করোনাকালের দরদী সংগঠন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশঃ আমার স্মৃতিচারণ

0

করোনাকালের দরদী সংগঠন
গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশঃ আমার স্মৃতিচারণ
মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার
কভিড-১৯ বাংলাদেশে প্রথম সনাক্ত হয় ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জে, ৮ মার্চ ২০২০। চট্টগ্রামে প্রথম রোগী পাওয়া গেছে ৩ এপ্রিল ’২০। চট্টগ্রামে কভিড-১৯ পরীক্ষা শুরু হয় ২৫ মার্চ ২০২০ থেকে। লক ডাউন শুরুও একই সময়ে। অথচ গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ করোনাকালের সম্ভাব্য সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়াবার পদক্ষেপ নিয়েছে এরও আগে থেকে। চট্টগ্রামে এর আগে কোন সংগঠন এই মহামারীতে সহায়তা দিতে প্রস্তাব করেনি। অন্য কোথাও করেছে কিনা জানিনা।
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০ আমি ফিরলাম ওমরা থেকে। তখন এই মহামারী চলছিল চীন সহ পৃথিবীর উন্নত কিছু দেশে। স্বপরিবারে হংকং বসবাস করে আমার চার ছোট ভাই। তাই, মহাতংকের খবরা-খবর আমরা অনেকের আগেই পাচ্ছিলাম। ফেব্রুয়ারী ’২০ এ হংকং প্রবাসী ছোট ছোট ভাতিজাদের মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঘরে বসে আতংকে থাকতে দেখেছি, সেই মদিনা শরিফ থেকে ভিডিও কলের সুবাদে।
যাক্, করোনা আসবার আগেই আমাদের পরিবারে করোনা সচেতনতা এবং আতংক দুটোই চলে এল হংকং কানেকশনের কারণে। মনে হচ্ছিল বাংলাদেশও বাদ যাবেনা এই মহামারীর ছোবল থেকে। সারজাহ্ ভিজিটের ভিসা এল। ১৪ মার্চ ২০২০ উড়াল দেবার কথা। কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে। তাই টিকেট কনফার্ম করলাম না। ৮ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হলো। সেদিনই ইন্তেকাল করেন আমার মেঝ চাচা শ্বশুর সৈয়দ সেলিম মোহাম্মদ ইউনুস। শারজাহ যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করলাম। করোনায় মৃতের দাফন কাফন জানাজা নিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় আসবে বুঝতে পারছিলাম। বিদেশে মৃতের দাফন সৎকার নিয়ে যে অমানবিকতা তা প্রতিনিয়ত দেখছি ইন্টারনেট আর আকাশ মিডিয়ার সুবাদে। বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতি নেবার বিষয়টা মাথায় কাজ করতে শুরু করলো আল্লাহর ইচ্ছায়। ১২ মার্চ ২০২০ ছিল চাচা শ্বশুরের চেহলাম উপলক্ষে মেজবান। অনুষ্ঠান শেষে বান্দরবানের বর্তমান জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরিজী, যিনি তখন ছিলেন স্থানীয় সরকার চট্টগ্রামের উপ পরিচালক, তাঁর গাড়িতে করেই শহরে ফিরছিলাম। তাঁকে বললাম, আমার মনের কথাটা। বললাম, করোনায় মৃতের দাফন সৎকার বিপর্যয় আসন্ন, আমরা এই সময়ে সরকারের সহায়তা দিতে চাই। হয়ত সরকারের স্বেচ্ছাসেবক তালিকাভুক্ত হয়ে নতুবা স্বতন্ত্র দাফন টিম গঠন করে কাজ করতে চাই। দরকার সরকারের অনুমতি, দিক-নির্দেশনা এবং পরামর্শ। কথা হলো, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে জানানো হবে আমাকে। ১৫ মার্চ ২০২০, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জনাব ইলিয়াস হোসেন জানালেন করোনায় মৃতের গোসল কাফন দাফন বিষয়টি মূলত সিভিল সার্জন এবং সিটি মেয়রের দায়িত্ব। তিনি পরামর্শ দিলেন তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতে। তিবরিজি জানালেন, যদি শুধু সিটিতে কাজ করি তবে মেয়রের সাথে, আর সিটি এবং সিটির বাইরে সমগ্র জেলার দায়িত্ব হলো সিভিল সার্জনের। তিনি জানতে চাইলেন, আমরা কোন লোকেশনে কাজ করবো। জানালাম, সর্বত্র। তিনি বললেন, তাহলে সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলেন। শুরু হলো, দাফন মিশন। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের অন্যতম যুগ্ন মহাসচিব মাহবুবুল হক খাঁন কে বললাম, সব কথা। তাঁকে অনুরোধ করলাম সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলতে, যেহেতু, তিনি ডাক্তার -ক্লিনিক লাইনে সম্পর্ক রাখেন। বেশ ক’দিন চলে গেল। কোন খবর আসল না। এদিকে, আমি পিপিই যোগাড়ের কাজও সমানে শুরু করেছি ১৬ মার্চ থেকে। কয়েক দফা কথা বললাম, স্মার্ট গ্রুপের এম ডি মোস্তাফিজ সাহেবের বড় ভাই শফিক সাহবের সাথে। তিনি আমাদের আত্মীয়। বাংলাদেশের প্রথম পিপিই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁদের কথা মিডিয়ায় শুনলাম। তখন তারা সরকার কে পিপিই দিতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি আমাকেও আশ্বস্ত করলেন।
পিপিই সংগ্রহ নিয়ে আরো কথা হলো ঢাকার উত্তরা নিবাসী, হাটহাজারী মধ্য মাদার্শার সমাজ দরদী মানুষ আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন ভাইয়ের সাথে। সেই সময়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা লাগছিল এক একটা পিপিই তে। তিনি প্রয়োজনে ঢাকা থেকে পিপিই সহায়তার দায়িত্ব নেবার কথা জানিয়ে আশ্বস্ত করলেন। এ দিকে করোনায় মৃতের লাশ দাফন নয়, পোড়াতে হবে এমন তথাকথিত বৈজ্ঞানিক তত্ব মিডিয়ায় সম্প্রচার হবার সাথে সাথে জন্ম হয় দেশব্যাপী নতুন আতংকের। আলাপ করি, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত কো চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম জামেয়ার অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ অসিয়র রহমান সাহেবের সাথে এবং মুসলমানদের লাশ দাফন বিষয়ে শরয়ী জবাব প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। পত্রিকায় বিবৃতি প্রকাশিত হলো। দাহ্ নয়, দাফনই করতে হবে মুসলমানদের লাশ। তাই প্রস্তুতি নিতেই হবে। চিন্তা করলাম দাফনের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে স্বেচ্ছায় প্রস্তুত এমন কর্মীদের সংগ্রহ করতে হবে। ফেইসবুক আই ডি তে লিখতে শুরু করলাম এই নিয়ে। ২৩ মার্চ লিখলাম, সুরক্ষা পোশাক পরিধান করে চিকিৎসক যদি করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে পারে, তাহলে আমরাও একই পোশাকে আবৃত হয়ে দাফন করতে পারবো। ২৩ মার্চ আরো লিখলাম, জেলায় জেলায় স্বেচ্ছাসেবক টিমকে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দিতে। এমনকি ২৪ মার্চের অপর স্ট্যাটাসে আশ্বস্থ করলাম যে, সুরক্ষা পোশাক যোগাড় হয়ে যাবে সুতরাং তৈরী থাকুন। উল্লেখ্য, এর আগেই ঢাকা-চট্টগ্রামের উক্ত দুই সোর্স, ছাড়াও আরো দুইজন পিপিই দিতে এগিয়ে এসেছিলেন, একজন ইঞ্জিনিয়ার আমান উল্লাহ্ এবং অন্যজন নঈমুল ইসলাম পুতুল। পিপিই নিশ্চিত হবার পরই উক্ত তিনটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। কর্মীদের মধ্যে এ সব ঘোষণা খুব সাড়া জাগালো। জেলায় জেলায় দাফনের জন্য স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করতে বলার পর কেউ কেউ ফোনেও যোগাযোগ করে সম্মতির কথা জানালো। আমার ফেইসবুক বন্ধুদের মধ্যে পরিচিত অপরিচিত কেউ কেউ, জীবনের ঝুঁকি সত্বেও এই কাজে সাথে থাকবার কথা আমার মেসেঞ্জারে এবং স্ট্যাটাসগুলোর কমেন্টে জানাতে শুরু করে। তাঁদের কথা ছিল আপনি উদ্যোগ নিন, আমরা সাথে থাকবো। এতটুকুই যথেষ্ট যে-কোন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এরি মধ্যে কেউ কেউ তাঁদের সম্মতি প্রকাশকে নিশ্চিত করতে মোবাইল নম্বরটাও পাঠিয়ে দিল। বিশেষত, যাঁর সমর্থন এবং উদ্দীপনা আমাকে বেশি আশ্বস্ত করে, তিনি হলেন রাউজানের আহসান হাবিব হাসান। তিনি একজন বিশ্বস্ত এবং সাহসী কর্মী হিসেবে ইতোমধ্যেই পরীক্ষিত ছিলেন। তিনি বললেন, বদ্দা আপনি পদক্ষেপ নিন, আর কেউ আসুক না আসুক আমরা রাউজান থেকে আপনার সাথে থাকবো। এবার আমি কোমর বেঁধে নামতে প্রস্তুত হলাম। কারণ, একদিকে প্রশাসনিক যোগাযোগ হয়ে গেল এবং সুরক্ষা পোশাকের বিষয়ে ফলপ্রসূ যোগাযোগ হলো। পেলাম বিশ্বাস রাখার মতো একটি স্বেচ্ছাসেবক টিম। শুধু তাই নয়, ২৪ মার্চ রাতে, আহসান হাবিব হাসান সহ অন্য কয়েকজন রাউজানের একটি স্থানীয় মিডিয়ায় প্রকাশ্যে জানালেন যে, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ করোনায় মৃতের দাফনের দায়িত্ব পালন করবে, যা ২৫ মার্চ থেকে প্রচার পায়। ২৩ মার্চের আগেই আমার কাছে পিপিই কিনতে পঁচিশ হাজার টাকা দিতে চাইলেন আমাদের প্রকৌশলীদের সংগঠন ওইবি’র পক্ষে ইঞ্জিনিয়ার আমান উল্লাহ্ আমান, কিন্তু আমি টাকা তাঁর হাতেই রাখতে অনুরোধ করি। বললাম, টাকা যখন লাগবে তখন নেব। অবশ্য, উনার মাধ্যমে পরবর্তীতে ডিপ্লোমা ও বি এস সি ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠন আমাদের দফায় দফায় পিপিই দিয়ে পাশে ছিলেন। ২৪ মার্চ টেলিফোনে যোগাযোগ হলো সিভিল সার্জনের সাথে। একাধারে কয়েকদিন সরকারি ছুটি এবং কড়া লক ডাউনের দিকে দেশ এগুচ্ছে তখন। সিভিল সার্জন বৈঠকের তারিখ দিলেন ২৯ মার্চ। তাঁর সাথে সাক্ষাতে যাবার আগেই সম্মতি নিলাম গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব পেয়ার মোহাম্মদ কমিশনার সাহেবের। এরপর, অনুমতি নিলাম আনজুমান এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আলহাজ্ব মোহাম্মদ মহসীন সাহেবের। এই দুইজন পাশে না থাকলে এ বিশাল খেদমতের সুযোগটি অন্তত গাউসিয়া কমিটির মাধ্যমে করতে পারতাম না। হয়ত অন্য কোন ব্যানারে করার প্রয়াস পেতাম, যা এতটা সফলতা পেত না।
২৯ মার্চ ২০২০ সাক্ষাৎ করি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ফজলে রাব্বি, বিভাগীয় কমিশনার এ কে আজাদ, সিটি মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিন, উপ পুলিশ কমিশনার (সিটি এস বি) আবদুল ওয়ারিশ এবং ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে ফোন দিল সিপ্লাস টিভি। তাঁরা জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদের দ্বিতীয় তলায় দাঁড়িয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিল যে, বাংলাদেশে করোনায় মৃতের দাফন করবে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ। শুরু হয়ে গেল হুলুস্থুল কান্ড। সাড়া জাগালো এই ঘোষণা। পরদিন থেকে পত্র পত্রিকায়ও গেল এই খবর। চারিদিকে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে শুরু করে অনেকে। দাফন জানাজা না হবার আতংক কিছুটা কমাতে সাহায্য করলো আমাদের এই এগিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার কারণে। ৩০ মার্চ ২০২০, নঈমুল ইসলাম পুতুল কিছু পিপিই নিয়ে আমার বাসায় চলে এল। ১ এপ্রিল থেকে, সিভিল সার্জনের পরামর্শে উপজেলা কর্মকর্তা এবং স্ব্যাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাবরে স্বেচ্ছাসেবকদের নামের তালিকা জমা শুরু করতে অনুরোধ করি স্থানীয় কমিটিগুলোকে। সব যোগাযোগ ছিল আমার ফেসবুক এবং টেলিফোন মাধ্যমে। স্বাভাবিক ধারায় সংগঠন চলার সুযোগ তখন ছিল না। তবুও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই আমরা প্রায় সাতশো স্বেচ্ছাসেবকের তালিকা সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করি, যা পুরো মাস ব্যাপি চলতে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য সিভিল সার্জনকে ফোনে বলতে থাকি। ১১ এপ্রিল ২০২০ তারিখ বিকেল ৫ টা পর্যন্ত সিভিল সার্জন কার্যালয়েই ছিলাম। তখনো তাঁকে অনুরোধ করি আমাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য। বাসায় আসার পর, সন্ধ্যা ৭ টার দিকে সিভিল সার্জন সাহেব ফোন করে জানালেন কাল সকালেই ২/৩ জন কর্মী তাঁর অফিসে পাঠাতে হবে প্রশিক্ষণের জন্য। ঢাকা থেকে অনলাইনে একযোগে প্রশিক্ষণ হবে। ১২ এপ্রিল প্রশিক্ষণ দিল সিভিল সার্জন অফিসে এবং কয়েকটি উপজেলার সরকারি অফিসে। অনেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ইসলামিক ফাউণ্ডেশন কর্মকর্তারা তখনো আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা থাকা সত্বেও ট্রেনিংয়ের জন্য তাদেরকে ডাকেনি। আমি তাঁদেরকে বারবার ইউ এন ও বরাবরে পাঠিয়েছি এ জন্য। কিন্তু প্রশাসন তখনো আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিল না। যা হোক, নানা তদবির করে উপজেলা এবং শহরের কিছু কর্মীকে প্রশিক্ষণ গ্র্রহণের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম। সিলেটের ওসমানী নগরের ইউ এন ও অফিসেও ট্রেনিং নিল গিয়াস উদ্দিন সহ কয়েকজন। পরদিন, ১৩ এপ্রিল ২০২০, পটিয়া হাইদগাঁও প্রামের ৭ বছরের শিশু সন্তানটির দাফন কাজে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ পটিয়া পৌরসভার সভাপতি মরহুম আলহাজ্ব আবু তাহের মুজাহিদীর নেতৃত্বে যে টিমটি প্রথম দাফন কাজে অংশ নিয়েছিল সেদিন, তাঁদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না, পটিয়া উপজেলা প্রশাসনের ডাকে এবং নির্দেশনায় তাঁরা সেদিন দাফন কাজে অংশ নিয়েছিল। ১ মে ২০২০ আমি নিজেই মোহরায় মৃত করোনা রোগীর জানাজায় ইমামতি করি কারণ এ সময় মসজিদের ইমাম- মুয়াজ্জিনরা কেউ এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেনি। ১ মে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব পেয়ার মোহাম্মদ কমিশনার ও আমি দাফন কাজে সরাসরি অংশগ্রহণের পর সাধারণ কর্মীদের সাহস বৃদ্ধি পায় এবং আমাদের দাফন কাজে গতি আসে। কিন্তু আমাদের ছিলনা কোন এম্বুলেন্স। ফলে, হাসপাতাল থেকে মরদেহ গ্রহণের কাজটা করতে পারছিলামনা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সিটি এসবি উপ পুলিশ কমিশনার জনাব কাজেমুর রসিদ আমাকে ফোন করে বললেন বখতিয়ার ভাই আপনাদের বিশাল সংগঠন, লোকবলের অভাব নেই, কিন্তু এই সময়ে এম্বুলেন্স না থাকার কারণে আমরা আপনাদের আরো বেশি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তিনি বিষয়টা নিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে আনজুমানের সাথে আলাপ করতে অনুরোধ করলেন।
যা হোক, জুন মাস থেকে আমাদের এ কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যায় পর পর কয়েকটি এম্বুলেন্স সহায়তা পাবার পর। প্রথমে ২ জুন ২০২০ থেকে আগষ্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য এম্বুলেন্স সহায়তা দিলেন আলম আনোয়ারা ফাউন্ডেশন। এরপর, ফ্লোরিডা বাংলাদেশ এসোসিয়েশন, যা আজ নয় মাস ধরে চালু আছে। তিন মাসের জন্য বোয়ালখালীকে এম্বুলেন্স দিলেন ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন। সীতাকুণ্ড সলিমপুরের চেয়ারম্যান সাহেবও তাঁদের ইউনিয়নের নিজস্ব একটি এম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ দিলেন। সর্বশেষ, নিজেদের এম্বুলেন্সটা দিলেন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ আরব আমিরাত শাখা, যা আর ফেরত দিতে হবে না। করোনা চলে গেলেও চলবে এই এম্বুলেন্সটির সেবা। যা হোক, এম্বুলেন্স পাবার কারণে,এ সময়ে, আমরা কোন কোন দিন ১০/১২ জন মৃতের দাফন কাজ সম্পন্ন করেছি।
১৯ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রামেই দাফন কাফন করেছি ১৭০০+ জন এবং সারাদেশে ২১০০+ জন। এ ছাড়াও ২৮ জন হিন্দু, ৩ জন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সৎকারে সহায়তা করেছি। আমরা এ পর্যন্ত ১৩ জন অজ্ঞাত লাশেরও দাফন করেছি। তবে, চট্টগ্রামে আমরা করোনায় মৃত ছাড়াও এই মহামারী পরিস্থিতিতে, গোসল-কাফন দাফন কাজে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আগের মত এগিয়ে না আসার কারণে যারা করোনা ছাড়া অন্য কোন রোগে মারা যান এবং আমাদের সহায়তা চান তাঁদের গোসল-কাফন দাফন কাজও আমরা করে আসছি। যা ভবিষ্যতেও চলবে ইনশাআল্লাহ।
অক্সিজেন ও এম্বুলেন্স সেবা
আমরা এ পর্যন্ত অন্ততঃ ১২,৭০০ (বার হাজার, সাতশো) মানুষকে দিয়েছি অক্সিজেন সহায়তা। চারটি এম্বুলেন্সে রোগী সেবা দিয়েছি দুই হাজার দুইশো মানুষকে। এতে বহু অজ্ঞাত পথ রোগীকে দেওয়া হয় চিকিৎসা এবং এম্বুলেন্স সেবায় নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। কোন কোন নাম পরিচয়হীন রোগীকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহ, ঢাকার আশ্রয়কেন্দ্র্রে।
ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করোনা পরীক্ষা
আমরা এই সময়ে, ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করোনা পরীক্ষার নমূনা সংগ্রহে সহায়তা দিয়েছি ৯৪৬ জনকে, যা করোনার টিকা শুরু হবার প্রেক্ষিতে ১ মার্চ ২০২১ থেকে বন্ধ করা হয়েছে। বাকি সব সেবা চলতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
এ পর্যন্ত দাফন -কাফন, অক্সিজেন, এম্বুলেন্স সহায়তা বা অন্য কোন সেবা দিয়ে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ কারো কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক, এমনকি তেল – গ্যাস খরচও গ্রহন করেনি, যা একটি বড় মানবিক দৃষ্টান্ত বটে। তাছাড়া আমাদের উপজেলা, থানা কমিটিগুলো এই সময়ে নিয়মিত চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজন করে করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বঞ্চিত ১১০০০ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা সহ বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করেছে। লক ডাউন শুরু হবার সাথে সাথে দেশ ব্যাপি এক লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা এবং শত শত পরিবারকে বিকাশ ও হাতে হাতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। (আংশিক)

লেখক: প্রধান সমন্বয়ক-করোনায় মৃতের দাফন এবং রোগী সেবা কার্যক্রম
যুগ্ন মহাসচিব-গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, কেন্দ্রীয় পরিষদ।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •