রোযায় নিয়ম মেনে সুস্থ থাকুন

0
রোযায় নিয়ম মেনে সুস্থ থাকুন
তরজুমান ডেস্ক:
রমজান এলেই দামি ও গুরুপাক খাবার খাওয়ার ব্যাপারে একরকম প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। অথচ সারা দিন অভুক্ত থাকার ফলে মস্তিস্ক ও স্নায়ুকোষ খাবারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান চায় বলে ইফতার, রাতের খাবার ও সাহরির সময় স্বাস্থ্যসম্মত, সুষম, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে যাতে খাবারের কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, মিনারেলস, ভিটামিন, তেল ও পানি এই ছয় ধরনের উপাদানের সমন্বয় থাকে।
  • রোযার উপকারিতানিয়মমতো অভুক্ত থাকা বা রোযা রাখার মধ্যে স্বাস্থ্যের যথেষ্ট উপকারিতা বা হেলথ বেনিফিট রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, রোযা একই সঙ্গে দেহের রোগ প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। যথা- ওজন কমায়, পরিপাকতন্ত্রের জন্য সহায়ক, হজমে যথেষ্ট উন্নতি হয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, মস্তিস্ক সুস্থ রাখে, গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, সুস্থ মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়, সব ধরনের প্রদাহ হ্রাস করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

    —ডা. গুলজার হোসেন

সাহরি ও রাতের খাবার
* সাধারণত ধীরে ধীরে হজম হয় (ছয় থেকে আট ঘন্টা) এমন খাবার খাওয়া উচিত। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট যেমন- ভাত, রুটি, ওট, পরোটা ইত্যাদি হতে পারে আদর্শ খাবার। এ ধরনের খাবার অনেকক্ষণ পেটে থাকে বলে ক্ষুধা কম লাগে।
* রাতে সুষম খাবার যেমন: মাছ, মাংস, ডিম, দুধজাতীয় এবং চর্বি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি মেন্যুতে রাখুন।
* চা বা কফিতে ক্যাফেইন থাকে বলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দেয়। তা ছাড়া ইউরিনের সঙ্গে লবণ বের করে দেয়, যা দিনের বেলায় শরীরের জন্য দরকারি। এ জন্য সাহরিতে যথাসম্ভব চা, কফি বা কোলাজাতীয় পানীয় বর্জন করুন।

ইফতারের সময়
* সারা দিন রোযা রাখার পর খেজুর খুবই উপকারী।
* কলা খান। এতে থাকে শর্করা, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম- যা এনার্জি দেয় ও অবসাদ দূর করে।
* প্রচুর প্রোটিন, ফাইবার এবং সামান্য ফ্যাট আছে বলে খেতে পারেন বাদাম, আমন্ড, আখরোট, কাঠবাদাম ও দেশি বাদাম। এতে চর্ম ভালো থাকে।
* ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের রস, লাচ্ছি- যেকোন একটি খাওয়া যেতে পারে। তবে অনেক চিনি মিশিয়ে শরবত নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য।
পরিহার করুন
* অতিরিক্ত তেল, ঝাল, ভাজা, চর্বিজাতীয়, বাসি ও বাইরের খোলামেলা খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। এতে এসিডিটি, বদহজম, পেট খারাপ ইত্যাদি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
* ওভার ইটিং বা অতিরিক্ত খাওয়া নয়। এতে বদহজম, বমি, এসিডিটি, পেট ব্যথা ও ডায়ারিয়া হতে পারে।
* অতিরিক্ত রং ব্যবহার করা বাইরের সুস্বাদু খাবার নয়। এগুলো খেলে পেট, কিডনি বা লিভারের সমস্যা ছাড়াও নানা রকম শারীরিক অসুবিধা হয়।
পরামর্শ
* সময়ের সঙ্গে ফু¬ইড লেভেল যেন অ্যাডজাস্ট হয়, তাই ইফতার ও সাহরির মধ্যবর্তী সময়ে প্রচুর পানি পান করুন।
* রিফাইনড ফুড ও কম পানি পান করার জন্য রোযার মাসে অনেকের কনস্টিপেশান হয়। এ সমস্যা যাদের, তারা শরবতে তোমকা বা সাগু খেতে পারেন।
* যাদের লো ব্লাড প্রেসার, তাঁরা ফু¬ইড ও লবণ খান। শরীরের লবণ বা পটাসিয়াম যেন কমে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
* মনে রাখবেন অতিরিক্ত কিংবা কম পুষ্টিকর উপাদানসমৃদ্ধ খাবার- কোনোটাই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।
নিম্নের ভুলগুলো থেকে বেঁচে থাকা উচিত
১. সাহরিতে শুধু পানি পান করে রোযা রাখা
রোযার সময় পুরো দিন ভালো থাকতে তথা স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহরিতে সঠিক পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। বরং সাহরিতে একেবারে কিছু না খেয়ে বা শুধু পানি পান করে রোযা রাখলে সঠিক পুষ্টি উপাদানের অভাবে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, এসিডিটি বা গ্যাস্টিকের সমস্যা, ত্বক ও চুলের ক্ষতি, মেজাজ খিটখিটে, কোষ্ঠকাঠিন্য ছাড়া নানা শারীরিক সমস্যা হতে পারে। তাই ভাত, সবজি, মাছ বা মাংস অথবা দুধ-ভাত-কলা বা এমন কোনো মেন্যু সাহরিতে রাখুন, যা থেকে কার্বোহাইড্রেট ফ্যাট ও প্রোটিন- এ তিনটি পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
২. রাতের খাবার না খেয়েই শুয়ে পড়া
অনেকেই একটু বেশি পরিমাণে ইফতার খেয়ে রাতে আর খেতে চাই না বা খান না। আবার অনেকে ইচ্ছা করেই রাতে না খেয়ে সরাসরি সাহরি খান। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর।
রোযার সময় দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে ইফতার, রাতের খাবার ও সাহরির খাবার। রাতে একেবারে কিছুই না খেলে বিপাক ধীরগতিতে হয়, এতে রোযা রেখেও ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, এসিডিটির সমস্যা হয়। ভোররাতে সাহরি খাওয়ার সময়ও অস্বস্তি কাজ করে। তাই পরিমিত ইফতারের পর দুধ-রুটি, রুটি-সবজি, খেজুর-দুধ, দুধ-মুড়ি, চিড়া-দই বা সামান্য দুধ-ভাত হতে পারে আদর্শ খাবার।
৩. ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে রোযার সময় ডায়েট করা
অনেকেই ওজন নিয়ে অনেক চিন্তিত থাকেন বলে সারা দিন রোযা রেখেও একেবারে কার্বোহাইড্রেট না খাওয়া বা প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া অথবা একেবারে তেল বাদ দিয়ে খাবার খাওয়ার মতো ডায়েট করে থাকেন। মনে রাখতে হবে, এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর। এসবের ফলে লিভারে ফ্যাটি জমা, রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়া, রক্তস্বল্পতা দেখা দেওয়া, মাথা ঘোরানো, ত্বক ও চুলের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে রোযার সময় ডায়েট নয়। স্বাভাবিক খাদ্যতালিকা মেনে চলুন, ভালো থাকবেন।
৪. তাড়াড়াড়ি সাহরি খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়া
ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটার জন্য অনেকেই তাড়াতাড়ি সাহরি খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। এতে অনেক সময় পরিমাণমতো পানি পান করা হয়ে ওঠে না। এর ফলে দিনের বেলায় পানির ঘাটতিজনিত ডিহাইড্রেশন হতে পারে।
ক্লান্তিভাব, অবসাদ, গ্যাস্ট্রিক, মাথা ঘোরানো ছাড়াও নানা সমস্যা দেখা দেয়। তাই রোযার সময় রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করুন। এবং আজানের কিছু আগে ওঠে প্রথমে কিছুটা পানি পান করুন এবং সাহরি শেষে নামায পড়ে ঘুমান। আজানের কিছু আগে খেলে পুরো রোযার দিনের ভাগে আপনি এনার্জিটিক থাকতে পারেন। পিপাসা অথবা ক্ষুধা খুব একটা লাগবে না। আপনি থাকবেন বেশ সতেজ।
খেজুরের পুষ্টিগুণ
খেজুরে রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাংগানিজ, সালফার, কপারসহ খুব প্রয়োজনীয় উপাদান, যা আমাদের দেহের জন্য খুবই উপকারী। প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশক্তি থাকায় খেজুর খেলে দ্রুত দুর্বলতা কেটে যায়। গ্লুকোজের ঘাটতিও পূরণ হয়।
* কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
* কোলেস্টেরলের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখে। হাড় মজবুত রাখে।
* ফুসফুসের প্রদাহ এবং সুরক্ষায় বিশেষ কার্যকর।
* ক্রনিক ব্রংকাইটিসে ভালো উপকার দেয়।
* অ্যামাইনো এসিড থাকার কারণে হজমের সহায়তা করে।
* অন্ত্রের কৃমি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি ও হজমে সহায়তা করে।
* প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ থাকে বলে দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি রাতকানা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
* দাঁতের মাড়ি শক্ত করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
* ব্রংকাইটিস, রিকেট রোগে বেশ ভালো কাজ করে।
* ক্ষুধার তীব্রতা কমায়। পাকস্থলীকে কম খাবার নিতে উদ্বুদ্ধ করে। শরীরের প্রয়োজনীয় শর্করার ঘাটতি পূরণ করে, মুটিয়ে যাওয়াও প্রতিরোধ করে।
* রক্তশূন্যতা পূরণে ভূমিকা রাখে।
* অতিরিক্ত প্রোটিন শরীর থেকে বের হয়ে গেলে কিংবা শ্বেতপ্রদরে খেজুর খুব ভালো কাজ করে।
* পিপাসা নিবারক হিসেবে ভালো কাজ করে।
রাজিয়া হক: পুষ্টিবিদ ডায়েট প্লান্টে অ্যান্ড নিউট্রিশন কনসালট্যান্সি।
তামান্না চৌধুরী: প্রধান- পুষ্টিবিদ এ্যাপোলো হসপিটাল, ঢাকা।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •