বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়তের জাগরণে শাহানশাহ্ এ সিরিকোট

0

বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়তের জাগরণে শাহানশাহ্ এ সিরিকোট
[রহমাতুল্লাহি আলায়হি]
মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার
গাউসে জামান, সৈয়্যদুল আউলিয়া,পেশওয়ায়ে আহলে সুন্নাত, আল্লামা হাফেজ সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি, পেশোয়ারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, কালে কালে কখনো ‘আফ্রিকাওয়ালা পীর’, কখনো ‘সীমান্ত পীর’, কখনো ‘পেশওয়ারী সাহেব’, শেষের দিকে ‘সিরিকোটি হুজুর’, এমনকি চট্টগ্রামে শুভ আগমনের শুরুতে ‘ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের পীর’ হিসেবেও অভিহিত হতেন। এই ক্ষণজন্মা মহান সংস্কারক অলীই এই নিবন্ধে ‘শাহানশাহ্ এ সিরিকোট’ উপাধিতে আলোচিতব্য। আজ বাংলাদেশ’র সুন্নি অঙ্গনে এই ‘শাহানশাহ্ এ সিরিকোট’ একটি প্রাতঃস্মরণীয় নাম, একটি জাগরণী শ্লোগান। শাহানশাহ্ এ সিরিকোট’র জন্ম পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বর্তমান খাইবার পাখতুন প্রদেশের বিখ্যাত মাশওয়ানি, ‘সৈয়্যদ’ অধ্যুষিত ‘সিরিকোট’ পার্বত্য অঞ্চলের শেতালু শরিফে ১৮৫৬-৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বা তারও কয়েকবছর আগে। তিনি বংশ পরম্পরায় হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৩৮তম অধস্তন বংশধর। [শাজরা শরীফ, প্রকাশনায়, আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট] ইমাম হোসাইন (রা)’র পঞ্চম অধস্তন বংশধর সৈয়্যদ জালাল আর রিজাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মদিনা পাক ছেড়ে ইরাকের ‘আউস’ এ চলে আসেন। পরবর্তিতে তাঁর ৫ম অধস্তন বংশধর মীর সৈয়্যদ মুহম্মদ গেসুদারাজ সুলতান মাহমুদ গজনবী রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র সময়ে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আফগানিস্তান হিজরত করেন, এবং তাঁর সাথে ভারত অভিযানেও শরীক হন। আফগান-বেলুচিস্তানের সীমান্তের ‘কোহে সোলাইমানি’তে তিনি শায়িত আছেন, যে জায়গাটি সুলতান গজনবীর উপহার হিসেবেই তিনি লাভ করেন, এবং এখানে বসেই তিনি মুলতান পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিয়ে ৪২১ হিজরিতে ওফাত বরণ করেন, আর এই সময়টা ছিল খাজা গরীব নওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র ভারত আগমনের দুইশ বছর আগে। এ গেসুদারাজ (আউয়াল)’রই ১২ তম অধস্তন পুুরুষ হলেন সিরিকোট বিজয়ী, ফাতেহ্ সিরিকোট সৈয়্যদ গফুর শাহ্ ওরফে কাপুর শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি। [Local govt. Act: (Ref-15) Hazara 1871] তিনি আফগানের কোহে সোলাইমানি হতে হিজরত করে উত্তর- পশ্চিম সীমান্তের কোহে গঙ্গরে আসেন এবং অত্যাচারী শিখ রাজাদের প্রতিহত করে যে এলাকাটি ইসলামের জন্য আবাদ করেন এর বর্তমান কেন্দ্রস্থল ‘সিরিকোট’। ‘সের’ মানে মাথা, আর কোহ্ ‘হল পাহাড়। ‘সেরকোহ’ মানে ‘পাহাড়ের চূঁড়া’ বা পাহাড় শীর্ষ। এই ইসলাম বিজয়ী বীর হযরত সৈয়্যদ গফুর শাহ্ ওরফে কাপুর শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি গঙ্গর পাহাড়ের একদম মাথায় বসবাস করতেন বিধায় তাঁর আবাস বুঝাতে ‘সেরকোহ্ শব্দটি ব্যবহার হয়, এবং কালের বিবর্তনে মানুষের মুখে শব্দ পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারায় বর্তমানে এ এলাকা ‘সিরিকোট’ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। ফাতেহ্ সিরিকোট সৈয়্যদ গফুর শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র ১৩ তম অধস্তন পুুরুষ হযরত সৈয়্যদ সদর শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র ই শাহজাদা হলেন এই প্রবন্ধে আলোচিত শাহানশাহ্ এ সিরিকোট, আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি, পেশোয়ারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি।
[শাজরা শরীফ, প্রকাশনায়, আনজুমান -এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট] সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার এই মহান দিকপাল শুধু কাদেরিয়া ত্বরিকাকে নয়,এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে ভ্রমন করে সুন্নিয়ত কেও পূনর্জাগরিত করেছিলেন তাঁর শতাধিক দীর্ঘ হায়াতে তাইয়্যেবাকে কাজে লাগিয়ে। তাই আজ বাংলাদেশ-বার্মা, আফ্রিকা-পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য সহ পৃথিবীর বহুদেশ-জনপদে একটি আদর্শ, একটি প্রেরণার নাম হলেন শাহানশাহে সিরিকোট রহমাতুল্লাহি আলায়হি।
ক. শিক্ষা-দীক্ষা
ঐতিহ্যগত উন্নত পারিবারিক শিক্ষা, তালিম, তারবিয়তের পাশাপাশি তিনি ছিলেন পরিত্র কোরানে করিমের হাফেজ। কোরান, হাদিস, উসুল-ফেকাহ্ ইত্যাদি দ্বীনিয়াত বিষয়ে শিক্ষা তিনি স্থানীয় জেলা সহ ভারত-পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসার উপযুক্ত ওস্তাদগন থেকে আয়ত্ব করেন। লিখিত সনদ অনুসারে, ১২৯৭ হিজরির শা’বান মাসে তাঁকে ‘মমতাজুল মুহাদ্দেসীন’ সনদ প্রদান করে দস্তারে ফজিলত অর্পন করা হয়। যা ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রদান করেন। তাঁর ত্বরিকত জীবনের দীক্ষা গুরু ছিলেন হরিপুরের বিখ্যাত কামেল অলী, গাউসে দাঁওরা, খলিফায়ে শাহে জীলাঁ, খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী আল আলাভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি।
[শাজরা শরীফ, প্রকাশনায়, আনজুমান -এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট] ১৯১২ তে, আফ্রিকা হতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি শত শত বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার এমন কামেল মুর্শিদের হাতে বয়াত গ্রহণ করে ত্বরিকত জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেন। তাঁর পীর খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র আধ্যাত্মিক মর্যাদার অনুমান সাধারণের জন্য সাধ্যাতীত। যিনি প্রাতিষ্ঠানিক-আনুষ্ঠানিক কোন প্রকারের শিক্ষার্জনের সুযোগ লাভ করতে পারেননি, অথচ তাঁর অদৃশ্য আধ্যাত্মিক ‘ইলমে আতায়ি’ দিয়ে রচনা করে গেছেন ১৮ টি কিতাব। এর একটি কিতাব হল ৩০ পারা বিশিষ্ট দরুদ গ্রন্থ ‘মজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’, যা বড় বড় আল্লামাদের পর্যন্ত আক্বল হয়রান হবার মত একটি কিতাব। দুনিয়ার বুকে কোরান শরিফ, বোখারি শরিফের পর এটিই তৃতীয় ৩০ পারা কিতাব যা মাকসাদ হাসিল ও বরকতের জন্য খতম দেওয়ার রেওয়াজ চালু আছে। বিশুদ্ধ আরবীতে রচিত এ অনবদ্য দরুদ গ্রন্থের একটি কপি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের এক আরব পাঠকের নজরে আসবার পর, তিনি কিতাবটির মলাটে আরবিতে একটি মন্তব্য লিখে যান যে, ‘‘এটা কখনো কোন অনারবের রচনা হতে পারেনা’’। উল্লেখ্য, যেহেতু এ বিরল দরুদ গ্রন্থের লেখক খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র পরিচয় হল তিনি পাকিস্তানের হরিপুর জেলার বাসিন্দা, একজন অনারব। অর্থাৎ অনারবের পক্ষে এত উচ্চাঙ্গের আরবী ভাষার কিতাব রচনা কখনও সম্ভব হবার কথা না।
খ. ইসলামের মূলধারা ‘সুন্নিয়ত’
কোরান-সুন্নাহ্, এজমা-কেয়াস এবং মাজহাব ও সূফিবাদের সুসামন্জস্যপূর্ণ বিশ্বাস ও আমলই মূলত সুন্নিয়ত। এটাই ইসলামের মূলধারা। এ আক্বিদা-আমলের মুসলমানরাই সুন্নি মুসলমান। সুন্নি মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, শুধু শরিয়তের অনুসরণ সফলতার জন্য যথেষ্ট নয়, দরকার তাসাওফের পথ ত্বরিকতও। আবার শরিয়ত বাদ রেখে শুধু ত্বরিকত-মারেফাত চর্চা সুন্নিয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, এমন সুসামঞ্জস্যপূর্ণ অবিতর্কিত আদর্শের অনুসারী সফল পুরুষগণের মধ্যে হযরত গাউসুল আযম জিলানী, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি, শেহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দী, বাহাউদ্দিন নক্সবন্দী, মুজাদ্দিদ আল ফেসানি রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র পথ ও মত কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, নক্সবন্দীয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত। উক্ত মূল ত্বরিকত দর্শনের অনুসরণে এবং সিলসিলাহ্ পরম্পরায় পরবর্তিতে আরো কিছু ত্বরিকত দর্শন আত্মপ্রকাশ করলেও প্রথমোক্ত চারটিই বিশ্বব্যাপি বহুলভাবে সমাদৃত ও পরিচিত। উল্লেখ্য, ত্বরিকত সমূহের উক্ত মূলধারার অপর নামও কিন্তু সুন্নিয়ত। যদিও এসব ধারার অনুসারী দাবিদারদের মধ্যে ইদানিং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিয়া ও ওহাবী মতবাদের আক্বিদা-আমল ও আচরণ লক্ষ্যণীয়। এরপরও, সহজভাবে আমরা সুন্নি বলতে বুঝব কোরান-সুন্নাহ্ -এজমা, কেয়াস-মাজহাব-ত্বরিকতে বিশ্বাসী ও অনুসারী বৃহত্তর ইসলামি জনগোষ্ঠীকে। এরাই, হাদিস শরীফে নির্দেশিত একমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত দল ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত’। যাদের পরিচয় হল ‘‘মা আনা আ’লাইহি ওয়া আসহা-বি।’’ [আল হাদিস]
গ.বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়ত প্রচারে শাহানশাহ্
এ সিরিকোটের কর্মযজ্ঞ
হযরত সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতার ইতি টানবার পর থেকেই নিজেকে দ্বীনের কাজে নিয়োজিত করে দ্বীনি শিক্ষাকে কাজে লাগাতে শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অবদান এ প্রবন্ধের শিরোনামের প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় সংক্ষেপে তুলে ধরলামঃ
দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলাম প্রচার
১৮৮০-১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে, তিনি প্রথমে আপন মাশওয়ানি সৈয়্যদ বংশের এক তাপসী নারীর সাথে পারিবারিক ঐতিহ্যানুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, এরপরই কোন এক সময়ে ইসলাম প্রচারের ব্রত নিয়ে পূর্বপুরুষ আহলে বাইতগণের পথ ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছুটে যান ইসলাম প্রচারের কাজে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপটাউন, মোম্বাসা ও জাঞ্জিবারের বিভিন্ন জনপদে তাঁর হাতে অসংখ্য স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। Dr Ibrahim M Mahdi, মাহদি লিখিত A short history of Islam in South Africa গ্রন্থের স্বীকৃতি অনুযায়ী এ সব অঞ্চলের ইসলাম প্রচারকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফলকাম প্রচারক হলেন সৈয়্যদ আহমদ পেশওয়ারী নামক একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী। উল্লেখ্য, পাকিস্তান অর্জনের আগেকার ঐ সময়ে সিরিকোটি হুজুর ভারতীয় হিসেবেই পরিচিত হবার কথা। আর তিনি ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি সুন্নতি পেশা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে আফ্রিকার একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী হিসেবেও গণ্য হতেন। পরবর্তিতে, ১৯১১ সনে, তাঁর নিজের অর্জিত অর্থে আফ্রিকার প্রথম জামে মসজিদটি তাঁর হাতেই নির্মিত হয়।
[Dr.Ibrahim M Mahdi,, প্রাগুক্ত] পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থেও সিরিকোটি হুজুরের আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারের তথ্য পাওয়া যায়।
[প্রফেসর ড. মাসউদ আহমদের ইফতিতাহিয়্যা, মুফতী আবদুল কাইয়্যুম হাযরাভী, আল্লামা আবদুল হাকীম শরফ কাদেরী, আল্লামা সৈয়দ আমির শাহ্ গীলানী, ড. মমতাজ আহমদ ছদিদীসহ বিভিন্ন স্কলারদের কিতাব] বিশেষত, তাঁর বড় নাতি, দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরিফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন হযরত, আল্লামা সৈয়্যদ মুহম্মদ তাহের শাহ্ মাদ্দাজিল্লুহুল আলিও একবার অধম প্রবন্ধকারের জিজ্ঞেসে বলেছিলেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ঐ জামে মসজিদের দেখভাল করার দায়িত্ব অদ্যাবধি তাঁর নানার বংশের আত্মীয়দের হাতে রয়েছে। সিরিকোটি হুজুরের সহোদর ভাই সৈয়্যদ মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ্ ১৯১১ সালে স্বপরিবারে উক্ত মসজিদসহ দ্বীনী মিশনের দায়িত্ব পালনের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় হিজরত করেন। [অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান, সুন্নিয়তের নবদিগন্ত উন্মোচনকারী পথিকৃত, হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রহ. তরজুমান যিলক্বদ সংখ্যা ১৪৩৯ হিজরী] উল্লেখ্য, হুজুর কেবলা তাহের শাহ্’র দাদা সিরিকোটি শাহ্ এবং নানাজি সৈয়দ ইউসুফ শাহ্ সম্পর্কে আপন ভাই হন। সৈয়্যদ বংশের পবিত্র রক্তধারার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে তাঁদের সব আত্মীয়তা নিজেদের মধ্যেই এ পর্যন্ত হয়ে আসছে।
পীরের দরবারে নজিরবিহীন খেদমত
আফ্রিকা থেকে ফিরে তিনি তাঁর পীর খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র দরবারেই কাটিয়ে দেন প্রায় ৭-৮ বছর। সেখানেও তিনি বিরল স্বাক্ষর রেখেছেন দরবারের সেবায়। পীরের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটিও বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তাঁর মহীয়সী বিবির উপুর্যপরি পরামর্শ এবং পীড়াপীড়িতেই তিনি খাজা চৌহরভীর সাথে সাক্ষাতে কোনমতে রাজি হন, এবং সেই এলাকার হরিপুর বাজারে কাপড়ের দোকান খুলেছিলেন। হরিপুর থেকে সিরিকোটের দুরত্ব অন্তত ১৮ মাইল। দোকান খোলার কয়েকদিন পর, আসা-যাওয়ার পথেই একদিন হয়ে গেল সেই তাৎপর্যপূর্ণ মিলনপর্ব। এ সময় সিরিকোটি হুজুরের এক লোকের নুরানি সূরতের দিকে দৃষ্টি গেল, যাঁকে খুব কর্ম ব্যস্ত মনে হচ্ছিল। ভাবছিলেন, বোধহয় উনিই হবেন, তাঁর বিবির বর্ণিত সেই পীর। সামনাসামনি হতেই তাঁকে সালাম দিলেন, আর পীর সাহেবের পক্ষ থেকে প্রত্যুত্তর এল অনেক লম্বা এবং বিশেষ স্বরভঙ্গিতে, যেন তাঁর সেই স্বরভঙ্গি জানান দিচ্ছিল ‘‘ও তুমিই তাহলে,এসেছ শেষতক -ঠিক আছে, আমারও যে দরকার তোমাকে’’। পীরজি সালামের তাৎপর্যপূর্ণ উত্তর শুধু দিলেন না, এবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘চান্দে কেত্তে আয়ে’’, হে চাঁদপুরুষ আপনি কোত্থেকে আসছেন? সিরিকোটি হুজুর উত্তর দিলেন, গঙ্গর সে’-গঙ্গর উপত্যকা হতে। আবার জিজ্ঞেস, এখানে কেন? উত্তর দিলেন, ‘‘আমি হরিপুর বাজারের নতুন দোকানদার’’। পীরজি বল্লেন, ও তাই নাকি, বেশ ভাল কথা, আমার কাছে যারা আসে আমি তাদের বলব যে, হরিপুরে আমার একটা দোকান আছে, যেন তারা আপনার কাছ থেকে কিনে ‘‘কী আশ্চর্য, প্রথম দেখাতেই যেন শত বছরের আপনজন, পর বলে মনে হচ্ছিলনা চৌহরভী হুজুরকে। এবার সিরিকোটি হুজুর জানতে চাইলেন, হযরত আপনাকে খুব তৎপর দেখাচ্ছে, কী করছিলেন? বললেন, একটা মসজিদ নির্মানের কাজে ব্যস্ত আছি’’। সিরিকোটি সাহেব বললেন, তাই নাকি? তাহলে মেহেরবানি করে আমাকেও এমন মোবারক কাজে শরিক করুন, এই বলে, হযরত চৌহরভী’র হাতে তিনি তুলে দেন একশত টাকা, সুবহানআল্লাহ! ঘটনাটি আনুমানিক ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক সময়ে, আর সে সময়ে একশত টাকা তাৎক্ষনিক দানের ঘটনা কল্পনাতীত। শুধু চৌহর শরিফের উক্ত মসজিদ নয়, সিরিকোটি হুজুর নিজের টাকায় আরো বহু মসজিদ তৈরী করেন, এর মধ্যে একটি হরিপুর বাজারে রয়েছে। তাছাড়া নিজ বাড়ি সিরিকোট দরবারের জামে মসজিদটিও তাঁর টাকায় নির্মিত হয় ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে। বিশেষ করে, ১৯০২ সনে চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি হরিপুর বাজারে যে ‘‘দারুল উলুম ইসলামিয়া রহমানিয়া’’ প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা মূলত সিরিকোটি সাহেবের হাতেই বিশাল মারকাজ হিসেবে পূর্ণতা পায়। তিনি এই মাদরাসার আর্থিক পৃষ্টপোষকতায় শুধু প্রধান ছিলেননা বরং খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র পর এর পরিচালনাটা পরিপূর্ণভাবে তাঁর উপরই নির্ভরশীল হয়। মাদরাসার বিশাল দ্বিতল ভবন (১৯২৭ খ্রি.) সহ পরবর্তী সকল উন্নয়ন ও প্রশংসনীয় অবস্থান ছিল তাঁর অবদান।
উল্লেখ্য, ৩১ডিসেম্বর ১৯৪৮ তৎকালিন অবিভক্ত পাকিস্তানের মন্ত্রী এবং গভর্নর সর্দার আবদুর রব নিশতার এ মাদরাসার অবস্থান সম্পর্কে বলেছিলেন। ‘‘এই দারুল উলুমের মাধ্যমে এমন কামেল ব্যক্তি তৈরী হয়েছে যে যাঁদের পদচুম্বনে রয়েছে পরকালের মুক্তি’’ (আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আ’লা হযরত গবেষক, প্রফেসর ড: মাসউদ আহমদ লিখিত ইফতিতাহিয়্যা) ২২ মার্চ ১৯৪৯ পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁনও এ মাদ্রাসার অবদান স্বীকার করে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, দরবারের লঙ্গরখানা এবং এই রহমানিয়া মাদরাসার হোস্টেলের রান্নাবান্নার জন্য লাকড়ির অভাব ছিল বলে, তিনি নিজ বাড়ি সিরিকোটের পাহাড় হতে সারাদিন লাকড়ি যোগাড় করতেন এবং দিন শেষে ১৮ মাইল দুরের চৌহর শরিফে নিয়ে যেতেন নিজের কাঁধে করে। এভাবে বহুবছর তিনি এমন কঠোর শারীরিক পরিশ্রম পর্যন্ত করেছিলেন দরবার ও মাদরাসার সেবায়। এর ফলে তাঁর হাতে -ঘাঁরে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল এর যন্ত্রনা এবং চিকিৎসা জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত চলেছিল। এই ক্ষত সম্পর্কে তিনি বলতেন-ইয়ে মেরে বাবাজিকা মোহর হ্যায়’’। দ্বীনি খেদমতে কঠিন পরিশ্রমী এই জবরদস্ত আলেম-হাফেজ সিরিকোটি হুজুরের মধ্যেও এক সময়ে লোকালয় ছেড়ে বনে জঙ্গলে একান্তে রেয়াজত করবার ইচ্ছা জেগেছিল এবং এ জন্য পীরের এজাজতও চেয়েছিলেন, কিন্তু পীর খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁকে সাফ জানিয়ে দিলেন যে, বন জঙ্গলের কঠিন রেয়াজাত-মোশাহেদা-মোজাহেদার চেয়েও উত্তম হল মানুষের মধ্যে থেকে দ্বীনের খেদমত করা’’। সুতরাং সংসার -লোকালয় বর্জনে তিনি ব্যর্থ হবার পর, এবার তিনি চেয়েছিলেন লাহোর বাদশাহী জামে মসজিদের ইমাম -খতিবের দায়িত্ব পেতে। দরখাস্তও করেছিলেন কিন্তু এবারও পীর সাহেব একমত হলেন না। কারণ, ঐ মর্যাদাপূর্ণ পদে ইতোপূর্বে যিনি ছিলেন তাঁর এক শাহজাদা এ পদের জন্য আবেদন করেছেন, খাজা চৌহরভী চেয়েছিলেন যে, দায়িত্বটা মরহুম ইমামের সন্তানের হাতে থাকুক। তাই, হযরত সিরিকোটি, তাঁর পীরের এক তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশে প্রেরিত হলেন রেঙ্গুনে। তাঁর কামেল পীর ছিলেন গাউসে দাঁওরান, খলিফায়ে শাহে জীলান তিনি তাঁর রুহানি দৃষ্টিতে দেখেছিলেন হযরত সিরিকোটি হুজুরের হাতে রেঙ্গুন আর চট্টগ্রামের এক যুগান্তকারী দ্বীনি খেদমত সুন্নিয়তের মহাজাগরণের সুসংবাদ। ১৯২০ সালে, তিনি পীরের নির্দেশে স্বদেশের মায়া ছেড়ে দ্বীনের মায়ায় আবারো হিজরত করলেন রেঙ্গুনে।
রঙ্গিলা রেঙ্গুনের আঁধার তাড়াতে,
সিরিকোটি এলেন মশাল হাতে
বার্মার রঙ্গিলা শহর রেঙ্গুনে হুজুরের আগমন ১৯২০ খ্রি.। তখন তাঁর বয়স ছিল কমপক্ষে তেষট্টি। পীরের নির্দেশ আর ইসলাম প্রচারের নেশা তাঁকে এই বয়সেও বিদেশ সফরে বাধ্য করল। এখানে তিনি ছিলেন ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মোট ২১-২২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি তৎকালিন বার্মার হাজার হাজার অমুসলিমকে যেমন মুসলমান বানিয়েছেন, তেমনি অসংখ্য বিপদগামি মুসলমানদের বানান সাচ্চা আক্বিদার পরহেজগার বান্দা।
[১৯৩৫ সালে রেঙ্গুনে অনুষ্ঠিত বিদায়ী সংবর্ধনার মানপত্র, রচনায়- তফজ্জল হক, সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট,
আনজুমানে শুরা-ই রহমানিয়া রেঙ্গুন ১৬ অক্টোবর ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে]
অনেক ভাগ্যবান বান্দা তাঁর তা’লিম তারবিয়তের ফলে হয়েছিলেন ইনসানে কামেল অলি-আউলিয়া। জানা যায়, শুরুতে তিনি ক্যাম্পবেলপুরে মাওলানা সুলতানের মাদরাসায় এবং পরবর্তিতে রেঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙ্গালি সুন্নি জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই বিখ্যাত মসজিদই ছিল তাঁর সুন্নিয়ত প্রচারকেন্দ্র-যা তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ১৯৪১ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বিখ্যাত আ’লা হযরত গবেষক প্রফেসর ড: মাসউদ আহমদ, আনজুমানে শুরায়ে রহমানিয়ার ১৯৩৫ সনের রিপোর্টের তথ্যানুসারে জানান যে, পীরের নির্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গিয়ে হযরত সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৯২০-৩৫ পর্যন্ত ১৬ বছর একাধারে রেঙ্গুনে থেকে যান, একটি বারের জন্যও স্বদেশে আপনজনদের কাছে যাননি। যদিও এই সময়ের মধ্যে ১৯২৪ সনের ৫ জুলাই তাঁর মহান পীর খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং ৩ শাবান ১৯২৮ তারিখ বুধবারে তাঁর বড় শাহজাদা মৌলানা সৈয়্যদ মুহম্মদ সালেহ্ শাহ্ ওফাত প্রাপ্ত হন (ইফতিতাহিয়্যা)। অবশ্য, এ সংক্রান্ত একটি কারামতের কথা জানা যায় হুজুর কেবলার প্রবীণ মুরীদদের কাছ থেকে, যা ড: মাওলানা সাইফুল ইসলামের একটি রচনায়ও স্থান পেয়েছে। সে অলৌকিক ঘটনানুসারে, হুজুর কেবলা সিরিকোটি, ঐদিন ৩ শা’বান, বুধবার আসরের নামাজের সময়ে, বা নামাজের পরে হঠাৎ করে নিজের হুজরার দরজা বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ বের হননি। তখন তিনি তাঁর অসুখ বলে বলেছিলেন। কিন্তু ঐ দিকে সিরিকোট শরিফে একই সময়ে অনুষ্ঠিত তাঁর বড় শাহজাদার নামাজে জানাজায় তাঁকে দেখা যায়, সুবহানআল্লাহ। [সূত্র, তরজুমান]
উল্লেখ্য, খাজা চৌহরভী তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন ৩০ পারা দরুদ গ্রন্থ ছাপানোর কাজ এবং দারুল উলুম রহমানিয়ার কোন বিহীত না করে রেঙ্গুন না ছাড়েন। আর, এ জন্যই তিনি ১৬ বছর পরই স্বদেশে যান। আর, এরি মধ্যে তিনি ১৯৩৩ সনে এতবড় বিশাল ৩০ পারা কিতাব রেঙ্গুনে থেকেই প্রথম প্রকাশ সম্পন্ন করেন, এবং রহমানিয়া মাদরাসার দ্বিতল ভবন তৈরী করেন। এমনকি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের আবাসনের এবং শিক্ষকদের নিয়মিত বেতনের ব্যবস্থাটাও তিনি রেঙ্গুন থেকে করেন, আর এমন বিরল খেদমতে সে সময়েও অংশগ্রহণের সুযোগটা হয়েছিল রেঙ্গুন প্রবাসী চট্টগ্রামের মুসলমানদের।
রেঙ্গুন থেকে চট্টগ্রামে, আনজুমান-জামেয়ার মিশন শুরু
১৯২০ থেকে ১৯৪১ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ বাইশ বছরে রেঙ্গুনের হাজার হাজার স্থানীয় বার্মিজ নাগরিক এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসে কর্মরত প্রবাসীদের মধ্যে অসংখ্য অমুসলিম-মুসলিম নির্বিশেষে তাঁর আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক আকর্ষণে উপকৃত হয়েছিলেন। এদের কেউ ভিন্ন ধর্ম থেকে ইসলামে আবার কেউ অন্ধকার জীবন থেকে আলোর দিকে ফিরে এসেছিলেন। রেঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙালী মসজিদের ইমামত ও খেতাবতের পাশাপাশি রেঙ্গুনসহ সমগ্র ব্রহ্মদেশে সত্যিকারের দ্বীন ও তরীক্বতের প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন যা এখনো পর্যন্ত সেখানে বিদ্যমান। এ সময় সমগ্র রেঙ্গুনে তাঁর অসংখ্য কারামাতের কথা ছড়িয়ে পড়ে এবং দলে দলে লোকজন তাঁর কাছে এসে দুনিয়া-আখিরাতের অমূল্য নিয়ামত লাভে ধন্য হয়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের অপ্রতিদ্বন্ধি মুজাহিদ আলেমে দ্বীন, ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ আযীযুল হক শেরে বাঙালা রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর রেঙ্গুন সফরের সময় কুতুবুল আউলিয়া, গাউসে যামান আল্লামা শাহ্ সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে লোকজনের কাছে জানতে পেরে বাঙালি মসজিদে গিয়ে তাঁর সাথে মুলাক্বাত করেন এবং দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা ও পর্যবেক্ষণের পর তাঁর মধ্যে বিশাল বেলায়তী ক্ষমতা অবলোকন করে তিনি তাঁকে চট্টগ্রামে তাশরীফ আনার জন্য অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের সংবাদ পত্র শিল্পের পুরোধা দৈনিক আজাদী’র প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার আবদুল জলিলসহ চট্টগ্রাম নিবাসী তাঁর অসংখ্য মুরীদের আবেদন-নিবেদন উপেক্ষা করতে না পেরে ১৯৩৫-৩৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি রেঙ্গুন থেকে পাকিস্তান যাওয়ার পথে চট্টগ্রামে কিছু দিনের জন্য যাত্রা বিরতি করতেন। এ কয়েক দিনের যাত্রা বিরতিতে তাঁর আদর্শ, আখলাক ও অলৌকিক শক্তির আকর্ষণে এখানকার মানুষ আকৃষ্ট হতে থাকে এবং এখানে তাঁর মুরীদ’র সংখ্যা বাড়তে থাকে দিন দিন।
এভাবে, ১৯৪১ এর শেষ দিকে এসে তিনি রেঙ্গুন থেকে স্থায়ীভাবে এই মিশন নিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল এবং বার্মা ছিল তখনো অক্ষত। কিন্তু আল্লাহর এ মহান অলী হযরত সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অলৌকিক অদৃশ্য শক্তিতে দেখলেন যে, শিগগিরই রেঙ্গুন শহর বোমা হামলায় তছনছ হয়ে যাবে এবং অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটবে। তিনি তাঁর মুরীদ এবং পরিচিত সকলকে দ্রুত রেঙ্গুন ত্যাগের নির্দেশ দেন এবং নিজেও রেঙ্গুন ছেড়ে চলে আসেন।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বর্তমানে রেঙ্গুনে বিদ্যমান গাউসে জমান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর খলিফা হাজি ইসমাঈল বাগিয়া সাহেব জানান যে, তাঁর আব্বা হাফেজ মুহাম্মদ দাঊদ জী বাগিয়া উক্ত নির্দেশ পেয়ে ৮ ডিসেম্বর ১৯৪১ তারিখে তাদের পুরো পরিবার নিয়ে রেঙ্গুন ছেড়ে লক্ষনৌতে নিজ দেশে ফিরে আসেন। অন্যান্যরাও চলে যান যার যার দেশে। আর ২৩ ডিসেম্বর ১৯৪১ তারিখে রেঙ্গুন শহরে বোমা বর্ষণ শুরু হয়।
[মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার, সিরিকোট থেকে রেঙ্গুন দ্রষ্টব্য]
অপর একটি বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায় যে, শেষের দিকে হুজূর কেবলা সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি রেঙ্গুন ছাড়বার সময় তাঁর খাদেম ফটিকছড়ি নিবাসী মরহুম ফজলুর রহমান সরকারকে রেখে আসেন হুজূর কেবলার বিছানায়। তাঁকে হুজুর কেবলা আরো তিন দিন থাকার পর রেঙ্গুন ছাড়ার পরামর্শ দেন। ফজলুর রহমান সরকার নির্দেশমত তিন দিন থেকে চলে আসেন এবং এর পরপরই বোমা বর্ষণ শুরু হয়। যারা হুজূর কেবলার নির্দেশ মেনে এবং বিশ্বাস করে রেঙ্গুন ছেড়েছিল তাদের সকলের প্রাণ বেঁচে যায় এবং সম্পদও রক্ষা পায় অনেকাংশ। আর অন্যদের অবস্থা হয় বিপরীত ধরণের। শেষ পর্যন্ত সকলকেই রেঙ্গুন ছাড়তে হয়েছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা শুরু হবার পর, কিন্তু তাদের কেউ আর স্বাভাবিক এবং সুস্থভাবে দেশে ফিরতে পারেনি। হেটে হেটে আসবার সময় অনেকে পথিমধ্যেই ক্ষুধায় এবং শক্তিহীন হয়ে মারা যান।
যা হোক, তাঁর রেঙ্গুন জীবনের শুরুতে ১৯২৪ সালের দিকে তাঁর পীর খাজা চৌর্হভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করে শরীয়ত-তরীক্বতের বিশাল দায়িত্ব এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রদান করে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেন। পীরের ইন্তিকালের পরপরই তিনি উক্ত অর্পিত দায়িত্বাবলী যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয়ার লক্ষে তাঁর পীরের নামেই একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।
১৯২৫ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারী ‘আন্জুমান-এ শুরায়ে রহমানিয়া’ নামক এই সংস্থা স্থাপিত হলে খাজা চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রতিষ্ঠিত হরিপুরস্থ রহমানিয়া মাদরাসা পরিচালনা, তাঁর রচিত ৩০ পারা বিশিষ্ট দরূদ শরীফের অদ্বিতীয় কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ প্রকাশনা সহ যাবতীয় দায়িত্ব এ সংস্থা কর্তৃক সুচারুরূপে পরিচালিত হতে থাকে। ‘আন্জুমান-এ শুরায়ে রহমানিয়া’রেঙ্গুন’র চট্টগ্রাম শাখা স্থাপিত হয় ১৯৩৭ সনের ২৯ আগস্ট একই উদ্দেশ্য আঞ্জাম দেয়ার প্রয়োজনে। শুরুতে এ সংস্থা রেঙ্গুনের শাখা হিসেবে কাজ শুরু করলেও ১৯৪২ থেকে চট্টগ্রামের এই সংস্থাই হয়ে ওঠে হুজূর কেবলা রহমাতুল্লাহি আলাইহি’র মিশনের প্রধান অবলম্বন। ১৯৪২-১৯৫৪ পর্যন্ত অন্তত: ১২ বছর পর্যন্ত এই সংস্থার মাধ্যমেই চট্টগ্রাম থেকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হতো হরিপুরের রহমানিয়া মাদরাসার জন্য। সুন্নিয়ত ও তরিক্বতের অন্যান্য কাজও এ সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পঞ্চাশের দশকে এসে বাঁশখালির শেখেরখীলের এক মাহফিলে দরূদ শরীফ বিরোধীদের বেআদবীপূর্ণ আচরণের প্রতিক্রিয়ায় সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি চট্টগ্রামে এদের মোকাবেলার জন্য একটি শক্তিশালী মাদরাসা কায়েম করার ঘোষণা দেন। ১৯৫৪ সনের ২২জানুয়ারী এই নয়া মাদরাসা বাস্তবায়নের জন্য গঠিত হয় ‘আন্জুমান-এ আহমদিয়া সুন্নিয়া’ নামক অপর এক সংস্থা। সিরিকোটী হুজূরের উপস্থিতিতে এই নয়া আন্জুমানের ১৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৪ তারিখের এক ঐতিহাসিক সভায় প্রস্তাবিত মাদরাসার নাম রাখা হয় ‘মাদরাসা-এ আহমদিয়া সুন্নিয়া’ ২৫ জানুয়ারী ১৯৫৬ তারিখের এক সভায় এ মাদরাসাকে পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার লক্ষে মাদরাসার নামের সাথে “জামেয়া” (বিশ্ববিদ্যালয়) শব্দটি যুক্ত করে এ মাদরাসার নাম রাখা হয় ‘জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’। [মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ ইতিবৃত্ত ও কর্মসূচি, ২১/১১/২০১২]
চট্টগ্রামের ষোলশহরে স্থাপিত এই মাদরাসা আজ অর্ধশতাব্দিকাল ধরে দেশে সুন্নিয়তের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। ১৮ মার্চ ১৯৫৬ তারিখে ইতিপূর্বে গঠিত আন্জুমান দ্বয়ের পরিবর্তে ‘আন্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’ নামক নতুন একক আন্জুমান প্রতিষ্ঠা করা হয়। [প্রাগুক্ত] বর্তমানে এই আন্জুমান দেশের প্রধান বেসরকারী দ্বীনী সংস্থা হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। আন্জুমান পরিচালিত এই ‘জামেয়া’কে এশিয়ার অন্যতম খ্যাতনামা সুন্নি মারকাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জামেয়ার এতটুকু সফলতার কারণ হলো এই প্রতিষ্ঠানটি আল্লাহর দরবারে কবূল হয়েছে।
জামেয়া প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায়-বাঁশখালীর এক মাহফিলে হুজূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র দরূদ-সালামকে ইনকার করার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে এদের বিরুদ্ধে আদর্শিক মেধাভিত্তিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবেই তৎকালীন ‘নয়া মাদরাসা’ এই জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জায়গা নির্ধারণ, ভিত্তি স্থাপন থেকে শুরু করে এর যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে হযরত সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যেন অদৃশ্য কারো ইঙ্গিতের অনুসরণ করছিলেন। তাঁর ঘোষণা অনুসারে “শহর ভি নাহো, গাঁও ভি নাহো, মসজিদ ভি হ্যায়, তালাব ভি হ্যায়” এমন ধরণের জায়গাটি যখন অনেক যাঁচাই-বাছাই শেষে চট্টগ্রাম ষোলশহরস্থ বর্তমানের মাদরাসা এলাকাটি নির্ধারণ করা হয়। তখন এর মাটি থেকে ইলমে দ্বীন’র সুগন্ধি পাওয়া যাচ্ছে বলে উঠেন সুফী মোনাফ খলিফা নামক নাজিরপাড়া নিবাসী সিরিকোটি হুজুরের জনৈক মুরীদ।
এই মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতা কে কোত্থেকে করবেন সে সম্পর্কে তিনি অনেক রহস্যময় মন্তব্য করেছিলেন। কেয়ামত পর্যন্ত এই মাদরাসা পরিচালনার ভার স্বয়ং আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করেছেন বলে তিনি তাঁর মুরীদদের অভয় দেন। তিনি বলেন-“মেরে কান মে ইয়ে আওয়াজ আতেহে, ইয়ে নয়া মাদরাসা হাম খোদ চালাওঙ্গা’’ অর্থাৎ এই নতুন মাদরাসা আমি নিজেই চালাবো। সত্যিকার অর্থেই এই মাদরাসা চলছে যেন অদৃশ্য শক্তির ব্যবস্থাপনায়। টাকা-পয়সা যখন যা প্রয়োজন তা ভাবনা-চিন্তা করতে না করতেই চলে আসছে। শুধুমাত্র মাদরাসার টাকা নেয়ার জন্যই আজ আলাদা অফিস খুলে বসতে হয়েছে। কত চেনা-অচেনা লোক এসে হাদিয়া, সদক্বা, মান্নত, নিয়্যতের টাকা, যাকাত-ফিতরা ইত্যাদির টাকা দিয়ে যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। মান্নতকারীদের আশাভঙ্গ করেনা এই জামেয়া-তাই, আজ জামেয়া মান্নত পূর্ণ হওয়ার কথা মানুষের মুখে মুখে। শাহ্ সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছিলেন-“মুঝেহ দেখনা হ্যায় তো, জামেয়া কো দেখো, মুঝসে মুহাব্বত হ্যায় তো, জামেয়া কো মুহাব্বত করো।” ভ্রান্ত মতবাদীদের বিরুদ্ধে ইসলামের মূলধারা সুন্নিয়তকে বিজয়ী করতে ইশ্ক্বে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ভিত্তিতে এই মাদরাসা তৈরি করেছিলেন। ফলে, আজ ভেজাল থেকে আসল ইসলামকে রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী ‘সাচ্চা আলেম’ বের হচ্ছে এই মাদরাসা থেকে।
আল্লামা সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি জামেয়ার কারিকুলাম সম্পর্কে বলেন, এই মাদরাসায় প্রয়োজনীয় সকল ভাষাজ্ঞানসহ বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলোর উপরও শিক্ষা দিতে হবে। তিনি ভবিষ্যতে ইউরোপ-আমেরিকায় ইসলাম প্রচারে সক্ষম হয় এমন ইংরেজী ও জ্ঞান বিজ্ঞানে দক্ষ সুন্নী আলেম তৈরির জন্য এই জামেয়া প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জামেয়ার সাচ্চা আলেমরা শুধু মোল্লা না হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখায় পারদর্শী হয়ে বহির্বিশ্ব পর্যন্ত যেন ইসলামের সঠিক আক্বীদা ও মূল্যবোধের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হন। সিরিকোটী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সময় বলেছিলেন, তোমরা ত্রিশ বছর পর্যন্ত হরিপুর রহমানিয়া মাদরাসার খিদমত করেছো। তাই, তোমাদের জন্য এই নয়া মাদরাসা (জামেয়া) উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছে। যদি এই জামেয়ার দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দাও তবে জেনে রেখো, এরপর তোমাদের জন্য আরো অনেক বড় বড় দায়িত্ব অপেক্ষা করছে। আর এই বড় দায়িত্ব যে ‘হুকুমত’ তাও তিনি কয়েক দফা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, মনে হচ্ছে, এখনো আমরা এই দায়িত্ব কাঙ্ক্ষিতভাবে পালন করতে পারিনি, তাই আজ হুকুমতও আমাদের হাতে নেই। কারণ, হুকুমতের যোগ্য লোক এখনো আমরা তৈরি করতে সক্ষম হইনি। তাই, আমাদের এই লক্ষে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
(চলবে)
লেখক: যুগ্ন মহাসচিব-গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, কেন্দ্রীয় পরিষদ।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •