শানে রিসালত

0

শানে রিসালত
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভাগমনের ফলে বহু লা-‘এলাজ রোগের শেফা হয়েছে
লা-‘এলাজ রোগী, বিপদগ্রস্ত, আরোগ্য লাভে আশাহীন এবং বাতেনী ধ্বংসকারী রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগী, এমনকি শয্যাশায়ী হৃদরোগী পর্যন্ত হুযূর-ই আক্রামের চিকিৎসার ফলে আরোগ্য লাভ করে সুস্থ হয়ে গেছে। এ নি’মাত-ই ‘উযমা হাসিল হওয়া মাহবুব-ই দো‘আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো থেকে সম্ভবপর ছিলো না। অগণিত মুশরিক-কাফিরের হৃদয়-মনকে সংশোধন করে ঈমানী আলোয় আলোকিত করা এমন এক মহান সংস্কারক ও চিকিৎসকের উপর নির্ভরশীল ছিলো, যিনি একদিকে আ-রিফে রব্বানী এবং ‘আলিম-ই আসমা ও সিফাত, অন্যদিকে খোদার বিধানাবলী ও তাঁরই নির্দেশিত কার্যাবলী সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াক্বিফহাল। তদুপরি, তাঁর বয়ান বা বর্ণনা হবে ‘জ¦ালাময়ী’, হৃদয়স্পর্শী, যা শ্রোতার হৃদয়-মনকে আকৃষ্ট করে মুহূর্তের মধ্যে তাতে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। এমনসব গুণ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সত্তা ব্যতীত অন্য কারো সত্তায় সন্নিবিষ্ট হতে পারে না। তিনি যাহেরী রোগ-ব্যাধিরও সুদক্ষ চিকিৎসক, ক্বলব বা আত্মার শেফার জন্য মহাজ্ঞানী হাকীম। তাঁর বরকতময় হাতে এমন অনেক দৈহিক রোগী সব সময়ের জন্য পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেছে, যারা ‘মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছে ছিলো। লাখো-কোটি হৃদয়ের রোগী আরোগ্য লাভ করেছে। ওই সম্প্রদায়, যারা পশুর ন্যায় নিজেদের জীবনের রাত ও দিনগুলো অতিবাহিত করেছিলো, এক কৃপাদৃষ্টিতেই তারা আপাদমস্তক উন্নত চরিত্র হয়ে গিয়েছিলো। যারা কুফর ও শির্কের অন্ধকাররাশিতে আটকা পড়ে বন্ধুর উপত্যকাগুলোতে মাথা মারতে মারতে ঘুরপাক খাচ্ছিলো, তারা একটি মাত্র আওয়াজ শুনে সরল-সোজা পথে এসে গিয়েছিলো।
হুযূর-ই আক্রামের সত্যের প্রতি আহ্বান, ওই পশুসুলভ চরিত্রের অধিকারী মানুষগুলোকে সত্যিকার অর্থে ‘ইনসান’ করে ফেলেছে। ওইসব মস্তকে, যেগুলোতে গর্ব ও অহংকার ছিলো, মাহবূব-ই দু’ আলমের কৃপাদৃষ্টিতে আবাদ হয়ে গিয়েছে। ওইসব হৃদয়, যেগুলোকে লাত-ওয্যার ভালবাসা ছাইয়ে ফেলেছিলো, রসূল্-ই মু‘আয্যমের দৃষ্টি মুবারকের কৃপাদৃষ্টিতে এক, লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতকারী হয়ে গেছে। এ মহান আরোগ্যদাতার অগণিত মু’জিযার কথা হাদীস শরীফগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো পড়লে হতভম্ব হতে হয়!
হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম কয়েকটা মু’জিযা দেখিয়ে আসমানের উপর তাশরীফ নিয়ে গেছেন, হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম যাদুকরদেরকে পরাস্ত করেছেন। আর আমাদের নবীর সাথে মোকাবেলা করার জন্য যেই আসুক না কেন? সে-ই পরাজিত হয়ে যায়। ভাষালঙ্কার শাস্ত্রের ইমামগণকে একটি মাত্র মোকাবেলায় নবী-ই আক্রামের সামনে ঝুঁকে যেতে দেখা গেছে। আবূ জাহলের পুত্র বদরের যুদ্ধে হযরত মু‘আওভায ইবনে আফরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর হাত কেটে ফেলেছিলো। তিনি নিজের ওই কর্তিত হাত তুলে নিয়ে হুযূর-ই আক্রামের পবিত্র দরবারে হাযির হয়ে গিয়েছিলেন। হুযূর-ই আক্রাম কর্তিত হাতটি নিলেন এবং সেটার স্থানে লাগিয়ে দিলেন। তখনই তা সুস্থ হাতের মতো জুড়ে গিয়েছিলো। দুনিয়ার কোন বড় থেকে বড়তর সার্জনও এমনটি করে দেখাতে পারেননি; পারবেনও না।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বলেন, এক মহিলা তাঁর পুত্রকে নিয়ে হুযূর-ই আক্রামের দরবারে হাযির হলেন। আর আরয করলেন, ‘‘হুযূর! তার মধ্যে উম্মাদনার রোগ দেখা গিয়েছে।’’ হুযূর-ই আক্রাম আপন হাত মুবারক তার বুকের উপর বুলিয়ে নিলেন। আর বললেন, ‘‘اُخْرُجْ (বেরিয়ে যা!)।’’ অতঃপর তার পেট থেকে কালো কুকুরের ছোট ছোট ছানার মতো বের হয়ে গেলো আর ছেলেটি সুস্থ হয়ে গেলো। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুল করীমের চোখ উঠেছিলো। হুযূর-ই আক্রাম তাঁর চোখ দু’টিতে নিজের থুথু মুবারক লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে ওই চক্ষু যুগল আরোগ্য লাভ করেছিলো।
‘মাওয়াহিব-ই লাদুন্নিয়া’র প্রণেতা মহোদয় লিখেছেন, আল্লামা ক্বোশায়রী বর্ণনাকারী, তাঁর সাহেবযাদা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন; এমনকি সে মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিলো। আরোগ্য লাভের আশাটুকুও বাকী থাকেনি। তিনি বলেন, আমি আমার আক্বা ও মাওলা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখার সৌভাগ্য লাভ করলাম। আমি হুযূর-ই আক্রামের পবিত্র দরবারে আমার সন্তানের অসুস্থতার কথা জানালাম। তখন হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘তুমি আয়াতে শেফাগুলো থেকে কেন উদাসীন হয়ে আছো?’’ অতঃপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি শেফার আয়াতগুলো লিখে সেগুলো ধুয়ে আমার পুত্রকে পান করিয়ে দিলাম। তারপর এমন হতাশার অবস্থায় আশার আলো দেখা গেলো। সে এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলো যেন তার কোন রোগই ছিলোনা। আয়াতে শেফা (শেফার আয়াতগুলো) নি¤œরূপ-
وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍۢ مُّؤْمِنِينَ وَشِفَآءٌ لِّمَا فِى ٱلصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ ـ يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ ـ نُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ ۙ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ ـ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ
হযরত আবূ বকর রাযী বলেন, ‘‘আমি ইসফাহানে ‘আবূ নু‘আয়মের নিকট ছিলাম। এক ব্যক্তি বললো, আবূ বকর ইবনে আলী সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। ফলে তিনি বন্দী হয়ে গেছেন। অতঃপর আমি হুযূর-ই আক্রামকে স্বপ্নে দেখেলাম। জিব্রাঈল আমীন হুযূর-ই আক্রামের ডান পাশে ছিলেন। হুযূর-ই আক্রামের আপন বরকতময় ওষ্ঠযুগল কোন তাসবীহ্ পাঠের কারণে নড়ছিলো। তখন হুযূর-ই আক্রাম আমাকে এরশাদ করলেন, ‘‘আবূ বকর ইবনে আলীকে বলে দাও যেন সে ‘দো‘আ-ই কারব’, যা বোখারী ও মুসলিম শরীফে আছে, পড়ে। আর যেন এ পর্যন্ত পড়ে ‘‘আল্লাহ্ বালা দূরীভূত করুন!’’
ভোর হতেই আমি তাঁকে তা বলে দিলাম। তিনি তা পড়লেন। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতেই তিনি মুক্ত হয়ে এসে গেলেন। ওই ‘দো‘আ-ই কারব’, যা শায়খাঈন বর্ণনা করেছেন, তা হচ্ছে-
لاَ اِلهَ اِلاَّ اللهُ الْعَظِيْمُ الْحَكِيْمُ لاَاِلهَ الله رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيْمِ لاَاِلهَ اِلاَّ الله رَبُّ السَّمَواتِ وَالْاَرْضِ وَرَبُّ الْعَرِشِ الْكَرِيْمِ
আল্লামা খরপূতী তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন, আমাদের যুগেও এমন এক ঘটনা ঘটলো। আর তা এ হলো যে, আমাদের ওস্তাদের স্ত্রী হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। তিনি এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছেন যে, রাতে ও দিনে কখনো শান্তি পাচ্ছিলেন না। সব সময় শোর-চিৎকার করছিলেন। এমন জোরে চিৎকার করছিলেন যে, প্রতিবেশীরাও বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। চিকিৎসকদের চিকিৎসা নেওয়া হলো; কিন্তু কোন উপকার হয়নি। সুতরাং তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন যেন আমার পক্ষ থেকে রসূলে পাকের দরবারে একটি দরখাস্ত লিখে পেশ করি এবং এ রোগ থেকে শেফার জন্য আবেদন করি। সুতরাং আমি দরখাস্ত এভাবে লিখলাম-
প্রথমে সালাত ও সালাম লিখে আমার উদ্দেশ্য উল্লেখ করলাম। আর হাজীগণ, যারা হজ্জে যাচ্ছিলেন, তাঁদের মাধ্যমে তা পাঠিয়ে দিলাম। আমরা দিন গুণতে লাগলাম। এমনকি যেদিন হাজীগণ মদীনা শরীফে পৌঁছেছেন, ওই দিনই তাঁর শোর-চিৎকার বন্ধ হয়ে গেলো এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন।
হযরত উম্মে সালামাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেন, এক মরুভূমিতে হুযূর-ই আক্রাম তাশরীফ রাখছিলেন। এক হরিণী ‘ইয়া রসূলাল্লাহ্’ বলতে বলতে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলো। হুযূর-ই আন্ওয়ার সেটার নিকটে গেলেন আর এরশাদ করলেন, ‘‘তুমি কি চাও!’’ সেটা আরয করলো, ‘‘হুযূর, আমাকে এ গ্রাম্য লোক শিকার করে ধরে ফেলেছে। ওই পাহাড়ে আমার দু’টি শাবক (বাচ্চা) রয়েছে। হুযূর! আমাকে খুলে দিন! আমি ওই দু’টি বাচ্চাকে দুধ পান করিয়ে আসি! আমি এর পরক্ষণে ফিরে আসবো।’’ হুযূর-ই আক্রাম বললেন, ‘‘তুমি অবশ্যই ফিরে আসবে তো?’’ তা আরয করলো, ‘‘জ্বী! অবশ্যই ফিরে আসবো।’’
হুযূর-ই আক্রাম সেটাকে খুলে দিলেন। সেটা চলো গেলো এবং দুধ পান করিয়ে ফিরে আসলো। গ্রাম্য শিকারীটি এ সম্পর্কে জানতে পারলো। তখন সে আরয কররো, ‘‘হুযূর! এখন আপনার যা মর্জ্জি হয় করুন!’’ হুযুর-ই আন্ওয়ার এরশাদ করলেন, ‘‘তুমি সেটাকে (হরিণী) আযাদ করে দাও!’’ গ্রাম্য লোকটি সেটাকে আযাদ করে দিলো। আর বলতে লাগলো- اَشْهَدُ اَنْ لاَ اِلهَ الا اللهُ وَاَنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, আর নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রসূল!)
ইমাম বূসীরী আলায়হির রাহমাহ্র নি¤œলিখিত পংক্তি দ্বারা এ প্রসঙ্গে নিবন্ধটি’র ইতি টানছি-
كَمْ اَبْرَأَتْ وَصِبًا بِالَّلًمْسِ رَاحَتُه —ـ وَاَطْلَقَتْ اَرِبًا مِّنْ رِّبِقَةِ الَّلمَم
অর্থ: অনেকবার আরোগ্য লাভ করেছে রোগী তাঁর (হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বরকতমন্ডিত হাতের তালুর স্পর্শ দ্বারা আর আযাদ হয়ে গেছে হাজমতমন্দ (মুখাপেক্ষী) উন্মাদনার ফাঁদ থেকে।
[ক্বসীদাহ্-ই বোর্দাহ্ শরীফ]

মহাপরিচালক-আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •