সায়্যিদুনা ইমাম হুসাইন’র অতুলনীয় চরিত্র মাধুর্য

0
সায়্যিদুনা ইমাম হুসাইন ’র অতুলনীয় চরিত্র মাধুর্য
মাওলানা মুহাম্মদ আবুল হাশেম
আহলে বায়ত-ই রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে নবী-দৌহিত্র সায়্যিদুনা ইমাম হুসাইন ইবনে আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমার অতি মহত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শুধু মুসলমান জনসাধারণের মধ্যেই নয়, বরং অমুসলিমদের নিকটও ব্যাপক পরিচিত। তাঁর এ মহত্ব ও উঁচু মর্যাদা শুধু খোদাপ্রদত্ত ফযিলতসমূহ ( যেমন- আহলে বায়তের মধ্যে শামিল হওয়া, সরাসরি হুযূর-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দৌহিত্র হওয়া, নবী-ই রহমতের সীমাহীন মুহাব্বত ও স্নেহ অর্জিত হওয়া, সায়্যিদাতু নিসা-ই আহলিল্ জান্নাত সায়্যিদাহ্ ফাতিমাতুয্ যাহরা’র ‘লখত-ই জিগর’ (কলিজার টুকরা প্রিয় সন্তান) ও হায়দার-ই র্কারার সায়্যিদুনা আলী মুরতাদ্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র ‘নূর-ই নযর’ (নয়নের মণি) হওয়া, গড়ন ও অবয়ব, চালচলন-স্বভাবচরিত্রে নবী আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সদৃশ্য হওয়া, ক্বোরাইশী ও সা-দাত-এর মধ্যে হওয়া, মাদীনা-ই মুনাও্ওয়ারায় জন্মগ্রহণ করা ইত্যাদি)-এর ভিত্তিতে নয়, বরং তাঁর অতুলনীয় ‘কামালাত’ (পূর্ণতাদি) যথা: চারিত্রিক পবিত্রতা, অনুপম আদর্শ, ইসলামের সেবা, আল্লাহ্র পথে তাঁর নিজের এবং আপন পরিবার-পরিজনের শাহাদাত এবং অদ্বিতীয় আত্মত্যাগ ও ক্বোরবানীর বদৌলতে অর্জিত। ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থসমূহে থেকে প্রাপ্ত তাঁর ফযিলত, মানক্বাবাত, স্নেহ, মুহাব্বত এবং খোদাপ্রদত্ত কামালাত ও কারবালার হৃদয়বিদারক দৃশ্য বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । এ প্রবন্ধে তাঁর জীবনের চারিত্রিক বিষয়াদি, সামাজিক জীবন এবং অন্যসব আচার-ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করার প্রয়াস পাচ্ছি-
 আহলে বায়তের সর্বাঙ্গিন পবিত্রতার জন্য নবভী দো‘আ:
হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু স্বীয় কর্ম ও সামাজিক জীবনে যেসকল উন্নত চরিত্র বা যে অনুপম আদর্শ ও চরিত্র মাধুর্য-এর বহিঃপ্রকাশ করেছেন, তাতে যেমনিভাবে তাঁর বংশীয় আভিজাত্য ও মর্যাদা, পবিত্র ঘরোয়া পরিবেশ, নুবূয়তী শিক্ষা, প্রতিপালন, সাহাবীগণের সংস্পর্শ এবং মদীনা মুনাও্ওরার সাধারণ পবিত্র পরিবেশ-এর কার্যকারিতা রয়েছে, অনুরূপ তাঁর পবিত্র চরিত্র মাধুর্য-এর ক্ষেত্রে নবভী দো‘আরও বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
عَنْ عُمَرَ بْنِ أَبِي سَلَمَةَ، رَبِيبِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ البَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا فِي بَيْتِ أُمِّ سَلَمَةَ، فَدَعَا فَاطِمَةَ وَحَسَنًا وَحُسَيْنًا فَجَلَّلَهُمْ بِكِسَاءٍ، وَعَلِيٌّ خَلْفَ ظَهْرِهِ فَجَلَّلَهُ بِكِسَاءٍ ثُمَّ قَالَ: اللَّهُمَّ هَؤُلاَءِ أَهْلُ بَيْتِي فَأَذْهِبْ عَنْهُمُ الرِّجْسَ وَطَهِّرْهُمْ تَطْهِيرًا.
“হযরত ওমর ইবনে আবূ সালামাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, যিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আশ্রয়ে লালিত পালিত হন। তিনি বলেন, উম্মে সালামাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা’র গৃহে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল: (তরজমা) “হে নবীর পরিবারবর্গ- আল্লাহ্ তো এটাই চান যে, তোমাদের থেকে প্রত্যেক অপবিত্রতা দূরীভূত করে দেবেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র করে অতীব পরিচ্ছন্ন করে দেবেন।[ ] তখন তিনি হযরত ফাতিমা, ইমাম হাসান ও হুসাইন-কে ডাকলেন এবং তাদেরকে একটি কম্বলের মধ্যে ঢেকে নিলেন। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম তাঁর পিছনে ছিলেন। তিনি (হুযূর করীম) তাঁকেও কম্বলের মধ্যে ঢেকে নিলেন। তারপর তিনি ইরশাদ করলেন: “হে আল্লাহ্! এঁরা আমার ‘আহলে বায়ত’ (পরিবারের সদস্য)। অতঃপর তুমি তাঁদের নিকট হতে অপরিচ্ছন্নতা দূর করে দাও এবং তাঁদেরকে পবিত্র করে অতীব পরিচ্ছন্ন করে দাও।”[ ] আলোচ্য হাদীস শরীফে বর্ণিত ‘ الرِّجْسَ ’ শব্দের অর্থ করতে গিয়ে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, الْإِثْمَ وَكُلَّ مَا يُسْتَقْذَرُ مُرُوءَةً তথা প্রত্যেক প্রকারের দৃশ্য ও অদৃশ্য গুনাহ্ এবং ওই আমল, যা মানবতা বিরোধী হয়।[ ] এ নবভী দো‘আর ফয়য (কল্যাণধারা) এমন যে, ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু চরিত্র মাধুর্যের দিক থেকে এত উঁচু পর্যায়ে উপনীত হন, যা তাঁর শান-মর্যাদার উপযুক্ত ছিল।
বিখ্যাত সীরাত প্রণেতা ইবনে আসীর হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র সাধারণ চরিত্র, স্বভাব-প্রকৃতিসমূহ সম্পর্কে সংক্ষেপে এভাবে বলেন:
وكان الحسين رضي اللَّه عنه فاضلًا كثير الصوم، والصلاة، والحج، والصدقة، وأفعال الخير جميعها.
“হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী, অধিক পরিমাণে রোযা, নামায, হজ্জ পালনকারী, সাদ্ক্বাহ্দাতা এবং সকল প্রকারের কল্যাণপূর্ণ কাজ সম্পাদনকারী ছিলেন।”[ ] নিচে তাঁর সামাজিক চরিত্র-শিষ্টাচার ও অনুপম আদর্শ সম্পর্কে সংক্ষেপে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি-
 বড় ভাইয়ের প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শন
ইসলামী চরিত্র, শিষ্টাচারের দিক থেকে ছোট ভাইয়ের উপর বড় ভাইয়ের প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শন করা তেমনি আবশ্যক, যেমনি পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক হয়। ছোট ভাইয়ের সামনে বড় ভাইয়ের মর্তবা ও মর্যাদা শরঈ’ দৃষ্টিকোণে পিতার সমান। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করে উম্মতের প্রশিক্ষণের জন্য অনুপম চরিত্র শিক্ষাদাতা ও সর্বোত্তম চরিত্রের ধারক রসূল-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
حُقُّ كَبِيرِ الْإِخْوَةِ عَلَى صَغِيرِهِمْ حَقُّ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ
“সকল ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাইয়ের হক্ব ছোট ভাইদের উপর ওই হক্ব-এর সমান, যা পিতার জন্য স্বীয় সন্তানের উপর অর্জিত।”[ ] হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু স্বীয় নানাজানের এ ইরশাদের উপর আমল করে আপন বড় ভাই হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে হৃদয়ের গহীন থেকে কীভাবে সম্মান জ্ঞাপন করেছেন একটু লক্ষ্য করুন:
 বড় ভাইয়ের সাথে সমান করা অপছন্দ করা
বড় ভাই ছোট ভাইয়ের সামনে স্বয়ং উপস্থিত থাকলে, তাহলে লজ্জার দাবি হয় যে, ছোট ভাই বড় ভাইয়ের সম্মান করবে, আর যদি সামনে উপস্থিত না থাকে, তখন এক্ষেত্রে সাধারণত এ বিষয়কে লক্ষ্য রাখা হয় না। কিন্তু ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আপন বড় ভাইজান হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র সম্মান ও আদবকে অনুপস্থিতিতেও লক্ষ্য রেখেছেন।
প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ ইবনে ক্বুতায়বাহ্ একটি ঈমান উদ্দীপ্ত ঘটানা লিখেছেন, এক ব্যক্তি হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র নিকট এসে সাহায্য প্রার্থনা করল, তখন হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাকে ইরশাদ করলেন, দেখো, ভিক্ষা করা জায়েয নেই, অধিক ঋণগ্রস্ত হওয়া অথবা অভাবী করে দেয় এমন দারিদ্র অথবা অর্থ দন্ড বা জরিমানার ক্ষেত্র ব্যতিরেকে। ওই ব্যক্তি আরয করল: আমি এ প্রকারের একটি সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আপনার নিকট এসেছি। তখন তিনি (ইমাম হাসান) তাকে ১০০ দীনার দেয়ার হুকুম দিয়েছেন। অতঃপর ওই ব্যক্তি হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নিকট আসল এবং তাঁর নিকটও সাহায্য চাইল। তিনি (ইমাম হুসাইন) ভিক্ষা বিষয়ে অনুরূপ কথা ব্যক্ত করলেন, যা হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও বলেছিলেন। সে একই উত্তর দিল, যা ইতিপূর্বে হযরত হাসানকে দিয়েছিল। তিনি (ইমাম হুসাইন) জিজ্ঞেস করলেন: “তিনি (ইমাম হাসান) তোমাকে কত অর্থ দিয়েছেন?” সে বললো: ১০০ দীনার। তিনি (ইমাম হুসাইন) এক দীনার কম করে ৯৯ দীনার তাকে দিয়েদিলেন। আর এ কথাকে অপছন্দ করলেন যে, বড় ভাইয়ের সাথে এ দানে সমান সমান করবেন। অতঃপর ওই ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নিকট এসে সাহায্য চাইল। তিনি কোন কিছু জিজ্ঞেস করা ছাড়াই তাকে সাত (৭) দীনার দিয়ে দিলেন। এরপর ওই ব্যক্তি তাঁকে বললো, আমি হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমার নিকট গিয়েছিলাম এবং তাদের সাথে হওয়া সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললো। তখন হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন:
ويحك و أنى تجعلنى مثلهما انهما غراء العلم غرا المال.
“তোমার উপর অবাক হই, তুমি আমাকে কীভাবে তাঁদের মত মনে করছো! নিশ্চয় তাঁরা দু’ভাই ইল্ম ও সম্পদের সমুদ্র।”[ ]
 খোদার সৃষ্টির প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা
দানশীলতা, পরোপকার এবং নিজ স্বার্থত্যাগ করার বহিঃপ্রকাশ হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র নিয়মিত আমল ছিল। যেমন- হাফিয ইবনে আসাকির আবূ হিশাম আল্ ক্বানাদ বসরীর মুখে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বর্ণনা করেন, “আমি (আবূ হিশাম) হযরত হুসাইন ইবনে আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র নিকট বসরা থেকে পণ্যসামগ্রী বিক্রির জন্য নিয়ে আসতাম। তিনি (ইমাম হুসাইন) দরাদরি করে আমার কাছ থেকে মূল্য কমাতেন। অতঃপর সেখান থেকে উঠার আগে আগে ওই ক্রয়কৃত পণ্যসামগ্রীর বেশিরভাগ অংশ লোকদের মাঝে দান করে দিতেন। আমি (আবূ হিশাম) আরয করলাম: হে রাসূলুল্লাহ্র সন্তান! আমি আপনার নিকট বসরা থেকে পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসি, আর আপনি নিয়ম মোতাবেক দরাদরি করে তাতে মূল্য কম করান, আর মজলিস থেকে উঠার আগে আগেই বেশিরভাগ পণ্যসামগ্রী লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেন, এর কারণ কী? তিনি (ইমাম হুসাইন) বলেন, আমার পরম সম্মানিত পিতা আমাকে এ মারফূ’ হাদীস শুনিয়েছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
اَلْمَغْبُوْنُ لَا مَحْمُوْدٌ وَلَا مَأْجُوْرٌ. “যে ব্যক্তি সওদা বা লেনদেনে ধোঁকার শিকার হয়, সে না প্রশংসার উপযুক্ত আর না প্রতিদান পাওয়ার।”[ ]
 হাদীস-ই নবভীর প্রতি লক্ষ্য রেখে বাহনের উপর মালিকের আগে বসা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
ইমাম-ই আলী মক্বাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সদাসর্বদা বড় বড় সাহাবীগণের প্রতি তাঁদের স্ব স্ব অবস্থান অনুযায়ী সম্মান প্রদর্শন করতেন। তাঁর আমল ও চিন্তাধারা এটাও ছিল যে, কোন সাহাবীর সম্মান প্রদর্শনের কোন ক্ষেত্রে ইসলামী চরিত্র, শিষ্টাচারের বিপরীত যেন না হয়। যেমন: প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা নূরুদ্দীন হায়সামী ইমাম বাকের ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম থেকে বর্ণনা করেন, “একবার হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু মদীনা-ই মুনাও্ওরার বাহিরে র্হারা নামক স্থানের নিকটবর্তী নিজের জমির দিকে যাওয়ার জন্য বের হলেন। পথিমধ্যে প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত নো’মান ইবনে বশীর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁকে দেখতে পেলেন, এমতাবস্থায় তিনি বাহন (খচ্চর)’র উপর আরোহী ছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইনকে পায়ে হেঁটে যেতে দেখে তিনি বাহন থেকে নেমে পড়লেন এবং বাহনকে ইমাম হুসাইনের নিকটে নিয়ে গিয়ে আরয করলেন: হে আবদুল্লাহ্! আপনি এটার উপর আরোহন করুন। কিন্তু তিনি (ইমাম হুসাইন) আরোহন করতে অপছন্দ করলেন। হযরত নো’মান ইবনে বশীর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বারবার বলার পরও যখন তিনি আরোহন করছিলেন না, তখন তিনি (নো’মান ইবনে বশীর) শপথ করলেন, আপনাকে যে কোন মূল্যে আরোহন করতেই হবে। এখন আরোহন করা ছাড়া কোন উপায় নেই। তখন তিনি (ইমাম হুসাইন) বললেন: আপনি শপথ করে আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছেন। এখন আপনি বাহনের আগে বসুন, আর আমি আপনার পিছনে বসবো। কেননা আমি আমার পরম সম্মানিতা মাতা (সায়্যিদাহ্ ফাতিমাতুয্যাহরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা) কে এ হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
الرَّجُلُ أَحَقُّ بِصَدْرِ دَابَّتِهِ، وَصَدْرِ فِرَاشِهِ، وَالصَّلَاةِ فِي مَنْزِلِهِ إِلَّا مَا يُجْمَعُ النَّاسُ عَلَيْهِ
“ব্যক্তি স্বীয় চতুষ্পদ প্রাণী (বাহন)-এর আগের অংশে বসার অধিক হক্বদার; অনুরূপ বিছানার অগ্রবর্তী অংশে বসার হক্বদার হচ্ছে বিছানার মালিক, আর গৃহের মধ্যে জামা‘আত সহকারে নামায পড়ার ক্ষেত্রে গৃহকর্তা নামাযের ইমামতি করার অধিক হক্বদার।” এ কথা শুনে হযরত নো’মান ইবনে বশীর বললেন: রাসূলুল্লাহ’র তনয়া সত্যই বলেছেন। আমি আমার পিতা বশীরকেও অনুরূপ বলতে শুনেছি, যা সায়্যিদাহ্ ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এও ইরশাদ করেছেন, إِلَّا مِنْ إِذْنٍ “কিন্তু ওই ব্যক্তি যাকে মালিক অনুমতি দেয়।” এটা শুনেই হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরোহন করেছেন।[ ]
 নিচে পড়ে থাকা লোক্বমা আহার করায় গোলামকে আযাদ করে দেন
আল্লামা মুহিব্বুদ্দীন ত্বাবারী বর্ণনা করেন, হযরত ইমাম আলী ইবনে মূসা রেযা থেকে বর্ণিত যে, হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু একদা প্রাকৃতিক প্রয়োজন সমাধা করতে বের হলেন, গোলামও সাথে ছিল। রাস্তায় নিচে পড়ে থাকা খাবারের লোক্বমা পেলেন, তখন সেটা উঠিয়ে নিয়ে গোলামের হাতে দিলেন এবং বললেন, ফেরার সময় আমাকে স্মরণ করিয়ে দিও। কিন্তু গোলাম সেটা আহার করে নিল। তিনি (ইমাম হুসাইন) প্রাকৃতিক প্রয়োজন থেকে অবসর হয়ে এসে গোলামকে ওই লোক্বমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সে বললো, আমার মুনিব! আমি ওই লোক্বমা খেয়ে নিয়েছি। একথা শুনে তিনি (ইমাম হুসাইন) ইরশাদ করলেন: “যাও, আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য তুমি আযাদ।” অতঃপর ইরশাদ করেন:
سمعت جدى رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : من وجد لقمة ملقاة فمسح أو غسل ثم أكلها أعتقه الله من النار-
“আমি আমার নানাজান রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এ কথা ইরশাদ করতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি কোন পড়ে থাকা লোক্বমা পেয়েছে, অতঃপর সেটাকে পরিষ্কার করে বা ধৌত করে আহার করে, তাহলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন।” তাহলে এ ইরশাদ-ই রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মোতাবেক যে ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা‘আলা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন, তাহলে আমি কীভাবে তাকে গোলাম বানাতে পারি?”[ ]
 কারবালা প্রান্তরে আপন সাথীদেরকে কষ্টে আপতিত করা থেকে দূরত্ব বজায়
মানবীয় ‘ফিত্বরাত’ (স্বভাব) হচ্ছে, বিপদ ও মুসীবতের সময় বেশি থেকে বেশি লোকের সাহায্য-সহযোগিতা প্রত্যাশী হয়, কিন্তু ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এমন সময়েও কাউকে কষ্ট এবং মুশকিলে ফেলে দেয়াকে পছন্দ করেন নি। এ মহৎ দৃষ্টিভঙ্গির এক ঝলক লক্ষ্য করুন: “হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ‘আশূরা’র রাতে আপন সকল সাথীকে একত্র করলেন, অতঃপর (এ সর্বাধিক মুশকিল ও পরীক্ষার সময়েও) আল্লাহ্ তা‘আলার প্রশংসা-বন্দনা বয়ান করলেন এবং ইরশাদ করেন: আমি এটা অনুভব করছি যে, এ লোকেরা (ইয়াযীদ বাহিনী) যে কোন উপায়ে আগামীকাল তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে। এমতাবস্থায় আমি তোমাদের সকলকে (স্বানন্দে) অনুমতি দিচ্ছি, তোমরা সকলেই আমার পক্ষ থেকে আযাদ, এখন রাতের অন্ধকার তোমাদেরকে ঢেকে নিয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তির নিকট সাহস হয়, সে আমার আহলে বায়ত-এর মধ্য থেকে কোন ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে নাও এবং তোমরা সকলে রাতের অন্ধকারে এখান থেকে বেরিয়ে পড়ো। ওই লোকদের (ইয়াযীদ বাহিনী) তো শুধু আমাকে প্রয়োজন। কাল যখন তারা আমাকে দেখবে, তখন তোমাদের খোঁজ করা ভুলে যাবে। এ নির্মল হৃদয়ের বাণীগুলো শুনে তাঁর আহলে বায়ত বললেন: لاَ أَبْقَانَا اللهُ بَعْدَكَ، وَاللهِ لاَ نُفَارِقُكَ، وَقَالَ أَصْحَابُهُ كَذَلِكَ.
“আল্লাহ্ তা‘আলা আপনার পর আমাদেরকে জীবিত না রাখুন। আল্লাহ্র শপথ! আমরা আপনাকে একা ছেড়ে যাব না। আর তাঁর অন্যসব সাথীও অনুরূপ অনুভূতি প্রকাশ করলেন।”[ ] ইসলামী আখলাক্ব, আ-দা-ব, তাহযীব-তমদ্দুন এবং প্রশংসনীয় গুণাবলি, ন¤্রতা-ভদ্রতা এককথায় সর্বোত্তম চরিত্র-মাধুর্য সমৃদ্ধ ছিল ইমাম-ই আলী মক্বাম, ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর পবিত্র সত্ত্বা। বিশ্ব মুসলিমের অনুপম আদর্শ বিনির্মাণে সুলতানে কারবালার অতুলনীয় চরিত্র-মাধুর্য ‘রোল মডেল’ হিসেবে সমুজ্জ্বল। আমাদের উচিত, তাঁর সুমহান আদর্শগুলোকে আঁকড়ে ধরা। এতেই রয়েছে আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি

টিকা.

আল্ ক্বোরআন, সূরা (৩৩) আহ্যাব, আয়াত: ৩৩
তিরমিযী, আস্ সুনান্, খ– ৫, পৃ. ৩৫১, হা/ ৩২০৫
মোল্লা আলী ক্বারী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ্ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ্, খ– ৯, পৃ. ৩৯৬২, হা/ ৬১৩৬
ইবনুল আসীর, আসাদুল গায়াত, ২/২৪
বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, খ– ১০, পৃ. ৩১৩, হা/ ৭৫৫৩
ইবনে মানযূর, মুখতাসার তারীখে দামেশ্ক্ব লি ইবনে আসাকির, ৭/১২৬
প্রাগুক্ত, ৭/১১৫
মাজমাঊয যাওা-ইদ ওয়া মান্বা‘উল ফাওয়া-ইদ, কিতাবুল আদব, ৮/১০৮, হা/ ১৩২৩১
মুহিব্বুদ্দীন ত্বাবারী, যাখা-ইরুল্ ‘ওক্ববা- ফী মানাক্বিবি যাভিল ক্বোরবা, পৃ. ১৪৩
যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা-, ৪/৩৬০

লেখক: পরিচালক- আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •