বাঙালি-মুসলমানের অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি ঈদে মিলাদুন্নবী

0

বাঙালি-মুসলমানের অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি ঈদে মিলাদুন্নবী-
মোহাম্মদ আবু সাইদ (নয়ন) >
সংস্কৃতি যদি হয় একটি জাতির জাগরণী তৎপরতার উপলক্ষ কিংবা স্বাতন্ত্র্যের বহমান পরিচায়ক তবে বাঙালি-মুসলমানের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের উৎফুল্লমন্ডিত উৎসবমুখর পরিবেশের যে ধারা এখনো পর্যন্ত প্রবহমান তার প্রতিষ্ঠাকাল নির্ণয় সোজা কথা নয়। শুধু বাঙালি-মুসলিম সমাজেই নয় বরং বিশ্বের তাবৎ মুসলিম সমাজেই উৎফুল্লতার সাথেই দিবসটি বৃহৎ পরিসরে উদযাপিত হয়; তবে বাঙালি-মুসলিম সমাজে এ প্রসঙ্গটি আমল বা ইবাদতের লক্ষ্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণেই আপ্যায়িত হয় বেশি। তাই বলে ঈদে মিলাদুন্নবীকে যে আমল বা ইবাদত হিসেবে বাঙালি-মুসলিমরা গণ্য করে না তা কিন্তু নয় এক্ষেত্রে তাদের নিকট এ প্রসঙ্গটি আমল বা ইবাদতের নির্দিষ্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সংস্কৃতিরূপে গ্রহণ করে একে ধর্মীয় জাতীয় উৎসবে রূপান্তর করার এক অতি কাক্সিক্ষত চেষ্টা তাদের মধ্যে স্পষ্টভাবেই লক্ষ্য করা যায়।
১৭৫৭ সালে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতি ঘটে। পরবর্তী শতাব্দী তথা ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত বাঙালি-মুসলিম সমাজ ছিল কোণঠাসার গভীর গহ্বরে; নির্যাতন আর নিপীড়নের কথা বিয়োগ করলেও সামাজিকভাবে ছিল অত্যন্ত মলিন, বিপর্যস্ত এবং বিধ্বস্ত। বিধ্বস্ততার ছাপ শুধু চলনে-বলনে সীমাবদ্ধ ছিল না, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাতেও পড়েছিল যন্ত্রণার কাতরানি; শিক্ষার প্রভাব খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রবাহিত হয়েছে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যেও। বাঙালি-মুসলমানের এই বিধ্বস্ত ভাবকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্যবহার করেছে বঙ্কিমচন্দ্র ও তার সহধর্মীরা। তবে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর অবস্থা নড়তে শুরু করে। ভারতবর্ষের ভাগ্য আংশিক সুপ্রসন্ন হবার সাথে সাথে মুসলিমরাও কিছুটা সাহসী হয়ে ওঠে। যার নিদর্শনস্বরূপ মীর মশাররফ হোসেন, কবি কায়কোবাদ এবং নজিবুর রহমান সাহিত্যরত্নের মতো সাহসী সাহিত্যিকদের নাম স্মরণীয়। হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির প্রবল স্রোতের সাথে অসচেতনভাবে ভেসে যাচ্ছিল বাঙালি-মুসলিম সমাজও। উত্তরণের উপায় বাতলানোর মতো মনোবলও ছিল যৎসামান্য। এহেন চতুর্মুখী বিপর্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি-মুসলমান নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবার প্রয়াস পায়। সে কুণ্ঠিত সময়ে দুই ঈদ, শবে বরাত, শবে কদর এবং মোহররমসহ অন্যান্য যে সাংস্কৃতিক উপলক্ষ বাঙালি-মুসলমানের ছিল তার চেয়ে ঢের বেশিগুণে তারা উৎফুল্লতার সহিত লালন এবং পালন করেছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। যার প্রমাণরূপে ১৯০০ সালে মীর মশাররফ হোসেনের মিলাদুন্নবী-কেন্দ্রিক রচিত “মৌলুদ শরীফ” বিদ্যমান।১ মীর মশাররফ যে এ সুবিস্তৃত গ্রন্থটি মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করেই রচনা করেছেন তা গ্রন্থের শুরুতেই নির্দ্বিধায় বলেছেন; পরবর্তী কয়েক বৎসরের মধ্যে চতুর্থ সংস্করণ পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে যায় এতেই অনুমেয় যে, তৎকালীন সময়ে “মিলাদুন্নবী” বাঙালি-মুসলমানদের নিকট কতটা তাৎপর্যবহ এবং আদরণীয় ছিল। বাগ্মীপ্রবর মুনশি মেহেরুল্লাহর ‘মেহেরুল ইসলাম’ গ্রন্থেও মিলাদ শরীফের বেশ কিছু কাসিদা, গজল উল্লেখ ছিল যেগুলো বাঙালি-মুসলিম সমাজে জনশ্রুতিরূপে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানদের দৈনন্দিন ফরজ এবাদত এবং অন্যান্য বহু উৎসব-উপলক্ষ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও মিলাদুন্নবী-কেন্দ্রিক বিস্তৃত গ্রন্থ প্রণয়ন এবং বাঙালি মুসলিম সমাজের অত্যুচ্ছ্বাসের সাথে সে গ্রন্থ লুফে নেওয়াতেই বোঝা যায়, মিলাদুন্নবীকে বাঙালি-মুসলমান কেবল আমলী দৃষ্টিতে দেখেই তুষ্ট ছিল না, এটাকে সাংস্কৃতিক পোষাকে সাজিয়ে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে রূপদানই ছিল অসেচতন লক্ষ্য। কিন্তু দিন যতই বাড়তে লাগলো অসচেতন ভাবকে কাটিয়ে সচেতনতায় প্রবেশ করল অনেকেই।
সামাজিকভাবে ঈদে মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে সাড়া-জাগানো আয়োজন একটি ঐতিহাসিক বিষয়। বাংলায় নওয়াবী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ মহাড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করতেন। রবিউল আওয়ালের প্রথম বারো দিন সর্বসাধারণের জন্য খাদ্যাভোজের আয়োজন করতেন; পুরো মুর্শিদাবাদ শহর আলোকসজ্জায় আলোড়িত করে তুলতেন এ কাজে সেনাপতি নাজির আহমদের অধীনে এক লক্ষ লোক নিয়োজিত করা হতো। কামান গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও নদী তীরের সমস্ত আলোক জ¦লে উঠত এবং সারা শহর ও ভগীরথী এক আনন্দময় রূপ ধারণ করত। মুসলমানদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত ঘোষণা করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কামানগুলো গর্জন করে উঠত।২ মীরাত-ই-সিকান্দরী গ্রন্থে বলা আছে, গুজরাটের সুলতান মুজাফ্ফর (১৫১৫-১৫২৫ খ্রি.) আলেম-উলামাদের আমন্ত্রণ জানাতেন এবং পরবর্তী এক বৎসর চলার মতো কাপড়-চোপড় ও টাকা-পয়সা উপহার দিতেন।৩ গুজরাট সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ রাজপ্রাসাদে রবিউল আওয়ালের প্রথম বারো দিন ধর্মীয় আলোচনা ও ভোজসভার আয়োজন করতেন, বিশেষ ব্যক্তিদেরকে উপঢৌকন দিতেন। তিনিও পরবর্তী এক বছর চলার মতো ধার্মিক ও বিদ্বানদেরকে উপহারসামগ্রী প্রদান করতেন। বিশিষ্ট ইতিহাস-গবেষক ডক্টর এম.এ. রহিমের অনন্য খ্যাতিমান গ্রন্থ, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস-এ উপর্যুক্ত ঐতিহাসিক তথ্য-পেশের পর বলেন, “ধার্মিক ও বিদ্বান ব্যক্তিদেরকে উপহার প্রদান এবং রোজা রাখা ও মুসলমানদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যেও মহানবীর জন্মোৎসব একটা বিশেষ উপলক্ষ ছিল।”৩
১৯২০ সালে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ নামক বিশ্বসাহিত্যের বিরল কাব্যের প্রথমেই যখন “নাই তা-জ – তাই লা-জ” লিখেছেন তখন আমাদের বুঝতে বেগ পেতে হয় না যে, কাজী নজরুল একান্তই ঈদে মিলাদুন্নবী-কেন্দ্রিক কাব্যেও বাঙালি-মুসলমানদের মুকুটহীন শোচনীয় অবস্থাকে ঈদে মিলাদুন্নবীর দীপ্ত শক্তিমত্তার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে প্রেরণা যুগিয়েছেন। তখনকার বাঙালি মুসলিম-সাহিত্যিকরাও ঈদে মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র কবিতা, প্রবন্ধ লিখেছেন। মীর মশাররফ, কবি দাদ আলী মিঞা, কাজী নজরুল ইসলাম,শান্তিপুরের কবিখ্যাত মোজাম্মেল হক, ইয়াকুব আলী চৌধুরী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কাজী আব্দুল ওদুদ, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, সূফি মোতাহের হোসেন, সূফি জুলফিকার হায়দার, মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ, ফররুখ আহমদ, সুফিয়া কামাল এবং বে-নজীর আহমদসহ আরও অনেক বাঙালি-মুসলিম সাহিত্যিকের নাম আনা যাবে যাঁরা ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে স্বতন্ত্র কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সাহিত্যিকরা মিলাদুন্নবী নিয়ে কেন স্বতন্ত্র রচনায় মাতলেন? উত্তরটা গভীরতর স্পষ্ট। মিলাদুন্নবী কেবল ইবাদতের গন্ডিতেই বদ্ধ ছিল না; বাঙালি-মুসলমানদের প্রধান সংস্কৃতি হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছিল। আর এ কথা তো সাহিত্যপ্রেমীদের অজানা নয় যে, একজন স্বাভাবিক কবি, সাহিত্যিক মাত্রই তাঁর কবিতায়, প্রবন্ধে সর্বোপরি রচনায় স্ব-সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, অনুসঙ্গ ও সংস্কৃতি আবেদনময়ী ভাষায় এবং জাগরণী ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তুলবেন বাঙালি-মুসলিম সাহিত্যিকবৃন্দ ঠিক তাই করেছেন।
এখানে কেবল ৩জন বিখ্যাত লেখকের আত্মজীবনী থেকে এ সম্পর্কে উদ্ধৃতি দেবো।
কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন: “আমাদের নবী করিমের জন্মদিন ‘বারে ওফাতে’ ঈদ-ই মিলাদুন্নবী বড়ই সমারোহের সাথে সম্পন্ন হতো; আলোকে জেয়াফতে ধনী-দরিদ্র্য বারো দিন ধরে মিলাদ-মাহফিলে সমবেত হতো। বারো দিনের দিন জেয়াফত খাওয়ানো হতো সকলকে একসাথে করে। মহানবীর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর জীবনী আলোচনার জন্য মাহফিল অনুষ্ঠানের প্রথা শাসক ও অবস্থাপন্ন মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ধার্মিক ও বিদ্বান ব্যক্তিদেরকে উপহার প্রদান এবং রোজা রাখা ও মুসলমানদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্যও মহানবীর জন্মোৎসব একটা বিশেষ উপলক্ষ ছিল।”৪
কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন: “আমাদের স্কুলে ফাতেহায়ে দোয়াজদাহুমে মিলাদ হতো- তবে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা এত কম ছিল যে, মৌলবী সাহেবের সকল তালবে আলেম নিমন্ত্রণ করে এনেও একটা ঘর ভর্তি করা যেত না। মিলাদ পড়াবার জন্য আমরা খাজা নাজিমুদ্দীনের ছোট ভাই খাজা শাহাবুদ্দীনকেই ডাকতাম। তিনি তখন রাজনীতি করতেন না। তিনি ছিলেন মৌলভী সাহেব। তার গলার স্বর সুমিষ্ট ছিল। কেতাব ও ছাতা তালেবে এলেমদের হাতে থাকত। কোন মৌলভী সাহেব আমাদের স্কুলে মিলাদ পড়ালে তাকে দেয়া হতো পাঁচ টাকা, কিন্তু খাজা সাহেব আসলে কলিন্স সাহেব তাঁকে দশ টাকা দিতে বলতেন।”৫
আবু রুশদ লিখেছেন: “একবার স্কুলের মিলাদে ডাকা হয়েছিল তখনকার শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর (পরে সার) আজিজুল হক সাহেবকে। তিনি যে স্কুলের মিলাদে আসতে রাজী হলেন তার পেছনে হেডমাষ্টারের (বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্য) সৌজন্য ও ব্যক্তিত্ব কাজ করেছিলো। মিলাদটির আয়োজনেও বিন্দুমাত্র ক্রুটি হয়নি, অনেক হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন তাঁরা অবশ্য আলাদা বসেছিলেন এবং মিলাদ শেষে মোনাজাতে অংশ গ্রহণ করেন নি। তবে মনে আছে আজিজুল হক সাহেবকে তিনি স্বাগত জানিয়ে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে ছোট কিন্তু সুন্দর এক বক্তৃতা করেছিলেন। আজিজুল হক সাহেবও কম জাননি হেড মাষ্টার সাহেবের মতো তিনিও বক্তৃতা করেছিলেন ইংরেজিতে।”৬
বাঙালি মুসলমানদের প্রাণে ঈদে মিলাদুন্নবী এতটা প্রাচুর্যের নহর বইয়ে দেয় যা অন্য কোনো উপলক্ষ জোগান দিতে পারে না; মিলাদুন্নবী তাদের জাগরণী স্রোতকে এতটা প্রাবল্যবান করে যার ছিটেফোঁটাও অন্য কোনো উপলক্ষ থেকে সরবরাহ হয় না; সর্বোপরি ঈদে মিলাদুন্নবী বাঙালি-মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংস্কৃতিরূপে পরিগণিতই নয় শুধু, প্রসিদ্ধও বটে।
আধুনিক বাঙলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকদের মধ্যে অন্যতম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীন উপাচার্য সাহিত্যিক আবুল ফজল ১৯৭২ সালে ‘সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে লিখেছেন: “সংস্কৃতির এক সহজাত ধর্ম অচলায়তনকে ভাঙা, ডিঙিয়ে যাওয়া, কোথাও আটকে না থাকা; আটকে না পড়া।”৭ এ সমীকরণের ভিত্তিতে সহজ প্রশ্ন: মিলাদুন্নবী কি মসজিদের আঙিনা ডিঙিয়ে মাঠে-ময়দানে, ঘরে-ঘাটলায়, সাহিত্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যায়নি? সংস্কৃতির এ সহজাত ধর্মের পরীক্ষাগারেও মিলাদুন্নবী খুব সহজেই মানোত্তীর্ণ হয়। খানিক বাদেই উনি লিখেন: “সংস্কৃতি হচ্ছে মনের খোরাক এ খোরাকের সাহায্যে মন-মানসের বিকাশ আর সম্প্রসারণ ঘটে।” সত্যিকারার্থে মনের খোরাক যদি সংস্কৃতির চিহ্নরূপেই পরিগণিত হয় তবে বাঙালি-মুসলমানের নিকট ঈদে মিলাদুন্নবীর আশপাশে অন্য কোনো সংস্কৃতির জায়গা হবে কি? প্রশ্নটা কম শক্তিশালী নয়। বিরোধিতাকারীদের কথা চিন্তা করে যদি ঈদে মিলাদুন্নবীকে সংস্কৃতির গন্ডি থেকে বের করার দুঃসাহসী প্রচেষ্টা করা হয় তবে সেটা নিছক সাংস্কৃতিক-জ্ঞানের অজ্ঞতা কিংবা অসাড়তা ছাড়া ভিন্ন কিছু হবে না। যারা নিয়মিত খবরের কাগজে দৃষ্টি রাখেন এটা তাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয় যে, বাংলাদেশের শীর্ষসারির প্রায় প্রতিটি দৈনিকই ঈদে মিলাদুন্নবীর দিবসটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব এবং দায়িত্বের সাথেই প্রচার করেন। আর পত্রিকাবলীর সম্পাদকমণ্ডলীও এটাকে নিছক ইবাদত হিসেবে নেন না; একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মঞ্চ হিসেবেই বরণ করে থাকেন সচেতন কিংবা অসচেতন, যে কোনো ভাবেই হোক। এখানে একটি অতিশয় প্রণিধানযোগ্য তথ্য হচ্ছে, ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‘এক জাতি গঠন’প্রবন্ধে বাঙালি-মুসলিমদের পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনী-দিবস তথা ঈদে মিলাদুন্নবীকে “জাতীয় উৎসব” হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।৮ দুই ঈদ, শবে বরাত-মেরাজ-কদর এবং মোহররম থাকতেও ডক্টর শহীদুল্লাহ্ কেন ঈদে মিলাদুন্নবীকেই প্রস্তাব করেছিলেন তা আজ গভীরভাবে এবং ভীষণভাবে উপলব্ধির সময় এসেছে। প্রাবন্ধিক আবুল ফজল “সাহিত্য ও সংস্কৃতি” প্রবন্ধে লিখেছেন: “সংস্কৃতির মূল কান্ড সাহিত্য। সাহিত্যকে অবলম্বন করেই সাধারণত সংস্কৃতির নানা শাখা-প্রশাখা দল মেলে।” এ সূত্র ধরে একেবারে নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সংস্কৃতির মূল কান্ডটি অত্যন্ত মজবুত এবং সম্প্রসারিত; দুই ঈদ ব্যতীত অন্য কোনো ইসলামী উপলক্ষ বাঙালি-মুসলিম সাহিত্যিকদের বাগানে এতটা বিস্তৃত শিকড়ে মূলকান্ড গাড়তে পারেনি। বিরোধীগোষ্ঠীর দিকে না তাকিয়ে বাঙালি-মুসলিম সমাজে ঈদে মিলাদুন্নবীর ঐতিহাসিক সামাজিক গুরুত্ব, বাঙালি-মুসলিম সাহিত্যিকদের রচনায় ঈদে মিলাদুন্নবীর দৃঢ় অবস্থান, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ঐতিহাসিক প্রস্তাবের উপলব্ধি এবং বর্তমান পরিসরের সার্বিক পরিস্থিতির চাহিদা পূরণের নিমিত্তে ঈদে মিলাদুন্নবীকে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র পরিচায়করূপে যথার্থ সমাদর করাই বাঙালি-মুসলিম সমাজের একান্ত চাহিদা হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র:
১. মশাররফ রচনা-সম্ভার : বাংলা একাডেমী, তৃতীয় খ-, ১৯৮৪
২. বাংলার ইতিহাস : কে. পি. সেন, কলিকাতা, ১৩০৮ বঙ্গাব্দ, ৭০ পৃষ্ঠা
৩. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস (অনূদিত) দ্বিতীয় খ- : ড.এম.এ. রহিম, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬, ১৯৭-৮ পৃষ্ঠা
৪. একালে আমাদের কাল : সুফিয়া কামাল, সুফিয়া কামাল রচনা সংগ্রহ, বাংলা একাডেমী, ২০১৬, ৫৭৭ পৃষ্ঠা
৫. বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ : কামরুদ্দীন আহমদ, জহিরউদ্দীন মাহমুদ কর্তৃক প্রকাশিত, ঢাকা, ১৩৮২, ৪৩-৪৪ পৃষ্ঠা
৬. আত্মজীবনী জীবন ক্রমশ ঠিকানা পশ্চিম এখন বর্তমান : আবু রুশদ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ১৯৯৮, ৩২-৩৩ পৃষ্ঠা
৭. নির্বাচিত প্রবন্ধ : আবুল ফজল, সময় প্রকাশন, তৃতীয় মুদ্রণ, ২০১৪, ১২৭ পৃষ্ঠা
৮. ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ স্মারকগ্রন্থ : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫, ৩০৪ পৃষ্ঠা।
লেখক: ধর্মীয় প্রাবন্ধিক, চ্যানেল আই অনলাইন। ১৩/৮-৯, আজিজ মহল্লা, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
Email: [email protected]