জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটি

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটি

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ ছিরিকোটি

অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান

সুফী সাধকদের শুভাগমনের মাধ্যমে এ উপমহাদেশে পরম করুণমায় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের মনোনীত ধর্ম ‘দ্বীন ইসলাম’ এর প্রচার প্রসার ঘটেছে। আর এ মহান কর্তব্য পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন নায়েবে রাসুল বিশেষ করে প্রিয় নবীর পূতঃপবিত্র বংশধরগণ অর্থাৎ আওলাদে রাসূল (সালাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)। আমরা জানি যে, গরীবে নেওয়াজ আতা’য়ে রাসূল হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশ্তি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি উপমহাদেশে প্রথম দ্বীন ইসলাম প্রচার করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরো শতবর্ষপূর্বে ৪০০ হিজরি সনে হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র বংশধর হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ গীসুদারাজ আওয়াল রাহমাতুল্লাহি আলায়াহি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং এ বিশাল পার্বত্য এলাকাজুড়ে তাঁরই বুজুর্গ আওলাদগণ বসতি স্থাপন করেন। উমাইয়া শাসকদের নির্মম জুলুম-অত্যাচার থেকে নিজেদের এবং পবিত্র দ্বীন-ইসলামের হিফাজত করার ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তাঁরা আফগানিস্তান ও পরে পাকিস্তান সীমান্তে এসে বসতি স্থাপন করেন প্রিয় নবীর অনেক বংশধর।

প্রিয় নবীজির ৩৮তম অধঃস্তন বংশধর উপমহাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক সুন্নীয়ত আন্দোলনের কাণ্ডারী মসলকে আ’লা হযরত এর প্রচার প্রসারের অন্যতম পথিকৃৎ গাউসে জমান কুতুবুল আউলিয়া রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরীক্বত হাদ্বীয়ে দ্বীন ও মিল্লাত হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির সালানা ওরশ মুবারক ১১ই জিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরি আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার ব্যবস্থাপনায় জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। এ মহান বরকতময় দিবসে ফয়ুজাত হাসিলের উদ্দেশ্যে এ মহাপুরুষের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও কার্যক্রম উল্লেখ করার প্রয়াস।

পাকিস্তানের হাজারা প্রদেশের হরিপুর জেলার (শেতালুশরীফ) ছিরিকোটি’র নবী বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৮৫৬ সালে আওলাদে রাসুল হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ ছদর শাহ’র ঔরসে জন্ম নেন জমানার গাউস হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ, পিতা-মাতা উভয়েই ছিলেন আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীয়ে পাক হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়াহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধর। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কুরআনে হিফজ্ সমাপ্ত করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন মাদ্রাসায় কুরআন-হাদিস-এর শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১২৯৭ হিজরি মোতাবেক ১৮৮০ সালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপনান্তে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি সেখানে অতিবাহিত করেন। এ সময় একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং দেশে তিনি ‘আফ্রিকাওয়ালা’ নামে অভিহিত হন। ড: ইব্রাহিম মাহ্দি লিখিত ‘‘অ ঝযড়ৎঃ যরংঃড়ৎু ড়ভ গঁংষরসং রহ ংড়ঁঃয অভৎরপধ’’ নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে দেখা যায় তিনি সফল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, উপরন্তু, সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে একজন সফল ইসলাম প্রচারক ও প্রথম জামে মসজিদ নির্মাণকারী হিসেবেও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এ মহামনীষী। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদ ও দ্বীনি মিশনের তত্ত্বাবধানে তাঁর জ্ঞাতি ভাই সৈয়্যদ মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ্ ১৯১১ সালে সপরিবারে আফ্রিকায় হিযরত করেন। ক্যাপটাউন, জাঞ্জিবার মোম্বাসা প্রভৃতি শহরে দীর্ঘ ১৬ বছরব্যাপী ইসলাম প্রচার প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করেন। দেশে ফিরে তিনি কোন কাজে মনস্থির করতে পারছিলেন না। কি এক না পাওয়ার তীব্র বাসনা তাড়া করে ফিরছে। এসময় তাঁর বিদুষী সহধর্মিনী হযরত সৈয়্যদা খাতুনের অনুপ্রেরণায় ও উৎসাহে হরিপুরের বাসিন্দা তখনকার যুগের গাউসেজমান এল্মে লুদুন্নীর প্রস্রবণ হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভীর নিকট যেতে রাজি হলেন। এ মহান সাধকের সান্নিধ্য লাভের আশায় হরিপুর গমন করলেন। হরিপুর বাজারে তিনি একটি কাপড়ের দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করেন। এক সময় হযরত চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির সাক্ষাত লাভের উদ্দেশ্যে যান। পথিমধ্যে একজন নুরানী চেহারার সুদর্শন লোককে পাথর কুড়াতে দেখে হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ তাঁর নিকট হযরত চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, বিবি ছাহেবান কি আপনাকে পাঠিয়েছেন? হযরত ছিরিকোটি ছাহেব বিস্ময়ে হতবাক। কথোপকোথনে জানা গেল পাথর কুড়ানো লোকটিই গাউসে জমান হযরত চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)। হযরত ছিরিকোটি (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) ছাহেব তিনি (চৌহরভী) কি করছিলেন? জানতে চাইলে হযরত চৌহরভী বলেন, এখানে একটা মসজিদ নির্মাণ করা হবে। তাই পাথর কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম এ কথা শুনে হযরত ছিরিকোটি (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) দুই টাকা নিয়ে তাঁর হাতে প্রদান করলেন। হযরত চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) টাকা নিয়ে দুহাত তুলে দোয়া করলেন। হযরত চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ’র নিকট জানতে চাইলেন তিনি কি করেন? হরিপুর বাজারে একটা কাপড়ের দোকান রয়েছে বলায় হযরত চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) বললেন, আমার লোকদের বলব যে হরিপুর বাজারে আমার একটা দোকান আছে, তোমরা সেখানে কেনা-কাটা করো। একথার মধ্যেই পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা লক্ষ্য করা যায়। কাপড়ের দোকানের মালিক হলেন ছিরিকোটি ছাহেব, আবার চৌহরভী ছাহেব বলছেন তাঁর দোকান। পরবর্তীকালে রেঙ্গুনে অবস্থানরত মুরীদের নিকট শেষ চিঠিতে হযরত চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) একটি ফারসি কবিতার আবৃত্তি করেছিলেন যার বাংলার অর্থ “তুমি আমি হলে, আমি হলাম তুমি, আমি শরীর হলাম আর তুমি হলে প্রাণ’। ‘কেউ আর না বলে যেন তুমি আর আমি পৃথক সত্তা”। যখন ছিরিকোটি (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) পীরের অবর্তমানে তাঁর অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, ইঞ্জিন থেকে বগি আলাদা হয়ে গেলে বগির অবস্থা কি হবে? এ কথার প্রত্যুত্তরে উপরোক্ত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন হযরত চৈৗহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)। পীর মুরীদ সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়ে গেল। ফয়ুজাত পাওয়া শুরু হলো, পীরের মাদ্রাসায় কয়েক বছর পাঠদান করলেন। পীরের সোহবতে আসার অল্প দিনের মধ্যেই পীরের আদেশ হল “লঙ্গরখানার জন্য কাঠ যোগাড় করে আনতে’’। শুরু হলো সিরিকোটি হুজুরের রিয়াজতের পালা। সকলেই কানাঘুষা করতে লাগল এরকম একজন মৌলানা, ব্যবসায়ী, পণ্ডিত ব্যক্তিকে হুজুর কেবলা কাঠ সংগ্রহের কাজে লাগালেন। নির্দেশদাতা ও নির্দেশ পালনকারী এর গুঢ় রহস্য বুঝতে পেরেছেন। তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে পীরের আদেশে লঙ্গরখানার জন্য কাঠ সংগ্রহের কাজে লেগে গেলেন হুজুর সৈয়্যদ আহমদ শাহ্। দীর্ঘ সময় যাবৎ বহু দূর থেকে মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে লঙ্গরখানায় কাঠ সরবরাহ করেছেন এক নাগাড়ে। এভাবে কঠোর সাধনার কারণে পীরের নিকট হতে ‘তাওয়াজ্জুহ্’ লাভ করেন। পীর ছাহেব চার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে গিয়ে দ্বীন ইসলাম এর প্রচার করার নির্দেশ দিলেন। যে কথা সে কাজ। কোন অজুহাতে বা কোন রকম সুবিধা অসুবিধা বা পরিবার পরিজনের কথা তাঁর মনে কোন রকম দাগ কাটেনি। বিনা বাক্যব্যয়ে পুনরায় দেশান্তরিত হলেন পীরের ইচ্ছে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। ১৯২০ সালে তিনি রেঙ্গুন গমন করে সেখানকার বাঙালি মসজিদ নামে খ্যাত মসজিদে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব নেন। তাঁর আকর্ষণীয় নূরানী চেহারা শরীয়ত তরীকত হাকীকত মারেফত প্রভৃতি বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞান লক্ষ্য করে মুসল্লীরা ক্রমশঃ হুজুর ক্বিবলার সান্নিধ্যে আসা শুরু করলো। তিনি প্রথম কয়েক বৎসর পীর ছাহেব ক্বিবলা হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর শানমান ও অলৌকিক জ্ঞান সম্বন্ধে ওয়াজ নসিহত করতেন। স্থানীয় মুসল্লীরা তাঁকে বাইয়াত করানোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দিলে তিনি তাঁর মুর্শিদের নিকট এর একটা সমাধান চাইলেন। হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী তাঁর নিকট একটি রুমাল পাঠান। কিছুকাল পর তাঁকে খেলাফত ও ইজাজত দিয়ে বাইয়াত করানোর অনুমতি দান করা হয়। দলে দলে নবী অলি প্রেমিকরা বাইয়াত হতে থাকল। এ সময় চট্টগ্রামের বহু লোক জীবিকার সন্ধানে রেঙ্গুন তথা সমগ্র বার্মায় অবস্থান করছিল। দৈনিক আজাদী ও কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক, সুফী আবদুল গফুর, ডা. মোজাফফরুল ইসলাম, আবদুল মজিদ সওদাগর, মাস্টার আবদুল জলিলসহ বেশ কিছু চট্টগ্রামের লোক হুজুর ক্বিবলার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। গাউসে জমান হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)’র একটি অলৌকিক নিদর্শন। অদ্বিতীয় ৩০ পারা দুরূদ শরীফ সম্বলিত মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) রচনা করেন। এই অদ্বিতীয় কিতাবখানা ছাপিয়ে প্রচার করার জন্য এবং দারুল উলুম ইসলামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসার উন্নতিকল্পে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। আরো বললেন, যতদিন এ কাজ সমাধা না হয় ততদিন রেঙ্গুন ত্যাগ করে কোথাও যাবে না। আপন পীরের নির্দেশ শিরোধার্য এ কথা অনুধাবন ও বিশ্বাস করতেন বলে হুজুর ক্বিবলা সৈয়্যদ আহমদ শাহ দীর্ঘ ১৬ বছর দেশে যাননি। এমনকি তাঁর প্রিয় প্রথম সন্তান সৈয়্যদ মোহাম্মদ সালেহ’র ইন্তেকালের খবর পেয়েও পীরের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে দেশে যাওয়া হয়নি। সোবহানাল্লাহ। চট্টগ্রামের ভাইয়েরা এমনকি ইমামে আহলে সুন্নাত মর্দে মুমিন হযরত গাজী শেরে বাংলা আযিযুল আল কাদেরী সাহেব রেঙ্গুন সফরে গেলে হুজুর ক্বিবলার সাথে দেখা করে চট্টগ্রাম আসার অনুরোধ করেন। ১৯২৫ সালে তিনি পীরের নামে আন্জুমানে শুরায়ে রহমানিয়া নামে একটি সংগঠন করেন। যাবতীয় কার্যাদি এর মাধ্যমেই তখন সম্পন্ন হতো। ১৯৩৬ সালে তিনি ১৬ বছর পর স্বদেশে যান। ইতোমধ্যে হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) ইন্তেকাল করেন (ইন্না….রাজেউন)। স্বদেশ যাবার পথে তিনি কিছুদিনের জন্য প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে অবস্থান করেন ভাইদের অনুরোধে। সে সময় থেকেই চট্টগ্রামের মানুষ হুজুর ক্বিবলার সাথে পরিচিত হয় এবং সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়া ত্বরিকায় হুজুর ক্বিবলার হাতে বাইয়াত গ্রহণ শুরু হয়। ১৯৪১ সালে সুদীর্ঘ ২১ বছর রেঙ্গুনে শরীয়ত ত্বরিক্বতের খেদমত করার পর হুজুর বিদায় নিয়ে স্বদেশে ফিরে যান। প্রতি বছর চট্টগ্রাম সফর শুরু করেন তখন থেকেই। ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম সফরকালে আন্জুমানে শুরায়ে রহমানিয়া’র নাম পরিবর্তন করে আন্জুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া রাখা হয়।

১৯৫০ সালে হুজুর ক্বিবলা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক ছাহেবের গ্রামের বাড়ি রাউজান থানার সুলতানপুর গ্রামে সফরে যান, সে সময় সেখানে সুলতানপুর ফোরকানিয়া মাদ্রাসা নামে একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান ছিল। হুজুর ক্বিবলা বরাবরই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করতেন, সফরকালে তাঁকে ঐ ছোট্ট মক্তবসম প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি স্থাপন করার অনুরোধ জানানো হলে তিনি সানন্দে নতুন করে ভিত্তি দেন। বর্তমানে ঐ ছোট্ট মক্তবটি রাউজান দারুল ইসলাম কামিল মাদ্রাসা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্তৃক একটি শক্তিশালী কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৯ সালে হুজুর বাঁশখালী থানার শেখের খীল এলাকায় একটি মাহফিলে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। মরহুম মৌলানা ইজহারুল হক ছাহেব ও মরহুম বজলুল করিম (দু’জনই হুজুরের খলীফা) এর ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। ওয়াজ নসিহত শুরু করার প্রাক্কালে হুজুর ক্বিবলার সফর সাথীগণ ব্যতীত উপস্থিত জনতার কেউ দরুদ পাঠ করলেন না। এটা প্রত্যক্ষ করে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। ক্রোধান্বিত হয়ে সফর সংক্ষিপ্ত করে তিনি শহরে ফিরে আসেন। তিনি উপলব্দি করেন যে এখানকার সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা রক্ষা করার জন্য সুন্নীয়ত ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় তিনি বললেন, ‘কাম করো দ্বীনকো বাঁচাও, ইসলামকো বাঁচাও’। তিনি ভক্ত অনুরক্তদের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য জমি খোঁজ করতে নির্দেশ দিলেন, বললেন এমন জমি দেখ শহর ভি না হো, গাঁও ভি না হো, সাথ মসজিদ ভি হো আওর তালা ভি হো, অর্থাৎ শহর ও না গ্রাম ও না, সাথে মসজিদ থাকবে, পুকুরও থাকবে। অনেক জমি দেখা হলো হুজুরের পছন্দ হয় না। শেষে ষোলশহরের নাজিরপাড়ার বর্তমান স্থানটি (যেখানে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া অবস্থিত) দেখানো হলে হজুর বলেন যে হ্যাঁ এখান থেকে আমি দ্বীনি শিক্ষার খুশবু পাচ্ছি। এখানেই ১৯৫৪ সালে নবী পাকের ৩৮তম বংশধর আলেমে দ্বীন শরীয়ত ত্বরীকতের কাণ্ডারী গোমরাহীর অন্ধকার থেকে আলোর পথের দিশারী কুতুবুল আউলিয়া গাউসে জমান হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি পবিত্র হস্ত মুবারক দ্বারা ঐতিহাসিক জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। পরিচালনার দায়িত্ব আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট-এর উপর ন্যস্ত, তথাপি এর পিছনে প্রিয় নবী ও আওলাদে রাসূলগণের জাহেরী বাতেনী শক্তিই মূল পরিচালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। হুজুর মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠালগ্নে কয়েকটি অতি মূল্যবান নসিহত করেন। প্রিয় নবী বলেছেন এ মাদ্রাসার ভার তিনি নিজেই নিয়েছেন। সোবহানাল্লাহ, ইয়ে কিস্তিয়ে নুহ (আ.) হ্যায়। হযরত নূহ আলায়হিস্ সালাম-এর কিসতি সদৃশ, এ মাদ্রাসার খেদমত যারা করবে তারা ঐ কিসতির যাত্রীদের মতো মুক্তি পাবে। হুজুর আরো বলেন ‘মুঝে দেখনা হ্যায়তো, মাদ্রাসাকো দেখো’ ‘মুঝছে মহব্বত হ্যায়তো মাদ্রাসাকো মহব্বত করো’ ‘মাদরাসা কি লিয়ে মান্নত করো, মান্নাত পুরো হোনেছে ওয়াদা পুরো করো।’ ‘চেনা-অচেনা হাজার হাজার নবী অলী প্রেমিক আল্লাহর বান্দা লক্ষ লক্ষ টাকা দান খয়রাত করে যাচ্ছে এবং তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করছে।’ মসলকে আলা হযরত এর আক্বীদার উপর এই মাস্রাসার কার্যক্রম বিস্তৃত। এখানকার শিক্ষার্থীরা একজন খাঁটি নবী অলী প্রেমিক মন নিয়ে দেশ দেশান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর পক্ষে জেহাদ করে যাচ্ছে।
নাজিরপাড়ার বাসিন্দা মরহুম আবদুল মুনাফ খলীফা (মরহুম সৈয়্যদ মেম্বারের পিতা) রেঙ্গুনে হুজুর ক্বিবলার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, আধ্যাত্মিক দিক থেকে তার ওপর হুজুর ক্বিবলার কিছু মেহেরবাণী ছিল। মাঝে মধ্যে তিনি হুজুর সম্পর্কে কিছু কিছু অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করতেন। একদা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ছাহেবের বাসায় এশার নামাজান্তে তিনি হুজুরকে সম্বোধন করে বললেন, ‘‘হুজুর আপ নামাজ মে যব রুকু ও সাজদা মে জাতে তো সারা চাঁটগাম আপ কা সাথ রুকু আওর সাজদা মে যাতা হ্যায়।’’ হুজুর তাঁকে সমীহ করতেন, হুজুর সব সময় নিজেকে প্রকাশ হতে সংযত রাখতেন।

হুজুর ক্বিবলা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হির জীবনটাই ছিল কারামতে ভরপুর। সহ¯্র-সহ¯্র কারামত লক্ষ্য করা গেছে তাঁর মধ্যে। নিজেকে সবসময় আড়াল করে সংযত হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি প্রায়শঃ বলতেন, ‘বাবা হাম এক মোল্লা নাচীয হুঁ, ‘হামছে আপ লোগো কো কেয়া ফায়দা মিলেগা?’’ পরক্ষণে বলতেন ‘হাঁ হামকো সাচ্চা পীর মিলা, সাচ্চা রাহবার মিলা, উনকি যরিয়ে মখলুক কা খেদমত করনেকা কোশিশ করতা হুঁ। আবার কখনো তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ মুরীদ পেলে জোশের সাথেই বলতেন ‘‘না হাম পীর সে জুদা হুঁ, না পীর হামছে জুদা হ্যায়।’’ তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। আরো বলতেন, ‘‘সাচ্চা সঙ্গত করো (ওয়াকুনু মাআস্ সোয়াদেকিন)।’’

প্রিয় দৌহিত্র্য আওলাদে রসুল গাউসে জমান হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী)কে সাথে নিয়ে হুজুর ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম সফরে আসেন (এটা ছিল হুজুরের শেস সফর)। প্রায় সাত মাস চট্টগ্রামে অবস্থান করে ৩০/৩৫ জন মুরীদান সঙ্গে করে হুজুর প্রিয় নাতিসহ জাহাজযোগে হজ্ব পালনার্থে জেদ্দার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন। বহু বছর পর হুজুর পুনর্বার হজ্বে গেলেন। নাতি তাহের শাহকে নিয়ে হজ্বে যাবার এক গুরুত্বপূর্ণ কারামত তখন প্রকাশ পেয়েছিল। যখন হুজুর ১৯৫০/৫১ সালে হজ্ব সমাপনান্তে আকা-মওলা নুরে মুজাচ্ছম, তাজেদারে মদীনা হুজুর পুরনুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের রওজা মুবারকে বিদায়ী সালাম আরজ করছিলেন সে সময় প্রিয় নবীজির ৩৯তম অধঃস্তন (সৈয়্যদ আহমদ শাহ্) পুরুষকে আগামীবার হজ্বে আসার সময় তাঁর নাতি সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহকে নিয়ে আসার জন্য আদেশ হল। নাতি নাবালক থাকায় সাবালক হওয়া অবধি তিনি হজ্বে যাননি। নাতির বয়স যখন হজ্বে যাবার সময় হলো তখনিই হুজুর নাতিকে নিয়ে হজ্বে (১৯৫৮) গেলেন। এ হজ্ব হুজুরের বিদায় হজ্ব ছিল। হজ্জে গিয়ে নাতিসহ প্রিয় নবীর রওজায় সালাম আরয করলেন এবং পবিত্র আরাফাহ্ ময়দানে প্রিয় নাতিকে উপস্থিত পীর ভাইদের সম্মুখে আপন হাতে হাত রেখে বাইয়াত করালেন। হুজুর করিম রাউফুর রহিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের নির্দেশেই এ কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। সোবহানাল্লাহ। তাঁর সঙ্গে হযরত খিজির (আলায়হিস্ সালাম) সহ সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার তামাম মাশায়েখ হযরাত কেরামের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ছিল পরিক্ষীত।

১৯৬০ সালে ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবদুল খালেক, আলহাজ্ব নুর মুহাম্মদ সওদাগর আলকাদেরী, আরহাজ্ব ডা. টি হোসেন, হাজী আবুল বশর, আলহাজ্ব আমিনুর রহমান সওদাগর, আলহাজ্ব আকরাম আলী খান, আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম সওদাগর, ফজলুর রহমান হুজুরকে আনতে সিরিকোট শরীফ যান। শারীরিক দুর্বলতার কারণে হুজুর আসতে পারেননি। হুজুর ভাইদের বলেছিলেন ‘ওপরওয়ালাকো হুকুম মিলনে ছে জরুর জাউঙ্গা’, লেকিন যানে কো হুকুম নেহী হ্যায়।’’ অনেক কান্নাকাটি করে ভাইয়েরা চট্টগ্রাম ফিরে আসেন। এটাই ছিল হুজুর কেবলার আখেরী সাক্ষাৎকার। ১৯৬১ সনের ০২ মে আনজুমান ট্রাস্টর সাবেক সেক্রেটারি বর্তমান সহ সভাপতি হুজুরের খলীফা জনাব আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ তবিবুল আলম সিরিকোট শরীফ গমন করেন। হুজুর খুবই অসুস্থ ছিলেন। ২১ মে এক রকম জোর করে হুজুর ক্বিবলা তাঁকে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেন। হুজুর ১৯৬১ সালের ২২ মে মোতাবেক ১১ই জিলক্বদ লক্ষ লক্ষ পীর ভাইদের শোক সাগরে ভাসিয়ে অন্তিম শয়ানে অবগাহন করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজেউন)
হুজুর ক্বিবলার অসংখ্য কারামত লক্ষ্য করেছি সবচেয়ে বড় কারামত এই জামেয়া। হুজুর ক্বিবলার সালানা ওরস মোবারকের প্রাক্কালে গভীর প্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এ মহান রাহবার আমাদের সকলের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদকে, আমরা তাঁর নেগাহ-করম কামনা করছি, করুণাময়ের দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের হুজুর ক্বিবলার নির্দেশিত পথে চলার তওফিক দিন। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে অদ্যাবধি যারা খেদমত করে জান্নাতবাসী হয়েছেন তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহ পাক তাঁদের দরজাকে বুলন্দ করুন। জামেয়াকে যারা ভালবাসবে দুনিয়া আখিরাতে তারাই সফল, যারা শত্রুতা করবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। আসুন আমরা সকলে আওলাদে রাসুল এর এ মহান কীর্তিকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে চলি। এ হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। দরবারে আলিয়া কাদেরিয়ার সাজ্জাদানসীন হযরত মাশায়েখ ক্বেরাম গাউসে জমান হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ ও হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ জামেয়া আনজুমানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রিয় নবীর ৪১তম অধঃস্তন বংশধর আমাদের পরিচালক ও নির্দেশদাতা, আল্লাহ পাক আমাদের নবী অলিপ্রেমিক হবার সৌভাগ্য দান করুন আমিন!

লেখক: প্রেস এণ্ড পাবলিকেশন সেক্রেটারী- আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম।

 

Share:

Leave Your Comment