একটি ঐতিহাসিক সত্য: এ উপমহাদেশে ওহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠায় সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী-মাওলানা এম. এ. মান্নান

0

একটি ঐতিহাসিক সত্য: এ উপমহাদেশে
ওহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠায় সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী
মাওলানা এম. এ. মান্নান
=======
খ্রিষ্ট্রিয় অষ্টাদশ শতাব্দির গোড়ার দিকে, ১৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে/১১১১ হিজরীতে আরবের নজদে, হাদীসে পাকের নূরানী ভাষায় ‘শয়তানের শিং’ বা দল এবং ইসলামী জগতে ‘ভূমিকম্প’ স্বরূপ জন্মগ্রহণ করেছিলো মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্হাব নজদী। কৈশোরে, কুখ্যাত খারেজী সম্প্রদায়ের অনুসারী শায়খ ইবনে তাইমিয়া ও তার শিষ্য ইবনে ক্বাইয়্যেম-এর কয়েকটা মাত্র কিতাব পড়ে, যৌবনে পদার্পণ করে, তাদেরই অনুসরণে ‘ওহাবী মতবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এ শায়খ-ই নজদী। দ্বিতীয় সুলতান মাহমূদ খানের শাসনামলে তার জন্ম হয়েছিলো। আক্বীদা ও কর্মকাণ্ডের দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব তার সকল অনুসারীসহ খারেজী সম্প্রদায়েরই অনুসারী। তার আক্বীদা, কথা ও কাজ তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দিয়েছে। নবী, রাসূল, ওলীগণ ও নেক্কার লোকদের মানহানি করেছিলেন এ ওহাবী মতবাদের প্রবর্তক। অথচ তাঁদের মানহানি করা ইমাম চতুষ্ঠয়ের মতে কুফর। এর উপর ইজমা’ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। [সূত্রাবলী- আদ্ দুরারুস্ সানিয়্যাহ্, পৃ. ৪২, ৪৭, আত্তাওয়াস্সুল বিন্নাবিয়্যি, পৃ.১, কৃত- আবূ হামিদ মারযূক, ওহাবী মাযহাবের হাক্বীক্বত, পৃ. ১১১, ১২৫ ইত্যাদি]
এ প্রত্যাখ্যানযোগ্য ওহাবী মতবাদ নজদ তথা তদানীন্তনকালীন আরব থেকে এ উপমহাদেশে যে লোকটি আমদানী ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন তার নাম সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী। এটা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। বলাবাহুল্য, তার প্রধান সহযোগী ছিলেন মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী। তখন এ উপমহাদেশে ইংরেজদের শাসন চলছিলো। গোটা জীবন এ দু’জন লোক ইংরেজদের পক্ষে কাজ করেছিলেন। পরিশেষে নিজেদের অযৌক্তিক ও অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের ফলে মুসলমানদেরই হাতে বালাকোটে, ১৮৩১ ইংরেজীর ৬ মে তারা নিহত হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, আরবের নজদী-ওহাবীরা পীর-মুরীদী, সিল্সিলা ও ওসীলাহ্ ইত্যাদির ঘোর বিরোধী। ওই মতবাদের আমদানীকারক এ দু’নেতাও ওহাবী মতবাদের সাথে একমত। ‘সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর মালফূযাত’ বলে খ্যাত ‘সিরাতুল মুস্তাক্বীম’ ও ইবনে ওয়াহ্হাব নজদীর ‘কিতাবুত্ তাওহীদ’-এর সারমর্ম বলে স্বীকৃত কিতাব ‘তাক্বভিয়াতুল ঈমান’ (কৃত, মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী) এ কথার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে; কিন্তু রহস্যজনকভাবে পরবর্তীতে তথাকথিত ‘পীর’ সেজে বসলেন খোদ সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী। তাকে এ কাজে সহযোগীতা করেছেন মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী ও মৌলভী আবদুল হাই। (যথাক্রমে- হযরত শাহ্ আবদুল আযীয রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা।) আরো উল্লেখ্য যে, এর ফলে, উপমহাদেশের কিছু সরলপ্রাণ লোক সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেছিলেন; আর কিছুলোক তার নেতৃত্বে বালাকোটের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তার নিকট থেকে খেলাফতপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে তাদের সিলসিলাহ্গুলোতে এভাবে সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর নামটাও ঢুকে পড়েছে।
বলাবাহুল্য, বালাকোটে উক্ত ওহাবী নেতাদ্বয় নিহত হবার পর আরম্ভ হলো তাদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা-পর্যালোচনা। তাদেরকে নিয়ে তখন থেকে প্রধানত: চর্তুমুখী আলোচনা করতে লাগলেন- ১. রাজনীতিবিদগণ, ২. ওহাবী মতবাদীগণ, ৩. সৈয়দ আহমদ বেরলভী বিশিষ্ট সিলসিলাহ্র পীরগণ এবং ৪. ইসলামের প্রকৃত আদর্শের অনুসারী সুন্নী মুসলমানগণ। প্রথমোক্ত তিন জনগোষ্ঠীর আলোচনায় সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীকে দেখানো হলো একজন ধর্মীয় যোদ্ধা হিসেবে। তার ওহাবী আক্বীদার ভয়াবহতা ও ইংরেজী-প্রীতির মতো জঘন্য স্বার্থপরতাকে গৌণ করে দেখানো হলো এবং তার বিতর্কিত কর্মগুলোকে দেখানো হলো ইসলামের তথাকথিত খিদমত হিসেবে। এটা অবশ্য সম্ভব হয়েছে কিছু সংখ্যক ধূর্ত ওহাবী মতবাদীদের ইতিহাস-বিকৃতির সুযোগে। এসব ইতিহাস বিকৃতকারীরা সুন্নী মতাদর্শের ক্বোরআন-সুন্নাহ্সম্মত আক্বীদা ও কাজগুলোকে ইসলাম বিরোধী বলে চালিয়ে দিলো এবং এ ওহাবী নেতাকে সাজানো হলো তথাকথিত সংস্কারকরূপে। তদুপরি, বালাকোটে তাদের মুসলিম বিরোধী জঘন্য যুদ্ধকে দেখানো হলো ইংরেজ ও শিখদের বিরুদ্ধে তথাকথিত ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে।
ইতিহাসবিদগণ হয়তো, ইংরেজদের বিরোধী মনে করে; কিংবা তাঁদের নিজ নিজ গবেষণানুসারে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে মূল্যায়ন করতে চেয়েছেন। কারণ, তখনতো ইংরেজ শাসন যেমন এদেশের মানুষের নিকট অসহনীয় মাথাব্যথা, অন্যদিকে ইংরেজদের বিরোধীতায় যে কোন ধরনের তথ্য-উপাথ্য এক বিরাট ব্যাপারই ছিলো। সম্ভবত ইতিহাস বিকৃতকারীরাও এ সুযোগটা গ্রহণের চেষ্টা করেছেন। আর যেহেতু ওহাবী মতবাদের আমদানীকারক ও প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে ওই দু’জন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, সেহেতু ওহাবী ভাবাপন্নরা সুকৌশলে যথাসময়ে তাদেরকে ইংরেজবিরোধী ও তথাকথিত ধর্মীয় যোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কসূর করেন নি। যে প্রবণতাটা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাত্তোরকালে স্বাধীনতা-বিরোধীরা করেছে, এখনো তা চলছে বলে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
আর যে সমস্ত সিলসিলায় দুর্ভাগ্যক্রমে সৈয়্যদ আহমদের নাম সম্পৃক্ত হয়ে গেছে, তাদের বেলায় দু’ধরনের চিত্র দেখা যায়ঃ ১. কোন কোন পীরের এক বা একাধিক সিল্সিলায় সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী আছেন, সাথে সাথে তাঁদের অন্য সিল্সিলায় (ঊর্ধ্বতন শায়খদের পরম্পরা) সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী নেই এবং ২. কোন কোন পীরের সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী মুক্ত সিল্সিলাই নেই।
সুতরাং এ উভয় প্রকারের সিল্সিলার বেশীরভাগ পীর-মাশাইখই জানেন যে, কোন সিল্সিলায় সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর মতো ওহাবী মতবাদী ব্যক্তি ‘ঊর্ধ্বতন শায়খ’ হিসেবে থাকলে তা তাসাওফের পরিভাষা ও বাস্তবতায় কর্তিত ও বরকতশূন্য; তাই অগ্রহণযোগ্য। কারণ, শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী ও আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু প্রমুখের বর্ণনানুসারে (যথাক্রমে, ‘আল্-ক্বাওলুল জামীল’ ও ‘ইরশাদাতে আ’লা হযরত’ ইত্যাদি) কমপক্ষে চারটি বৈশিষ্ট্য থাকা কোন গ্রহণযোগ্য পীর হওয়ার জন্য পূর্বশর্তঃ
১. বিশুদ্ধ সুন্নী আক্বীদা, ২. প্রয়োজনীয় প্রতূল দ্বীনী ইল্ম, ৩. তাক্বওয়া-পরহেযগারী (ফাসিক্ব না হওয়া) এবং ৪. বিশুদ্ধ তথা অকর্তিত সিল্সিলাহ, (যাতে কোন শায়খই ওহাবী কিংবা বদ-আক্বীদা সম্পন্ন নেই)।
ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাযী শেরে বাংলা আযীযুল হক আলায়হির রাহমাহ্ বলেন-
سلسلۂ کہ دراں سید احمد آمدہ
آں بریدہ ازفیوضات محمد آمدہ
অর্থাৎ যে সিল্সিলায় সৈয়দ আহমদ বেরলভী এসেছে সেটা হুযূর মুহাম্মদ মোস্তফার ফয়য ও বরকত থেকে কর্তিত। তিনি এর কারণ হিসেবে বলেন-
سید احمد بریلوی را کنوں بشنوبیاں
کر دگستاخی بشان سرور پیغمبراں
অর্থাৎ এখন সৈয়দ আহমদ বেরলভীর কথা বলছি, শুনো! লোকটি নবীকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বেআদবী করেছে। [দিওয়ানে আযীয]
তাই, ওই উভয় প্রকারের সিল্সিলার পীর-মাশাইখ উক্ত সৈয়্যদ আহমদ সম্পর্কে নিরবতা পালন করেন; ঈসালে সাওয়াব করেন না, তাকে কোন প্রকারে স্মরণও করেন না। আর যাঁদের সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীমুক্ত সিল্সিলাহ্ও আছে, তাঁরা তো নিশ্চিতভাবে সহীহ্ সিল্সিলার দাবীদার। কারণ তাঁদের তাকে সিলসিলার শায়খ দেখানোর প্রয়োজনই নেই। সিলসিলার ‘শাজরাহ’ দেখলে এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমার নিকটও এ ধরনের কতিপয় সিল্সিলাহর ‘শাজরা’ সংগৃহীত আছে; এ নিবন্ধে আমি কারো নাম না নিয়ে শুধু বাস্তব অবস্থাটা তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি। আর যাঁদের নিকট সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী মুক্ত সিলসিলাহ্ নেই, তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থে পীর-মুরীদী করতে চান এবং সিল্সিলাহ্গতভাবে ফয়যপ্রাপ্ত হতে চান এবং মুরীদদেরকেও ফয়যপ্রাপ্ত করতে চান, তবে তাঁরা ইচ্ছা করলে অবশ্যই সেটার যথাযোগ্য ও ফলপ্রসূ প্রতিকারও করতে পারেন; অনেকে করেছেনও। কারণ, তরীক্বতের ক্ষেত্রে আক্বীদার বিবেচনাটা আসে সর্বাগ্রে। এতে কেউ ইসলামের বড় খাদিম কি না, রাজনৈতিকভাবে অবদান রেখেছেন কিনা- এসব বিষয় গৌণ।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে সৈয়্যদ আহমদযুক্ত কোন কোন সিলসিলাহ্ কিছু সংখ্যক উত্তরসূরীর মধ্যে একটি ভিন্ন ও ক্ষতিকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হচ্ছে- হয়তো তারা নির্বিচারে সৈয়্যদ আহমদ বেরেলভীকে তাদের শায়খ মেনে নিচ্ছেন; হোক না তাদের সিল্সিলাহ্ কলূষিত; নতুবা উক্ত সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীকে ওহাবী না মেনে, ‘সুন্নী’ বলে প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। এমনকি তার সম্পর্কে (ওয়াহাবী হওয়া) ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র মতো ধামাচাপা দিয়ে একটি ডাহা মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করতে চান; তাও ‘তরীক্বত’ বাঁচানোর জন্য। আর এজন্য তথ্য বিকৃত করে প্রচুর পরিমাণে বইপুস্তকও লেখানো হচ্ছে। দেশের কোন কোন বহুল প্রচারিত এবং কোন কোন অখ্যাত পত্র-পত্রিকাকে এমনি অপপ্রচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। মোটা অংকের টোপ দিয়ে স্বার্থপর সুন্নীবেশী আলিম ও আলিমযাদাদের কেনা হচ্ছে। সাম্প্রতিককালীন এমনি কিছু ঘটনা তো গোটা সুন্নী ও তরীক্বতজগকে হতবাক করে দিয়েছে। এতদিন যাবৎ সুন্নী জগতের শীর্ষ আসনে ও সুন্নী হিসেবে পরিচিতির শীর্ষে অবস্থানকারী, অথচ সুবিধাভোগী কিছু আলিম ও আলিমযাদার অবিবেচকসূলভ পদক্ষেপ ও নিলর্জ্জতা গোটা সুন্নী জগৎকে এক বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদ্ধতিগত ব্যবস্থা গ্রহণেও বাধ্য করেছে।
বাকী রইলো- সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী, ইসমাঈল দেহলভী ও বালাকোট যুদ্ধ ইত্যাদি সম্পর্কে খাঁটি সুন্নী মুসলমানদের অবস্থান। সত্য বলতে কি? অনেক দিন আগে থেকে এ দেশের সুন্নী মুসলমানগণ রাজনৈতিকভাবে অসচেতন; ধর্মীয়ভাবেও নিজে নিজে আক্বীদা ও আমলের সংরক্ষণ করলেও ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্য গঠনমূলক কিছু করতে তেমন তৎপর নন। পাকিস্তান ও ভারতে কতিপয় বুযুর্গ ইমাম, মুজাদ্দিদ ও আলিম-ই হক্কানী-রব্বানী এবং পীর-মাশাইখ কলম না ধরলে ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তো অবস্থা কি হতো তা বলাই যায় না। আমাদের বাংলাদেশের সুন্নী-অঙ্গনের অবস্থা তাই দুঃখজনক। বিশেষত: সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও মৌং ইসমাঈল দেহলভীর এদেশে ওহাবী আমদানী ও সুকৌশলে প্রতিষ্ঠা এবং বালাকোটের ঘটনার বাস্তব ইতিহাস লিখন ও সংরক্ষণ এবং তৎপরবর্তী ঘটনাবলীর পর্যালোচনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও ভারতের সুন্নী আলিমগণ যথেষ্ট সচেতন ভূমিকা পালন করলেও আমাদের বাংলাদেশের বেশীরভাগ সুন্নী আলিম ওই ইতিহাস বিকৃতি ইত্যাদি দেখেও চোখ বুঁজে থাকেন। তাঁদের চোখের সামনে ওহাবী ও বালাকোটীগণ নির্বিচারে পত্র-পত্রিকা ও বইপুস্তকে ইতিহাস বিকৃত করেই যাচ্ছে, আর এর যথাযথ জবাব দিয়ে মুসলিম সমাজকে কেউ এ ব্যাপারে সচেতন করার কোন গরজই মনে করেন নি। ফলে, এখন এদিকে ওহাবী- বালাকোটীরা হঠকারিতা করার প্রয়াস পাচ্ছে আর সুন্নী অঙ্গনের লোকেরা সঠিক ইতিহাসটুকুও জানতে হিমসিম খাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে স্বার্থপর, অর্থগৃন্ধু, সুন্নিয়াতের অহমিকাশূন্য, হিংসুক ও পরশ্রীকাতর শ্রেণীর লোকেরা তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে, কিংবা তাদের নিকট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমি ভারত ও পাকিস্তানের আল্লামা ফযলে হক খায়রাবাদী, ইমামে আহলে সুন্নাত আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা বেরলভী, সদরুল আফাযিল সৈয়্যদ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী, আল্লামা আবদুল হাকীম শরফ ক্বাদেরী, আল্লামা আরশাদ আল-কাদেরী প্রমুখ আলায়হিমুর রহমাহ্ এবং বাংলাদেশে আল্লামা গাযী আযীযুল হক শেরে বাংলা আলকাদেরী এবং মাসিক তরজুমান ও এর সাহসী লেখকগণের সবিশেষ শোকরিয়া আদায় করছি। এখনো তাঁদের ক্ষুরধার লেখনীগুলো এক্ষেত্রে সঠিক পথের দিশা দিয়ে যাচ্ছে।
এ নিবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে আমি সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও তার সহযোগীদের ওহাবী হবার এবং বাংলাকোট যুদ্ধ যে নিছক ইংরেজ কিংবা শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিলো না; বরং পাঠান সুন্নী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিলো সেটাই প্রমাণ করার প্রয়াস পাবো। ইন্শা-আল্লাহ!
প্রথমে দেখুন সৈয়দ বেরলভী কে? কি তার পরিচয়?
জন্ম :
সৈয়দ আহমদ বেরলভী ৬ সফর, ১২০১ হিজরী, মুতাবিক ২৯ নভেম্বর ১৭৮৬ ইংরেজী ভারতের এলাহাবাদের রায় বেরীলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ মুহাম্মদ ইরফান।
শিক্ষা
চার বছর বয়সে তাকে মক্তবে পাঠানো হয়েছিলো; কিন্তু বহু চেষ্টা করার পরও দেখা গেছে যে, শিক্ষার প্রতি তার কোন অনুরাগই নেই। এতে তার পিতা অতি নৈরাশ্য বোধ করেছিলেন। কারণ, পূঁথিগত বিদ্যায় তার কোন উন্নতিই হয়নি। মকতবে যেই মৌলিক প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া হয় তিনি তাও রপ্ত করতে পেরেছিলেন কিনা জানা যায় নি। শুধু এতটুকু জানা গেছে যে, তিনি আরবী মতন পড়তে পারতেন ও ফার্সি বলতে ও বুঝতে পারতেন মাত্র। [সূত্র: ঈমান যখন জাগলো, কৃত- আবুল হাসান নদভী, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস,
কৃত- আব্বাস আলী খান ইত্যাদি ]
কৈশোর
সৈয়দ আহমদ বেরলভী মেধাশূন্য হলে কি হবে স্বাস্থ্যগতভাবে হৃষ্টপুষ্ট ছিলেন। লেখাপড়ায় মনযোগ না থাকলেও কৈশোরে আশপাশের গ্রামে কিংবা সাম নদীর তীরে সমবয়সীদের সাথে ভবঘুরের মতো শুধু ঘুরে বেড়াতেন আর কাবাডী, মল্লযুদ্ধ, সাঁতার ও ঘোড়-দৌঁড় ইত্যাদিতে সময় কাটাতেন। এভাবে তার জীবনের সতেরটি বছর কেটে গেলো। সতের বছর বয়সে তার পিতার মৃত্যু হলো।
[সূত্র: চেতনায় বালাকোট স্মারক-২০১১, লেখক- আবদুল মওদূদ, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস]
কর্মজীবনের সূচনা
তিনি পিতার মৃত্যুর দু/তিন বছর পর চাকুরীর খোঁজে লক্ষ্মৌ শহরে গমন করেছিলেন; কিন্তু দীর্ঘদিন এখানে বহু চেষ্টা করেও ভালো কোন চাকুরী পান নি। (কারণ, চাকুরীর কোন যোগ্যতা তার মধ্যে ছিলো না।) সুতরাং দারিদ্র ও অর্থকষ্টের কারণে বহু কষ্ট করে তিনি লক্ষেèৗ থেকে দিল্লীতে চলে আসলেন। [সূত্র: মীর্যা হযরত দেহলভী, কৃত. হায়াতে তাইয়্যেবা]
দিল্লীতে শাহ্ আবদুল আযীয রাহমাতুল্লাহি আলায়হির দরবারে
দিল্লীতে সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী সাহেবের জানাশোনা কেউ ছিলো না। সুতরাং বাধ্য হয়ে দিল্লীর প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ও আলিম হযরত শাহ্ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভীর মাদরাসায় আশ্রয় নিলেন। এখানে শাহ্ আবদুল আযীয রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির পাঠদান ও মাদরাসার পরিবেশ দেখে সৈয়্যদ আহমদের মনেও লেখাপড়া করে ইল্ম শিক্ষার ইচ্ছা জাগলো। শাহ্ আবদুল আযীয রাহমাতুল্লাহি আলায়হিও একমাস এবং শাহ্ আবদুল ক্বাদির সাহেব দীর্ঘদিন তাঁকে পড়ানোর চেষ্টা করলেন; কিন্তু কোন ফল হয়নি। সিলেটের ফুলতলীর মাওলানা আবদুল লতীফ সাহেব লিখেছেন- সৈয়্যদ আহমদ সাহেব দীর্ঘ তিন বছরে ক্বোরআন শরীফের কয়েকটা মাত্র সূরা মুখস্থ করেছিলেন। আর কিছু লিখতে শিখেছেন। এই তার শিক্ষাগত যোগ্যতা।
মুরীদ হলেও বাতিল আক্বিদার বহি:প্রকাশ
ইত্যবসরে সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী হযরত আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভীর হাতে মুরীদ হয়েছিলেন। হযরত শাহ্ সাহেব তাকে তরীক্বতের দীক্ষা দিতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাকে ‘তাসাওভুর-ই শায়খ’-এর দীক্ষা দিলেন। অর্থাৎ যখন পীর-মুর্শিদ মুরীদ থেকে দূরে থাকেন তখন মুরীদ যদি তা’যীম ও মুহাব্বতের সাথে পীরের গুণাবলীকে স্মরণ করে পীর সাহেবের ধ্যান করে, তবে সে তাঁর সাহচর্যে থাকার ন্যায় ফয়য ও বরকত লাভ করতে সক্ষম হয়। এটা শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ সাহেবও তাঁর প্রসিদ্ধ ‘আল্-ক্বাওলুল জামীল’-এর ৫০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। এ কিতাবের হাশিয়া বা পাদটীকায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করার জন্যও এ পন্থা অতীব উপকারী ও ফলপ্রসূ বরং উত্তম। কারণ, অযোগ্য মুরীদও যদি কামিল পীর-মুর্শিদের প্রতি ভালবাসায় বিভোর হয়, (পীরের ধ্যানমগ্ন হয়) তবে কামিল মুর্শিদ খোদাপ্রদত্ত ক্ষমতাবলে মুরীদের মধ্যে যোগ্যতা এনে দিতে পারেন। কিন্তু সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী এ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মহান ওলী ও বুযুর্গের কথায় বিশ্বাস করলেন না; বরং প্রত্যাখ্যানের সুরে বললেন, ‘‘আমি এমনটি করতে পারবো না; কেননা, পীরের ধ্যান ও মূর্তিপূজার মধ্যে পার্থক্য নেই। সুতরাং এটা শির্ক।’’ (এটা তার অদৃষ্টের দুর্ভাগ্যের বহি:প্রকাশই ছিলো) [সূত্র: মাহজানে আহমদী, পৃ. ১৯, কৃত- মাও: মুহম্মদ আলী বেরলভী]
দরবার থেকে বহিস্কার
সৈয়দ আহমদ বেরলভী যখন আউলিয়া-ই কেরামের ক্বোরআন-সুন্নাহ্ ভিত্তিক এমন একটি আমলকে মূর্তিপূজার মতো শির্ক বলে আখ্যায়িত করলেন, তখনই হযরত শাহ্ আবদুল আযীয আলাইহির রাহমাহ তাকে দরবার থেকে বের করে দিলেন। সৈয়দ আহমদও তার বদ-আক্বীদার উপর হঠ ধরে বের হয়ে গেলেন। লক্ষ্যণীয় যে, শুরু থেকেই তার ওহাবী আক্বীদায় বিশ্বাসী হবার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছিলো।
তারপর
এরপর সৈয়দ আহমদ বেরলভী ‘তরীক্বাহ্-ই মুহাম্মদীয়া’ নামের নিজস্ব তথাকথিত ‘তরীক্বাহ্’ বের করলেন। এ নামকরণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজে হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ হবার দাবী করেছেন বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। এ ধারণার কারণ হিসেবে তারই মালফূযাত ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ নামক কিতাবের ৬ষ্ঠ পৃষ্ঠার নিম্নলিখিত মন্তব্যকে স্থির করা যায়। উক্ত কিতাবে লিখা হয়েছে-
‘আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর হাবীব মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে যে যাত ও সিফাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, সৈয়্যদ আহমদকেও নবীর যাত ও সিফাতের ‘কামালে মুশাবাহাত’ বা পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে সৃষ্টি করেছেন।’ (নাঊযু বিল্লাহ্)
উল্লেখ্য, মৌং কারামত আলী জৌনপুরী সাহেব তার ‘যখীরা-ই কারামত’-এ লিখেছেন- ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ মূলতঃ সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর মালফূযাত; ইসমাঈল দেহলভী লেখক (অনুলিপিকার) মাত্র।
দ্বিতীয়ত
সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর বাস্তব জ্ঞান-শূণ্যতাকে ‘হুযূর আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘উম্মী’ উপাধীর সাথে তুলনা করারও দুঃসাহস দেখানো হয়েছে; অথচ হুযূর আকরামের উপাধি ‘উম্মী’ মানে ‘আসলী’, ‘মক্কী’ ও পার্থিব কোন ওস্তাদের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি এমন ইত্যাদি। কারণ, পবিত্র ক্বোরআনের ভাষায়- খোদ আল্লাহ্ তা‘আলাই আপন হাবীবকে পূর্ব ও পরবর্তী সবকিছুর জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, সব জ্ঞানের ধারক ‘ক্বোরআন মজীদ’ শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী তার গোটা জীবনে জ্ঞানগত যোগ্যতার কোন সাক্ষ্য রেখে যেতে পারে নি; বরং তার নামে মৌং ইসমাঈল প্রমুখ যা প্রচার করেছে তাও ভ্রান্তি, এমনকি কুফরীতে ভরপুর। তদুপরি, যে কোনভাবে কোন মানুষ নবী করীমের সাথে সমকক্ষতা দাবী করাতো নীরেট কুফরই।
তাছাড়া, সৈয়্যদ আহমদের ‘তরীক্বাহ-ই মুহাম্মাদিয়া’ ওহাবী মতবাদের প্রবক্তা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব নজদীর নামে নামকরণ করা হয়েছে বলেও ধারণা করা যায়।
তৃতীয়ত
ওহাবী মতবাদের সুতিকাগার সৌদী আরব থেকে প্রকাশিত ‘আশ্-শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব ওয়া আফকারিহী ওয়া খিদমাতিহী’ নামক পুস্তকের ৭৭ ও ৭৮ পৃষ্ঠায় লিখা হয়েছে-
کَمَا غَزَتِ الدَّعْوَۃُ الْوَہَّابِیَّۃُ السُوْدَانَ کَذٰلِکَ غَزَتِ الدَّعْوَۃُ بَعْضَ الْمُقَاطَعَاتِ الْہِنْدِیَّۃِ بِوَاسِطَۃِ اَحَدِ الْحُجَّاجِ الْہُنُوْدِ وَہُوَ السَّیِّد اَحْمَد وَقَدْ کَانَ الرَّجْلُ مِنْ اُمْرَآءِ الْہِنْدِ
অর্থাৎ যেমনিভাবে ওহাবী মতবাদের দাওয়াত সুদানে অনুপ্রবেশ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, তেমনিভাবে ভারতের বিভিন্ন এলাকায়ও ওহাবী মতবাদ অনুপ্রবেশ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে; তা করেছে হিন্দুস্তানের একজন হাজীর মাধ্যমে। তিনি হলেন সৈয়্যদ আহমদ। নি:সন্দেহে তিনি হিন্দুস্তানের একজন আমীর ছিলেন।
তাছাড়া, উপমহাদেশের ইতিহাস, ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের ‘দি ইণ্ডিয়ান মুসলমানস’ ইত্যাদিও একথার জ্বলন্ত প্রমাণ। সুতরাং এ কথা সুস্পষ্ট হলো যে, সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী শুধু ওহাবী নন, বরং উপমহাদেশে ওহাবী মতবাদের আমদানীকারক, প্রচারক ও প্রতিষ্ঠাকারী।
সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ওহাবী হবার জন্য কি এতটুকু যথেষ্ট নয়? এ প্রসঙ্গে আরো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ নামক পুস্তকে স্থান পাওয়া ওহাবী আক্বীদাগুলো পর্যালোচনা করলে। বস্তুত ‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এর সাথে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর সম্পর্ক বিভিন্নভাবে। যেমন- সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর খলীফা মৌং কারামত আলী জৌনপুরী তার কিতাব ‘যখীরাহ্-ই কারামত’ ১ম খণ্ডের ২০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-
صراط مستقیم کہ اسکے مصنف حضرت سید صاحب اور اسکے کاتب مولانا محمد اسماعیل محدث دہلوی صاحب ہیں
অর্থাৎ ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ কিতাবের প্রণেতা (মূল লেখক) হলেন সৈয়দ সাহেব (অর্থাৎ সৈয়দ আহমদ বেরলভী) এবং এর কাতিব বা লিপিকার হলেন মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল মুহাদ্দিসে দেহলভী।’’
সুতরাং ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’-এর সংকলক ও বিন্যাসকারী হলেন সৈয়্যদ সাহেবের দু’শিষ্য-মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী ও মৌলভী আবদুল হাই। এ তিনজনের আক্বীদার ভ্রান্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা দেয়ার জন্য ‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এর ভ্রান্তিগুলোর পর্যালোচনা করা দরকার। (নক্বলে কুফর কুফর নীস্ত!)
এক. ‘‘নামাযে নবী-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খেয়াল আসা গরুগাধার খেয়ালে ডুবে থাকার চেয়েও মন্দ। তাঁকে নামাযের মধ্যে তা’যীমের সাথে খেয়াল করা শির্ক।’’ (নাঊযু বিল্লাহ্)
[সূত্র: সিরাতে মুস্তাক্বীম, পৃ. ১৬৭] অথচ
যে নামায হুযূর-ই আক্রামের মাধ্যমে প্রাপ্ত, ক্বোরআন মজীদের বহু আয়াতে হুযূর-ই আকরামের নাম ও সরাসরি প্রশংসা বিদ্যমান, খোদ্ ‘আত্তাহিয়্যাত’ ও ‘দুরূদ-ই ইব্রাহীমী’তে হুযূর-ই আক্রামের নাম ও গুণাবলী আবৃত্তি করতে হয়, এমনকি হুযূর-ই আক্রামকে সম্বোধন করে সালামও দিতে হয়, ওই নামাযে নবী করীমের কথা স্মরণে না আসা মোটেই সম্ভব নয়; আল্লাহ্ তা‘আলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কষ্ট (বিধান) দেন না। [আল্-ক্বোরআন] বরং ইসলামী শরীয়তের বিধানই হচ্ছে ‘আত্তাহিয়্যাত’-এ প্রথমে হুযূর করীমকে অতি ভক্তি-শ্রদ্ধা সহকারে খেয়াল করে, তারপর ‘আস্-সালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবীয়্যু (হে মহান নবী, আপনাকে সালাম) বলতে হয়।  [ইহ্য়াউ উলূমিদ্দীন, শেফা শরীফ, ইত্যাদি] কিন্তু সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও ইসমাঈল দেহলভী প্রমুখ কোন্ ধর্মের নামায পড়তেন তা সহজে অনুমেয়। আল্লাহ্ ও রসূলের শানে বেয়াদবী করে নামায পড়ার কী অর্থ হতে পারে?
দুই. ‘‘হ্দাীস শরীফের বর্ণনানুসারে চুরি ও যিনা করার সময় যেমন চোর ও যিনাকারীর ঈমান পৃথক হয়ে যায়, তেমনিভাবে কোন মাযার শরীফে অবস্থান করে দো‘আ করার সময়ও ঈমান একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। অজ্ঞতার ওযর না থাকলে তারা পরিস্কারভাবে কাফির হয়ে যেতো। সুতরাং যিয়ারতকারী যদি আলিম হন, তবে ওখানে দো‘আ করার সময় তিনি নি:সন্দেহে কাফির হয়ে যান।’ (নাঊযুবিল্লাহ)। [সিরাতে মুস্তাকীম, পৃ. ১০৫] অথচ
ওলীর মাযার তৈরী করা মুস্তাহাব, কবর যিয়ারত করা সুন্নাত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওসীলা নিয়ে দো‘আ করা শরীয়ত সম্মত ও উপকারী আমল।
সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর পীর, ত্রয়োদশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ হযরত শাহ্ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর তাফসীর-ই আযীযীর ১১৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘‘অভাবগ্রস্ত ও কঠিন সমস্যায় জর্জরিত লোক যদি ওফাতপ্রাপ্ত ওলীগণের নিকট হাযির হয়ে হাজত পূরণের জন্য দো‘আ ফরিয়াদ করে, তবে সে অবশ্যই তা পাবে। কেননা, ওলীগণও খোদাপ্রদত্ত ক্ষমতা বলে মানুষের সমস্যাদির সমাধান করতে পারেন।’’
আর মোল্লা আলী ক্বারী আলায়হির রাহ্মাহ্ তাঁর প্রসিদ্ধ ‘মিরক্বাত শরহে মিশ্কাত’-এ পুরুষদের জন্য কবর যিয়ারত করা সুন্নাত হবার উপর ‘উম্মতের ইজমা’ উদ্ধৃত করেছেন।
নিজে পীর সেজে যারা যিয়ারত ও ওসীলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ওহাবী আক্বীদা পোষণ করে তাদের ভণ্ডামীর পক্ষে আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন থাকে না।
উল্লেখ্য, মৌং কারামত আলী জৌনপুরী, ফুলতলীর পীরজাদা ইমাম উদ্দীন, সোনাকান্দার পীর সাহেব এবং লাহোরের মওদূদী ও ‘সেরাতে মুস্তাকীম’-এর উক্ত ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। যথাক্রমে ‘যখীরা-ই কারামত’, ‘আনীসুত্ তালেবীন’ ও ‘ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন’ দ্রষ্টব্য। মওদূদী তো খাজা আজমীরী ও হযরত সালার মাসঊদ-এর মতো বুযুর্গদের মাযারে যাওয়াকে যিনার চেয়েও জঘন্য কাজ বলে মন্তব্য করেছেন। (নাঊযু বিল্লাহ্)
তিন. ‘একদিন স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর শক্তিশালী হাতে সৈয়্যদ আহমদের ডান হাত ধরে বললেন, আজ তোমাকে এই দিলাম। পরে আরো দেবো। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তার কাছে বায়‘আত গ্রহণ করার জন্য বারংবার আরজি পেশ করতে থাকলে তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ! আপনার বান্দা বায়‘আত গ্রহণ করার জন্য আমার কাছে আসছে, আর আপনি আমার হাত ধরে আছেন।’ আল্লাহ্ তা‘আলা উত্তরে বললেন, ‘তোমার হাতে যারা বায়‘আত গ্রহণ করবে লক্ষ লক্ষ গুনাহ্ থাকলেও আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো।’
[সিরাতে মুস্তাক্বীম, পৃ. ৩০৮] অথচ
আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে সরাসরি কথা বলা একমাত্র নবীগণ ও ফিরিশতাগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর জন্যই নির্দ্ধারিত। অন্য কেউ এ মর্যাদায় পৌঁছতে পারে না। [তাফসীর-ই আযীযী]
আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা‘আলার উলূহিয়্যাৎ ও তাওহীদের কথা স্বীকার করে, অর্থাৎ আল্লাহকে একমাত্র মা’বূদ বলে স্বীকার করে, কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে সরাসরি কথা বলার দাবী করে, তবে ‘ইজমা-ই উম্মত’ অনুসারে সে কুফর করে। [শেফা শরীফ, কৃত. ক্বাযী আয়ায]
সুতরাং হক্কানী পীরের দরবার থেকে বহিস্কৃত সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও তাঁর অনুসারীরা কোন্ আক্বীদা প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট ছিলেন তা তো এখন সহজে অনুমেয়। যেসব পীর-মাশাইখের সিল্সিলায় এমন ভ্রান্ত মতবাদী আছে, তাঁরা কি একটু চিন্তা করবেন? ঈমানের অহমিকাকে কি তাঁরা একটু জাগ্রত করবেন?
চার. ‘সৈয়দ আহমদ বেরলভীকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যাত ও সিফাতের সাথে ‘কামালে মুশাবাহাত’ বা পূর্ণাঙ্গ মিল রেখে সৃষ্টি করা হয়েছে।’ [সিরাতে মুস্তাকীম, পৃ. ৬] অথচ
কোন সৃষ্টিকে আল্লাহ্র হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তুলনা করা যাবে না। যারা নূর নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কোন সৃষ্টির তুলনা করে থাকে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সুমহান মর্যাদা ও শানে চরম বেয়াদবী করার দরুন কুফরীতে পতিত হবে।  [শেফা শরীফ ও শরহে আক্বাইদে নাসাফী ইত্যাদি]
লক্ষ্যণীয় যে, সিরাতে মুস্তাকীমে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ওই জ্ঞানশূন্য, কাবাডী খেলোয়ার ও বদ আক্বীদা সম্পন্ন সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর ‘কামালে মুশাবাহাত’ (পূর্ণাঙ্গ মিল) ছিলো বলে দাবী করা হয়েছে। (না‘ঊযু বিল্লাহ্)
এভাবে আরো বহু চরম বিভ্রান্তিকর মন্তব্য ও বক্তব্য রয়েছে সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও মৌং ইসমাঈল দেহলভীর কিতাব ‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এ। পরিসরবৃদ্ধি এড়ানোর জন্য এখানে সবকটি উল্লেখ করা গেলো না। কারণ, উক্ত কিতাবে সত্তরাধিক কুফরীপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে।
আরো মজার বিষয় হচ্ছে- সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর দক্ষিণ হস্ত ও উপমহাদেশে ওহাবী মতবাদের আমদানীতে অন্যতম প্রধান সহযোগী মৌং ইসমাঈল দেহলভীর প্রণীত কিতাব হচ্ছে- ‘তাক্বভিয়াতুল ঈমান’।
এ কিতাব ও এর প্রণেতার স্বরূপ উন্মোচিত হয় আল্লামা কাযী ফযল আহমদ লুদিয়ানভীর কিতাব ‘আন্ওয়ার-ই আফতাব-ই সদাক্বত’ থেকে। এ কিতাবের ১ম খণ্ড, ৫৩৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে-
لاَ شَکًَّ فِیْ بُطْلاَنِ مَنْقُوْلٍ مِّنْ تَقْوِیَۃِ الْاِیْمَانِ بِکَوْنِہٖ مُوَافِقًا لِلنَّجْدِیَّۃِ مَأْخُوْذٍ مِّنْ کِتَابِ التَّوْحِیْدِ لِقَرْنِ الشَّیْطَانِ وَاَیْضًا لَہُ نِسْبَتُ تَقْوِیَۃُ الْاِیْمَانِ وَمُؤَلِّفُہُ اَنَّ ہٰذَا الدَّجَّالَ وَالْکَذَّابَ اِسْتَحَقَّ اللَّعْنَۃَ مِنَ اللّٰہِ تَعَالٰی وَمَلٰءِکَتِہٖ وَاُولِی الْعِلْمِ وَسَآءِرِ الْعَالَمِیْنَ الخ
অর্থাৎ ‘মৌলভী ইসমাঈল দেহলভীর ‘তাক্বভিয়াতুল ঈমান’-এর বিষয়াবলী বাতিল হওয়ার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, সেটা নজদী আক্বাঈদের অনুরূপ ও ‘শয়তানের শীং’ (ওহাবী মতবাদের প্রবর্তক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব নজদী’র) ‘কিতাবুত্ তাওহীদ’ থেকে সংকলিত। এ কিতাবটার রচয়িতা দাজ্জাল, মহামিথ্যুক এবং আল্লাহ্, তাঁর ফিরিশ্তাগণ, বিজ্ঞ ইমামগণ ও সমস্ত বিশ্ববাসীর পক্ষ থেকে লা’নত বা অভিশাপ পাবার উপযোগী।’’
আল্লামা লুদিয়ানভী সাহেবের এ ফাত্ওয়ার সমর্থনকারী হচ্ছেন- হারামাঈন শরীফাঈনের ১২ জন মুফতী ও বিজ্ঞ ওলামা। এর কারণও স্পষ্ট। এ কিতাব অতি জঘন্য ও বিভ্রান্তিপূর্ণ বক্তব্যে ভরপুর। দেশের বহু বরেণ্য ওলামা-মাশাইখকেও এ কিতাবের খণ্ডনে কলম ধরতে হয়েছে। তন্মধ্যে ‘মুঈদুল ঈমান রদ্দে তাক্বভিয়াতুল ঈমান’, কৃত মাখসূস উল্লাহ্ দেহলভী, ‘তাহ্ক্বীক্বুল ফাত্ওয়া’ ও ‘ইমতিনা‘উন্ নাযীর’, কৃত. আল্লামা ফযলে হক খায়রাবাদী, ‘সাইফুল জাব্বার,’ কৃত- আল্লামা ফযলে রসূল বদায়ূনী, ‘সাইফুল আবরার’, কৃত. আল্লামা আবদুর রহমান সিলেটী, ‘আল্-কাওকাবাতুশ্ শিহাবিয়াহ’, কৃত. আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী, ‘আত্ইয়াবুল বয়ান’ কৃত. আল্লামা সৈয়্যদ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী আলায়হিমুর রহমাহ্ ইত্যাদি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
এসব তো মুসলমানদের সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ ঈমান-আক্বীদার বিষয়। যার ঈমান-আক্বীদা এমন জঘন্য ভ্রান্ত তার অন্যান্য কর্মকাণ্ডের স্বরূপ কি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কাজ করার পেছনেও তার উদ্দেশ্য কি ছিলো তাও সহজে অনুমেয়। ওহাবী-নজদীরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে সৌদী আরবে ও বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ওয়াহ্বিয়াত প্রতিষ্ঠা করেছে, খোমেনী ও তার অনুসারীরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইরানে শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে। উভয় রাষ্ট্রে তারা সুন্নী নিধন চালিয়েছে। ইসলামী আক্বীদা ও আমলকে ধ্বংস করেছে। এতে ইসলামেরই ক্ষতি হয়েছে।
কোন কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও মৌং ইসমাঈল দেহলভীকে ব্রিটিশ বিরোধী ও বড় মুজাহিদ বলে মন্তব্য করেছেন এবং তাদের বইপুস্তকেও এমন মন্তব্য সন্নিবিষ্ট করে দিয়েছেন। ফলশ্র“তিতে পরবর্তী পাঠকগণ তাঁদের এই মন্তব্যকে নির্বিচারে জোরেশোরে মূল্যায়ন করতে থাকেন। অথচ ওই দু’জন লোক গোটা জীবন ইংরেজদের পক্ষাবলম্বণ করে গেছেন। বস্তুত এর পক্ষে যেসব ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে সেগুলোকে তাঁরা বে-মালুম উল্লেখ করেন নি; বরং তাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাদের বদ-আক্বীদা ও ঈমান-বিধ্বংসী বিষয়গুলোকে একেবারে গৌণ, এমনকি প্রকারান্তরে অস্বীকারই করে গেছেন। অথচ একজন প্রকৃত ঈমানদারের নিকট ঈমান-আক্বীদার গুরুত্ব সর্বাগ্রে; আর রাজনৈতিক বিষয়াদি তার নিকট ওই নিরীখেই মূল্যায়ন সাপেক্ষ ব্যাপার।
যারা সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও মৌং ইসমাঈল দেহলভীকে ইংরেজ বিরোধী বলে প্রমাণ করতে চান তারা যেন খোদ্ ইসমাঈল দেহলভীর নিম্নলিখিত ফাত্ওয়া বা মন্তব্যের প্রতি লক্ষ্য করেন-
کلکتہ میں جب مولانا اسماعیل نے جہاد کا وعظ فرمانا شروع کیا اور سکھوں کے مظالم کی کیفیت پیش کی توایک شخص نے دریافت کیا آپ انگریزوں پر جہاد کا فتوی کیوں نہیں دیتے ؟ آپ نے جواب دیا ان پر جہاد کرنا کسی طرح واجب نہیں‘ ایک تو ان کی ہم رعیت ہیں دوسرے ہمارے مذہبی ارکان کے ادا کرنے میں وہ ذرا بھی دست اندازی نہیں کرتے ‘ ہمیں ان کی حکومت میں ہرطرح آزادی ہے ‘ بلکہ اگر ان پر کوئی حملہ آورہو تو مسلمانوں پر فرض ہے کہ وہ اس سے لڑیں اور اپنی گورنمنٹ بر طانیہ پر آنچ نہ آنے دیں
অর্থাৎ ‘মাওলানা ইসমাঈল দেহলভী যখন কোলকাতায় জিহাদ সংক্রান্ত ওয়ায শুরু করলেন এবং শিখদের অত্যাচার সম্পর্কে বিবরণ দিচ্ছিলেন, তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলো, আপনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ফাত্ওয়া দিচ্ছেন না কেন? তিনি (মৌলভী ইসমাঈল) উত্তরে বললেন, ‘তাদের (ইংরেজগণ) বিরুদ্ধে কোন অবস্থাতেই জিহাদ করা ওয়াজিব নয়। কারণ, একদিকে আমরা হচ্ছি তাদের প্রজা, অপরদিকে আমাদের ধর্মীয় কোন কাজ সম্পন্ন করতে তারা কোন রূপ হস্তক্ষেপ করছেন না, তাদের শাসনে আমাদের সকল প্রকার স্বাধীনতা রয়েছে। যদি ইংরেজদের উপর কেউ হামলা করে তবে মুসলমানদের উপর ফরয যেন তারা তাদের (হামলাকারীদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং আমাদের ব্রিটিশ সরকারের গায়ে যেন কোন আচঁড় পর্যন্ত না লাগে।’’  [সূত্র: মীর্যা হায়রৎ দেহলভী প্রণীত ‘হায়াতে তাইয়্যেবাহ্’,
মৌলভী ইসমাঈল দেহলভীর জীবনী গ্রন্থ, পৃ.২৭১] এ কথার সমর্থন করেছেন- মুন্সী মুহাম্মদ জাফর খানেশ্বরী তার ‘সাওয়ানিহে আহমদী’ পৃ. ৪৭-এ।
আরো মজার বিষয় হচ্ছে- আমাদের বাংলাদেশের সিলেটের ফুলতলীর বর্তমান পীর সাহেব মৌং মুহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন চৌধুরী সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর জীবনী পুস্তক, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃ.৪৮ ও ৪৯-এ লিখেছেন- ‘‘এক ইংরেজ আতিথ্য। এশার নামাযের পর নৌকার দিক-দর্শকরা খবর দিলো মশালধারী কয়েকজন লোক নৌকার দিকে এগিয়ে আসছে। সৈয়্যদ সাহেব খবর নিয়ে জানতে পারলেন জনৈক ইংরেজ ব্যবসায়ী (বণিক) সৈয়্যদ আহমদের কাফেলার জন্য খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ইংরেজ ভদ্রলোক কয়েকজন লোকসহ সৈয়দ সাহেবের সামনে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেন, ‘জনাব, তিনদিন থেকে আপনার শুভাগমনের অপেক্ষায় ছিলাম। আজ সৌভাগ্যক্রমে আপনি তাশরীফ এনেছেন। আমার নগণ্য খাদ্য দ্রব্যগুলো গ্রহণ করুন!’ সৈয়্যদ সাহেব ইংরেজদের আতিথ্য গ্রহণ করলেন।’’
সুতরাং এ কথা ঐতিহাসিকভাবেও প্রমাণিত হয় যে, সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী ও ইসমাঈল দেহলভী শুধু ওহাবী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং তারা ইংরেজদের দালালী করে গেছেন। বাকী রইলো শিখদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের তথ্য আর বালাকোটে সংঘঠিত যুদ্ধ। শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও যে তারা ইংরেজদের স্বার্থে করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘কোলাকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থের ৯০ পৃষ্ঠায়-
‘‘ওহাবী ও শিখদের সংঘর্ষ চলাকালে উভয়পক্ষের শক্তি ক্ষয় হোক এটাই ইংরেজদের কাম্য ছিলো। এ প্রেক্ষিতে ১৮৩১ সালে ওহাবী নেতা সৈয়্যদ আহমদের ইন্তেকাল হয় এবং ১৮৩৯ সালে রণজিত সিং-এর মৃত্যুর পর লর্ড ডালহৌসী একে একে পাঞ্জাব ও সিন্ধু এলাকা ইংরেজ রাজত্বের অন্তর্ভূক্ত করে নেয়।’’
আর বালাকোট যুদ্ধ!
একথা সুপ্রসিদ্ধ যে, সৈয়দ আহমদ বেরলভী ও ইসমাঈল দেহলভী বালাকোটের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। বস্তুত: তারা ‘তাক্বভিয়াতুল ঈমান’ পুস্তক দ্বারা ওহাবী আক্বীদাকে এ উপমহাদেশে আমদানী ও প্রতিষ্ঠা করে যেই নতুন ফ্যাসাদের জন্ম দিয়েছিলেন সেটার পরম্পরায় সীমান্তের পাঠান মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছিলেন; কিন্তু শিখদের হাতে নিহত হয়েছিলেন বলে প্রচারণা চালিয়ে (ইতিহাস বিকৃতির আশ্রয় নিয়ে) ওহাবীরা তাকে শহীদ বলে গণ্য করে থাকে। [সূত্র. আন্ওয়ার-ই আফতাব-ই সদাক্বাত ও মুক্বাদ্দামা-ই জা‘আল হক্ব ইত্যাদি]
হিজরি চতুর্দশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিম্নলিখিত দু’টি পংক্তিতে এ প্রসঙ্গে অতি সুন্দর বলেছেন-
وہ وہابیہ نے جسے دیا ہے لقب شہید وذبیح کا
وہ شہید لیلئی نجد تھا‘ وہ ذبیح تیغ خیار ہے
অর্থাৎ ওহাবীরা যাকে শহীদ ও যবীহ্ বলে আখ্যায়িত করেছে, মূলত: সে নজদের লায়লার প্রেমে বিভোর ছিলো, নবীপ্রেমিক মুসলমান ধার্মিকদের হাতে সে প্রাণ হারিয়েছে।
[আল্-কাওকাবাতুশ্ শিহাবিয়াহ্]
উল্লেখ্য, ওহাবীরা শহীদ বলেছে ইসমাঈল দেহলভী ও সৈয়দ আহমদ বেরলভীকে। তাছাড়া, লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- যদি পাঞ্জাবের শিখদের হাতে তারা নিহত হতেন, তবে অমৃতসর বা পাঞ্জাবের কোন শহরে তারা মারা যেতেন, কারণ পাঞ্জাবই হলো শিখদের কেন্দ্রস্থল। আর সীমান্ত প্রদেশ হলো পাঠান সুন্নী মুসলমানদের এলাকা। সুতরাং বুঝা গেলো যে, মুসলমানদের হাতেই তাদের মৃত্যু হয়েছিলো। তাঁরা তাদের মৃতদেহ পর্যন্ত গুম করে ফেলেছিলেন। এ কারণে কোথাও তাদের কবর নেই।
কাজেই, সেই ‘বালাকোট’-এর অবস্থান এবং যুদ্ধের পটভূমিকা (কারণ) ও ফলাফল সম্পর্কে জানা দরকার। এ নিবন্ধে পরিসর বৃদ্ধি এড়ানোর জন্য বিস্তারিত আলোচনা করতে পারছি না। তবুও সংক্ষেপে আলোচনা করার প্রয়াস পেলাম-
‘‘পেশোয়ার থেকে কাশ্মিরের পথে বালাকোট একটি সুরক্ষিত এলাকা। চতুর্দিকে উচুঁ উচুঁ পাহাড় দ্বারা বালাকোট বেষ্টিত। সুতরাং এটি একটি সুদৃঢ় দূর্গের ন্যায় ছিলো। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ অবস্থান করে সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী সাহেব, ইসমাঈল দেহলভী, মুজাহিদ বাহিনীর কাজী ও কর্মচারীরা পাঠানদের কিছু কুমারী ও বিধবা মহিলাকে জোর করে বিবাহ্ করেছিলেন। এ নিয়ে ভারতীয় ও পাঠানদের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সৈয়্যদ আহমদ সাহেবও একটি পাঠান বালিকাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ( জোর করে) বিবাহ করেছিলেন। তার গর্ভে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছিলো। এ নিয়ে সৈয়্যদ সাহেবের সাথে আফগান উপজাতীয়দের মন কষাকষি চরম আকার ধারণ করে। এ দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত সৈয়্যদ বাহিনীর সাথে যুদ্ধের রূপ নিলো। ঐতিহাসিক ফুলুড়ার যুদ্ধে সৈয়্যদ বাহিনী চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিলো এবং তাঁর অসংখ্য ওহাবী সৈন্য নিহত হয়েছিলো।
এভাবে বিভিন্ন যুদ্ধে আফগান সীমান্তবাসীদের হাতে মার খেতে খেতে ‘সৈয়্যদ বাহিনী’র কিছু লোক নিহত হলো আর কিছু লোক দল ত্যাগ করে মৌলভী মাহবূব আলীর নেতৃত্বে হিন্দুস্তানের দিকে পলায়ন করলো। শেষ পর্যন্ত লক্ষ সৈন্যের মধ্যে হাজার/বারশ’ লোক সৈয়্যদ সাহেবের সাথে থেকে যায়। এ অবস্থা দেখে সৈয়্যদ সাহেব ওই এলাকা ছেড়ে কাশ্মিরে আশ্রয় নেয়ার উদ্দেশ্যে পলায়ন করতে থাকেন; কিন্তু বিধিবাম। সামনে শিখ সর্দার শের সিং-এর বিশ হাজারের সৈন্যবাহিনী এবং পেছনে পাঠান আফগান সীমান্তবাসীর ধাওয়ার মধ্যখানে ‘বালাকোটের চূড়ান্ত ঘটনা’ সংঘটিত হলো এবং তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হলো। (অর্থাৎ তার শোচনীয় পরাজয় ও মৃত্যু হলো।) [সূত্র: শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ্ ও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা’ পৃ. ৭৮-৮৬, অনূদিত,
মূল লেখক- ওবায়দুল্লাহ্ সিন্ধী, অনুবাদ ও প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন]
সুতরাং একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, মৌং ইসমাঈল দেহলভী ও তাঁর পীর সাহেব সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী শিখদের হাতে নয়; বরং সুন্নী আক্বীদায় বিশ্বাসী ধার্মিক মুসলমানদের হাতেই নিহত হয়েছিলেন।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ওদিকে শিখগণ তাদের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যস্ত ছিলো। সুতরাং সৈয়্যদ আহমদ গং তাদের বিরুদ্ধে গেলে একদিকে তারা শিখদের বিরাগভাজন হলেন; অন্যদিকে যেহেতু ইংরেজরা শিখদের শক্তি খর্ব করতে উদ্গ্রীব ছিলো, সেহেতু প্রকারান্তরে সৈয়্যদ সাহেবদের ইংরেজ পক্ষপাতিত্বের পরিচয় যাওয়া যায়।
এদিকে সীমান্তের পাঠানগণ সৈয়দ সাহেব ও মৌং ইসমাঈলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে কেন বাধ্য হলেন? ‘তারীখে হাযারা’ (হাযারার ইতিকথা) নামক ইতিহাস গ্রন্থের ৫১৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাঠান মুসলমানদের মধ্যে নিয়ম ছিলো যে, তাঁরা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিবাহ দিতেন না। মেয়েরা বয়োপ্রাপ্ত হলেই বিবাহ দিতেন। এটা যেমন চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত, তেমনি সামাজিক ও ধর্মীয় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা না থাকলে শরীয়ত বিরোধীও নয়। কিন্তু সৈয়্যদ আহমদ ও মৌং ইসমাঈল দেহলভীগণ এ নিয়ম রহিত করে নির্দেশ জারী করলেন যে, তার কোন মুরীদের মেয়ে অবিবাহিত থাকলে সে তার বাহিনীর সঙ্গে থাকতে পারবে না। অথচ এটা ছিলো তার নিজস্ব ও মনগড়া মত এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত ঘোষণা। এ নির্দেশ জারী হবার পর পাঠান খান্দানের ২০জন অবিবাহিত মেয়েকে পাঞ্জাবী বাহিনীর ২০ জনের সাথে বিবাহ পড়িয়ে দেয়া হয়। দু’টি মেয়েকে স্বয়ং ইসমাঈল দেহলভী সাহেবও বিবাহ করে নিলেন। তাদের এ কঠোরতা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। তারা কখনো কখনো বিধবাদের তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য করতো। অথচ বেশীরভাগ বিধবা ওই সমাজে কোন কোন অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ্ করা পছন্দই করতো না। এতদ্সত্ত্বেও তাদেরকে জোর করে মসজিদে নিয়ে বিবাহ পড়িয়ে দেয়া হতো। [মীর্যা হায়রত কৃত. ‘হায়াতে তাইয়্যেবাহ্’ পৃ. ৩৫৫]
তখন ইয়ূসুফ জা‘ঈ (পাঠানগণ) প্রতিবাদ করে বলেছিলেন- আমরা এ বিবাহরীতি মানি না। আমরা আমাদের মেয়েগুলোকে ফেরৎ চাই; কিন্তু মৌং ইসমাঈল ও তার পীর সাহেব সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী তাদের ফেরৎ দিতে অস্বীকার করলেন। এটাও ওই যুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
তাছাড়া, সৈয়দ আহমদ সাহেব সীমান্তের পাঠানদেরকে তার আক্বীদার পরিপন্থী অর্থাৎ খাঁটি সুন্নী দেখে ‘মুনাফিক্ব’ সাব্যস্ত করতেও কুণ্ঠিত হননি, অথচ সীমান্ত ও তদানীন্তনকালীন আফগানিস্তানের মুসলমানগণ খাঁটি সুন্নী হানাফী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে স্যার সৈয়্যদের মন্তব্য সবিশেষ প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন-
‘আমার শত শত পাহাড়ী লোক দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এমন কোন পাহাড়ী পাঠান আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি, যে হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছাড়া কেউ ছিলো; কিংবা ওহাবী মতবাদের দিকে বিন্দুমাত্রও কারো ঝোঁক ছিলো।’’ [মাক্বালাতে স্যার সৈয়্যদ খণ্ড-৯, পৃ. ১৩৯]
তিনি আরো বলেন- যেহেতু সীমান্তের পাঠান জনগোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে অতি অটল ছিলো, সেহেতু তারা ওহাবীদের বিরোধীতা করে মৌলভী ইসমাঈল ও সৈয়্যদ আহমদ সাহেবকে মেরে ফেলেছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৯-৪০]
এ প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘সৈয়্যদ আহমদ শহীদ কী সহীহ্ তাসভীর’, কৃত-ওয়াহীদ আহমদ মাস‘ঊদ বদায়ূনী, ‘ইমতিয়ায-ই হক্ব’, কৃত- রাজা গোলাম মুহাম্মদ, ‘হাক্বাইক্বে তাহরীক-ই বালাকোট’, কৃত. শাহ্ হোসাইন গুরদীযী, ‘তারীখে তানাভুলিয়া’, কৃত. সৈয়্যদ মুরাদ আলী, ‘হাক্বীক্বত-ই আফসানা-ই জিহাদ’, কৃত. সৈয়্যদ নূর মুহাম্মদ ক্বাদেরী, ‘ইয্হার-ই হক্ব’, কৃত- অধ্যক্ষ আল্লামা শেখ মুহাম্মদ আব্দুল করীম সিরাজনগরী ইত্যাদিতে।
সুতরাং বালাকোট যুদ্ধ বলুন আর শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলুন কোনটাই নিছক ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিলো না, বরং প্রকারান্তরে এ দু’টিতে ইংরেজদের উপকারই হয়েছে। যার পরবর্তী অবস্থাদৃষ্টে একথা প্রতীয়মান হয়েছে। তদুপরি, এ দু’টি যুদ্ধে সৈয়্যদ আহমদের বেলায় ইংরেজদের ভূমিকা কি ছিলো তা পর্যালোচনা করলেও একটি ঐতিহাসিক সত্য বেরিয়ে আসে। তাছাড়া, সৈয়্যদ আহমদ ও ইসমাঈল দেহলভীর ইংরেজদের পক্ষে ফাত্ওয়া ও তাদের আতিথ্য গ্রহণ ইত্যাদি একথা প্রমাণ করে যে, তারা ইংরেজদের শত্র“ ছিলেন না, বরং বন্ধুই ছিলেন।
সর্বোপরি, তারা উভয়ে উপমহাদেশে ওহাবী মতবাদ আমদানী করে ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ও রূপরেখা ‘সুন্নী মতাদর্শের’ উপর চরমভাবে আঘাত হেনেছেন এবং আক্বীদা ও শরীয়তের আমলের ক্ষেত্রে নানা বিভ্রান্তিকর ফাত্ওয়া দিয়ে মুসলমানদের ঐক্যে চিরদিনের জন্য ফাটল ধরিয়ে দিয়েছেন। তারা যদি উপমহাদেশে ওহাবিয়্যাত আমদানী না করতেন, তাহলে গোটা উপমহাদেশে সুন্নী মুসলমানরা চিরদিন ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতেন। আর এখন উপমহাদেশেরই একটি জনগোষ্ঠী ‘দেওবন্দী’ ও ‘আহলে হাদীস’ ইত্যাদিতে পরিণত হয়ে ঘোর সুন্নী বিরোধী সম্প্রদায়ের রূপ নিয়ে আছে। আর ইসলামের মৌলিকত্ব রক্ষা করতে গিয়ে সুন্নী মুসলমানদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। ওই ওয়াহাবিয়্যাতের বিষ বাষ্প আমাদের বাংলাদেশের স্বচ্ছ পরিবেশকেও দূষিত করছে।
পরিশেষে, সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী ও তার অনুসারীদেরকে ‘সুন্নী’ কিংবা ‘ইংরেজ বিরোধী মুজাহিদ’ জাতীয় কিছু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা না করে এদেশের দ্বীন-মাযহাব, শরীয়ত-তরীক্বতকে তাদের থেকে রক্ষা করার মতো দ্বীনী কর্তব্য পালন করার জন্য সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
আসুন! ‘আল্হুব্বু ফিল্লাহ্, ওয়াল্ বুগ্দ্বু ফিল্লাহ’ (বন্ধুত্বও আল্লাহর ওয়াস্তে এবং বিদ্বেষ বা বিরোধীতাও আল্লাহর ওয়াস্তে) -এ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাই। সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী গং এর সাথে সুন্নী মুসলমানদের বৈরীতাও আল্লাহর ওয়াস্তে তাতে সন্দেহ নেই! আল্লাহ্ আমাদের বুঝার ও আমল করার শক্তি দিন। আমীন।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •