আল্লাহ-রাসূলকে সংযুক্ত করে উল্লেখ করা পরিপূর্ণ ঈমানের পরিচায়ক

0

আল্লাহ-রাসূলকে সংযুক্ত করে উল্লেখ করা
পরিপূর্ণ ঈমানের পরিচায়ক
অধ্যক্ষ হাফেজ কাজী আবদুল আলীম রিজভী >
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ
اِنَّ الَّذِیْنَ یُحَآدُّوْنَ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗ كُبِتُوْا كَمَا كُبِتَ الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَ قَدْ اَنْزَلْنَاۤ اٰیٰتٍۭ بَیِّنٰتٍؕ-وَ لِلْكٰفِرِیْنَ عَذَابٌ مُّهِیْنٌۚ (۵) یَوْمَ یَبْعَثُهُمُ اللّٰهُ جَمِیْعًا فَیُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوْاؕ-اَحْصٰىهُ اللّٰهُ وَ نَسُوْهُؕ-وَ اللّٰهُ عَلٰى كُلِّ شَیْءٍ شَهِیْدٌ۠ (۶) اَلَمْ تَرَ اَنَّ اللّٰهَ یَعْلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الْاَرْضِؕ-مَا یَكُوْنُ مِنْ نَّجْوٰى ثَلٰثَةٍ اِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَ لَا خَمْسَةٍ اِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَ لَاۤ اَدْنٰى مِنْ ذٰلِكَ وَ لَاۤ اَكْثَرَ اِلَّا هُوَ مَعَهُمْ اَیْنَ مَا كَانُوْاۚ-ثُمَّ یُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوْا یَوْمَ الْقِیٰمَةِؕ- اِنَّ اللّٰهَ بِكُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمٌ(۷)
আল্লাহর নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়
তরজমাঃ (মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন) নিশ্চয় যারা বিরুদ্ধাচরণ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের, তাদেরকে অপদস্থ করা হয়েছে, যেমন অপদস্ত করা হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। এবং নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছি। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (স্মরণ করো) যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন অতঃপর তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত করবেন। আল্লাহ সেগুলোর গণনা করে রেখেছেন আর তারা তা ভুলে গেছে। আর প্রত্যেক বস্তুই আল্লাহর সম্মুখে রয়েছে। (ওহে শ্রোতা!) তুমি কি দেখো নি যে, অবশ্য আল্লাহ জানেন যা কিছু নভোমন্ডলে রয়েছে এবং যা কিছু ভুমন্ডলে। যে কোন স্থানে তিন ব্যক্তির কানাঘুষা হয়, সেখানে চতুর্থ তিনি (আল্লাহ) বিরাজমান থাকেন এবং পাঁচজনের হলে, তবে ষষ্ঠ তিনি (অর্থাৎ আল্লাহ) এবং না তা থেকে কম সংখ্যক না তদপেক্ষা বেশির কিন্তু তিনি তাদের সাথে থাকেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কিয়ামত দিবসে জ্ঞাত করবেন যা কিছু তারা করেছে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ। [সূরা আল মুজাদালাহ্, ৫,৬ ও ৭ নং আয়াত]
আনুষঙ্গিক আলোচনা
শানে নুযুল: উদ্ধৃতআয়াতগুলো আল্লাহর পবিত্র বাণী أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ الخ – এর শানে নুযুল প্রসঙ্গে মুফাসসেরীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন। একদা রবিআহ বিন আমর ও হাবিব বিন আমর ভ্রাতৃদ্বয় এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া পরস্পর কথোপকথন করছিল। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল আমাদের এসব কথাও কি মহান সৃষ্টিকর্তা জানেন? অন্যজন মন্তব্য করলো, কিছু অংশ জানেন, অবশিষ্টাংশ জানেন না। তৃতীয় জন বলল, কিছু অংশ জানলে সবকিছুই জানেন। তখনই এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং জানিয়ে দেয়া হয় যে, শুধু মানবজাতির মুখের কথোপকথন নয় বরং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সবকিছুই জানেন। তাঁর নিকট সৃষ্টিজগতের কোন বিষয়ই গোপন কিংবা উহ্য নেই। [তাফসীরে রুহুল বয়ান ও নুরুল ইরফান শরীফ]
রাসূলে করীমের বিরূদ্ধাচরণ মহান আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ
আল্লাহর পবিত্র বাণী إِنَّ الَّذِينَ يُحَادُّونَ اللَّهَ الخ অর্থাৎ নিশ্চয় যারা বিরূদ্ধাচরণ করে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের, তাদেরকে অপদস্ত করা হয়েছে। সুরা আহযাব এর ৫৭নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে, إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ الخ অর্থাৎ নিশ্চয় যারা কষ্ট দেয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে আল্লাহ অভিসম্পাত করবেন তাদেরকে দুনিয়া আখেরাত ও উভয় জাহানে। সুরা আহযাব এর ৩৬নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে, وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا الخ অর্থাৎ যে ব্যক্তি নির্দেশ অমান্য করে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবশ্যই সে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পথভ্রষ্ট হয়েছে। উদ্ধৃত আয়াতসমূহের মর্মবাণীর পর্যালোচনা করলে প্রমানিত হয় যে, মহান আল্লাহ্ বান্দার সর্বশক্তিমান ¯্রষ্টা, লালনকর্তা ও সর্বময় নিয়ন্ত্রণকর্তা। বান্দার সার্বিক জাগতিক কার্যক্রম পরিচালনায় মহান ¯্রষ্টা আল্লাহর সাথে দৃশ্যমান ও সাক্ষাৎ কোনরূপ লেনদেন কিংবা সংশ্লিষ্টতা বান্দার সঙ্গে নেই। সুতরাং মহান ¯্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিরূদ্ধাচরণ করা কিংবা তাঁকে কষ্ট দেওয়া বান্দার পক্ষে সম্ভবপর নয়। মহান ¯্রষ্টা রাব্বুল আলামীন এহেন আচরণের অনেক অনেক উর্ধ্বে, পূত-পবিত্রময় স্বত্ত্বা। বরং মানব-দানবসহ সৃষ্টিকুলের সঙ্গে সার্বিক জীবনাচারে সার্বক্ষণিক সংযোগ-সংশ্লিষ্টতা, লেনদেন ও কার্যক্রম রয়েছে আল্লাহর প্রেরিত পরম প্রিয়তম সুহৃদ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে। সুতরাং বান্দার পক্ষে আল্লাহর প্রিয়তম রাসূলের বিরূদ্ধাচরণ করা কিংবা কষ্টদান করা অথবা নির্দেশ অমান্য করা সম্ভব ও সহজ। যেহেতু সার্বিক জীবন পরিচালনায় বান্দার সাথে রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের সহযোগ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সুতরাং আল্লাহর হাবিবের বিরূদ্ধাচরণ করা মানে স্বয়ং আল্লাহরই বিরূদ্ধাচরণ করা, তাঁকে কষ্ট দেয়া মানে সবকিছুর ¯্রষ্টা আল্লাহকেই কষ্ট দেওয়া, তাঁর নির্দেশ অমান্য করা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহরই নির্দেশ অমান্য করা। কারণ, তিনি তো মহান আল্লাহরই প্রেরিত পরম প্রিয়তম সুহৃদ, শ্রেষ্ঠতম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, তিনি সৃষ্টিকুল সরদার, সৃষ্টিকুলের সম্মুখে ব্যাপক বৃহত্তম পরিসরে সার্থক, কার্যকর ও স্থায়ীরূপে মহান আল্লাহর কলেমা বাণী ও দ্বীনকে বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠাকারী নূরানী স্বত্ত্বা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন মূলত আল্লাহরই সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁর নৈকট্য অবলম্বন করা মানে স্বয়ং ¯্রষ্টারই নৈকট্য অর্জনে ধন্য হওয়া। এজন্য সুরা নিসা ৫ম পারায় এরশাদ হয়েছে,من يطع الرسول فقد اطاع الله অর্থাৎ যে রাসূলে কারীম রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করে সে অবশ্যই আল্লাহরই আনুগত্য করে। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য এক ও অভিন্ন। এর মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য নির্ণয় করা ঈমান ও ইসলাম পরিপন্থিী। (নাউযুবিল্লাহ)
আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কে 
সংযুক্ত করে উল্লেখ করা প্রকৃত ও পরিপূর্ণ ঈমানেরই পরিচয়
উদ্ধৃত সুরা আল মুজাদালাহ এর ৫ম আয়াতে এরশাদ হয়েছে, إِنَّ الَّذِينَ يُحَادُّونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ الخ অর্থাৎ যারা আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়তম রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদেরকে অপদস্ত করা হয়েছে। সুরা আল আহযাবের ৫৭নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে-إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ অর্থাৎ যারা আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করবেন দুনিয়া-আখেরাত উভয় জাহানে। সুরা আল আহযাবের ৩৬নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে,وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ الخ অর্থাৎ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ অমান্য করে তারা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পথভ্রষ্ট হয়েছে। উদ্ধৃত তিন আয়াত ছাড়াও কুরআনে কারীমের অসংখ্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত করে উল্লেখ করেছেন। সহিহ বুখারী ও মুসলিম শরিফসহ সকল হাদিসের বিশুদ্ধ গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে, রাসূলে আকরাম নুরে মুজাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজলিশে সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁরা জবাবে আদব সহকারে বলতেন, الله ورسوله اعلم অর্থাৎ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। এখানেও সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সংযুক্ত করে উল্লেখ করতেন।
অতএব কুরআনে করীমের নির্দেশনা এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম এর অনুসৃত আমলের আলোকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেল আল্লাহ এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে যুক্ত করে উল্লেখ করা শুধু বৈধই নয় বরং প্রকৃত ও পরিপূর্ণ ঈমানের অভিব্যক্তি। এছাড়া মুমিনের ঈমান আনয়ন করা প্রথম ও বলিষ্ট স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে যে কলেমা তাইয়্যেবা ও কলেমায়ে শাহাদাত সেখানেও আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সংযুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুবহানাল্লাহ) এক কথায় কুরআনের আয়াতে হাদিসে নববী শরিফের রেওয়ায়াতে, কলেমাতে, আযান-ইক্বামতে, খুতবাতে এবং সাহাবায়ে কেরামের স্বীকৃতিতে সর্বত্রই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সংযুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। এটাই দ্বীন ইসলামের নির্দেশনা। এর ব্যতিক্রম করে আল্লাহ এবং রাসূলের মধ্যে পার্থক্য রেখা নির্ণয় করার পাঁয়তারা ইয়াহুদি-নাসারাদের সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্র যা ঈমান-ইসলাম পরিপন্থী ও কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী, সহজ-সরল মুমিনগণকে ঈমান হারা করার সুগভির চক্রান্ত। আল্লাহ হেফাজত করুন।

লেখক: অধ্যক্ষ-কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া কামিল মাদরাসা, মুহাম্মদপুর এফ ব্লক, ঢাকা।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •