ভণ্ডামি

0

ভণ্ডামি
মুহাম্মদ ওহীদুল আলম
নিয়মতান্ত্রিকতার চাইতে একটু বেশি জোর দিয়েই বলা যায়, ধর্ম কখনো ভণ্ডামি শিক্ষা দেয় না। এরূপ দাবি করা অসংগতও নয়। তবে এ ঘোষণা এবং নির্দোষ অহঙ্কারের মাঝে একটা বিপদ আছে। বিপদটা তেমন হালকা পাতলা নয় বরং বেশ গুরুতর। আর সে স্থূলকায় ও গুরুতর বিপদটা হচ্ছে, ভন্ডরা অনেক সময় ধর্মের আড়ালে আশ্রয় নেয়। এ আশ্রয় নেয়া তার উদ্দেশ্যের পক্ষে যতই মানানসই হোক না কেন সে কিন্তু ধর্মের বিপক্ষে বিদ্বিষ্ট মানুষের হাতে একটা অজুহাতের অস্ত্র তুলে দেয়। তাদের কার্যকলাপে বিদ্বিষ্টরা বিতৃষ্ণ হয়, তারা কখনো ধর্মের পথ মাড়ায় না। যারা ধর্ম থেকে দুরে ছিল অন্য লোকের ভন্ডামির কারণে তারা আরও দুরে সরে যায়। তারা সন্দেহের চোখে দেখে তাদেরকে যারা ধর্ম সাপেক্ষ জীবন যাপনে অভ্যস্ত।
ভণ্ডরা শুধু ধর্ম কিংবা ধর্মপরায়ণদের বিপদগ্রস্ত করে না। তারা নিজেদেরকেও বিপদগ্রস্ত করে। ভণ্ডরা নিজেদেরকে খুবই বুদ্ধিমান মনে করে। নিজেদের বুদ্ধিমান ভাবার এ মানসিক তৃপ্তি বিপদের ফাঁদে পা দেয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ। অতি চালাকের গলায় দড়ি বলে সমাজে যে কথা চালু আছে শেষ পর্যন্ত সে দুরবস্থায়ই তাকে পড়তে হয়। কারণ বাম পা ফেললে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডান পা এগিয়ে আসে। তার উদ্দেশ্য তাকে পরিণতিতে পৌঁছে দেয়। অবশেষে তাকে সে রকম বিছানাতেই শু’তে হয় যে ধরণের বিছানা সে রচনা করে। সে বিছানা পায় সত্য কিন্তু ভণ্ডামির কারণে আরামের ঘুম তার জন্য হারাম হয়ে যায়।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে কিছু ভন্ড মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল। তারা মুসলমানদের কাছে যখন আসত তখন বলত ‘আমরা তোমাদের মত মুসলমান’ কিন্তু গোপনে যখন তাদের সাথীদের সাথে মিলিত হত তখন বলত, ‘আমরা তোমাদের সাথেই আছি, আমরাতো শুধু ওদের (মুসলমানদের) সাথে ঠাট্টা তামাশাই করি।’ এভাবে দু’ মুখো সাপের ভূমিকায় অভিনয় করে তারা নিজেদেরকেই ঠাট্টা তামাশার পাত্রে পরিণত করত। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারত না। বস্তুত নিজেদের অবস্থা ও অবস্থানকে বুঝতে না পারাই ভন্ডদের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত সত্যকে বুঝতে না পারাটাই তাদের জ্ঞানগত ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণ হবার নয়। আর জ্ঞানগত ঘাটতি জন্ম দেয় ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তের। তারা যে পার্থিব স্বার্থের জন্য ধর্মের ছায়াতলে আশ্রয় নেয় সেটা তাদের ভুল সিদ্ধান্তের উদাহরণ।
ধর্মের প্রকৃত সম্পর্ক মানুষের সৃষ্টিকর্তার সাথে। যারা ধর্মকে গ্রহণ করে তাদেরকে ¯্রষ্টার অভিপ্রায় সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। ¯্রষ্টার অভিপ্রায়ের বিপরীত আচরণ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আর তাঁকে কোনোক্রমেই ফাঁকি দেয়া যায় না। কারণ তিনি তাঁর সৃষ্টির আদ্যোপান্ত জানেন। তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন। মানুষ যা প্রকাশ করে কিংবা করে না সেসব কিছু তাঁর জানা। মানুষের অন্তরের গোপনস্থলে কী ভাবনার গুঞ্জরণ চলে তাও তিনি জানেন। কিন্তু ভণ্ডরা মনে করে তাঁকে ফাঁকি দেয়া যায়। মানসিক এ বিকারের কারণেই তারা অন্য মানুষের সাথে প্রতারণা করে। এ প্রতারণা তার পক্ষে আত্মপ্রতারণাও বটে।
আত্মপ্রতারকরা বেশিদুর পরিভ্রমণ করতে পারে না। একসময় তাদের মুখোশ খসে পড়ে। তারা ধরা পড়ে। ধর্মের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণার যে প্রচেষ্টা তারা গ্রহণ করে তার স্বরূপ যথাসময়ে প্রকাশ হয়ে পড়ে। প্রকৃতি তাদেরকে কোনো সুরক্ষা দেয় না। কারণ প্রকৃতি সবসময় ¯্রষ্টার ইচ্ছার অনুগামী। তাই ¯্রষ্টা ও প্রকৃতির ইচ্ছার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তারা শেষপর্যন্ত কোনো সুবিধা করতে পারে না। প্রকাশ হয়ে পড়ে তাদের স্বরূপ। ফলে একসময় নিক্ষিপ্ত হয় আস্তাকুঁড়ে।
এসব লোক নিজেদের সুরক্ষার জন্য যতই ধর্মের আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করুক না কেন ধর্ম কিন্তু কখনো তাদের সমর্থন করে না। কারণ ধর্ম মানুষকে চরিত্রবান হতে বলে চরিত্রহীন হতে বলে না। আর যার কথা ও কাজে সামঞ্জস্য নেই ধর্ম তাকে মুনাফিক বলেই চিহ্নিত করে। হাদিস শরিফে তার কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। সে যখন কথা বলে তখন মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খেয়ানত করে আর বিরোধ দেখা দিলে অশ্লীল বাক্যবাণের আশ্রয় নেয়। আর মিথ্যা বলা, ওয়াদার খেলাফ করা, আমানতের খেয়ানত করা ও অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করা কোনো ধর্ম পরায়ণ মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
ধর্মের দৃষ্টিতে ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক জীবনে কোনো পার্থক্য নেই। আবার ধর্মীয় জীবন ও পার্থিব জীবন বলে আলাদা কোনো বস্তু নেই। মানুষের জীবন বলতে একটাই। বরং পার্থিব জীবনে ধর্মের অনুশাসন মেনে চলাই ধর্মের শিক্ষা। ব্যক্তি জীবনে সৎ অথচ সামাজিক জীবনে অসৎ এরকম কোনো মানুষের জন্য ধর্মের কোনো ছাড়পত্র নেই। অধিকাংশ মানুষ ধর্মের প্রকাশ্য কিছু দাবি ব্যক্তিগত জীবনে পালন করে বৃহত্তর জীবনাচরণে অসদাচারণে লিপ্ত হতে বিেেবকের কোনোরূপ দংশন অনুভব করে না। তারা মনে করে ব্যক্তিগত কিছু পূণ্য দিয়ে বৃহত্তর জীবনের অসদাচরণের ক্ষতিপূরণ করা যাবে। উদাহরণ স্বরূপ, একজন মানুষ হয়তো খুব দানশীল, সমাজের ভূখা নাঙ্গা মানুষের জন্য তার দরদ চোখে পড়ার মত। কিন্তু এ মানুষই যদি ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে তাহলে ধর্ম কখনো তার সে অপকর্মকে অনুমোদন করবে না। সে যদি আল্লাহকে মানে তাহলে সে ব্যক্তিগত জীবনে যেমন তার মান্যতার প্রমাণ দেবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার প্রমাণ রাখবে। বক্তৃতার মঞ্চে নীতিবান, রাজনৈতিক ময়দানে ভ্রষ্টতার অনুচারী এমন বৈপরীত্যকে আল্লাহ গ্রহণ করেন না। কথায়, কাজে ও চিন্তায় যে সৎ সে-ই প্রকৃত ধার্মিক।
কোনো ধার্মিক ব্যক্তি যে কাজ সম্পাদন করেননি কখনো তিনি সে কাজের কৃতিত্ব গ্রহণ করেন না। আমরা দেখেছি কিছু মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করেও তার কৃতিত্ব গ্রহণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ভূয়া সার্টিফিকেট দিয়ে অনেকে সচিব পর্যন্ত হয়ে গেছে বলে পত্রিকায় খবর পরিবেশিত হয়েছে। অবস্থানগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অনেকে নানা অবৈধ পন্থায় সম্পদ ও প্রতিপত্তি অর্জনে এগিয়ে যায়। ধর্ম কখনো এ ধরণের অনৈতিকতাকে অনুমোদন দেয় না। সারা পৃথিবীতেই অনৈতিকতার জোয়ার চলছে। এর জন্য প্রকৃত ও অপ্রকৃত অনেক আহাজারিও চলে। কিন্তু ধর্মের নির্দেশনা মতে নৈতিক জীবন যাপন করার জোরালো কোনো আহ্বান শোনা যায় না। বিপরীতে ধর্মের বিরুদ্ধে বিরূপ বিদ্বেষ ছড়াতেই অনেককে উৎসাহী দেখা যায়। কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ আছেন যাঁদের সার্বক্ষণিক চেষ্টা মানুষকে ধর্মের পথ থেকে বিচ্যূত করা। মানুষের জীবনে ধর্মের প্রভাব শিথিল হয়ে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাক এটাই তাদের অভিলাষ। যদিও এঁরা সংখ্যায় নগণ্য কিন্তু প্রচার প্রপাগান্ডায় তাঁরা বিশাল শক্তিধর। বিশ্বের শীর্ষ সবকটি প্রচার মাধ্যম তাঁদের কণ্ঠকেই উচ্চকিত করে। ধর্ম কিংবা ধর্মের মর্মবাণী কোনটাকেই তাঁরা গ্রহণ করেন না। তাঁরা সূর্যের উত্তাপে দেহকে উত্তপ্ত করেন, আকাশে তারকার সৌন্দর্যকে উপভোগ করেন, পত্রপল্লব শোভিত সবুজ বনবনানীর ¯িœগ্ধতায় মুগ্ধ হন, চাঁদের দুধেল জোছনায় বিমোহিত হয়ে কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হন, সাগরের বিপুল জলরাশি ও এর উন্মত্ত ঊর্মিমালায় বিহ্বল হয়ে পড়েন, পাহাড়ের মহিমায় স্তব্ধ হয়ে পড়েন, পাখপাখালির কলকাকলিতে আনন্দের অজানা রাজ্যে হারিয়ে যান, অথচ সেই সূর্য, আকাশ, তারকা, বৃক্ষ পত্রপল্লব, চাঁদ, সাগর, পাহাড় ও পাখপাখালির ¯্রষ্টাকে অনুসন্ধান করার তাগিদ অনুভব করেন না। মানুষ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যকেই অনুভব করে নি বরং প্রাকৃতিক শৃংখলার নিয়ম কানুনকেও আবিষ্কার করেছে। মানুষ যদি এর পেছনের রহস্য ও শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারত তাহলে সহজেই বুঝতে পারত প্রাকৃতিক এ নিয়মশৃংখলা যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই মানুষের জন্য জীবন বিধান দিয়েছেন। ধর্ম মানুষকে এ রহস্যের সন্ধান দিয়েছে। যারা এ রহস্যের খোঁজ পায়নি তারা নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী হয়েছে আর যারা সে রহস্যকে ভুলভাবে গ্রহণ করেছে তারা হয়েছে ভণ্ড।
পুলিশের পোশাক পরে যেমন ডাকাতি করা যায় তেমনি ধর্মের মুখোশ পরে ধর্মহীনতার কাজ করা যায়। ডাকাতের গায়ে পুলিশের পোশাক দেখে পুলিশ বাহিনীকে যেমন দোষ দেয়া যায় না, তেমনি কোনো ভণ্ডের অপরাধের জন্য ধর্মকে দায়ি করা যায় না। ভারতের গুরমুত সিং ধর্মের মুখোশ পরে দীর্ঘদিন ধরে লাখ লাখ শিষ্য শিষ্যা পরিবেষ্টিত হয়ে সমাজে দোর্দন্ড দাপট চালিয়েছে। সে নাম গ্রহণ করেছে রাম রহিম গুরমুত সিং। এতে বিভিন্ন ধর্মের সরলপ্রাণ মানুষকে সে নিজের কাছে টেনেছে। তারা তাঁর জানবাজ ভক্তে পরিণত হয়েছে। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে পুঁজি করে সে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, অর্থবিত্ত সম্পদের মালিক হয়েছে। সে শুধু সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করেনি, সে আদায় করেছে সামাজিক সম্মান, প্রশাসনিক সমীহ এবং রাজনীতিবিদদের সম্ভ্রম। ক্ষমতার পূজারীরা লালায়িত হয়েছে তার হাতের তালুর আশীর্বাদ প্রাপ্তির জন্য। তার আসন স্থাপিত হয়েছে সর্বসাধারণের উর্ধে এক অলৌকিক অবস্থানে। অথচ ধর্ম সাধনার নামে সে প্রবৃত্তির পূজো করেছে। আর এসবের আড়ালে সে চরিতার্থ করেছে তার বিকৃত যৌন লালসা। হানীপ্রীত নামে এক মহিলাকে সে বানিয়েছে তার ধর্মকন্যা। আসলে সে ছিল তার যৌন সঙ্গী। তীক্ষèদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের সন্দেহ বরাবর তার দিকে ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু দাপটের কাছে দানা-বাঁধা সন্দেহ বাস্তবে প্রমাণ করা সহজ ছিল না। এক পাপ তাকে অন্য পাপের দিকে নিয়ে গেছে। বিরুদ্ধবাদীদের খুন পর্যন্ত করিয়েছে সে। পাপ যখন ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে তখনই তার মুখোশ গেছে খুলে। প্রকৃতির হাত ধরে আইন এগিয়ে এসেছে। আইনকে এগিয়ে নিয়েছে আদালত। তার বিচার হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে অপরাধ। তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। পালিয়ে ছিল হানীপ্রীত। শেষ পর্যন্ত সেও নিজেকে আদালতে সমর্পণ করেছে। ভন্ডরা ক’দিনই বা গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে? লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপনে চলছে মানুষের প্রতিমুহূর্তের কর্মকাণ্ডের রেকর্ডিং। মানুষ কি এ বিষয়ে সচেতন আছে?
শুধু ধর্ম নিয়ে ভন্ডামি নয়। রাজনীতি নিয়েও সমান তালে ভণ্ডামি চলে। পৃথিবীতে রাজনীতি মানুষকে সোনার থালে দুধভাত খাওয়াবার অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচনকালীন প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কত অংশ পূরণ হয়েছে বাস্তব জীবনে? ‘সামনে আসছে শুভদিন’ এ স্লোগান বধিরও শুনেছে শতকোটিবার। জনতার ভাগ্যে জোটেনি সে শুভদিন দেখার, নেতাদের কেউ কেউ হয়তো তার সাক্ষাৎ পেয়েছে। ঘুরে গেছে তাদের ভাগ্যের চাকা। দেশের চৌহদ্দি পরিধি না বাড়লেও নেতাদের কারো কারো দখলীয় ভূমির পরিমাণ বেড়ে গেছে শতগুণ, বিপরীতে হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়েছে ভূমিহীন। মানুষের স্বাধীনতার জন্য কত মায়াকান্না কেঁদেছে রাজনীতি অথচ শেষ পর্যন্ত তা পর্যবসিত হয়েছে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীনদের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতায়। আপামর জনসাধারণের কপালে জুটেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাসত্ব। ক্ষমতাসীনদের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার কবলে পড়ে উৎখাত হয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিম, চিরতরে অন্ধ হয়েছে স্বাধীনতাকামী কাশ্মিরী তরুণ, ঘরওয়াপসি আন্দোলনে পৌত্তলিকতায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে ভারতের বিশ্বাসী মুসলিম, গরুর কারণে জবাই হয়ে যাচ্ছে মানুষ, জায়নামায, কুরআনশরিফ, তসবিহসহ ধর্মীয় সকল পরিচিহ্ন রাষ্ট্রের হাতে জমা দিতে বাধ্য হচ্ছে উইঘুর, ঝিংজিয়াং এর নাগরিক, নিজ জন্মভূমিতে শান্তিতে থাকতে পারছে না ফিলিস্তিনের বাসিন্দারা। ক্ষমতাবানদের ‘ভেটো’র কারণে বানচাল হয়ে যাচ্ছে মানুষের বাঁচার অধিকার। হায় রাজনীতি! হায় ভণ্ডামি!
কিছুদিন পূর্বে ইউটিউবে একটা ছবি পোস্ট হয়েছিল। একটা বিড়ালকে কোলে নিয়ে পানির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অসংখ্য মানুষের সাথে ঝড়ের কবলে পতিত এ বিপন্ন বিড়ালকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। এতে ফুটে ওঠেছে তাঁর মানবতাবাদী রূপ। এ ছবি ছেড়েছিল ট্রাম্পের এক ভক্ত। ছবিটি দেখে ট্রাম্পের সমর্থক তো বটেই, তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা পর্যন্ত বাহবা দিতে থাকেন। চারিদিকে ধন্য ধন্য রব পড়ে যায়। কিন্তু আসল কথা ফাঁস করে দেয় একটা পত্রিকা। তারা জানায় ছবিটা দু’বছর আগের। প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ে এক বিড়ালের মালিক তার পোষা বিড়ালকে কোলে নিয়ে পানির ভেতর দিয়ে নিরাপদ ডাঙ্গায় আশ্রয় নিতে যাচ্ছিলেন। সে ছবির লোকটির মুখ কেটে ফটোশপের মাধ্যমে সেখানে ট্যাম্পের ছবি পেস্ট করে দিয়েছিল তাঁর ভক্ত। মিথ্যা জনপ্রিয়তা অর্জনের আশায় এমন একটা উদ্ভট পরিকল্পনা এক রাজনৈতিক বুদ্ধিই বটে!
হিটলার পোলান্ড আক্রমণের অজুহাত তৈরি করেছিলেন এমনি এক রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। তিনি মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত কতিপয় জার্মান সৈনিকের লাশকে পোলান্ডের সেনাবাহিনীর পোশাক পরিধান করিয়ে জার্মান সীমান্তে শুইয়ে রেখে তার ছবি ছাপিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, পোলান্ডই তাঁর দেশ আক্রমণ করেছে। রাজনৈতিক বুদ্ধি আর কাকে বলে!
এবার সাংস্কৃতিক ভন্ডামির একটা উদাহরণ দেই। ২০১৫ সালের ঘটনা। নেদারল্যান্ডসের দু’জন শ্বেতাঙ্গ ডাচ নাগরিক ডাচ ভাষায় অনূদিত খ্রিষ্টানদের পবিত্র বাইবেলের একটি কপিকে পবিত্র কুরআনের মলাট পরিয়ে জনসমক্ষে উপস্থিত হয়। তারা লোকজনদের জানায়, এটা মুসলমানদের কুরআন। অতঃপর তা শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিদের হাতে দিয়ে তা থেকে কিছু বাছাই করা অনুচ্ছেদ পাঠ করতে বলে। নির্দেশ অনুযায়ী তারা উপস্থিত মানুষদের পাঠ করে শোনায়, “আমি কোনো স্ত্রীলোকের পাঠগ্রহণ অনুমোদন করিনা.. .. কোনো স্ত্রীলোক যদি অবাধ্য হয় তার হাত কেটে ফেলো.. ..।” এগুলো শুনে শ্রোতারা ‘ইসলাম ধর্ম কী নিষ্ঠুর’ বলে ধিক্কার দিতে থাকে। অথচ কথাগুলো ছিল বাইবেলের, বইটাও ছিল বাইবেল।
এ ঘটনার বর্ণনাকারী কানাডার একজন কলামিষ্ট। তাঁর নাম পারদকার। কানাডার বৃহত্তম পত্রিকা টরেন্টো স্টার-এ প্রকাশিত এক কলামে তিনি পাশ্চাত্যের কোন কোন মহল পরিকল্পিতভাবে ইসলামকে ‘সন্ত্রাসের ধর্ম’ বলে প্রচারের যে অপপ্রয়াস চালায় তার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি প্রসঙ্গক্রমে এ ঘটনার উল্লেখ করেন। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল: We should stop labelling Terrorists as `Islamists’ and `Islamic’.. লেখাটি ছাপা হয়েছিল ২৪ মে ২০১৭ ইং।
মানুষের ভণ্ডামি কোনো একটি যুগে, কোনো একটি বিশেষ দেশে বা বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পৃথিবীতে বিশুদ্ধ ধার্মিক, সৎ রাজনীতিক ও মহৎ সংস্কৃতি চর্চাকারী মানুষ আছেন। আমাদেরকে অবশ্যই তাঁদের দলভুক্ত থাকতে হবে।
লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বিশিষ্ট কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। ৩৬৪/১, এলিফ্যান্ট রোড, নিউ মার্কেট, ঢাকা-১২০৫।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •