তাবূকের যুদ্ধ ও হুযূর-ই আকরামের তিন সাহাবা-ই কেরাম

0

শানে রিসালত
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান >
তাবূকের যুদ্ধ ও হুযূর-ই আকরামের তিন সাহাবা-ই কেরাম
আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেছেন-
لَقَد تَّابَ الله عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِن بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ- وَعَلَى الثَّلاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُواْ حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّواْ أَن لاَّ مَلْجَأَ مِنَ اللهِ إِلاَّ إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُواْ إِنَّ اللهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ-
তরজমা: ১১৭. নিশ্চয় আল্লাহ্র রহমতসহ ধাবিত হলো এ অদৃশ্যের সংবাদদাতা এবং ওই মুহাজিরগণ ও আনসারের প্রতি, যারা সংকটকালে তাঁর সাথে সাথে ছিলো। এর পরে যে, তাদের মধ্যে কিছু লোকের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো; অতঃপর তাদের প্রতি রহমত সহকারে দৃষ্টিপাত করেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র, দয়ালু।
১১৮. এবং ওই তিনজনের প্রতি, যাদেরকে মওকূফ রাখা হয়েছিলো এ পর্যন্ত যে, যখন পৃথিবী তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিলো . . . আল-আয়াত।
[সূরা তাওবা: আয়াত-১১৭-১১৮, কান্যুল ঈমান]
শানে নুযূল
এ দু’টি আয়াত ঐতিহাসিক তাবূকের যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত। এ যুদ্ধের অপর নাম ‘গায্ওয়া-ই উসরত’ (সংকটপূর্ণ যুদ্ধ)। এটা হক্ব বাত্বিলের মধ্যে ওই সর্বশেষ যুদ্ধ, যাতে হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সশরীরে শরীক হয়েছিলেন এবং স্বয়ং ইসলামী সৈন্য বাহিনীর সেনাপত্বিত্ব করেছিলেন।
ঘটনাঃ ৯ম হিজরীর রজব মাস। এ ভয়ানক ও দুঃখজনক খবর আসলো যে, রূম সা¤্রাজ্যের বাদশাহ্ ক্বায়সার-ই রূম এক বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে এ অসদুদ্দেশ্যে ‘মদীনা মুনাওয়ারার উপর হামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছে যে, মদীনা মুনাওয়ারাকে ধ্বংস করে মুসলমানদেরকে দুনিয়া থেকে নিশ্চি‎হ্ন করে ফেলবে। এ খবর শুনা মাত্র হুযূর তাজদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের পয়গাম্বরসূলভ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা সহকারে ঘোষণা করে দিলেন- ‘‘রূমী সৈন্যরা মদীনা মুনাওয়ারায় আসার পূর্বেই আমরা এগিয়ে গিয়ে তাদের ভূ-খণ্ডে তাদের তূফানী সৈন্য বাহিনীর মোকাবেলা করবো।’’ সুতরাং আল্লাহর নবীর এ ঘোষণা শোনার সাথে সাথে রিসালত-প্রদীপের উপর প্রাণোৎসর্গকারী সাহাবা-ই কেরাম দৌঁড়ে এসে সমবেত হতে থাকেন। দেখতে দেখতে ত্রিশ হাজার প্রাণোৎসর্গকারীর এক বিরাট জমা‘আত প্রাণপণে যুদ্ধ করার জন্য ইসলামী পরচমের (পতাকা) নিচে একত্রিত হয়ে গেলেন।
কিন্তু, আল্লাহু আকবার, এ সৈন্যবাহিনীর অভিযাত্রা শুরু করার সময়টি ছিলো বড় কষ্টকর ও কঠিন। মুসলমানদের দারিদ্রের অবস্থা এ ছিলো যে, এ দীর্ঘ সফরের জন্য প্রতি দশজন লোকের আরোহণের জন্য একটি মাত্র উট ছিলো, যার উপর পালা পালা করে তাঁরা আরোহণ করছিলেন। মৌসুমের গরমের অবস্থাও এ ছিলো যে, আরবের মরুভূমির একেকটি ধূলিকণা জ্বলন্ত চুলোতে পরিণত হয়েছিলো। বাতাস তো বাতাস ছিলো না যেন ‘লূ’ হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিলো। ওদিকে খাদ্য সামগ্রীর স্বল্পতার অবস্থা এ ছিলো যে, প্রতি ২৪ ঘন্টায় একেকটি খেজুরের উপর কয়েকজন সাহাবী এভাবে দিনাতিপাত করছিলেন যে, প্রত্যেকে ওই খেজুর চুষে কিছুটা পানি পান করছিলেন মাত্র। পানির স্বল্পতা তো আরো শোচনীয় ছিলো। কয়েক মানযিল পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও পাওয়া যায়নি; বরং কখনো কখনো পানির পিপাসায় কাতর হয়ে অনেকের প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়েছিলো।
কিন্তু এমন কঠিন থেকে কঠিনতর অবস্থায়ও সাহাবা-ই কেরামের জিহাদের প্রেরণা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। ইসলামের জন্য নিজের শির ও প্রাণ উৎসর্গকারীর পূর্ণাঙ্গ জোশ সহকারে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এভাবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা তাবূকের ময়দানে পৌঁছে তাঁবূ খাঁটালেন। আর ওই আল্লাহ্ ওয়ালাদের আতঙ্ক ও দাপটের প্রভাব এমনভাবে বিস্তার লাভ করলো যে, রূমীদের অন্তর ভয়ে কেঁপে উঠলো। মুসলমানদের না’রা-ই তাকবীরের গগণচুম্বি ধ্বনি শুনে রূমীদের বড় বড় পলোয়ানদের দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে লাগলো। রোম স¤্রাট কায়সার এমন ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়লো যে, মদীনা মুনাওয়ারার উপর হামলা করার যাবতীয় পরিকল্পনা ধূলোয় মিশে গিয়েছিলো। মুসলিম বাহিনীর বিরাট আয়োজন, সাহস ও শক্তি দেখে রোমানরা ভীত হয়ে পালায়ন করল। তাজেদারে মদীনা সেখানে ২০ দিন অবস্থান করে ইসলামের শত্রুদেরকে উত্তমরূপে আতঙ্কিত করে মদীনা মুনাওয়ারায় তাশরীফ নিয়ে যান। বিশ্বনবী ও মুসলমানদের এ বিজয় দেখে আয়লার খ্রিস্টান গভর্ণর বার্ষিক কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্ম-সমর্পণ করে; সিরীয় সীমান্তের কয়েকটি ইহুদি ও খ্রিস্টান বসতি এলাকাও অধিকৃত হয় এবং দূমাতুল জন্দলের খ্রিস্টান শাসক বন্দী হয়ে সদাচরণের মুচলিকা দিতে ও মাথা পিছু কর দিতে বাধ্য হয়। বর্ণিত হয় যে, হুযূর-ই আকরাম জীবনে ছোট বড় ২৭টি যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তন্মধ্যে ৯টি যুদ্ধ স্বয়ং পরিচালনা করেন। [সূত্র: উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামের ইতিহাস: প্রথমপত্র- হাসান আলী চৌধুরী]
হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন তাবূক থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় তাশরীফ আনলেন এবং মসজিদ-ই নবভী শরীফে আসন অলঙ্কৃত করলেন, তখন প্রায় ৮০ জনের অধিক মুনাফিক তাঁর পবিত্র দরবারে এসে হাযির হলো, যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তারা তখন মিথ্যা শপথ করে এবং নানা ধরণের অজুহাত দেখিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলো। তারা সুন্দর সুন্দর কথা হুযূর-ই আকরামকে ধোঁকা দেওয়ার এবং নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণিত করার চেষ্টা করছিলো। আর রহমতে আলাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামও তাদের মিথ্যা ও দোষগুলো গোপন করার খাতিরে তাদের বাত্বিনকে আল্লাহর উপর সোপর্দ করে তাদের কথিত ওযরগুলো কবূল করলেন এবং কাউকে কোনরূপ তিরস্কার করেননি।
তিনজন সত্যিকার অর্থে মু’মিনের অবস্থা
তাঁদের একজন হলেন হযরত কা’ব ইবনে মালিক, দ্বিতীয়জন হযরত হিলাল ইবনে উমাইয়া এবং তৃতীয়জন হযরত মুরারাহ্ ইবনে রাবী’। এ তিনজন হলেন নিষ্ঠাবান সাহাবী। তবে তাঁরা যুদ্ধে শরীক হননি। এ তিনজন সাহাবী যখন রসূল-ই আকরামের দরবারে আসলেন, তখন তাঁরা কোন মিথ্যা বাহানা পেশ করেননি; স্বচ্ছ হৃদয়ে একেবারে সত্য কথাটি পেশ করলেন। তাঁরা বলেছেন, ‘‘ইয়া রসূলাল্লাহ্! আমাদের কোন বাধ্য বাধকতা ও ওযর ছিলো না, আমরা শুধু অলসতা ও উদাসীনতা বশত: যুদ্ধে শরীক হইনি। এজন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থী, চূড়ান্ত পর্যায়ের লজ্জাবোধ করছি এবং মাফ চাচ্ছি।
রহমতে আলম হুযূর-ই আকরাম এ তিনজন নিষ্ঠাবান সাহাবীর বর্ণনা শুনে এরশাদ করলেন, ‘‘এ তিনজন একেবারে সত্য কথাই বলেছে। কিন্তু আমি এখন তাদের সম্পর্কে রায় মওকূফ রাখছি। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কে খোদা তা‘আলার কোন ফরমান নাযিল হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোন ফয়সালা করবো না। এখন আমি তাদের সম্পর্কে এ হুকুম দিচ্ছি যে, সমস্ত মুসলমান এ তিনজনকে সম্পূর্ণ বয়কট করবে।’’
হুযূর-ই আকরামের এ এরশাদ শুনা মাত্র সমস্ত মুসলমান তাঁদের (এ তিনজন) সাথে সালাম-কালাম, মেলামেশা ও পানাহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিলেন।
এমতাবস্থায় দীর্ঘ চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলো। এরপর তাজেদারে মদীনা এ হুকুমও জারী করলেন যেন তাঁরা নিজ নিজ স্ত্রীদের থেকে পৃথক হয়ে যান। এ বয়কটের কারণে এ তিনজন সাহাবীর উপর কি অবস্থা হলো তাতো সহজে অনুমেয়। হযরত মুরারাহ্ অপারগ হয়ে নিজ ঘরে আত্মগোপন করলেন এবং রাতদিন অস্থির হয়ে কান্নাকাটিতে মশগুল হয়ে গেলেন। হযরত কা’ব যেহেতু বড় বাহাদুর লোক ছিলেন, সেহেতু তিনি ঘরে আত্মগোপন করেন নি, বরং পাঁচ ওয়াক্বতের নামায মসজিদে নবভী শরীফে পড়তেন, বাজারে যেতেন। কিন্তু পুরানা বন্ধুদের সালাম দিলে তারা সালামের জবাবও দিতেন না; বরং অতি ঘৃণাভরে উপেক্ষা করে চলে যেতেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি মসজিদে নবভী শরীফে গিয়ে হুযূর-ই আকরামের যথা সম্ভব নিকটে গিয়ে নামায পড়তাম আর এ আশায় তাঁর নূরানী চেহারার দিকে তাকাতাম যে, তিনি আমাকে একবার হলেও রহমতের দৃষ্টিতে দেখবেন। কিন্তু আফসোস! তিনি আপন চেহারা মুবারককে আমার দিক থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিতেন।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমার দুই আপজন আমার চাচাত ভাই আবূ ক্বাতাদার বাগানের দেওয়ালে চড়ে তাঁকে আমি সালাম করলাম। কিন্তু তিনি না আমার সালামের জবাব দিলেন, না আমার দিকে ফিরে দেখেছেন। এমনকি আল্লাহর কসম দিয়েও তাঁকে আমার দিকে ফেরাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত আমি অশ্রু সজল হয়ে দেওয়াল থেকে নেমে ফিরে এলাম।
শাহী প্রস্তাবনামা উনুনে
হযরত কা’ব ইবনে মালকের বর্ণনা, ‘‘এক্ষণি আমার আপন জন আবূ ক্বাতাদার ব্যবহারে আমার হৃদয় খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছিলো, আমার চোখের পানি থামেনি, আরেকটা চরম পরীক্ষা আমার সামনে এসে হাযির। আর তা হচ্ছে আমি বাজারের ভিতর দিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কি দেখতে পাচ্ছিলাম! সিরিয়া-রাজ্যের এক কৃষক লোকজনকে জিজ্ঞাসা করছে- কা’ব ইবনে মালিক কে? তাকে কোথায় পাওয়া যাবে? সে আমাকে খুব হন্যে হয়ে তালাশ করছিলো। আর আমি দেখলাম- কেউ মুখেতো কিছুই বলছিলো না, বরং আমার দিকে ইশারা করে তাকে আমার দিকে ফেরাতে চাচ্ছে। কৃষকটি আমাকে দেখামাত্র আমার দিকে দৌঁড়ে এলো এবং সে আমাকে একটি চিঠি দিলো, যা গাস্সানের বাদশাহ্ আমার নামে লিখেছিলো। তাতে সে লিখেছিলো-
‘‘হে কা’ব ইবনে মালিক! আমি জানতে পেরেছি যে, তোমার নবী তোমার উপর বড় যুল্ম করেছেন। কিন্তু খোদা তো তোমাকে এমন মানহীন করে তৈরি করেননি যে, দুনিয়ায় তোমার কোন সাথী ও সাহায্যকারী থাকবে না! তুমি এক্ষুণি আমার দরবারে এসে যাও! আমি তোমার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপনকারী ও সাহায্যকারী।’’
বেরাদরানে মিল্লাত! হযরত কা’ব বলেছেন, এ চিঠি পড়ে আমি গাস্সানের বাদশার প্রতি ক্ষোভে ফেটে পড়লাম। আমি ভালভাবে বুঝতে পরলাম যে, এটাও আমার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় পরীক্ষার উপকরণ। সুতরাং আমার ঈমানের শিরা-উপশিরায় আবেগের তূফান বইতে লাগলো। আমি রাগে ও ক্ষোভে নিজেকে সামাল দিতে পারলাম না। আমি এক রুটি তৈরীকারীর জ্বলন্ত চুলোয় ওই চিঠিটা ফেলে দিলাম। আর ওই কৃষককে বললাম, ‘‘তুমি তোমার দেশে গিয়ে গাস্সানের বাদশাহ্কে বলে দিও, ‘‘তোমার চিঠির জবাব হচ্ছে এটাই।’’ এটা বলে তিনি চলে গেলেন। কৃষকটি আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলো।
[বোখারী শরীফ: ২য় খণ্ড, ৬৩৫ পৃষ্ঠা, ‘কা’ব ইবনে মালিকের হাদীস’ শীর্ষক অধ্যায়]
সুপ্রিয় পাঠক সমাজ!
মোট কথা, এমনি অসহনীয় অবস্থায় ওই তিন সাহাবীর ৫০ দিনরাত অতিবাহিত হয়ে গেলো। এ তিনজন মদীনা মুনাওয়ারার অলিতে-গলিতে, হাটে-বাজারে প্রত্যাখ্যাত ও লাঞ্চিত ছিলেন। তাঁদের অবস্থা জিজ্ঞাসাকারী কিংবা সাহায্যকারী কেউ রইলো না। বস্তুত: এটা একটা অসহনীয় পরীক্ষা ছিলো। কিন্তু ওই সাহাবীত্রয়ের ধৈর্য্যরে পাহাড় হিমালয়ের চেয়েও উঁচু ছিলো। তাঁদের ধৈর্যের বিন্দুমাত্র কমতি হয়নি। যদিও মনের দুঃখে অহরহ তাঁদের কান্না কিছুক্ষণের জন্যও থামেনি। এদিকে তাঁদের মনে আরেক চিন্তা বিরাজ করছিলো এবং কাঁটার মতো বিঁধে যাচ্ছিলো। তা হচ্ছে যদি এমতাবস্থায় তাঁদের কারো মৃত্যু হয়ে যায়, তবে তো হুযূর-ই আকরাম ও তাঁর কোন সাহাবী তাঁদের জানাযার নামাযও পড়বেন না, আর যদি ইত্যবসরে হুযূর-ই আকরামেরও ওফাত শরীফ সংঘটিত হয়ে যায়, তবে তো তারা সারা জীবন এমতাবস্থায় থেকে যাবেন। জানাযার নামায তো দূরের কথা তাঁদের লাশে কেউ হাতও লাগাবেন না। এসব কথা চিন্তা করতে করতে তাঁদের হৃদয় পটে ভূ-কম্পন চলছিলো, আর এর উপক্রম হয়েছিলো যেন তাঁদের রূহ বের হয়ে যাবে।
তাওবা কবূল হলো
মোট কথা, এ পঞ্চাশ দিন এ তিন সাহাবীর উপর তিন বছরের চেয়ে বেশী সময়ের মতো অতি কষ্টে অতিবাহিত হলো। এ দীর্ঘ সময় যাবৎ তাঁদের তাওবা-ইস্তিগফার, আল্লাহ্ ও রসূলে আকরামের দরবারে কান্নাকাটি জারী-ই ছিলো। এরপর একদিন পরম দয়ালু আল্লাহর রহমতের সমুদ্রে ঢেউ খেললো। রাতের শেষ ভাগে হুযূর রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু ত‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার হুজুরা মুবারকে তাশরীফ রাখছিলেন। হাঠাৎ আল্লাহর ওহী নাযিল হয়েছে। হুযূর রহমতে আলম বললেন, يَا اُمَّ سَلَمَةَ تِيْبَ عَلى كَعْبٍ হে উম্মে সালামাহ্! কা’বের তাওবা কবূল হয়েছে। সুবহা-নাল্লাহ্! সুবহা-নাল্লাহ্! তাঁদের প্রসঙ্গে পবিত্র ক্বোরআনের এ আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে-
لَقَد تَّابَ الله عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ الاية-
অর্থাৎ- নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা নবীর দিকে এবং মুজাহিদগণ ও আনসারের দিকে রহমতরাজির সাথে মনোনিবেশ করেছেন, কারা সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে নবীর অনুসরণ করেছেন। [. . . আল-আয়াত]
এ আয়াতগুলোতে অনেক শিক্ষা ও নসীহত রয়েছে। আরো অনেকগুলো সুক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। যেমন- যখন আল্লাহ্ তা‘আলা নিজের রহমতরাজির সাথে কৃপাদৃষ্টি প্রদানের ঘোষণা দিলেন, তখন মুহাজির ও আনসারের পূর্বে আপন নবীর উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত: এ আয়াতে আনসার ও মুহাজিরদের অগণিত ফযীলত ও গুণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আনসার ও মুহাজিরগণ কঠিন সময়েও রসূলে আকরামের দরবার ছাড়েন নি। তৃতীয়ত: ৮০ জন লোক রসূলে আকরামের দরবারে মিথ্যা অজুহাত পেশ করেছিলো। কিন্তু রসূল আকরাম তাদের রহস্য ফাস করে তাদের অপমাণিত করেন নি; বরং তাদের মামলা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে তাদের অব্যহতি দিয়েছিলেন। কিন্তু হযরত কা’বা ইবনে মালিক, হযরত মুরারাহ্ ইবনে রবী’ ও হযরত হেলাল ইবনে উমাইয়্যা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম সত্য বলে রসূলে আকরামের দরবারে লজ্জিত হন এবং কঠোর অবস্থার সম্মুখীন হন। এর কারণ, ওই আশিজন গোপনে মুনাফিক ছিলো আর এ তিনজন সাচ্ছা মুসলমান ছিলেন। ওই আশিজন আল্লাহর দুশমন ছিলো আর এ তিনজন ছিলেন আল্লাহর বন্ধু। স্মর্তব্য যে, তিরস্কার করা হয় বন্ধুদেরকে, পরীক্ষাও হয় আপনদের, শত্রুদের নয়। বরং বন্ধু যত ঘনিষ্ট হয়, পরীক্ষাও তত বড় হয়। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, اَشّدُّ النَّاسِ بَلَاءً الْاَنْبِيَاءُ ثُمَّ الْاَمْثَلُ فَالْاَمْثَلُ অর্থাৎ-আল্লাহ্ তা‘আলার এ পবিত্র নিয়ম যে, তিনি . . .তাঁর প্রিয় বান্দাগণ অর্থাৎ তাঁর নবীগণ আলায়হিমুস্ সালামকে সর্বাপেক্ষা বড় পরীক্ষা এবং সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন। আবার শেষ পরিণতিও মু’মিন এবং নেক বান্দাদের উত্তমই হয়, মুনাফিক্ব, কাফিরদের পরিণতি হয় অতি শোচনীয়।

লেখক: মহাপরিচালক – আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •