রসূল-ই আকরামের অনন্য মু’জিযা মি’রাজ শরীফ

0

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

মি’রাজ হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বড় বড় মু’জিযাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটা এমন মু’জিযা, যা সৃষ্টির সেরা মানবকুলের বিবেক-বুদ্ধিকে হতভম্ব করে দেয়। এটা হুযূর-ই আকরাম-এর ‘খাসা-ইসে কুবরা’ (মহা বৈশিষ্ট্যাবলী)’র সামিল। ‘খাসা-ইস’ হচ্ছে এমন সবগুণ বা বৈশিষ্ট্য, সেগুলো অন্য কোন নবী কিংবা রসূলকে দেওয়া হয়নি; শুধু তাঁকেই প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং ‘মি’রাজরূপী মু’জিযাটিও অন্য নবী-রসূলকে দেওয়া হয়নি। এটা আমাদের আক্বা ও মাওলা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরই বিশেষত্ব।
এখন দেখা যাক, ‘মি’রাজ’ কি? ‘মি’রাজ’ হচ্ছে- হুযূর-ই আন্ওয়ার আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম রাতের একটি সংক্ষিপ্ত অংশে মসজিদ-ই হারাম থেকে মসজিদে আক্বসা পর্যন্ত এবং মসজিদে আক্বসা থেকে আসমানগুলোয় ভ্রমণ করে ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’রও উপরে, যতদূর পর্যন্ত আল্লাহ্ তা‘আলা চেয়েছেন, তাশরীফ নিয়ে যাওয়া, আরশ, কুরসী, লওহ, ক্বলম, জান্নাত ও দোযখ ইত্যাদি বড় বড় নিদর্শন স্বচক্ষে পরিদর্শন করা, আরশাধিপতি আল্লাহ্ তা‘আলার দিদার, তাঁর অশেষ-অগণিত দান নিয়ে আবার ধরাবুকে তাশরীফ নিয়ে আসা।
এ ‘মি’রাজ শরীফ’-এর ঘটনার সত্যতার পক্ষে সাহাবা-ই কেরামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত ‘আহলে হক্ব’ (সত্যপন্থীগণ)-এর ঐকমত্য রয়েছে। কাফির-মুলহিদগণ ব্যতীত কেউই এ মু’জিযার অস্বীকারকারী নেই। এর কারণও এ যে, মি’রাজকে অস্বীকার করার কোন উপায়ও নেই, থাকতেও পারে না।
‘মি’রাজ’-এর এত দীর্ঘ সফর এতই দ্রুতগতিতে সুসম্পন্ন হয়েছে যে, সেটার বর্ণনা নি¤œলিখিত পংক্তিতে ফুটে ওঠেছে-
زنجير بى, هلتى رهي ـ بستر بھى رها گرم
تاعرش گۓ اور چلے آئےمحمد صلى الله عليه وسلم
অর্থ: এ দিকে দরজার কড়াটি নড়ছে, বিছানাও গরম রয়েছে, ওদিকে ‘আরশ পর্যন্ত (বরং আরো ঊর্ধ্ব গিয়েছেন এবং ফিরেও এসেছেন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। এটা সম্ভব হলো কিভাবে?-এর জবাবও অতি হৃদয়গ্রাহী ও অকাট্য।
প্রথমত: গতির দ্রুততার ভিত্তি ও হাক্বীক্বত বা বাস্তবতা এ যে, চালনাকারী যদি শক্তিমান হন, আর যাকে চালনা করবেন তিনিও সে অনুপাতে চলার যোগ্যতা রাখেন, তাহলে এর ফলশ্রুতিতে তো সন্দেহের কোন অবকাশই থাকে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- রেলের ইঞ্জিন অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান, আর রেল লাইনও যদি ঠিক থাকে, রেলের বগিগুলোও ত্রুটিমুক্ত অবস্থায় ইঞ্জিনের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে গাড়িটি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেটার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে তাতে সন্দেহ থাকার কোন যুক্তি থাকে না। কারণ, একথা, সুস্পষ্ট হয়েছে যে, যিনি চালান তাঁর মধ্যে ক্ষমতা যতবেশী হবে আর যাঁকে চালাবেন তাঁর মধ্যে চলার যোগ্যতা ততবেশী হবে, ওই পরিমাণ চলার গতিও দ্রুত হবে। এখন একটু লক্ষ্য করা যাক- মি’রাজ শরীফের এ দ্রুত গতির ক্ষেত্রে যিনি চালনা করেছেন তিনি কে, আর যাঁকে চালিয়েছেন তিনি কে? এর জবাব রয়েছে নিম্নলিখিত আয়াত শরীফে-
سُبْحان الَّذِىْ اَسْرى بِعَبْدِه তরজমা: পবিত্রতা তাঁরই, যিনি তাঁর খাস বান্দাকে ভ্রমণ করিয়েছেন। [সূরা বনী ই¯্রাঈল, আয়াত-১] সুতরাং বুঝা গেলো যে, মি’রাজ শরীফে চালনাকারী হলেন আল্লাহ্ তা‘আলা, চালিত হয়েছেন হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। বলুন তো আল্লাহ্ তা‘আলার চেয়ে বেশী শক্তিমান আর কে হতে পারে? আর হযরত মুহাম্মদুর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে ‘এজন্য বেশী’ যোগ্যতা সম্পন্ন আর কে আছে? আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন- اِنَّ اللهَ عَلى كُلِّ شَئٍ قَدِيْرٌ
(নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা যা চান করতে পারেন) আর قَدْ جَآءَ كُمْ مِنَ اللهِ نُوْرٌ
(নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর এসেছে।) নিশ্চয় এ ‘নূর’ মানে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। সুতরাং তিনি হলেন নূর আর নূর অপেক্ষা বেশী গতিসম্পন্ন আর কিছু নেই। সুতরাং দুনিয়ায় ‘মি’রাজ শরীফ’ থেকে অধিক দ্রুতগতি সম্পন্ন সফর আর কিছুই হতে পারে না।
এটা এমন এক বাস্তবতা যে, যেভাবে চাঁদ-সূর্যের আলোকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না, তেমনিভাবে মি’রাজে সাহিবে লাউলাক, সাইয়্যারে আফলাক হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দ্রুতগতির বিষয়টিকেও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

