আল্লাহ্ তিনি, যিনি আপন রসূলকে হিদায়ত ও সত্য দ্বীন সহকারে প্রেরণ করেছেন

0

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

রসূলের শান
দুনিয়ায় আমরাও মহান রবের প্রেরিত অবস্থায় এসেছি, আর ‘রাসূল’ও। কিন্তু আমাদরে আগমনকে ক্বোরআন-ই করীম خَلَقَ (অর্থাৎ পয়দা করেছেন) বলেছেন। যেমন- এরশাদ হয়েছে- خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُوْنَ- অর্থ: তিনি (আল্লাহ্) তোমাদেরকে ও তোমাদের কর্মগুলোকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু রসূলের দুনিয়ায় শুভাগমনকে بعثت(বি’সাত) ও رسالت (রিসালত) দ্বারাও বর্ণনা করেছেন। অন্য আয়াতে এরশাদ করেন- هُوَ الَّذِىْ بَعَثَ فِى الْاُمِيِّيْنَ رَسُوْلًا-
অর্থ: তিনিই আল্লাহ্; যিনি পড়াবিহীনদের মধ্যে রসূল প্রেরণ করেছেন। অন্য আয়াতে এরশাদ করেন- هُوَا الَّذِيْ اَرْسَلَ رَسُوْلَهٗ بِالْهُدى وَدِيْنِ الْحَقِّ- অর্থ: আল্লাহ্ তিনি, যিনি আপন রসূলকে হিদায়ত ও সত্য দ্বীন সহকারে প্রেরণ করেছেন। মোট কথা, বি’সাত ও রিসালত শুধু নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, আমাদের জন্য হয়নি। অর্থাৎ আমরা শুধু আল্লাহ্র মাখলূক্বই, আর রসূল তাঁর মাখলুক্বও, রসূলও এবং তাঁর প্রেরিতও। এ পার্থক্যের কয়েকটা কারণও আছে।

এক. আমরা দুনিয়ায় আমাদের কাজের জন্য নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে আসি, আর রসূল দুনিয়ায় মহান রবের কাজের জন্য মহান রবের বদান্যতার দায়িত্বে তাশরীফ আনেন। যেমন: কোন রাজ্যের কোন ব্যক্তি নিজের কাজের জন্য যায়, আর কেউ যায় রাষ্ট্রের কাজে রাষ্ট্রদূত হয়ে। নিশ্চয় উভয়ের যাত্রার মধ্যে পার্থক্য আছে। রাষ্ট্রদূতের যাতায়াতের যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকে, তার যাবতীয় কথা রাষ্ট্রের কথা বলে বিবেচিত হয়; কিন্তু যে ব্যক্তিগত কাজে যায়, তার যাবতীয় দায়িত্ব তার নিজেরই হয়।

দুই. আমরা দুনিয়ায় কিছু হবার জন্য আসি। যেমন- সঠিক আক্বীদাগুলো গ্রহণ করে মু’মিন হবার জন্য আমরা আসি, নেক কাজ করে মুত্তাক্বী হবার জন্য আমাদের আগমন হয়। কিন্তু রসূল তাশরীফ আনেন অন্যদেরকে বানানোর জন্য। লোকজন তাঁদের মাধ্যমে মু’মিন হয়, মুক্তাক্বী হয়। ইসলাম রূপী জাহাজে আমরাও আরোহণ করি, রসূলও আরোহণ করেন। কিন্তু আমরা আরোহণ করি পাড়ি দেওয়ার জন্য, আর রসূল আরোহণ করেন পার করানোর জন্য। যেমন, পানির জাহাজে কিংবা উড়োজাহাজে যাত্রীরা অন্যত্র পাড়ি দেওয়ার জন্য আরোহণ করে, কাপ্তান কিংবা পাইলট চড়েন পার করানোর জন্য। এ পার্থক্যের কারণে যাত্রীরা ভাড়া পরিশোধ করেই আরোহণ করে, আর কাপ্তান কিংবা পাইলট বেতন নিয়ে আরোহণ করে থাকেন।

তিন. আমরা যখন দুনিয়ায় আসি, তখন আমরা অবুঝ থাকি, এখানে এসে শিক্ষা গ্রহণ করি। আর সম্মানিত রসূল ও নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম সবকিছু মহান রবের নিকট থেকে শিখে তাশরীফ আনেন। তাঁরা আসেন অন্য লোকদের শেখানোর জন্য। এ কারণে আমরা এখানকার পারিপার্শ্বিক অবস্থানুসারে হয়ে যাই। কিন্তু রসূল অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তাশরীফ আনেন, কিন্তু নিজেরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন। অর্থাৎ আমাদের পরিবেশ বদলায়, আর তাঁরা পরিবেশকে বদলান।

হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম ভূমিষ্ট হবার সাথে সাথে বলেছিলেন-
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا۝ وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا۝ وَبَرًّا بِوَالِدَىَّ الاية۝
তরজমা: আমি আল্লাহ্র বান্দা, আমাকে তিনি কিতাব (ইঞ্জিল) দান করেছেন। আমাকে নবী করেছেন। আর আমাকে বরকতমন্ডিত করেছেন- আমি যেখানেই থাকিনা কেন। আর আমাকে নামায ও যাকাত (পবিত্রতা)’র নির্দেশ দিয়েছেন- যতদিন জীবিত থাকি। এবং আমাকে আমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারকারী করেছেন।
[সূরা মরিয়ম: আয়াত-৩০]

এ আয়াত শরীফে সব সীগাহ্ (শব্দরূপ) অতীতকাল বাচক (ماضى) ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সবকিছু হয়ে, শিখে এখানে এসেছেন। এ-ই হচ্ছে রসূলের শান।
আমাদের হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জন্মগতভাবে আরিফ-ই কামিল রসূল (পূর্ণাঙ্গ খোদাপরিচিতি সম্পন্ন রসূল)। এ কারণেই হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কখনো গুনাহ্র নিকটেও যাননি। শৈশবে লালিত হবার সময়ে বিবি হালীমা ধাত্রী-মা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার নিকট, যখন অন্যান্য ছেলেরা তাঁকে খোলধূলা করার জন্য ডাকতো, তখন ওই বয়স শরীফে পবিত্র মুখে বলেছেন- مَا خُلِقْنَا لَهذَا (আমরা এ কাজের জন্য সৃষ্ট হইনি)। এ-ই হচ্ছে রসূলের ফিৎরাৎ (জন্মগত স্বভাব) আর এটা হচ্ছে রসূল দুনিয়ায় তাশরীফ আনায়নের শান (অবস্থা)।

যেসব লোক: রসূলগণ আলায়হিমুস্ সালামকে তাদের মতো ‘বে-খবর’, ‘ইল্ম শূন্য’, নবূয়তের পূর্বে ‘পথহারা’ ও ‘দ্বীন শূন্য’ ইত্যাদি বলে মানে বিশ্বাস করে তারা বাস্তবিকপক্ষে রসূলের শান-মানকে অস্বীকারকারী। যদি আমাদের মতো সংশোধন প্রার্থী হতেন, তবে তো তাঁর জন্য আরেক রসূলের প্রয়োজন হতো, যিনি তাকে সংশোধন করতেন, আর ইনি তার উম্মত হতেন!

স্মর্তব্য যে, সর্বাধিক সফল হচ্ছেন ওই ব্যক্তি, যিনি পাক-পবিত্র হয়ে জীবন-যাপন করেন, মহান রবের নাম জপেন এবং নিয়মিত নামায সম্পন্ন করেন। মহান রব এরশাদ ফরমাচ্ছেন- قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّى۝ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى۝
(নিশ্চয় সফলকাম হয়েছে ওই ব্যক্তি, যে পাক-সাফ হয়েছে, যে আপন রবের নাম জপনা করেছে এবং নামায পড়েছে। [সূরা আ’লা: আয়াত-১৪]

বুঝা গেলো যে, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা (পরিশুদ্ধি) সাফল্যের প্রথম ধাপ। প্রশ্ন জাগে পবিত্রকারী কে? এর উত্তরও ক্বোরআন-ই করীমই দিয়েছে। এরশাদ হচ্ছে- وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ-
তরজমা: তিনি (আমার নবী) ওইসব লোককে পাক-সাফ করনে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। অন্য আয়াতে এরশাদ হচ্ছে- خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِيْهِمْ بِهَا-
তরজমা: হে হাবীব! আপনি তাদের মালের সদ্কাহ্গুলো কবূল করে নিন। ওইগুলো দ্বারা আপনি তাদেরকে পাক-সাফ করে দিন।

বুঝা গেলো যে, পবিত্র হচ্ছি আমরা, আর পবিত্রকারী হলেন হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম।
আমাদের নিকট চারটি বস্তু রয়েছে- দেহ, মগজ, হৃদয় ও রূহ (আত্মা)। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামও আমাদের চারটি জিনিষ দান করেছেন- শরীয়ত, ত্বরীক্বত, হাক্বীক্বত, ও মা‘রিফাত। শরীয়ত দ্বারা আমাদের দেহকে পাক করেছেন, ‘ত্বরীক্বত’ দ্বারা আমাদের মগজ ও খেয়ালগুলোকে পবিত্রতা দান করেছেন, ‘হাক্বীক্বত’ দ্বারা হৃদয়কে এবং ‘মা‘রিফাত’ দ্বারা রূহকে পাক-সাফ করেছেন।

একথাও জেনে রাখা দরকার যে, শরীয়তের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে- হুযূর মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দেহ, স্বভাবের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে- হুযূর-ই আকরামের হৃদয় মুবারক, ‘হাক্বীক্বত’-এর উৎসস্থল হচ্ছে হুযূর মোস্তফার রূহ মুবারক এবং মা’রিফাতের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে- নবী-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘সির’ গোপন রহস্য শরীফ।

হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম চার প্রকার আবর্জনা দূর করার জন্য চার প্রকারের পানি দান করেছেন। বাকী রইলো- আমাদের ‘নাফস’-ই আম্মারাহ্। সেটার পুরোটাই নাপাক, যা কোন প্রকারের পানি দ্বারা পাক-সাফ হয়না। সেটাকে পাক করার জন্য ইশ্ক্বে মোস্তফার আগুন দান করেছেন, যা দ্বারা ‘নাফস’কে জ্বালিয়ে সেটার হাক্বীক্বতকে বদলে ফেলো। সেটার হাক্বীক্বতকে বদলে ফেলতে পারলে সেটার না-পাকী দূরীভূত হয়ে যায়।

মোট কথা, যেকোন অবস্থাতেই সৃষ্টি জগতের জন্য রসূলের প্রয়োজন তেমনি, যেমন যমীনের জন্য পানির প্রয়োজন। বাগানের জন্য দরকার বৃষ্টির। যমীনের কোন অংশই কখনো বৃষ্টির অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। অনুরূপ কোন মানুষই চাই যেকোন স্তরেরই হোক না কেন, কখনো- জীবন, মৃত্যু, কবর ও নশরে হুযূর-ই আকরামের অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। যেভাবে বাগানের প্রতিটি পাতা-পল্ল­ব, শাখা ও কাঁটা বৃষ্টির প্রতি ঋণী। তেমনি মাখলুক্বের প্রতিটি পূর্ণতা (গুণ) নবী-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দরবার-ই পাকের দয়ার মুখাপেক্ষী। তাঁরই মহান রবের শপথ! যে যা পেয়েছে, সে তা তাঁরই হাত থেকে পেয়েছে কবি বলেন-
لا ورب البيت جو جس كو ملا ان سے ملا
بٹتى هے كو نين ميں نعمت رسو الله كى
অর্থ: বায়তুল্লাহ্ শরীফের মহান রবের শপথ! যে যা পেয়েছে, সে তা তাঁরই নিকট থেকে পেয়েছে, উভয় জাহানে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নি’মাত-ই বন্টন করা হয়।

লেখক: মহাপরিচালক- আন্জুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •