তাকওয়া অর্জনের অনন্য মাধ্যমঃ পবিত্র রমজানুল করীম

0

তাকওয়া অর্জনের অনন্য মাধ্যমঃ পবিত্র রমজানুল করীম
মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান
রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের বারতা নিয়ে ঈমানদারের কাছে আবারো ফিরে এলো মাহে রমজান। ঈমানদাররা এমন কিছু সময় বা মুহূর্তের সন্ধান পায় যাতে তার সকল দোয়া কবুল হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পবিত্র মাস। ঈমানদারের জন্য সমূহ কল্যাণে ভরপুর এ পবিত্র মাস। ইমানদারগণ সারাদিন সিয়াম সাধনা করে, রাত জেগে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে অতিবাহিত করে থাকে। এ মাসে জান্নাতের দ্বার সমূহ উন্মুক্ত থাকে, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা থাকে, শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। হাজার মাসের চেয়ে উত্তম লাইলাতুল কদর এমাসের শেষ দশকেই রয়েছে। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব গুলোও এমাসে অবতীর্ণ হয়েছিল। ১ রমজান হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর উপর সহিফা অবতীর্ণ হয়, ৬ রমজান হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম এর উপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হয়। ১২ রমজান হযরত দাউদ আলায়হিস্ সালাম এর উপর যাবুর কিতাব এবং ১৮ রমজান হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম এর উপর ইঞ্জিল কিতাব অবতীর্ণ হয়। সিয়মা সাধনা ইসলামের এমন একটি বিধান যার মাধ্যমে মানুষ অভুক্ত, অনাহারীর কষ্ট বুঝতে পারে। মানুষের মনে মানবিকতার ভাব উদয় হয়।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে মানুষের জন্য দুটি পথ রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বস্তুত আমি তাকে দুটি পথ প্রদর্শন করেছি”। (সূরা আল বালাদ-১০)
একটি হলো সৎপথ বা কল্যাণের পথ যা মানুষের অন্তরে নূর সৃষ্টি করে। মানুষ কল্যাণকর কাজে দৃঢ় থাকতে পারে। আর অপরটি হলো শয়তানের পথ যার মাধ্যমে মানুষের মনে পাশবিকতা জাগ্রত হয়। দুনিয়ার মায়ায় আচ্ছন্ন থাকে। পরকালের কথা ভুলে যায়। ধীরে ধীরে তার অন্তর আরো কলুষিত হতে থাকে। কিন্তু রমজান এমন একটি নিয়ামত যার মাধ্যমে মানুষ নিজের রিপুকে দমন করতে পারে। নিজের ভিতর পশুত্বকে হত্যা করে আল্লাহর ভয়কে জাগ্রত করতে পারে। ফলে ক্রমশঃকল্যাণের পথে অগ্রসর হতে থাকে।
পূর্ববর্তী নবিগণের মধ্যে হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন। যাকে আইয়ামে বীজের রোজা বলা হয়। আদমে সানি হিসেবে পরিচিত হযরত নূহ আলায়হিস্ সালাম সারা বছরই রোজা পালন করতেন। আল্লাহর নবি হযরত দাউদ আলায়হিস্ সালাম একদিন পর একদিন রোজা পালন করতেন। দাউদ আলায়হিস্ সালাম এর উপর অবতীর্ণ কিতাবে রোজাকে বলা হতো “ কোরবাত” যার অর্থ হলো নৈকট্য লাভ করা।
রোজাদার বান্দা এ মাসে বেশি বেশি নেক কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকে। র্দীঘরাত জাগ্রত থেকে যাবত তারাবির সালাত, তাহাজ্জুদ, অন্যান্য নফল সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল আদায় করে। রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি ইমান ও ইহাতসাবের সঙ্গে ও পূণ্য লাভের আশায় রমজানে রাত জেগে ইবাদত করে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। [বুখারি ও মুসলিম]
মৌলিক ইবাদত গুলোর মধ্যে সালাত ও সাওম উভয়টি হাক্কুল্লাহ হিসেবে স্বীকৃত। ঈমানের পরেই সালাতের স্থান। অর্র্থাৎ আল্লাহর নিকট পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনের সাথে সাথে সালাত যেমন আবশ্যক অনুরূপ ভাবে রমজান মাস পেলেই সিয়াম সাধনা তার উপর ফরজ। সালাত মানুষকে যাবতীয় অশ্লীলতা ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর সাওমের উদেশ্য হলো বান্দাকে মুত্তাকি বানানো।
রমজান মাস হলো তাকওয়া অর্জনের মৌসুম। তাকওয়া শব্দের অর্থ হলো ভয় করা, বেঁচে থাকা, সতর্ক হওয়া ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালা রোজার বিধান সম্বলিত আয়াতটি শুরু করেছেন ইমানের কথা দিয়ে আর শেষ করেছেন তাকওয়া দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,“হে ইমানদারগণ তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববতী লোকদের উপর ফরজ করা হয়েছিল যাতে তোমরা তাকাওয়া অর্জন করতে পার”। (সূরা বাকারা-১৮৩)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে গড়া ইসলামের সোনালী যুগের সাহাবাগণ এই মূল মন্ত্রেই জীবন আতিবাহিত করেছেন। তারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করলেও দুনিয়ার প্রতি ছিল অনাসক্ত ও আখিরাতের প্রতি উদগ্রীব। আখিরাতে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকী বান্দাগনের জন্য যে চিরশান্তি ও নেয়ামতের ব্যবস্থা রেখেছেন সেটাকেই তারা কামনা করতেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে নবি) আপনি বলুন! আমি কি তোমাদেরকে এগুলো আপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তুর কথা বলে দেব? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য রবের নিকট জান্নাত সমূহ রয়েছে। যার তলদেশে নদী প্রবাহিত যাতে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। আরো আছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। এবং আল্লাহ বান্দাদেরকে দেখেন। (সূরা আলে ইমরান-১৫)
তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষ ইমানের উপর দৃঢ় থাকতে পারে। দুনিয়ার যে কোন মসিবত আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসার উপর প্রাধান্য লাভ করতে পারে না। যেমন, হয়রত মুসা আলায়হিস্ সালাম এর সাথে মোকাবিলা করার জন্য ফিরআউন প্রায় বাহাত্তর জন জাদুকর ও তাদের সরঞ্জাম জমা করল। মুসা আলায়হিস্ সালাম তার লাঠিটি মাটিতে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে তা বিরাট অজগর সাপ হয়ে তাদের যাদুগুলো গিলে ফেলল। তখন যাদুকরদের আর বুঝতে বাকী রইলো না যে, যাদু কখন যাদুকে গ্রাস করতে পারেনা। বরং তা নিঃসন্দেহে নবির মুজিযা ছাড়া অন্য কিছু নয়। সাথে সাথে যাদুকররা সেজদায় পড়ে গেল এবং ঘোষণা করল, আমরা মুসা আলায়হিস্ সালাম ও হারুন আলায়হিস্ সালাম এর পালনকর্তার প্রতি বিশ^াস স্থাপন করলাম। ফিরআউন হতভম্ভ হয়ে গেল এবং তাদেরকে কঠিন শাস্তির অদেশ দিল। এমনকি ফিরআউন বলল, তোমাদের ডানহাত ও বামপা কাটা হবে, এরপর তোমাদেরকে শূলের মধ্যে মৃত্যু না আসা পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘যাদুকররা বলল, আমাদের কাছে যে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে তার উপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার উপর আমরা কিছুতেই তোমাকে প্রাধান্য দেবনা। অতএব, তুমি যা ইচ্ছা করতে পার। তুমিতো শুধু পার্থিব জীবনেই যা করার করবে”। (সূরা তা-হা:৭২)
আল্লাহর উপর গভীর আস্থার কারণে ফিরাআউনের হুমকির মুখেও তারা মুসা আলায়হিস্ সালামএর উপর দৃঢ় ইমান ছেড়ে দেননি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন দেখ, তারা দিনের শুরুতেই ছিল যাদুকর ও কাফের আর দিনের শেষ অংশে হয়ে গেল আল্লাহর ওলি ও শহীদ। জীবনের কিছুক্ষণ সময় একজন নবির সংস্পর্শে থাকার কারনে তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় এমনভাবে জাগ্রত হলো ফেরআউনের চরম শাস্তিকে কিছুই মনে করলেন না।
দার্শনিক ইমাম গাযালী রহমাতুল্লাহি আলায়হি সিয়াম পালনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন- আখলাকে ইলাহী তথা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করে তোলাই হচ্ছে সিয়ামের মূল উদ্দেশ্য। সিয়াম ফেরেশতাদের অনুকরণের মাধ্যমে যতদূর সম্ভব নিজেকে প্রবৃত্তির গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। মানুষের মাঝে সহজাত এমন কিছু প্রবৃত্তি আছে। যেমন, আত্মস্থ প্রবৃত্তি, আত্ম-প্রতিষ্ঠা প্রবৃত্তি, ক্রীড়া কৌতুক প্রবৃত্তি, যৌন কমনা, বিশ্রাম ইত্যাদি। প্রত্যেক প্রাণীই এসব প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে চায়। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণী এসব চরিতার্থ করতে গিয়ে কোনো বাঁধা নিষেধ মানেনা। কিন্তু একমাত্র মানুষকে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কারণ অন্যান্য প্রাণীর কোনো বিবেক বোধ নেই মানুষকে বিবেক বোধ দেওয়া হয়েছে। তাই তার ইচ্ছা শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তার ভিতরের পশুত্বকে দমন করতে কঠোর সাধনা করতে হয়। তাই মানুষ যখন পাশাবিক ইচ্ছার সুতীব্র ¯্রােতে গা ভাসিয়ে দেয় তখন নেমে যায় অধঃপতনের নিম্মতম স্থানে। তখন অরণ্যের পশু ও লোকালয়ের মানুষের কোনো পার্থক্য থাকে না। আর সে যখন তার পাশাবিকতা দমন করতে সক্ষম হয়, তখন তার স্থান নির্ধারিত হয় নুরের ফেরেশতাদের উপরে। (এহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১ম- খন্ড, পৃ:২১২)
আল্লাহ তায়ালা ১২টি মাসের মধ্যে একটি মাসকে ইন্দ্রিয় সংযম পালনের হুকুম প্রদান করেছে। কেননা মানব সমাজে অপরাধ প্রবণতা প্রসারের জন্য কুপ্রবৃত্তির ভূমিকা অত্যধিক। তাই সিয়াম পালনই এই কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সহীহ বুখারীতে রয়েছে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অবর্তমানে এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম যে, মসিবত সংঘটিত হয়েছিল তা হলো পেটপুরে খাওয়াকে কেন্দ্র করে। কেননা মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি হলে শরীর সতেজ হয়ে উঠে, আত্মা সংকীর্ণ হয়। প্রবৃত্তি বল্গাহীন রূপ ধারণ করে। হাদিস পাকের মধ্যে হযরত রাসুলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করবে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে, রমজান মাসে রোজা রাখবে, বায়তুল্লাহ শরীফে হজ করবে, স্বতঃস্ফুর্তভাবে নিজেদের মালের যাকাত আদায় করবে, তাহলেই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।
হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত প্রিয় নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন, আমার উম্মতকে রমজান মাসে এমন পাঁচটি বিশেষ নিয়ামত দান করা হয়েছে যা পূর্বে কোনো উম্মতকে দান করা হয়নি। যা হলো-
১. রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর তায়ালার কাছে মেশকের চেয়েও বেশি সুগন্ধি বলে বিবেচিত হয়।
২. রোজাদরদের জন্য পানির মাছ ও গর্তের পিপীলিকা সহ সব মাখলুকাত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
৩. রমজান মাসে প্রতিদিন নতুন নতুন সাজে বেহেশতকে সাজানো হয় রোজাদার বান্দাদের জন্য।
৪. রমজান মাসে শয়তানকে বন্দি করে রাখা হয়। যার ফলে এই মাসে পাপের মাত্রা কমে যায়।
৫. এই মাসের শেষ রাতে রোজাদার বান্দাদের সমস্ত গুনাহ মাপ করে দেওয়া হয়। সাহাবারা আরজ করলেন, এটা কী লাইলাতুল কদরের রাত্রে? নবিজী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। বরং নিয়ম হলো শ্রমিক যখন কাজ শেষ করে তখন তাকে সাথে সাথেই তার প্রাপ্য মজুরি আদায় করা হয়। (বায়হাকী)
রমজান মাস হলো ইবাদত বন্দেগির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার মাস। এ মাসে প্রতিটি আমলের সাওয়াব বহুগুণ বেড়ে যায়। রাসূলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমা থেকে আরেক জুমা ও এক রমজান থেকে আরেক রমজান তাদের মধ্যবর্তী পাপগুলো মোচনকারী, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়। (সহিহ মুসলিম)
রোজার মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়ার প্রভাব মোমিনের পরর্বতী জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে সে কখনো অন্যায় কাজ করতে পারে না। এ জন্য রাসূলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, রোজা ঢাল স্বরূপ। অর্থাৎ, ঢাল যেভাবে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষা করে তেমনি রোজাও বান্দাকে শয়তানের অনিষ্ট, প্রবঞ্চনা ও প্ররোচণা থেকে বাচিঁয়ে রাখে। আল্লাহ তায়ালা তার উপর সন্তুষ্ট হন। পরকালে জান্নাত লাভের পথ সহজ হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং স্বীয় প্রবৃত্তিকে রিপুর অনুসরণ থেকে বিরত রাখে তার ঠিকানা হবে জান্নাত। (সূরা নাজিআত,৪০-৪১)
রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করতে পারেনি তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। রাসুলেপাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, এমন কিছু রোজাদার রয়েছে যাদের রোজা শুধু পিপাসাই লাভ হয়। সুতরাং বুঝা গেল রোজার মাধ্যমে এমন একটি শক্তি তৈরি করা যায় যা যাবতীয় অনৈতিক ও গর্হিত কাজের মধ্যে প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে।
আল্লাহর বান্দারা তাকওয়ার অর্জনের মাধ্যমে সাওম পালনের পাশাপাশি এর হাকিকত বা গুঢ় রহস্য সর্ম্পকেও উপলব্ধি লাভ করতে পারে। সাওমের মাধ্যমে স্বীয় নফসে আম্মারাকে প্রতিহত করার কৌশল শিখতে পারে। দৈহিক ও জাগতিক সমস্ত ভোগ বিলাসের তাড়না এই নফসে আম্মারার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আর মানুষের অন্তরই হলো তাকওয়ার স্থান। হযরত ইরবাস বিন সারিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে নিয়ে নামায পড়লেন অতঃপর আমাদের দিক মুখ ফিরিয়ে বসলেন, এবং আমাদেরকে মর্মস্পর্শী উপদেশ প্রদান করলেন। যাতে আমাদের চোখ গুলো অশ্রুশক্তি হলো এবং অন্তর সমূহ বিগলিত হলো। তখন এক ব্যক্তি উঠে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! মনে হয় এটি বিদায়ী উপদেশ? তখন তিনি বললেন, আমি তোমাদের তাকওয়া তথা আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। (আবু দাউদ)
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন, রোজার তিনটি স্তর রয়েছে।
১. সর্বসাধারণের রোজা। অর্থাৎ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পানাহার ও ইন্দ্রিয় কামনা থেকে বিরত থাকা।
২. বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রোজা যাকে মধ্যম শ্রেণির রোজাও বলা হয়। পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা সহ অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা।
৩. উচুঁ স্তরের ব্যক্তিদের রোজা। পানাহার ও কামভাব থেকে বিরত থাকার সাথে সাথে চোখ,কান, জিহ্বা, হাত-পা ও অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা এবং মনকে যাবতীয় কুচিন্তা, কুপ্রভাব এবং বৈষয়িক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহ ধ্যানে মগ্ন থাকা।
হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, পানাহার এবং যা কিছু করলে রোজা ভঙ্গ হয় তা করা থেকে বিরত থাকার নাম শরিয়তের বিধান মতে রোজা। অপর পক্ষে হারাম, কুপ্রবৃত্তি, লোভ লালসা ও সফল অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা হলো তরিকতের বিধানমতে রোজা। তিনি আরো বলেছেন, যে শরিয়তের রোজা নির্দিষ্ট মাসের সাথে এবং নির্দিষ্ট সময়ের সাথে। কিন্তু তরিকতের রোজা সারা জীবন।
সুতরাং রমজান মাস হলো তাকওয়া অর্জন করার মাস। আর তাকওয়া অর্জন হলে আল্লাহ তায়ালার কাছে তার মর্যাদা অনেক বেড়ে যায়। তার জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার ও আল্লাহর ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পাপ মোচন করে দেন এবং তাকে মহাপুরস্কার দেন। (সূরা তালাক-৮)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, যে লোক নিজ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করবে, অবশ্যই আল্লাহ তাকওয়াবানদের ভালোবাসেন। (সূরা আল ইমরান-৭৬)

লেখক: সহকারি শিক্ষক – (ইসলাম শিক্ষা), চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •