হাজরে আসওয়াদ ও মাক্বামে ইবরাহীম আল্লাহর কুদরতী নিদর্শন

0

হাজরে আসওয়াদ ও মাক্বামে ইবরাহীম আল্লাহর কুদরতী নিদর্শন
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি
عَنْ عَبْدِ الله بن عَمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنَّ الْحَجْرَ وَالْمَقَامَ يَاقُوْتَانِ مِنْ يَاقُوت الجَنَّةِ طَمَسَ اللهُ نُوْرُهَمَا لَوْلَا ذَالِكَ لَاضَاءَتَا مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْاَرْضِ اَوْمَا بَيْنَ الْمشرقَ وَالْمَغْرِبَ- (مسند احمد ۲/۲۱۴– صحيح ابن خذيمه)
অনুবাদ: হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হাজরে আসওয়াদ এবং মাক্বামে ইবরাহীম জান্নাতের ইয়াকুত পাথর সমূহের দুটি ইয়াকুত পাথর আল্লাহ্ তা‘আলা এর নূরকে নিস্প্রভ করে দিয়েছেন যদি এ দুটি পাথরের নয়র নিস্প্রভ না করতেন তাহলে পূর্ব দিকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত আলোকিত হয়ে যেতো।
[মুসনাদে আহমদ: ২/২১৪ সহীহ ইবনে খুজায়মা: হাদীস নম্বর ২৭৩১, তারিখে মক্কা মুর্কারমা: পৃষ্ঠা ৬৮, তিরমিযী শরীফ খণ্ড. ২, পৃষ্ঠা ২৪৮, হাদীস নম্বর ৮৭৯, বাহারে শরীয়ত: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৯২]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
বর্ণিত হাদীস শরীফে দুটি জান্নাতি পাথরের গুরুত্ব আলোকপাত হয়েছে। পবিত্র ক্বোরআন মজীদ ও অসংখ্য হাদীস শরীফের আলোকে এ পাথর দুটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এগুলো আল্লাহর কুদরতী নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। ক্বাবা কেন্দ্রিক আল্লাহ্ কর্তৃক নির্দ্ধারিত পবিত্র নিদর্শনাদির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে তাকওয়ার পরিচায়ক বলা হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেছেন, وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
অর্থ: যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই। [সূরা হজ্ব: আয়াত- ৩২]

পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে আল্লাহর কুদরতী নিদর্শন
বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ক্বিবলা বাইতুল্লাহ্ তথা ক্বাবা শরীফকে কেন্দ্র করে পূণ্যভূমি মক্কা মুর্কারামায় রয়েছে আল্লাহ্র অসংখ্য কুদরতী নিদর্শন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন- فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ অর্থ: সেটার মধ্যে সুষ্পষ্ট নিদর্শনাদি রয়েছে, ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থান। [সূরা আল-ইমরান: আয়াত ৯৭] বণির্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকারক হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রণীত তাফসীর নুরুল ইরফানে উল্লেখ রয়েছে, এতে রয়েছে বহু বরকতময় নিদর্শন, যেমন মাক্বাম-ই ইবরাহীম, হাজরে আসওয়াদ, সাফা মারওয়া, রুকনে ইয়ামীন, আরাফাত, মিনা ইত্যাদি।
আল ক্বোরআনে মাক্বামে ইবরাহীমের বর্ণনা
মাক্বাম-ই ইবরাহীম এমন এক জান্নাতি পাথর যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম ক্বাবা শরীফ নির্মাণ করেছেন। এ পাথরে হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর গভীর পদচিহ্ন অদ্যাবধি বিদ্যমান। হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম ক্বাবা শরীফ নির্মাণকালে ক্বাবা ঘরের দেওয়ালগুলোর উচ্চতা অনুসারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ পাথর উপরের দিকে উঠে যেতো। এবং নীচে অবতরণের সময় পাথর নীচে মেনে যেতো। একটি জড় পাথরের পক্ষে প্রয়োজনানুসারে উঁচু নীচু হওয়া ও মোমের মতো নরম হয়ে আল্লাহর নবীর পদচিহ্ন নিজের মধ্যে ধারণ করা আল্লাহ্র অপার কুদরতের নিদর্শন। বাইতুল্লাহ্ শরীফ সাতবার তাওয়াফের পর হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে বাইতুল্লাহ্ শরীফ ও মাক্বামে ইবরাহীমকে সামনে রেখে দু’রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব। একে তাওয়াফের নামায বলা হয়। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে- وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى আর ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ করো। [সূরা বাক্বারা: আয়াত ১২৫] এ দু’রাকাত ওয়াজিব নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস পাঠ করবে। যদি সেখানে নামাযের জায়গা পাওয়া না যায় হাতিমের ভিতরে অথবা মাতাফের যেখানে জায়গা পাওয়া যাবে সেখানে উক্ত নামায পড়লে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। [আলমগীরি ১ম খণ্ড]
হাদীস শরীফের আলোকে মাক্বামে ইবরাহীমে নামায
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আগমন করে বাইতুল্লাহ্র তাওয়াফ করেন এবং মাক্বামে ইবরাহীমের পেছনে দু’রাকাত নামায আদায় করেন এবং সাফা মারওয়ার মাঝে সাতবার সাঈ করেন।
[বুখারী শরীফ, ফিকহুস সুনানি ওয়াল আছার কৃত: মুফতি সাইয়্যেদ আমিনুল ইহসান (রাহ.)]
মাক্বামে ইবরাহীম সম্মানিত হওয়ার কারণ
মাক্বামে ইবরাহীম পাথরটিতে আল্লাহ্র নবী হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর কদম শরীফ স্পর্শ হওয়ার কারণে সেটা মর্যাদা মন্ডিত হয়েছে। মাক্বামে ইবরাহীমের প্রতি নামাযে সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামান্তর। এ সম্মান নামাযকে ত্রুটিপূর্ণ করবে না বরং নামাযকে পরিপূর্ণ করবে। প্রতীয়মান হলো পাথর নবীর কদম স্পর্শ হওয়ার কারণে যদি সম্মানিত হয়ে যায়, তাহলে নবীজির পবিত্র বিবিগণ ও সাহাবায়ে কেরাম এবং নবীজির পবিত্র বংশধরগণের মর্যাদা কতো বেশী হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। [তাফসীরে নুরুল ইরফান: ১ম খণ্ড]
মাক্বামে ইবরাহীমের অবস্থান
ক্বাবা শরীফের পূর্বদিকে সোনালী ফ্রেমে যে প্রস্তরখণ্ড সংরক্ষিত আছে তাকে মাক্বামে ইবরাহীম বলে। চার হাজার বছরের অধিককাল অতিবাহিত হওয়ার পরও হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর কদম মোবারক’র চিহ্ন এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত তা অপরিবর্তিত থাকবে। প্রতিটি পায়ের ছাপের দৈর্ঘ্য ২৭ সেন্টিমিটার প্রস্ত ১৪ সেন্টিমিটার দুই পায়ের মধ্যে ব্যবধান প্রায় এক সেন্টিমিটার। পাথরটিতে হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর পায়ের চিহ্নের গভীরতা পাথরটির উচ্চতার অর্ধেক ৯ সেন্টিমিটার। এটি দুআ কবুলের স্থান।
হাজরে আসওয়াদ জান্নাতি পাথর
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত-
عن ابن عباس رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم نزل الحجر الاسود من الجنةِ وهو اشدّ بَيَاضًا من اللبنِ فسودته خطايا بنى ادم- (رواه الترمذى والدارمى)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথরটি) জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। সেটা দুধের চেয়েও অধিক সাদা ছিল, আদম সন্তানের গুনাহ্ সেটাকে কালো বানিয়ে দিয়েছে। [তিরমিযী শরীফ: ২য় খণ্ড, ২৪৮, হাদীস নম্বর ৮৭৮, বাহারে শরীয়ত: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৯২]
হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা ও চুমু দেওয়া নবীজির সুন্নাত
عَنْ ابن عُمَرَ رَضِىَ الله عنهما اَنَّهُ سُئِلَ عَنْ اِسْتِلَامِ الْحَجِرِ فَقَالَ رَاَيْتُ رسُوْلُ الله صلى الله عليه وسلم يُسلِّمه ويُقَبّلُهُ- (رواه البخارى)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমাকে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি তিনি তা স্পর্শ করেছেন ও চুম্বন করেছেন। [বুখারী শরীফ, ফিকহুস্ সুনানি ওয়াল আছার: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২] হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন-
ما تركته منذ رايت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقبله- (رواه مسلم)
আমি যখন থেকে হাজরে আসওয়াদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে চুম্বন করতে দেখেছি তখন থেকে আমি সেটাতে চুম্বন করা ত্যাগ করিনি। [সহীহ মুসলিম শরীফ: হাদীস নম্বর ১২৬৮, তারিখে মক্কা মুর্কারমা: পৃষ্ঠা ৬৯]
কিয়ামতের দিবসে হাজরে আসওয়াদ সাক্ষ্য দিবে
عن ابن عباس رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم فى الحجر والله يبعثه اللهُ يَوْمَ الْقيامة لهُ عَينَانِ يُبصربهما ولسان ينطقُبه يشهد على من استلمه بحق- (رواه الترمذى وابن ماجه والدارمى)
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ সম্বন্ধে এরশাদ করেছেন, আল্লাহর শপথ আল্লাহ্ সেটাকে কিয়ামত দিবসে এমনভাবে উঠাবেন যে, সেটার দুটি চক্ষু থাকবে যে চক্ষুদ্বয় দিয়ে সে দেখতে পাবে। একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে কথা বলবে। চুম্বনকারীদের পক্ষে সত্য সাক্ষ্য দিবে। [তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, দারেমী শরীফ] প্রতীয়মান হলো, এ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ সেটাকে চুম্বন করেছে, সেটা তাদের সবাইকে জানে ও চিনে। এমনকি মু’মীনের অন্তরের ইখলাস ও মুনাফিকদের নিফাক সম্পর্কেও অবগত। [মিরআতুল মানাজীহ ৪র্থ খণ্ড কৃত: হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী (রাহ.)]
হাজরে আসওয়াদ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে
উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে হাজরে আসওয়াদের নিকট উপস্থিত হবে, সেটা কিয়ামতের দিন তাকে সুপারিশ করবে। [দুররে মনছুর, কানযুল উম্মাল: খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৯৮, আনোয়ারুল বায়ান: খণ্ড ৩৩, পৃষ্ঠা ২৮৩]
লেখক: অধ্যক্ষ- মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), হালিশহর, বন্দর, চট্টগ্রাম।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •