কথায়-কথায় মিথ্যা শপথ করা মুনাফেকীর লক্ষণ

0

কথায়-কথায় মিথ্যা শপথ করা মুনাফেকীর লক্ষণ
অধ্যক্ষ হাফেজ কাজী আবদুল আলীম রিজভী
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا قِیْلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوْا فِی الْمَجٰلِسِ فَافْسَحُوْا یَفْسَحِ اللّٰهُ لَكُمْۚ-وَ اِذَا قِیْلَ انْشُزُوْا فَانْشُزُوْا یَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْۙ-وَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍؕ-وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِیْرٌ(۱۱)یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نَاجَیْتُمُ الرَّسُوْلَ فَقَدِّمُوْا بَیْنَ یَدَیْ نَجْوٰىكُمْ صَدَقَةًؕ-ذٰلِكَ خَیْرٌ لَّكُمْ وَ اَطْهَرُؕ-فَاِنْ لَّمْ تَجِدُوْا فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ(۱۲)ءَاَشْفَقْتُمْ اَنْ تُقَدِّمُوْا بَیْنَ یَدَیْ نَجْوٰىكُمْ صَدَقٰتٍؕ-فَاِذْ لَمْ تَفْعَلُوْا وَ تَابَ اللّٰهُ عَلَیْكُمْ فَاَقِیْمُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتُوا الزَّكٰوةَ وَ اَطِیْعُوا اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗؕ-وَ اللّٰهُ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ۠(۱۳) اَلَمْ تَرَ اِلَى الَّذِیْنَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْؕ-مَا هُمْ مِّنْكُمْ وَ لَا مِنْهُمْۙ-وَ یَحْلِفُوْنَ عَلَى الْكَذِبِ وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ(۱۴)
আল্লাহর নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়
তরজমা : (মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন-) হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়: মজলিসে স্থান প্রশস্থ করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্থ করে দাও। আল্লাহ তোমাদের স্থান প্রশস্থ করে দিবেন। আর যখন বলা হয় ‘উঠে দাড়াও’ তখন উঠে দাড়াও। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা সমুন্নত করবেন। এবং আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর। হে ঈমানদারগণ যখন তোমরা রাসূলের নিকট কোন কথা গোপনে আরজ করতে চাও, তবে আপন আরজ করার পূর্বে কিছু সাদক্বাহ প্রদান করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম ও খুব পবিত্র। অতঃপর যদি তোমাদের সামর্থ্য না থাকে, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়া পরবশ। তোমরা কি এতে ভয় পেয়েছো যে, তোমরা স্বীয় আবেদনের পূর্বে কিছু সাদক্বাহ দান করবে? অতঃপর যখন তোমরা এটা করোনি এবং আল্লাহ স্বীয় করুনা সহকারে তোমাদের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছেন; সুতরাং তোমরা নামায কায়েম করো। যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাকো। আর আল্লাহ খবর রাখেন যা তোমরা করো। আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা এমন লোকদের বন্ধু হয়েছে, যাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ রয়েছে, তারা না তোমাদের অন্তর্ভুক্ত না তাদের অন্তর্ভুক্ত, তারা জ্ঞাতসারে মিথ্যা শপথ করে। [সূরা আল মুজাদালাহ ১১-১৪]

আনুষঙ্গিক আলোচনা
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا قِیْلَ لَكُمْ এর শানে নুযুল : উপরোক্ত আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনায় মুফাসসেরীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন- আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দরবারে ‘বদর যুদ্ধে’ অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ ‘বদরী সাহাবী’ নামে বিশেষ সম্মান মর্যাদার অধিকারী। একদা কতিপয় বদরী সাহাবী রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র মজলিসে এমন অবস্থায় পৌছলেন যখন মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। তাঁদের বসার স্থান সংকুলান হয়নি। তাঁরা আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কে সালাম দান করত: মজলিসে বসার স্থানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মজলিসে উপস্থিত কেউ তাঁদের বসার সুযোগ করে দিচ্ছিলনা। তখন রাসূলে করীম রউফুর রহিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের কাছে উপবিষ্টদের উঠিয়ে বদরী সাহাবীগণের বসার জন্য স্থানের সংকুলান করে দিলেন। যাঁরা উঠে গেলেন তারা এতে কিছুটা কষ্ট বোধ করলেন। তখনই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ করে ঘোষণা করলেন-মুমিনগণ! যখন তোমাদের কে বলা হয়: মজলিসে স্থান প্রশস্থ করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্থ করে দাও। বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের স্থান প্রশস্থ করে দিবেন (দুনিয়া-আখেরাত উভয় জাহানে)। আর যখন বলা হয় উঠে দাড়াও, তোমরা তখন উঠে দাড়াও। উপরোক্ত রেওয়ায়তের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও বুযুর্গানেদ্বীনের জন্য স্থান ছেড়ে দেয়া এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা যদিওবা মসজিদে হয়, তবুও জয়েয বরং সুন্নাত। উপরোক্ত ঘটনা মসজিদে নববী শরিফেই ঘটেছে। এক মুসলমান অপর মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর দরবারে খুবই প্রিয় আমল। এজন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাওয়াবের সুসংবাদ রয়েছে। কারণ, এতে মুসলিম মিল্লাতের পারষ্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য সুসংহত হয়। [তাফসীরে খাযায়েনুল ইরফান ও নুরুল ইরফান]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا এর শানে নুযুল: উদ্ধৃত আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনায় তাফসীর বিশারদগণ উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলে খোদা আশরফে আম্বিয়া ছাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জ্ঞান শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারের কাজে দিবারাত্রি মশগুল থাকতেন। সাধারণ মজলিশ সমূহে উপস্থিত লোকজন তাঁর অমিয়বাণী শ্রবণে উপকৃত হত। এই সুবাদে কিছু লোক আলাদাভাবে তাঁর সাথে গোপন কথাবার্তা বলতে চাইলে তিনি সময় দিতেন। বালাবাহুল্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে আলাদাভাবে সময় দেয়া যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি কষ্টকর ব্যাপার। এতে মুনাফিকদের কিছু দুষ্টামিও শামিল হয়ে গিয়েছিল। তারা প্রকৃত মুসলমানদের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে রাসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একান্তে গমন ও গোপন কথা বলার সময় চাইত এবং দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত কথাবার্তা বলত। কিছু অজ্ঞ মুসলমানও স্বভাবগত কারনে কথা লম্বা করে মজলিসকে দীর্ঘায়িত করত। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর এই বোঝা হালকা করার জন্য আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ করে ঘোষণা করলেন যে, যারা রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সাথে একান্তে গোপন কথা বলতে চায়,তারা প্রথমে কিছু সাদকাহ প্রদান করবে। আয়াতে কুরআনে সাদকাহর পরিমাণ বর্ণিত হয়নি। কিন্তু আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাইয়্যেদুনা মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম এর উপর আমল করেছেন। তিনি এক দিনার সাদকাহ প্রদান করে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে একান্তে কথা বলার সময় গ্রহণ করেন।
উল্লেখ থাকে যে, একমাত্র সাইয়্যেদুনা মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুই উপরোক্ত আয়াতের বিধানের উপর আমল করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এরপর তা রহিত হয়ে যায় এবং আর কেউ উক্ত আয়াতের বিধানের উপর আমল করার সুযোগ পায়নি। কারণ, এ আদেশের ফলে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অনেকেই অসুবিধার সম্মুখীন হন। তাই এ আয়াতের আদেশটি রহিত হয়ে যায়। মাওলা আলী শেরে খোদা প্রায়ই বলতেন ‘পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত এমন আছে যার বিধানের উপর আমি ব্যতীত অন্য কেউ আমল করার সুযোগ পায়নি। আদেশটি রহিত হয়ে যায়।
[তাফসিরে ইবনে কাসির, রুহুল বায়ান ও খাযায়েনুল ইরফান]
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِم এর শানে নুযুল: বক্ষ্যমান আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনা প্রসঙ্গে তাফসীর বেত্তাগন উল্লেখ করেছেন- আলোচ্য আয়াতখানা মুনাফিকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। যারা প্রকাশ্যে নিজেদের কে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দান করলেও গোপনে আন্তরিকভাবে ইহুদিগণের সাথে বন্ধুত্ব-ভালবাসা রাখতো। তাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতো এবং মুসলমানদের গোপন রহস্য ও বিষয়াবলি তাদের নিকট ফাঁস করে দিত। এ আয়াতের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে مغضوب عليهم তথা আল্লাহর গজব প্রাপ্ত সম্প্রদায় হলো ইহুদি। কোন কোন রেওয়ায়তে উল্লেখ আছে যে, উদ্ধৃত আয়াতখানা মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলুল ও আব্দুল্লাহ ইবনে নাবতাল সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। একদা রাসূলে আকরাম নূরে মুজাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় তিনি বললেন, এখন তোমাদের মাঝে এক ব্যক্তি আগমন করবে। তার অন্তর নিষ্ঠুর এবং সে শয়তানের চোখে দেখে। কিছুক্ষণ পরই আবদুল্লাহ ইবনে নাবতাল আগমন করল। তার চক্ষু ছিল নীলাভ, দেহাবয়ব বেটে, গোধুম বর্ণ এবং সে ছিল হালকা শশ্রুমন্ডিত। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এবং তোমার সঙ্গীরা আমাকে গালি দাও কেন? সে শপথ করে বলল আমি এরূপ করিনি, এরপর সে তার সঙ্গীদের ডেকে আনল এবং তারাও মিথ্যা শপথ করল। তখনই আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের মিথ্যাচার প্রকাশ করে দিয়েছেন। (তাফসীরে কুরতুবি, রুহুল বায়ান ও খাযায়েনুল ইরফান শরীফ)
আলোচ্য আয়াতের মর্মবাণীর আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, ইহুদি-খৃষ্টান, কাফির-মুশরিকসহ কোন অমুসলিম বেদ্বীনের সাথে মুসলমানের আন্তরিক বন্ধুত্ব -ভালোবাসা স্থাপন করা কোন অবস্থায় জায়েয নেই। এটা সর্বাবস্থায় হারাম ও কুফরী। যৌক্তিকতার নিরিখে এটা সম্ভবপরও নয়। কেননা মুমিনের আসল সম্পদ ও মূলধন হলো আল্লাহ-রাসূলের মহব্বত। কাফির-মুশরিকগণ আল্লাহ রাসূলের শত্রু। যার অন্তরে কারও প্রতি সত্যিকার মহব্বত ও বন্ধুত্ব আছে, তার শত্রুর প্রতিও মহব্বত ও বন্ধুত্ব রাখা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। এ কারণেই কুরআনে করীমের অনেক আয়াতে কাফির-মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। এবং যে মুসলমান কাফের-মুশরিকদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব রাখে, তাকে কাফিরদের দলভূক্ত করত শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছে। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সকলকে উপরোক্ত দরসে কুরআনের উপর আমল করার সৌভাগ্য নসীব করুন। আমিন।

লেখক: অধ্যক্ষ-কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া কামিল মাদরাসা, মুহাম্মদপুর এফ ব্লক, ঢাকা।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •