপনের বিপক্ষে উপরোক্ত মন্তব্য করে ফাত্ওয়া জারী করে, তাদের এমন ফাত্ওয়া শুধু তাদের মতাবলম্বীদের জন্য হতে পারে। সঠিক ইসলামপন্থী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের জন্য হতে পারে না। সুতরাং তাদের খারেজী ধর্মে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম না থাকতে পারে, তাই বলে আমাদের সঠিক ইসলামে উদ্যাপন নেই এ কথা বলা যাবে না; বরং সঠিক ইসলামে ‘মীলাদুন্নবী আছে, তাদের খারেজী ধর্মে নেই। আর খাজেরী ধর্মের কোন ফাত্ওয়া আমাদের ধর্মে গ্রহণযোগ্য নয়।
মীলাদে পাক-এ ক্বিয়াম
হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তাওয়াল্লুদ শরীফ পাঠের শেষান্তে দাঁড়িয়ে হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সালাম পেশ করাকে ‘ক্বিয়াম’ নামে অভিহিত করা হয়। আর এ ক্বিয়াম করা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সম্মানের জন্যই। সম্মান প্রদর্শনের অনেক পদ্ধতি রয়েছে। ক্বোরআন-সুন্নাহর মধ্যে সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। যখন যে পরিবেশে যে জিনিষকে সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম ধরা হয়, সে পরিবেশে সে পদ্ধতিতে সম্মান প্রদর্শন করা ক্বোরআন-সুন্নাহ সমর্থিত। এর উদ্দেশ্য হল সম্মান প্রদর্শন করা। মীলাদ শরীফের ক্বিয়াম ক্বোরআন, হাদীস ও প্রখ্যাত ইমামগণের উক্তি দ্বারা প্রমাণিত। ক্বিয়ামের বিপক্ষে বিন্দুমাত্র দলীল ইসলামী শরীয়তে নেই; কিন্তু এক শ্রেণীর ওহাবী মোল্লারা বলে ও লিখে থাকে যে, কোন ইমাম, মুজতাহিদ, সাহাবী, তাবে‘ঈ, নাকি ক্বিয়াম করেননি। আমদের কথা হলো, যারা বলে সাহাবা-ই কেরাম, তাবে‘ঈন, তব‘ই তাবে‘ঈন, সলফে সালেহীন, আ‘ইম্যা-ই মুজতাহিদীন ক্বিয়াম করেননি, তাঁরা কি তাদের যুগে ছিলো? তারা কি তাঁদের সকল কর্মকান্ড স্বচক্ষে দেখেছে? নিশ্চয়ই তারা তখন ছিলো না। তাই তারা দেখেও নি কিসের উপর ভিত্তি করে ইমামগণ ক্বিয়াম করেননি বলে তারা দাবি করে? মীলাদে ক্বিয়াম নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র তা’যীমের জন্য করা হয়। নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র তা’যীম সকল মু’মিনের উপর সদা সর্বদা অপরিহার্য। তাই সাহাবা-ই কেরাম, তাবে‘ঈন, তব‘ই তাবে‘ঈন, আইম্মা-ই মুজতাহিদীনসহ তরীক্বতের সকল ইমামগণ সদাসর্বদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তা’যীমে সচেষ্ট ছিলেন। শরীয়ত ও তরীক্বতের প্রতিটি কাজ তাঁরা নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তা’যীমের আলোকে করেছেন। যুগে যুগে তা’যীম ও সম্মানের ধারা ও ধরণ পরিবর্তন-পরিমার্জন হয়। হুযূর-ই আক্রামের মীলাদে পাকের আয়োজন যেমন তাঁরই সম্মানের বহিঃপ্রকাশ, তেমনিভাবে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি সালাম পেশ করাও তা’যীমেরই বহিঃপ্রকাশ। শরীয়তের পরিভাষায়, কোন কাজ এক দিক দিয়ে বৈধ হলে অন্য দিক দিয়ে অন্য কারণে তা অবৈধ হয়ে যায়। যেমন- নামায ভাল ইবাদত। এর মধ্যে ফরয, সুন্নাত, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব রয়েছে। আবার নামায অন্য কারণে হারামও হয়। যেমন, اوقات منهية যেমন- নিষিদ্ধ সময়সমূহে, যথা-সূর্যোদয়, দ্বি-প্রহর ও সূর্যাস্ত এবং নাপাক অবস্থায় নামায পড়া হারাম।
‘ক্বিয়াম’-এর প্রকারভেদ
জায়েয, ফরয, সুন্নাত, মুস্তাহাব, মাকরূহ ও হারাম।
এক. ক্বিয়াম-ই জায়েয বা মুবাহ্: দুনিয়াবী কোন কাজের জন্য দাঁড়ানো ‘জায়েয-ক্বিয়াম’। যেমন- দাঁড়িয়ে ঘর নির্মাণ করা, দাঁড়িয়ে চলাফেরা করা ইত্যাদি। ক্বোরআন পাকে এরশাদ হয়েছে- فَاِذَا قُضِيَتِ الصَّلٰوةُ فَانْتَشِرُوْا অর্থাৎ ‘জুমু‘আর নামায শেষে যমীনে ছড়িয়ে পড়ো।’ [১১০:১০] আর এ ছড়িয়ে পড়া দন্ডায়মান হওয়া ব্যতীত হতে পারে না। সুতরাং এ ক্বিয়াম বৈধ বা মুবাহ্।
দুই. ক্বিয়াম-ই ফরয: পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ও ওয়াজিব নামাযের মধ্যে ক্বিয়াম করা ফরয। যেমন- ক্বোরআন-ই করীমের এরশাদ- وَقُوْمُوْا لِلهِ قَانِتِيْنَ অর্থাৎ ‘আল্লাহর সম্মুখে আনুগত্য সহকারে দাঁড়িয়ে যাও।’ সুতরাং কেউ দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি বসে নামায পড়ে তাহলে তার নামায বাতিল।
তিন. ক্বিয়াম-ই নফল: নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়া মুস্তাহাব। বসে বসে পড়লেও শুদ্ধ হয়ে যাবে; কিন্তু দাঁড়ানোর মধ্যে সাওয়াব দ্বিগুণ।
চার. ক্বিয়াম-ই সুন্নাত: ইসলাম ধর্মের কোন সম্মানিত বস্তুকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়ানো সুন্নাত। যেমন- মক্কা শরীফের ঝমঝমের পানি পান করার সময় দাঁড়ানো। ওযূ করার পর অবশিষ্ট পানি দাঁড়িয়ে পান করা সুন্নাত।
হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রওযা-ই পাকে হাযির হয়ে নামাযের মতো হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করা সুন্নাত। যেমন- ‘ফতোয়া-ই আলমগীরী: ১ম খন্ড: কিতাবুল হজ্জ্; আদাবু যিয়ারাতি কাবরিন নবীয়্যি’ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে বর্ণিত আছে-
وَيَقِفُ كَمَا يِقِفُ فِى الصَّلٰوةِ وَيُمَثِّلُ صُوْرَتَه҅ الْكَرِيْمَةَ كَاَنَّه نَآئِمٌ فِىْ لَحْدِ يَعْلَمُ بِهٖ وَيَسْمَعُ كَلاَمَه ҅
অর্থাৎ রওযা-ই আক্বদাসের সামনে নামাযের মতো এমন আদবের সাথে দাঁড়াবে এবং অন্তরে হুযূর-ই আক্রামের আকৃতি মুবারক কল্পনা করবে যেন হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম রওযা-ই আক্বদাসে আরাম করছেন এবং তার সম্পর্কে হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জানেন ও তার কথা শুনেন।
ঈমানদার ব্যক্তিদের কবর যিয়ারতের সময় দাঁড়িয়ে কবরকে সামনে রেখে ফাতেহা পাঠ ও দো‘আ করা সুন্নাত। যেমন, ‘ফাত্ওয়া-ই আলমগীরী: বাবু যিয়ারাতি ক্বুবূরিল আম্বিয়া’য় আছে-
يَخْلَعُ نَعْلَيْهِ ثُمَّ يِقِفُ مُسْتَدْبِرَ اَلْقِبْلَةِ مُسْتَقْبِلاً لِوَجْهِ الْمَيِّتِ
অর্থাৎ ‘‘(প্রথমে) যিয়ারতকারী তার পাদুকা দু’টি খুলবে, তারপর ক্বিবলাহকে পিঠ দিয়ে এবং কবরস্থ ব্যক্তির চেহারাকে সামনে রেখে দাঁড়াবো।’’
হুযূর-ই আকরামের রওযা-ই পাক যিয়ারত, ঝমঝমের পানি পান করা, ওযূর অবশিষ্ট পানি পান করা এবং ঈমানদারদের কবর যিয়ারত সবগুলোই ইসলামের দৃষ্টিতে বরকতময় বিষয়। ফলে এগুলোর প্রতি সম্মান দেখিয়ে ক্বিয়াম করা বা দাঁড়ানো শরীয়তের বিধান সাব্যস্থ হলো।
যখন কোন ধর্মীয় পেশ্ওয়ার আগমন হয়, তখন তাঁর জন্য দাঁড়ানো সুন্নাত। এভাবে ওই দ্বীনী পেশ্ওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্নাত; বসে থাকা বেয়াদবি। যেমন হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাহাবা-ই কেরামকে হযরত সা’দ ইবনে মু‘আয রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আগমনে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, قُوْمُوْا اِلٰى سَىيِّدِكُمْ (তোমরা উঠো, তোমাদের সরদারের দিকে এগিয়ে যাও।) এ ক্বিয়ামটা তা’যীমি ক্বিয়াম। যেহেতু, এখানে سَيِّدِكُمْ (তোমাদের সরদার) বলে তা’যীমের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। অন্য কোন ওযরের কারণে যদি দাঁড়ানোর কথা আসত তাহলে- سَيِّدِكُمْ বলতেন না; ঘোড়া থেকে তাকে নামিয়ে আনার জন্য দু’/একজন সাহাবী যথেষ্ট হতো। সবাইকে যখন হুকুম দিলেন দাঁড়ানোর জন্য এবং سَيِّدِكُمْও বলেছেন, তখন বুঝা গেল যে, এ ক্বিয়াম ‘তা’যীমী ক্বিয়াম। সুতরাং এ ক্বিয়াম এমদাদ বা সাহায্য করার ক্বিয়াম নয়। আর যদি امداد বা সাহায্য করার জন্য ক্বিয়াম হতো তাহলে اِذَا قُمْتُمْ اِلٰى الصَّلٰوةِ -এর যে মধ্যে ক্বিয়ামটার কথা এরশাদ হয়েছে, তা নামাযের সাহায্যের জন্য হতো; কিন্তু নামাযের সাহায্যের প্রয়োজন নেই; যেহেতু, নামায রোগী নয়; বরং নামাযের সম্মানের জন্য কথাটা বলা হয়েছে।
তাছাড়া, ‘মিশকাত শরীফ, বাবুল ক্বিয়াম’-এ আছে হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত-
فَاِذَا قَامَ قُمْنَا قِيَامًا حَتّى نَرَاهُ قَدْ دَخَلَ بَعْضَ بُيُوْتِ اَزْوَاجِهٖ
অর্থাৎ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন কোন মজলিসে দাঁড়াতেন, তখন আমরাও তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতাম, যতক্ষণ না তিনি কোন বিবি সাহেবার হুজুরায় প্রবেশ করতেন।
র্দুরে মুখতার ৫ম খন্ড, বাবুল ইসতেবরায় বর্ণিত আছে-
يَجُوْزُ بَلْ يَنْدُبُ الْقِيَامُ تَعْظِيْمًا لِلْقَادِمِ يَجُوْزُ الْقِيَامُ وَلَوْلِلْقَارِىْ بَيْنَ يَدَىِ الْعَالِمِ
অর্থাৎ কোন আগমনকারীর সম্মানার্থে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এমনকি কোন ক্বোরআন তেলওয়াতকারীর সম্মুখে কোন সঠিক সুন্নি আক্বিদাসম্পন্ন আলেমে দ্বীন আসলে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়ানো মুস্তাহাব তথা জায়েয।
রদ্দুল মুহতার (ফতাওয়া-ই শামী), ১ম খন্ড, বাবুল ইমামত-এ আছে, যদি কেউ মসজিদের প্রথম সারিতে বসে জামা‘আতের অপেক্ষা করে, এমতাবস্থায় যদি কোন সুন্নী আলেম আসেন, তবে তাঁর জন্য স্থান ত্যাগ করে পেছনে চলে আসা মুস্তাহাব। কেননা, তাঁর জন্য প্রথম সারিতে নামায পড়ার চেয়ে এ সুন্নী আলিমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন উত্তম। যেমন হযরত আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নামাযরত অবস্থায় জায়নামায হতে ইমামতি ত্যাগ করে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে পেছনে সরে আসেন। ‘মুসলিম শরীফ, ২য় খন্ড’ বাবূ হাদীসি তাওবাতি ইবনে মালেক’-এর মধ্যে আছে-
فَقَامَ طَلْحَةُ بْنُ عُبَيْدِ اللهِ يُهَرَوِلُ حَتّى صَافَحَنِىْ وَهَنَّأَنِىْ
অর্থাৎ হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ্ দাঁড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে মুসাফাহা করলেন এবং আমাকে মুবারকবাদ দিলেন। ইমাম নববী বলেন,
فِيْهِ اِسْتِحْبَابُ مُصَافَحَةِ الْقَادِمِ وَالْقِيَامِ لَه اِكْرَامًا اِلى لِقَآئِه
অর্থাৎ আগমনকারীর জন্য মুসাফাহা করা তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়ানো এবং সাক্ষাতের জন্য একটু দ্রুত যাওয়া মুস্তাহাব।
মিরক্বাত শরহে মিশকাত بَابُ الْمَشْىِ بِالْجَنَازَةِ -এর মধ্যে ২য় অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, وَفِيْهِ اِيْمَاءٌ اِلى نُدُبِ الْقِيَامِ لِتَعْظِىْمِ الْفُضَلآءِ الْكُبَرَآءِ অর্থাৎ এতে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, কোন সম্মানিত ব্যক্তির জন্য তা’যীমী ক্বিয়াম মুস্তাহাব।
সাহাবা-ই কেরাম তথা সলফে সালেহীন থেকে এ সুন্নাত বা প্রথা চালু আছে যে, কোন সুসংবাদ শুনলে তাঁরা দাঁড়িয়ে যেতেন। হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘আমাকে হযরত আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু একটি সুসংবাদ শুনালেন, তখন- فَقُمْتُ اِلَيْهِ وَقُلْتُ بِاَبِىْ اَنْتَ وَاُمِّىْ اَنْتَ اَحَقُّ بِهَا অর্থাৎ আমি তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে গিয়ে বললাম, ‘‘আপনার উপর আমার পিতামাতা ক্বোরবান! এ সুসংবাদের আপনিই উপযুক্ত।’’
পাঁচ. ক্বিয়াম-ই মাকরূহ: তা হলো ঝমঝম শরীফের ও ওযূর অবশিষ্ট পানি ব্যতীত অন্য কোন পানি দাঁড়িয়ে পান করা এবং কোন দুনিয়াবী সম্মানের জন্য দন্ডায়মান হওয়া (দুনিয়ার লালসায় দাঁড়ানো) মাকরূহ। হ্যাঁ, যদি কোন ওযর থাকে তখন মাকরূহ হবে না। যেমন, ফাতাওয়া-ই আলমগীরী: كِتَابُ الْكَرَاهِيَّةِ (কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)-এর মধ্যে আছে- وَاِنْ قَامَ لَه مِنْ غَيْرِ اَنْ يَّنْوِىَ شَيْئًا مِمَّا ذَكَرْنَا اَوْ قَامَ طَمْعًا لِغِنِاهُ অর্থাৎ আর যদি কেউ আমাদের উল্লিখিত বিষয়াদি থেকে কোন একটার নিয়্যত করা ছাড়া অথবা তার ধনী হবার কারণে দাঁড়ানো মাকরূহ।
ছয়. ক্বিয়াম-ই হারাম: আর তা হলো- যে ব্যক্তি চায় যে, তাকে সম্মান করা হোক, তার জন্য দাঁড়ানো হারাম। তাছাড়া, মূর্তির তা’যীমের জন্য দন্ডায়মান হওয়াও হারাম।
পর্যালোচনা
উপরোল্লিখিত ক্বিয়ামসমূহের মধ্যে চতুর্থ প্রকারের ক্বিয়াম সাহাবা-ই কেরাম ও সলফে সালেহীনের সুন্নাত হিসেবে সাব্যস্ত। অর্থাৎ কোন সুসংবাদ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দন্ডায়মান হওয়া সাহাবা-ই কেরাম ও সলফে সালেহীনের সুন্নাত সাব্যস্ত হয়েছে। সে অনুপাতে মিলাদ শরীফে হুযূর-ই আক্রামের বেলাদত পাকের আলোচনা করার পর এ সুসংবাদ শুনার সাথে সাথে ক্বিয়াম করা সাহাবা ও সলফে সালেহীনের সুন্নাত হিসাবে সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা, হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বেলাদত শরীফের সুসংবাদ হতে বড় সুসংবাদ আর কি হতে পারে? পাশাপাশি কোন দ্বীনি সম্মানিত বস্তুর সম্মানের জন্য ক্বিয়াম করার কথাও উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ঝমঝম শরীফের পানি, ওযূর অবশিষ্ট পানি পান করার সময় দন্ডায়মান হয়ে পান করা। অনুরূপ, হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মীলাদে পাকের আলোচনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর চেয়ে বেশি খুশির খবর আর কি হতে পারে? আর খুশির সংবাদ শুনার সাথে সাথে ক্বিয়াম করা সুন্নাত। হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হতে মুসলমানের নিকট অধিকতর প্রিয় কি হতে পারে? তাঁর শুভ বেলাদতের সময় ফেরেশতারা দন্ডায়মান ছিলেন। সেই ফেরেশতাদের সম্মানসূচক ক্বিয়ামের মতো আমরাও বেলাদতে পাকের কথা স্মরণ করে ক্বিয়াম করি এবং ফেরেশতাদের সুন্নাতটুকু পালন করি। উপরন্তু হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের গুণাবলী ও বংশের বিবরণ (যা মীলাদ শরীফে বর্ণনা করা হয়), মিম্বর শরীফের উপর দাঁড়িয়ে বর্ণনা করেছেন। [মিশকাত, বাবু ফাযা-ইলি সাইয়্যিদিল মুরসালীন] ইসলামী শরীয়তের মধ্যেও এ ক্বিয়ামের বিপক্ষে কোন বর্ণনা নেই। পৃথিবীর সকল দেশের সুন্নী মুসলমানরা সাওয়াব মনে করে ক্বিয়াম করেন, হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে।
হাদীসে পাকে রয়েছে-
مَارَاهُ الْمُسْلِمُوْنَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللهِ حَسَنٌ وَلاَ تَجْتَمِعُ اُمَّتِىْ عَلَى الضَّلاَلَةِ
অর্থাৎ (সুন্নী) মুসলমানেরা, যা উত্তম মনে করে তা আল্লাহর নিকটও উত্তম হিসেবে সাব্যস্ত এবং আমার উম্মত কোন গোমরাহীর উপর একমত হবে না।
[মিরক্বাত, বাবুল ই’তিসাম] এখানে মুসলমান ও উম্মত বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত-এর অনুসারী সুন্নী মুসলমানদের কথা বুঝানো হয়েছে। র্দুরুল মুখতার, ২য় খন্ড, কিতাবুল ওয়াক্বফ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
لِاَنَّ التَّعَامُلَ يُتْرَكُ بِهِ الْقِيَاسُ لِحَدِيْثِ مَا رَاهُ الْمُسْلِمُوْنَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللهِ حَسَنٌ
অর্থাৎ মুসলমানের কর্মকান্ড যদি শরীয়ত বিরোধী না হয়, তবে প্রচলনটা শরীয়তের অংশ হিসেবে গণ্য হবে এবং এটা দ্বারা قيَاس (ক্বিয়াস)কে বর্জন করা যাবে উক্ত হাদীসের আলোকে। তাই সাধারণ সুন্নী মুসলমানরা যখন ‘মীলাদের ক্বিয়াম’কে জায়েয এবং মুস্তাহাব মনে করছেন, তখন উক্ত হাদীসের আলোকে এটাও মুস্তাহাব হিসেবে স্যাবস্ত হয়েছে। আর হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তা’যীমের ব্যাপারে- تُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ বলে স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশ আছে। যেখানে কোন সময় বা স্থানের নির্দিষ্টতা নেই, তখন সাধারণ ব্যাপকতার মাধ্যমে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তা’যীমের জন্য যত পদ্ধতি হতে পারে সব ক’টিই উক্ত আয়াতাংশে শামিল আছে। এ অনুপাতে ‘এ ‘মীলাদের ক্বিয়াম’ সম্পর্কে বিশ্বের বিজ্ঞ ওলামা-ই কেরামগণ জায়েয এবং মুস্তাহ্সান হওয়ার ফাত্ওয়া দিয়েছেন।
এছাড়া, পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি-এর পিতা শাহ্ আবদুর রহিম দেহলভী (ওফাত ১২৮৮হি.) তাঁর কিতাব- رَوْضَةُ النَّعِيْمِ فِىْ ذِكْرِ النَّبِىِّ الْكَرِيْمِ (রাওদ্বাতিন না‘ঈম ফী- যিক্রিন নাবিয়্যিল করীম)-এর মধ্যে মক্কা মুকাররমার ৪২ জন মুফতীর ফতোয়া, মদীনা মুনাওয়ারার ৩০ জন, জিদ্দার ২০ জন, হাদীদার ১২ জন মুফতীর ফতোয়াসমূহ উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হল যে, যারা মীলাদে পাক ও ক্বিয়াম-ই তা’যীমী অস্বীকার করবে তারা মূলত বদ-আক্বিদা তথা খারেজী। সেখানে শরীয়তের হাকিমদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন এ ক্বিয়াম বিরোধী বিদ‘আতীদের শাস্তি প্রদান করা হয় নবীর তা’যীমের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে। [আন্ওয়ার-ই আফতাবে সাদক্বাত, পৃ.৩৩৮] উপরোল্লিখিত বিশ্ব বরেণ্য ওলামা-ই কেরামের ফাত্ওয়ার মাধ্যমে মীলাদে পাকের মধ্যে ক্বিয়াম ‘মুস্তাহসান’ ও ‘মুস্তাহাব’ সাব্যস্ত হল, বিদ‘আত নয়। আর যদি বিদ‘আত বলে ইনকার করে, তখন এ বিদ‘আতীদের বিদ্‘আতের খন্ডনে সুন্নী মুসলমানদের উপর ‘মীলাদ-ক্বিয়াম’ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন শায়খ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহ্ইয়াহ্ মুফতী হাম্বলী (মক্কা মুকাররমা) বলেন-
يَجِبُ الْقِيَامُ عِنْدَ ذِكْرِ وِلاَدَتِهٖ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا اِسْتَحْسَنَ عُلَمَآءُ الْعَالَمِ وَقُدْوَةُ الدِّيْنِ وَالْاِسْلاَمِ فَذَكَرُوْا عِنْدَ وِلاَدَتِه يَجِبُ الْقِيَامِ لِلتَّعْظِيْمِ
অর্থাৎ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বেলাদত শরীফের আলোচনার সময় ক্বিয়াম করা ওয়াজিব, যখন বিশ্বের আলিমগণ, দ্বীন ইসলামের পেশওয়াগণ সেটাকে ‘মুস্তাহ্সান’ তথা উত্তম ও সওয়াবের কাজ বলেছেন। সুতরাং হুযূর-ই আক্রামের মীলাদের আলোচনার সময় ক্বিয়াম করাকে তারা তা’যীমের জন্য ওয়াজিব বলে উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং সাধারণত সুন্নী মুসলমানগণ মীলাদ পাঠান্তে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে ক্বিয়ামের মাধ্যমে সালাম পেশ করে। এটাই মুস্তাহ্সান। আর যখন ওই পরিবেশে ক্বিয়ামের কোন বিরুদ্ধাচরণকারী বিরোধিতা ও অস্বীকার করবে এবং বিদ্‘আত বলে ফাত্ওয়া দেবে, তখনই ওই অবস্থায় সুন্নী মুসলমানের জন্য ক্বিয়াম করা ওয়াজিব। যেমন কোন মুস্তাহাব কাজকে যদি অস্বীকার করা হয়, তখন তা ওয়াজিবে পরিণত হয়। যথা উসূলে ফিক্বহ্র একটি নীতিমালা ও ধারা আছে যে, يَتَبَدَّلُ الْحُكْمُ بِتَبَدُّلِ الزَّمَانِ অর্থাৎ স্থান ও কালের পরিবর্তনের ফলে হুকুমের ধারারও পরিবর্তন হয়।