ক্বোরআনুল কারীম ও হাদীস শরীফের আলোকে রিসালত ও দ্বীন-প্রচার

ক্বোরআনুল কারীম ও হাদীস শরীফের আলোকে রিসালত ও দ্বীন-প্রচার

ক্বোরআনুল কারীম ও হাদীস শরীফের আলোকে রিসালত ও দ্বীন-প্রচার

ড. মাওলানা মুহাম্মদ লিয়াকত আলী
সকল প্রশংসা আল্লাহ্ পাকের জন্য, যিনি মানব জাতির হেদায়াতের জন্য পৃথিবীতে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেন। রাহ্মাতুললিল্ আলামীন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দুরূদ ও সালাম। আহ্লে বায়ত, সাহাবী, তাবি‘ঈন, তব‘ই তাবি‘ঈন, মুজ্তাহিদীন, সাল্ফ-ই সালিহীন ও বুযর্গানে দ্বীন-এর প্রতি রহ্মত বর্ষিত হোক, যাঁদের ত্যাগ, পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়।
সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে তাঁর নির্দেশিত পথে পরিচালনা করার জন্য যুগে যুগে তাঁর মনোনীত অগণিত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, اَللهُ يَصْطَفِىْ مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَمِنَ النَّاسِ“আল্লাহ্ ফিরিশতা ও মানব থেকে রাসূলদের মনোনীত করেন।”
সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালত ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তিনি আল্লাহর পথে সর্বশ্রেষ্ঠ দাওয়াতদাতা। এ নিবন্ধে আমি রসূগণের রিসালত এবং তাঁদের দ্বীন প্রচার সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাচ্ছি।
।। এক।।
রিসালত পরিচিতি
‘রিসালত’ আরবী (ر س ل)রা, সীন, লাম থেকে উদ্গত। এটিاسم مصدر একবচন, বহুবচনেاَلرَّسَائِلُ বা اَلرِّسَالَاتُ (রিসালত বা রাসাইল) আভিধানিক অর্থে ‘রিসালাত’ হল বার্তাবহন বা দৌত্যকার্য, চিঠি, পত্র, বার্তা, সন্দর্ভ, থিসিস, পুস্তিকা, মিশন, কর্তব্য, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, রিসালত, সম্বোধন, কিতাব, লিখিত সহীফা, লিখিত বিষয়বস্তু বা মাকতূব এবং বক্তব্য, যা কোন ব্যক্তি অন্যের নিকট প্রাপ্ত হয়ে বহন করে নিয়ে আসে, চাই সেটা লিখিত হোক অথবা অলিখিত প্রভৃতি। সাধারণ অর্র্থে, যা কিছু প্রেরণ করা হয়, তাকেই আমরা রিসালাত বলে জানি। ইংরেজীতে একে গবংংধমব, খবঃঃবৎ, ঘড়ঃব, উরংঢ়ধঃপয, ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ বলা হয়।
ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের হিদায়াতের জন্য তাদের মধ্য হতে মনোনীত নবী-রাসূল-এর মাধ্যমে যে সব বাণী পাঠিয়েছেন তা রিসালাত। আর যাঁরা এর ধারক-বাহক তাঁরা হলেন সম্মানিত রাসূল। আল্লাহ্ তা‘আলা একান্ত ইচ্ছায় তাঁদের মনোনয়ন দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ “নিশ্চয় তাঁরা ছিলেন আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।”
আল্লামা নাসাফী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, هِىَ سَفَارَةُ العَبْدِ بَيْنَ اللهِ وَ بَيْنَ ذَوِى الْألْبَابِ مِنْ خَلِيْقَتِه “রিসালাত হল আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর সৃষ্টিকুলের জ্ঞানীদের মধ্যে কোন বান্দার মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করা।”
অতএব, আল্লাহ তা‘আলা যাঁদের মনোনীত করেন তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও গুণাবলী জন্মগতভাবে ও স্বভাবগতভাবে সৃষ্টি করে দেন। মক্কার কাফিররা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাতকে অস্বীকার করলে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ “আল্লাহ্ তাঁর রিসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন।”
ইমাম আবূ জা’ফর ত্বাহাভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন,
إنَّ الرِّسَالَةَ هِىَ أنْ يَّجْعَلَ اللهُ مِنْ عِبَادِهِ الْمُخْلِصِيْنَ الصَّالِحِيْنَ
نَبِيًّا ثُمَّ نَبَّأهُ بِخَبَرِ السَّمَاءِ ثُمَّ أمَرَهُ أنْ يُّبَلِّغَ غَيْرَهُ.
“আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদের থেকে কাউকে নবী নির্বাচিত করার পর তাঁকে আসমানী সংবাদ প্রেরণ করে তা অন্যদের নিকট পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রদানকে রিসালাত বলে।”
ইমাম রাগিব ইস্ফাহানী বলেন,
اَلرِّسَالَةُ هِىَ أنْ يَّبْعَثَ اللهُ الرَّسُوْلَ بِشَرْعٍ يَعْمَلُ بِهٖ وَيُبَلِّغُهٗ
“রিসালাত হল, আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক শরী‘আত সহকারে রসূল প্রেরণ করা, যা তিনি পালন করেন এবং এর প্রচার করে থাকেন।”
এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে,
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ
بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
“আমি সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী করে রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
ক্বোরআনুল করীমের আলোকে নবীকুল সরদার হযরত
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাত
ইসলাম আল্লাহ্র নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম। আল্লাহ্ তা‘আলা এর প্রবর্তন, প্রচার-প্রসারের নিমিত্তে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِه
وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ
“তিনি ওই সত্ত্বা, যিনি উম্মী লোকদের মধ্যে এক রাসূল প্রেরণ করেছেন, যেন তাদেরকে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।”
সুতরাং আয়াতসমূহের তেলাওয়াত, আত্মার পরিশুদ্ধি, কিতাবুল্লাহ্ তথা ক্বোরআনের শিক্ষাদান, বিধি-বিধানের ব্যাখ্যা, উন্নত নৈতিকতা ও চরিত্র শিক্ষাদানের জন্য হুযূর-ই আক্রামের শুভাগমন হয়েছিলো। তাঁর আগমনের প্রাক্কালে আরবের লোকেরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমে তাদেরকে ধ্বংস থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আল্লাহ্ ইরশাদ করেন,
وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَآءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
তরজমা: এবং তোমাদের উপর অবতীর্ণ নি’মাতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নি’মাত দ্বারা পরস্পর ভাই হয়ে গেছো। আর তোমরা ছিলে দোযখের গর্তের তীরে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ্ এভাবে তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা সঠিকপথের দিশা পাও। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]
হাদীসের আলোকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাত
আল্লাহ্র উপর ঈমান আনার সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিও ঈমান আনার মধ্য দিয়ে ঈমান পূর্ণ হয়।
হাদীস শরীফে আছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ” بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَان.
“হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটিঃ ১. একথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং নিশ্চয় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল, ২. সালাত ক্বায়েম করা, ৩. যাকাত দেয়া, ৪. হজ করা এবং ৫. রমযানের রোযা রাখা।”
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.
“হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে কেউ মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশী প্রিয় না হই।”
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، أَنَّهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ النَّارَ.
“হযরত ওবাদাহ্ ইবনে সামিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এ মর্মে সাক্ষ্য দিল যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল, আল্লাহ্ তাঁর জন্যে দোযখের আগুন হারাম করে দিয়েছেন।”
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَلَا يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ، وَمَاتَ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ.
“হযরত আবূ হুরায়রাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেন, ওই মহান আল্লাহ্র শপথ, যাঁর ক্বুদরতের মুঠোর মধ্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাণ, এ উম্মতের মধ্যে যে আমার সম্পর্কে শুনতে ও জানতে পারবে। সে ইয়াহুদী হোক বা নাসারা হোক, আর আমি যে দীনসহ প্রেরিত হয়েছি তার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুমুখে পতিত হবে সে নিশ্চয় জাহান্নামবাসী হবে।”
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ.
“হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত বিধানের অনুগত হয়।”
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” لَا تَسْأَلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ عَنْ شَيْءٍ، فَإِنَّهُمْ لَنْ يَهْدُوكُمْ، وَقَدْ ضَلُّوا، فَإِنَّكُمْ إِمَّا أَنْ تُصَدِّقُوا بِبَاطِلٍ، أَوْ تُكَذِّبُوا بِحَقٍّ، فَإِنَّه لَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ، مَا حَلَّ لَهُ إِلَّا أَنْ يَتَّبِعَنِي
এ হাদীসের শেষাংশে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি মূসা আলায়হিস্ সালামও জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ ব্যতীত তাঁর উপায় থাকতোনা।”
عَنْ رَبَاحِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حُوَيْطَبٍ يَقُولُ: حَدَّثَتْنِي جَدَّتِي، أَنَّها سَمِعَتْ أَبَاهَا يَقُولُ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَا وُضُوءَ لَهُ، وَلَا وُضُوءَ لِمَنْ لَمْ يَذْكُرِ اللهَ تَعَالَى، وَلَا يُؤْمِنُ بِاللهِ مَنْ لَمْ يُؤْمِنْ بِي، وَلَا يُؤْمِنُ بِي مَنْ لَا يُحِبُّ الْأَنْصَارَ.
“হযরত রাবাহ্ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে হুওয়াইত্বাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার দাদী তাঁর পিতা থেকে আমাকে বলেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যার ওযূ নেই তার সালাত নেই। আর যে আল্লাহ্র স্মরণ করে না (বিসমিল্লাহ্ পড়ে ওযূ করেনা) তার ওযূ হয় না এবং যে কেউ আল্লাহর উপর ঈমান আনে না সে আমার উপর ঈমান আনে না এবং যে ব্যক্তি আনাসার-কে ভালবাসে না, সে আমার উপর ঈমান আনে না। ”
হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাতের বৈশিষ্ট্যসমূহ
হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালত ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাঁর রিসালত পূর্ণাঙ্গ ও সর্বকালের সব মানুষের জন্য। তিনি যুগোপযোগী হিদায়তকারীরূপে আবির্ভূত হন।
হাদীসের আলোকে হুযূর-ই আকরামের রিসালাতের বৈশিষ্ট্যসমূহ নি¤œরূপঃ
১. সার্বজনীন
হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বিশেষ সময় ও বিশেষ অঞ্চলের জন্য প্রেরিত হন নি; তিনি সমগ্র জাহানের কল্যাণরূপে আবির্ভূত হন। পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূল কোন বিশেষ অঞ্চল বা বিশেষ গোত্রের প্রতি প্রেরিত হতেন; কিন্তু ইনি বিশ্ববাসীর জন্য সর্বশেষ রাসূল। তাঁর রিসালাত পূর্ণাঙ্গ, চূড়ান্ত, সার্বজনীন ও ব্যাপক। আবদুল হামীদ আস্ সুনহাজী বলেন,
وَجَعَلَ رِسَالَتَهُ الرِّسَالَةَ الْعَامَّةَ لِلْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالْمَلَائِكَةِ
“তাঁর রিসালাত জিন্, মানব ও ফিরিশ্তাকুলের জন্যو যা সার্বজনীন ছিল।”
২. সত্যের সাক্ষ্যদাতা
সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করা মানুষের ফিতরাত বা স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যের বাস্তব নমুনার মূর্ত প্রতীক ও সাক্ষ্যদাতা হয়ে প্রেরিত হন।
৩. আল্লাহর পথে আহ্বানকারী
রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কুফরী ও শিরকের ঘোর অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথে এনেছেন। পথভ্রষ্ট মানুষকে হিদায়তের পথ দেখিয়েছেন। সারাজীবন দ্বীনী দাওয়াত প্রদান করেছেন। তাঁর এ কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য মুসলামানদেরকে বলেছেন, بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً “একটি আয়াত হলেও আমার পক্ষ থেকে (অন্যের নিকট) পৌঁছিয়ে দাও।”
৪. সুসংবাদদাতা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেহেস্তের সুসংবাদদাতারূপে প্রেরিত হয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
يَسِّرُوا وَلاَ تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا، وَلاَ تُنَفِّرُوا ‘‘সহজপন্থা দেখাও, কঠিন করো না, তোমরা সুসংবাদ দাও, তাড়িয়ে দিওনা। ”
৫. ভীতি প্রদর্শনকারী
আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে দোযখের ভীতিপ্রদর্শকরূপে প্রেরণ করেছেন। তিনি মানুষকে আল্লাহ্র শাস্তির ভয়ের বর্ণনা দিতেন। সহীহ মুসলিম শরীফে এ মর্মে হযরত আবূ হোরায়রাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ আয়াতটি নাযিল হয়, তখন তিনি ক্বোরাঈশের সকল শাখা গোত্রকে একত্রিত করে প্রত্যেক গোত্রের নাম ধরে বলতে লাগলেন, হে বনী কা’ব ইবনে লুয়াই, তোমরা নিজকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। এভাবে তিনি র্মুরাহ্ ইবনে কা’ব, আবদে শামস, আবদে মুনাফ, হাশেম, বনী আবদুল মুত্তালিবের লোকদেরকেও সমভাবে আহ্বান জানান। এমনকি আপন কন্যা ফাত্বিমাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকেও একইভাবে সম্বোধন করেন এবং পরকালে নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমান না আনলে তাঁর রক্তের সম্পর্কের হওয়া কোন কাজে আসবে না মর্মে সাবধান করে দিয়েছিলেন।”
৬. আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধিকরণ
দেহ ও হৃদয় উভয়ের সমন্বয়ে একজন মানব। তাই মানুষের দেহের যেমনি চাহিদা রয়েছে, তেমনি হৃদয় এবং আত্মারও চাহিদা রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে বিভিন্ন উপায় উপকরণ অবলম্বন পূর্বক তাদের আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত এটা রিসালাতের দায়িত্ব। তিনি বলেন,
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ لَمُضْغَةً، إِذَا صَلُحَتْ، صَلُحَ الْجَسَدُ كُلُّه، وَإِذَا فَسَدَتْ، فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ.
“নিশ্চয় মানুষের শরীরে গোশতের টুকরা আছে, যা ভাল হলে সারা শরীর ভাল থাকে; আর যা নষ্ট হলে সারা শরীর নষ্ট হয়ে যায়। সাবধান আর এটা হল ক্বাল্ব বা হৃদয়।”
উল্লেখ্য, রসূল-ই করীম’ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর রিসালতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন। বিদায় হজ্বের সময় আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দ্বী-নাকুম…আল-আয়াত। অর্থাৎ আমি আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি…। [সূরা মা-ইদাহ্, আয়াত নম্বর-৩] বিদায়হজ্বের এ বিশাল জমায়েতে আল্লাহর হাবীব ও তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন মর্মে স্বীকারোক্তি নিয়েছেন সমস্ত সাহাবী থেকে। আলহামদুলিল্লাহ্ আজ আমাদের রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ দ্বীন ও উভয় জাহানের সাফল্যের সঠিক দিক-নির্দেশনা লাভ করেছি।
আল্লাহ্ তা‘আলা প্রেরিত সকল নবী-রাসূল রিসালতের মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালত ছিল সার্বজনীন। তাঁর আগমনে যুল্ম-অত্যাচার, অন্যায়-অপরাধ, স্বেচ্ছাচার-নিপীড়ন, কুফর-শিরক ও মুর্খতা দূরীভূত হয়ে ন্যায় ও সুবিচার, আনুগত্য ও ইবাদত, বিনয় ও ন¤্রতা এবং তাওহীদ ও রিসালত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তাই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
—০—
।। দুই।।
দ্বীন প্রচার-এর পরিচিতি
দ্বীন-প্রচার শব্দটার আরবী তাবলীগ (تبليغ)-এর আভিধানিক অর্থ প্রচার, ঘোষণা, দ্বীনী দা’ওয়াত ইত্যাদি। আর (دين) দ্বীন অর্থ হচ্ছে ধর্ম, ধার্মিকতা, ধর্মবিশ্বাস, প্রথা, বিচার, প্রতিদান, আনুগত্য ইত্যাদি।
পারিভাষায় এর অর্থ আরো ব্যাপক। যে প্রচার ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির গৃহীত পদ্ধতিতে করা হয়ে থাকে, তাই দ্বীন প্রচার (তাবলীগ)। এ প্রচারে ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হয়। এ’তে মেনে নেয়া এবং তাদের বাস্তব জীবনে চর্চার ব্যবস্থা করার পদ্ধতিগত সকল প্রচেষ্টা ও কার্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে। ‘তাবলীগে দ্বীন’ কুরআন ও সুন্নাহ্য় একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একে দ্বীনী দা’ওয়াত এবং দা’ওয়াতে খায়রও বলা হয়। আধুনিক অভিধানগুলোতে ধর্মীয় বা কোন ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জন সম্পর্কিত প্রচার প্রচারণা অর্থে ‘দা’ওয়াহ্’ শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়। যেমন-
ঞযব ঐধহং বিযৎ উরপঃরড়হধৎু ড়ভ গড়ফবৎহ ডৎরঃঃবহ অৎধনরপ-এ দা’ওয়াহ্ শব্দের অর্থ লিখা হয়েছে গরংংরড়হধৎু ধপঃরারঃু, গরংংরড়হধৎু ড়িৎশ, ঢ়ৎড়ঢ়ধমধহফধ.
তাই দা’ওয়াহ্ যে কোন পথ, মত বা বিষয়ে হতে পারে। কোন বিষয় গ্রহণে অনুপ্রাণিত করার অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। বিষয়টি ভাল বা মন্দ হতে পারে। ক্বোরআন মজীদে ‘দা’ওয়াহ্’ শব্দের এ ধরনের ব্যবহার হয়েছে। যেমন-
وَيَا قَوْمِ مَا لِي أَدْعُوكُمْ إِلَى النَّجَاةِ وَتَدْعُونَنِي إِلَى النَّارِ “হে আমার সম্প্রদায়, ব্যাপার কি, আমি তোমাদেরকে দা’ওয়াত দেই মুক্তির দিকে, অথচ তোমরা আমাকে দা’ওয়াত দিচ্ছ দোযখের দিকে।”
দ্বীনী দা‘ওয়াত সম্পর্কিত হাদীস শরীফ
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ্রبَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً، وَحَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلاَ حَرَجَ، وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও প্রচার কর। বনী ইসরাঈল সম্পর্কে আলোচনা কর, এতে কোন দোষ নেই। যে আমার প্রতি স্বেচ্ছায় মিথ্যা আরোপ করে, তার চিরস্থায়ী ঠিকানা জাহান্নামে তালাশ করা উচিত।”
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ،قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَ، فَرُبَّ مُبَلِّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ.
“হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস‘ঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ তা‘আলা সে ব্যক্তির চেহারাকে সজীব রাখুন যে আমার কোন হাদীস শুনেছে এবং যেভাবে শুনেছে তা অপরের নিকট পৌঁছিয়েছে। কেননা, অনেক সময় যাকে পৌঁছানো হয়, সে ব্যক্তি শ্রোতা অপেক্ষা অধিক রক্ষণাবেক্ষণকারী বা জ্ঞানী হয়ে থাকে।”
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ اليَمَانِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلاَ يُسْتَجَابُ لَكُمْ.
“হযরত হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি আল্লাহ্র শপথ করে বলছি, যার ক্বুদরতের মুঠোয় আমার প্রাণ। অবশ্যই তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দেবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ হতে লোককে বিরত রাখবে; নতুবা তোমাদের উপর শীঘ্রই আল্লাহ্র আযাব নাযিল হবে। অতঃপর তোমরা (তা হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে) দো‘আ করতে থাকবে; কিন্তু তোমাদের দো‘আ ক্ববূল হবে না।”
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ نِالْخُدْرِيِّ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ رَا ٰى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ.
“হযরত আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে দেখে, তাহলে সে যেন হাত দিয়ে তা ঠেকায়। আর যদি তার সে শক্তি না থাকে, তাহলে যেন মৌখিকভাবে বারণ করে। যদি এতেও অপরাগ হয়, যেন অন্তরে অন্তরে এ কাজকে ঘৃণা করে। তবে অন্তরের ঘৃণা পোষণ দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।”
عَنْ جَرِيرٍ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَا مِنْ رَجُلٍ يَكُونُ فِي قَوْمٍ يَعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي، يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّرُوا عَلَيْهِ، فَلَا يُغَيِّرُوا، إِلَّا أَصَابَهُمُ اللَّهُ بِعَذَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَمُوتُوا ـ
“হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে জাতির মধ্যে কোন ব্যক্তি পাপ কার্যে লিপ্ত হয়, সে জাতির লোকের শক্তি থাকা সত্ত্বেও তা বারণ করে না, আল্লাহ্ সে জাতির উপর মৃত্যুর পূর্বে ভয়াবহ আযাব দেবেন।”
দ্বীন প্রচারের বিষয়বস্তু
দ্বীন প্রচারের বিষয়বস্তু হল পরিপূর্ণ জীবন বিধান-‘দ্বীন ইসলাম’। ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা ব্যাপক। তবে তার মৌলিক বিষয়সমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়ঃ ক. আক্বীদাহ্, খ. শারী‘আহ্, গ. আখ্লাক্ব।
দ্বীন প্রচারে উপস্থাপন কৌশল
মানুষের মাঝে কিছু গ্রহণের তিনটি উপাদান আছে, যেগুলো দ্বারা মানুষ নিয়ন্ত্রিত। উপাদানগুলো হলঃ ক. হৃদয়ানুভূতি, খ. বুদ্ধি ও গ. ইন্দ্রিয়ানুভূতি।
ক. হৃদয়ানুভূতির নিকট গ্রহণীয় উপস্থাপন
মানুষের হৃদয় ও অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করে এমন উপস্থাপনের নিয়ম হলোঃ
১. দা‘ঈ কর্তৃক মাদ‘ঊর প্রশংসা করা, ২. দা‘ঈ কর্তৃক মাদ‘ঊকে তিরস্কার করা,
৩. আল্লাহ্র নিয়ামতসমূহ উল্লেখ করা, ৪. আবেগ উদ্দীপক জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান করা, ৫. উৎসাহ প্রদান ও ভীতি প্রদর্শন। অর্থাৎ আখিরাতে জান্নাতের আরাম-আয়েশ ও দোযখের কঠিন শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, ৬. আল্লাহ্র সাহায্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দেয়া, ৭. আবেগকে জাগিয়ে তোলার সঠিক কিস্সা-কাহিনী বলা, ৮. দা‘ওয়াতকৃত ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি, দয়া প্রদর্শন ও বিপদ-আপদে দেখা-শুনা করা, ৯. মাদ‘উর অভাব মোচনে সাহায্য করা এবং সেবা যতœ করা, ১০. নাম নিয়ে সম্বোধন করা, ১১. উপমা বা উদাহরণ দেয়া, ১২. পরামর্শ চাওয়া, ১৩. নসীহত সুলভ বক্তব্য রাখা, ১৪. ক্ষেত্রবিশেষে বিষয়বস্তুর কিছু উল্লেখ করা, কিছু উহ্য রাখা, ১৫. বক্তব্য সংক্ষেপে বলা, ১৬. কোন প্রশ্নের একাধিক উত্তরের মাঝে অধিক কল্যাণকর দিক উল্লেখ করা, ১৭. প্রয়োজনে আল্লাহ্র শপথ করা, ১৮. সম্মান, ইয্যাত প্রদর্শনমূলক বক্তব্য বা কাজ করা, ১৯. মাদ‘উর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ ও প্রশ্নোত্তর করা এবং ২০. সবর ও সংযম প্রদর্শন করা।
খ. বুদ্ধিগ্রাহ্যভাবে উপস্থাপন করা
মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে নাড়া দিয়ে তার মাঝে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণায় অনুসদ্ধিৎসু করার ক্ষেত্রে-
১. দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করা।
২. বিভিন্ন ধরনের উপমা প্রদর্শন করা। যেমন- একদা এক যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে এসে ব্যভিচার করার অনুমতি চাইল, রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তোমার মায়ের সাথে কেউ ব্যভিচার করুক- তা কি তুমি চাও?’’ যুবকটি বলল, ‘‘না, কখনো না।’’ রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তাহলে অন্য মানুষেরাও তা চাইবে না।’’ এমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকটির ফুফী ও বোনের সাথে উপমা তুলে ধরলেন। তখন যুবকটি তার ওই বাসনা ত্যাগ করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে নিল।
৩. মাদ‘উর সাথে যুক্তি প্রদর্শনমূলক বিতর্ক করা, যাকে বাহাস বা মুনাযারা বলা হয়, ৪. যে সব বিশুদ্ধ কাহিনীতে বুদ্ধি ও চিন্তার কাজ বেশী, সে সব কাহিনী উল্লেখ করা, ৫. বিরোধী পক্ষ যা সত্য মনে করছে, তার বিপরীত বিষয়টি সত্য বলে প্রমাণ করা।
গ. ইন্দ্রিয়ানুভূতিগ্রাহ্যভাবে উপস্থাপন করা
মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ভুক্ত তথ্য গ্রহণের পরিধিতে আবেদন সৃষ্টি করে এমন উপস্থাপন কৌশলের মধ্যে-
১. আসমান-যমীনে, মানব দেহে অবস্থিত আল্লাহ্র সৃষ্টিলীলা প্রত্যক্ষ করানো। এভাবে ক্বোরআন ও সুন্নাহ্য় প্রচুর তথ্য রয়েছে, ২. আদর্শিক যুক্তি-তথ্য উপস্থাপনা, ৩. হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নামায শিক্ষা দিতেন এবং ৪. নিন্দিত কাজ বর্জনে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ।
দ্বীন প্রচারে সফলতা
যথাযথ পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বনে দ্বীন-প্রচারে সফলতা অনিবার্য। সমাজবিজ্ঞানী হ্যান্টিংটনের মত যারা সভ্যতার দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের প্রবক্তা, তাঁরাও স্বীকার করেছেন, বর্তমান যুগ ইসলামের যুগ। এর সফলতা ও বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
দ্বীন প্রচারের প্রাথমিক কৌশলগত স্থান হল মানুষের ফিত্বরাত, যা সকলের মাঝে নিহিত। এমনিভাবে দা‘ঈদের হাতে রয়েছে ক্বোরআনুল কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ্। পাশাপাশি আছে হিকমতপূর্ণ তথা বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রচারের পদ্ধতি। এমনিভাবে মুসলমানদের মাঝে দা’ওয়াতী চেতনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামের জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে বিশ্বের মানুষ দিশেহারা হয়ে শান্তি খুঁজছে, সত্যের অনুসন্ধান করছে। দা‘ঈরা যদি এ মোক্ষম সুযোগটি যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেন, তবে গোটা বিশ্বে ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটাতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে দা‘ঈদের প্রতি পরামর্শ-
১. ক্বোরআন-সুন্নাহ্র আলোকে আক্বীদা-বিশ্বাসের ব্যাপক সংশোধন করতে হবে, ঈমানী শক্তিতে উজ্জীবিত হতে হবে এবং অন্যকেও করতে হবে।
২. নির্দ্বিধায় ক্বোরআন-সুন্নাহ্র দিকে ফিরে যেতে হবে এবং সকল ক্ষেত্রে এ উভয়কে আঁকড়ে ধরতে হবে, ৩. সত্য গ্রহণে একে অপরের উপদেশ দিতে হবে এবং নিজের কোন ভুল হলে, তা নিসংকোচে মেনে নিতে হবে, ৪. চরম ধৈর্য সহকারে এগুতে হবে; নৈরাজ্যের মোকাবেলা আরেকটি নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে নয়, ৫. দা’ওয়াত দেয়ার পূর্বে প্রস্তুতি নিতে হবে, পরিকল্পনা অনুযায়ী হিকমতের সাথে পদক্ষেপ নিতে হবে, ৬. একমাত্র আল্লাহ্কে ভয় করতে হবে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করতে হবে, ৭. কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে, ৮. পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে বরণ ও উপস্থাপন করতে হবে, ৯. নেতৃত্ব সৃষ্টির উপর গুরুত্ব দিতে হবে, ১০. দা‘ঈদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে ও সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে, ১১. মুসলিম উম্মাহ্র মাঝে গবেষণা মনোবৃত্তি জাগরিত করতে হবে, ১২. দা‘ওয়াতী বিভিন্ন প্রচেষ্টার মাঝে সমন্বয় ও পরস্পরের সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে, ১৩. ইখলাস ও মানবতার প্রতি প্রভূত দরদ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, ১৪. মুসলিম উম্মাহ্্র মাঝে ঐক্য ও ঈমানী ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি জাগরিত করতে হবে, ১৫. রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্তৃত্বকে দা’ওয়াতের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, ১৬. দম্ভ ও ভোগ বিলাসিতার পরিবর্তে বিনয় ও পরিমিত জীবনাচারের আদর্শ উপস্থাপন করতে হবে, ১৭. সমাজে ইসলাম ও আহ্লে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে, ১৮. ইসলাম বিরোধী চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, ১৯. আধুনিক প্রযুক্তি ও মাধ্যম উদ্ভাবন ও তা ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং ২০. সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তা‘আলার উপর আস্থা রেখে দ্বীন প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
সুতরাং আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তাবলীগে দ্বীনের কাজ করে, যুগ প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং তা বিবেচনায় এনে দা‘ওয়াতি কাজ পরিচালনা করলে সফলতা আশা করা যায়।