উল্লেখিত আয়াত শরীফের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
‘‘সুবহা-নাল্লাযী’’ (سُبْحان الَّذِىْ) তরজমা: ‘পবিত্র ওই মহান সত্তা’ এ মহান ঘটনার বর্ণনা আল্লাহ্ তা‘আলা নিজের পবিত্রতার ঘোষণা দ্বারা আরম্ভ করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা ওই দুর্বলতা বা অপারগতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র যে, তিনি আপন মাহবূবকে রাতের এক ক্ষুদ্র অংশে ওই ঊর্ধ্ব দেশে নিয়ে যেতে পারবেন না; বরং তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি যা চান করতে সক্ষম।
‘‘আস্রা- বি‘আবদিহী’’ (اَسْرَى بِعَبْدِه)। তরজমা: ‘যিনি নিয়ে গেছেন আপন খাস বান্দাকে।’ এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা ‘আসরা’ বলেছেন। কেননা এ শব্দ থেকে আনন্দ ও খুশী প্রকাশ পায়। ‘বি‘আবদিহী’ (بِعَبْدِه)-এর মধ্যে যে ب (বা) বর্ণটি রয়েছে তা مصاحبت (সঙ্গ) বুঝানোর জন্য। এ’তে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ‘যিনি তাঁকে ভ্রমণ করিয়েছেন, তিনি (তাঁর ক্বুদরত) সাথে সাথে ছিলেন। অবশ্য এ ভ্রমন كيف (ধরন বা অবস্থা) থেকে পবিত্র ছিলো, যা অনুধাবন-উপলব্ধির আওতায় আসতে পারেনা।
عَبْدٌ (আব্দুন) مضاف اليه ـ ه ـ مضاف ; এটাضمير متصل; অর্থাৎ এ খাস বান্দা যেন পুরোপুরিভাবে মা’বূদের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন, আর মা’বূদও আপন প্রিয় বান্দার প্রতি তাঁর পুরস্কার ও মর্যাদা প্রদান সহকারে ফিরেছেন। ‘আবদুহু’ মানে ‘আবদে কামিল’ (পূর্ণাঙ্গ বান্দা) আর এ ‘আবদে কামিল’ হলেন হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম। আল্লামা ইকবাল বলেন-
عبد ديگر عبده چيز ديگر ـ ما سراپا انتظار او منتظر
অর্থ: ‘শুধু আবদ’ এক জিনিষ, আর ‘আল্লাহর বান্দা’ অন্য কিছু। (আমরা হলাম নিছক বান্দা,) আপাদমস্তক অপেক্ষমান, আর তিনি হলেন ওই সত্তা, যাঁর জন্য অপেক্ষা করা হয়।
এখানে আরো লক্ষণীয় যে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হলেন নূরী বান্দা। আর ‘নূর’ ও ‘বান্দা’ পরস্পর বিপরীত কিনা? এর জবাব হচ্ছে ‘নূর’ ও ‘বান্দা’ পরস্পর বিরোধী নয়; বরং নূরী সত্তা বান্দা হতে পারেন। এর পক্ষে অকাট্য প্রমাণও রয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলার সমস্ত ফেরেশতা নূরী। পবিত্র ক্বোরআনে তাঁদেরকে ‘বান্দা’ (عباد) বলা হয়েছে। যেমন এরশাদ হয়েছে- بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُوْنَ (বরং তারা সম্মানিত বান্দা)। তাছাড়া, عبد (আবদ) মানে ‘ইবাদতকারী’ও। আর আল্লাহর ইবাদত নূরী, নারী, খাকী (যথাক্রমে নূরের তৈরী, আগুনের তৈরী, মাটির তৈরী) বান্দাগণ, জড়পদার্থ (جمادات), পশু-পাখী (حيوانات) এবং তৃণ ও লতাগুল্ম (نباتات)ও হতে পারে। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
يُسَبِّحُ للهِ مَافِى السمّٰو۱اتِ وَمَا فِى الْاَرْضِ
(অর্থাৎ যমীন ও আসমানের সবকিছু আল্লাহ্ তা‘আলার তাসবীহ্ তথা ইবাদত করে। [সূরা জুমু‘আহ্: আয়াত-১] ‘লায়লান’ (لَيْلاً) তরজমা: রাতের এক ক্ষুদ্র অংশে।
এখানে আরো লক্ষণীয় যে, এ ভ্রমণ আল্লাহর বিশেষ বিশেষ নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য ছিলো; মি’রাজ রাতের বেলায় কেন করানো হলো? তাও ছিলো সাতাশে রাত! অর্থাৎ হুযূর-ই আকরামকে না সূর্যের আলোতে, না চাঁদের আলোতে নিয়ে গেছেন। কারণ, তিনি চাঁদ ও সূর্যের মুখাপেক্ষী নন; বরং সমগ্র বিশ্ব তাঁর মুখাপেক্ষী, বিশ্বের সমস্ত নূর বা আলো হুযূর-ই আক্রামের নূর থেকেই সৃষ্ট। হযরত শেখ সা’দী আলায়হির রাহমাহ্ এ প্রসঙ্গে বলেছেন-
كليمےكه چرخ فلك طور اواست ـ همه نورها پر تونوراوست
অর্থাৎ হযরত কলীমুল্লাহ্ (মুসা আলায়হিস্ সালাম) তূর পাহাড়ে আসমানের সূর্যের আলোতে আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। এ সব নূরই মূলতঃ হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূরেরই আলোকচ্ছটা। (বরং চাঁদ ও সূর্য তাঁর নূর দ্বারাই আলোকিত হয়।)
হযরত শাহ্ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস-ই দেহলভী আলায়হির রাহমাহ্ বলেছেন-
يَاصَاحِبَ الْجَمَالِ وَيَا سَيِّدَ الْبَشَرِ
مِنْ وَجْهِكَ الْمُنِيْرِ لَقَدْ نُوِّرَ الْقَمَرُ
অর্থ: হে সৌন্দর্যের অধিকারী, হে মানবকুল সরদার! আপনার আলোদাতা চেহারা থেকে চাঁদ আলোকিত হয়েছে।
مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ اِلَى الْمَسْجِدِ الْاَقْصى
(মসজিদ-ই হারাম থেকে মসজিদে আক্বসা পর্যন্ত)।

মি’রাজ শরীফের আরম্ভ
হুযূর-ই আক্রামের চাচাত ও দুধ বোন হযরত উম্মে হানীর ঘর থেকে কিংবা হাত্বীম-ই কা’বা থেকে হয়েছে। এখান থেকে এ সফর প্রথম পর্যায়ে মসজিদে আক্বসা পর্যন্ত হয়েছে, তারপর মসজিদে আক্বসা থেকে ‘মালা-ই আ’লা’ (সর্বোচ্চ পর্যায়) পর্যন্ত হয়েছিলো।
اَلَّذِىْ بَارَكَنْا حَوْلَه (ওই মসজিদ যার চতুর্পাশে আমি বরকত রেখেছি)। এ বরকতগুলো হচ্ছে- সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর কেন্দ্রস্থল এবং অসংখ্য নবী আলায়হিমুস্ সালাম-এর মাযার আর নানাবিধ ফলমূলের বাগান, শাক-সবজির বিশাল সবুজ ক্ষেত, পানির ফোয়ারা এবং নানা ধরনের ফসলাদি ইত্যাদি।
لِنُرِيَه مِنْ ايَاتِنَا (যাতে তাঁকে দেখাই আমার নিদর্শনগুলো)। এ বাক্যাংশ اَسْرى ক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ ভ্রমনটি করিয়েছেন এ জন্য যে, তিনি তাঁকে তাঁর নিদর্শনগুলো দেখাবেন। এখানে مِنْ (থেকে) অব্যয়টি نفسيريه (ব্যাখ্যাকারী)। আর যদি تبعيضيه (একাংশ বুঝানোর জন্য) হয়, তবে অর্থ হবে- কিছু নিদর্শন দেখানোর আর কিছু উপযোগ বা স্বাদ গ্রহণের। তবে প্রথমোক্ত অভিমতই অধিকতর জোরালো।
اِنَّه هُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ (নিশ্চয় তিনি মহান শ্রোতা, দ্রষ্টা) এখানে ‘তিনি’ বলতে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালামকে বুঝানো হয়েছে; অবশ্য আল্লাহ্ তা‘আলার মহান সত্তাও হতে পারে। সুতরাং অর্থ দাঁড়ায়- রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন এবং সরাসরি তাঁর কথা শুনেছেন আর আল্লাহ্ তা‘আলা হুযূর-ই আকরামকে বিশেষ কুদরতী দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং তাঁর কথা শুনেছেন। এতদ্ভিত্তিতে, আল্লাহ্ তো ‘সামী’ ও ‘বসীর’ এবং তাঁর দানক্রমে হুযূর-ই আকরামও ‘সামী’ ও ‘বাসীর’ (শ্রোতা ও দ্রষ্টা)।

মি’রাজের পূর্ণ ঘটনা
হিজরতের প্রায় পাঁচ বছর পূর্বে রজব শরীফের ২৭তম রাতে সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপন চাচাত ও দুধবোন হযরত উম্মে হানীর ঘরে আরাম ফরমাচ্ছিলেন। ইত্যবসরে হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম পঞ্চাশ হাজার ফেরেশতার দল ও বোরাক্ব নিয়ে হাযির হলেন। তখন হুযূর-ই আকরাম নিদ্রারত ছিলেন। হযরত জিব্রাঈল হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছিলেন। যদি সশব্দে জাগ্রত করি তবে বেয়াদবী হবে। কারণ এটাতো চূড়ান্ত আদবের স্থান।
ادب گاهيست زير آسماں ازعرش نازل تر
نفس گم كرده مى آيد جنيد وبايزيد كاايں جا
অর্থ: আসমানের নিচে আরশ অপেক্ষাও নাজুক (স্পর্শকাতর) স্থান রয়েছে। (আর সেটা হচ্ছে রসূল-ই আকরামের পবিত্র দরবার) এখানে হযরত জুনায়দ বাগদাদী ও হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (আলায়হিমার রাহমাহও নিজেদের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে (পিনপতন নিরবতা অবলম্বন করে) এসে থাকেন।
আল্লাহ্ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন- يَا جِبْرِيْلُ قَبِّلْ قَدَمَيْهِ
(হে জিব্রাঈল! তাঁর উভয় কদম শরীফে চুমু খাও)! সুতরাং তিনি নির্দেশ পালন করলেন। হুযূর সাইয়্যেদে আলম জাগ্রত হলেন। তখন হযরত জিব্রাইল আরয করলেন- اِنَّ اللهَ اِشْتَاقَ اِلى لِقَآئِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা আপনার সাক্ষাতের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তারপর হযরত জিব্রাঈল বোরাক্ব পেশ করলেন। নবী প্রেমে বিভোর বোরাক্বটির পিঠে বিশ্বকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সদয় আরোহণ করলে বোরাক তার অদম্য খুশী ধরে রাখতে পারেনি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও শারীরিক স্পন্দনের মাধ্যমে সেটার বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেলো। তখন হযরত জিব্রাঈল ধমক দিয়ে বললেন, ‘বোরাক্ব! তুমি কি জানোনা যে, তোমার পিঠে গোটা বিশ্ব-জগতের সরদার আরোহণ করেছেন? ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে বোরাক্ব আরয করলো, ‘‘বাবুয়ানা কিংবা অহংকার বশতঃ নয়; বরং আমার এমন সৌভাগ্যের জন্য আমার আবেগকে ধরে রাখতে পারিনি, তাই।’’
হুযূর-ই আকরাম বোরাকে আরোহণ করার পূর্বে একটু দাঁড়িয়ে গেলেন। হযরত জিব্রাঈল আরয করলেন, ‘‘এয়া রাসূলাল্লাহ্ দেরী করার কারণ কি?’’ হুযূর (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করলেন, ‘‘আমি চিন্তা করছি, আজ আমার জন্য এত আয়োজন করা হয়েছে, পরকালে আমার উম্মতের কি অবস্থা হবে? তারা পুল সেরাত্ব, যা পাঁচশ’ বছরের রাস্তা, চুলের চেয়ে সরু, তলোয়ারের চেয়ে ধারালো, কিভাবে পার হবে?’’ তখন আল্লাহ্ তা‘আলার তরফ থেকে সুসংবাদ দেওয়া হলো, ‘‘হে হাবীব! আপনি আপনার উম্মতের জন্য মোটেই চিন্তা করবেন না। আমি তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করবো যে, তারা এ দীর্ঘ ও সরু পুল অনায়াসে পার হয়ে যাবে।’’ আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা বেরলভী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন-
پل سے گزارو راه گزركو خبرنه هو
جبريل پر بچھائيں توپر كو خبر نه هو
অর্থ: পুল অতিক্রম করে পার হযে যাবে, অতিক্রমকারী টেরও পাবে না। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম তাঁর পাখাগুলো বিছিয়ে দেবেন। হুযূর আক্রামের উম্মতগণ সেগুলোর উপর আরোহণ করে পার হয়ে যাবে; কিন্তু পাখাগুলো অনুভবও করতে পারবে না।
এ সুসংবাদ পেয়ে হুযূর নিশ্চিন্ত মনে বোরাক্বে আরোহন করলেন। বিদ্যুতের তীব্র গতিতে বোরাক্ব বায়তুল মুক্বাদ্দাস (মসজিদে আক্বসা)’র দিকে এগিয়ে চললে। সেটার গতির অবস্থাও এ ছিলো যে, সেটা তার দৃষ্টির শেষ প্রান্তে কদম রাখে। আশে পাশে নূরের ছড়াছড়ি আর ফেরেশতাদের ‘জুলূস’ (শোভাযাত্রা) সাথে ছিলো। এ নূরানী সফরের প্রথম পর্যায়ে কিছুক্ষণের মধ্যে অতি সুন্দর উপত্যকা নজরে পড়লো, যাতে প্রচুর খেজুর গাছের সারিগুলো শোভা পাচ্ছিলো। অর্থাৎ মদীনা মুনাওয়ারা। হযরত জিব্রাইল আরয করলেন, ‘‘হুযূর! এখানে নেমে দু’ রাক্‘আত নামায পড়–ন! এটা আপনার হিজরত করার পবিত্র স্থান। আপনার সদয় অবস্থানস্থল। তারপর আরেক উপত্যকা অতিক্রম করছিলেন। তা ছিলো ‘ওয়াদী-ই আয়মান’, যেখানে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। তারপর একটি ‘লালটিলা’ অতিক্রম করলেন। এখানে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর সমাধি শরীফ। দেখলেন, তিনি কবর শরীফে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন।
দেখতে দেখতে বায়তুল মুক্বাদ্দাস এসে গেলো। সেখানে হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম থেকে হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম পর্যন্ত সমস্ত নবী ও রসূল (আলায়হিমুস্ সালাম) সফ বন্দি হয়ে দাঁড়ানো ছিলেন। সবাই অপেক্ষমান ছিলেন। ইমামের মুসাল্লা খালি ছিলো। নবী ও রসূলকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মুসাল্লায় গেলেন। হযরত জিব্রাঈল ‘সাখরা’র উপর দাঁড়িয়ে আযান দিলেন। সুবহা-নাল্লাহ! এ কেমন নামায! মুআয্যিন ফেরেশতাকুল সরদার, ইমাম নবী ও রসূলগণের সরদার আর মুক্বতাদী হযরত আদম, হযরত নূহ্, হযরত ইব্রাহীম এবং হযরত মূসাসহ সমস্ত নবী ও রসূল আলায়হিমুস্ সালাম! এ শানদার নামায দ্বারা একথাও প্রমাণিত হলো যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম সমস্ত সৃষ্টির আগে সৃষ্ট হয়েছেন, সমস্ত নবীগণের পরে দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছেন। আর আজ সমগ্র সৃষ্টিজগৎ দেখছে সব শেষে যিনি তাশরীফ এনেছেন, তিনি সবার আগে। আর যাঁরা আগে এসেছেন, তাঁরা সবাই তাঁর পেছনে দ-ায়মান। ক্বোরআন মজীদের আয়াত- هُوَ الاَوَّلُ وَالْاخِرُ (তিনিই সর্বপ্রথম, তিনি সর্বশেষ)-এর একটি তাফসীর অনুসারে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, নবী-ই আকরাম সৃষ্ট হয়েছেন সমস্ত সৃষ্টির আগে আর তাশরীফ এনেছেন নবী ও রসূলগণের মধ্যে সবার শেষে। [মাদারিজুন্নবুয়ত:১ম খন্ড] আ’লা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত বলেছেন-
نماز اقصى ميں تھا يهي سرعياں هو معنئى اول آخر
كه دست بسته هيں پيچھےحاضر جو سلطنت آگے كرگۓ تھے
অর্থ: মসজিদ-ই আক্বসার নামাযে এই রহস্যই উদঘাটিত হলো। ক্বোরআন মজীদের আয়াত ‘হুয়াল আউয়ালু ওয়াল আখিরু’ (তিনিই সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ)-এর একটি মাহাত্ম্য প্রকাশ পেলো যে, যাঁরা ইতোপূর্বে দুনিয়ায় বাদশাহী করে গেছেন তাঁরা আজ সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন।
উল্লেখ্য যে, মসজিদে আক্বসার এ নামায জিসমানী (সশরীরে) ছিলো, রূহানী (আত্মিক) ছিলোনা। মোল্লা আলী ক্বারী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর সুপ্রসিদ্ধ কিতাব ‘মিরক্বাত’: ৫ম খন্ড: ৪৩০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘নামাযের বিভিন্ন কাজ, যেমন ক্বিয়াম, রুকূ’, সাজদাহ্, ক্বা’দাহ্ ইত্যাদি সশরীরেই সম্পন্ন হতে পারে, শুধু রূহ এগুলো সম্পন্ন করতে পারে না।’’ সুতরাং হুযূর-ই আক্রামের এ মি’রাজও জিসমানী (সশরীরে) ছিলো। অবশ্য হুযূর-ই আক্রামের ছাব্বিশটি মি’রাজ রূহানীভাবেও হয়েছিলো। হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বর্ণনা-
مَا فَقَدْتُّ جَسَدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلى اللهُ تَعَالى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
(আমি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সশরীরে অনুপস্থিত পায়নি)-ও এসব রূহানী মি’রাজের কোন একটি সম্পর্কে প্রযোজ্য, এ সশরীরে মি’রাজের প্রসঙ্গে নয়।

ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণ
মসজিদে আক্বসা থেকে অবসর হওয়ার পর হুযূর-ই আকরাম-এর উপরের দিকে ভ্রমন আরম্ভ হলো। হুযূর-ই আকরাম স্বয়ং এরশাদ করেছেন ثُمَّ عُرِجَ بِىْ (অতঃপর আমাকে উপরে নিয়ে যাওয়া হলো)। এ ভ্রমণও কতোই আশ্চর্যজনক ছিলো এখন ফেরেশতাদের সাথে সমস্ত নবী-রসূলও সালাম নিবেদনে রত হলেন। এদিকে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর বোরাক্বও অতি শান-শওকতের সাথে উপরের দিকে যাত্রা আরম্ভ করলো। আ’লা হযরত অত্যন্ত সুন্দরভাবে এর চিত্র তুলে ধরেছেন-
حسن طلب هرقدم ساتھه هے دائيں بائيں فرشتوں كي بارات هے
سرپه نور انى سهرے كي كيابات هے شاه دلهابنا آج كي رات هے
طور پر رفعت لامكانى كهاں لن ترانى كهاں من رانى كهاں
جس كا سايه نهيں اس كا ثانى كهاں اس كا ايك معجزه آج كي رات هے
অর্থ: ১. প্রতিটি কদমে চিত্তাকর্ষী শোভা সাথে রয়েছে, ডানে ও বামে ফেরেশতাদের শোভাযাত্রা, শির মুবারকে নূরী মুকুট শোভা পাচ্ছে- এ দৃশ্যের সৌন্দর্য সম্পর্কে বর্ণনার অপেক্ষা রাখেনা। আজ রাতে হুযূর-ই আকরাম শাহ্ দুলহা হিসেবে অধিষ্ঠিত।
২. হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর সাথে কথা বলার জন্য তূর-পর্বতে তাশরীফ নিয়ে গেলেও হুযূর-ই আক্রামের ‘আলমে লা-মাকান’-এ গিয়ে আল্লাহর সাক্ষাতের মহিমা সেখানে কোত্থেকে? হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর দিদার চাইলে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন, ‘‘লান তারানী’’ (তুমি আমাকে দেখতে পারবে না)। আর হুযূর-ই আকরাম এরশাদ করেছেন- ‘যে আমাকে দেখেছে সে আমার মাধ্যমে আল্লাহর নূরের তাজাল্লীর দর্শন লাভ করেছে। যে নবী-ই আক্রামের ছায়া ছিলোনা, তাঁর দ্বিতীয় কোথায়? তাঁরই একটি অনন্য মু’জিযার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আজকের মি’রাজ রজনীতে।
চোখের পলকেই প্রথম আসমান এসে গেছে। হযরত জিব্রাঈল আসমানের দরজায় সংকেত দিলেন। দারোয়ান বললেন, ‘কে? বললেন, ‘‘জিব্রাঈল।’’ দারোয়ান বললেন مَنْ مَّعَكَ (আপনার সাথে কে আছেন?) হযরত জিব্রাঈল বললেন, ‘হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। দারোয়ান বললেন, ‘‘মারহাবা (স্বাগতম), তাঁর জন্যই দরজা খোলা হবে। প্রথম আসমানে হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম হুযূর-ই আকরামকে স্বাগত জানালেন। তারপর দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে হযরত ইয়াহিয়া ও হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম হুযূর-ই আকরামকে স্বাগত জানালেন। তৃতীয় আসমানে পৌঁছলে হযরত ইয়ূসুফ আলায়হিস্ সালাম, চতুর্থ আসমানে হযরত ইদ্রিস আলায়হিস্ সালাম, পঞ্চম আসমানে হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাম, ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম হুযূর-ই আকরামকে মি’রাজের মুবারকবাদ নিবেদন করলেন। তারপর হুযূর-ই আকরাম সিদরাতুল মুন্তাহায় পৌঁছে গেলেন।
এখানে এসে হযরত জিব্রাঈল এ বলে বিদায় নিলেন-
اگرايك سرموۓ بر تر پرم ـ فروغ تجلى بسوزدپرم
অর্থ: যদি আমি এক চুল পরিমাণও আগে বেড়ে যাই, তবে আল্লাহ্ তা‘আলার নূররাশি ও তাজাল্লীরাজি আমার পাখাগুলোকে জ্বালিয়ে ছাই করে ফেলবে। এটা হচ্ছে আমার চূড়ান্ত স্তর।
তখন হুযূর আলায়হিস্ সালাম আপন প্রপিতা হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর প্রতি হযরত জিব্রাঈলের এক একান্ত ভক্তি প্রদর্শনের কথা স্মরণ করলেন। হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামকে নমরূদ কর্তৃক অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করার সময় হযরত জিব্রাঈল আরয করেছিলেন, ‘‘আমি আপনার খাদিম হিসেবে হাযির! হুকুম দিন! তখন হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম বলেছিলেন- اَمَّا اِلَيْكَ فَلاَ (তোমার নিকট আমার চাওয়ার কিছুই নেই)। হযরত জিব্রাঈল আরয করলেন, ‘‘তাহলে আল্লাহর দরবারে আপনার পক্ষে আরয করি! তদুত্তরে হযরত ইব্রাহীম বললেন-
جانتاه هے وه ميرا رب جليل ـ آگ ميں پڑتاهے اب اس كا خليل
অর্থ: আমার মহামহিম রব জানেন যে, এখন তাঁর খলীল অগ্নিকুন্ডের দিকে যাচ্ছে।
তবুও হুযূর-ই আকরাম হযরত জিব্রাঈলের ওই ভক্তি প্রদর্শনের প্রতিদান দিতে চাইলেন। এরশাদ করলেন, ‘জিব্রাঈল! তুমি আজ তোমার কিছু চাওয়ার থাকলে বলতে পারো! আমি আল্লাহ্ তা‘আলার মহান দরবার থেকে তা মঞ্জুর করিয়ে নেবো। হযরত জিব্রাঈল আরয করলেন, ‘‘আমি চাই- আপনার উম্মতগণ যখন পুলসেরাত পার হবে, তখন আমি তাদের পার করানোর জন্য আমার পাখাগুলো বিছিয়ে দেবো; যাতে তারা সহজে পুলসেরাত্ব পার হয়ে বেহেশতে চলে যেতে পারে। উল্লেখ্য, তাঁর এ প্রার্থনা কবুল হয়েছিলো। ক্বিয়ামতে, পুলসেরাতের দৃশ্যও আজব ধরনের হবে- জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম তাঁর পাখাগুলো বিছিয়ে দেবেন আর বিশ্বকুল সরদার আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম দো‘আ করতে থাকবেন-
رَبِّ سَلِّمْ اُمَّتِىْ رَبِّ سَلِّمْ اُمَّتِىْ
অর্থাৎ হে আমার রব আমার উম্মতকে নিরাপত্তা সহকারে পার করিয়ে দাও!
আ’লা হযরত অতি সুন্দর বলেছেন-
رضا پل سے اب وجد كرتے گزرئيےـ كه رب سلم صداۓمحمد صلى الله عليه وسلم
অর্থ: ওহে রেযা! এখন আনন্দোচ্ছ্বাস সহকারে পুল সেরাত্ব অতিক্রম করে যাও! কারণ, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দো‘আর ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে, ‘‘হে আমার রব! আমার উম্মতকে নিরাপদে পার করিয়ে দাও!’’
উল্লেখ্য, সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে আরো কতিপয় আজব ধরনের নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিলো। কলেবর বৃদ্ধি এড়ানোর জন্য এখানে উল্লেখ করা গেলোনা।

‘সিদরা’র আগে নবী-ই আক্রামের শুভ-গমন
হযরত জিব্রাইল আমীন আলায়হিস্ সালাম বোরাকসহ এখানেই (সিদরাহ্) র’য়ে গেলেন। ‘মা’আরিজুন্নুবূয়ত’-এ মোল্লা মু‘ঈন কাশেফী আলায়হির রাহমাহ্ বলেন-
অতঃপর হুযূর-ই আকরাম আলায়হিস্ সালাম বর্ণনা করেছেন, আমি একাকী রওনা হলাম। অনেক নূরানী পর্দা অতিক্রম করলাম। এভাবে সত্তর হাজার পর্দা অতিক্রম করেছি। প্রতি দু’ হিজাবের মধ্যখানে পাঁচশ’ বছরের দূরত্ব ছিলো। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে- হুযূর আলায়হিস্ সালাম-এর বাহন বোরাক্ব এখানে পৌঁছে রুখে গেছে। তখন সবুজ রঙের ‘রফরফ’ প্রকাশ পেলো, যার আলো সূর্যের আলোর মতো ছিলো’’। [মা‘আরিজ’: পৃ. ১৫২] হুযূর-ই আকরাম ওই রফরফে আরোহন করলেন এবং এগিয়ে যেতে লাগলেন। এভাবে আরশের স্তম্ভ পর্যন্ত তাশরীফ নিয়ে গেলেন। ‘মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়াহ’: ৩৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যখন হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম আরশের নিকটে পৌঁছলেন, তখন আরশ হুযূর-ই আকরামের দামন (আঁচল) শরীফ ধরলো। তিনি আরশের উপর তাশরীফ রাখলেন।’’
আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন-
وهى لامكان كے مكين هوۓسرعرش تخت نشيں هوئے
وه نبى كه جس كے هيں يه مكاں وه خدا هےجس كا مكاں نهيں
অর্থ: তিনি ‘লা-মাকান’-এ অবস্থান করেন, আরশের উপর অধিষ্ঠিত হন। ওই নবী হোন তিনিই, যাঁর মাকান (বিশেষ স্থান) আছে, আর খোদা হন ওই যাত-ই পাক, যিনি কোন স্থানে সঙ্কুলান হওয়া থেকে পবিত্র।
এবার আরো আগে শুধু পর্দার পর পর্দাই ছিলো। তবে সমস্ত পর্দা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত এক স্থান আসলো যেখানে-
سراغ اين ومتى كهاں تھا نشان كيف والى كهاں تھا
نه كوئى راهي نه كوئى ساتھى نه سنگ منزل نه مرحلےتھے
অর্থ: সেখানে ‘কোথায়’ ও ‘কখন’-এর পাত্তা কোথায় ছিলো? ‘কিভাবে’ ও ‘কোন দিকে’ কোথায় ছিলো? অর্থাৎ ছিলোনা, না ছিলো কোন পথিক, না ছিলো কোন সাথী। না ছিলো মাইল ফলক, না ছিলো গন্তব্যের দিক-নিদের্শনার কোন চিহ্ন।
এর পরের বর্ণনা খোদ্ ক্বোরআন মজীদে রয়েছে-
ثُمَّ دَنى فَتَدَلّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ اَوْ اَدْنى [سوره نجم[
তরজমা: ৮. অতঃপর ওই জ্যোতি নিকটবর্তী হলো। অতঃপর খুব নেমে আসলো, ৯. অতঃপর ওই জ্যোতি ও এ মাহবূবের মধ্যে দু’হাতের ব্যবধান রইলো; বরং তদপেক্ষাও কম। [সূরা নাজম: আয়াত-৮ ও ৯, কানযুল ঈমান] সফর অব্যাহত রয়েছে। এক ভালবাসাপূর্ণ আহ্বান আসলো- اُدنُ مِنِّىْ (নিকটে আসুন)!

বিভিন্ন মাক্বাম
হুযূর-ই আকরাম ‘মাক্বামে দানা’ (নিকটবর্তী হলেন)-এর পর্যায় থেকে অগ্রসর হলেন। অতঃপর ‘ফাতাদাল্লা’ (অতঃপর নেমে আসলো)-এর স্তরে পৌঁছলেন। ওখান থেকে অগ্রসর হয়ে ‘ক্বা’বা ক্বাউসাঈন’ (এত নিকটে গেলেন যে, শুধু দু’ হাতের ব্যবধান রইলো)-এর স্তরে পৌঁছলেন। তারপর ‘আউ আদ্না’ (আরো নিকটে গেলেন)-এর স্তরে পৌঁছে ধন্য হলেন।
মিশকাত শরীফ: ৬৮ পৃষ্ঠায় হযরত আবদুর রহমান বর্ণনা করেন-
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَيْتُ رَبِّىْ فِىْ اَحْسَنِ صُوْرَةٍ فَوَضَعَ كَفَّه بَيْنَ كَتِفَّى فَوجَدْتُّ بَوْدَهَا بَيْنَ ثَدِيَىَّ فَعَلِمْتُ مَا فِى السَّمَواتِ وَالْاَرْضِ (ملخصًا(
অর্থ: রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপন রবকে অতি সুন্দর সূরতে দেখেছেন। তারপর তিনি আমার উভয় স্কন্ধের মধ্যভাগে আপন ক্বুদরতের হাত রাখলেন। ফলে আমি আমার বক্ষে শৈথিল্য পেলাম আর যমীন ও আসমানের প্রতিটি বস্তু জেনে ফেললাম। [সংক্ষেপিত] এ হাদীস শরীফ থেকে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হলো-
এক. মি’রাজের রাতে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এ’তে প্রায় সকল বিজ্ঞ আলিম একমত। হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম মি’রাজ রাতে প্রকাশ্য চোখে আল্লাহ্ তা‘আলার দীদার (দর্শন) লাভ করে ধন্য হয়েছেন। ‘মাওয়া-হিবে লাদুনিয়া:২য় খন্ড: পৃ. ৩৭-এ উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বলেন, আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামকে ‘খলীল’ (অন্তরঙ্গ বন্ধু)’র মর্যাদা দিয়েছেন, হযরত মূসা আলায়হিস্ সালামকে ‘কলীম’ (সরাসরি বাক্যালাপ)-এর মর্যাদা দিয়েছেন আর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দিদার (সাক্ষাৎ) দ্বারা ধন্য করেছেন।
আল্লামা ইসমাঈল হক্বক্কী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর ‘তাফসীর-ই রূহুল বয়ান’: ১ম খন্ড: ৫৩পৃষ্ঠায় লিখেছেন-
وَمِنَ الْمُحَالٍ اَنْ يَّدْعُوَ الْكَرِيْمُ كَرِيْمًا اِلى دَارِه وَيُضِيْفُ حَبِيْبٌ حَبِيْبًا فِىْ قَصْرِه ثُمَّ يَتَسترُ عَنْهُ وَلاَ يُرِيْهِ وَجْهَ
অর্থ: এটা কিভাবে হতে পারে যে, কোন সম্মানিত ব্যক্তি আরেক সম্মানিত ব্যক্তিকে নিজের দাওয়াত দেবেন, আর বন্ধু তার বন্ধুকে নিজের বালাখানায় আতিথ্য করবেন; কিন্তু নিজে তাঁর নিকট থেকে গোপন থাকবেন এবং চেহারাটুকুও দেখাবেন না? (এমনটি হতে পারে না।)
শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভী ও আল্লামা ড. ইক্ববালও এ প্রসঙ্গে একই কথা বলেছেন। পবিত্র ক্বোরআন ও হাদীসে পাকে তো এর পক্ষে অসংখ্য দলীল প্রমাণ রয়েছে।
তাছাড়া, এ ঘনিষ্ট সাক্ষাতে হুযূর-ই আকরাম আপন উম্মতকে ভুলেন নি। তিনি আল্লাহর দরবারে আপন উম্মতের মাগফিরাতের জন্য সুপারিশ করেছেন এবং উভয় জাহানে তাদের সাফল্য কামনা করেছেন।

উম্মতের জন্য মি’রাজের ব্যবস্থা
আল্লাহ্ তা‘আলা হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালামকে তাঁর উম্মতের জন্যও মি’রাজ দান করেছেন। আর ওই মি’রাজ হলো নামায। اَلصَّلوةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِيْنَ (নামায মু’মিনদের জন্য মি’রাজ)। মি’রাজে আল্লাহ্ তা‘আলা পঞ্চাশ ওয়াক্বত নামায এবং ছয় মাসের রোযা দান করলেন। হুযূর-ই আকরাম যমীনের দিকে ফিরে আসার পথে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম অপেক্ষমান ছিলেন। তিনি আরয করলেন, ‘‘আপনার উম্মত এত নামায সম্পন্ন করতে পারবে না। আপনি আল্লাহর দরবারে পুনরায় গিয়ে কম করিয়ে নিন! হুযূর-ই আকরাম আবার আল্লাহ্ তা‘আলার মহান দরবারে পৌঁছলেন। পাঁচ ওয়াক্বত কমানো হলো। ফিরে আসার সময় হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম একই অনুরোধ জানালেন। হুযূর-ই আকরামও পুনরায় আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে গেলেন এবার আরো পাঁচ ওয়াক্বত কমানো হলো। এভাবে হযরত মূসার অনুরোধে বারংবার মহান আল্লাহর দরবারে হুযূর-ই আকরাম যেতে থাকেন এবং প্রত্যেক বার পাঁচ ওয়াক্বত করে নামায কমানো হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নয়বারে পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্বত কম হয়ে আর মাত্র পাঁচ ওয়াক্বত অবশিষ্ট রইলো। আর রোযাও ছয় মাসের স্থলে মাত্র এক মাস রাখা হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, নামায পাঁচ ওয়াক্বত সম্পন্ন করা হলে সাওয়াব কিন্তু পঞ্চাশ ওয়াক্বতের পাওয়া যাবে। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে-
مَنْ جَآءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَه عَشْرُ اَمْثَالِهَا
অর্থাৎ কেউ একটি নেক কাজ করলে সে সেটার বিনিময়ে দশগুণ পাবে। [সূরা আন্‘আম: আয়াত-১৬১] এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- আল্লাহ্ তা‘আলা চাইলে প্রথমেই নামায পাঁচ ওয়াক্বত দিতে পারতেন। পঞ্চাশ ওয়াক্বত দিয়ে বারংবার কমতি করে পাঁচ ওয়াক্বত করার মধ্যে এ হিকমত ছিলো যে, আল্লাহ্ তা‘আলা চাচ্ছিলেন যে, তাঁর মাহবূব বারংবার তাঁর দরবারে আসুন, ওদিকে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালামের আশাও পূরণ হয়ে যাক! তিনি এভাবে বারংবার হুযূর-ই আক্রামের ওই চক্ষুযুগল দেখার সুযোগ পাচ্ছিলেন, যে চক্ষুযুগল আল্লাহ তা‘আলাকে দেখে আসছিলো।

মি’রাজের অন্যান্য দান
তিন ধরনের ইলম (জ্ঞান) দান করা হয়েছে। হযরত শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দিসে দেহলভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর ‘মাদারিজুন নুবূয়ত’-এ লিখেছেন, আল্লাহ্ তা‘আলা শবে মি’রাজে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালামকে তিন ধরনের ইলম (জ্ঞান) দান করেছেন, এক ধরনের ইলম এমনি ছিলো যে, তা হুযূর-ই আক্রামের জন্য খাস। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা ধারণ করতে পারে না। দ্বিতীয় প্রকারের ইলম সম্পর্কে তাঁকে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছিলো- তিনি যাঁকে উপযুক্ত মনে করেন, যতটুকু চান দান করতে পারবেন এবং তৃতীয় প্রকারের ইলম এমনি ছিলো যে, তা সমস্ত সৃষ্টির জন্য ‘আম’ (ব্যাপক)। সুতরাং তিনিও এ প্রকারের ইলম সৃষ্টির যাবতীয় বিষয়ে (যেমন-অর্থনীতি, সমাজনীতি, ইবাদত, আক্বাইদ ইত্যাদি) বিতরণ করেছেন। বিশ্বের এমন বিষয় নেই, যা সম্পর্কে হুযূর-ই আকরাম সমাধান দেননি; কিছু বিস্তারিতভাবে, কিছু ইঙ্গিতে।

তিন তিনটি তোহফার বিনিময়
মি’রাজের সাক্ষাতে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে তিন বিষয় উপস্থাপন করলেন-
اَلتَّحِيَّاتُ لِلهِ وَالصَّلواتُ وَالطِّيّبَاتُ
(যাবতীয় মৌখিক ইবাদত, যাবতীয় দৈহিক ইবাদত এবং যাবতীয় আর্থিক ইবাদত), এবার আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে তিনটি দান করা হলো-
اَسَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِىُّ وَرَحَمْةُ اللهِ وَبَرَكَاتَه
(হে নবী আপনার উপর সালাম তথা শান্তি-বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত এবং তাঁর বরকতরাজিও। তখন হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এ সালাম, রহমত ও বরকতে আপন উম্মতদেরকে সামিল করে আরয করলেন-
اَلسَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلى عِبَادِ الله الصَّالِحِيْنَ
(এবং শান্তি বর্ষিক হোক আমাদের উপর এবং আল্লাহর সৎ কর্মপরায়ণ বান্দাদের উপরও।)

মি’রাজ থেকে হুযূর-ই আকরামের প্রত্যাবর্তন
আল্লামা সৈয়্যদ মাহমূদ আলূসী তাঁর তাফসীর-ই রূহুল মা‘আনী; ১৫শ খন্ড: ১২ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা ইসমাঈল হক্বক্বী হানাফী তাঁর তাফসীর-ই রূহুল বয়ান:২য় খন্ড: ৪০৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-
‘‘যখন বিশ্বকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মি’রাজ শরীফ থেকে ফিরে আসলেন তখন এ দিকে ঘরের দরজার শিকলটিও নড়ছিলো, বিছানা মুবারকও গরম ছিলো, আর ওযূর পানিটুকুও গড়াচ্ছিলো।’’
আল্লাহ্ তা‘আলা হুযুর-ই আক্রামের মি’রাজ থেকে ফিরে আসা নিয়ে শপথ করেছেন-وَالنَّجْمِ اِذَا هَوى তরজমা: ওই প্রিয় উজ্জ্বল নক্ষত্র মুহাম্মদের শপথ, যখন তিনি মি’রাজ থেকে অবতরণ করেন। [সূরা আন্নাজম: আয়াত-১১, কানযুল ঈমান]

সত্যায়ন
এ অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ সরওয়ারে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম হযরত উম্মে হানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার নিকট করেছিলেন। তিনি আরয করলেন, ‘‘এটা জনসাধারণের নিকট ব্যক্ত না করাই শ্রেয় হবে।’ কারণ, লোকেরা অস্বীকার করবে; কিন্তু হুযূর-ই আকরাম এরশাদ করলেন, ‘‘আমি সত্য কথাটা বলা থেকে কখনো বিরত থাকতে পারিনা। কেউ সত্যায়ন করুক কিংবা না-ই করুক। আবূ জাহল এ ঘটনা শুনা মাত্র হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের নিকট গেলো এবং এ সম্পর্কে তার মতামত জানতে চাইলো; কিন্তু তিনি বললেন- لَئِنْ قَالَ لَصَدَقَ অর্থাৎ যদি আমার আক্বা বলে থাকেন, তাহলে তিনি সত্যই বলেছেন। তাঁর যবান থেকে কখনো অসত্য কথা উচ্চারিত হতে পারে না। তিনি জগদ্বাসীকে এ শিক্ষাই দিয়ে দিলেন- عقل قربان كن پيش مصطفےঅর্থাৎ নিজের বিবেক-বুদ্ধিকে হুযূর মোস্তফার সামনে উৎসর্গ করে দাও।

কাফেলাগুলোর সাক্ষ্য
আবূ জাহল হুযূর-ই আকরামকে বললো, ‘‘আপনি কি এ ভ্রমনের কথা গোটা সম্প্রদায়কে তাদের সামনে বলতে প্রস্তুত আছেন?’’ তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়।’’ আবূ জাহল কাফিরদেরকে ডাকলো। যখন সকল গোত্রের লোকজন সমবেত হলো, তখন হুযূর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে পূর্ণ ঘটনা শুনালেন। তারা তালি বাজালো, উপহাস করলো। এক কাফির বললো, ‘‘আমরা জানি আপনি আজ পর্যন্ত বায়তুল মুক্বাদ্দাসে যাননি। বলুন তো সেটার দরজা ও স্তম্ভ কয়টি?’’ তখনই হযরত জিব্রাইল বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে হুযূর-ই আক্রামের সামনে করে দিলেন। হুযূর সেটার স্তম্ভ ও দরজার সংখ্যা বলে দিলেন। কাফিরগণ বললো, ‘‘হয়তো কারো নিকট শুনেছিলেন।’’ এমন কোন কথা জিজ্ঞাস করো, যা নতুন। এক কাফির বললো, ‘‘আমাদের ব্যবসায়িক কাফেলাগুলো ফিরে আসছে। আপনি কি তাদেরকে পথিমধ্যে দেখেছেন?’’ হুযূর-ই আকরাম বললেন, ‘‘হাঁ, তিনটি কাফেলা দেখেছি। ওইসব কাফেলার কথা ‘সীরাতে হালবিয়া’: ১ম খন্ড:৬২১ পৃষ্ঠায়, ‘খাসা-ইসে কুবরা’:১ম খন্ড: ১৮০পৃষ্ঠায় এবং আরো অনেক কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
হুযূর-ই আকরাম আরো বলেছেন, প্রথম কাফেলাটিকে ‘রাওহা’ নামকস্থানে দেখেছি। এ কাফেলা আগামী বুধবার সূর্যাস্ত নাগাদ এসে পৌঁছাবে। আমি দেখলাম, তাদের একটি উট হারিয়ে গেছে আর তারা সেটাকে তালাশ করছিলো। তারা তজ্জন্য খুবই পেরেশান ছিলো। আমি তাদেরকে ডেকে বলে দিলাম, তোমাদের উট অমুক জায়গায় আছে। তারা হতভম্ব হয়ে গেলো, এখানে (হযরত) মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কণ্ঠস্বর কিভাবে শোনা যাচ্ছে?
দ্বিতীয় কাফেলাটি ‘যী মারওয়া’ নামক স্থানে ছিলো। এ কাফেলা আগামী বুধবার দুপুর নাগাদ এসে পৌঁছবে, তাদের দু’জন লোক উটের পিঠে আরোহনরত ছিলো। যখন তাদের পার্শ্ব দিয়ে আমার বোরাক্বটি দ্রুতগতিতে যাচ্ছিলো, তখন উট ভয় পেয়ে গেলো এবং উভয় আরোহীকে নিচে ফেলে দিয়েছে।
তৃতীয় কাফেলাকে তান‘ঈম নামক স্থানে দেখেছি। এ কাফেলার আগে আগে সারিবদ্ধ হয়ে উট চলছিলো। এক উষ্ট্র-আরোহীর ঠান্ডা লেগে ছিলো। সে তার গোলামের নিকট কম্বল চাচ্ছিলো। এ কাফেলা একেবারে নিকটে এসে গেছে। সূর্য উদিত হতেই এখানে এসে পৌঁছবে।
সুতরাং বিশ্বকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যেভাবে বলেছেন, হুবহু সেভাবেই ঘটেছে। কাফেলাগুলোর ফিরে আসার বর্ণনার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। তারপর কাফিরগণ কাফেলাগুলোর লোকজনকে ওইসব আলামত ও নিশানা জিজ্ঞাসা করলো, যেগুলো হুযূর-ই আকরাম বলেছিলেন। তাঁরা সেগুলোর সত্যতা পেয়ে গেছেন। এটা দেখে তাদের মধ্যে অনেক কাফির ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।
পরিশেষে, সশরীরে মি’রাজ শরীফ হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরই অনন্য মু’জিযা। এ মু’জিযা এমন সত্য ও অকাট্য যে, অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এটা একদিকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অতুলনীয় শান যা সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রমাণ মিলে, অন্যদিকে আল্লাহ্ তা‘আলার পবিত্র দরবার থেকে সৃষ্টিজগৎ নামাযসহ অনেক নি’মাত ও অনুগ্রহ লাভ করে ধন্য হয়েছে। সর্বোপরি, এটা মুসলমানদের জন্য অতি গৌরব ও শোকরিয়ার বিষয় যে, আমরা মুসলমানরা এমন অতুলনীয় নবী ও আল্লাহর প্রিয়তম হাবীবের উম্মত হবার সৌভাগ্য লাভ করেছি। আল্লাহ্ আমাদেরকে এ নি’মাতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামর্থ্য দিন। আমীন।

লেখক: মহাপরিচালক- আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •