খারেজি -ওহাবি জঙ্গিবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ – অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ এরফান উল্লাহ

0

খারেজি -ওহাবি জঙ্গিবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ …

ইসলামই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইসলাম মানে শান্তি। এ ধর্ম শান্তি, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার ধর্ম। ফিতনা-সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি ইসলাম সমর্থন করে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন, ”ফিতনা হত্যার চেয়েও ভয়াবহ।’’ [আল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত-১৯১]
আল্লাহ্র প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেন, ‘‘শুনে রাখো! মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সাবধান আমার পরে তোমরা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মত কুফরি কাজে লিপ্ত হয়ো না।” মানুষ হত্যার বিষয়ে নিষেধ করে আল্লাহ্ বলেন,‘‘কেউ কাউকে নরহত্যার অপরাধ অথবা পৃথবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টির কারণ ব্যতীত হত্যা করলে সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো। আর কেউ কারো প্রাণ বাঁচালে সে যেন গোটা মানব জাতিকে বাঁচালো।’’ [আল কুরআন, সূরা মায়িদা, আয়াত-৩২]
ইসলামের নামে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী, ”হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: শেষ যমানায় এমন একটি গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে বয়সে নবীন, বুদ্ধিতে অপরিপক্ক ও নির্বোধ। কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালীও অতিক্রম করবে না। তাঁরা সৃষ্টির সেরা মানুষের কথাই বলবে, কিন্তু দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমন ধনুক (তীর) শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়।’’ [তিরমিযী, ফিতান, বাব ২৪]
যাঁরা কট্টরপন্থা অবলম্বনকারী সন্ত্রাসী, তাঁরা কপট ও মুনাফেকী চরিত্রের। তাঁরা নিজেদেরকে শান্তির বার্তাবাহক বানিয়ে গোপনে অশান্তি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘটিত করে। তাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘‘তাদেরকে যখন বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরাই তো শান্তি ও সংস্কারকামী।
[আল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ১১]
এই কারণে বিশ্বের সুন্নি আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ, লেখক, বুদ্ধিজীবী, পর্যটক অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রেণির সুন্নি মুসলমান এই সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ বা ফিৎনার বিরুদ্ধে স্ব স্ব অবস্থান হতে বিরোধিতা করেন।
শান্তির ধর্ম হিসাবে ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে এক আল্লাহ্ ও তাঁর অত্যন্ত প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে। তাওহীদ ও রিসালতের সমন্বয়ে ইসলামের প্রথম চার খলিফা পার্থিব ও অপার্থিব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। ইসলামের মূল ধারা সুন্নি জামা‘আত ইসলামের প্রথম চার খলিফাকে সঠিক পথের অনুসারী হিসাবে মান্য করে। ইসলামি জাহানের সুন্নি তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান গনি যুন্ নুরাইন ইবন আফ্ফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এক দল বিদ্রোহী কর্তৃক নিহত হওয়ার মাধ্যমে বিদ্রোহী মুসলিম কর্তৃক সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী একজন খলিফার শাহাদাতের মত বেদনাবিধুর দৃষ্টান্তের সৃষ্টি হয় এবং পরে এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। ইসলাম ধর্মে সুন্নি, শিয়া ও খারেজী- এই তিনটি প্রধান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতবাদের উৎপত্তি এবং পরে মুসলমানরা আরও ধর্মীয় ফিরকা বা দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা ও মদিনার জীবনে যদিও মুনাফিক ছিল কিন্তু তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিতে সফল হয় নি। সুন্নি চতুর্থ খলিফা হযরত আলি ইবন আবি তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু (৬০০খ্রি.-৬৬১ খ্রি. শাসনকাল ৬৫৬- ৬৬১খ্রি.) ইসলামি জাহানের খলিফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মুনাফিক চক্র বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এই সময়ে প্রাক ইসলামি যুগ হতে চলে আসা কুরাইশ বংশের হাশিম ও উমাইয়্যা গোত্রের দ্বন্দ্ব নতুন করে দেখা দেয়। কারণ হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন উমাইয়্যা গোত্রের এবং হযরত আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হলেন হাশিম গোত্রের। হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হত্যার বিচার বা প্রতিশোধকে কেন্দ্র করে মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিদের মধ্যে মতানৈক্য প্রকট আকার ধারণ করলে খলিফা আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে একটি গ্র“প সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ফলে মুসলিমদের মধ্যেই উষ্ট্র যুদ্ধ (৬৫৬ খ্রি.) ও সিফ্ফিনের যুদ্ধ (৬৫৭ খ্রি.) সংঘটিত হয়। এভাবে প্রখ্যাত সাহাবী ও তৎকালীন সিরিয়ার শাসক উমাইয়া নেতা হযরত আমীরে মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার (৬০৬-৬৮০ খ্রি. শাসনকাল ৬৬১-৬৮০ খ্রি.) সঙ্গে খলিফা আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মনোমালিন্য শুরু হয়, যার প্রভাব তাঁদের সন্তান হাশেমী বংশের সূর্য ইমাম হাসান ইবন আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু (৬২৫-৬৭০ খ্রি.), ইমাম হোসাইন ইবন আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু (৬২৬-৬৮০ খ্রি./৪-৬১ হি.) এবং উমাইয়া বংশের বাদশাহ্ ইয়াজিদ ইবন মুয়াবিয়া (৬৪৭-৬৮৩ খ্রি. শাসনকাল ৬৮০-৬৮৩ খ্রি.) প্রমুখের উপর পড়ে। এক পর্যায়ে উমাইয়া বংশের ইয়াজিদ বাহিনীর সঙ্গে ইমাম হোসাইন পরিবারের মধ্যে সত্য- মিথ্যার দ্বন্দ্বে কারবালার যুদ্ধ (৬৮০ খ্রি./৬১ হি.) পর্যন্ত গড়ায়। এর পর মুসলমানদের মধ্যে ফিৎনা ও ফিরকা বৃদ্ধি পেয়ে আসছে। এই ফিরকা বা মুসলিম দল-উপদলের মধ্যে ভয়ঙ্কর-বিশৃঙ্খলাকারী হিসাবে খারেজি সম্প্রদায় তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। পরবর্তীতে খারেজি উপগ্র“প বা খারেজি ভাবাপন্ন কিছু ক্ষুদ্র গ্র“প এ সম্প্রদায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এসব গ্র“পের মধ্যে সালাফি-ওহাবি বা আহলে হাদিস অন্যতম। সমকালীন ধর্মতত্ত্ববিদগণ ‘দ্যা ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক এন্ড দ্যা লেভান্ত’ (ওঝওখ-ওংষধসরপ ঝঃধঃব ড়ভ ওৎধয় ধহফ ঃযব খবাধহঃ) যার সংক্ষিপ্ত নাম আই এস, আল কায়দা (ধষ ছধবফধ) ও এরূপ দল-উপদলের বিশ্বাস ও কার্যক্রমকে খারেজিদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ঃযবড়ষড়মরধহং যধাব পড়সঢ়ধৎবফ ঃযব নবষরবভং ধহফ ধপঃরড়হং ড়ভ ওংষধসরপ ঝঃধঃব ড়ভ ওৎধয় ধহফ ঃযব খবাধহঃ, ধষ ছধবফধ ধহফ ষরশব সরহফবফ মৎড়ঁঢ়ং ঃড় ঃযব কযধধিৎরল) । তাই এই বিষয়ে আলোচনা করা সমীচীন মনে করি।
খারেজি পরিচয়
মুসলিমদের মধ্যেই প্রথম গৃহযুদ্ধ উষ্ট্র যুদ্ধ (৬৫৬ খ্রি.) সংঘটিত হওয়ার পর আপাতদৃষ্টিতে সুন্নি ৪র্থ খলিফা হযরত আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিজয় অর্জন করলেও মূল বিজয় অর্জন করেছিল ষড়যন্ত্রকারীরা। কারণ তাঁরা মুসলমানদের মধ্যে এরূপ গৃহযুদ্ধ কামনা করেছিল। পরবর্তীতে সিফ্ফিনের যুদ্ধ (৬৫৭ খ্রি.) যা হযরত আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সৈন্যদের মধ্যে ইউফ্রেতিস (ফোরাত) নদীর তীরে সিফ্ফিন নামক স্থানে সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহুর পরাজয় অনুমান করতে পেরে তাঁর এক দল সৈন্য আমর ইবনুল আসের (৫৮৫-৬৬৪ খ্রি.) পরামর্শক্রমে তাঁদের পতাকাশীর্ষে ও বর্শাগ্রে পবিত্র কুরআন শরীফ বেঁধে চীৎকার করে উঠল, ‘‘এখানে আল্লাহর কিতাব- এটি আমাদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করে দিবে ।’’ পরবর্তীতে এ মীমাংসার কারণকে শির্ক ফাত্ওয়া দিল খারেজীরা। খলিফা আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু শুরু থেকেই মুসলমানদের মধ্যে এরূপ যুদ্ধ নিয়ে অনিহা ছিল। কুরআন দেখিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করানোর আসল বিষয়টি তিনি অনুমান করেও কেবল মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট ও কুরআন শরীফের অবমাননা- এদুয়ের আশঙ্কায় যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে উভয়পক্ষের সংঘর্ষ পরিসমাপ্তির জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, তাঁরা উভয়ে মধ্যস্থতাকারী (গবফরধঃড়ৎ) নিযুক্ত করে বিরোধ নিষ্পত্তি করবেন। খলিফা আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে আবু মুসা আশ্‘আরী রাদ্বিআল্লাহু আনহু (ওফাত ৬৬২/৬৭২ খ্রি.) ও হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহুর পক্ষে আমর ইবনুল আস রাদ্বিআল্লাহু আনহু কে (৫৮৫-৬৬৪ খ্রি.) মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করা হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয় পক্ষের চারশত করে লোক নিয়ে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে মিলিত হবেন এবং বিরোধ মীমাংসা করবেন। যদি তাঁরা কোন স্থির ও অবিচল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারেন তাহলে মীমাংসার ভার নিযুক্তীয় আট শত লোকের ওপর পড়বে এবং তাঁরা প্রত্যেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। সে অনুযায়ী জানুয়ারি, ৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থান ‘দুমাতুল জন্দল’ নামক স্থানে সালিসি বৈঠক বসে। সালিসি সভা শুরু হওয়ার পূর্বে আমর ইবনুল আস সরলমনা আবু মুসাকে বুঝালেন যে, ইসলামের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য মুয়াবিয়া ও আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহুমা এ দুইজনের পরিবর্তে তৃতীয় ব্যক্তিকে খলিফা নির্বাচিত করতে হবে, যদিও খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি তাঁদের এখতিয়ার বহির্ভূত ছিল। দুই মধ্যস্থতাকারী স্থির করলেন যে, আবু মুসা আল আশ‘আরী প্রথমে হযরত আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পদচ্যুতি সর্বসমক্ষে ঘোষণা করবেন এবং পরে আমর ইবনুল আস হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ঘোষণা দেবেন। সেই মোতাবেক সহজ-সরল আবু মুসা আল আশ‘আরী আমর ইবনুল আসের কথামতো তিনি জন সমক্ষে হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহুকে খলিফার পদ হতে পদচ্যুত করেন। তারপর সভা মঞ্চে আমর ইবনুল আস বললেন, ‘‘আমি হযরত আলির পদচ্যুতি অনুমোদন করলাম এবং তাঁর পরিবর্তে মুয়াবিয়াকে খলিফা মনোনয়ন করলাম।” এ ঘোষণানুসারে সিরীয়রা আমীর মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে খলীফা স্বীকার করলেও ইরাক্বীরাসহ বাকী সৈন্যরা তা মানতে রাজী হননি। তাঁরা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে খলীফা পদে বহাল আছে বিধায় হযরত আমীর মু‘আবিয়া ও সিরীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিদ্রোহ্ দমনের পরামর্শ দেন। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিলেন; কিন্তু এদিকে এক অমূলক ধূয়া তুলে ১২,০০০ (বার হাজার) লোক সৈন্য দল ত্যাগ করে আব্দুল্লাহ ইবন ওহাবকে তাঁদের নেতা নির্বাচিত করেছেন এবং ঘোষণা করে যে, লা হুকমাহ ইল্লা লিল্লাহ বা আল্লাহর মীমাংসা ছাড়া কারো মীমাংসা নেই। তাঁরা হযরত আলিকেও উক্ত মীমাংসার জন্য রাজী হওয়ায় তারা হযরত আলির দল থেকে ‘খারিজ’ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ‘খারেজি’ অর্থ দল ত্যাগী অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম হতে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বুঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তারা দল ত্যাগ করে হারুরা নামক গ্রামে মিলিত হয়, এ গ্রামের নামানুসারে অনেকে তাদেরকে হারুরীয়া বলে। তারা আল্লাহ্র হুকুমের কথা বলে ছিলো বলে অনেকের নিকট তারা ‘মুহাক্কিমাহ্’ নামে পরিচিত। হারুরা থেকে তাঁরা আব্দুল্লাহ ইবন ওহাবের নেতৃত্বে নাহরাওয়ানে শিবির স্থাপন করে। হযরত আলি ‘খারেজি আন্দোলনের’ সংবাদ পেয়ে সৈন্যদের নিয়ে নাহরাওয়ানের দিকে অগ্রসর হয়ে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে (৬৫৯ খ্রি.) খারেজিদের পরাজিত করেন। এভাবে ৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের মধ্যে সুন্নি-খারেজি বিভক্তি প্রকাশ্যে দেখা দেয়। এরূপে খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ ও অশান্তি দেখা দিলে হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু ইসলামের স্বার্থে হযরত হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহুর সঙ্গে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হন। সন্ধি অনুযায়ী সিরিয়া ও মিশরের শাসক হিসাবে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু এবং খিলাফতের অবশিষ্ট অংশে খলিফা হিসাবে হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু শাসন করবেন। এভাবে উভয় সাহাবীর বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। ফলে মুসলামানদের গৃহযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে; কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত সফল না হওয়ায় তাঁরা নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে। বিশেষ করে বিদ্রোহী খারেজিরা উভয় সাহাবীর ওপর খুবই ক্ষুব্ধ হয়।

খারেজিদের প্রথম সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতা
ইসলামের ইতিহাসে বর্তমান সময়ের ন্যায় প্রথম জঙ্গি কর্মকাণ্ড সূচনা করে খারেজিরা। তাঁরা ইসলামের শত্র“ হিসাবে তিন জন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে এবং চিহ্নিত শত্র“দেরকে হত্যা করার গোপন ষড়যন্ত্র করে। তাঁদের চিহ্নিত শত্র“রা হলেন:
১. সুন্নি ৪র্থ খলিফা হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু।
২. মহানবীর অন্যতম সাহাবি সিরিয়া ও মিশরের সুন্নি শাসক হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু এবং
৩. ’দুমাতুল জন্দল’ সালিসির হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহুর পক্ষে নিযুক্তীয় মধ্যস্থতাকারী ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদ্বিআল্লাহু আনহুম।
খারেজি জঙ্গিরা একই দিনে ও একই সময়ে এই তিনজনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আব্দুর রহমান ইবন মুলজাম, আল হুজ্জাজ আল তামিমি /বারেক ইবন আব্দুল্লাহ এবং আমর ইবন বকর আল তামিমি -এই তিনজন খারেজি জঙ্গি হজ্বের সময় পবিত্র কাবা ঘরে উপস্থিত হয়ে প্রতিজ্ঞা করে যে, পরবর্তী ১৫ ই রমজান (৪০ হি.) ইসলামি জগতে অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তাদের চিহ্নিত শত্র“ যথাক্রমে হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু, আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস প্রমুখকে বর্তমান ইরাকের কুফা, সিরিয়ার দামেস্ক ও মিশরের ফুসতাতের মসজিদে ফজর নামাযে ইমামতি করে ফেরার পথে হত্যা করবে। প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য তারা হত্যা অভিযানে নামে। সৌভাগ্যক্রমে আমর ইবনুল আস ঐ দিন মসজিদে অনুপস্থিত ছিলেন। আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু সামান্য আহত হলেও প্রাণে রক্ষা পেলেন; কিন্তু মুসলমানদের দুর্ভাগ্যক্রমে আব্দুর রহমান ইবন মুলজামের বিষাক্ত ছুরির অব্যর্থ আঘাতে হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু গুরুতর আহত হন (২৪ জানুয়ারি, ৬৬১ খ্রি.) এবং ২৭ জানুয়ারি, ৬৬১ খ্রি. শাহাদাত বরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় খারেজিরা উমাইয়া ও আব্বাসী শাসনামলে বিভিন্নভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং বর্তমানে তাঁদের উপদল হিসাবে সালাফি-ওহাবিরা বিশ্বব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসী ও ঘৃণিত ধর্ম হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।

খারেজিদের কতিপয় ভ্রান্ত বিশ্বাস
১. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর ১ম ও ২য় খলিফাকে স্বীকৃতি দেয়। সুন্নি ৩য় ও ৪র্থ খলিফা এবং উমাইয়াগণ ইসলামি আদর্শ হতে বিচ্যুত হয়েছেন বলে মনে করেন। ২. যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোন ব্যক্তি সর্বজনীন ভোটের মাধ্যমে খলিফা নির্বাচিত হবেন, তাদের মতে কোন নারীর যোগ্যতা থাকলে তিনিও খলিফা হতে পারেন। ৩. কোন মুসলমান গুনাহ করলে তাকে ধর্মচ্যুত বা মুরতাদ বলে গণ্য করে তাকে কাফের বা বিধর্মী বলতে হবে। খারেজি উগ্রগ্র“পের মতে এরূপ ব্যক্তি পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারে না এবং তার পুত্র- কন্যাসহ তাকে হত্যা করতে হবে। ৫. খারেজি সম্প্রদায়ের অনেকে মনে করে যে, যে সমস্ত মুসলমান নিয়মিত নামাজ রোজা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে না তাদেরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করতে হবে । (৬) খারেজিরা ভিন্ন মতালম্বী অ-খারেজি বা সুন্নি- শিয়াকে নির্বিশেষে কাফের মনে করে এবং অ-খারেজিদের হত্যা করা সওয়াবের কাজ মনে করে ইত্যাদি।
খারেজিরা যুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন গ্র“পে বা নামে ইসলাম ধর্ম বর্হিভূত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁদের অপতৎপরতা চালিয়ে আসছেন। তাঁদের বিভিন্ন উপদল বা বিবর্তিত গ্র“পের মধ্যে আজরাকী, ইবাদি, নাজদাই, জাহেরি, ইয়াজেদি, বর্তমান সময়ে আহলে হাদীস বা সালাফি-ওহাবি। পরবর্তীতে খারেজি মতবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ইবন তাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.) ও মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদী (১৭০৩-১৭৯২ খ্রি.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। মূলত তাঁদের কারণেই এখনো খারেজি ধারা টিকে আছে। আহলে হাদীস বা সালাফি হচ্ছে সুন্নি চার মাযহাব বিকাশের সময় খারেজি ভাবাপন্ন একগ্র“প মুসলিম যাঁরা হাদীস বা সুন্নাহর অনুসরণকারী হিসাবে পরিচয় দিত ও মাযহাবের ইজমা-কিয়াস বা অন্যান্য অপ্রধান ইসলামি আইনের উৎসসমূহকে স্বীকৃতি দিত না। তাঁরা বিশেষ কোন ইমামের তাকলিদ বা অনুসরণ করার বিরোধিতা করে। তাঁদের অন্যতম ইমাম ইবন তাইমিয়ার (১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.) যুগ শেষ হলে মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদীর (১৭০৩-১৭৯২ খ্রি.) যুগ শুরু হলে তাঁর নামানুসারে তাঁরা ওহাবি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। তাই বর্তমানে আহলে হাদীস গ্র“প ও ওহাবিদের মধ্যে পার্থক্য করা হয় না। তাঁদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্রটি । সুন্নি ও শিয়াদের সঙ্গে খারেজি ওহাবিদের সম্পর্ক যেমন তিক্ত, তেমনি খারেজীদের অনেক সময় অমুসলিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক দেখা যায়। সুন্নি, শিয়া ও খারেজি-ওহাবিদের মধ্যে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে মতবিরোধ বিদ্যমান যেমন-মিলাদ শরীফ উদযাপন। সুন্নিরা রবিউল আওয়াল মাসে বিশেষত ১২ই রবিউল আওয়াল ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে উদযাপন করেন, শিয়ারা ১৭ই রবিউল আওয়াল মিলাদ উদযাপন করে। কারণ এ দিনটি ৬ষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিক রাদ্বিআল্লাহু আনহুর জন্মদিন (নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইমাম জাফর সাদিক রাদ্বিআল্লাহু আনহুর জন্মদিন একসঙ্গে উদযাপন করে।) আর ওহাবিরা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিলাদ বা জন্মদিন উদযাপন করে না, তাঁরা এরূপ উদ্যাপন করাকে বিদ‘আত বলে বিশ্বাস করে । এ বিশ্বাসের কারণেই ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের করাচি শহরে জামাআতে আহলে সুন্নাত বা সুন্নি জামাআতের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ঈদে মিলাদুন্নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানে ওহাবি জঙ্গিরা হামলা করে এবং ও প্রায় ৫৭ জন সুন্নি মুসলমানকে হত্যা করে । ভারতবর্ষে মিলাদ-ক্বিয়াম নিয়ে ওস্তাদ শাগরেদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এখনও একদল মিলাদ-কিয়ামের পক্ষে আরেক দল মিলাদ-কিয়ামের বিপক্ষে অবস্থান করছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সুন্নি আলেম ও পীর হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ্ মোহাজেরে মক্কী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (ভারত ১২৩১হি.- মক্কা ১৩১৮ হি./১৮১৭-১৮৯৯ খ্রি.) তাঁর সনদ এবং সিলসিলা (তরিকতের শায়খ পরম্পরা) দ্বারা ভারতের দেওবন্দে অনেক আলেম ও পীর রয়েছেন। তাঁর দুইজন নামকরা দেওবন্দি শাগরেদ হলেন যথাক্রমে (১) মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গুহি (১৮২৯-১৯০৫ খ্রি.) ও (২) মাওলানা আশরাফ আলি থানবি (১৮৬৩-১৯৪৩ খ্রি.)। এই দুইজন দেওবন্দি শাগরেদ তাদের পীরের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতেন। এই মতানৈক্যের মধ্যে মিলাদ-কিয়াম অন্যতম। পীর ও ওস্তাদ মিলাদ-কিয়াম করতেন এবং এই নফল কাজটিকে পুণ্যের কাজ বলে প্রচার করতেন। অন্যদিকে এই শাগরেদরা মিলাদ-কিয়ামকে শিরক-বিদআত বলে মত প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ ’ফায়সালায়ে হাফতে মাছায়েল’ (ঋধরংষধ ঐধভঃ গধংষধ; ধ নড়ড়শ ড়হ ংবাবহ পড়হঃৎড়াবৎংরধষ রংংঁবং) বা সাত মাসায়েলের সমাধান নামক পুস্তিকা লিখে মিলাদ-কিয়াম ইত্যাদি শরীয়তসম্মত আমল বলে প্রচার করলেও এই শাগরেদরা তা মেনে নিতে পারেন নি। অথচ তারা চিশতিয়া তরিকার অনুসারী হিসাবে নিজের পীরের নামে উপশাখা সাবেরি ইমদাদি তরিকার পীর বা তরিকতের খেলাফত প্রাপ্ত দাবী করেন এবং নিজেদের হক্কানিয়াত বা সত্যের পথের পথিক হিসাবে তাঁদের পীর ও মুর্শিদ হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ্ মোহাজেরে মক্কী চিশতি, নক্সবন্দি, সোহরাওয়ার্দী আল কাদেরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পরিচয় দিয়ে থাকেন অথচ তাদের এ দ্বিমুখী ভূমিকা শরীয়ত ও তরিকতের শিক্ষার পরিপন্থী ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ তাদের এরূপ নীতি দ্বারা তারা বুঝাতে চায় যে, তারা সুন্নি বা হকপন্থী আর তাঁদের পীর শিরকী- বিদআতি ।

ওহাবি পরিচয়
ওহাবি হচ্ছে মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব (১৭০৩-১৭৯২ খ্রি.) ওরফে শায়খ নজদী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হতে তাঁদের বিরোধিরা তাদেরকে এ নামে অভিহিত করেন। ব্রিটিশ কমনওয়েলথ মন্ত্রণালয়ে নিয়োজিত হ্যামফ্রে নামক এক গোয়েন্দার ডায়রি হতে জানা যায় যে, শায়খ নজদী ব্রিটিশ কর্তৃক মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে পৃথক একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে, ওহাবি আন্দোলনের ইতিহাস ও শায়খ নজদীর জীবনী পর্যালোচনাপূর্বক বলা যায় যে, মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাবের নেতৃত্বে যে ওহাবি মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় তার মৌলিক নীতিগুলি ইমাম ইবন তাইমিয়ার (১২৬৩-১৩২৮ খ্রি./৬৬১-৭২৮ হিজরি) শিক্ষা থেকেই গৃহীত হয়েছে এ বিষয়ে কোনও মতবিরোধ নেই। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা যিয়ারত করা বিদআত (বিদআতে সাইয়্যাহ্)- ফতোয়া দানকারী বা ঘোষণাকারী হিসাবে পরিচিত হলেন ওহাবিদের আদি গুরু ইবন তাইমিয়া। তাঁর পুরো নাম তকি উদ্দিন আবুল আব্বাস আহমদ ইবন আব্দুল হালিম ইবন আব্দুস সালাম ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আল কিজর ইবন মুহাম্মদ ইবন আল কিজর ইবন আলী ইবন আব্দুল্লাহ ইবন তাইমিয়া আল হারিয়ানি (জন্ম- হারান, তুরস্ক ১২৬৩ খ্রি.- মৃত্যু দামেস্ক, সিরিয়া ১৩২৮ খ্রি./৬৬১-৭২৮ হিজরি), যিনি সুন্নি হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী দাবীদার হলেও মুজতাহিদ ইমামদের মাযহাব অনুসরণ (তাকলিদের) এবং সুফি মতবাদ বিশেষত গাউছুস সাকালাইন বড়পীর গাউছুল আজম সৈয়দ মুহি উদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী রাদ্বিআল্লাহু আনহু (৪৭০-৫৬১ হি./১০৭৭-১১৬৬ খ্রি.), রেফায়ী তরিকার ইমাম সৈয়দ আহমদ কবীর আর-রেফায়ী আশ শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (ইরাক ১১১৮-১১৮২ খ্রি.), শায়খে আকবর আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মদ ইবন আলী ইবন মুহাম্মদ ইবন আল আরাবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (জন্ম- মুরসিয়া, স্পেন, ১১৬৫ খ্রি./৫৬০হি.- ওফাত দামেস্ক, সিরিয়া ১২৪০ খ্রি.) প্রমুখের সমালোচনা করেন এবং বিভিন্ন সময়ে ও বিষয়ে সুন্নি মতাদর্শের বিরোধিতা করেন। তৎকালীন সুন্নি আলেমগণ ইবন তাইমিয়ার বাতিল মতবাদের বিরোধিতা করেন এবং তাঁর ভ্রান্ত মতবাদের মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হন। ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে (৭২৬ হি.) ইমাম ইবন তাইমিয়া নবী বিদ্বেষী বিদআতী ফতোয়া দিলে তাঁকে এ অপরাধে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে (৭২৮ হি.) নবী বিদ্বেষ নিয়েই ইবনে তাইমিয়া কারাগারে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। [“ওনহ ঞধুসরুধয ধিং লধরষবফ রহ ১৩২৬ ঁহঃরষ যরং ফবধঃয ঃড়ি ুবধৎং ষধঃবৎ ভড়ৎ ফবপষধৎরহম ঃযধঃ ড়হব যিড় ঃৎধাবষং ঃড় ারংরঃ ঃযব চৎড়ঢ়যবঃ’ং মৎধাব পড়সসরঃং রহহড়াধঃরড়হ (নরফধয)”] . এরূপ নবী বিদ্বেষী বিদআতী ফতোয়া দেওয়ার কারণে সুন্নিরা ইবনে তাইমিয়াকে হকপন্থী বলে স্বীকার করেন না বরং তাঁরা তাঁকে সালাফি-ওহাবিদের ইমাম বা গুরু বলে থাকেন। বর্তমানে সালাফি-ওহাবি বা আহলে হাদিস গ্র“পও ইবনে তাইমিয়াকে তাঁদের ইমাম বা গুরু বলে প্রচার করে থাকেন।
নবুুয়ত, বেলায়ত সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার অভিমত হল, ‘‘একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ্-ই আমাদের প্রার্থনায় ধ্যানযোগ্য, কোনও পয়গম্বর, পীর, সূফী বা ধর্মনেতার কাছে প্রার্থনা জানানো ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। এমন কি কেবলমাত্র দর্শনাভিলাষে বিশ্বনবীর মাযার শরীফে যাওয়াও তিনি অন্যায় কার্য (মা’সিয়া) বলে ফতোয়া দেন ।” বহুক্ষেত্রে তিনি প্রথিতযশা মুসলিম বিধান দাতাদের বিরুদ্ধে মত পোষণ করতেন। তার মতে, ’ইজমার বিরুদ্ধ মতপোষণ করা অধর্ম নয়, নাস্তিকতাও নয়’। তকলিদকে অস্বীকার করেই ইবন তাইমিয়া ক্ষান্ত হননি, সর্বজননন্দিত বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির তথাকথিত ভুল ভ্রান্তির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি তকলিদের তথাকথিত অসারতা প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন: ‘উমর বিন খাত্তাব বহু ভুল করেছিলেন। আলী বিন আবি তালিব জীবনে তিনশ ভুল করেছিলেন। (না‘ঊযুবিল্লাহ্) ইবন তাইমিয়া বহু সর্বজনমান্য সূফি বিশেষত আল গাযালী, মহীউদ্দীন ইবনুল আরাবী ও উমর আল ফরীদের তীব্র সমালোচনা করেন ।’ ইবন তাইমিয়ার মত ছিলো যে, কুরআনের কোনও উক্তি সম্বন্ধে ‘কেন, কিভাবে’ প্রভৃতি তর্কমূলক প্রশ্ন করা চলবে না। কুরআনের যা উক্তি তার সহজ-সরল অর্থ গ্রহণ করতে হবে, কোনও রূপক বা অলংকারের অবতারণা করে তার সহজ মর্মকে বিকৃত করা ধর্ম বিরুদ্ধ। এই মতানুযায়ী তিনি কুরআন ও সুন্নাহয় উক্ত আল্লাহ্র সিফাত বা গুণাবলী সম্বন্ধে যে আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করতেন, তার দরুন আল্লাহ্ মানবসুলভ আকৃতি বিশিষ্ট এই মতবাদের একজন দৃঢ় বিশ্বাসী (ধহঃযৎড়ঢ়ড়সড়ৎঢ়যরংঃ) হিসাবে তিনি আখ্যায়িত হয়েছেন। ইবনে তাইমিয়া তার এসব মত এত দুঃসাহসের প্রকাশ করতেন যে, পরিব্রাজক ইবনে বতুতার ভাষ্য মতে তিনি একদিন দামেস্কের জামে-মসজিদ থেকে ঘোষণা করেছিলেন: আল্লাহ্ আসমান হতে যমীনে নামেন। ঠিক যেভাবে আমি নেমে যাচ্ছি এবং সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের সিঁিড় বেয়ে তিনি নিচে নেমে গিয়েছিলেন ।
জাজিরাতুল আরবের নজদ, হেজায ইত্যাদি অঞ্চল নিয়ে তথাকথিত তাওহীদ/একত্ববাদের ভিত্তিতে ওহাবি মতাদর্শিক একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সালাফি নেতা বা ওহাবি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব ওরফে শায়খ নজদী এবং দিরাইয়ার রাজা বা শাসক মুহাম্মদ বিন সৌদ (পিতা- সৌদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুকরিন) এক মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। রাজনৈতিকভাবে দিরাইয়ার রাজা বা শাসক মুহাম্মদ বিন সৌদ এবং ধর্মীয়ভাবে ইমাম মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব- এই দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে (১১৫৭ হি.) দিরাইয়া আমিরাত (ঞযব ঊসরৎধঃব ড়ভ উরৎরুধয) বা প্রথম সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক কারণে মুহাম্মদ বিন সৌদকেই দিরাইয়া আমিরাত (ঞযব ঊসরৎধঃব ড়ভ উরৎরুধয) বা প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, সূফি মতবাদীদের সমাধিসৌধ (মাযার), ওহাবী মতানুসারে সকল বিদ‘আতি কর্মকাণ্ড। যেমন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, তাঁর বংশধরগণের ও তাঁর সাহাবীগণের এবং সূফি মতবাদী ওলীগণের মাযার, স্মৃতিচিহ্ন, স্মৃতিবিজড়িত স্থান, গাছ, পাথর ইত্যাদি যিয়ারত (পরিদর্শন) ইত্যাদি (ওহাবী মতানুসারে শিরক-বিদআতি কর্মসমূহ) নির্মূল করার জন্য একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাঁদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ধর্মীয় এ মতবাদের সম্পর্ক এখনও বিদ্যমান রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য উভয়ে যে শপথ করেছিলেন তা আরো সুদৃঢ় ও বাস্তবায়ন করার জন্য উভয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থায়ী করতে মুহাম্মদ বিন সৌদের পুত্র ও স্থলাভিষিক্ত উত্তরাধিকারী আব্দুল আজিজ বিন মুহাম্মদ বিন সৌদের সঙ্গে শায়খ মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাবের কন্যার বিয়ে দেওয়া হয়, যে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে সৌদি রাজপরিবার ও আল আস শায়খ পরিবার- এ দুই পরিবারের সুসম্পর্ক শতাব্দী পার হয়ে এখনও বিদ্যমান। নজদ অঞ্চলের দিরাইয়া ভিত্তিক ওহাবি শাসকগণ প্রতিবেশী কুয়েত, ওমান ইত্যাদি অঞ্চলে তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সৌদি রাষ্ট্র দিরাইয়া আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা ও সৌদি রাজপরিবারের প্রধান ব্যক্তি মুহাম্মদ বিন সৌদ (শাসনকাল ১৭৪৪-১৭৬৫ খ্রি.) ইন্তেকাল করলে তাঁর পুত্র আব্দুল আজিজ বিন মুহাম্মদ (শাসনকাল ১৭৬৫-১৮০৩ খ্রি.) যিনি মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাবের জামাতা, ওহাবি সভাসদ কর্তৃক শাসক নিযুক্ত হন।

ওহাবিদের প্রথম সন্ত্রাসী তৎপরতা
ইসলামের ইতিহাসে বর্তমান সময়ের ন্যায় প্রথম জঙ্গি কর্মকাণ্ড সূচনা করেন খারেজিরা। ইসলামি জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইসলামের শত্র“ হিসাবে চিহ্নিত করে যথাক্রমে হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহু, আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস প্রমুখকে তাঁরা হত্যা করার গোপন ষড়যন্ত্র করে এবং হযরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহুকে হত্যা করে। অনুরূপ খারেজিদের পরবর্তী গ্র“প ওহাবিরা তথাকথিত র্শিক-বিদআত নির্মূলের অজুহাতে আল্লাহ্র প্রিয়বান্দাদের সান্নিধ্য হতে সাধারণ মুসলমানদেরকে দূরে সরানোর হীন মানসে নি¤েœাক্ত তিনটি মাযার শরীফকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করে:
১. ইসলামের ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (শাসনকাল ৬৫৬-৬৬১ খ্রি.) রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাযার (বর্তমান ইরাকের নাজাফ)
২. ইমাম হোসাইন ইবন আলী (০৪-৬১ হি./৬২৬-৬৮০ খ্রি.) রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাযার (বর্তমান ইরাকের কারবালা)। হযরত আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহুর মাযার এবং ইমাম হোসাইন রাদ্বিআল্লাহু আনহুর মাযার- এ দুটি মাযার ওহাবিরা ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে (১২১৬ হি.) ধ্বংস করে।
ঙহষরহব (ধাধরষধনষব) যঃঃঢ়://বহ.রিশরঢ়বফরধ.ড়ৎম/রিশর/
অনফঁষ অুরু ওনহ গঁযধসসধফ ওনহ ঝধঁফ
৩. হযরত যায়েদ ইবন খাত্তাব রাদ্বিআল্লাহু আনহুর মাযার (রিয়াদের উত্তরে জাবীলা, সৌদিআরব)। যায়েদ ইবন খাত্তাব রাদ্বিআল্লাহু আনহু হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও ইসলামের ২য় খলিফা হযরত উমর ইবন খাত্তাব রাদ্বিআল্লাহু আনহুর বড় ভাই। হযরত যায়েদ ইবন খাত্তাব রাদ্বিআল্লাহু আনহুর গম্বুজ বিশিষ্ট মাযার শরীফ আধুনিক রিয়াদের উত্তরে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। মাযারটিকে মূর্তিপূজার মূর্তির সঙ্গে তুলনা করে ওহাবি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদি (১৭০৩-১৭৯২ খ্রি.) মাটির সঙ্গে সমান করে মিশিয়ে দেয়*।
ঙহষরহব (ধাধরষধনষব) যঃঃঢ়://বহ.রিশরঢ়বফরধ.ড়ৎম/রিশর/ তধুফ রনহ ধষ কযধঃঃধন, *ড. মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, শায়খুল হাদীস মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (প্রথম প্রকাশ জানুয়ারী, ২০০২ ইং), প্রকাশক-ড. মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, বিনোদপুর বাজার, রাজশাহী-৬২০৬, বাংলাদেশ (পৃ. ১০২)।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হিসাবে দুই ভাই যথাক্রমে যায়েদ ইবন খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর ইবন খাত্তাব রাদ্বিআল্লাহু আনহু হাদিস বর্ণনা করার সৌভাগ্যও অর্জন করেন।
[ড. মাহমূদ আত্-তাহ্হান, হাদীসের পরিভাষা (তাইসীরু মুসতালাহ্ আল-হাদীস), বঙ্গানুবাদক- ড. মুহাম্মদ জামালউদ্দিন, অক্টোবর, ২০১০, বঙ্গানুবাদ প্রকাশনায়- ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগরগাঁও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭, বাংলাদেশ (পৃ. ১৯২)]
এ তিনটি মাযার ধ্বংস করার মাধ্যমে ওহাবিরা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মাযার ধ্বংস করা শুরু করে, যা যুগে যুগে দেশে দেশে ওহাবিরা চালু রাখতে সচেষ্ট হয়েছে। ওহাবিরা পবিত্র শহরদ্বয় মক্কা ও মদিনা দখল, সুন্নি মুসলমানদের গণহারে হত্যা ও মসজিদে নববীতে ভাংচুর করলে সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় সন্ত্রাসী দল (বর্তমান সময়ের জঙ্গি) হিসেবে চি‎িহ্নত হয়েছে। [চলবে]

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •