বদর যুদ্ধে মুসলমানদের শিক্ষণীয় বিষয়- কাযী মুহাম্মদ মুঈন উদ্দীন আশরাফী

0

‘বদর যুদ্ধ’ ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অভিযান। এর ফলে কাফিরদের নিকট ইসলামের বিজয়বার্তা ও নিশ্চিত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠেছে। বদর যুদ্ধ মুসলমানদের ঈমানী শক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত। এ যুদ্ধ মুসলমানদের ঈমানী চেতনার বড় ধরনের পরীক্ষা স্থল। কারণ, সর্ব প্রথম রমযানের রোযা রেখে প্রথম বড় ধরনের সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ। বদর যুদ্ধ ইসলাম ও কুফরের মধ্যে চূড়ান্ত পার্থক্য নির্ণয়কারী অভিযান। মহান আল্লাহ্ বদর দিবসকে ‘ইয়াউমুল ফুরকান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন পবিত্র ক্বোরআনে। পবিত্র ক্বোরআনের সূরা আনফালে বদর যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান। অন্যান্য সূরাতে সংক্ষেপে বদর যুদ্ধের আলোচনা স্থান পেয়েছে। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের প্রতি মহান আল্লাহর সরাসরি সাহায্য এসেছে। ফলে সৈন্য সংখ্যার স্বল্পতা ও অপ্রতুল সমরাস্ত্র সত্ত্বেও মুসলমানদের মহান বিজয় অর্জিত হয়েছে। মুসলমানদের সর্বদা এ বিশ্বাস দৃঢ় চিত্ত আত্মস্থ করতে হবে যে, তাদের সার্বিক বিজয় কেবল মহান আল্লাহর সাহায্যের উপরই নির্ভরশীল। যতদিন মুসলমান এ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলেছে, ততদিন সবক্ষেত্রে বিজয় মুসলমানদের কদম চুমেছে। যখন থেকে মুসলমানরা ঈমানী শক্তির পরিবর্তে বৈষয়িক শক্তিতে মূলমন্ত্র হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তখন থেকে পতনের সূচনা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে মুসলমানরা ঐ দিকে বিশ্বাস স্থাপন দূষণীয় নয় সমস্যা হলো কেবল বৈষয়িক শক্তি নির্ভরতা। আসল কথা হলো ঈমানদারকে সর্বদা নির্ভরশীল হতে হবে মহান আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সাহায্যের উপর। বদর যুদ্ধ থেকে এটাই মুসলমানদের মূল শিক্ষণীয় বিষয়।
মুসলমানদের প্রচণ্ড অসহায়ত্বের সময় এ অসাধারণ বিজয় লাভের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা‘আলার সাহায্যই যে চূড়ান্ত বিজয়, তার বর্ণনায় আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ بِبَدْرٍ وَاَنْتُمْ اَذِلَّة فَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ-
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদেরকে (হে ঈমানদারগণ) বদর যুদ্ধে সাহায্য করেছেন, যখন তোমরা ছিলে দুর্বল ও অসহায় সম্বলহীন। অতএব, তোমরা আল্লাহ্ তা‘আলাকে ভয় করো। যাতে শোকরগুযার হতে পার।

বদর পরিচিতি
মদীনা শরীফ থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত এক জনপদ। জাহেলী যুগে এ জায়গায় মেলা বসত। এখানে ‘বদর বিন হারেছ’ এর মালিকানাধীন একটি কূপ ছিল। তার নামেই এলাকার নামকরণ।

বদর যুদ্ধের কারণ
দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে হযরত আবদুল্লাহ্ বিন জাহাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে আমর ইবনুল হাদরমীর হত্যার বদলা নিতে কুরাইশ কাফিরদের প্রস্তুতি- রক্তের বদলা রক্তের মাধ্যমে নেবে। এ আমর ইবনুল হাদরমীই সর্বপ্রথম কাফির যে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে। কুরাইশ কাফিরদের একটি দলের সন্ধানে স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘যিল ওশাররা’ নামক স্থানে তাশরীফ নিয়েছিলেন। কিন্তু ঐ কাফেলা ততক্ষণে চলে যেতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে হঠাৎ মদীনা শরীফে খবর আসল যে, ঐ কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কা শরীফ দিয়ে আসছে মাল সম্পদ নিয়ে। আর ঐ কাফেলায় রয়েছে- আবু সুফিয়ান, মাখরামা ইবনে নওফল, আমর ইবনে আসসহ ত্রিশ-চল্লিশজনের নেতৃস্থায়ী ব্যক্তিবর্গ। ইতিপূর্বে কুরাইশদের ছোট ছোট দল মদীনা শরীফের আশে পাশে লুটতরাজের উদ্দেশ্যে ঘুরা-ফিরা করার খবরও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত। এমনকি কুরয বিন জাবের ফিহরী মদীনা শরীফের চারন ভূমিতে এসে অতর্কিতভাবে ডাকাতি করে গিয়েছে। অতএব, মুসলমানগণ কুরাইশ কাফিরদের এ অপকর্মের বদলা নিতে মনস্থ করল যে, সিরিয়া থেকে প্রচুর মাল সম্পদ নিয়ে আসা কাফিলার পথ রোধ করবে। যাতে শত্র“পক্ষের সিরিয়ার সাথে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়ে মুসলমানদের সাথে সমযোতায় আসে। এ উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় হিজরীর বারই রমযান তাড়াহুড়ার মধ্যে মুসলমানগণ বেরিয় পড়ে। যে যে অবস্থায় ছিল, সে অবস্থায় বেরিয়ে পড়েছিল। তেমন কোন হাতিয়ারও ছিল না এবং রশদও ছিল না। ঐ যুগেও গোয়েন্দা তৎপরতা শক্তিশালী ছিল। ফলে মুসলমানদের খবর দ্রুত মক্কা শরীফে পৌঁছে গেল তারাও মুসলমানদের উপর হামলা করার জোরালো প্রস্তুতি নিল। তাদের প্রস্তুতির খবর পেয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আনসার মুহাজিরদের এ বিষয়ে অবহিত করেন যে, এ সফরে হয়তো যুদ্ধও করতে হতে পারে। উভয় পক্ষ আন্তরিকভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আশ্বস্ত করে।
ওই দিকে আবু সুফিয়ান মুসলমানদের প্রস্তুতির খবর পেয়ে ভিন্ন পথে মক্কা শরীফের দিকে চলতে থাকে এবং মুসলমানদের নাগালের বাইরে গিয়ে মক্কা শরীফে খবর দেয় যে, আমরা নিরাপদে ফিরে আসতেছি তোমাদের এদিকে আসার প্রয়োজন নেই, বরং তোমরা ফিরে যাও। এতে মক্কার কাফির গোত্রদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ফলত বনু যোহরা ও বনু আদী গোত্র ফিরে যায়। অবশিষ্টরা আবু জাহেলের নির্দেশে বদর অভিমুখে রাওয়ানা হয়।

স্থান নির্বাচন ও পরিবর্তন
বদর প্রান্তরে প্রথম দিকে এমন এক স্থানে অবস্থান নেয়, যেখানে পানির ব্যবস্থাও ছিল না এবং জায়গা ছিল প্রচণ্ড বালুকাময়। হযরত হুবাব ইবনে মুনযের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু-এর পরামর্শে স্থান পরিবর্তন করা হয়। এবং মহান আল্লাহ্র অপার অনুগ্রহে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। ফলে বালুকাময় স্থান শক্ত হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম বৃষ্টির পানিও ধরে রাখেন।
প্রিয় নবী (দ.)’র বিনিদ্র রাত যাপন
সতের রমযান সারা রাত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করতে থাকেন। ভোরে সাহাবায়ে কেরামদের নামাযের জন্য জাগিয়ে তুলেন। অতঃপর জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য রাখেন।
প্রিয় নবী (দ.)’র ইলমে গায়েবের বহিঃপ্রকাশ
কোন যুদ্ধের চরম মুহূর্তে যদি একথা জানার সুযোগ হয় যে, আগামী কাল প্রতিপক্ষের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিশ্চিত এই এই জায়গায় মৃত্যুবরণ করবে। তাহলে এটার চেয়ে সুখবর আর কি হতে পারে। এ ধরনের অদৃশ্য জ্ঞানলব্ধ খবর একমাত্র নবীই দিতে পারেন। বদর যুদ্ধের আগের রাতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবা নিয়ে যুদ্ধের ময়দান পরিদর্শনে যান। তাঁর হাত মুবারকে ছিল লাঠি। তিনি লাঠি দিয়ে জায়গা চিহ্নিত করে বলে যাচ্ছেন যে, এ স্থানে আগামীকাল অমুখ মারা যাবে। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল এতে একচুল পরিমাণ এদিকসেদিক হয়নি।
[আবু দাঊদ শরীফ: ২য় খণ্ড]

ঈমানদার-বেঈমান মুখোমুখি
রমযানে ময়দানে ঈমানদার ও মুশরিক মুখোমুখি। এর বর্ণনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা-
قد كان لكم اية فى فئتين التقتا فئة تتائل فى سبيل الله وأخرى كافرة-
অর্থাৎ নিশ্চয় পরস্পর যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উপদেশ গ্রহণের উপাদান। এক পক্ষ আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছে আর অপর পক্ষ হলো কাফির।

ফেরেশতা অবতরণ
বদর যুদ্ধে প্রথমে এক হাজার, তারপর তিন হাজার, অতঃপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা নাযিল হবার বর্ণনা পবিত্র ক্বোরআনে বিবৃত। যুদ্ধ ক্ষেত্রে তাঁদের কর্মকাণ্ড প্রমাণিত। অনেক কাফিরের শির দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেখা গেছে। কিন্তু আক্রমনকারীকে প্রত্যক্ষ করা যায়নি।

শোহাদায়ের বদর
বদর যুদ্ধে সর্বমোট চৌদ্দজন সাহাবা শাহাদাত বরণ করেছেন। তাদের মাযার শরীফ বদর প্রান্তরে বিদ্যমান। তন্মধ্যে ছয়জন মুহাজির আর আটজন আনসার। অপর পক্ষে কাফির-মুশরিকদের সত্তরজন মারা গেছে।
বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩১৩জন, রশদ অপ্রতুল, অস্ত্র একেবারে নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহর সাহায্যে ও মুসলমানদের ঈমানী শক্তির বদৌলতে অসাধারণ বিজয় লাভ হয়। এতে একদিকে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে কাফিরদের মধ্যে হতাশা নেমে আসে।
উল্লেখ্য, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে ঈমানী দুর্বলতাই দায়ী। বৈষয়িক প্রস্তুতির পাশাপাশি ঈমানী শক্তিকে শানিত করতে পারলে মুসলমানদের পক্ষে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু ইসলাম বিরোধীদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের ফলে আজ মুসলমানদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ দুর্নাম বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ইসলামের নামে জঙ্গি তৎপরতার জন্মদাতা নিঃসন্দেহে ইসলাম বিরোধী শক্তি। কারণ, মুসলমান মাত্রই ইসলামের নির্দেশনার বাইরে কাউকে ঠুনকো অজুহাতে হত্যা করতে পারে না। তাই সকল মুসলমানকে মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ত্যাগ করে ক্বোরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত হতে হবে। তবেই মুসলমানদের হারানো গৌরব ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া যেতে পারে।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •