আলহাজ্ব ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি স্মরণে

0
আলহাজ্ব ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি স্মরণে
মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন
কালের বিবর্তণে এ দুনিয়ায় কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটে, যারা স্বীয় কর্ম ও সাধনার কারণে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। তারা শুধু ইতিহাসই সৃষ্টি করেন না, প্রকৃতপক্ষে তারাই ইতিহাসের স্রষ্টা হয়ে যান। তাঁদের কর্মের সৌরভ জগতের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত আমোদিত হয়, ছড়িয়ে পড়ে ভুবনময়। মানুষের কাছে যারা চির স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তি তাদেরই একজন আলহাজ্ব ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি।
জন্ম ও ফটিকছড়ি’র ইতিবৃত্ত
১৬৬৬ সালের দিল্লীর মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসন আমলে বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এর পুত্র বুজুর্গ উমেদ আলী খাঁ। তিনি আরকান রাজাকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে এর নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য ও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষাকল্পে সমগ্র এলাকাকে ৭টি চাকলায় ভাগ করে এক একটি পরগণার নামকরণ করেন। বাংলার বার ভুঁইয়াদের অন্যতম স্বাধীনতাকামী ঈসা খাঁ এ অঞ্চলে অবস্থানকালে বাইশপুর সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ‘ইছাপুর পরগণা’ গঠন করেন। পরবর্তিতে ’ইছাপুর পরগণা’ ই বর্ধিত আকারে ‘ফটিকছড়ি উপজেলা’ হিসাবে রূপ লাভ করে। ফটিকছড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। ‘ফটিক’ অর্থ স্বচ্ছ ও ‘ছড়ি’ অর্থ পাহাড়িয়া নদী, ঝর্না বা খাল। এই উপজেলার পশ্চিমাংশে ফটিকছড়ি ছড়া এর নামানুসারে ফটিকছড়ির নামকরণ করা হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। আয়তন ৭৭৩.৫৬ বর্গকিলোটিার এবং চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। ১৯১৮ সালে ফটিকছড়ি থানা হিসাবে প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে পরবর্তিতে ফটিকছড়ি থানাকে ১৯৮৩ সালে উপজেলাতে উন্নিত করা হয়। ফটিকছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রাঙ্গামাটিয়া ৩নং ওয়ার্ড এর মরহুম সফর মিঞা চেীধুরী ও মরহুমা আমেনা খাতুন এর ঔরশে ১৮৮২ ইংরেজীর কোন এক শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ আলহাজ্ব ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি।
‘সরকার’ উপাধি লাভ ও হযরত সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হির সান্নিধ্য
১৯২২ সালে একমাত্র পুত্রের শুভ আকদ অনুষ্ঠানের দিন মুত্যু বরণ করলে, তিনি শোকে হত বিহবল হয়ে পড়েন। শোক কাটিয়ে উঠার জন্য তিনি বার্মার (মায়ানমার) সরকারী চাউল গুদামের ‘রাইস ইন্সপেক্টার’ এর চাকুরী নিয়ে রেঙ্গুন চলে যান। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ৩৯তম অধস্থন পুরুষ হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি অতি অল্প বয়সে কোরআন হাফেজ হয়ে কোরআন-হাদিস-ফিকাহ সহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর পারিবারিক ব্যবসার সুবাদে সুদুর দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান। সেখানে অতি অল্প সময়েই ব্যবসা ও ইসলাম প্রচারে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি সেখানে পাক-ভারত ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘আফ্রিকা ওয়ালা’ নামেও খ্যাত ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপটাউন বন্দরে ১৯১১ সালে তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে নির্মিত হয় নব দিক্ষিত মুসলমানদের জন্য প্রথম মসজিদ। এরপর ১৯১২ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে হরিপুর বাজারে দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তিতে মা’সাহেবার পরামর্শে হরিপুর পীর হযরত খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি দরবারে যান এবং বাইয়াত গ্রহণ করেন। সেখানে শরীয়ত ও ত্বরীকতের এক বে-মাসাল খিদমত আনজাম দেন। পীরের লঙ্গরখানার জন্য জ্বালানীর সমস্যা হলে সিরিকোটের পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে ১১ মাইল দূরের চৌহর শরীফে নিজ কাঁধে করে নিয়ে আসতেন। এভাবে বিরতি ছাড়া বহু বছর এ কঠিন দায়িত্বটি পালন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় হযরত আব্দুর রহমান চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ওফাতের তিন বৎসর পূর্বে পীরের নির্দেশে ১৯২০ সালে বার্মার (মায়ানমার) রেঙ্গুন শহরে চলে আসেন এবং সেখানে প্রায় দু’যুগেরও বেশী সময় অবস্থান করে শরীয়ত তরীক্বতের বিশাল দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত বাঙ্গালী মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন। চাকুরীর সুবাদে ফজলুর রহমান চৌধুরীও সেই বাঙ্গালী মসজিদে প্রায়ই নামাজ পড়তে যেতেন, আর এভাবেই তিনি সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সান্নিধ্যে চলে আসেন। ১৯২৩ সালের কোন এক শুভক্ষণে এই ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ ফজলুর রহমান চৌধুরী সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হির হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, বাইয়াত গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যে তিনি চাকুরী জীবনের ইতি টেনে পুরোপুরি পীরের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ফজলুর রহমান চৌধুরী রেঙ্গুনে সরকারী চাকুরে ছিলেন বিধায় সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি উনাকে ‘সরকার’ সাহেব ডাকতেন। পরবর্তিতে এই ‘সরকার’ নামটি প্রসিদ্ধ হয়ে যাই এবং উনার নামের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি হয়ে যান ‘ফজলুর রহমান সরকার’। রেঙ্গুনে চট্টগ্রামবাসী মুরিদ আলহাজ্ব আব্দুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার মুহাম্মদ বদিউল আলম, সুফি আব্দুল গফুর, ডা. মুহাম্মদ মোজাফফরুল ইসলামসহ অন্যান্য পীরভাইদের অনুরোধে সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি করাচি-কলকাতা-রেঙ্গুন সমুদ্রপথে যাত্রাকালে চট্টগ্রামে বিরতি করেন ১৯৩৫-৩৬ সালের দিক থেকে। এই সময়ে সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি বহুবার ফজলুর রমান সরকারকে বাড়ী তথা চট্টগ্রাম যেতে বললে তিনি আগ্রহ দেখাতেন না। আর এভাবেই সুদীর্ঘ ১৮ বছর পীরের খাবার রান্না করার মাধ্যমে নিজেকে উৎসর্গ করেন হয়ে যান ‘ফানা ফিশ শায়খ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাপান বার্মায় বোমা নিক্ষেপের কিছুদিন পূর্বে সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৯৪১ সালে চিরতরে বার্মা ত্যাগ করে সিরিকোট চলে যান, যাবার সময় ফজলুর রহমানকে নির্দেশ দিয়ে যান তিনি যেন পরের জাহাজে বার্মা ত্যাগ করেন। পীরের নির্দেশ পেয়ে সরকার সাহেবও পরের জাহাজেই চট্টগ্রাম চলে আসেন। এর এক সপ্তাহ পরে ১৯৪১ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাপান বার্মায় বোমা বর্ষণ শুরু করে এতে বহু মুসলমান মারা যান এবং বার্মায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এই ঘটনা সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর একটি জীবন্ত কারামত।
ঢাকা কায়েৎটুলি খানকার প্রেক্ষাপট
বার্মা ফেরত ফজলুর রহমান সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঢাকার কায়েৎটুলিতে কাজী সাহেব, আবুল কালাম সাহেব (যিনি পরবর্তিতে আলহাজ্ব ওয়াজের আলী সওদাগরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মুন্সির চাকুরি করেছিলেন) ও সরকার সাহেব মিলে খানকা শরীফ যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই জায়গায় জালানীর রসদ (কয়লা, লাকড়ী ও অন্যান্য দ্রব্য) মজুদ করতেন। তারা তিনজনে মিলে সেনাবাহিনীতে রসদ সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৫০ সালের আগেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে যায়, তিনি চট্টগ্রাম চলে আসেন। কায়েৎটুলির সেই জায়গায় পরবর্তিতে ১৯৫২ সালে খানকাহ এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এই মারকাজ থেকে ঢাকার মুহাম্মদপুরে ১৯৬৮ সালে গাউসে জামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রতিষ্ঠা করেন কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা।
আলহাজ্ব ওয়াজের আলী সওদাগর ও
আলহাজ্ব ফজলুর রহমান সরকার
১৯৫০ সালের ৩০ মার্চ ওয়াজের আলী সওদাগরের সহধর্মিনী সাদিয়া বেগম আন্দরকিল্লা মেটারনিটি হাসপাতালে যখন প্রসব বেদনায় অত্যন্ত কাতর, তখন সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি আন্দরকিল্লা কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস ভবনের দোতালায় অবস্থান করছিলেন। ওয়াজের আলী সওদাগরের এই পেরেশানি দেখে হালিশহরের আবুল বশর সওদাগর কারণ জিজ্ঞেস করেন, কারণ শুনার পর তিনি আর দেরী না করে নিজের পীরের কাছ হতে পানি পড়া নিয়ে ওয়াজের আলী সওদাগর সাহেবকে দেন এবং বলেন দ্রুত প্রসব বেদনায় কাতর সহধর্মিনীকে খাওয়ানোর জন্য। ওয়াজের আলীও দ্রুত কথা মান্য করেন। পানি খাওয়ানোর সাথে সাথে ভূমিষ্ঠ হয় ওয়াজের আলী সওদাগরের ২য় সন্তান আলহাজ্ব মোহাম্মদ সামশুদ্দিন (এডিশনাল জেনারেল সেক্রেটারী, আনজুমান)। এই ঘটনার কয়েকদিন পরই ওয়াজের আলী সওদাগর কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেসের দোতলায় যান এবং সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি কে দেখে উনাকে জিজ্ঞেস করেন “ইহা আবুল বশর সাহেবকা পীর কাহা রেহেতা হে” তখন সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি উত্তর দেন “ইহা পীর-টীর কোই নেহী রেহেতা, ইহা হাম এক বুড্ডা রেহেতা”। এই ঘটনার পরই ওয়াজের আলী সওদাগর সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি কে ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন এবং মুরিদ হয়ে পীরের খেদমত আনজাম দিতে শুরু করেন। বার্মা ফেরত সরকার সাহেব ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন তখন দিকবিদিক শূন্য হয়ে আবার পীর সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি নিকট চলে আসেন। সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি তখন ওযাজের আলীকে ডেকে বললেন, “তোমকো হাম এক বোজ দেগা, তোম সামাল পায়েগা” ওয়াজের আলীও তৎক্ষনাত বলেছিলেন “ইনশাল্লাহ”। সেই সুবাদে ১৯৫১ সালে সরকার সাহেব উঠেছিলেন ওয়াজের আলী সওদাগরের তখনকার তিন পোলের মাথা রিয়াজউদ্দিন রোডস্থ বাসভবনে। সেই থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত একটানা ২৬ বৎসর ওয়াজের আলী সওদাগরের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। বার্ধক্যের কারণে তিনি যখন জীবন সায়াহ্নের শেষ প্রান্তে তখন তিনি নিজবাড়ী ফটিকছড়ি চলে যান। তিনি দেখতে খুব সুন্দর ফর্সা ছিলেন, সবসময় এক কাপড়ে সাদা লং ক্লথের মতো কাপড় পড়ে চলাফিরা করতে পছন্দ করতেন। পায়ে সবসময় কাঠের খড়ম পড়তেন। তার নির্দিষ্ট কোন কাজ ছিল না, ওয়াজের আলী সওদাগরের কখনও স্টেশনরোডস্থ আড়ত, কখনও ছোট ভাই আনজুমান ফাইন্যান্স সেক্রেটারী সিরাজুল হকের মুরগী হাটায় চা-পাতার দোকানে ঘোরা-ফেরা করে তার দিন চলে যেত। খাওয়া দাওয়া চলত ওয়াজের আলী সওদাগরের আড়তে। ১৯৬৭ সালের পরে তিনি থাকতেন ওয়াজের আলী সওদাগরের আড়তের এবাদতখানা সংলগ্ন পাশের রুমে।
হজ্জ্বব্রত পালন ও সিরিকোট শরীফ গমণ
আওলাদে রসূল, হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি চট্টগ্রাম শেষ সফর করেন ১৯৫৮ সালে। সেই বছরই নিজ নাতী সফরসঙ্গী ১৮ বছর বয়সী হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মা.জি.আ.) কে নিয়ে মক্কা শরীফের জিদ্দা বন্দরের উদ্দেশ্যে জাহাজ যোগে চট্টগ্রাম বন্দর হতে রওয়ানা হন। সেই সময় ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি হুজুরের সাথে সফরসঙ্গী হন। সেই বছর ওয়াজের আলী সওদাগর পূর্ব পাকিস্তানের কোটায় যেতে না পেরে পীরের সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যান। তিনি যেহেতু করাচী ব্যবসায়ীদের সাথে তাজা ফল ও শুকনা ফলের ব্যবসা করতেন সেই সুবাদে তিনি করাচী ব্যবসায়ী ভাইদের সহযোগীতায় চট্টগ্রাম থেকে বিমানে চড়ে করাচী পৌছান, সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের কোটায় জাহাজে উঠে সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সফরসঙ্গী হয়ে যান। ঐ সফরেই মদীনা শরীফে রওজা মুবারকে জেয়ারতের সময় জেয়ারতকারীদের সাক্ষাতেই সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি সফরসঙ্গী ডাঃ টি.হোসেনকে বলেন “ ডাঃ টি. হোসেন আপ খোশনসীব হ্যায়। ইসওয়াক্ত আপকি সাথ সরকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি দিদার চল রাহা- আওর আপ কি উপর সিলসিলাকি গেয়ারা সবককি হুকুম হো গিয়া”। এই কথা শুনামাত্র আর দেরী না করে ওয়াজের আলী সওদাগরও কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন, একের পর এক আবেদন-নিবেদনে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি কে এবং পরবর্তিতে হুজুর কেবলা বলেন- “সবর করো ওয়াজের আলী- কোশিশ করো, ইনশাল্লাহ মিল যায়ে গা”। কিন্তু ওয়াজের আলী কোন ভাবেই সবর করতে পারছিলেন না- পাগল হয়ে উঠলেন দিদারে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য। অবশেষে দিদার নসীব হলো। দিদারের জন্য চঞ্চল হয়ে উঠা ওয়াজের আলী হঠাৎ যেন শান্ত চুপচাপ হয়ে গেলেন। আরো হাজার গুন উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে যাপিয়ে পড়লেন “কাম করো দ্বীন কো বাঁচাও” আন্দোলনে। ১৯৬০ সালে পীর ভাইদের সাথে ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি সিরিকোট শরীফ গমণ করেন। তখন সিরিকোটে পাকা রোড ছিল না পায়ে হেটে, ঘোড়ায় চড়ে, গাধায় চড়ে যাতায়াত হত । সেখানে সফর শেষে পীরভাইদের সাথে তিনি চট্টগ্রাম ফিরে আসেন।
ইনতিকাল
১৯৭৬ সালে ওয়াজের আলী সওদাগরের আড়ত থেকে চলে য়াওয়ার পর ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি নিজ গৃহেই দিনাতিপাত করতে থাকেন। ১৯৭৮ সালের ২রা জুন মোতাবেক ২৫শে জমাদিউস সানী ১৩৯৮ হিজরী ১৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৫ বাংলা শুক্রবার সকাল ৯:১৫ মিনিটে ৯৬ বছর বয়সে দক্ষিণ রাঙ্গামাটিয়া ৩নং ওয়ার্ড ফটিকছড়ির নিজগৃহেই এই মহান ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন)। মরহুম আলহাজ্ব কবির আহমদ এর দান করা জমিতে গড়ে উঠা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে এই কবরস্থানের পাশেই রোড সংলগ্ন জমিতে ১৯৯৫ সালে গড়ে উঠেছে ছৈয়দিয়া তৈয়বিয়া ভূঁইয়া জামে মসজিদ। ২০১২ সালে আলহাজ্ব ওয়াজের আলী সওদাগর আলকাদেরী স্মৃতি সংসদ গঠিত হওয়ার পর হতে সংকল্প ছিল ওয়াজের আলী সওদাগরের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের স্মৃতি সংরক্ষণ জীবনচরিত আলোচনা ও মাজার জেয়ারত করা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ মার্চ ২০২১ ইংরেজী শনিবার স্মৃতি সংসদের উপদেষ্টা যথাক্রমে আলহাজ্ব মোহাম্মদ সামশুদ্দিন, আলহাজ্ব মোহাম্মদ ছিদ্দিক, আলহাজ্ব মোহাম্মদ আজিমউদ্দিন, আলহাজ্ব মোহাম্মদ কাশেম, মোহাম্মদ আরিফ, সংসদ কর্মকর্তা যথাক্রমে আলহাজ্ব মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, মোহাম্মদ বশির, মোহাম্মদ খালেদ সোহেল, আলহাজ্ব মোহাম্মদ হামিদ, মাওলানা মোহাম্মদ নুরউদ্দিন, আলহাজ্ব সাদমান আলী, মোহাম্মদ আজওয়াদ আলী আবীর, মোহাম্মদ আজমাইন আলী আইয়ান মরহুম ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ফটিকছড়ি গমন করেন। সেখানে ফজলুর রহমান সরকারের ভাতিজা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম চৌধুরীর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম চৌধুরীর কথা না বললেই নয়, তিনি সরকার সাহেবের ছোট ভাই মরহুম গণু মিয়া চৌধুরীর ঔরসে ১৯৪৭ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী জন্ম গ্রহণ করেন। সেই বছরই ফটিকছড়ি সফর করেন সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হি। ফজলুর রহমান সরকার রহমাতুল্লাহি আলায়হি তার ভাতিজাকে কোলে করে হুজুর কেবলার সামনে নিয়ে আসলে তিনি বলে উঠেন ‘ইসকো মাওলানা বানানা’’ সেই সুত্র ধরে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৭২ সালে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া হতে ফাজিল এবং ১৯৭৪ সালে দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে কামিল পাশ করেন। তিনি ছিলেন সেই সময়কার উনার এলাকার এবং পরিবারের মধ্যে প্রথম মাওলানা। তিনি ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা রাজ্যের বগাপা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ১নং সেক্টরে বোয়ালখালী জোনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার সহজ সরল কথাবার্তা, তার পরিবারের সদস্যদের আচার আচরণ সর্বোপরি ফটিকছড়ি গাউসিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দের সরব উপস্থিতি ওয়াজের আলী পরিবারের সদস্য বৃন্দকে সত্যিই বিমোহিত করে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সফল মানুষদের পদাংক অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন! বেহুরমাতি সৈয়্যদিল মুরসালিন- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তথ্যসুত্র ঃ
১. আলহাজ্ব মোহাম্মদ সামশুদ্দিন, এডিশনাল জেনারেল সেক্রেটারী, আনজুমান। ২. বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম চৌধুরী। ৩. এডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার, যুগ্ম মহাসচিব, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ। ৪. উইকিপিডিয়া।

লেখক: সভাপতি- আলহাজ্ব ওয়াজের আলী সওদাগর আলকাদেরী স্মৃতি সংসদ।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •