রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূর

0

রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূর

=======

এক. ‘নূর’ (نور) -এর আভিধানিক অর্থ। ‘নূর’ (نور) শব্দের আভিধানিক অর্থ আলো, চমক-ঝলক ও উজালা। কিন্তু কখনো কখনো ওই বস্তুকেও ‘নূর’ বলে ফেলা হয়, যা থেকে রুশ্নী ও উজালা প্রকাশ পায়। এ অর্থে সূর্যকেও ‘নূর’ বলা হয়, বিজলী, চেরাগ ও লালটিনকেও ‘নূর’ অথবা ‘রুশ্নী’ বলে ফেলা হয়। অর্থাৎ ‘মুসাব্বাব’ (مسبّب) বলে ‘সবব’ (سبب) বুঝানো হয়। (অন্য ভাষায়, ‘পাত্র’ বলে পাত্রস্থিত জিনিষ বুঝানো হয়।)

দুই. ‘নূর’ (نور) দু.প্রকারের হয়ঃ ১. ‘নূর-ই হিস্সী’ (ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য নূর) এবং ২. ‘নূর-ই ‘আক্বলী’ (বিবেকগ্রাহ্য বা বিবেক দ্বারা অনুধাবনযোগ্য নূর)।

‘নূর-ই হিস্সী’ (نورحسّى) বলা হয় ওই নূরকে, যা চোখে দেখা যায়। যেমন- রোদ, চেরাগ (প্রদীপ)ও বিজলী (বিদ্যুৎ) ইত্যাদির আলো। আর ‘নূর-ই আক্বলী’ (نورعقلى) বলা হয় ওই নূরকে, যাকে চোখ তো অনুধাবন করতে পারেনা, কিন্তু বিবেক বলে যে, এটা নূর, এটা রুশ্নী। এ অর্থে ‘ইসলাম’কে, ‘ক্বোরআন’কে, ‘হিদায়ত’কে এবং ‘ইল্ম’কে ‘নূর’ বলা হয়। কতিপয় আয়াত দেখুন-
প্রথমত,  اَللهُ وَلِىُّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ اِلَى النُّوْرِ
তরজমা: আল্লাহ্ তা‘আলা সাহায্যকারী মু’মিনদের, তাদেরকে অন্ধকাররাশি থেকে আলোর দিকে বের করে নেন। [২: ২৫৭] এ আয়াত শরীফে ‘পথভ্রষ্টতা’কে অন্ধকার এবং ‘হিদায়ত’কে নূর বা রুশ্নী বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত,
وَاَنْزَلْنَا اِلَيْكُمْ نُوْرًا مُّبِيْنًا
তরজমা: আমি তোমাদের দিকে সুস্পষ্ট আলো (রুশ্নী) নাযিল করেছি।
[৪:১৭৪] এ আয়াত শরীফে ক্বোরআনকে ‘নূর’ বলা হয়েছে।

তৃতীয়ত,
مَثَلُ نُوْرِهٖ كَمِشْكوةٍ فِيْهَا مِصْبَاحٌ  তরজমা : মহান রবের নূরের উপমা ওই থাকের মতো, যাতে চেরাগ রয়েছে। [২৪:৩৫] এ আয়াত শরীফে মহান রব আপন যাত (সত্তা)কে অথবা আপন হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে নূর বলেছেন।

চতুর্থত,
اَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَاَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهٗ نُوْرًا يَمْشِىْ بِهٖ فِى النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهٗ
فِى الظُّلُمَاتِ … الاية
তরজমা: এবং যে ব্যক্তি মৃত ছিলো, অতঃপর আমি তাকে জীবন দিয়েছি এবং তার জন্য এমন নূর তৈরী করেছি, যা দ্বারা সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে, সেকি ওই ব্যক্তির ন্যায় হয়ে যাবে, যে অন্ধকাররাজিতে রয়েছে?… [৬:১২৩]

পঞ্চমত,
اَفَمَنْ شَرَحَ اللهُ صَدْرَهٗ لِلْاِسْلاَمِ فَهُوَ عَلٰى نُوْرٍ مِّنْ رَّبِّهٖ
তরজমা: তবে কি ওই ব্যক্তি, যার বক্ষকে আল্লাহ্ ইসলামের জন্য উম্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে আপন প্রতিপালকের নিকট থেকে আলোর উপর রয়েছে, তারই মতো হয়ে যাবে, যে পাষাণ হৃদয়? [৩৯:২২]

ষষ্ঠত,
رَبَّنَا اَتْمِمْ لَنَا نُوْرَنَا وَاغْفِرْلَنَا
তরজমা: হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পরিপূর্ণ করে দাও এবং আমাদেরকে ক্ষমা করো। [৬৬: ৮]

সপ্তমত,
اِنَّا اُنْزَلْنَا التَّوْراةَ فِيْهِ هُدًى وَّ نُوْر
তরজমা: নিশ্চয় আমি তাওরীত নাযিল করেছি, তাতে রয়েছে হিদায়ত ও নূর। [৫:৪৪] তাছাড়া, ইমাম শাফে‘ঈ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেছেন-
فَاِنَّ الْعِلْمَ نُوْرٌ مِّنْ اِلهٍ وَاِنَّ النُّوْرَ لاَ يُعْطى لِعَاصٍ
অর্থাৎ: নিশ্চয় ‘ইল্ম’ (জ্ঞান) হচ্ছে মহান রবের নূর। আর ‘নূর’ গুনাহ্গারকে দেওয়া হয় না।
তিন. তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে ‘নূর’-এর সংজ্ঞা। ‘নূর’ হচ্ছে- যা নিজেও প্রকাশ্য, অন্যকেও প্রকাশ করে। অর্থাৎ ظَاهِرٌ بِالذَّاتِ (নিজেও প্রকাশ্য) مُظْهِر لِلْغَيْرِ (অন্যকে প্রকাশকারী)। এ প্রকাশ্য হওয়া এবং প্রকাশ করাও দু’ধরনের حِسِّىْ ও عَقلى (যথাক্রমে, ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ও বিবেক দ্বারা অনুধাবনযোগ্য)। চাঁদ, সূর্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ইত্যাদি (حسّى) (ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য)ভাবে প্রকাশ্য ও প্রকাশকারী। আর ইল্ম (জ্ঞান), হিদায়ত, ইসলাম ও ক্বোরআন ইত্যাদি (عقلى) (বিকেকগ্রাহ্য)ভাবে নিজেও প্রকাশ্য এবং অন্যকেও প্রকাশ করে।

চার. আল্লাহ্ তা‘আলা প্রকৃতপক্ষে (حقيقة) আযালী, আবাদী ও যাতী (যথাক্রমে অনাদি, অনন্ত ও স্বত্তাগত) নূর। অর্থাৎ নিজে প্রকাশ্য আর যাঁকে তিনি প্রকাশ করে দিয়েছেন তিনিও প্রকাশ্য হয়ে গেছেন। বাকী রইলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অথবা ক্বোরআন শরীফ কিংবা ইসলাম অথবা ফেরেশতাগণ-আল্লাহর দানক্রমে ও তিনি বানিয়েছেন বলে নূর। অর্থাৎ তিনি হুযূর-ই আক্রামকে ও এ গুলোকে ‘নূর’ বানিয়েছেন। ফলে তিনি (হুযূর-ই আক্রাম) ও এগুলো ‘নূর’ হয়ে গেছেন। যেমন মহান রব হাক্বীক্বী তথা বাস্তবিকপক্ষে অনাদি ও অনন্তভাবে (ازلاً و ابدًا) সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, চিরঞ্জীব, সর্বজ্ঞ ও সব বিষয়ে অবগত।
(سميع ,بصير , حى , عليم خبير) আর অন্যান্য সৃষ্টি তিনি বানিয়েছেন বিধায়, তাঁর দানক্রমে (سميع) (শ্রোতা), (بصير) (দ্রষ্টা), (عليم) (জ্ঞাতা) এবং (خبير) (অবগত)ও। আল্লাহ্ তা‘আলা নিজের জন্য বলেছেন, اِنَّهٗ هُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ (নিশ্চয় ওই মহান রব সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা)  [সূরা বনী ই¯্রাঈল: আয়াত-১]

এ আয়াত শরীফে মহান রব নিজে নিজেকে (سَمِيْعٌ بَصِيْر) (সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা) বলেছেন। অন্য আয়াতে ইন্সান (মানবজাতি) সম্পর্কে এরশাদ করেছেন- اِنَّا خَلَقْنَا الْاِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ اَمْشَاجٍ نَبْتَلِيْهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيْعًا بَصِيْرًا
তরজমা: নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্রিত বীর্য থেকে, আমি তাকে পরীক্ষা করবো। অতঃপর তাকে শ্রবণকারী, দর্শনকারী করে দিয়েছি। [৭৬:২, কান্যুল ঈমান]

সমস্ত গুণের এ অবস্থা যে, মহান রব নিজে নিজে, কারো দান ব্যতিরেকে এসব গুণে গুণান্বিত আর অন্য সৃষ্টি, দানক্রমে, মহামহিম রব সৃষ্টি করার কারণে এসব গুণে সাময়িকভাবে গুণান্বিত। শব্দ ‘মুশ্তারাক’ (একাধিক অর্থ বিশিষ্ট); কিন্তু অর্থের দিক দিয়ে, প্রতিটি অর্থের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে।

পাঁচ. হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘মহান রবের নূর’ হওয়ার অর্থ এও নয় যে, হুযূর-ই আক্রাম আল্লাহর নূরের টুকরা, এও নয় যে, মহান রবের নূর হুযূর-ই আক্রামের নূরের হুবহু মৌলিক উপাদান, আবার এও নয় যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম আল্লাহ্ তা‘আলার মতো আযালী, আবাদী ও যাতী (অনাদি, অনন্ত ও স্বত্তাগত) নূর, এও নয় যে, মহান রব হুযূর-ই আক্বদাসের মধ্যে ছড়িয়ে গেছেন; এমনটি হয়েছে বলে কেউ বিশ্বাস করলে তার শির্ক ও কুফর অর্থাৎ তার মুশরিক ও কাফির হওয়া অনিবার্য (নিশ্চিত) হয়ে যাবে; বরং শুধু এর এ অর্থ যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, কোন মাধ্যম ছাড়া (بلا واسطه) মহান রবের নিকট থেকে ফয়য হাসিলকারী আর সমস্ত সৃষ্টি হুযূর-ই আক্রামের মাধ্যমে মহান রবের নিকট থেকে ‘ফয়য’ অর্জনকারী। যেমন- একটা চেরাগ থেকে অন্য চেরাগ জ্বালিয়ে, তারপর এ দ্বিতীয় চেরাগ থেকে হাজারো চেরাগ জ্বালিয়ে নিন। অথবা একটা শীশা (আয়না) সূর্যের সামনে রাখুন! ফলে তা চমকে উঠবে। তারপর সেটাকে ওইসব আয়নার দিকে করে নিন, যেগুলো অন্ধকার কামরায় রয়েছে। তখন সেটার প্রতিবিম্ব থেকে সমস্ত আয়না আলোকিত হয়ে যাবে।

প্রকাশ থাকে যে, প্রথম আয়নায় না সূর্য নেমে এসেছে, না সেটার টুকরা কেটে পড়ে আয়নার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে; বরং শুধু এমনটি হয়েছে যে, প্রথম আয়নাটা সরাসরি কোন মাধ্যম ছাড়া, সূর্য থেকে আলো অর্জন করেছে, আর অবশিষ্ট সব ক’টিই ওই আয়না থেকে। যদি এ প্রথম আয়না মধ্য ভাগে না হতো, তবে কামরাটার সব আয়না আলোহীন অন্ধকারই থেকে যেতো। এর উদাহরণ এটা বুঝে নিন যে, মহান রব হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম সম্পর্কে এরশাদ করেছেন- وَإِذَا سَوَّيْتُهٗ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُّوحِى فَقَعُواْ لَهٗ سَاجِدِينَ
তরজমা: অতঃপর যখন আমি সেটাকে ঠিক করে নিই এবং সেটার মধ্যে আমার নিকট থেকে বিশেষ সম্মানিত রূহ ফুৎকার করে দিই, ‘তখন সেটার নিমিত্তে সাজদাবনত হয়ে পড়ো।’ [১৫:২৯, কান্যুল ঈমান]

হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম সম্পর্কে এরশাদ করেছেন- وَرُوْحٌ مِّنْهُ (এবং তাঁরই নিকট থেকে একটি রূহ।) [৪:১৭১, কান্যুল ঈমান]

এ কারণে হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালামকে ‘রূহুল্লাহ্’ (আল্লাহ্ প্রদত্ত রূহ) বলা হয়। এর অর্থ এ নয় যে, ‘হযরত আদম ও হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর রূহের টুকরা কিংবা অংশ; অথবা আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁদের মধ্যে ছড়িয়ে গেছেন’; বরং যথাক্রমে মাতা-পিতার ও পিতার মাধ্যম ছাড়া তাদেরকে মহান রব রূহ দান করেছেন। এভাবে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘নূরুল্লাহ্’ (আল্লাহর নূর) হওয়ার অর্থও এটাই যে, কোন মাখ্লূক্বের মাধ্যম ছাড়া তিনি মহান রবের নিকট থেকে ফয়য (কল্যাণধারা) পেয়েছেন ও পেয়ে থাকেন।

ছয়. এক হলো ‘শাখ্সে মুহাম্মদী (شخص محمّدى) বা ‘মুহাম্মদী ব্যক্তিত্ব’ অপরটি হচ্ছে ‘হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী’ (حقيقت محمدى) অর্থাৎ ‘মুহাম্মদী হাক্বীক্বত বাস্তবাবস্থা।’ ‘শাখসে মুহাম্মদী’ হচ্ছে ওই পবিত্র শরীরের নাম, যা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর বংশধরদের মধ্যে, বিবি আমিনার পবিত্র গর্ভ থেকে এসেছে, সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালাম-এর পর দুনিয়ায় এসেছে, যা এ বিশ্ব-জগতে বহুবিধ আত্মীয়তার সাথে সম্পৃক্ত। বিবি আমেনা খাতুনের চোখের আলো হওয়া, হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বার মাথার মুকুট হওয়া, হযরত ইব্রাহীম, তাইয়্যেব, তাহের ও ফাতিমা যাহ্রার মহান পিতা হওয়া- এ সব সম্পর্ক ওই ‘শাখসে মুহাম্মদী’র বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী।

বাকী রইলো- ‘হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী’। এটা সম্মানিত সূফীগণের পরিভাষায়, শর্তহীন পবিত্র সত্তার প্রথম ঝলকের নাম। যেমন-উপমাহীনভাবে, এভাবে বুঝুন- আরবী ব্যাকরণ (ইলমে সরফ)-এর ‘মাসদার’ (ক্রিয়ামূল) থেকে গঠিত, প্রথম শব্দরূপের নাম (ماضى مطلق) (শর্তহীন অতীতকাল বাচক ক্রিয়াপদ), যা ‘মাসদার’ (ক্রিয়ামূল) থেকে গঠিত হয়। তারপর সমস্ত নির্গত ক্রিয়াপদ (مشتقات) এ ماضى مطلق (শর্তহীন অতীতকালবাচক ক্রিয়াপদ) থেকে গঠিত হয়। সুতরাং (ماضى مطلق) মাসদারের প্রথম ফসল (নির্গত ক্রিয়াপদ)। আর অন্যসব নির্গত ক্রিয়া এর পরবর্তী ফসল বা নির্গত শব্দাবলী।

মহান রব হলেন সমস্ত তাজাল্লী বা নূরের ‘মাসদার’ (উৎস)। আর হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হলেন ওই ماضى مطلق স্বরূপ, অর্থাৎ মহান রবের প্রথম ‘তাজাল্লী’ (আলোকচ্ছটা)। আর অবশিষ্ট সব সৃষ্টি পরবর্তী তাজাল্লী রাশির প্রকাশস্থল। ‘শখসে মুহাম্মদী’ সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে- قُلْ اِنَّمَا اَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ
তরজমা: হে হাবীব! আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের মতো বশর।’ [১৮:১১০]

আর ‘হাক্বীক্বতে মুহাম্মাদিয়্যাহ্’ সম্পর্কে খোদ্ হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এরশাদ করেছেন-
كُنْتُ نَبِىًّا وَ اٰدَمُ بَيْنَ الْمَآءِ وَالطِّيْنِ
অর্থ: আমি ওই সময় নবী ছিলাম, যখন (হযরত) আদম (আলায়হিস্ সালাম) পানি ও মাটির উপাদানে অবস্থান করছিলেন।

‘হাক্বীক্বতে মুহাম্মাদিয়্যাহ’ না আদম-সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, না বশর, না ‘মিস্লুকুম’ (তোমাদের মতো), না কারো পিতা, না কারো সন্তান; বরং সমগ্র বিশ্বের মূল উৎস। প্রকাশ থাকে যে, ‘বশরিয়াত’ (মানব হওয়া)’র সূচনা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম থেকে হয়েছে। আর হুযূর-ই আক্রাম ওই সময়ও নবী, যখন হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর খামীরও তৈরী হয়নি। যদি ওই সময় ও ওই অবস্থায় হুযূর ‘বশর’ হন, তখন না হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম ‘প্রথম বশর’ হতেন, না ‘আবুল বশর’ (মানব জাতির পিতা) হতেন।

এখন যা ‘নবী’র সংজ্ঞা দেওয়া হয়- ‘নবী হলেন ওই মানব, যাঁকে আল্লাহ্ তা‘আলা শরীয়তের বিধানাবলী পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছেন’, তা হচ্ছে ‘শাখসে নবী’র সজ্ঞা, ‘হাক্বীক্বতে নবী’ নবীর হাক্বক্বীত বা মূল অবস্থা’র নয়। হুযূর-ই আক্রাম তো ‘নুবূয়ত’ দ্বারা তখনো ভূষিত, যখন ‘ইনসানিয়াত’ (মানব হওয়া)’র ‘নাম নিশানাও ছিলো না। কেননা, তখন প্রথম ইন্সান এবং সমস্ত মানবের পিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম পয়দাও হননি; বরং ‘ইনসান’-এর জন্য জরুরী জিনিষগুলো-সময় এবং স্থানও পয়দা হয়নি। হুযূর-ই আক্রামের ‘নুবূয়ত’ স্থান ও স্থানে অবস্থানকারী (مكان ومكين)-এরও পূর্বেকার।

বাদামের ছিলকাও বাদাম নামে পরিচিত এবং মগজও;কিন্তু ছিলকার বিধান অন্য প্রকারের, মগজের বিধান ভিন্নতর। আবার এটাও লক্ষণীয় যে, মগজ থাকে ছিলকার অভ্যন্তরে। অনুরূপ, ‘হাক্বীক্বতে মুহাম্মাদিয়্যাহ’ ‘শখসে মুহাম্মাদী’তে আলোকদ্বীপ্ত থাকে। ‘নূর হওয়া’, ‘বোরহান হওয়া’ ‘মহান রবের দলীল হওয়া’ হচ্ছে এ হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীই এবং সেটারই গুণাবলী। এ বিষয়বস্তুকে মসনভী শরীফে অত্যন্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘ পরিসরে বর্ণনা করা হয়েছে। মৌলভী আশরাফ আলী সাহেব তার ‘নশরুত্ব ত্বী-ব’ (نشر الطيب)-এ অতি উত্তমরূপে প্রমাণ করেছেন। তাফসীর-ই ‘রূহুল বয়ান’-এ, সূরা আ’রাফ, পারা-৯-এ আয়াত- (هُوَ الَّذِىْ خَلَقَكُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَةٍ) (তিনি হলেন ওই মহান সত্তা, যিনি তোমাদেরকে একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘সমস্ত রূহ’ ‘রূহে মুহাম্মদী’ থেকে সৃষ্ট।’ সুতরাং হুযূর-ই আক্রাম হলেন ‘আবুল আরওয়াহ্’ (রূহগুলোর পিতা)।

সাত. হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর দেহ মুবারকের নূরানিয়াত (নূর হওয়া) (حِسِّىْ) (ইন্দ্রীয় গ্রাহ্য)ও ছিলো, ফলে সাহাবা-ই কেরাম এবং হুযূর-ই আক্রামের পবিত্র বিবিগণ ওই নূরানিয়্যাত আপন আপন চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। ইমাম তিরমিযী তাঁর ‘শামা-ইল’ শরীফে হযরত হিন্দ ইবনে আবূ হালাহ থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন। সেটাতে বর্ণিত হয়েছে-
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَخَمًا يَّتَلَأْلَأُ  وَجْهُه كَتَلَأْلُأِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ
অর্থ: হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মহত্ব ঔজ্জ্বল্যমন্ডিত ছিলেন। তাঁর নূরানী চেহারা তেমন আলোকদীপ্ত ছিলো যেমন মাসের চতুর্দশ রাতের পরিপূর্ণ চাঁদ।

দারেমী শরীফে ইমাম দারেমী হযরত রুবায়্যি’ বিনতে মু‘আত্তভিয্ ইবনে আফরা থেকে বর্ণনা করেছেন-
قَالَتْ يَا بُنَىَّ لَوْ رَأَيْتَهٗ رَأَيْتَ الشَّمْسَ طَالِعَةً
অর্থ: হে আমার বৎস! যদি তুমি ওই মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখতে, তবে উদিত সূর্যই দেখতে পেতে।
এই ইমাম দারেমী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন-
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَفْلَجَ الثِّنْيَتَيْنِ اِذَا تَكَلَّمَ رُئِىَ كَالنُّوْرِ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ ثُنَايَاهُ
অর্থ: নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সমুখস্থ দাঁত মুবারকগুলোর মধ্যবর্তীতে জানালা (ফাঁক) ছিলো। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন ওই দাঁত মুবারকগুলো থেকে আলো বের হতো।
কোন কোন রেওয়ায়তে আছে- ওই আলোকরশ্মি দ্বারা রাতে সুঁচ তালাশ করে নেওয়া হতো। আ’লা হযরত আলায়হির রাহমাহ্ বলেন- (পংক্তি)
سوزن گم شده ملتى هےتبسم سے ترے – رات كو صبح بناتاهے اوجالا تيرا
অর্থ: হে আল্লাহর রসূল! আপনার হাসি থেকে উদ্ভাসিত নূর বা আলোতে হারিয়ে যাওয়া সুঁচ খুঁজে পাওয়া যায়। রাতকে ভোর করে দেয় আপনার উজালা।
তিরমিযী, আহমদ, বায়হাক্বী ও ইবনে হাব্বান হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন- كَاَنَّ الشَّمْسُ تَجْرِىْ فِىْ وَجْهِهٖ
অর্থ: তাঁর চেহারা মুবারকে যেন সূর্য চমকাতো।
‘মাওয়াহিব-ই লাদুন্নিয়াহ্’: ১ম খন্ড: পৃষ্ঠা ২৫১-তে ‘নিহায়া’ শরীফের বরাতে উদ্ধৃত হয়েছে-
وَكَانَ الْجِدَارُ تُلاَحِكُ وَجْهَهٗ
অর্থ: তাঁর চেহারা-ই আন্ওয়ার-এ দেওয়ালের প্রতিবিম্ব দৃষ্টিগোচর হতো।
শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভী: মাদারিজুন্নুবূয়ত: ১ম খন্ড: পৃ-১১০-এ বলেছেন- ونمى افتاد آں حضرت را سايه بر زمين  অর্থ: হুযূর-ই আক্রামের ছায়া যমীনের উপর পড়তো না।
এ সব ক’টি বর্ণনা দ্বারা বুঝা গেলো যে, হুযূর-ই আকরামের পবিত্রতম দেহের ‘নূরানিয়াত’ শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ অনুভব করতেন। হুযূর-ই আন্ওয়ারের চেহারা মুবারককে এ জন্য তাঁরা সূর্য ও চাঁদ বলে বুঝাতেন। অনুরূপ, দেহ মুবারকের ছায়া না থাকা, পবিত্রতম শরীর মুবারক থেকে এমন খুশ্বু প্রবাহিত হওয়া যে, অলিগলি পর্যন্ত খুশ্বুদার হয়ে যেতো- এগুলোও ‘নূরানিয়াত’-এর কারণেই। মি’রাজ শরীফে শরীর মুবারক আগুন ও যামহারীর (বরফ)-এর বলয় অতিক্রম করে যাওয়া এবং ওই দু’টির প্রভাবে কোন অসুবিধা না হওয়া, সপ্ত আসমানের ভ্রমণ করা, যেখানে বাতাস নেই, অথচ জীবিত থাকা-এও এজন্য যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নূর। আর এ নূরানিয়াত (নূর হওয়া) حِسّىْ (ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য)ও, عقلى (বিবেকগ্রাহ্য)ও। অনুরূপ, বক্ষ মুবারক বিদারণের সময় বক্ষ মুবারক থেকে হৃদয় শরীফ বের করে আনা এবং ফেরেশতাদের সেটাকে ধৌতকরা। এতদ্সত্ত্বেও হুযূর জীবিত থাকা- এ কারণে যে, হুযূর-ই আক্রাম নূর। অন্যথায় হৃদযন্ত্রের উপর সামান্যতম প্রভাব পড়লেও তা মৃত্যুর কারণ হয়ে যায়। এখনো আল্লাহর কোন কোন ওলী হুযূর-ই আক্রামের নূরকে কপালের চোখে দেখতে পান; যার পক্ষে অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে।

যদি এ মূলনীতিগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া যায়, তবে অনেক উপকার হবে। আর মূল মাসআলাটা অনুধাবন করা (বুঝা) সহজ হয়ে যাবে। আজকাল বিরুদ্ধবাদীরা একথা বলে মানুষকে ধোঁকা দেয় যে, ‘আল্লাহ্ নূর’, যদি হুযূর-ই আক্রামও নূর হন, তবে তো হুযূর-ই আক্রামও রব হয়ে গেলেন।’ কখনো বলে বেড়ায়- ‘তোমরা যে বলছো, হুযূর আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্ট, তাহলে কি আল্লাহ্ হুযূর-ই আক্রামের মধ্যে সীমিত হয়ে গেছেন? নাকি আল্লাহর নূরের টুকরা কেটে তা থেকে হুযূরের সত্তা তৈরী করা হয়েছে?’ কখনো কখনো বলে, ‘খ্রিস্টানগণ হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালামকে খোদার পুত্র বলে বিশ্বাস করে। আর তোমরা নবী আলায়হিস্ সালামকে আল্লাহর নূর বলে বিশ্বাস করো। পুত্র বলে বিশ্বাস করা এবং নূর বলে মেনে নেওয়া এক কথা।’ কখনো কখনো বলে বেড়ায়- ‘যদি হুযূর-ই আক্রাম নূর হন, তবে তাঁর সমস্ত সন্তান-সন্তুতিও নূর হওয়া চাই। কোন সাইয়্যেদ মানুষ (ইন্সান) থাকা সমীচিন হবে না।’ যদি এ মূলনীতিগুলো স্মরণে থাকে, তবে এ সব ক’টি প্রশ্ন ও সংশয় আপসে দূরীভূত হয়ে যাবে।