ওরসের নামে নানা কুসংস্কার: মুসলমানদের করণীয়

0

মাওলানা মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি

উপস্থাপনা
বাংলাদেশ নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ, পীর-ফকির, দরবেশ-আউলিয়াদের দেশ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বার আউলিয়ার শহর নামে খ্যাত। আল্লাহর আউলিয়া কেরাম আরবের বিভিন্ন অঞ্চল হতে এসে এদেশে ইসলামের মহান বাণী প্রচার করেছেন এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসার করে ইসলামকে আবাদ করেছেন। আমরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করার পেছনে মূল অবদান এ মহান আউলিয়ায়ে কেরামের। এসব আউলিয়ায়ে কেরামের জীবন চর্চা করা এবং তাঁদের অবদানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ আউলিয়ায়ে কেরামের ওফাত তথা ইন্তেকাল বার্ষিকী পালনের নামকে ওরশ বলে। ওরস আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো বিশেষ অনুষ্ঠান। আমাদের দেশে ইদানিং কিছু কিছু মাযারে ওরসের নামে যে অনুষ্ঠানগুলো আমরা দেখতে পাই এবং সেখানে যেসব কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে সেগুলো প্রকৃতপক্ষে বুযুর্গ আউলিয়ায়ে কেরামের ওরসের সাথে কোন মিল পাওয়া যায় না। আউলিয়ায়ে কেরামের আস্তানা ও মাযারে গিয়ে আমরা তাঁদের জিয়ারত করি এবং তাঁদের অবদানকে স্মরণ করে থাকি। আর আউলিয়ায়ে কেরামের এই ওফাত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু দরবারের একশ্রেণীর ভক্ত-আশেকানরা ওরসের নাম দিয়ে এমন সব কুসংস্কার ও ভণ্ডামি করে থাকে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে চরম অন্যায় এবং সুস্পষ্ট হারাম। একজন মুসলমান হিসেবে এসব ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা একান্ত কর্তব্য বলে মনে করছি। নিম্নে বিষয়টি নিয়ে যৎসামান্য আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।

আউলিয়ায়ে কেরামের পরিচয়
আউলিয়া শব্দটি আরবি এবং বহুবচন, এর একবচন হলো- ওলিউন। ‘ওলি’ এর আভিধানিক অর্থ হলো- অভিভাবক, বন্ধু, সাথী, সঙ্গী, সাহায্যকারী, পথপ্রদর্শক, মুর্শিদ, পীর ইত্যাদি। পরিভাষায় আল্লাহর আউলিয়া কেরামের পরিচিতি হলো, তাঁরা এমন সব বান্দা যাদেরকে দেখলে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং হিদায়ত তথা আল্লাহর ইবাদতের দিকে ফিরে আসে। তারাই হলো- প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ওলি।

উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে আল্লাহর ওলিগণের অবদান
ইসলামের সূত্রপাত যদিও আরব দেশে হয়েছে তথাপি এই ধর্মকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব মহামানব নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন তাঁরা নিঃসন্দেহে আল্লাহর মকবুল বান্দা। আল্লাহর এই মহান ওলিগণ আরবের বিভিন্ন দেশ যেমন- ইরাক, ইরান, মিশর, বাগদাদ, খোরাসান, ইয়ামন, আফগানিস্তান ইত্যাদি হতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। তাঁদের একমাত্র মহান উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে ইসলামের মহান বাণী পৌঁছে দেয়া। আর একাজে তাঁরা অনেক কষ্ট স্বীকার ও নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে মানুষের কাছে আল্লাহর কলমাকে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টিই, দুনিয়াবী কোন লোভ-লালসার প্রতি তাঁদের কোন মোহ ছিল না।

অধর্মের বিরুদ্ধে জিহাদ
যুগে যুগে আল্লাহর আউলিয়ায়ে কেরাম অধর্মের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। বিধর্মীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাদের বাধার মুখে পড়েছেন। এমনকি জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে তুমুল লড়াইয়ের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার করে ইসলামকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। আল্লাহর সাথে যারা শরিক করত, আর ইসলামকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত থাকতো, এদেরকে কোন ধরনের ছাড় না দিয়ে জিহাদ ঘোষণা করে আপোষহীন ভূমিকা রেখেছেন। আউলিয়া কেরামের জীবনীতে তাঁদের অসামান্য অবদানের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড গুলো বর্ণনা করা হয়েছে।

বাতিলের বিরুদ্ধে জিহাদ
ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে আউলিয়ায়ে কেরাম নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এসব প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তাঁরা ইসলামকে মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। দিন দিন ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে। বিধর্মীরা দীর্ঘদিন এদেশে বসবাসের ফলে তারা রাজত্বও কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল। যার কারণে ইসলাম তাদের কাছে নতুন ধর্মের চেয়ে রাজত্ব কেড়ে নেওয়ার কারণ বলে মনে হয়েছিল। ফলে তারা মুসলমানদের নানা সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। এসব হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম নির্যাতন, অন্যায় আচরণ ও তাদের এঁকঘেয়েমির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আউলিয়ায়ে কেরাম এদেশে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে আল্লাহর অলিদের ভূমিকা
এদেশে ইসলাম এসেছে আউলিয়া কেরামের হাত ধরে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য কোন নবী-রাসুল আসেননি। আরব দেশের ব্যবসায়ী ও আউলিয়ায়ে কামেলীন এদেশে ইসলামের আবাদ করেছেন। এদেশে তারা শুধু শান্তির বাণী পৌঁছে দিয়েছেন তা নয়, মানুষের কল্যাণে অনেক অসামান্য অবদান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। হযরত শাহজালাল ইয়ামেনি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং তাঁর সাথে ৩৬০ আউলিয়া যারা এসেছেন, তাঁদের মাধ্যমে এদেশে ইসলাম আবাদ হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রপথে চট্টগ্রামে আগত আরবের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও আউলিয়ায়ে কেরাম এদেশে এসেছেন। যেমন-হযরত বদর শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি, হযরত গরীব উল্লাহ শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত মিসকিন শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত আমানত শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত শাহ চান্দ আউলিয়া রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওরসের নামে নানা ভণ্ডামির বর্ণনা
আমাদের দেশে কিছু কিছু মাযারে ওরসের নামে বিভিন্ন কুসংস্কার ও সুস্পষ্ট হারাম কাজ এবং ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়ে কতিপয় লোক আল্লাহর ওলিগণের মানহানি করছে, যা তাঁদের শানে চরম অবমাননাকরও বটে। নিম্নে এসব কুসংস্কার ও গর্হিত কাজসমূহের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কুসংস্কারের বর্ণনা করা যায়।

ক.ওরসের দিনকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন করা
ওরসের দিন মাযারের আশেপাশে বিশাল একটা খোলা জায়গায় মেলার আয়োজন করা হয়। অনেক মেলা মাযারের ওরশ কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে থাকে। এই মেলাকে উদ্দেশ্য করে ওই গ্রামে নানা আয়োজন হয়ে থাকে। মেলা শুরুর আগে স্থানীয় বিবাহিত মহিলারা শ্বশুরবাড়ি থেকে তাদের বাপের বাড়িতে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় স্বজনদেরকে নিয়ে বেড়াতে আসেন। এই মেলা যুবক-যুবতী সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে বিধায় নারী-পুরুষ সবাই মেলাতে অবাধ বিচরণের সুযোগ পায়। এই ক্ষেত্রে যুবতী ও মহিলাদের পর্দার ব্যাপারে যথেষ্ট অবহেলা থাকে। অনেক সময় তারা বখাটের লাঞ্চনা-নির্যাতন ও ইভটিজিংয়ের শিকার হয়।

খ. ওরসের পশুকে নেশা জাতীয় খাবার খাওয়ানো
জানা গেছে যে, ভক্তদের অনেকেই ওরসে আসার সময় গরু, মহিষ ও ছাগল ইত্যাদি নিয়ে আসে। ওরসের জন্য যে পশু আনা হয় অথবা ভক্তরা নিয়ে আসে সেসব নিরীহ পশুদেরকে তারা নানাভাবে কষ্ট দেয় এবং পশুগুলোর উপর জুলুম করে। ভক্ত নামের ভণ্ডদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা এই নিরীহ পশুটিকে নেশা জাতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করে, মদ খাওয়ায় ও অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্যাদি খাওয়ানোর মাধ্যমে পশুটির সাথে নিকৃষ্ট আচরণ করে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে চরম অন্যায় ও জুলুম। নেশা জাতীয় খাবার খাওয়ানোর পর পশুটি নিয়ে ঢোল-তবলা ইত্যাদি বাজিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। অনেকে আবার পশুটির চারপাশে চারটি রশি বেঁধে চারদিক থেকে চারজন টানাটানি করে, যা অমানবিক নির্যাতন ও জুলুম। এরা এসব নিরীহ পশুকে উত্তেজিত করে নাচায় এবং নাচতে বাধ্য করে। এককথায় পশুকে নানা পন্থায় কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তারা নাকি মজা পায়।

গ.ওরসের পশুকে নিয়ে হৈ হুল্লোড় করা
ওরসের জন্য ক্রয়কৃত পশুটি নিঃসন্দেহে হালাল। আর এই হালাল পশুটিকে মদ খাওয়ানোর মাধ্যমে পাগল করা এবং উত্তেজিত করা কোন সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী মানুষের কাজ নয়। পশুটিকে ঘিরে আতশবাজি ও বোমা ফোটায় এবং বিভিন্নভাবে ওই পশুটির চতুর্পাশে সবাই নাচানাচি করে। এরা কোন ধরনের মানুষ ভাবতেই অবাক লাগে। একটি পশুর সাথে কেমন আচরণ করবে তাও জানে না অথবা জেনেশুনে পশুটিকে কষ্ট দেয়। আর এসব পশুকে রাস্তা দিয়ে মানুষকে দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া এটা এক ধরনের রিয়া যা চরম গুনাহ। এই পশুটিকে উত্তেজিত করে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এর দ্বারা শিশু ও নারীসহ সাধারণ জনগণ আহত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। যা সাধারণ মানুষের জন্য ভয়-ভীতির কারণ হতে পারে।

ঘ.শিল্পীদের মাধ্যমে গান-বাজনার ব্যবস্থা করা
আউলিয়ায়ে কেরাম শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করা তো দূরের কথা, কেউ শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করলে তার সাথে কোন ধরণের সম্পর্ক পর্যন্তও রাখতেন না। আর এখন আউলিয়ায়ে কেরামের ভক্ত দাবি করে ওরসের নাম দিয়ে সেখানে নর্তকী মহিলা, গায়িকা এনে নাচ-গানের আয়োজন করে সাধারণ মানুষদেরকে গুনাহগার বানানো নিঃসন্দেহে এটা কোন মুসলমানের কাজ হতে পারে না এবং কোন মুসলমান এটা মেনে নিতে পারে না।

ঙ. তাবাররুকের নামে ভাত বিক্রি করা
ইদানিং বিভিন্ন মাযারে দেখা যায় ওরসের জন্য গরু ক্রয় করার আগে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে এমনকি রিক্সাযোগে গান বাদ্য করে দোকানে দোকানে গিয়ে টাকা তোলে। এটা আল্লাহর ওলির নামে ভিক্ষা করা, যা আল্লাহর ঐ ওলিকে চরম অপমানের সাথে ছোট করাও বটে। ঐ টাকা দিয়ে ওরসের ইন্তেজাম করা। ওরসের জন্য এক বা একাধিক গরু, মহিষ ও ছাগল কিনে থাকে এবং যারা টাকা দিয়ে অংশগ্রহণ করে তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে তাবাররুক দেয় না, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। কেননা তাবাররুক সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, এটাই ইসলামের মহানুভবতা। যতক্ষণ আছে ততক্ষণ ওই তার্বারুক খাওয়ানো হবে। বিশেষ করে একশ্রেণীর অসাধু ও লোভী মানুষের কারণে তা সাধারণ মানুষের কেউ পায় আবার কেউ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ত্রুটির কারণেও এমনটি হয়ে থাকে।

চ. নারী-পুরুষদেরকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেয়া
ওরসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে বেপর্দা নারী-পুরষদের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়, অথচ মাযারে মহিলা গমন করা এবং মাযারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে ফেরেশতারা গুনাহ লিখা শুরু করে দেন। কারণ সেখানে মহিলারা পর্দার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কাজটি যৎসামান্যও মানে না। অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন খারাপ ও দুষ্ট প্রকৃতির লোকও যারা মহিলাদের টাকা-পয়সা এবং সম্মানের যথেষ্ট ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

ছ. গাঁজার আসর জমানো
ওরসকে কেন্দ্র করে কোন কোন স্থানে কিছু অসাধু ও ভণ্ড প্রকৃতির লোক গানের আড্ডা ও গাঁজার আসর জমায়, যা সুস্পষ্ট হারাম কাজ। এসব হারাম কাজে যারা অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করে তারা ইসলামকে কলুষিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং তাদের কারণে সুফীবাদী বিশ্বাসীদের নানাভাবে কথা শুনতে হচ্ছে। যা এক প্রকার ইসলামকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং প্রকৃত আউলিয়ায়ে কেরামের প্রতি চরম অবমাননা ও তাঁদের অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার একটি চক্রান্তও বটে।

জ. জুয়ার আসর জমানো
ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়া খেলা হারাম। আর যারা জুয়ার আসর জমায়, তারা সুস্পষ্ট হারাম কাজে জড়িত। যারা এসব কাজে সহযোগিতা করে তারাও সমান অপরাধী। এসব হারাম কাজ আল্লাহর আউলিয়ায়ে কেরামের ওরসের নামে কোন কোন পবিত্র আস্তানায় বিনা বাধা-বিপত্তিতে হচ্ছে বা হতে দেওয়া হচ্ছে, এতে মুসলিম হিসেবে আমাদের লজ্জা থাকা উচিত। এইসব ভণ্ডামির সরাসরি মূলোৎপাটন করা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানের দাবী।

ঝ. প্রকৃত আউলিয়ায়ে কেরামের অবমাননা
এসব ভণ্ডামির কারণে প্রকৃত আউলিয়ায়ে কেরামের শানে বেয়াদবিমূলক কথাবার্তা এবং একতরফাভাবে সব আউলিয়ায়ে কেরামকে খারাপ মন্তব্য করার সুযোগ পাচ্ছে এক শ্রেণির মানুষ। আউলিয়ায়ে কেরাম হলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও দ্বীনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গকারী ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা মানুষের কাছে আল্লাহর কলমাকে পৌঁছে দেয়া এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যে অসমান্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের সেই অবদানকে অস্বীকার করার সুযোগ থাকে,যা মোটেও কাম্য হতে পারে না।

ওরসের নামে নানা ভণ্ডামির অবসানে আমাদের করণীয়
ইসলামী শরীয়তে ওরস কিভাবে উদযাপন করা হবে, তা ক্বোরআন-হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিধিনিষেধ মেনে আমাদেরকে ওরস উদযাপন করতে হবে। নিম্নে কিছু কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।

শরীয়ত সম্মত পন্থায় ওরসের আয়োজন করা
ইসলামের দৃষ্টিতে আউলিয়ায়ে কেরামের ওরস কিভাবে করতে হবে, তা ক্বোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। সুফিবাদ সমর্থিত বুযুর্গ আউলিয়ায়ে কেরামের পবিত্র আস্তানায় পীর-ফকীরদের এবং আউলিয়ায়ে কেরামের ওরস উদযাপন উপলক্ষে ইসালে সওয়াবের ব্যবস্থার করা হয়ে থাকে। খতমে ক্বোরআন, খতমে বুখারী, খতমে মজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বিভিন্ন চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা সেবা, বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা, দান-সদাকা, ফকীর-মিসকীনদের পোশাক বিতরণ, গরীব ও দুঃস্থদের জন্য খাবারের আয়োজন করা, ইসলামী কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ইত্যাদি পূণ্যময় কর্মসূচী পালন ওরসের মহৎ উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

পুরুষদের জন্য জিয়ারতের সুন্দর ব্যবস্থা থাকা
আল্লাহর মহান আউলিয়ায়ে কেরামকে যে জায়গায় দাফন করা হয় সেটাকে মাযার বলা হয়। মাযার আরবি শব্দ এবং এর অর্থ হলো জিয়ারতের স্থান। মাযারে মানুষ আউলিয়ায়ে কেরামের রওজা শরীফের জিয়ারত করেন এবং তাঁদের ওসিলা নিয়ে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আর তারা বিশ্বাস করেন যে, আউলিয়ায়ে কেরাম যেহেতু আল্লাহর কাছে মাকবুল সুতরাং তাঁদের ওসিলায় দো’য়া করলে আল্লাহ পাক কবুল করেন। সুতরাং মাযারে আগত সকলের জন্য জিয়ারতের সুন্দর ব্যবস্থা থাকা উচিত। এটা দেখাশোনা করতে হবে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ আলেমকে নিয়োগ করা উচিৎ যেন সেখানে কেউ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করতে না পারে।

‘মাযারে সাজদা করা হারাম’ স্টিকার সেঁটে দেয়া ও সাজদা করতে বাধা দেওয়া
মাযার হলো জিয়ারতের স্থান। সুতরাং কেউ যাতে মাযারে গিয়ে সাজদা দিতে বা করতে না পারে, সেজন্য সুস্পষ্ট অক্ষরে ‘মাযারে সাজদা দেয়া হারাম’ লিখে দিতে হবে। এভাবে লিখে সাধারণ মানুষদের সাজদার মতো জঘন্য ও চরম সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা আমার-আপনার নৈতিক দায়িত্ব। কোন মানুষ না জেনে অথবা স্বেচ্ছায় কাউকে সাজদা দিতে দেখলে সাথে সাথে তাকে বাধা দিতে হবে। এবং তাকে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে হবে, যাতে অদূর ভবিষ্যতে কেউ যেন এ কাজ করতে না পারে।
নারীদের গমনকে নিষিদ্ধ করা
মাযার জিয়ারতে শুধুমাত্র পুরুষগণ আগমন করবেন। বেপর্দা মহিলা ও যুবতী মেয়েরা মাযারে যাওয়া নিষিদ্ধ এবং হারাম। বেপর্দা মহিলা ও যুবতী মেয়েরা মাযারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাদের উপর লানত তথা অভিশাপ দিতে থাকেন। বর্তমান ফিতনার যুগে মহিলা ও যুবতী মেয়েদের পর্দার কথা বিবেচনা করে না যাওয়ায়াই সাওয়াবের কাজ। সুতরাং বেপর্দা মহিলা ও যুবতী মেয়েরা মাজারে যাওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

সংশ্লিষ্ট ওলির জীবনী চর্চা করা
যে মাযারে ওরসের আয়োজন করা হয়েছে, আল্লাহর সেই ওলী সম্পর্কে মানুষকে জানানো ও তাঁর অবদান মানুষের কাছে তোলে ধরা। এবং তাঁদের জীবনীর উপর দক্ষ ও অভিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে আল্লাহর ওই মাকবুল বান্দা সম্পর্কে মানুষ ধারণা লাভ করতে পারবে।

ধনী-গরীব পার্থক্য না করে সকলের জন্য তাবাররুকের ব্যবস্থা করা
বিভিন্ন মাযারে দেখা যায় ওরসের জন্য টাকা উত্তোলন করে। আর যারা টাকা দেয় শুধু তাদেরকে তাবাররুক দেয়া হয়। অন্যদেরকে তাবাররুক থেকে বঞ্চিত করা হয়, যা মোটেও ঠিক নয়। এক্ষেত্রে ধনী-গরীব বিবেচনা না করে সামর্থ্য থাকলে মাযারে আগত সকলের জন্য তাবারুকের ব্যবস্থা করাই উত্তম। এ রকম অনুষ্ঠানে সাধারণত গরীব, মিসকীন, অসহায়, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোকদের খাওয়ানো সাওয়াবের কাজও বটে।

মেলায় নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে নিষিদ্ধ করা
আউলিয়ায়ে কেরামের পবিত্র ওরসকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন করা এবং মেলায় নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে নিষিদ্ধ করাই হবে সর্বোত্তম পন্থা। নারীরা মায়ের জাত, বোনের জাত। নারীর প্রতি সুবিচার ও সুন্দর আচরণই মূখ্য। এক্ষেত্রে নারীর পর্দা ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং নারীর প্রতি সম্মান জানিয়ে হলেও নারীর আগমনকে কঠোরভাবে বন্ধ করা উচিত।

অন্যায় ও গর্হিত কাজ থেকে মুক্ত রাখা
আউলিয়ায়ে কেরামের আস্তানাও মানুষের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো। কেননা এসব দরবারে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, সম্মান ইত্যাদি শিক্ষা দেয়া হয়। সাথে সাথে জুলুম-নির্যাতনসহ সকল প্রকার নেতিবাচক কর্মকান্ড থেকে মুক্ত থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ভুলে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। আর তাদের দরবারগুলো থেকে সকল প্রকার অন্যায় ও অবৈধ এবং গর্হিত ও অপরাধমূলক নানা ধরনের কর্মকাণ্ড হতে মানুষদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সকলকে আন্তরিক সহযোগিতা ও ভূমিকা রাখতে হবে।

আউলিয়ায়ে কেরামের ওসিলা নিয়ে দোয়া করা
অনেক সময় দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ে। অলসতা ও অবহেলার মাধ্যমে সময় কাটিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ ইবাদত-বন্দেগী করার সুযোগ থাকে না। তাই, তারা আল্লাহর কাছে আউলিয়ায়ে কেরামদের ওসিলা নিয়ে সাহায্য প্রার্থনা ও সফলতা কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করে থাকেন। সুতরাং এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আউলিয়ায়ে কেরামের ওসিলা নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে নিজের এবং পরিবারের সকলের জন্য দোয়া করার সুযোগ লাভ করা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

উপসংহার
পরিশেষে একটি প্রস্তাব পেশ করে আমার প্রবন্ধ শেষ করতে চাই,আর তা হলো”অন্তত একজন হক্কানি আলেম নিয়োগ দানের মাধ্যমে মাযারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। যাতে মাযারে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেন জিয়ারতের বদলে সাজদা করা থেকে বিরত থাকেন। বর্তমানে কিছু কিছু মাযারে ওরসের নাম দিয়ে সেখানে মহিলা এনে অশ্লীল গান-বাজনা ও নাচানাচিসহ যাবতীয় অন্যায় ও গর্হিত কাজ করছে। যা মারাত্মক গুনাহ ও চরম অন্যায়। এসব ভণ্ডামি থেকে সকলকে বিরত থাকার পরামর্শ ও সহযোগিতার নির্দেশনা থাকবে সবসময়। এসব ভণ্ডামির কারণে যেন প্রকৃত আউলিয়ায়ে কেরামের অবমাননা ও তাদের অবদানকে অস্বীকার করা না হয় সেদিকে গভীর দৃষ্টি দিতে হবে।

লেখক: সহকারী মাওলানা চরণদ্বীপ রজভীয়া ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •