খারিজী ও রাফিজী মতবাদ: একটি পর্যালোচনা

0

খারিজী ও রাফিজী মতবাদ: একটি পর্যালোচনা-

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী >

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন। সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন। ইসলামের দাবী ও আবেদন বিশ্বজনীন, সার্বজনীন। মানবতার মুক্তির সনদ মহান গ্রন্থ আল-ক্বোরআনুল করীম ইসলামের অভ্রান্ত দলীল। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সুন্নাহ তথা হাদিস শরীফ ইসলামের শাশ্বত নির্ভুল নির্দেশনা। ক্বোরআন, সুন্নাহ্, এজমা, কিয়াস এর সমষ্টি দলীল চতুষ্টয় বিশ্ব মানবতার মুক্তির অবলম্বন। ইসলামের পূর্ণতায় বিশ্বাসী মুসলিম মাত্রই উপরোল্লিখিত বিধানাবলীর অনুসারী। দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা সৃষ্টিতে এসবের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। আল্লাহর নির্দেশিত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত সত্যের মাপকাঠি আদর্শের মূর্ত প্রতীক মহান সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত পথ ও দ্বীনের পয়গাম প্রচার প্রসারে যারা অবদান রেখেছেন তাঁরাই প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামের অনুসারী, যথার্থ মুসলিম। পক্ষান্তরে যারা এর বিপরীতে অবস্থানকারী তারা বিপথগামী, দ্বীনের মূল¯্রােত থেকে তারা বিচ্যুত, পথভ্রষ্ট দিশেহারা।
মহান ¯্রষ্টার শ্রেষ্ঠধর্ম আল ইসলামকে কলংকিত করার প্রয়াসে ইসলামের ছদ্মাবরণে যুগে যুগে আবির্ভূত হয় অসংখ্য ভ্রান্ত দল-উপদলের, ইসলামের সুষ্ঠু সুন্দর, নির্মল আদর্শকে কালিমাযুক্ত করার হীন প্রয়াসে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ভ্রান্ত মতবাদের। শিরোনামে উল্লেখিত ‘‘খারিজী ও রাফিজী’’ সম্প্রদায় দুটি ইসলামের নামে সৃষ্ট বাতিল মতবাদ। এদের আক্বিদা বিশ্বাসে ও কর্মনীতির আলোকে তাদের ভ্রান্ত ও কুফুরী চিহ্নিত। ইতিহাসে তারা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ক্বোরআন, সুন্নাহ্ ও ইসলামী গবেষক ইমাম, মুজতাহিদ পন্ডিত মনীষীদের গবেষণা ও মতামত পর্যালোচনার নিরিখে ‘‘খারিজী ও রাফিজী’’ ভ্রান্ত মতবাদদ্বয়ের প্রকৃত পরিচয় তাদের আক্বিদা ও ভ্রান্তনীতি পাঠক সমাজের সামনে তুলে ধরার মানসে আমার এ সংক্ষিপ্ত প্রয়াস।

খারিজীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
খারিজী শব্দের অর্থ ‘দলত্যাগী’ সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর দলত্যাগ করে চরমনীতি অনুসরণপূর্বক যে বার হাজার মুসলমান এক নতুন দল গঠন করে, সাধারণত ইতিহাসে তারা খারিজী নামে অভিহিত। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র পক্ষ ত্যাগকারী খারিজীরা কুফার হারুরা নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকে। এ কারণে হাদীস শরীফে খারিজীদেরকে ‘‘হারুরীয়া’’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। খারিজীরা নিজেদেরকে আল্লাহর পথে বহির্গত (খারিজ) বলে মনে করত। পক্ষান্তরে মুসলমানরা খারিজীদের উগ্রভাবধারা অতি উৎসাহ ও শৃঙ্খলা বিবর্জিত কার্যাবালীর কারণে তাদেরকে ইসলামের সীমারেখা হতে বহির্গত মনে করত। এ কারণে তারা মুসলিম সমাজে খারিজীরূপে আখ্যায়িত।
খারিজীদের উৎপত্তি
মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র ওফাতের পর সর্বপ্রথম মুসলমানদের মধ্যে খলীফা নির্বাচন বিষয়টি কেন্দ্র করে এই মতবিরোধ দেখা দেয়। এ মতবিরোধের ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। অনেকেই হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে নির্বাচিত খলীফা মনে করতেন, কখনো অসুস্থতার সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে নামাযের ইমামতির দায়িত্ব দিতেন বলে অনেকে ধারণা করতেন যে, হযরত আবু বকর সিদ্দিক হলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর যথার্থ উত্তরসুরী। বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ ও প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়, উদ্ভব হয় বিভিন্ন মতবাদের।
সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ইসলামী জগতের প্রথম খলীফা নির্বাচিত হন। এরপর হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু খলীফা নির্বাচিত হন। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র পর উমাইয়া বংশের হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু খলীফা নির্বাচিত হন। প্রায় বার বছর খলীফা পদে অধিষ্ঠিত থাকার পর মুনাফিক সাবায়ীদের চক্রান্তে সৃষ্ট বিদ্রোহের এক পর্যায়ে কয়েকজন আততায়ীর তরবারীর আঘাতে শাহাদত প্রাপ্ত হন। তাঁর স্থলে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে খলীফা পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। এতে উমাইয়াদের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেল। উমাইয়া গোত্রের বিদ্বেষ ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। তারা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর নিকট ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে হত্যাকারীদের বিচার দাবী করল। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের জন্য তদন্ত টিম গঠনপূর্বক অর্পিত দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হন। কিন্তু প্রতিপক্ষরা তাঁকে সময় দিতে সম্মত হননি। তারা উমাইয়াদের হাতেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব রাখার অভিপ্রায়ে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করল। তাঁরা প্রিয় নবীর দুইজন প্রিয় সাহাবা হযরত তালহা ও যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা এর নেতৃত্বে সঙ্গবদ্ধ হল। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা ভিত্তিহীন অপপ্রচার শুরু করল এবং এরা হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর হত্যার ঘটনার ব্যাপারে অসত্য তথ্য ও বিকৃত ধারণা দিয়ে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাকে প্রথম প্রবলভাবে বিভ্রান্ত করল এবং হযরত ওসমান এর হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তাঁকে অনুপ্রাণিত করল। এভাবে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম গৃহযুদ্ধ শুরু হলো। হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা এর নেতৃত্বে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বিরুদ্ধে পরিচালিত এ যুদ্ধ ‘উষ্ট্রের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা উটের পিঠে আরোহন করে যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা হওয়ার কারণে এ যুদ্ধ উষ্ট্রের যুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধ। যুদ্ধে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু জয়যুক্ত হন। ইতিমধ্যে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার গভর্ণর হযরত আমীর মুয়াবিয়াকে পদচ্যুত করেন। হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার কথা ঘোষণা করেন, মুসলিম দুনিয়া দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। খিলাফতকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এ বিরোধে মুসলমানদের মধ্যে খারিজী ও শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হলো। ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর মধ্যে সিফফীনের রণাঙ্গনে এক তুমূল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা এর বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া সেনাপতি আমার বিন আসের পরামর্শে বর্শার অগ্রভাগে পবিত্র ক্বোরআন শরীফ বেঁধে সন্ধি প্রার্থনা করে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব করেন এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর নিকট ক্বোরআনের বিধানানুসারে শালিসী দ্বারা বিরোধ নিস্পত্তি করার প্রস্তাব করেন। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এ কূটনৈতিক চাল বুঝতে পারা সত্ত্বেও প্রস্তাবে সম্মত হন। কারণ তাঁরা রক্তপাতের পক্ষপাতী ছিলেন না। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর সমর্থকদের মধ্যে একদল চরমপন্থী এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করল ও প্রতিবাদ জানাল। তারা উমাইয়াদের ইসলামের শত্রু মনে করে তাদের ধ্বংস কামনা করত। কিন্তু হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু উমাইয়াদের ধ্বংসের পরিবর্তে নির্বাচিত বিচারকমন্ডলীর সহায়তায় বিরোধ নিস্পত্তির লক্ষ্যে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করার চেষ্টা চালান। চরমপন্থীরা এতে অসন্তুষ্ট হল। তারা খিলাফতের ব্যাপারে মানুষের বিচার মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। তারা স্লোগান তুলল ‘‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ্’’ অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া কারো হুকুম নেই। অবশেষে বিরোধ নিস্পত্তির জন্য ৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে ‘‘দুমাতুল জুন্দাল’’ নামক স্থানে অনুষ্ঠিত সালিসি বোর্ড এর উদ্যোগ দুর্ভাগ্যক্রমে আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সালিশী বোর্ডের এ পরাজয়কে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু অনুসারী এর চরম পরাজয় মনে করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। চরমপন্থী বার হাজার সৈন্যের একটি দল হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর পক্ষ ত্যাগ করে তারা কুফায় গিয়ে একটি নতুন দল গঠন করল, ইসলামের ইতিহাসে এরাই খারিজী নামে পরিচিত।

হাদিস শরীফের আলোকে বাতিল ফিরকার পরিচয়
ইসলামের ইতিহাসে খারিজী সম্প্রদায় হচ্ছে সর্বপ্রথম বাতিল ফিরকা। সিহাহ সিত্তা তথা ছয়টি হাদীস শরীফের গ্রন্থসমূহে খারিজীদের সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান পেয়েছে। পরবর্তীতে ইসলামের নামে ভ্রান্ত দল-উপদলের আক্বিদা বিশ্বাস ও চরিত্রের সাথে খারিজীদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। পাঠক সমাজের জ্ঞাতার্থে খারিজী সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন বাতিল ফিরকা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের জন্য প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কতিপয় হাদীস শরীফের উদ্ধৃতি উপস্থাপন করা হলো।
বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ বোখারী শরীফ দ্বিতীয় খন্ডে হযরত ইমাম বোখারী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বাতিল সম্প্রদায় খারিজী ও মুলহীদের হত্যা করার বিধান সম্বলিত (باب قتال الخوارج والملحدين) শিরোনামে একটি অধ্যায় উপস্থাপন করেন। উক্ত অধ্যায়ে তিনি নিন্মোক্ত হাদীস বর্ণনা করেন-
১. وكان ابن عمر يراهم شرار خلق الله অর্থাৎ প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা খারিজীদেরকে আল্লাহ্র সৃষ্টিতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মনে করতেন।
২.হযরত আবু সাঈদ খুদরী ও হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা হতে মিশকাত শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال سيكون فى امتى اختلاف وفريقة قوم يحسنون القيل ويسنون الفعل يقرون القران لايجاوز تراقيهم يمرقون من الدين مروق السهم من الرمية لايرجعون حتى يرتد السهم على فرقه هم شر الخلق والخليقة طوبى لمن قتلهم وقتلوه يدعون الى كتاب الله وليسوا فى شئ من قاتلهم كان اولى بالله منهم قالوا يارسول الله ما سيماهم قال التحليق- (مشكوة)
অর্থাৎ- প্রিয়নবী হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের মধ্যে মতানৈক্য ও ফিরকা সৃষ্টি হবে। এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি হবে যারা সুন্দর ও ভালকথা বলবে, আর কাজ করবে মন্দ। তারা ক্বোরআন পাঠ করবে, তা তাদের কন্ঠনালী অতিক্রম করবে না, তারা দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেভাবে তীর শিকারী থেকে বেরিয়ে যায়। তার দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে না, অথচ তীর ফিরে আসা সম্ভব। তারা সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট। ঐ ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ, যে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং যুদ্ধে তাদের দ্বারা শাহাদত বরণ করবে। তারা মানুষকে আল্লাহর কিতাব (ক্বোরআন) এর প্রতি আহ্বান করবে, অথচ তারা বিন্দুমাত্র আমার আদর্শের অনুসারী নয়। যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে লড়বে সে অপরাপর উম্মতের তুলনায় আল্লাহ তা’আলার অতি নিকটতম হবে। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদের চিহ্ন কি? হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, অধিক মাথা মুন্ডানো। [মিশকাত শরীফ: পৃষ্ঠা ৩০৮] ৩. মিশকাত শরীফে হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে-
قال بينما نحن عند رسول الله صلى الله عليه وسلم ويقسم قسما اتاه ذو الخويصرة وهو رجل من بنى تميم فقال يا رسول الله اعدل فقال ويلك فمن يعدل اذلم اعدل قد خبت وخسرت ان لم اكن اعدل فقال عمر انذن لى اضرب عنقه فقال دعه فان له اصحابا يحقر احدكم صلوته مع صلواتهم وصيامه مع صيامهم يقرون القران لايجاوز تراقيهم يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية- (مشكوة- ৫৩৫)
অর্থাৎ- হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, আমরা হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। তিনি গণীমতের মালপত্র বন্টন করছিলেন। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বনী তামীম গোত্রের যুল খোয়াইসারা নামক এক ব্যক্তি আসল, অতঃপর সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ইনসাফ করুন। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার ধ্বংস হোক। আমি যদি ইনসাফ না করি কে ইনসাফ করবে? যদি আমি ইনসাফ না করতাম তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে। তখন হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম! আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার শিরচ্ছেদ করে ফেলব। অতঃপর হুযূর আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই তার এমন অনেক অনুসারী আছে, তোমাদের মধ্যে অনেকে নিজেদের নামাযকে তাদের নামাযের তুলনায় তুচ্ছ-হীন মনে করবে, অনুরূপ নিজের রোজাকে তার রোজার তুলনায় তুচ্ছ মনে করবে। তারা ক্বোরআন পাঠ করবে, কিন্তু ক্বোরআন তাদের কন্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর শিকারী থেকে বেরিয়ে যায়। [মিশকাত শরীফ: পৃষ্ঠা ৫৩৫] ৪. হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বিভিন্ন সহীহ সনদে বর্ণিত হাদিসে রাসূূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
ياتى فى اخر الزمان قوم حدثاء (احداث) الاسنان سفهاء الا حلام يقولون من خير قول البرية (يقولون من قول خير البرية) (يتكلمون بالحق) يمرقون من الاسلام (من الحق) كما يمرق السهم من الرمية لايجاوز ايمانهم خناجر هم فاذا لقيتموهم (فاينما لقيتموهم) فاقتلوهم فان فى قتلهم اجرا لمن قتلهم عند الله يوم القيامة-
অর্থাৎ শেষযুগে এমন একটি সম্প্রদায় আগমন করবে যারা বয়সে তরুণ এবং তাদের বুদ্ধি-জ্ঞান অপরিপক্কতা, বোকামী ও প্রগলভতায় পূর্ণ। মানুষ যত কথা বলে তন্মধ্যে সর্বোত্তম কথা তারা বলবে। তারা সর্বোত্তম মানুষের কথা বলবে। তারা সত্য ন্যায়ের কথা বলবে। কিন্তু সত্য, ন্যায় ও ইসলাম থেকে তেমনি ছিটকে বেরিয়ে যাবে যেমন করে তীর শিকারের দেহ ভেদ করে ছিটকে বেরিয়ে যায়। তাদের ঈমান তাদের কন্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তোমরা যখন যেখানেই তাদেরকে পাবে তখন তাদেরকে হত্যা করবে। কারণ তাদেরকে যারা হত্যা করবে তাদের জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র নিকট পুরস্কার থাকবে।
খারিজীদের অদূরদর্শিতা, উগ্রভাবধারা, চরমপন্থা অবলম্বন, অপরিপক্ক, বুদ্ধি অভিজ্ঞতার অভাব, জ্ঞান বুদ্ধির অহংকার তাদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করেছিল। বর্ণিত সূত্রে ১৭ জন সাহাবী থেকে প্রায় ৫০টি পৃথক সূত্রের হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এ সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক আকর্ষণীয় ধার্মিকতা সততা ও ঐকান্তিকতা সত্ত্বেও অনেক মানুষ উগ্রতার কারণে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হবে। এ সকল হাদীস যদিও সার্বজনীন এবং সকল যুগেই এরূপ মানুষের আবির্ভাব হতে পারে। তবে সাহাবীদের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহ্র আলেমগণ একমত যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের এসব ভবিষ্যৎবাণীর প্রথম বাস্তবায়ন হয়েছিল খারিজীদের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে।
৫. খারিজীগণ জাহান্নামের কুকুর সমতুল্য। [ইবনে মাযাহ শরীফ] ৬. তারা অধিক ইবাদত করবে। [তাবরারী] ৭. তারা ঘন ঘন মাথা মুন্ডাবে। [মিশকাত শরীফ] ৮. তারা সর্বদা ক্বোরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে।
[ফতহুলবারী: পঞ্চদশ খন্ড, পৃষ্ঠা ৩২২] ৯. তারা সৃষ্টির সর্ব নিকৃষ্ট। [বোখারী শরীফ] ১০. আমার উম্মতের উত্তম ব্যক্তিগণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
খারিজীদের ভ্রান্ত আক্বিদাসমূহ
১. খারিজীরা খোলাফায়ে রাশেদীনের দুই খলিফা হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে খলিফা হিসেবে স্বীকার করে না।
২. খারিজীদের মত, যে মুসলমান নামায পড়ে না, রোজা রাখে না, সে কাফির।
৩. খারিজীদের মত, একটি মাত্র অপরাধের জন্য যে কোন লোক ইসলাম হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
৪. খারিজীদের মত, খলিফা বা ইমাম ভুল করলে তাকে পদচ্যূত করতে হবে। প্রয়োজনে তাকে হত্যা করতে হবে।
৫. খারিজীরা তাদের বিরুদ্ধবাদী (যারা খারিজী নয়) তাদেরকে কাফির মনে করে।
৬. খারিজীদের মত, ঋতু¯্রাবকালীন মেয়েদের উপর নামায ফরয।
৭. খারিজীদের মত, যে কোন প্রকার কবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি কাফির।
৮. খারিজীদের মত, চোরের হাত বগল পর্যন্ত কর্তন করতে হবে।
৯. খারিজীদের মত, সূরা ইউসুফ ক্বোরআনের অন্তর্ভুক্ত নয়।
১০. খারিজীদের মত, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বললে মুমিন হিসেবে গণ্য হবে। যদিও কুফরী আক্বিদা পোষণ করে।
১১. খারিজীদের মত, তাদের মতে, পাপীকে শাস্তি প্রদান করতে হবে।
১২. খারিজীরা উমাইয়া খিলাফতের বিরোধী এবং তাদের নিন্দা ও সমালোচনা করেন।
১৩. খারিজীদের মত, কোন মুসলিম পাপে লিপ্ত হলে সে কাফির।
১৪. খারিজীরা জিহাদকে ইসলামের মূলভিত্তি বা রুকন মনে করে, তারা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের সাথে জিহাদকে ষষ্ঠ স্তম্ভ হিসেবে যুক্ত করে।
১৫. খারিজীদের মত, খলিফা হওয়ার জন্য কোন গোত্র বা পরিবারের প্রয়োজন নেই। মুসলিম সমাজের যে কেউ খলিফা হতে পারেন।
১৬. খারিজীদের মত, কোন প্রকার ত্রুটির কারণে খলিফা অপসারণযোগ্য ও হত্যাযোগ্য।
১৭. খারিজীরা নিজেদের বাইরে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে অগ্রহী নয়।
১৮. খারিজীদের মত, তারা নিজেরাই আল্লাহর পথের যাত্রী। তাদের সাথে যারা আল্লাহর পথে বের হয় না তারা কাফির।
১৯. খারিজীদের মত, কাফিরদের সন্তানাদি তাদের পিতামাতার সাথে দোজখের আগুনে জ্বলবে।
২০. খারিজীদের মত, ক্বোরআন আক্ষরিক অর্থেই বুঝতে হবে, রূপক অর্থে নয়।

ইসলামের ছদ্মাবরণে বাতিল দল রাফিজী
রাফিজী সম্প্রদায় ইসলামের মূলধারা হতে বিচ্যুত একটি বাতিল পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়। চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত মাওলানা শাহ্ আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর রচিত ঐতিহাসিক ‘সালামে রেযা’ কাব্যে আহলে বায়তে রাসূলের মধ্যমনি হযরত মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর শানে লিখিত নি¤েœাক্ত পংক্তিতে খারিজী-রাফিজীদের ভ্রান্তি উল্লেখ করেন।
اولى دافع ال رفض وخروج- چارمى ركن وملت په لاكو ں سلام
ماحى رفض وتفضيل ونصب وخروج- حامى ودين وسنت په لاكهوں سلام
অর্থাৎ ১. হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সর্বপ্রথম রাফিজী ও খারিজীদের ভ্রান্ত আক্বিদা খন্ডন করেন, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তিনি শরীয়ত ও ইসলামী খিলাফতের চতুর্থ স্তম্ভ ও খলিফা। তাঁর উপর লাখো সালাম বর্ষিত হোক।
২. হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু রাফিজী আক্বিদা তাফযিলী আক্বিদা ও খারিজীদের ভ্রান্ত আক্বিদার মূলোৎপাঠনকারী ও প্রতিরোধকারী। তিনি ইসলাম ধর্ম ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের সাহায্যকারী, তাঁর উপর লাখো সালাম বর্ষিত হোক।
রাফিজীরা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর প্রতি অধিক ভালোবাসার দাবীদার। পক্ষান্তরে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী সম্প্রদায়। রাফিজীদের সম্পর্কে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এরশাদ করেন, ‘‘আমার ভালবাসায় অধিক সীমা অতিক্রমকারীরা ধ্বংস হয়ে যাবে’’। হযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
لا يجتمع حب على وبغض ابى بكر وعمر على قلب مؤمن-
অর্থাৎ- হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর প্রতি ভালবাসা এবং হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর প্রতি কটূক্তি, গাল-মন্দ, সমালোচনা করার পরও নিজেদেরকে মুসলমান মনে করে।
রাফিজীদের আক্বিদা হচ্ছে যে, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সত্য গোপন করেছেন এবং বাধ্য হয়ে খোলাফায়ে রাশেদার তিন খলিফার বায়আত মেনে নিয়েছেন। [নাঊজুবিল্লøাহ্] রাফিজী ও খারিজী দু’দলই পথভ্রষ্ট, ধ্বংসপ্রাপ্ত। একমাত্র ইসলামের মূলধারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারীরাই সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর অতি মুহাব্বত প্রদর্শন করে সীমা অতিক্রম করে না এবং সাহাবা কেরামের প্রতি যথার্থ সম্মানও প্রদর্শন করেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘আমি ইলমের শহর, আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর ভিত্তি, হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর প্রাচীর, হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর ছাদ, হযরত আলী রাদ্বিযাল্লাহু তা’আলা আনহু তাঁর দরজা। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন মসজিদে নববীর ভিত্তি প্রস্তর করেছিলেন প্রথম পাথর নিজে স্থাপন করেন, দ্বিতীয়টি হযরত আবু বকর, তৃতীয়টি হযরত ফারুকে আযম, চতুর্থটি হযরত ওসমান ও পঞ্চমটি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম দ্বারা করিয়েছিলেন। এসব ঘটনাপ্রবাহ খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিতবহ।
ইসলামের এ ধারাবাহিকতা অমান্য করে রাফিজীরা বিচ্যুত হয়েছে। ইমামে আহলে সুন্নাত আ’লা হযরত তাদের বাতুলতা প্রমাণ ও মুসলিম মিল্লাতের সঠিক দিক নির্দশনা দানে ‘‘রাদ্দুর রফযা’’ নামক একটি তথ্যবহুল নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য কিতাব রচনা করেন। এতে তিনি রাফিজীদের নি¤েœাক্ত ভ্রান্ত আক্বিদা ও কুফরী আক্বিদাসমূহ প্রমাণ করেন।
১. রাফিজীরা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খিলাফতকে অস্বীকার করেছে।
২.রাফিজীরা হুযূর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছাড়া যতসব সম্মানিত আম্বিয়া কেরাম রয়েছেন, সকলের উপর হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও আহলে বায়তের মর্যাদা অধিক মনে করেন।
৩. বর্তমান ক্বোরআন শরীফ অসম্পূর্ণ। তাদের মতে, বর্তমান ক্বোরআনের সূরা ও আয়াত আরো অধিক ছিল, যা হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু কর্তৃক ক্বোরআন সংকলনের সময় বাদ দেয়া হয়েছে। (নাঊজুবিল্লাহ্)
৪. রাফিজীদের মতে, ক্বোরআন শরীফে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও আহলে বায়ত এর মর্যাদা সম্পর্কিত যতসব আয়াত ছিল হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তা বাদ দিয়েছেন।
৫. হযরাতে শাইখাইন ও অপরাপর সাহাবা কেরাম এর শানে ঘৃণ্য ও বিদ্বেষ পোষণ করা রাফিজীরা আবশ্যক মনে করেন।
৬. হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও অপরাপর সাহাবা কেরামকে তারা কাফির মনে করে। রাফিজীদের উপর্যুক্ত আক্বিদার নিরিখে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি পঞ্চাশের অধিক নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য কিতাবাদির আলোকে তাদের কুফরী প্রমাণ করেন। রাফিজীদের প্রসঙ্গে নি¤œবর্ণিত শরয়ী বিধান কার্যকর মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেন।
১. রাফিজীরা সর্বোতভাব কাফির ও মুরতাদ।
২. রাফিজীদের জবেহকৃত পশু হারাম।
৩. রাফিজীদের সাথে বিবাহ বন্ধন কেবল হারামই নয়, ব্যভিচারের নামান্তর।
৪. রাফিজীদের সাথে মেলামেশা, লেনদেন, সালাম, কালাম কবীরা গুনাহ ও কঠোরতর হারাম।
৫. যে ব্যক্তি রাফিজীদের কুফরী অবগত হওয়ার পরও তাদেরকে কাফির বলতে সন্দেহ পোষণ করবে, সকল ইমামগণের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সে নিজেই কাফির ও বেদ্বীন হবে। রাফিজীদের কুফুরী প্রমাণে আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রায় ১২টি কিতাব রচনা করেন। যথা-
١۔ ردالرفضة – ۲۔شرح المطالب فى محبث ابى طالب ۳۔الادلة الطاعنة فى اذان الملاعنة (۱۳۰۶) ۴۔جمع القران وبم غزوه بعثمان (۱۳۲۲) ۵۔غاية التحقيق فى امامة العلى والصديق (۱۳۳۱) ۶۔اعتقاد الاجناب فى الجميل والمصطفى والال والاصحاب(۱۳۹۸)۷۔يعبر الطالب فى شيون ابى طالب (۱۲۹۴) ۸۔مطاع القمرين فى ابانة سبقة العمرين (۱۲۹۷) ۹۔الكلام الهبى فى تثبه الصديق بالنبى (۱۲۹۷)۱۰ ۔الزلال الانقى من بحر سبقه الاتقى (۱۳۰۵) ۱۱۔لمعة الشمعة لهدى شيعة الشنيعة (۱۳۱۲) ۱۲۔وجد المشوق بجلوة اسماء الصديق والفارون (۱۲۹۷)

রাফিজীদের সম্পর্কে মুজতাহিদ ইমাম ও ফোকাহাদের অভিমত
বিখ্যাত গ্রন্থ ফতহুল কদীর ১ম খন্ড, ২৪৮ পৃষ্ঠা আল্লামা আহমদ ছালাবী রচিত হাশিয়ায়ে তবীন ১ম খন্ড ১৩৫ পৃষ্ঠায় রাফিজী প্রসঙ্গে আলোকপাত হয়েছে-
فى الر وافض من فضل عليا على الثلاثة فمبتدع وان انكر خلافة الصديق او عمر رضى الله تعالى عنهما فهو كافر-
অর্থাৎ- রাফিজীদের মধ্যে যারা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে অপর তিন খলিফার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করবে তারা পথভ্রষ্ট। যদি হযরত সিদ্দিক আকবর রাদ্বিয়াাল্লাহু তা’আলা আনহু অথবা হযরত ফারুকে আজম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খিলাফত অস্বীকার করে কাফির হবে। ইমাম কুরদবী রচিত ওয়াজিজ কিতাবের ২য় খন্ড ৩১৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-
من انكر خلافة ابى بكر رضى الله تعالى عنه فهو كافر فى الصحيح ومن انكر خلافة عمر رضى الله تعالى عنه فهو كافر فى الاصح-
অর্থাৎ- হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খিলাফত অস্বীকারকারী কাফির। এটাই বিশুদ্ধ। হযরত ফারুক আজম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খিলাফত অস্বীকারকারীও কাফির। এটা বিশুদ্ধতম মত। মজমাউল আনহার শরহে মুলতাকা আল আবহার ১ম খন্ড ১০৫ পৃষ্ঠায় আছে-
الرافضى ان عليا فهو مبتدع وان انكر خلافة الصديق فهو كافر-
অর্থাৎ রাফিজীরা যদি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে শ্রেষ্ঠত্বদানকারী হয়, তখন হবে বিদআতী আর যদি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খিলাফত অস্বীকারকারী হয়, তখন হবে কাফির।
তানভীরুল আবছার গ্রন্থের ৩১৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে-
كل مسلم ارتد فتوبته مقبولة الا الكافر بسب النبى رواى الشيخين او احدهما-
অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মত্যাগী মুরতাদের তওবা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যে ব্যক্তি কোন নবী বা হযরাতে শাইখাইন বা তাদের একজনের সাথে গোস্তাখীকারী সে কাফির, সে ব্যক্তির তওবা কবুল হবে না। ‘ওয়াকিআতুল মুফতীয়ীন’ কিতাবের ১৩ পৃষ্ঠায় আছে-
يكفر اذا انكر خلافتهما او يبغضهما لمحبة النبى صلى الله عليه وسلم لهما-
যে শাইখাইনের খিলাফত অস্বীকার করবে, অথবা তাদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করবে সে কাফির। তারা তো রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার প্রিয়পাত্র। . . . . . আল্লামা শিহাব উদ্দীন খাফাজী রচিত ‘নসীমুর রিয়াজ শরহে শিফা’ ইমাম কাজী আয়াজ আলায়হির রাহমাহ এরশাদ করেন-
ومن يكون يطعن فى معاوية ——فذاك من كلاب الهاوية-
অর্থাৎ যে ব্যক্তি হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর সমালোচনা করে, সে জাহান্নামের কুকুরসমূহের একটি কুকুর। আল্লাহ্ পাক গোঁড়া ও চরমপন্থী রাফিজী-খারিজীসহ তাদের পদাঙ্ক অনুসারী বর্তমান বিশ্বের ইসলাম নামধারী বিভিন্ন বাতিল সম্প্রদায়ের কুফরী আক্বিদা ও ভ্রান্তনীতি থেকে মুসলিম মিল্লাতকে হিফাজত করুন। মুসলিম উম্মাহকে সম্মিলিত কুফুরী শক্তি প্রতিরোধে পরস্পর ঐক্য সংহতি জোরদাপূর্বক আদর্শ সমুন্নত রাখার তৌফিক দান করুন। আমীন, বিহুরমাতি সৈয়্যাদিল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম।