খলিফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু- সৈয়দ মৈাহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী

0

চারিত্রিক মাধুর্য, ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা, জ্ঞানের গভীরতা, আদর্শিক একনিষ্ঠতা, নীতি-জ্ঞানে পরিপক্বতা, কর্তব্য নিষ্ঠা, ত্যাগের মহিমা আর নিঃস্বার্থ প্রজা পালনে পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব ব্যক্তিত্ব সুখ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁর নামটি উচ্চারণ করতে হয় তিনি হলেন খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম খলিফা, খলিফাতুর রাসুল হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব ইসলাম জগতে এক নজিরবিহীন ব্যক্তিত্ব।

বংশ ও জন্ম
আরবের ঐতিহ্যবাহী কোরাইশ বংশে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, আল্লাহর সর্বশেষ নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহন করেন। এ বংশেরই একটি শাখার নাম বনু তাইম। এই বনু তাইম বংশেই ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জন্মগ্রহণ করেন। কুরাইশ বংশের উপর দিকে ষষ্ঠ পুরুষ ‘মুররা’-এ গিয়ে রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের দু’বছরের কিছু বেশী সময় পর ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং অনুরূপ সময়ের ব্যবধানে তাঁরা উভয়ে ইন্তেকাল করেন। তাই মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়সের সমান।

নাম ও উপাধি
তাঁর নাম আবদুল্লাহ ও ডাক নাম আবু বকর। সিদ্দীক ও আতিক হচ্ছে তাঁর উপাধি। মিরাজের ঘটনাকে সর্বপ্রথম মনেপ্রাণে এবং নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পিতা।
পিতার নাম ওসমান, কুনিয়াত আবু কুহাফা, তিনি মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র খেদমতে হাজির হয়ে ইসলামের ঘোষণা দেন। হিজরী ১৪ সনে একশ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। শেষ বয়সে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। মাতার নাম সালমা বিনতে সাখ্র এবং কুনিয়াত উম্মুল খায়ের। তিনি স্বামীর বহু পূর্বে মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার ‘দারুল আরকামে’ ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। স্বামীর মত তিনিও দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। প্রায় ৯০ বছর বয়সে পুত্রকে খেলাফতের পদে অধিষ্ঠিত রেখে তিনি ইন্তেকাল করেন।

শৈশবকাল
ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ দলপতির একমাত্র পুত্রসন্তান হিসেবে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কৈশোর ও শৈশব কেটেছে পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদাপূর্ণভাবে। বিলাসিতার মধ্যে প্রতিপালিত হলেও হজরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জীবনে জাহেলি যুগের নীতিহীনতা ও বর্বরতার কোনো স্পর্শ লাগেনি। শৈশব থেকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি কোনোদিন শিরক করেননি এবং মূর্তির জন্য অর্চনা দেননি ও মূর্তির সামনে মাথা নত করেননি। তিনি ছিলেন হানিফ ঘরানার প্রথম সারির ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও কখনো শরাব পান করেননি।

গুণাবলী
সত্যভাষণ, সদাচার, বিণয়-ন¤্রতা, দয়া-দাক্ষিণ্য, মায়া-মমতা প্রভৃতি গুণে তিনিও গুণান্বিত ছিলেন। এছাড়া তিনি বহুবিধ যোগ্যতারও অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন তৎকাালীন কুরাইশ বংশের মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, উঁচু শ্রেণীর বক্তা ও সাহিত্যিক। আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের পশু চরিত্রসম্পন্ন মানুষের মাঝে তিনি এত বেশি বিশ্বাসী ও ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন যে শত্রু মিত্র সকলেই তাঁকে নিজেদের হৈতেষী ও আপনজন মনে করতেন। তিনি ছিলেন সম্মানীত কুরাইশদের অন্যতম। জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, বিচক্ষনতা ও সচ্চরিত্রতার জন্য আপামর মক্কাবাসীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, দানশীল ও চরিত্রবান। জাহেলী যুগেও কখনো শরাব পান করেননি।

ইসলাম গ্রহণ
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রেসালাতের দাওয়াতের দ্বিতীয় দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই হলেন বয়স্ক ও পুরুষদের মধ্যে এবং কুরাইশ বংশের ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সর্বপ্রথম আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন, পুরুষদের মধ্যে তিনিই প্রথম মুসলমান। তিনি শুধু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেনি বরং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ইসলাম প্রচারেও আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও প্রচেষ্টায় তৎকালীন কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক ওসমান, যুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা রদিয়াল্লাহু আনহুম’র মত ব্যক্তিসহ আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি এ দিক দিয়েও সৌভাগ্যবান যে তাঁর মা-বাবা দুজনই ইসলাম কবুল করেছিলেন এবং পরিবারের সবাই ছিলেন মুসলমান।
কুরাইশদের ধনবান ও সম্মানী ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম প্রচারে রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সঙ্গ দেন, তাঁকে সাহস দেন এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর নবুয়তের প্রতি ঈমান আনেন। এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : ” مَا دَعَوْتُ أَحَدًا إِلَى الإِسْلامِ إِلا كَانَتْ عَنْهُ كَبْوَةٌ وَتَرَدُّدٌ وَنَظَرٌ إِلا أَبَا بَكْرٍ مَا عَتَّمَ مِنْهُ حِينَ ذَكَرْتُهُ وَمَا تَرَدَّدَ فِيهِ ”
“আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া সবার মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব লক্ষ করেছি।”
হযরত আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু প্রকাশ্যভাবে ইসলাম প্রচারের জন্য কুরাইশদের দ্বারা অসংখ্যবার নির্যাতিত হয়েছেন। তবুও তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য ত্যাগ করেন নি। শত অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাশে থেকে তাকে ইসলাম প্রচারে সাহস-উৎসাহ জুগিয়েছেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। তিনি সব সময়ই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে মক্কা থেকে মদীনা হিজরতের সময় আল্লাহর রাসুল একমাত্র সহযাত্রী ও সঙ্গী হিসাবে তাঁকেই বেছে নিয়েছিলেন। তিনিই হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একমাত্র সাহাবী, যিনি তাঁর সাথে সেই সফরে ‘সাওর’ গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। হিজরতের পর সকল অভিযানেই তিনি রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অংশগ্রহণ করেন।
শৈশব থেকে আবু বকরের সাথে রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বন্ধুত্ব ছিল। তিনি রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকাংশ বাণিজ্যে সফরসঙ্গী ছিলেন।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়স প্রায় আঠার আর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে; বিশ্রামের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নিচে বসেন। আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। এক খ্রিস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথা-বার্তা হয়। আলাপের মাঝখানে পাদ্রী জিজ্ঞেস করে ওখানে গাছের নিচে কে? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদিল্লাহ। পাদ্রী বলে উঠল, এ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেঁথে যায়। তখন থেকেই তার অন্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবী হওয়া সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় হতে থাকে। ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম ‘বুহাইরা’ বা’ নাসতুরা’ বলে উল্লেখিত হয়েছে।

ইসলামের জন্য সকল সম্পদ ব্যয়
রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নবুওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন, আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তখন ছিল চল্লিশ হাজার দিরহাম। ইসলামের জন্য তিনি তাঁর সকল সম্পদ ওয়াকফ করে দেন। কুরাইশদের যে সব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হচ্ছিল, এ অর্থ দ্বারা তিনি সেই সব দাস-দাসী খরিদ করে আযাদ করেন। তেরো বছর পর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে তিনি মদীনায় হিজরত করেন তাঁর কাছে এ অর্থের মাত্র আড়াই হাজার দেরহাম অবশিষ্ট ছিল। অল্পদিনের মধ্যে অবশিষ্ট দিরহামও ইসলামের জন্য ব্যয়িত হয়। বিলাল, খাব্বাব, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব,আবু ফুকাইহ প্রমুখ দাস-দাসী তাঁরই অর্থের বিনিময়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন।
তাছাড়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশায়, সহায়-সম্বলহীনতায় এবং দুস্থদের সাহায্যার্থে ছিলেন আত্মনিবেদিত।
তাবুকের যুদ্ধে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হলে যেখানে অন্য সাহাবিরা মোটা অঙ্ক দান করলেন, সেখানে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে দান করার উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। তাই তিনি ব্যাকুল চিত্তে ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় আসবাব, কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে চুলার ছাই পর্যন্ত (আহত যোদ্ধাদের ক্ষতস্থানে ছাই উপকারী) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ ত্যাগ দেখে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন,” مَا أَبْقَيْتَ لأَهْلِكَ ؟ ” قَالَ : أَبْقَيْتُ لَهُمُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ، ” . ‘তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ?’ তদুত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, “আমার উম্মতের মাঝে আবু বকরই বেশি দয়ালু।’’

সিদ্দিক উপাধি
রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে মিরাজের কথা অনেকেই যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দোল খাচ্ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। লোকেরা আবু বকরের কাছে গিয়ে বললো, আবু বকর তোমার বন্ধুকে তুমি বিশ্বাস কর? সে বলেছে, সে নাকি গতরাতে বাইতুল মোকাদ্দসে গিয়েছে, সেখানে নামায পড়েছে, অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে। আবু বকর বললেন, তোমরা কি তাঁকে বিশ্বাস কর? তারা বলল, হ্যাঁ, ঐতো মসজিদে বসে লোকজনকে এ কথাই বলেছে। আবু বকর বললেন, আল্লাহর কসম, তিনি যদি এ কথাই বলে থাকেন তাহলে সত্য কথাই বলেছেন। এতে অবাক হাওয়ার কি দেখলে? তিনি তো আমাকে বলে থাকেন,তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওহী আসে। আকাশ থেকে ওহী আসে মাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে। তাঁর সে কথাও আমি বিশ্বাস করি। তোমরা যে ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছো এটা তার চেয়েও বিস্ময়কর। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে হাজির হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী, আপনি কি জনগণকে বলেছেন যে, আপনি গত রাতে বাইতুল মোকাদ্দাস ভ্রমণ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবু বকর বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেল, হে আবু বকর, তুমি সিদ্দিক। এভাবে আবু বকর ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভুষিত হন।
ইবন ইসহাক এর মতে, এই অবিচল বিশ্বাসের দরুনই তিনি “আস-সিদ্দিক” উপাধি প্রাপ্ত হন।

হিজরত
তার জীবনের চরম গৌরবের দিন আসে যখন হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করার সময় তাঁকে স্বীয় সঙ্গী হিসেবে মনোনীত করেন ।
ইবনে ইসহাক বলেন “আবু বকর রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলে রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলতেন, তুমি তাড়াহুড়া করোনা, আল্লাহ হয়তো তোমাকে একজন সহযাত্রী হিসেবে জুটিয়ে দেবেন। আবু বকর একথা শুনে ভাবতেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো নিজের কথাই বলেছেন। তাই তিনি তখন থেকেই দুটো উট কিনে অত্যন্ত যতœ সহকারে পুষতে থাকেন, এই আশায় যে, হিজরতের সময় হয়তো কাজে লাগতে পারে।
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনে অন্তত একবার আবু বকরের বাড়িতে আসতেন। যেদিন হিজরতের অনুমতি পেলেন সেদিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে আসলেন, এমন সময় কখনো তিনি আসতেন না। তাঁকে দেখামাত্র আবু বকর বলে উঠলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। তা না হলে এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসতেন না। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলে আবু বকর খাটের একধারে সরে বসলেন। আবু বকরের বাড়িতে তখন আমি ও আমার বোন আসমা ছাড়া আর কেউ ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার এখানে অন্য যারা আছে, তাদেরকে আমার কাছ হতে দুরে সরিয়ে দাও। আবু বকর বললেন: হে আল্লাহর রাসুল আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ আমাকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন আমিও কি সঙ্গে যেতে পারব? রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ যেতে পারবে। আয়েশা বলেন, সেদিনের আগে আমি জানতাম না যে, মানুষ আনন্দের আতিশয্যেও এত কাঁদতে পারে। আমি আবু বকরকে সেদিন কাঁদতে দেখেছি। অতঃপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই দেখুন আমি এই উট দুটো এ কাজের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি।
রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের সেই কঠিন মুহূর্তে আবু বকরের কোরবানী, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও বন্ধুত্বের কথা ইতিহাসে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর সাহচর্যের কথা তো পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। কোরাআনে আবু বকর সিদ্দীককে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘ছহেব’ বা সাথী শব্দে ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা আল-কুরআনে “দুই জনের মধ্যে দ্বিতীয়” (সুরা ৯: আয়াত৪০) আখ্যায় তার নাম অমর করে এই আত্মত্যাগী মহান ভক্তকে পুরস্কৃত করেন। মক্বী ও মাদানী জীবনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রদ্ধাভাজন বন্ধু ও ইসলামের পরম খেদমতকারী ছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ।

বুযুর্গী ও ফযিলত
মহান আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফ-এ ইরশাদ করেন: যদি তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তার সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় স্বান্ত¦Íনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুত আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [তওবাহ: ৪০] হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, “’আমার উম্মতের মাঝে আবু বকরই বেশি দয়ালু।’
[মুসতাদরাক] নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেন: “বন্ধুত্ব ও সাহায্য আবু বকরই আমাকে বেশি করেছিলেন। ইহজগতে যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই করতাম।” [বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ] ইসলামের প্রতি হযরত আবু বকরের রাদিয়াল্লাহু আনহু অপরিসীম অবদানের জন্য তাঁকে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ বলা হয়। এ অবদানের স্বীকৃতির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
‘‘দুনিয়াতে আমি প্রত্যেক মানুষের এহসানের পরিপূর্ণ বদলা আদায় করেছি কিন্তু সিদ্দিকে আকবরের ত্যাগের প্রতিদান আদায় করতে পারিনি। হাশরের ময়দানে স্বয়ং রাব্বুল আলামিন তাঁকে ওই প্রতিদান দান করবেন। তাঁর অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্য কারো অর্থ তেমন আসেনি।” [তিরমিযী] হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: ” لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيلا غَيْرَ رَبِّي لاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرِ خَلِيلا ” “আমি মহান আল্লাহ পাককে ব্যতীত যদি অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম তাহলে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্বকেই বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম।”
[বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ] হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا ، قَالَتْ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” لَا يَنْبَغِي لِقَوْمٍ فِيهِمْ أَبُو بَكْرٍ أَنْ يَؤُمَّهُمْ غَيْرُهُ ” (قَالَ أَبُو عِيسَى : هَذَا حَسَنٌ غَرِيبٌ (.
“যেই জামায়াতে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব উপস্থিত থাকবেন সেখানে তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইমামতি করা উচিত হবে না।” [‘তিরমিযী শরীফ] হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্বকে উদ্দেশ করে বলেন:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لأَبِي بَكْرٍ : ” أَنْتَ صَاحِبِي فِي الْغَارِ , وَصَاحِبِي عَلَى الْحَوْضِ ” .
“তুমি আমার (ছওর) গুহার সঙ্গী এবং হাউযে কাউছারেও আমার সাথী। [তিরমিযী, মিশকাত শরীফ] হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসা ছিলাম। ইতিমধ্যে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এলেন। তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
عَنْ عَلِيٍّ ، قَالَ : بَيْنَا أنا جَالِسٌ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ أَقْبَلَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ ، فَقَالَ : ” هَذَانِ سَيِّدَا كُهُولِ أَهْلِ الْجَنَّةِ ، إِلا مَا كَانَ مِنَ الأَنْبِيَاءِ ، وَلا تُخْبِرْهُمَا ”
‘হে আলী! এ দু’জন হলেন নবীগণের পর জান্নাতের মধ্যবয়সী মানুষের সরদার। তবে তুমি তাদেরকে একথা বলো না। [মুসনাদে আহমদ ১/৮০] হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে
قَالَ رَسُولُ اللَّه صلى الله عليه وسلم: حُبُّ أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ إِيمَانٌ، وَبُغْضُهُمَا كُفْرٌ ”
“হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর এবং হযরত ফারূক্বে আ’যম’র মুহব্বত ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী।” [ইবনু আসাকের-তারিখু দেমশ্ক ৩০/১৪৪] ফারূকে আযম হযরত উমর ইবনুল খত্তাব বলেন,
عن عمر ذكر عنده أبو بكر فبكى وقال : وددت أن عملي كله مثل عمله يوما واحدا من أيامه وليلة واحدة من لياليه أما ليلته فليلة سار مع رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى الغار…..
“আমি আন্তরিকভাবে এই আকাক্সক্ষা পোষণ করি যে, আমার গোটা জীবনের আমল যদি হযরত ছিদ্দীক্বে আকবরের এক রাত্রির আমলের সমান হতো! তা সেই রাত্রি, যেই রাত্রিতে তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হিজরতের সফরে সওর গুহার দিকে রওনা হন।” [রযীন]

এমন কোন উত্তম কাজ নেই, যা সর্বাগ্রে সুসম্পন্ন করেন নি
একদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সামনে উপস্থিত সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে এমন কে আছ যে আজ রোযা রেখেছ?’’ হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি রোযা রেখেছি।’’ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, ‘‘এমন কে আছ যে, আজ কোন শবাধারের সাথে গমন করে জানাযার নামায পড়েছ?’’ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘‘এই মাত্র আমি এ কাজ সমাধা করে এখানে এসেছি।’’ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্ঠ থেকে আবার ঘোষিত হল, ‘‘আচ্ছা এমন ব্যক্তি কে আছ যে আজ কোন পীড়িতের সেবা করেছ?’’ হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘‘আজ আমি এক পীড়িত ব্যক্তির সেবা করেছি।’’ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও বললেন, ‘‘আজ কিছু দান করেছ, এমন ব্যক্তি কেউ এই মজলিসে আছ?’’ সলজ্জভাবে হযরত আবু বকর উত্তরে বললেন, ‘‘এক অতিথিকে সামান্য কিছু অর্থ আমি সাহায্য করতে পেরেছি’’। অবশেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘একদিনে যিনি এতগুলো সৎকাজ করেছেন নিশ্চয়ই তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন’’
[বুখারী হা/৩৬৬১] এই হাদীস শুনানোর পরবর্তীকালে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘সত্যই জগতে এমন কোন উত্তম কাজ নেই, যা আবু বকর রাসিয়াল্লাহু আনহু সর্বাগ্রে সুসম্পন্ন না করেন।

কখনও কষ্ট দেননি
আবূদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তার দু’ হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের এ সাথী এই মাত্র কারো সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে। তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এবং উমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাযির হয়েছি। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবূ বকর! এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবূ বকর কি বাড়িতে আছেন? তারা বলল, না। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চলে এসে সালাম দিলেন। (তাকে দেখে) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি। এ কথাটি তিনি দু’বার বললেন। তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ আর আবূ বকর বলেছে, আপনি সত্য বলেছেন। তাঁর জান-মাল সবকিছু দিয়ে আমাকে সহানুভূতি জানিয়েছে। তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথীকে অব্যাহতি দেবে? একথাটি তিনি দু’বার বললেন। অতঃপর আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আর কখনও কষ্ট দেয়া হয়নি।
[বুখারী হা/৩৬৬১ ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
ছাহাবীদের ফযীলত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫] এরূপ আরো বহু হাদীছ শরীফ-এ নূরে মুজাসসাম, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আফদ্বালুন নাস বা’দাল আম্বিয়া হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু ’র ফাযায়িল-ফযীলত বর্ণনা করেছেন।

ইসলামের প্রথম খলিফা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম খলীফা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর যে চারজন খলিফা ইসলামের পতাকা অতি উচ্চে তুলে ধরেছিলেন তাদের মধ্যে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম।
তাঁর খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সময়টি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তৎকালীন মুসলিম জাহানের বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা, ভন্ড নবীদের উৎপাত, ইত্যাদি দমনে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
একদিকে নব্যুয়তের প্রতি ঈর্ষান্বিত বেদুইনদের হিংষা, অমুসলিমদের চক্রান্ত, ভন্ড নবীদের আবির্ভাব, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও ধর্মদ্রোহী কার্যকলাপ ও বহিশত্রুর আক্রমণ, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি ইসলাম ধর্ম এবং নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকার সুযোগে একদল লোক যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি তারা যাকাত বিরোধী আন্দোলন শুরু করলে কোনো কোনো প্রভাবশালী লোক যাকাত প্রথা উচ্ছেদের সুপারিশ করে। কিন্তু দূরদর্শী আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু শরীয়তের সিদ্ধান্তে অটল থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে তারা যাকাত প্রদানে বাধ্য হয়।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর ভন্ডনবীরা মদিনাভিমুখে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস পেলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ওদের দমনের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। তিনি তাদেরকে আত্মসমর্পণ করার কঠোর নির্দেশ দান করেন। অন্যথায় যুদ্ধ অনিবার্য বলে ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি নিজে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অপরদিকে ওসমানকে ভন্ডনবী আসওয়াদকে দমনের জন্য সিরিয়া অভিযানের নির্দেশ দেন। আসওয়াদ ছিল আনাস জাতির নেতা সে তার অনুচরদের নিয়ে দক্ষিণ আরবের ইয়েমেন নগরে বাস করতো গ্রামের সরদারদের প্রভাবান্বিত করে আসওয়াদ এক বিরাট সৈন্যদল গঠন করে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কিন্তু শেষ র্পযন্ত ওসমানের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে তার মৃত্যু হয়।
আসওয়াদের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং মুসলমানদের রাজধানী মদিনা অবরুদ্ধ করার প্রয়াস পায়। হযরত আবু কবর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাই মদিনা নগরীকে সুরক্ষিত করেন এবং সৈন্যবাহিনীকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভণ্ডনবী ও ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে তাদের প্রেরণ করে। সেনাপতি খালিদ ৩৫০০ সৈন্য নিয়ে ভণ্ডনবী তোলায়হার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। তোলায়হা বনু তাইম বংশের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তায়িম বংশের নেতা আদি বিন হাতিম হযরত খালিদের পরামর্শে স্বীয়সম্প্রদায়কে তোলায়হার বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য বলেন। এভাবে খালিদ তোলায়হাকে দুর্বল করে ফেলেন এবং সহজেই পরাজিত করেন। তেলায়হা প্রথমত সাইবেরিয়াতে পলায়ন করে অবশেষে পুনরায়ইসলাম গ্রহণ করেন।
হযরত আবু বকর মাত্র আড়াই বছরের মত খেলাফত পরিচালনা করেন। তবে তাঁর এ সময়টুকু ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ বলে বিবেচিত হয়। রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা। আরবের বিদ্রোহসমূহ নির্মূল করা। রাষ্ট্র ও সরকারকে তিনি এত মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন যে, মুসলমানরা ইরান ও রোমের মত দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সাহসী হয় ও অল্প সময়ের মধ্যে তাদের বহু অঞ্চল দখল করে নেয়।

‘খলিফাতু রাসুলিল্লাহ’ উপাধি ‘আমিরুল মোমেনীন’ উপাধি দেয়া হয়েছে
لما قيل لابي بكر الصديق رضي الله عنه : يا خليفة الله ، فقال : لست بخليفة لله ، ولكني خليفة رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وحسبي ذلك . (تاريخ مدينة دمشق – ج ৩০ – أبو بكر الصديق خليفة رسول الله صلى الله عليه وسلم. صـ২৯৫(
একদিন কোন এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে সম্বোধন করে বলল, হে আল্লাহর খলীফা! তখন তিনি উত্তরে বললেন, আমি আল্লাহর খলীফা নই, বরং আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফা, আর এতে আমি খুশী।
[মুসনাদে আহমদ ও তারীখে দিমশ্ক ৩০/২৯৫] রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লে তৎপরিবর্তে আবু বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর উপর মসজিদে নাবভীর জামাআতে ইমামাত করার ভার ন্যস্ত হয় ।

কোরআনের সংকলন
হযরত আবু বকরের আরেকটি অবদান পবিত্র কোরআনের সংকলন ও সংরক্ষন। তাঁর খিলাফত কালের প্রথম অধ্যায়ে আরবের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সেই সব বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে কয়েকশত হাফেজে কোরআন শাহাদাত বরন করেন। শুধু মুসায়লামা কাজ্জাবের সাথে যে যুদ্ধ হয় তাতেই সাত শ হাফেজ শহীদ হন। অতঃপর হযরত উমরের পরামর্শে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ কোরআন একস্থানে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন এবং কপিটি নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন। ইতিহাসে কোরআনের এই আদি কপিটি ‘মাসহাফে সিদ্দিকী’ নামে পরিচিত। পরবর্তী কালে হযরত ওসমানের যুগে কোরআনের যে কপিগুলো করা হয় তা ‘মাসহাফে সিদ্দিকী’র অনুলিপি মাত্র।

ইন্তেকাল
১৩ হিজরির ৭ই জমাদিউস সানী হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জ্বরে আক্রান্ত হন। ১৫দিন রোগাক্রান্ত থাকার পর ২১শে জমাদিউস সানী মোতাবেক ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ইন্তেকাল করেন। রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসাল্লামের রওজা মুবারকের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি দু’বছর তিন মাস দশ দিন খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।
আল্লাহ্ আমাদেরকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই প্রিয় সাহাবীর ফায়েজ লাভের তৌফিক দান করুন। (আমিন)

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •