সিরিকোটের আলোতে পথ দেখছি, আজ শত বছর ধরে

সিরিকোটের আলোতে পথ দেখছি, আজ শত বছর ধরে

সিরিকোটের আলোতে পথ দেখছি, আজ শত বছর ধরে

মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার

এই বাতি মদিনার। জায়গা নিয়েছে সুউচ্চ পাহাড় চূড়া (সের কোহ্) সিরিকোটে। এই নিশান বাগদাদের। কালক্রমে ঘাঁটি গড়লো এই পাহাড়ের মাথায় –

‘‘ওয়া আ’লামি আ’লা রা’সিল জিবালী’’
আমার পতাকা দেখো সুউচ্চ পাহাড় শীর্ষে।
[গাউসে পাক কৃত কাসিদা এ গাউসিয়া]

আর বাগদাদ-মদিনার এই আমানত যিনি সযতেœ লালন করেছিলেন তিনিই সিরিকোটের শাহানশাহ্, আল্লামা হাফেজ সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (১২৭২-১৩৮০ হিজরি, ১৮৫৬-১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ)। বংশ পরম্পরায় তিনি ছিলেন ইমাম হোসাইন (রা)’র ৩৬ তম অধস্তন পুরুষ এবং রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৩৮ তম বংশধারার সদস্য। পূর্ব পুরুষদের পদাংক অনুসরণ করে তিনি শরিয়তের ইলম হাসিলের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন (শা’বান, ১২৯৭ হিজরি, ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ) করার পর থেকে অমুসলিমদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে এবং হালাল রুজি অর্জনের সুন্নাতি পেশা ব্যবসা করবার মহান ব্রত নিয়ে হিজরত করেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। কমপক্ষে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সেখানকার ক্যাপটাউন, মোম্বাসা, জাঞ্জিবার এলাকায় স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করেন এবং ব্যাপকভাবে সফল হন। নিজের ব্যবসায় অর্জিত অর্থ ব্যয় করে এ বছরই সেখানকার ক্যাপটাউনের প্রথম জামে মসজিদ টি নির্মাণ করেন তিনি। এরপর, কোন এক সময় তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময়ে একই দ্বীনি ব্রত নিয়ে তিনি আবারো হিজরত করেন রেঙ্গুনে, এবং একাধারে ষোল বছর (১৯৩৫ পর্যন্ত লাগাতার), সহ ডিসেম্বর ১৯৪১ পর্যন্ত মোট একুশ বছর ছিলেন ব্রহ্মদেশের এই ব্যস্ততম শহরে। এখানে তাঁর দ্বীনি মিশনের কেন্দ্র ছিল রেঙ্গুনের প্রানকেন্দ্রের বাঙ্গালি সুন্নি জামে মসজিদ, যেখানে তিনি ইমাম এবং খতিবের দায়িত্ব পালন করতেন এই সময়ে। গাউসুল আযম দস্তগীর শেখ আবদুল কাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাদেরিয়া সিলসিলাহর আনুষ্ঠানিক খেলাফত তিনি এখানেই ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে লাভ করেন। তাঁর পীর, খলিফায়ে শাহে জীলান, গাউসে দাঁওরান, খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রধান রচনা ৩০ পারা বিশিষ্ট বিখ্যাত দরুদগ্রন্থ ‘‘মজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’’ ছাপানো, ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পীর সাহেব কেবলা প্রতিষ্ঠিত ‘‘দারুল উলুম ইসলামিয়া রহমানিয়া’’ পরিচালনা সহ দরবারে আলীয়া কাদেরিয়ার সার্বিক জিম্মাদারিও একই সাথে তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই থেকে আজ সিরিকোটি হুজুরের দ্বীনি মিশনের এতদঞ্চলের বয়সও শত বছর হয়ে গেল। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে রেঙ্গুনে, ‘‘আনজুমানে শুরায়ে রহমানিয়া’’ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতার পাশাপাশি জাগতিক ও আধুনিক অগ্রসরতার সাক্ষ্য বহন করে। সেই হিসেবে দরবারে আলীয়া কাদেরিয়া সিরিকোটের মিশনের সাংগঠনিক ইতিহাসটাও শতবর্ষের মাইলফলক ছুঁয়ে যাবে আর দুই বছর পর। চট্টগ্রামের শীর্ষ গুণী মানুষ আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার (দৈনিক আজাদী), মাস্টার আবদুল জলিল, ডাক্তার মুজাফফরুল ইসলাম (নোয়াখালী) সাহেবরা ছিলেন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের গ্র্যাজুয়েট। ইনারা সবাই রেঙ্গুনে সিরিকোটি হুজুরের আধ্যাত্মিক আকর্ষণে বাঙ্গালি মসজিদের দ্বীনি মিশনের কর্মী হতে পেরে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতেন। এই সময়ে, রেঙ্গুনে হুজুর কেবলা সিরিকোটির খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন চট্টগ্রামের আরো অনেক নামি-দামি মানুষ। সূফী আবদুল গফুর, আবদুল লতিফ মাস্টার, মোয়াজ্জেম হোসেন পোস্টমাস্টার, ফজলুর রহমান সরকার, তফাজ্জল আহমদ, আবদুল মজিদ সওদাগর সহ বহু ভাগ্যবান মানুষ ছিলেন এই সংগঠনের কর্মধারায় নিবেদিত। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট এই ‘‘আনজুমান এ শুরায়ে রহমানিয়া’’, চট্টগ্রাম শাখা স্থাপনের মধ্য দিয়ে সাংগঠনিকভাবে চট্টগ্রাম রেঙ্গুনের সাংগঠনিক ধারায় মিলিত হয়। যদিও, ১৯২০’র পর হতে ১৯৩৫ পর্যন্ত ধীরে ধীরে রেঙ্গুনের ভাগ্যবানদের খবর এখানে পৌঁছতে থাকে। ১৯৩৫-১৯৪১ পর্যন্ত হুজুরের চট্টগ্রাম আগমন হতো কয়েকদিনের যাত্রা বিরতির সুবাদে। ১৯৪১ ডিসেম্বরের মধ্যে হযরত সিরিকোটি হুজুরের সরাসরি রেঙ্গুন মিশন স্থগিত হবার পর থেকে চট্টগ্রামই হয় সিরিকোটের আলো বিতরণের প্রকাশ্য কেন্দ্র। ১৯৪৫-১৯৫৮ পর্যন্ত, চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক সিরিকোটি মিশনের বাতিঘর ছিল ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সাহেবের আন্দরকিল্লা কোহিনূর মঞ্জিল (সাপ্তাহিক কোহিনূর এবং পরবর্তী তে দৈনিক আজাদী অফিস ও প্রেস)। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে, চট্টগ্রামে ‘মাদ্রাসায়ে আহমদিয়া সুন্নিয়া’ ভিত্তি প্রদান এবং এর বাস্তবায়নে ‘আনজুমান এ আহমদিয়া সুন্নিয়া’ প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৫৬ তে মাদ্রাসাটিকে পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের লক্ষ্যে ‘জামেয়া’ শব্দটি যুক্ত করে এর নাম ‘‘জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা’’ রাখা হয়, এবং তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী কে দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এ বছরই প্রথম সংগঠনের ‘রহমানিয়া’ এবং দ্বিতীয় সংগঠনের ‘আহমদিয়া’ শব্দের সমন্বয়ে ‘‘আনজুমান এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’’ কাজ শুরু করে, যা বর্তমানে দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে শত শত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে এই আনজুমান ট্রাস্ট এবং জামেয়া দেশ সেরা প্রতিষ্ঠান, বিশেষত, সুন্নি জনতার শেষ ভরসার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এখনো।
‘জামেয়া’ হলো সিরিকোটি হুজুরের খুলুসিয়ত এবং নবী প্রেমের পুরষ্কার, একটি অলৌকিক জীবন্ত নিদর্শন। এই পুরষ্কারও এসেছে মদিনাওয়ালা নবী পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে। বাঁশখালীতে সংঘটিত, নবী পাকের দরুদ-সালাম বিরোধীতাকারীদের বেয়াদবির বিরুদ্ধে এক ঈমানী এবং ইলমী জবাব হিসেবে জন্ম নিয়েছিল চট্টগ্রামের ষোলশহরের এই জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটির জায়গা নির্ধারণেও ছিল মদিনাওয়ালার মানচিত্র অনুসরণ –

‘‘শহর ভি নাহো, গাঁও ভি নাহো,
মসজিদ ভি হ্যায়, তালাব ভি হ্যায়’’।

উক্ত শর্তের সাথে যথাসাধ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ সারাদেশের বহু জায়গা দেখা হয়েছিলো বটে, কিন্তু হুজুর কেবলা নিশ্চিত করেছিলেন শুধু ষোলশহর নাজিরপাড়ার এই স্থানটিই, এবং বলেছিলেন, হ্যাঁ, এটিই। অর্থাৎ এটিই মানচিত্রের সেই নির্ধারিত জায়গা। সেই সময়ে সেখানে, জায়গায় দাঁড়িয়ে মোনাফ খলিফা নামক হুজুরের এক মজ্জুব ধরনের মুরীদ বলে ওঠেছিলেন,
‘‘ইঁহা সে ইলম কা খুশবো আ রা হা হ্যায়’’।
শুধু তাই নয়, ১৯৫৬ তে, পাঠদান শুরু হবার পর, এর নিয়মিত বিশাল ব্যয়ভার নিয়ে যখন পীর ভাইগণ চিন্তিত হয়ে গেলেন, তখন একদিন সিরিকোটি হুজুর বলেছিলেন,
‘‘এ মাদ্রাসার খরচাপাতি নিয়ে তোমাদের এতো চিন্তা করতে হবে না, আমার সাথে মদিনাওয়ালা আক্বা সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব কথাবার্তা পাক্কা হয়ে গেছে, যখন যা দরকার সব আসবে মদিনা শরিফ থেকে’’।
সিরিকোটি হুজুর ১৯৫৪ তে একবার বলেছিলেন যে, আমার কানে এই আওয়াজ আসছে, কেউ আমাকে বলছেন যে, ‘‘ইয়ে নয়া মাদ্রাসা হাম খোদ চালায়েঙ্গে’’
আজ আটষট্টি বছর পরেও ভবিষ্যতবাণীগুলোর সত্যতা সর্বজনস্বীকৃত এবং সদা জীবন্ত। আলহামদুলিল্লাহ, এখন এক জামেয়ার আয়ে বেঁচে আছে শত শত মাদ্রাসা।
জামেয়ার ছাত্রদের হাতেই সুন্নিয়ত মিশনের প্রধান নিশান। দেশ থেকে দেশান্তরে তাদের অবদান আজ সর্বজন স্বীকৃত। ১৯৫৪ তে সিরিকোটি হুজুরের প্রত্যাশা ছিল, এই নতুন মাদ্রাসায় (১৯৫৬ থেকে জামেয়া যুক্ত) এখানে সর্বপ্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, বিশেষত ইংরেজি সহ প্রয়োজনীয় ভাষা জ্ঞান দিতে হবে, যেন ইউরোপ-আমেরিকা পর্যন্ত এর ছাত্ররা দ্বীনের খেদমত করতে পারে। [ডায়েরী -১৯৫৪] জামেয়া নুহ আলায়হিস্ সালাম’র জাহাজ। ঈমানদারদের আশ্রয়ের প্রধান ঠিকানা। হ্যাঁ, জামেয়া জিন্দা। এটা শুধু জড় ইট পাথরের দালান নয়। গাউসে জামান তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি একে সালাম দিতেন এবং বলেছেন,জামেয়া জিন্দা, সালামের জবাব দেয়,
এবং ভাগ্যবানরা সেই জবাব শুনতেও পায়।

যা পরবর্তী তে আরো অনেক ভাগ্যবান চাক্ষুষ সাক্ষী দ্বারা প্রমানিতও হয়েছে, সুবহানাল্লাহ্।
হযরত সিরিকোটি হুজুরের বড় এক সফলতা হলো এই যে, তিনি রেখে গেছেন মাতৃগর্ভের অলী হিসেবে বহুল পরিচিত, গাউসে জামান তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি’র মতো একজন সুযোগ্য শাহজাদাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে পেরেছেন, যিনি তাঁর রোপিত বীজ কে বিশাল বটবৃক্ষে উন্নীত করার পাশাপাশি করেছেন নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন। পিতার এক জামেয়া থেকে আজ শত শত মাদ্রাসার জন্ম লাভ হয়েছে। শতাব্দী সেরা সংস্কার ‘জশনে জুলুস’র জন্য যিনি চিরস্মরণীয়। বিশেষত, ১৯২৫ সনে সিরিকোট হুজুর ‘‘আনজুমানে শূরায়ে রহমানিয়া’’ কায়েম করে যে সাংগঠনিক অগ্রসরতার বীজ বপন করেছিলেন এর একটি অঙ্গ ‘‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’’ আজ সমগ্র দেশে-বিদেশে আশার আলো জাগাতে পেরেছে। যে সংগঠন করোনাকালে সব ধর্ম বর্ণ দল মতের মানুষের আস্থার ঠিকানা হতে পেরেছে, আলহামদুলিল্লাহ। সুতরাং সিরিকোটের আলো আজ শতবছর ধরে পথ দেখাচ্ছে এর পূর্ণ ঔজ্জ্বল্যতা নিয়ে। দেখাবে আরো শত শত বছর ইনশাআল্লাহ। কারণ, সিরিকোটি হুজুর বলেছিলেন,

‘‘সাবের পাকিস্তান কা লিডার হোগা,
অওর বাঙ্গাল কা পীর হোগা’’।

সেই পীর সাবির শাহ্ আলো বিতরণ মাত্র শুরু করতে যাচ্ছেন। আবার এরপর দেখা যাচ্ছে আরো এক মাতৃগর্ভের অলীর পদচারণা এই দরবারে। পরদাদা সিরিকোটি হুজুরের নামেই তাঁর নাম। আল্লামা মুফতি, হাফেজ সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ মাদ্দাজিল্লুহুল আলী। যিনি বাংলাদেশে কোভিড-১৯ শুরুর দুই বছর আগে (২০১৮), চট্টগ্রাম জিইসি কনভেনশন সেন্টারের এক বক্তব্যে মহামহারী থেকে রক্ষা পাবার দোয়া নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, যা তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতার একটি নমুনা মাত্র। তাই বলছি, আমরা আসলেই ভাগ্যবান। ইনশাআল্লাহ, শত শত বছর ধরে আলোর পথ দেখাবে দরবারে আলীয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরীফ, তথা সিরিকোটি মিশন।

লেখক: যুগ্ম মহাসচিব-গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় পষিদ, চট্টগ্রাম।

Share:

Leave Your Comment