জানাযা ও গায়েবানা জানাযার বিধান- অধ্যাপক মুহাম্মদ মাসুম চৌধুরী

0

মৃত্যুবরণকারী মুসলমানের জানাযার নামায আদায় করা জীবিতদের উপর কর্তব্য। প্রসিদ্ধ ফিকাহ্বিদদের মতে নামাযে জানাযা ফরজে কিফায়া। জীবিতদের পক্ষে কেউ এ নামায আদায় করলে সকলের পক্ষে আদায় হয়ে যাবে। যদি কেউ আদায় না করে তবে সকলে গুনাহগার হবে।
[ফতোয়ায়ে আলমগীরী] যারা কোন মু’মিন-মুসলমানের মৃত্যুর খবর পাবে তাদের মধ্য হতে মৃত ব্যক্তির জন্য নামাযে জানাযা আদায় করবে। কোন ব্যক্তি যদি এ নামায একাও আদায় করে তবে ফরজে কিফায়া আদায় হয়ে যাবে। [ফতোয়ায়ে আলমগীরী] এ নামাযের মূলস্তম্ভ দু’টি:
চার তাকবীর উচ্চারণ করা এবং দাঁড়িয়ে নামায আদায় করা। [নূরুল ইজাহ্] পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য যে সকল শর্ত রয়েছে জানাযার নামাযের ক্ষেত্রেও এসবই প্রযোজ্য। কিন্তু এ নামাযে ওয়াক্তের শর্তটি প্রযোজ্য নয়। তবে নিষিদ্ধ সময়ে জানাযার নামায পড়া যাবে না। রুকু, সাজদা, কাওমা, জলসা ও আত্তাহিয়্যাত এ নামাযে নেই।
জানাযার নামাযে কিছু লোককে আমরা দেখতে পাই জুতার উপর দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছে। জুতার তলা যদি অপবিত্র থাকে বা না পাক হলে নামায শুদ্ধ হবে না। কারণ নামাযের জন্য স্থান পাক হওয়া শর্ত।
জানাযা নামাযের আটটি শর্ত কিতাবের মধ্যে পাওয়া যায় :
১. মৃত ব্যক্তি মুসলমান হওয়া, ২. মৃত ব্যক্তির শরীর ও কাফন পাক হওয়া, ৩. সতর ঢেকে রাখা, ৪. মৃতের লাশ মুসল্লির সম্মুখে রাখা, ৫. লাশের অর্ধেক অংশের বেশী উপস্থিত থাকা, ৬. ভূমির উপর লাশ রাখা, ৭. ইমাম বালেগ হওয়া, ৮. ইমাম লাশের কোন অংশের বরাবর দাঁড়ানো।
কোন মুসলমানকে যদি বিনা জানাযায় কবর দেওয়া হয়, তাহলে কবরের উপরই তার জানাযার নামায আদায় করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত লাশ অক্ষত থাকবে মনে করা হবে ততদিন নামায আদায় করা যাবে।
[ফতোয়া ও মাসাইল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ] লাশের সংখ্যা একাধিক হলে এক সাথে এক জমাতে নামায আদায় করা যায়। এ ক্ষেত্রে ইমাম সাহেব উত্তম ব্যক্তির (মৃতদেহ) বরাবরে দাঁড়াবে । [প্রাগুক্ত] জানাযার নামাযের একটি মাত্র ওয়াজিব। তা হলো দুই দিকে সালাম ফিরানো। চারটি সুন্নাতের কথা ফিকাহর কিতাবে উল্লেখ আছে। ১. ইমাম সাহেব মৃত ব্যক্তির বুক বরাবর দাঁড়ানো, ২. প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়া, ৩. দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরূদ শরীফ পাঠ করা, ৪. তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ করা।
জানাযার নামায পড়ার নিয়ম হলো:
নামাযের নিয়ত করে কান পর্যন্ত হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবর’ তাকবির বলে দু’হাত নাভীর নিচে বেঁধে নিুোক্ত সানা পাঠ করা- ‘‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তা‘আলা জাদ্দুকা ওয়া জাল্লা সানা-উকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা।’’
অতঃপর হাত আর না তুলে তাকবির উচ্চারণ করে দরূদে ইব্রাহীমী পাঠ করবে। এরপর আবার তাকবির উচ্চারণ করে দু‘আ মাছুরা পাঠ করা-
‘‘আল্লাহুম্মাগফির লিহায়্যেনা ওয়া মাইয়্যেতেনা ওয়া শাহেদেনা ওয়া গায়েবেনা ওয়া ছাগীরেনা ওয়া কবিরেনা ওয়া যাকারেনা ওয়া উনসানা আল্লাহুম্মা মান্ আহ্ইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহী আলাল ইসলাম ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু আলাল ঈমান।’’
দু‘আ পাঠের পর চতুর্থ তাকবির উচ্চারণের সাথে সাথে ডান দিকে অতঃপর বাম দিকে সালাম ফিরাবে। মনে রাখতে হবে একজন মানুষের একবারই জানাযার নামায পড়া যায়। এটি হানাফী মাহাবের সিদ্ধান্ত। কিন্তু মৃত ব্যক্তির অলী যদি নামাযে জানাযা আদায় না করে থাকে তবে অলীর জন্য পুনরায় জানাযা পড়ার অনুমতি রয়েছে। অলী নামায পড়ার পর আর কোন জানাযার বৈধতা নেই।
আমাদের সমাজে আরেকটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, স্ত্রী মারা গেলে তার লাশ স্বামী দেখতে পারে না। এ ধারণাটি সঠিক নয়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী তার স্ত্রীর লাশ দেখা, খাট বহন করা ও খাট কাঁধে নেওয়া জায়েয আছে। কিন্তু লাশ স্পর্শ করা নিষেধ। [র্দুরুল মুখতার] এ দিকে বর্তমানে গায়েবানা জানাযা পড়া একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। হানাফী মাযহাব মতে এই নামাযের কোন ভিত্তি নেই। হযরত ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং হযরত ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মত অনুসারে জানাযার নামায বৈধ হওয়ার জন্য মৃত ব্যক্তির লাশ ইমামের সামনে উপস্থিত থাকা পূর্বশর্ত। অনুপস্থিত মাইয়্যেতের জন্য দু‘আ করা যায় কিন্তু জানাযার নামায পড়া বৈধ নয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের কাছে দূর দূরান্তর থেকে অনেক সাহাবীর ইন্তেকালের সংবাদ আসতো। নবীজী তাঁদের জন্য শুধু দু‘আ করতেন, গায়েবানা নামায পড়তেন না। এ নামায বৈধ হলে অনেক সাহাবী এবং শহীদদের বঞ্চিত করতেন না তিনি। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও কোন গায়েবানা জানাযা হয়নি।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের নূরানী জীবদ্দশায় শুধু দুইবার গায়েবানা নামাযে জানাযা পড়েছেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। এ দু’টি ঘটনা ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই। ব্যতিক্রম ইসলামের আইন হতে পারে না। যে দুই ব্যক্তির গায়েবানা জানাযা তিনি পড়েছিলেন তাঁদের একজন হাবশার বাদশাহ্ নাজাশী, অপর জন হযরত মু‘আবিয়া ইবনে মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। এ দু’টি ঘটনার নবীজীর কাছে বিশেষভাবে অনুমতি ছিল। বিশেষ ঘটনা আমলযোগ্য নয়। তাই সাহাবায়ে কেরামও আমল করেননি।
এ দু’ব্যক্তির লাশ আল্লাহ্পাক বিশেষভাবে নবীজীর সামনেই হাজির করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন, নাজাশী বাদশাহর লাশ এবং নবীজীর মধ্যবর্তী সকল অন্তরায় তুলে দেওয়া হয়েছিল। লাশ মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সচক্ষে দেখেই জানাযার নামায পড়েছিলেন।
[ওয়াহিদী ও আস্বাবুন নুজুল] হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ সময় প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর পেছনে সাহাবীগণ কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন সকল সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম’র বিশ্বাস ছিল যে নাজাশীর লাশ তাঁর সামনেই রয়েছে। [ইবনে হিব্বান] হযরত মু’আবিয়া ইবনে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার বিষয়টিও ছিল অনুরূপ। তিনি যখন মদীনা শরীফে ইন্তেকাল করেন তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাবুক নামক স্থানে। হযরত আনাস ইব্নে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম হাজির হয়ে বললেন, ‘‘হে আল্লাহর রাসুল! মু’আবিয়া ইবনে মু’আবিয়া ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর জানাযার নামায আপনি কি পড়তে চান?’’ নবীজী বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর হযরত জিব্রাইল আলায়হিস্ সালাম নিজের পাখা প্রসারিত করেন আর তুলে ধরেন তাঁর লাশ মোবারক। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম লাশের দিকে তাকিয়ে জানাযার নামায আদায় করেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে দু’কাতার ফেরাশতাও ছিল। প্রতি কাতারে ফেরেশতাদের সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার। [তাবরানী, বায়হাকী] লাশ হাজির থাকলে জানাযা গায়েবানা হয় না এবং এ দু’টি ঘটনা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মু’জিযা ও বিশেষত্ব।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •