আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি মিথ্যা ও ওয়াদা ভঙ্গের অপবাদ

0

সম্পূর্ণ পূত-পবিত্র আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি
মিথ্যা ও ওয়াদা ভঙ্গের অপবাদের
খণ্ডন
তানযীহুর রহমান ‘আনিল কিয্বি ওয়ান্ নুক্বসান
[মিথ্যাসহ সব ধরনের দোষ-ত্রুটি থেকে
পরম করুণাময়ের পবিত্রতার বিবরণ]
লেখক
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

প্রথম প্রকাশ : ১৫ শা’বান, ১৪৩৪ হিজরী
১০ আষাঢ়, ১৪২০ বাংলা
২৪ জুন, ২০১৩ ইংরেজী

কম্পোজ : মুহাম্মদ ইকবাল উদ্দীন
প্রকাশনায়
আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট
৩২১, দিদার মার্কেট (৩য় তলা) দেওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম-৪০০০,
হাদিয়া : ৫০/- টাকা মাত্র
সূচীপত্র
 মুখবন্ধ ৪
 ‘আল্লাহ্’ নামের সংজ্ঞা ৭
 আল্লাহ্ পাকের প্রতি মিথ্যা ও ওয়াদা ভঙ্গের সর্বপ্রথম অপবাদদাতা কে? ৭
 এ ভ্রান্ত আক্বীদার বিভিন্ন ফির্কাঃ মীর্যায়ী ফির্ক¡া ৭
 ফির্ক্বা-ই ওয়াহ্হাবিয়া-ই আমসালিয়াহ্ ৮
 ফির্ক্বা-ই ওয়াহহাবিয়া কায্যাবিয়্যাহ্ ৯
 ফির্ক্বা-ই ওয়াহ্হাবিয়া শয়ত্বানিয়াহ্ ১০
 ‘ইন্নাল্লা-হা ‘আলা-ক্বুল্লি শায়ইন ক্বাদীর’-এর ভ্রান্ত তাফসীর ও ওহাবীদের দাবী ১১
 উক্ত আয়াতের সঠিক তাফসীর: তাফসীর-ই খাযাইনুল ইরফান ১২
 তাফসীর-ই নূরুল ইরফান ১২
 তাফসীর-ই জালালাঈন ১৩
 তাফসীর-ই নাঈমী ১৩
 ‘ইমকান-ই কিয্ব’-এর মাসআলা ১৫
 এ সম্পর্কে মুফতী আহমদ ইয়ার খান আলায়হির রাহমাহ্র বিস্তারিত আলোচনা ১৫
 ইমকান-ই কিয্বের প্রসঙ্গে বিভিন্ন আপত্তি ও তার খণ্ডন ১৯
 ক্বোরআন করীমের অন্যান্য আয়াতে আল্লাহর সত্যবাদিতার ঘোষণা ৩০
 তাফসীর-ই খাযিন ৩০
 তাফসীর-ই মাদারিক ৩১
 তাফসীর-ই বায়দ্বাভী ৩১
 তাফসীর-ই আবুস্ সাঊদ ৩১
 তাফসীর-ই কবীর ৩২
 তাফসীর-ই রূহুল বয়ান ৩২
 এ প্রসঙ্গে জমহুর ওলামা-মাশাইখের দৃষ্টিভঙ্গি : শরহে মাওয়াক্বিফ ৩৩
 মুসা-য়ারাহ্ ও শরহে মুসা-য়ারাহ্ ৩৩
 শরহে আক্বাইদ ৩৪
 মুসাল্লামুস্ সুবূত ৩৪
 শরহে ফিক্বহ-ই আকবর ৩৫
 শরহে আক্বাঈদ-ই জালালী ৩৫
 আক্বাঈদ-ই আদ্বদ্বিয়াহ্ ৩৫
 এ প্রসঙ্গে বুযুর্গান-ই দ্বীনের আক্বীদা ৩৬
 হযরত গাউসুল আ’যম শায়খ আবদুল ক্বাদির জীলানীর আক্বীদা ৩৬
 ফাতাওয়া-ই আলমগীরির মুফতীগণের আক্বীদা ৩৬
 ইমাম-ই রব্বানী মুজাদ্দিদ-ই আলফেসানীর আক্বীদা ৩৬
 শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস-ই দেহলভীর আক্বীদা ৩৬
 শাহ্ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস-ই দেহলভীর আক্বীদা ৩৭
 আল্লামা তামারতাশীর আক্বীদা ৩৭
 আল্লামা ইব্রাহীম বা-জূরীর আক্বীদা ৩৭
 আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা বেরলভীর আক্বীদা ৩৭
 মাওলানা মুফতী খলীল আহমদ ক্বাদেরী বরকাতীর দীর্ঘ আলোচনা ৩৮
تَنْزِيْهُ الرَّحْمن عَنِ الْكِذْبِ وَالنُّقْصَانِ
তানযীহুর রাহমান ‘আনিল কিয্বি ওয়ান্ নুক্বসান
بسم الله الرحمن الرحيم
اَلْحَمْدُ ِللهِ السُبُّوْحِ الْقُدُّوْسِ وَالصَّلوةُ وَالسَّلاَمُ عَلى الْحَبِيْبِ الْمَحْمُوْدِِ
وَعَلى الِه الطَّيِّبِيْنَ الطَّاهِرِيْنَ وَصَحْبِهِ الرَّاشِدِيْنَ الْمُرْشِدِيْنَ اَجْمَعِيْنَ
মুখবন্ধ
যে ই’তিক্বাদ বা দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তিতে কেউ মু’মিন-মুসলমান হয়, তা হচ্ছে সর্বাগ্রে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের উপর দৃঢ় বিশ্বাস। ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের প্রথম হচ্ছে কলেমা-ই তাইয়্যেব। কলেমার প্রথম অংশ হচ্ছে ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ্’। সুতরাং ‘আল্লাহ্’ সম্পর্কে কারো বিশ্বাস বিশুদ্ধ না হলে, তাকে মু’মিন-মুসলমান বলার প্রশ্নই আসে না। আর এ বিশ্বাস তখনই বিশুদ্ধ হবে, যখন আল্লাহকে এক, সকল উত্তম গুণের অধিকারী ও সর্বপ্রকার দোষত্র“টি থেকে মুক্ত ও পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়; অন্যথায় নয়।
কিন্তু আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, চট্টগ্রামের ওহাবী সম্প্রদায়ের বড় মাদ্রাসার বড় হুযূর, মুহতামিম, সাম্প্রতিককালে গঠিত ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’-এর প্রধান মৌং আহমদ শফী সাহেব প্রচার করে আসছেন যে, ‘আল্লাহ্ পাক মিথ্যা বলতে পারেন, তিনি ওয়াদা খেলাফও করার ক্ষমতা রাখেন।’ (না‘ঊযুবিল্লাহ্) আমরা আরো লক্ষ্য করছি যে, ইতোপূর্বে আহমদ শফী সাহেব ‘ভিত্তিহীন প্রশ্নাবলীর মূলোৎপাটন’ শিরোনামের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে এমন জঘন্য আক্বীদা বা ভ্রান্ত বিশ্বাসটা প্রচার করেছেন। তার প্রতি যখন পাঠক সমাজের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো এবং তাঁদের দৃষ্টিতে তা দৃষ্টিকটু ও জঘন্য ঠেকলো এবং তা নিয়ে আলোচনা হতে লাগলো আর বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকতা লাভ করতে লাগলো, তখন হাটহাজারী ওহাবী মাদরাসার ‘ফাত্ওয়া বিভাগ’ ‘ভ্রান্তি নিরসন ও আক্বীদা সংশোধন’ শিরোনামের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করলো। পুস্তিকাটি প্রচার করলো ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’-এর প্রচ্ছদের উপরিভাগে লেখা হয়েছে-
‘‘আল্লাহ্ পাক মিথ্যা বলার ক্ষমতা রাখেন; কিন্তু বলেন না। আল্লাহ্ পাক ওয়াদা খেলাফ করার ক্ষমতা বা শক্তি রাখেন; কিন্তু খেলাফ করেন না।’’ [সূত্র. আঃ আহমদ শফী দা.বা. রচিত ‘ভিত্তিহীন প্রশ্নাবলীর মূলোৎপাটন’] পুস্তিকাটার প্রচ্ছদটুকু দেখলে মনে হবে হয়তো মাদ্রাসাটার ফাত্ওয়া বিভাগের মুফতী সাহেবগণ আহমদ শফী সাহেবের উক্ত আক্বীদাটাকে ‘ভ্রান্ত’ বলে আখ্যায়িত করে তাদের সংশোধিত আক্বীদা (আল্লাহর শান রক্ষামূলক আক্বীদা) প্রকাশ করে মুসলিম সমাজকে এক মহাভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি থেকে হেফাজত বা রক্ষা করেছেন আর ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ তা প্রচারের দায়িত্বটুকু পালন করছে; কিন্তু সেটা পাঠ করলে বুঝা যায় তার বিপরীতটাই। তারা আহমদ শফী সাহেবের উক্ত আক্বীদাটাকেই প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের প্রচেষ্টা চালানোর মত দুঃসাহসই দেখিয়েছেন। কারণ, পুস্তিকাটার ৩য় পৃষ্ঠায় অর্থাৎ এ প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্যের শুরুতেই তারা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘তাদের উক্ত আক্বীদা নাকি যথার্থ। তাতে আল্লাহর শানে নাকি সামান্য কটুক্তিও করা হয়নি; আক্বীদাগত দিক থেকে তাদের সামান্য ত্র“টিও নেই; বরং এর বিপরীত আক্বীদা পোষণ করাই নাকি ঈমান বিধবংসী। অর্থাৎ আল্লাহকে ‘মিথ্যা বলা ও ওয়াদা খেলাফ করার ক্ষমতাসম্পন্ন’ বলে বিশ্বাস করলেই নাকি তাদের ঈমান পাক্কা হয়, আর তাঁকে মিথ্যা ও ওয়াদা খেলাফ করতে অক্ষম বললেই নাকি ঈমান ধবংস হয়ে যাবে।’ (না‘ঊযুবিল্লাহ্)
আরো লক্ষ্যণীয় যে, উক্ত পুস্তিকায় আহমদ শফী সাহেবের প্রচারিত উক্ত আক্বীদার পক্ষে তার পরিচালিত মাদরাসার ‘ফাত্ওয়া বিভাগ’ বিভিন্ন উদ্ধৃতি বরাতের ফুলঝুরিতে সজ্জিত করে বহু দলীল প্রমাণও! উপস্থাপন করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। শুধু তা নয়; পুস্তিকাটায় প্রকারান্তরে গণমানুষকে আল্লাহ্ সম্পর্কে এহেন জঘন্য আক্বীদা পোষণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তাছাড়া, আহমদ শফী সাহেব তার দাবীর শেষাংশে ‘কিন্তু আল্লাহ্ মিথ্যা বলেন না এবং ওয়াদা খেলাফ করেন না’ বলে সাফাইও গেয়েছেন; অথচ এ শেষোক্ত বাক্যটা না তাকে আল্লাহর প্রতি অপবাদ থেকে মুক্ত করতে পারে, না আল্লাহ্ সম্বন্ধে তার আক্বীদার বিশুদ্ধি প্রমাণ করতে পারে, বরং তা আল্লাহর প্রতি তাদের উপহাস করারই নামান্তর হয়েছে। বস্তুত ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ নামক ওহাবী সংগঠনটার প্রধান ও একটি কওমী মাদ্রাসার মহাপরিচালকের একদিকে খোদাদ্রোহী নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে বড় বড় সমাবেশ, লংমার্চ, রাজধানী অবরোধ, ১৩ দফা দাবী পেশ ও তা মেনে নেওয়ার জন্য মারাত্মক চাপসৃষ্টি, হত্যাযজ্ঞ, মাযার ভাংচুর, ক্বোরআন মজীদ, গাড়ী ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, মানুষের সম্পদ বিনষ্টকরণ এবং ভয়ঙ্কর হুমকি-ধমকি, অন্যদিকে মহান আল্লাহর শানে এমন মানহানিকর মন্তব্য ও তা প্রতিষ্ঠার জোর প্রচেষ্টা চালানো দেখে মুসলমানগণ হতবাক হয়েছেন। পক্ষান্তরে, নাস্তিকরা বিশেষত আল্লাহর শানে অশালীন মন্তব্য করার পক্ষে একটি যুক্তিও খুঁজে পেয়েছে।
আমরা সুন্নী মুসলমানগণ যেহেতু আগে থেকেই এসব ওহাবী-দেওবন্দী ও কওমীদের আক্বীদা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত আছি, ইসলামের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি ও ইতিহাসে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাদের আক্বীদা বা বিশ্বাসগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে আমাদের দক্ষ সুন্নী ইমাম ও ওলামা-মাশাইখ তাদের সব ভ্রান্ত মতবাদ ও অ-ইসলামী কর্মকাণ্ডের সপ্রমাণ খণ্ডন করে নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণ্য কিতাবাদি রচনা করে গেছেন, সর্বোপরি, এসব ওহাবী-দেওবন্দী-কওমীরা তাদের বর্তমানকার চরম উত্থানের মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা, দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ধ্বংসের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, সেহেতু মৌং আহমদ শফী সাহেব ও তার ‘হেফাজত পার্টি’র উক্ত আক্বীদা, তাদের ইতিহাস ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া এবং ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদা থেকে যাতে মানুষ বিচ্যুত না হয় তজ্জন্য সতর্ক করে দেওয়া আজ সুন্নী ওলামা ও মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। এ পবিত্র দায়িত্ব পালনার্থেই এ পুস্তক লেখার প্রয়াস পাচ্ছি।
এতে আহমদ শফী সাহেবের উক্ত আক্বীদা ও তার পক্ষে প্রদত্ত সব প্রমাণের যথাযথ খণ্ডন করা হয়েছে এবং এ সম্পর্কে ইসলামের সঠিক আক্বীদাটুকু অতি শালীনতা ও অকাট্য প্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ পুস্তকে এ কথাও খণ্ডনসহ স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, দেওবন্দী-ওহাবীরা মহান আল্লাহকে মিথ্যা বলা, ওয়াদা খেলাফ করাসহ যাবতীয় অপকর্ম ও দোষত্র“টি করার যোগ্য (بالقوة) বলে বিশ্বাস করে, যদিও বাস্তবে (بالفعل) তা করেন না বলে সাফাইও গায়। অথচ যেহেতু আল্লাহর পূত-পবিত্র মহান সত্তা পর্যন্ত কোনরূপ দোষত্র“টি পৌঁছারও কোন উপায় নেই, সেহেতু তিনি মিথ্যা বলেন না ও ওয়াদার খেলাফ করেন না বলার কোন অর্থই হয় না। বস্তুতঃ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেউ কোন মন্দ কাজ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা করেন না মর্মে প্রশংসার উপযোগী বলা বৈধ হলেও আল্লাহ্ তা‘আলার শানে এভাবে বলার কোন অবকাশই নেই এবং তা সমীচিন কিংবা বৈধও নয়; বরং তিনি কোন ‘মন্দ কাজ করতে পারেন’ বলতেই তার ঈমান চলে যায়, ‘কিন্তু করেন না’ বললেও ‘বে-ঈমানী’ থেকে বাঁচতে পারবে না। সুতরাং একজন মু’মিনের ঈমানের দাবী হচ্ছে আল্লাহকে সব ধরনের দোষ-ত্র“টি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র বলে বিশ্বাস করা।
—০—
‘আল্লাহ্’ নামের সংজ্ঞা-
عَلَمٌ لِذَاتِ الْوَاجِبِ الْوَجُوْدِ مُسْتَجْمِعٌ لِجَمِيْعِ صِفَاتِ الْكَمَالِ‘اللهُ’
অর্থাৎ ‘আল্লাহ্’ এমন মহান সত্তার নাম, যাঁর অস্তিত্ব অনিবার্য, (যিনি চিরজীবী, চিরস্থায়ী, তাঁর জন্য মৃত্যু অসম্ভব,) যিনি সমস্ত উত্তম গুণেরই ধারক, যে কোন মন্দ গুণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। [আক্বাইদ গ্রন্থাবলী] এ সর্বজন স্বীকৃত সংজ্ঞা থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহকে চিরঞ্জীব, চিরজীবী এবং সমস্ত ভাল গুণের ধারক ও যে কোন দোষ-ত্র“টি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র মানলেই একমাত্র আল্লাহ সম্পর্কে কারো ঈমান বিশুদ্ধ হতে পারে, অন্যথায় নয়।
পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহ্কে ‘মিথ্যা বলতে ও ওয়াদা খেলাফ করতে সক্ষম’ বলে বিশ্বাস করে, তারা এ জঘন্য ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে না পারা পর্যন্ত কোন্ ভ্রান্ত ফির্কার অন্তর্ভুক্ত রয়ে যাচ্ছেন তাও জানা দরকার।
আল্লাহ্ পাক সম্পর্কে এ ভ্রান্ত আক্বীদার জন্মদাতা হচ্ছে ভারতের দেওবন্দীরা
পবিত্র ক্বোরআনের সূরা বাক্বরার ২০নং আয়াতের শেষাংশ-
اِنَّ اللهَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
(নিশ্চয় আল্লাহ্ প্রত্যেক ‘শাই’-এর উপর ক্ষমতাবান)-এর ‘শাই’ শব্দের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সর্বপ্রথম দেওবন্দীরা আল্লাহ্ সম্পর্কে এমন জঘন্য আক্বীদার জন্ম দিয়েছেন। [তাফসীর-ই নঈমী, ১ম খণ্ড, কৃত. মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী, রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি] উল্লেখ্য, এ আয়াত শরীফের, দেওবন্দীরা যেই ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার উদ্ধৃতি ও সপ্রমাণ খণ্ডন একটু পরে করছি। ইতোপূর্বে জানা দরকার যে, উপমহাদেশে ভ্রান্ত আক্বীদার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ফির্ক্বা বা উপদলও আত্মপ্রকাশ করেছে।
তাদের মধ্যে একটি দল হচ্ছে- ‘মির্যায়ী ফির্ক্বা’ বা ‘গোলামিয়া ফির্ক্বা’। তাদের সম্পর্ক হচ্ছে- ভণ্ডনবী গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর সাথে। সে একজন ‘দাজ্জাল’, এ যুগে পয়দা হয়েছে। তার রয়েছে বহু কুফরী আক্বীদা। সে ভণ্ড নুবূয়তের দাবীদার হয়ে মুরতাদ্দ্ হয়েছে। উল্লেখ্য, হাটহাজারীসহ বাংলাদেশী ওহাবীদের মুরব্বী, দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মৌং ক্বাসেম নানূতবী সাহেব পবিত্র ক্বোরআনের আয়াতের ‘খাতাম’ শব্দের ভুল ব্যাখ্যা দেন। অর্থাৎ ‘আমাদের নবী করীমের পর কোন নবী আসলেও নবী করীমের শেষ নবী হবার মধ্যে অসুবিধা নেই’ বলে ফাত্ওয়া দিলে গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী নুবূয়ত দাবী করতে উৎসাহ্ বোধ করেছিলো এবং তাই করেছিলো।
দ্বিতীয় দল হচ্ছে- ‘ফির্ক্বা-ই ওয়াহ্হাবিয়া-ই আমসা-লিয়াহ্’ অর্থাৎ অতুলনীয় রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর (ছয় অথবা সাতজন) সমকক্ষ বিদ্যমান থাকায় বিশ্বাসী দল ও ‘খাওয়াতেমিয়াহ্’ অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে আরো ছয়জন ‘খাতামুন্নবীয়্যীন’ বা শেষনবী মওজুদ রয়েছে বলে বিশ্বাস স্থাপনকারী দল। তারা নিম্নলিখিত তিন দলে বিভক্ত হলেও বেশী দিন স্থায়ী হয়নি-১. ‘আমীরিয়্যাহ্’ (আমীর হাসান ও আমীর আহমদ সাহসাওনীর অনুসারী দল), ২. ‘নযীরিয়্যাহ্’ (নযীর হোসেন দেহলভীর দিকে সম্পৃক্ত দল) এবং ৩. ক্বাসেমিয়াহ্ (মৌং ক্বাসেম নানুতবীর দিকে সম্পৃক্ত দল)। এ শেষোক্ত দলের নেতা মৌং ক্বাসেম নানূতবী হচ্ছেন- ‘তাহযীরুন্নাস’ পুস্তকের রচয়িতা। তিনি তার এ পুস্তকে লিখেছেন-
بلكه بالفرض آپ كے زمانه ميں بىত كهيں اور كوئى نبى هو، جب بىر آپ كا خاتم هونا بدستور باقى رهتاهے، بلكه اگر بالفرض زمانه نبوى ميں بىب كوئى نبى پيدا هوتو بىر خاتميتِ محمدى ميں كچھ فرق نه آئيا ، عوام كے خيال ميں رسول الله خاتم هونا بايں معنى هے كه آپ سب ميں آخرى نبى هيں ، مرپ اهل فهم پر روشن كه تقدم يا تاخر زمانه ميں بالذات كچھ فضيلت نهيں الخـ
অর্থাৎ বরং ধরে নিন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যমানায়ও যদি কোথাও কোন নবী আসতো, তথাপি হুযূরের ‘খাতাম’ (শেষ নবী) হওয়া দস্তর মতো বহাল থাকতো; বরং ধরে নিন, নবী করীমের যমানার পরেও যদি কোন নবী পয়দা হয়, তবুও ‘খাতামিয়াতে মুহাম্মদী’ (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শেষ নবী হবার মর্যাদা)’তে কোন পার্থক্য দেখা দেবে না। জনসাধারণের খেয়ালে তো রসূলুল্লাহ্ ‘খাতাম’ বা ‘শেষ নবী হওয়া’ এ অর্থেই যে, তিনি সর্বশেষ নবী; কিন্তু বুঝ শক্তিসম্পন্নদের নিকট একথা স্পষ্ট যে, যমানায় অগ্রবর্তী হওয়া ও পরবর্তী হওয়ার মধ্যে আসলে কোন ফযীলত বা প্রাধান্য নেই।… (না‘ঊযুবিল্লাহ্)
অথচ ‘ফাতাওয়া-ই তাতিম্মাহ্’ ও ‘আল-আশবাহ্ ওয়ান্নাযা-ইর’ প্রভৃতি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে পরিস্কারভাবে ব্যক্ত হয়েছে-
اِذَا لَمْ يَعْرِفْ اَنَّ مُحَمَّدًا صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اخِرُ الْاَنْبِيَاءِ فَلَيْسَ بِمُسْلِمٍ لِاَنَّه مِنَ الضُّرُوْرِيَّاتِ
অর্থাৎ যদি কেউ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘শেষ নবী’ বলে বিশ্বাস না করে, সে মুসলমান নয়। কেননা এটা (হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘শেষ নবী’ হওয়া, যুগের দিক থেকে ও সমস্ত নবীর শেষে আগমন করায় বিশ্বাস করা) দ্বীনের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়াদিরই (ضروريات دين)-এর অন্তর্ভূক্ত।
তৃতীয় ফির্ক্বা হচ্ছে- ‘ওয়াহ্হাবিয়্যাহ্-কায্যাবিয়্যাহ্ ফির্ক্বা’। এরা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর অনুসারী। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা আপন দলীয় পীর-ইসমাঈল দেহলভীর অনুসরণে মহান আল্লাহ্ পাকের প্রতি এ অপবাদ দিয়েছে যে, ‘আল্লাহ্ তা‘আলা মিথ্যাবাদী হওয়াও সম্ভবপর।’ (না‘ঊযুবিল্লাহ্) পরবর্তীতে গাঙ্গুহী সাহেব তার ‘ফাতাওয়া-ই রশীদিয়া’ ১ম খণ্ড, পৃ. ৯- এ স্পষ্টভাষায় লিখে দিয়েছেন- ‘আল্লাহ্ মিথ্যা বলতে পারেন।’ (না‘ঊযুবিল্লাহ্)
উল্লেখ্য, আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ‘সুবহানুস্ সুব্বূহি ‘আন ‘আয়বি কিয্বিম্ মাক্ববূহ্’ (سبحان السبوح عن عيب كذب مقبوح) লিখে তাদের এ আক্বীদার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন। আ’লা হযরত বলেছেন- এ খণ্ডন পুস্তকটাই গাঙ্গুহী সাহেবের নিকট একনলেজম্যান্ট রেজিষ্ট্রী যোগে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি তার প্রাপ্তি স্বীকারের এগার বছর পরও তার কোন জবাব দিতে পারেননি; শেষ পর্যন্ত গাঙ্গুহী সাহেব অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, এ দুনিয়া থেকে বিদায়ও নিয়েছেন; কিন্তু কোন সংশোধন বা জবাব পাওয়া যায়নি; বরং তিনি ওই ভ্রান্ত আক্বীদার উপর অটল ছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়।
সুতরাং এতদিন পর হাটহাজারীর মৌং আহমদ শফী সাহেব যেহেতু একই আক্বীদা পোষণ করেন, তা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং এর পক্ষে বই-পুস্তক লিখেছেন, সেহেতু তিনিও ওই ‘ফির্ক্বা-ই ওয়াহ্হবিয়াহ্-ই কায্যাবিয়্যাহ্’ (আল্লাহকে মিথ্যাবাদী বলার মত জঘন্য বিশ্বাস পোষণকারী ওহাবী ফির্ক্বা)’র লোক বলে প্রমাণ করলেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার ফাত্ওয়া বিভাগও এহেন জঘন্য আক্বিদার ব্যাপক প্রচারের দায়িত্ব (!) পালন করছে!
চতুর্থ ফির্ক্বা- ‘ওয়াহ্হাবিয়্যাহ্-ই শয়তানিয়্যাহ্ ফির্ক্বা’! তারা রাফেযী (শিয়া) সম্প্রদায়ের ‘শয়তানিয়া ফির্ক্বা’র মতোই। এ ফির্ক্বার প্রধান যে লোকটি ছিলো সে কূফার জামে মসজিদে আসা-যাওয়া করতো। তাকে তারা মু’মিনুত্তাক্ব’ বলতো; কিন্তু ইমাম জা’ফর সাদিক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তার নাম রাখলেন ‘শয়তানুত্তাক্ব’। এ ফির্ক্বার লোকেরা এ শয়তানুত্তাক্বের অনুসারী ছিলো। তারা দিকমণ্ডল বিচরণকারী অভিশপ্ত ইব্লীস শয়তানের ভক্ত ও অনুসারী। ওহাবী-দেওবন্দী-কওমী ও হেফাজতীদের পরম গুরুজন খলীল আহমদ আম্বেটভী সাহেব তার ‘বারাহীন-ই ক্বাতি‘আহ্’ (জুড়ে রাখা দরকার এমন সব সম্পর্ক ছিন্নকারী প্রমাণাদি সম্বলিত কিতাব)-এর ৪৭/৫১ পৃষ্ঠায় সুস্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন- ‘ইবলীস শয়তানের ইল্ম (জ্ঞান) নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বেশী।’ ইবারতটা নিম্নরূপ-
شيطان وملك الموت كو يه وسعت نص سےثابت هوئى ،فخر عالم كى وسعت علم كو كونسى نص قطى هے كه جس سے تمام نصوص كو رد كركے ايك شرك ثابت كرتاهے؟
অর্থাৎ শয়তান ও মালাকুল মওতের জ্ঞানের বিশালতা ‘নাস’ (ক্বোরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতিমূলক দলীল) দ্বারা প্রমাণিত হলো। ফখরে আলম (বিশ্ব গৌরব নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর জ্ঞানের বিশালতা সম্পর্কে কোন্ অকাট্য নাস আছে, যা দ্বারা যাবতীয় ‘নাস’-কে খণ্ডন করে একটা শির্ককে প্রতিষ্ঠা করবে?
এর পূর্বে লিখা হয়েছে- شرك نهيں تو كونساايمان كا حصه هے؟ (এটা শির্ক নয় তো কোন্ ঈমানের অংশ?)
অথচ ‘নসীমুর রিয়ায’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে-
مَنْ قالَ فُلاَنٌ اَعْلَمُ مِنْهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ نَقَصَه فَهُوَ سَابٌّ وَالْحُكْمُ فِيْهِ حُكْمُ السَّابِ مِنْ غَيْرِ فَرْقٍ لاَ نَسْتَثْنِىْ مِنْهُ صُوْرَةً وَهذَا كُلُّه اِجْمَاعٌ مِنْ لَدُنِ الصَّحَابَةِ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُمْ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি বলেছে, ‘‘অমুক ব্যক্তির ইল্ম নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ইল্ম অপেক্ষা বেশী’’, সে অবশ্যই হুযূর-ই আক্রামের প্রতি দোষারোপ করেছে এবং হুযূরের মর্যাদাহানি করেছে। সুতরাং সে গালিদাতা হলো। তার বিরুদ্ধে ওই শাস্তির বিধান প্রযোজ্য, যা হুযূর-ই আক্রামকে গালিদাতার বেলায় প্রযোজ্য, তাতে কোন তফাৎ নেই। আমরা কোন অবস্থাকেই এর ব্যতিক্রম মনে করি না। এসব বিধানের উপর সাহাবা-ই কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম’র ইজমা’ (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। [সূত্র. হুমাসুল হেরমাঈন] উল্লেখ্য, নবী করীম ও অন্য যে কোন নবীর শানে অবমাননাকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ফিক্বহ্র কিতাবাদি ও আমার সম্প্রতি সংকলিত ও আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্তৃক প্রকাশিত ‘রসূল-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি সাল্লাম ও যে কোন নবীর মানহানির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ শীর্ষক পুস্তক দ্রষ্টব্য।
এখন দেখা যাক তারা যে আয়াত শরীফকে প্রধানত তাদের উক্ত ভ্রান্ত দাবীর পক্ষে পেশ করে থাকেন, ওই আয়াত শরীফের সঠিক তাফসীর কি। তারা কি আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের এ আক্বীদা আবিস্কার করেছেন, না ‘আয়াতের মনগড়া তাফসীর’ ও কুফরী আক্বীদা আবিস্কার করে উভয় প্রকারের জঘন্য ও মারাত্মক অপরাধ করেছেন?
ওহাবীদের দাবী হচ্ছে- আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন-اِنَّ اللهَ عَلى كُلِّ شَئٍ قَدِيْرٌ [সূরা বাক্বারা, আয়াত-২০] ‘‘নিশ্চয় সবকিছু আল্লাহর ক্ষমতাধীন।’’ সুতরাং আল্লাহ্ মিথ্যাও বলতে পারেন, কারণ, মিথ্যাও এ ‘শাই’ (সব কিছু)’র অন্তর্ভূক্ত।
[সূত্র. ফাতাওয়া-ই রশীদিয়া: ১ম খণ্ড, পৃ. ৯ এবং আহমদ শফী: ভিত্তিহীন প্রশ্নাবলীর মূলোৎপাটন: পৃ. ২-৩]
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা প্রত্যেক ‘শাই’ (شئ)-কে তাঁর ক্ষমতাধীন ও শক্তির আওতাভুক্ত বলেছেন। সুতরাং অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, যে সব কাজ ‘শাই’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত, সেগুলোই আল্লাহ্ তাঁর ক্ষমতাধীন বলেছেন। আর যেগুলো ‘শাই’ -এর সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না সেগুলোকে আল্লাহর ক্ষমতাধীন বলা যাবে না; বললে আয়াতের অপব্যাখ্যা হবে, যার কুফল স্বরূপ, অপব্যাখ্যাকারী ও তাতে বিশ্বাসীরা পথভ্রষ্টতা, এমনকি কুফর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া অনিবার্য।
এখানে উল্লেখ্য যে, নির্ভরযোগ্য মুফাস্সিরগণ ও আহলে সুন্নাতের ওলামা-ই কেরামই এখানে সঠিক তাফসীর করতে ও সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম হয়েছেন। পক্ষান্তরে, দেওবন্দী আলিমগণ ও তাদের অনুসারীরা, যেমন মৌং আহমদ শফী সাহেব প্রমুখ এ প্রসঙ্গে নানা বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকা পড়েছেন। এ শেষোক্ত জনেরা মনে করেন যে, আল্লাহকে মিথ্যা ও ওয়াদা খেলাফে অক্ষম বললে নাকি আল্লাহকে দুর্বল মেনে নেওয়া হবে। (না‘ঊযুবিল্লাহ্) অথচ এ ধরনের কোন অশোভন বিষয় না شئ (শাই) -এর অন্তর্ভুক্ত, না মহাপবিত্র আল্লাহ্ তা‘আলাকে মিথ্যাবাদী ও ওয়াদা ভঙ্গকারী বললে তাঁর প্রতি অবমাননা প্রদর্শন ও অপবাদ রচনা থেকে বাঁচার কোন উপায় থাকে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে সত্যিকারের মুফাস্সিরগণ অতি সতর্কতার সাথে তাফসীর করেছেন আর ইমামগণ ও ওলামা-ই কেরাম আল্লাহ্ সম্পর্কে সঠিক আক্বীদা নিরূপন করেছেন। নিম্নে এর আলোচনা দেখুন-
তাফসীর-ই খাযাইনুল ইরফান
এখানে (আলোচ্য আয়াত শরীফে) شئ (শাই) হচ্ছে ‘যা আল্লাহ চান’ এবং ‘যা আল্লাহর ইচ্ছাধীন হতে পারে’। সমস্ত ‘মুমকিন’ বস্তুই ‘শাই’ (شئ)-এর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণে সেগুলোই আল্লাহ্ তা‘আলার কুদরতের আওতাধীন। আর যা ‘মুমকিন’ নয়, তা হচ্ছে হয়তো ‘ওয়াজিব’ (واجب), অর্থাৎ যাঁর অস্তিত্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আবশ্যকীয়, যিনি কারো মুখাপেক্ষীও নন; অথবা ‘মুমতানি’ (ممتنع) বা অসম্ভব। সুতরাং আল্লাহর ক্বুদরত বা ইচ্ছার সাথে (‘ওয়াজিব’ কিংবা ‘মুমতানি’)-এর কোন সম্পর্ক নেই। (অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার শক্তি ও ইচ্ছা ‘ওয়াজিব’ ও ‘অসম্ভব’ বিষয়াদির সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়।) যেমন- আল্লাহ্ তা‘আলার সত্তা ও গুণাবলী হচ্ছে ‘ওয়াজিব’। এ কারণে তা আল্লাহর সৃষ্টি বা ক্বুদরতভুক্ত নয়। অনুরূপ, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষে ‘মিথ্যা বলা’ এবং যেকোন দোষ-ত্র“টি থাকাও ‘অসম্ভব’। এ কারণে এসব (অশোভন) জিনিষ-এর (কার্যাদি) সাথে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতা বা শক্তির কোন সম্পর্ক নেই।
[কান্যুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান: সূরা বাক্বারা: পৃ. ১২, বাংলা সংস্করণ]
তাফসীর-ই নূরুল ইরফান
এখানে (আলোচ্য আয়াত শরীফ) شئ (শাই) দ্বারা প্রত্যেক সম্ভব কাজই বুঝায়; যা আল্লাহর ইচ্ছাধীন হতে পারে। واجبات (ওয়াজিবাত) ও محالات (মুহালাত) আল্লাহর ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং না মহান আল্লাহ্ স্বয়ং দোষ-ত্র“টি দ্বারা দূষণীয় হতে পারেন; কারণ এটা অসম্ভব, না চিরজীবী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ
(واجب) সত্তা আপন সত্তাকে নিশ্চিহ্ণ করে দিতে পারেন। কারণ, তিনি হচ্ছেন ‘ওয়াজিব’ বা চিরস্থায়ী, চিরজীবী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা।
এ আয়াত থেকে (কোনভাবেই) ‘আল্লাহ্ মিথ্যা বলতে পারেন’ মর্মে বিশ্বাস করা চূড়ান্ত পর্যায়ের বোকামী।
[কান্যুল ঈমান ও নূরুল ইরফান, সূরা বাক্বারা: পৃ. ৮, বাংলা সংস্করণ]
তাফসীর-ই জালালাঈন
اِنَّ اللهَ عَلى كُلِّ شَئٍ (شَاءَه‘) قَدِيْرٌ অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্ এমন প্রতিটি বস্তুর উপর শক্তিমান, যা তিনি ইচ্ছা করেন। [সূরা বাক্বারা: আয়াত-২০, পৃ. ৬] এ প্রসঙ্গে এর পার্শ্বটীকায় (নং১১) লিখা হয়েছে- আয়াতে شئ (শাই) শব্দের তাফসীরে তাফসীরকারক মহোদয় شَاءَه বিশেষণটা সংযোজন করেছেন। (অর্থাৎ আল্লাহ্ ওই ‘শাই’ বা জিনিষের উপর শক্তিমান, যা তিনি চান বা ইচ্ছা করেন।) তাও এজন্য যে, এ বিশেষণ দ্বারা ‘শাই’ থেকে ‘ওয়াজিব’ অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীকে বের করে আনবেন। সুতরাং شَئٍ شَاءَه -এর অর্থ দাঁড়াবে- ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ যা চান তা-ই তাঁর ইচ্ছা বা ক্ষমতাধীন হবে।’ আর তা হচ্ছে ‘মুমকিন’ (সম্ভাব্য বস্তু)। [সূত্র. তাফসীর-ই জুমাল] উল্লেখ্য, মিথ্যা ও ওয়াদা খেলাফের মতো দোষ-ত্র“টি আল্লাহর জন্য ‘মুমকিন’ও নয়, সুতরাং তা তাঁর ইচ্ছাধীনও নয়। (সংক্ষেপিত)
তাফসীর-ই নঈমী
اِنَّ اللهَ عَلى كُلِّ شَئٍ قَدِيْرٌ
(ইন্নাল্লা-হা ‘আলা কুল্লি শায়ইন ক্বাদীর)। شئ (শাই) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- চাওয়া। আর পরিভাষায়, তাকেই شئ (শাই) বলা হয়, যার সম্পর্ক ‘চাওয়া’র সাথে রয়েছে। এর উর্দু অনুবাদ হলো ‘চীয’ অর্থাৎ জিনিস বা বস্তু। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো আল্লাহ্ প্রত্যেক ‘শাই’ বা জিনিসের ওপর শক্তিমান। এখন দেখুন এ ‘শাই’ বা ‘চীয’-এর অর্থ কি?
ক্বোরআন শরীফে شئ (শাইউন) শব্দটি চারটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছেঃ
১. ممكن موجود (মুমকিন-ই মাওজূদ) অর্থাৎ বিদ্যমান সম্ভাব্য বস্তু। যেমন- خَالِقُ كُلِّ شَئٍ (১৩:১৬) (খালিক্বু কুল্লি শায়ইন) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা সম্ভাব্য বিদ্যমান প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা। কেননা, ‘মাখলূখ’ বা সৃষ্টি বিদ্যমানই হয়; কখনোই বিদ্যমান থাকে না এমন নয়।
২. ممكن (মুমকিন), যার অস্তিত্ব সম্ভব; চাই, বিদ্যমান হোক কিংবা না-ই হোক; যা এ আয়াতের মধ্যে সুস্পষ্ট। কেননা, আল্লাহ্ এমন প্রত্যেক জিনিসের ওপর শক্তিমান, যা তার চাওয়া ও ইচ্ছার মধ্যে আসতে পারে। আর ওইগুলো হচ্ছে অস্তিত্বে আসার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বস্তু। এ জন্য যে, واجب (ওয়াজিব বা যার অস্তিত্ব অনিবার্য) এবং محال (মুহাল বা যার অস্তিত্ব অসম্ভব) খোদার ইচ্ছার মধ্যে আসতেই পারে না। সুতরাং তা তাঁর শক্তির অন্তর্ভূক্তও নয়। যেমন- পরওয়ারদেগার নিজের শরীক বানাতে পারেন না। কেননা, তা অসম্ভব। তিনি নিজে দূষণীয় গুণাবলী দ্বারা বিশেষিতও হতে পারেন না। কেননা, এটাও محال (মুহাল) বা অসম্ভব। তাঁর স্বীয় ذات (যাত) বা সত্তা ও صفات (সিফা-ত) বা গুণাবলী তাঁর ক্ষমতাধীন নয়। কেননা, তা হলো واجب (ওয়াজিব)। সুতরাং আয়াতের شئ (শায়ইন) শব্দ থেকে محال (মুহা-ল) বা ‘অসম্ভব’ ও ‘ওয়াজিব’ উভয়ই খারিজ।
৩. معلوم (মা’লূম) বা জ্ঞাত। যেমন- وَكَانَ اللهُ بِكُلِّ شَئٍ عَلِيْمًا (৪৮:১৬)। (ওয়াকা-নাল্লাহু বিকুল্লি শায়ইন ‘আলী-মা-); অর্থাৎ আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাতা। এখানে অবশ্যই شئ (শায়ইন)’র মধ্যে واجب (ওয়াজিব), محال (মুহাল), ممكن (মুমকিন)-সবই অন্তর্ভূক্ত। কেননা, আল্লাহ্ তা‘আলা এ সব কিছুই জানেন।
৪. موجود (মওজূদ) বা বিদ্যমান; তা, واجب (ওয়াজিব) হোক কিংবা ممكن (মুমকিন)। যেমন- قُلْ اَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَادَةً قُلِ اللهُ (৬:১৯)। (ক্বুল আইয়্যু শায়ইন আকবারু শাহাদাতান ক্বুলিল্লা-হু) অর্থাৎ আপনি বলুন! সর্বশ্রেষ্ঠ সাক্ষ্য কার? আপনিই বলে দিন, ‘আল্লাহ্র’। অনুরূপ, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ اِلاَّ وَجْهَه (২৮:৮৮)। (কুল্লু শায়ইন হা-লিকুন ইল্লা- ওয়াজহাহু), অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তু ধবংসশীল; কিন্তু তাঁরই সত্তা; অর্থাৎ তাঁর সত্তা (চিরস্থায়ী)।
এ দু’টি আয়াতের মধ্যে شىء (শায়উন)’র অর্থ موجود (মওজূদ)। মহান আল্লাহ্ এ শেষোক্ত আপন সত্তাকে পৃথক করে চিরস্থায়ী বলে ঘোষণা করেছেন। উল্লেখ্য, যদি شئ (শাইউন)’র এ অর্থগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা না হয়, তাহলে সঠিক অর্থ চয়নে বহু সমস্যা সৃষ্টি হবে। আলোচ্য আয়াতে ‘শাই’-এর দ্বিতীয় অর্থ (অর্থাৎ ‘মুমকিন’)ই প্রযোজ্য।
দেওবন্দীরা এবং তাদের অনুসারীরা এ আয়াত থেকে বুঝেছেন যে, ‘আল্লাহ্ মিথ্যা কথাও বলতে পারেন; কেননা, মিথ্যা বলাও নাকি شئ (শাই)। আর প্রত্যেক ‘শাই’ বা জিনিসের ওপর আল্লাহ্ শক্তিমান। অথচ এটা তাদের মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এর বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে লক্ষ্য করুন-
‘ইমকানে কিয্ব’ বা আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা’ সম্ভব কিনা-
এতদ্ সম্পর্কিত মাসআলা
যেহেতু এ আয়াত দ্বারা বর্তমান যুগের দেওবন্দের অনুসারীরা (যেমন মৌং আহমদ শফী সাহেব প্রমুখ) মহান আল্লাহ্র মধ্যে মিথ্যা বলার মত দোষের সম্ভাবনাকে মেনে নেন, সেহেতু এ সম্পর্কেও কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন। আমি (মুফতী আহমদ ইয়ার খান) এ সম্পর্কিত মাসআলাসমূহ একটি ভূমিকা ও দু’টি পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি। পাঠকদের গ্রহণযোগ্যতা ও আল্লাহ তা‘আলার নিকট মাক্ববূলিয়াত-ই কামনা করছি।
ভূমিকা
মিথ্যা বলা- সর্বপ্রকার দোষের মধ্যে সর্ব নিকৃষ্ট দোষ। (সমস্ত অপবিত্র কর্মের মূল।) এর কতিপয় কারণ রয়েছেঃ
১. মানুষ মিথ্যার সাহায্য ছাড়া কোন পাপ করতেই পারে না। যদি কেউ সত্য বলার প্রতিজ্ঞা করে, তাহলে সে ইনশা-আল্লাহ্ সর্বপ্রকার পাপ থেকে এমনিতেই তাওবা করে নেবে। দেখুন- চোর, শরাবী, ব্যভিচারী তখনই এ জাতীয় কাজগুলো করতে পারে, যখন সে প্রথম থেকেই মিথ্যা বলার জন্য তৈরী হয়ে যায়। আর এ ধারণা নিয়ে থাকে যে, যদি আমি ধরা পড়ে যাই, তাহলে সাথে সাথে অস্বীকার করে বসবো। যদি প্রথম থেকে সত্য বলার জন্য ওই লোকেরা প্রতিজ্ঞা করে নেয়, তাহলে তারা এ জাতীয় অপকর্ম করতেই পারে না।
২. অন্য যে কোন পাপ কুফর নয়; তবে মিথ্যা বলা কুফর ও শিরকের পর্যায়ে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যেমন- মুশরিকরা বলে, রব বা প্রতিপালক দু’জন তথা একাধিক। (না‘ঊযুবিল্লাহ্) এটা ডাহা মিথ্যা কথা ও কুফরী (শির্ক)। ‘ঈসায়ীরা বলে থাকে যে, হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম রবের পুত্র। তারাও মিথ্যাবাদী এবং কাফির। একজন মদ্যপায়ী ও জুয়াড়ী এ সব অন্যায় কাজকে হারাম জেনে এবং বুঝেও করে থাকে। তখন সে পাপী; কিন্তু কাফির নয়। কেননা, সে মিথ্যা বলছে না, কিন্তু সে যখন বলে দিলো যে, এ সব কাজ হালাল, তখন সে মিথ্যা বললো এবং কাফির হয়ে গেলো। একটি বিষয় মানতে হবে যে, অনেক বড় থেকে বড়তর গুনাহ্ও কুফর নয়, কিন্তু মিথ্যা বলা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কুফর। ইসলামী শরী‘আত যেসব কাজকে কুফর সাব্যস্ত করেছে, যেমন- পৈতা বাঁধা, মাথায় ঝুঁটি রাখা ইত্যাদিও কুফর; কেননা এগুলো দ্বীনকে অস্বীকার করারই আলামত। সুতরাং সেখানেও প্রকারান্তরে মিথ্যা বলার কারণে কুফর হলো।
৩. ক্বোরআন করীমে কোন পাপীর ওপর অভিশাপ দেয়া হয়নি, কিন্তু মিথ্যুকের ওপর অভিশাপ দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন- لَعْنَتُ اللهِ عَلَى الكَاذِبِيْن (৩:৬১), (লা’নাতুল্লাহি ‘আলাল কা-যিবীন) অর্থাৎ মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।
স্মর্তব্য যে, যালিম ও কাফিরদের ওপর যে অভিশাপ এসেছে তা তাদের মিথ্যা বলার কারণেই এসেছে। কেননা, কুফর ও শিরকের মধ্যে ‘মিথ্যা’ অবশ্যই নিহিত আছে। ক্বোরআনে এখানে ظالمين (যা-লিমীন) দ্বারা কাফিরদের বুঝানো হয়েছে। সুতরাং স্বীকার করতে হবে যে, মিথ্যা বললে মানুষ অভিশাপের উপযুক্ত হয়।
৪. মিথ্যুক মানুষ সাধারণত বাজে লোক হয়ে থাকে। আর বাজে লোক সরকারী প্রশাসনের উপযুক্ত হয় না। সুতরাং মিথ্যা বলা সর্বপ্রকার দোষের মধ্যে অত্যন্ত জঘন্য। আল্লাহ্ তা‘আলা এটা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
এখন দেখুন পরিচ্ছেদ দু’টি
প্রথম পরিচ্ছেদঃ মহান আল্লাহ্ মিথ্যা বলা থেকে পবিত্র হওয়ার প্রমাণসমূহ
প্রথম প্রমাণঃ যেহেতু মিথ্যা বলা দূষণীয়; বরং সর্বপ্রকার দোষের মধ্যে জঘন্য আর মহান রব সর্ব প্রকার ‘আয়ব’ বা দোষ থেকে পবিত্র, সেহেতু তিনি মিথ্যা বলা থেকেও পবিত্র।
স্মর্তব্য যে, যেভাবে অন্যান্য দোষ আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্যও নয় এবং সম্ভবও নয়, যেমন চুরি, ব্যভিচার ইত্যাদি, এগুলো তাঁর জন্য সত্তাগতভাবেই সম্পূর্ণ অসম্ভব, সেভাবে তাঁর পক্ষে মিথ্যা বলাও সত্তাগতভাবেই অসম্ভব।
দ্বিতীয় প্রমাণঃ যখন দু’টি ‘একক’ নিয়ে একটি ‘সমগ্র’ গঠিত হয়, তখন এ দু’টির মধ্যে প্রত্যেক হুকুম অপরটি অনুসারে হবে। যেমন- ‘খবর’ (সংবাদ)-এর দু’টি দিক থাকে- সত্য অথবা মিথ্যা। সুতরাং আল্লাহ্ প্রদত্ত খবরাদির মধ্যে যদি মিথ্যারও অবকাশ থাকে, তাহলে তাঁর সত্যবাদী হওয়া ওয়াজিব বা নিশ্চিত থাকলো না; মিথ্যার অবকাশের কারণে সত্যের নিশ্চয়তা দূরীভূত হয়ে যায়।
তৃতীয় প্রমাণঃ আল্লাহর সব গুণই ‘ওয়াজিব’। যদি তাঁর পক্ষে মিথ্যা বলার অবকাশ থাকে তাহলে প্রশ্ন জাগবে যে, ওই ‘মিথ্যা বলা’ খোদার গুণ হবে কি না? যদি মিথ্যা বলা আল্লাহর গুণ হয়, তাহলে তাও ‘ওয়াজিব’ হওয়াই উচিত হবে। আর যদি তার গুণ না হয় তাহলে এর ‘ইমকান’ বা সম্ভাবনার অর্থই বা কি?
চতুর্থ প্রমাণঃ ‘কালাম-ই সাদিক্ব’ বা ‘সত্য বলা’ মহান আল্লাহরই গুণ। যদি খোদার ‘মিথ্যা বলা’ ‘মুমকিন’ (সম্ভব) হয়, তবে ‘সত্য বলা’ও ‘ওয়াজিব’ থাকে না। এতে এটাই অনিবার্য হবে যে, আল্লাহর গুণ ‘মুমকিন’ (সম্ভাব্য/নশ্বর)-ই হলো, যা চিরস্থায়ী, চিরঞ্জীব আল্লাহর জন্য শোভন নয়।
পঞ্চম প্রমাণঃ মিথ্যা বলার তিনটি কারণ হতে পারে- ক. অজ্ঞতা, খ. অপারগতা, গ. দুষ্টামী বা ভ্রষ্টতা।
কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে (অবাস্তব) সংবাদ পেলো। আর তা লোকদের মধ্যে বর্ণনা করে দিলো। সুতরাং এ ব্যক্তি তার অজ্ঞতাবশতঃই মিথ্যা কথাটা বলে ফেললো। যায়দ প্রতিজ্ঞা করলো, ‘‘আমি একমাস পর ঋণ পরিশোধ করে দেবো।’’ কিন্তু এ সময়ের মধ্যে তার হাতে টাকা আসলো না এবং সে তার প্রতিজ্ঞায় মিথ্যুক হয়ে গেলো। এ মিথ্যা তার অপারগতাবশত হলো। অনুরূপ, কারও মিথ্যা বলা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলো, কোন কারণ ছাড়াই সে মিথ্যা বলতে থাকে। এ মিথ্যা বলা তার নাফ্সের ভ্রষ্টতার কারণে হলো। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা এ তিন ধরনের কারণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। সুতরাং মিথ্যা বলা থেকেও তিনি পবিত্র। তাই এ ধরনের বিশ্বাস মোটেই উচিত নয়।
ষষ্ঠ প্রমাণঃ কোন ব্যক্তি বা বস্তু আল্লাহর সমতুল্য হতে পারে না। আল্লাহর শান ও মান-মর্যাদা সর্বোচ্চ ও সর্বোন্নত। আর আল্লাহ্ ব্যতীত যদি অন্য কোন অত্যন্ত নেক্কার মানুষের কথাই বলি, তবে তার পক্ষে ‘মিথ্যাবলা’ (মুমকিন বিয্যাত) অর্থাৎ সত্তাগতভাবে সম্ভব হলেও তা محال بالغير (মুহাল বিলগায়র) অর্থাৎ অন্য কোন বাহ্যিক কারণে (যেমন- অত্যন্ত নেক্কার মানুষ হবার কারণে) অসম্ভব। অর্থাৎ এমন সৎ লোকেরা কখনোই মিথ্যা বলেন না। যদি মহান আল্লাহ্র ‘মিথ্যা বলাও’ এ ধরণের হয়ে থাকে, তাহলে মা‘আ-যাল্লাহ্! (আল্লাহরই আশ্রয়) এ গুণের দিক দিয়ে ওই ভাল মানুষগুলোও তাঁর সমকক্ষ হয়ে গেলেন।’ (আহমদ শীফ সাহেবের উক্তিও তেমনি হলো।)
সপ্তম প্রমাণঃ যে কালাম বাণীতে মিথ্যার অবকাশ থাকে ওই কালাম (বাণী) শ্রবণকারীর নিকট কোন গুরুত্ব রাখে না। তা তার মধ্যে কোন প্রভাবও ফেলবে না। যদি আল্লাহর কালাম ও সংবাদের মধ্যে মিথ্যার সম্ভাবনা থাকে, তবে তাঁর কোন সংবাদ বা খবরের মধ্যে ইয়াক্বীনই থাকলো না। আর ‘ইয়াক্বীন’ (يقين) ছাড়া ঈমানই অর্জিত হয় না। সুতরাং কোন দেওবন্দী ও তার অনুসারী কওমী-হেফাযতী ‘ইমকানে কিযব’-এর মাসআলা (আল্লাহকে মিথ্যা বলতে সক্ষম) মেনে নিয়ে মু’মিনই হতে পারে না। কেননা, তাদের অন্তরে খোদার বাণী বা খবরের মধ্যে মিথ্যার ‘ইমকান’ বা সম্ভাবনাই আসবে। আর সেই ইয়াক্বীন, যা তার ঈমানের জন্য প্রয়োজন, তা অর্জিতই হবে না।
অষ্টম প্রমাণঃ যেভাবে অন্যান্য দোষ اُلُوْهِيَّة (উলূহিয়্যাত) বা ‘ইলাহ্’ হওয়া’র বিপরীত, অনুরূপ, মিথ্যাও এর বিপরীত। দেখুন তাফসীর কাবীর, তাফসীর রূহুল বয়ান ও অন্যান্য ইলমে কালামের গ্রন্থাদি।
নবম প্রমাণঃ কোন কোন জিনিস বান্দাদের জন্য পূর্ণতা আনে; কিন্তু রবের জন্য তা দোষ। যেমন পানাহার করা ও ইবাদত করা। এগুলো মহান আল্লাহর জন্য সত্তাগতভাবেই অসম্ভব। সুতরাং মিথ্যা বলা ও ওয়াদা খেলাফ করা বান্দাদের জন্য প্রথম নম্বরের দোষ। সুতরাং তা আল্লাহর জন্য কিভাবে সম্ভব হবে?
দশম প্রমাণঃ দেওবন্দীদের মধ্যেও ‘মানতিক্ব’ বা তর্কবিদ্যা জানার মত লোক থাকতে পারেন। তারাও হয়তো এ মাসআলাকে (আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব হওয়া ইত্যাদি) গ্রহণ করেন নি। বস্তুতঃ বিজ্ঞ তর্কশাস্ত্রবিদরা এ মাসআলাকে রদ্ বা খণ্ডন করেছেন। সুতরাং মাওলানা আবদুল্লাহ্ টুনকী ও শাহ্ ফযলে হক্ব খায়রাবাদী এ ধরনের মাসআলার খণ্ডনে প্রমাণ্য কিতাব লিখেছেন। দেওবন্দীদের প্রসিদ্ধ তর্কবিদ মাওলানা আবদুল ওয়াহিদ সাম্বলী সাহেব একথা বলতেন যে, ‘‘আমাদের মুরুব্বী আলিমদের এ মাসআলার মধ্যে বড় ভুল হয়ে গেছে।’’ এতে বুঝা যায় যে, এ মাসআলাটি নিতান্তই নিরর্থক। কিন্তু মৌং আহমদ শফি সাহেব মুখে হেফাযতে ইসলামের কথা বলে কাগজে কলমে কেন এমন এক অনর্থক ও ঈমান বিধবংসী মাসআলা (ইমকানে কিযবে বারী তা‘আলা) প্রচার করেছেন? এ প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন আপত্তি ও তার খণ্ডন
আপত্তি :১
যদি মহান আল্লাহ্ মিথ্যা বলার শক্তি না রাখেন, তাহলে তো তিনি কিছু একটা করতে অপারগ হলেন। আর অপরাগতা তাঁর الوهية (উলূহিয়্যাত) বা ইলাহ্ হবার বিপরীত।
জবাব:
কর্তার ‘অপরাগতা’ তখনই প্রকাশ পাবে, যখন তার مفعول (মাফ’ঊল) বা কর্মবাচ্যে প্রভাব গ্রহণ করার মত যোগ্যতা থাকে, কিন্তু কর্তার মধ্যে প্রভাব বিস্তারের শক্তি বা যোগ্যতা থাকে না। আর যদি কর্তার মধ্যে যোগ্যতা থাকে, কিন্তু কর্মবাচ্য প্রভাব গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে এ ত্র“টিটা কর্মবাচ্যের নিজেরই, কর্তার নয়। যদি কেউ আলোর মধ্যে নিকটের কোন বস্তু না দেখে তাহলে সে অন্ধ। কিন্তু যদি অন্ধকারের মধ্যে অথবা বহু দূরের কোন বস্তু দেখতে না পারে তাহলে সে অন্ধ নয়। কেননা এখানে তার কোন দোষ নেই; বরং সেটা ওই বস্তুরই ত্র“টি, যা দেখার উপযোগী নয়। অনুরূপ, দোষ-ত্র“টি ইত্যাদির ওই শক্তি বা যোগ্যতা নেই যে, আল্লাহ্র কুদরত বা শক্তির মধ্যে প্রবেশ করবে। সুতরাং এ ত্র“টি হচ্ছে দোষ-ত্র“টি ইত্যাদিরই, আল্লাহ্র নয়। যদি এরই নাম অপরাগতা হতো, তাহলে হে দেওবন্দী, কওমী, হেফাজতীরা! মহান আল্লাহ্ তো তোমাদের ভাষায়, আরো অনেক দোষ-ত্র“টির শক্তি রাখেন না; যেমন মৃত্যুবরণ, চুরি ইত্যাদি।
আপত্তি : ২ মিথ্যা বলাও একটি شىء (শাই) বা বস্তু; আর প্রত্যেক شىء (শাই) আল্লাহ্র কুদরত বা ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত।
জবাব
‘আল্লাহর তথাকথিত মিথ্যা বলা’ شىء (শাই) নয়। কেননা, তা محال (মুহাল) অর্থাৎ অসম্ভব। অবশ্য বান্দাদের মিথ্যা বলা شىء (শাই)। মহান আল্লাহ অবশ্যই মিথ্যা সৃষ্টি করার শক্তি ও ক্ষমতা রাখেন; তবে নিজে এ মিথ্যা বলা দ্বারা বিশেষিত নন। কেননা, সমস্ত দোষত্র“টিও আল্লাহ্রই মাখলূক্ব বা সৃষ্টি। কিন্তু আল্লাহ্ এসব দোষ-ত্র“টি থেকে পবিত্র। আয়ব বা দোষ-ত্র“টি সৃষ্টি করা এবং জানা দোষ নয়। অবশ্য দোষ সম্পাদন করাই হলো আয়ব বা দোষ।
আপত্তি : ৩
আল্লাহর প্রদত্ত খবরসমূহও খবরই; আর খবর তাকেই বলা হয় যার মধ্যে সত্য-মিথ্যার অবকাশ থাকে। সুতরাং মিথ্যা বলার امكان (ইমকান) বা সম্ভবনা থাকলে সত্য বলারও امكان (ইমকান) বা সম্ভাবনা থাকে। কাজেই, আল্লাহ্র খবরসমূহকে খবর হিসেবে মেনে নেয়ার জন্য এর মধ্যে মিথ্যার সম্ভনাকেও মেনে নিতে হবে। কিন্তু যেহেতু তা খোদারই সংবাদ, সেহেতু তা মিথ্যা হবে না। সুতরাং ওই খবরগুলো ‘মিথ্যা হওয়া’ ممكن بالذات (মুমকিন বিয্যাত) অর্থাৎ সত্তাগতভাবে সম্ভব হলো; আর محال بالغير (মুহাল বিলগায়র) অর্থাৎ অন্য কারণে অসম্ভব হলো।
জবাব
خبرمطلق বা ‘সাধারণ খবর’ হলো جنس (সংজ্ঞেয় বাক্যের ব্যাপক অংশ), আর ‘আল্লাহর খবর’ হলো সেটার একটা نوع বা শ্রেণী। এ نوع (শ্রেণী)’র মধ্যে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হওয়া (نسبت)টি হলো فصل (স্বতন্ত্র্য নির্দেশক বস্তু)’র মতো। এ فصل দ্বারা نوع বা শ্রেণীর উপর যে বিধান বর্তায় বা জারী হয়, তা نوع -এর জন্য যাতী বা সত্তাগত হয় আর جنس (বা ওই ব্যাপক শব্দ)-এর জন্য হয় عارضى বা পরোক্ষ হয়। যেমন- যদি বলা হয় اَلْاِنْسَانُ حَيْوَانٌ نَاطِقٌ (মানুষ বাক্শক্তি সম্পন্ন প্রাণী), তবে এখানে ناطق বা ‘বাকশক্তি সম্পন্ন’ সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী (এ نوع বা) ‘ইনসান’-এর জন্য যাতী বা সত্তাগত (প্রত্যক্ষ) হলো, কিন্তু حيوان (প্রাণী)’র জন্য عارضى বা পরোক্ষ হলো। সুতরাং যখন ‘আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হওয়া’ (نسبت الهى) মিথ্যা হওয়াকে محال (অসম্ভব) করলো, তখন মিথ্যা ‘অসম্ভব হওয়া’ আল্লাহর খবর বা উক্তির জন্য – بالذات (সত্তাগত)ই হলো, আর ‘সাধারণ খবর’ এর জন্য بالعرض (পরোক্ষ বা কারণ সাপেক্ষ)ও হলো।
আমার উপরোক্ত আলোচনার ফলে, আল্লাহর অনুগ্রহক্রমে, উভয় আপত্তি দূরীভূত হলো। আর সাব্যস্ত হলো যে, মিথ্যা বলা আল্লাহর জন্য কোন মতেই সম্ভবপর নয়।
আপত্তি : ৪
মহান আল্লাহ্ সত্যবাদী হওয়ার প্রশংসা তখনই করা যায় যখন তিনি মিথ্যার সামর্থ্য রাখেন; কিন্তু বলেন না। যদি তিনি মিথ্যা বলার ক্ষমতাই না রাখেন তখন সত্যবাদী হওয়ার বৈশিষ্ট্যই বা কি?
যেমন- প্রাচীরের মিথ্যা না বলার প্রশংসা করা হয় না; কেননা তাতে বলার শক্তিই নেই। (এই আপত্তি নিছক ইসমাইল দেহলভীর নিজস্ব ধ্যান-ধারণা প্রসূত)।
জবাব:
মা-শা আল্লাহ্! তিনি আজব সূত্রই আবিস্কার করেছেন? তার ও তার অন্ধ অনুসারীদের মতে, চুরি না করার প্রশংসা এবং সমস্ত দোষ-ত্র“টি থেকে পবিত্র থাকার প্রশংসা তো করা হয়ই; কিন্তু তার এ সূত্র দ্বারা একথা অপরিহার্য হয়ে যায় যে, এসব দোষ-ত্র“টি খোদার জন্য সম্ভব হওয়া চাই। কেননা এ গুলোর امكان (ইমকান) বা সম্ভব হওয়া ছাড়া খোদার প্রশংসাই অসম্ভব। অথচ মহান আল্লাহর প্রশংসাও এ ভাবে করতে হবে যে, তাঁর দরবার পর্যন্ত কোন দোষ-ত্র“টি পৌঁছাও অসম্ভব।
বাকী রইলো- দেয়ালের মিথ্যা না বলা এটা তো محال بالغير (মুহাল বিলগায়র) বা পরোক্ষ কারণে নয়; বরং محال عادى (মুহাল আদী) বা স্বাভাবগত ও সৃষ্টিগত কারণেই। সম্মানিত নবীগণ ও ওলীগণের সাথে পাথর ইত্যাদি কথা বলেছে। ভবিষ্যতেও বলবে, সুতরাং মৌলভী ইসমাইল সাহেবের এ সূত্র দ্বারা এ কথা অপরিহার্য হয় যে, মহান আল্লাহর মিথ্যা বলা যদি محال بالغير (মুহাল বিলগায়র) তো দূরের কথা محال عادى (মুহাল আদী)ও না হয়, তবেই আল্লাহর প্রশংসা করা যাবে, অন্যথায় নয়; সুতরাং এ সূত্র বা যুক্তিও ভ্রান্ত।
আপত্তি : ৫
এ কথা সবাই মানে যে, মহান আল্লাহর শাস্তিসমূহের হুমকিরও বিপরীত ঘটতে পারে। যেমন- তিনি (আল্লাহ্) ঘোষণা করেছেন যে, কোন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যাকারীর শাস্তি জাহান্নাম; কিন্তু প্রত্যেক মুসলমানের আক্বীদা বা বিশ্বাস হলো যে, যদি আল্লাহ্ চান, তবে তিনি হত্যাকারীকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না । সুতরাং এটাই হচ্ছে মিথ্যা বলা (ওয়াদা খোলাফ করা)।
জবাব
আল্লাহরই আশ্রয় চাচ্ছি! এতে আল্লাহ্র সাথে মিথ্যার কি সম্পর্ক? অর্থাৎ কোন সম্পর্কই নেই। কারণ প্রথমত- সমস্ত শাস্তি প্রদান তো মহান আল্লাহর ইচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল। যদি তিনি চান শাস্তি দেবেন, যদি ইচ্ছা করেন ক্ষমা করে দেবেন। পবিত্র ক্বোরআনে মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন- وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَالِكَ لِمَنْ يَّشَاءُ (৪:১১৬) (ওয়া ইয়াগফিরু মা-দূনা যা-লিকা লিমাইঁ ইয়াশা-উ)। অর্থাৎ ‘‘এবং শির্ক-এর নিম্নপর্যায়ের যা কিছু রয়েছে তিনি যাকে চান ক্ষমা করবেন।’’ এ আয়াতে শির্ক ব্যতীত সমস্ত শাস্তিকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর মাওকুফ করে দিয়েছেন। সুতরাং যে পাপীর ক্ষমা হবে, তা এ আয়াতের ঘোষণা অনুসারেই হবে। (সুতরাং ওয়াদা ভঙ্গ হলো কোথায়?)
দ্বিতীয়ত- দোষ-ত্র“টি ক্ষমা করা তাঁর অনুগ্রহ স্বরূপ; মিথ্যা নয়। আর এটা মিথ্যা হলেই তো আয়ব বা দোষ হতো।
তৃতীয়ত-এ আপত্তি তো তোমাদের ওপরও বর্তায়। কেননা ‘আল্লাহর মিথ্যা বলা’কে তোমরাمحال بالغير (মুহাল বিলগায়র) বা পরোক্ষ হিসেবে স্বীকার করো। সুতরাং তোমাদের মতে, ধমকের শাস্তির বিরোধিতা ‘বিয্যাত’ বা তাঁর সত্তাগত হলো। যদি এটা মিথ্যাই হয়, তাহলে তোমরা তো খোদার মিথ্যাকে বাস্তবিক বলেও মেনে নিচ্ছো; محال بالغير (মুহাল বিলগায়র) বা পরোক্ষ হিসেবে মানছো না? (সুতরাং কারো শাস্তি ক্ষমা করে দেওয়া ওয়াদার বরখেলাফ হলো না, বরং হয়তো পূর্ব ঘোষণার বাস্তবায়ন হলো, কিংবা তাঁর দয়াপ্রদর্শনই হলো।)
আপত্তি : ৬
মহান রব এরশাদ করেছেন- وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَاَنْتَ فِيْهِمْ (৮:৩৩) (ওয়া মা-কা-নাল্লা-হু লিয়ু‘আয্যিবাহুম ওয়া আন্তা ফী-হিম)। অর্থাৎ ‘‘হে নবী! আপনি বর্তমান থাকা অবস্থায় আল্লাহ্ মক্কার কাফিরদের ওপর আযাব বা শাস্তি দেবেন না।’’ অতঃপর তিনি নিজেই অন্য আয়াতে বলেছেন-
قُلْ هُوَ الْقَادِرُ عَلَى اَنْ يَّبْعَثَ عَلَيْكُمْ عَذَابًا مِنْ فَوْقِكُمْ اَوْ مِنْ تَحْتِ اَرْجُلِكُمْ (৬:৬৫) ক্বুল হুয়াল ক্বা-দিরু ‘আলা- আঁই ইয়াব‘আসা আলায়কুম আযা-বাম মিন ফাওক্বিকুম আউ মিন তাহতি আরজুলিকুম্। অর্থাৎ ‘‘আপনি বলুন, তিনিই সক্ষম তোমাদের প্রতি শাস্তি প্রেরণ করতে তোমাদের উপর থেকে কিংবা তোমাদের পায়ের নিচে থেকে।’’ দেখুন! আয়াতের মধ্যে মক্কার কাফিরদের প্রতি আযাব না পাঠানোর ওয়াদা করা হয়েছে, কিন্তু অন্য আয়াতে আযাব পাঠানোর ওপর আল্লাহ্ শক্তি রাখেন মর্মে বলে দেয়া হয়েছে। এতে বুঝা গেলো যে, মহান আল্লাহ্ নিজ ওয়াদা ভঙ্গের ওপরও শাক্তি রাখেন। আর এটাই হলো মিথ্যা বলা কিংবা ওয়াদা খেলাফ করা। এ আপত্তি দেওবন্দী মাযহাবের শেষ আপত্তি, যা মৌলভী খলীল আহমদ ও মৌং রশীদ আহমদ বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করেছেন। (তাদের অনুসরণে, হাটহাজারীর মৌং আহমদ শফীও।)
জবাব
পৃথিবীর প্রত্যেক জিনিস সৃষ্ট হওয়া মহান আল্লাহর ইচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল। আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন- فَعَّالٌ لِمَا يُرِيْدُ (৮৫:১৬)। (ফা‘আ-লুল্ লিমা-ইয়ূরী-দু)। অর্থাৎ ‘‘তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই সম্পন্ন করেন।’’ তিনি আরো এরশাদ করেন- عَلَى مَا يَشَاءُ قَدِيْرٌ (আল্ ক্বোরআন) অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছা করেন তার ওপর তিনি শক্তি রাখেন।’’ মক্কার কাফিরদের ওপর আযাব আসা, যেহেতু এটাও পৃথিবীর একটি জিনিস, সুতরাং মহান রব এটা করতেও সক্ষম। সেই امكان (ইমকান) ও ক্বুদরতের আলোচনা তোমাদের উপস্থাপিত দ্বিতীয় আয়াতের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যখন পৃথিবীর কোন জিনিসের সাথে মহান আল্লাহর ইচ্ছার সম্পর্ক হয়ে যায়, তখন তার বিপরীত হওয়া محال بالذات (মহাল বিয্যাত) বা সত্তাগতভাবে অসম্ভব হয়। এর আলোচনা প্রথমোক্ত আয়াতে করা হয়েছে। সুতরাং সারমর্ম এ হলো যে, মক্কার কাফিরদের ওপর আযাব আসা আর না আসা খোদ তাদের অবস্থা অনুসারে উভয়ই সম্ভব। কিন্তু এ অনুসারে যে, যেহেতু আযাব না আসার বিষয়ে মহান আল্লাহ্ ওয়াদা করেছেন এবং তা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হওয়া محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) হলো, সেহেতু এ অবস্থায় আযাব আসা محال بالذات (মুহাল বিয্যাত বা সত্তাগতভাবে অসম্ভব) হলো।
উদাহরণ দ্বারা বিষয়টি বুঝে নিন। যেমন যায়দ দাঁড়ানো ও উপবিষ্ট হওয়া উভয়ের শক্তি রাখে। কিন্তু যখন দাঁড়িয়ে গেলো তখন দণ্ডায়মান অবস্থায় উপবিষ্ট হওয়া محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) বা একেবারে অসম্ভব হলো। কেননা, এটা হচ্ছে পরস্পর বিরোধী বস্তুর একত্রিত হওয়া অসম্ভব হবার উদাহরণ। অনুরূপ, মহান আল্লাহ্ কোন জিনিস সৃষ্টি করা ও ধ্বংস করা উভয়েরই শক্তি রাখেন। কিন্তু যখন কোন জিনিসকে সৃষ্টি করে ফেললেন তখন সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার অবস্থায় তা ধ্বংস হওয়া محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) হয়। কারণ তখন তার অস্তিত্ব ও অস্তিত্বহীনতা দু’টিই একত্রিত হওয়া আবশ্যকীয় হয়ে যাবে। আর যখন অস্তিত্বহীন করা হয় তখন অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। প্রত্যেক পরস্পর বিপরীত দু’টি জিনিসের এই অবস্থা হয় যে, উভয়ের মধ্যে প্রত্যেকটিই ‘মুমকিন’ সম্ভবনাময় হয়; কিন্তু একটির অস্তিত্বে আসা অবস্থায় অপরটির অস্তিত্ব محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) বা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব হয়।
বিষয়টি আরও একটি সাধারণ ও সহজ উদাহরণ দ্বারা বুঝে নিন যে, কুমারী মেয়ে বিবাহের পূর্বে যে কোন মুসলমান ছেলের সাথে বিবাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। অর্থাৎ এক মেয়ে যে কোন একজন মুসলমানেরই সাথে বিবাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে (بطريق بدليت)। কিন্তু যখন একজনের সাথে বিবাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়, তখন এ অবস্থায় (অর্থাৎ তার বিবাহধীন থাকাবস্থায় ইত্যাদি) অন্যের সাথে বিবাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) হয়ে গেলো।
আরও একটি উদারহণে বুঝে নিন। যায়দ জন্ম হওয়ার পূর্বে যে কোন একজন তার পিতা হতে পারতো, কিন্তু যখন বকরের বীর্য থেকে তাঁর জন্ম হয়ে গেছে এবং বকর তার পিতা হয়ে গেলো, তখন এ অবস্থায় অন্য কেউ তার পিতা হওয়া محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) সত্তাগতভাবে অসম্ভব হলো। এমতাবস্থায় মহান আল্লাহ্ ক্বাদির নন যে, কাউকে যায়দের পিতা বানিয়ে দেবেন। এখানেও মিথ্যা তখনই হতো, যখন ইচ্ছার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও যদি মহান আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার শক্তি রাখতেন। জনাব! تعدد امكان (তা‘আদ্দুদ-ই ইমকান) বা সম্ভবনার আধিক্য এক বিষয়; আর امكان تعدد (ইমকান-ই তা‘আদ্দুদ) বা আধিক্যের সম্ভাবনা আরেক বিষয়। সুতরাং তাদের প্রতি এ শাস্তি পাঠানোর মধ্যে امكان (ইমকান)’রই تعدد হলো, تعدد (তা‘আদ্দুদ)’র امكان (ইমকান) হলো না। পবিত্র ক্বোরআন বুঝার জন্য যেমন আক্বল (বিবেক) ও জ্ঞানের প্রয়োজন, তেমনি দ্বীন-ধর্মেরও প্রয়োজন; কিন্তু দেওবন্দীদের মধ্যে এ তিনটি বিষয়েরই অভাব পরিলক্ষিত হয়। দেওবন্দীদের এটা ছিলো চূড়ান্ত আপত্তি। মহান আল্লাহর অনুগ্রহে এ আপত্তিও টুকুরো টুকরো হয়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। আমরা তা দ্বারা এটাও বুঝলাম যে, তারা (দেওবন্দীরা) এখনো পর্যন্ত امكان كذب (ইমকান-ই কিযব)’র মাসআলাটাই বুঝলো না।
কে এটা বলছে যে, পৃথিবীর কোন কোন জিনিস ممكن (মুমকিন) বা সম্ভবনাময় আর কোন কোনটি نا ممكن (না-মুমকিন) বা অসম্ভব?
বস্তুত: পরস্পর বিপরীত প্রত্যেক জিনিস (نقيضين ضدين) ‘মুমকিন’ (বা হওয়া সম্ভবময়)। তবে উভয়কে একই সময়ে একত্রিতকরণ محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) বা মৌলিকভাবে অসম্ভব। অনুরূপ,خبر الهى (খবর-ই ইলাহী বা আল্লাহ্ প্রদত্ত সংবাদ)-এর সাথে خلف (খল্ফ) বা ব্যতিক্রম হওয়া محال بالذات (মুহাল বিয্যাত)। এটাই হচ্ছে امكان كذب (ইমকান-ই কিয্ব) বা মিথ্যার সম্ভবনা বা সত্তাগতভাবে অসম্ভব সম্পর্কিত মাসআলা।
উপরোক্ত আপত্তি (নং ৬) বা প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর হলো- পবিত্র ক্বোরআনের আয়াত مَا كَانَ اللهِ لِيُعَذِّبَهُمْ (৮:৩৩), (মা-কা-নাল্লা-হু লিইয়ু‘আয্যিবাহুম)-এর মধ্যে আম আযাব-ই যাহিরী বুঝানো উদ্দেশ্য। যেমন চেহারা বিকৃত হওয়া, পাথর-বৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। আর অন্য আয়াত, যেমন قُلْ هُوَ الْقَادِرٌ (৯:৬৫) (ক্বুল হুয়াল ক্বাদিরু), অর্থাৎ ‘‘হে হাবীব, সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, আপনি বলে দিন, তিনি (আল্লাহ্) শক্তিমান’’-এর মধ্যে আযাব-ই বাত্বেনী (অপ্রকাশ্য শাস্তি) বুঝানো উদ্দেশ্য। অর্থাৎ যুদ্ধ-বিগ্রহে পরাজিত হওয়া, দূর্ভিক্ষ, কঠিন রোগ-ব্যাধি ইত্যাদি।
অথবা উক্ত আয়াতে ‘নির্দিষ্ট আযাব-ই যাহেরী’ বুঝানো উদ্দেশ্য। যেমন- হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে যে, ক্বিয়ামতের নিকটতম সময়ে কোন কোন জাতির চেহারা বিকৃত হয়ে যাবে, যমীন ধ্বসতে থাকবে। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে শুভাগমনের কারণে ‘সাধারণ যাহিরী আযাব’ আসা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে; অন্যান্য আযাব নিষিদ্ধ হয়নি। পবিত্র ক্বোরআনের আয়াত- وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ (ওয়া মা-কা-নাল্লা-হু লিইয়ু‘আয্যিবাহুম)-এর পূর্বে মক্কার কাফিরদের এ দো’আ উল্লেখিত আছে-
فَاَمْطِرُ عَلَيْنَاحِجَارَةً مِّنَ السَّمَاءِ اَوِأْتِنَا بِعَذَابٍ اَلِيْمٍ (৮:৩২) (ফাআমত্বির আলায়না হিজা-রাতাম্ মিনাস্ সামা-ই। অর্থাৎ ‘‘আমাদের উপর আসমান হতে পাথর নিক্ষেপ করুন অথবা আমাদের নিকট কঠিন শাস্তি নিয়ে আসুন।’’ এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে এ আযাব-ই বুঝানো উদ্দেশ্য।
স্মতর্ব্য যে, كذب (কিয্ব) ও صدق (সিদ্ক্ব) খবরেরই বিশেষণ; এটা مُخْبَرْ عَنْهُ (মুখবার আনহু) বা যে বিষয়ে খবর দেয়া হয় তার নয়। সুতরাং এটা অসম্ভব যে, মহান রব তার বাস্তবতার বিপরীত বিষয় বা ঘটনার সংবাদ দেবেন। এটাই হলো امتناع كذب (ইমতিনা-‘ই কিয্ব) অর্থাৎ ‘মিথ্যা অসম্ভব হওয়া’রই অর্থ। যাঁদের জান্নাতি হওয়ার সংবাদ দেয়া হয়েছে, তাঁরা যদি দোযখে যেতে পারতেন, তাহলে জান্নাতি হবার এ খবর প্রদানই محال بالذات (বিযযাত) অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব হতো।
আপত্তি : ৭
সাধারণ তর্কশাস্ত্রবিদরা বলেন, مقدور العبد مقدور الله (মাক্বদূ-রুল ‘আবদি মাক্বদূ-রুল্লা-হি) অর্থাৎ ‘‘বান্দা যে কাজ করার শক্তি রাখে, সে কাজের শক্তি আল্লাহও রাখেন।’’ বান্দারা মিথ্যা বলার শক্তি রাখে, সুতরাং খোদারও মিথ্যা বলার শক্তি থাকা উচিত।
জবাব
ওই উক্তির মর্মার্থ হলো এই যে, যে কাজ অর্জন করার অর্থাৎ সম্পন্ন করার শক্তি বান্দা রাখে, তা সৃষ্টি করার ক্ষমতা আল্লাহ্ তা‘আলা রাখেন। কেননা, তা মুমকিন বা সম্ভাব্য জিনিসই হবে। এ অর্থ নয় যে, আল্লাহ্ তা সম্পন্ন করতে পারবেন, যদি এ অর্থ প্রযোজ্য হতো, তবে যেহেতু বান্দা চুরি, যিনা ইত্যাদি কাজ করার ক্ষমতা রাখে, সেহেতু মহান আল্লাহকেও কি ওই সব অপকর্মের ওপর শক্তিমান মনে করবে? কখনো না।
আপত্তি : ৮
পবিত্র সত্তা আল্লাহ্ তা‘আলা এ শক্তি রাখেন যে, হাজার হাজার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বানিয়ে দেবেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বলেন, এখন আর নতুন নবী আসা محال الذات (মুহাল বিয্যাত) অর্থাৎ ‘সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব’। এটা তাদের ভুল কথা। তারা আরো বলেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরূপ সত্তা থাকা অসম্ভব। তাদের এটাও ভুল কথা। কারণ, যিনি এক মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)কে সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি লক্ষ লক্ষ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)সৃষ্টি করতে পারেন না? (এ তথ্যটি تقويت الايمان অর্থাৎ মৌং ইসমাঈল ‘দেহলভীর তাক্ববিয়াতুল ঈমান’ থেকে গৃহীত।
জবাব
দেওবন্দী বাহিনী থামছে কোথায়? গঙ্গার স্রোতে বিরতি কোথায়? এটা امكانِ نظير (ইমকান-ই নাযীর)’র মাসআলা, যা امكان كذب (ইমকান-ই কিয্ব)’র একটি শাখা। এতে দু’টি বক্তব্য রয়েছে:
১. হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পরে নতুন পয়গাম্বরের আবির্ভাব হতে পারে কিনা?
২. হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ হতে পারে কিনা?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর ও আলোচনা, মহান আল্লাহ্র অনুগ্রহে, ষষ্ঠ আপত্তির উত্তরে পরিপূর্ণভাবে করা হয়েছে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ এর শক্তি রাখেন যে, লক্ষ লক্ষ নবীর মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন خَاتَمُ النَّبِيِيّنَ (খাতামুন্নবিয়্যীন) অর্থাৎ ‘শেষ নবী’ বানিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। অর্থাৎ লাখো নবীর মধ্য হতে কাউকে না কাউকে خاتم النبيين (খাতামুন্নবিয়্যীন) অর্থাৎ শেষ নবী করে পাঠানো (على سبيل البدليت) সম্ভবপর ছিলো; কিন্তু যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এজন্য নির্বাচন করে ফেলেছেন এবং তিনি خاتم النبيين (খাতামুন্নবিয়্যীন) বা শেষ নবী হয়ে গেছেন, তখন থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত অন্য কারো পক্ষে শেষ নবী হওয়া محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) বা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব হলো। এর অতি চমৎকার উদাহরণ আমি ইতোপূর্বে উপস্থাপন করেছি। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষ হিন্দার স্বামী এবং যায়দ-এর পিতা হতে পারতো; কিন্তু যখন একজন হয়ে গেলেন, তখন অন্য কারো পক্ষে তা হওয়া محال (মুহাল) বা অসম্ভব হয়ে গেলো। যখন যায়দের আরেকজন পিতা হওয়া সম্ভব নয়, তখন অন্য কারো পক্ষে خاتم النبيين (খাতামুন্নবিয়্যীন) বা শেষ নবী হওয়া কিভাবে সম্ভব?
বাকী রইলো দ্বিতীয় মাস‘আলা। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানার জন্য হযরত শাহ্ ফয্লে হক খায়রাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি’র বরকতময় পুস্তক امتناع النظير (ইমতিনা‘উন নযীর) অধ্যয়ন করুন। সংক্ষিপ্তভাবে আমি এখানে কিছু বর্ণনা করছি-
এ কথা সকলের সুস্পষ্টভাবে জানা আছে যে, দু’টি বিপরীত বিষয় বা জিনিসের পরস্পর একত্রিতকরণ محال بالذات (মুহাল বিয্যাত) অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব।
হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ থাকায় বিশ্বাস করলে এ দু’টি পরস্পর বিরোধী বিষয়ে একই সময়ে একত্রিত হওয়া অনিবার্য হয়ে যায়ঃ তা এভাবে যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাম শেষ নবী, তাঁর ধর্ম শেষ ধর্ম, তাঁর কিতাব শেষ কিতাব। যদি অন্য কাউকে হুযূর আলায়হিস্ সালাম-এর সমকক্ষ মেনে নেয়া হয়, আর সেও উপরোক্ত বিষয়গুলোতে সর্বশেষ হয়, তাহলে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আর শেষ নবী থাকেন না। আর হুযূর আলাহিস্ সালাম সর্বশেষ হলে ওই অন্য লোকটি সর্বশেষ হয় না। অনুরূপ, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম সুপারিশকারী, সবার পূর্বে আল্লাহর সাথে কথোপকথনকারী, সবার পূর্বে পুল সেরাত্ব অতিক্রমকারী, সবার পূর্বে জান্নাতে প্রবেশকারী, সবার পূর্বে তাঁর রওযা মুবারক খোলা হবে, সবার পূর্বে তাঁরই নূরই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ميثاق (মীসাক্ব) বা অঙ্গিকারের দিন তিনি সর্বপ্রথম بلى (বালা) বা ‘হাঁ’ বলেছেন। এতসব বিষয়ের মধ্যে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সবার অগ্রে। যদি কেউ হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, তার মধ্যে এসব ‘প্রথম হওয়া’ (اوليت )-এর সমাবেশ ঘটবে কি না? যদি ঘটে, তাহলে তো এগুলো হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে থাকবে না। অন্যথায় দু’টি পরস্পর বিপরীত জিনিস একত্রিত হওয়া অনিবার্য হবে। আর যদি না ঘটে তাহলে ওই দ্বিতীয়জন হুযূর-ই আকরামের মত বা সমকক্ষ হলো কিভাবে?
তাছাড়া, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আদম আলায়হিস্ সালামের সব সন্তানের সরদার। সব মানুষ ক্বিয়ামতের দিন তাঁরই পতাকাতলে সমবেত হবে। সব মানুষের তিনি খতীব অর্থাৎ সব মানুষ সম্পর্কে তিনিই বলবেন, ক্রন্দনরত সব মানুষের মুখে তিনিই হাসি ফুটাবেন, সব পতন্মুখকে তিনিই সামলাবেন, আগুনে নিক্ষিপ্তদের তিনিই রক্ষা করবেন, আগুনে প্রজ্জ্বলিত শিখাকে তিনি নির্বাপন করবেন, বিকৃতদের তিনিই ঠিক করবেন, সব চক্ষু তাঁরই নূরানী চেহারার দিকে নিবদ্ধ থাকবে, সব হাত তাঁর দামানের দিকেই বাড়বে, সব লোকের মধ্যে ‘মাক্বাম-ই মাহমুদ’ শুধু তাঁরই ভাগে থাকবে, সব লোকের মধ্যে তিনি ‘ওসীলা’ বা জান্নাতের উচুঁতম স্থান প্রাপ্ত হবেন এবং তিনি সব লোকেরই নবী। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে- رَسُوْلُ اللهِ اِلَيْكُمْ جَمِيْعًا (৭:১৫৮) রাসূলুল্লাহি ইলায়কুম জামী‘আন। অর্থাৎ ‘‘তিনি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল।’’
যদি কেউ হুযূর-ই আকরামের অনুরূপ হয় তাহলে বলুন, তার মধ্যেও এ সব গুণ থাকবে কিনা? যদি থাকে তাহলে দু‘টি বিপরীত গুণের সমাবেশ হবে। যদি না থাকে তাহলে তাঁর সমকক্ষ কিভাবে? সঠিক কথা হলো-এ মহান আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা হিসেবে একক ও অদ্বিতীয়। আর হুযূর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা ওয়াসাল্লাম এসব গুণের মধ্যে একক ও অদ্বিতীয়, যেভাবে দু’জন স্রষ্টা হওয়া محال (মুহাল) বা অসম্ভব। একটি কবিতা দেখুন-
كوئى مثل ان كا هو كس طرح وه هيں سب كے مبدأ ومنتها
نهىں دوسرے كى يهاں جهল كه يه وصف دو كو ملا نهيں
অর্থাৎ : তাঁর কোন উপমা কিভাবে হতে পারে? তিনি তো সবার শুরু ও শেষ।
এখানে অন্য কারও জায়গা নেই; কারণ, এ বৈশিষ্ট্য দ্বিতীয় কেউ পায় নি।
এ প্রসঙ্গে ড. ইক্ববাল অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেছেন-
رخ مصطفى هے وه آ ئينه نهں جس كے رنگ كا دوسرا
نه كسى كے وهم وگمان هيں نه دكانِ آ ئينه ساز ميں
অর্থাৎ : হুযূর মুস্তফার চেহারা মুবারক হচ্ছে ওই আয়না, যে রঙের অন্য কেউ নেই। এর উপমা না আছে কারও ধারণা-কল্পনায়, না আছে আয়না নির্মাতার দোকানে।
আপত্তি : ৯
মহান আল্লাহ্ শক্তিমান যে, এ ধরনের দ্বিতীয় পৃথিবী বানিয়ে দেবেন। আর ওই দ্বিতীয় পৃথিবীর মধ্যেও এ পৃথিবীর মত সমস্ত জিনিস থাকা জরুরি, অন্যথায় ওই পৃথিবী এ পৃথিবীর মত হবে না। সুতরাং ওই পৃথিবীর মধ্যেও হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মত সত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। অন্যথায় ওই আলম বা পৃথিবী এ আলম বা পৃথিবীর মত হবে না।
জবাব
এর দু’টি জবাব
১. মহান রব এ পৃথিবীর অনুরূপ পৃথিবী সৃষ্টি করতে সক্ষম। আর عالم (আলম) বলা হয় ما سوى الله (মা- সিওয়াল্লাহি) অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া সব মুমকিনই। যেহেতু হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর نظير (নাযীর) বা সমকক্ষ থাকা সম্ভব নয়, সেহেতু তা ওই তথাকথিত আলমের অন্তর্ভুক্তও নয়।
২. عالم (আলম) বলা হয় جميع ما سوى الله (জামী’ই মা-সিওয়াল্লাহি) অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া সব কিছুকে। যখন جميع ما سوى الله (জামী’ই মা-সিওয়াল্লাহি) আলম বা পৃথিবীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তখন দ্বিতীয় আলম বা পৃথিবী হওয়া অসম্ভব। কেননা এ কল্পনাকৃত আলম বা পৃথিবীর মধ্যে যে জিনিসের কল্পনা করা হবে, তা তার পূর্বেকার আলম বা পৃথিবীরই অংশ ছিলো।
ক্বোরআন করীমের অন্যান্য আয়াত ও তাফসীর
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন- وَمَنْ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ حَدِيْثًا
তরজমা ঃ এবং আল্লাহর চেয়ে বেশী কার কথা সত্য? [সূরা নিসা: আয়াত-৮৭] وَمَنْ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ قِيْلاً তরজমা ঃ এবং আল্লাহ্ অপেক্ষা কার কথা অধিক সত্য? [সূরা নিসা: আয়াত-১২২] وَعْدَ اللهِ ط لاَ يُخْلِفُ اللهُ الْمِيْعَادَ তরজমা ঃ আল্লাহর প্রতিশ্র“তি, আল্লাহ্ প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করেন না।[সূরা যুমার: আয়াত-২০] وَعْدَ اللهِ حَقًّا তরজমা ঃ আল্লাহর সত্য প্রতিশ্র“তি। [সূরা ইয়ূনুস: আয়াত-৪] اَلاَ اِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ وَلكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لاَ يَعْلَمُوْنَ
তরজমাঃ শুনে নাও, নিশ্চয় আল্লাহ্র প্রতিশ্র“তি সত্য; কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই জানে না। [সূরা ইয়ূনুস: আয়াত-৫৫] وَلَنْ يُخْلِفَ اللهُ وَعْدَه তরজমা ঃ এবং আল্লাহ্ কখনো আপন প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করবেন না। করেন না। [সূরা হজ্জ, আয়াত-৪৭]
ক্বোরআন-ই আযীমে এ ধরনের অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলোতে একথা জোর দিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা পরম সত্যবাদী, তাঁর ওয়াদা সত্য, তিনি না কখনো মিথ্যা বলেছেন, না কখনো বলতে পারেন। তিনি না কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন, না কখনো করতে পারেন।
ক্বোরআন-ই করীমের আয়াতগুলোর এ প্রসঙ্গে এমন সুস্পষ্ট বর্ণনার পর দেখুন কতিপয় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর-ই ক্বোরআন। ‘আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা ও ওয়াদা ভঙ্গ করা অসম্ভব’-এ প্রসঙ্গে শীর্ষস্থানীয় তাফসীরকারকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আক্বীদা কি-
তাফসীর-ই খাযিন
এ তাফসীরে লিখেছেন-
لاَ اَحَدٌ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ فَاِنَّه لاَ يُخْلِفُ الْمِيْعَادَ وَلاَ يَجُوْزُ عَلَيْهِ الْكِذْبُ
অর্থাৎ: আল্লাহ্ তা‘আলার চেয়ে কেউ বেশী সত্যবাদী নেই, না তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারেন, না তাঁর পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব।
[আলাউদ্দিন বাগদাদী: তাফসীর-ই খাযিন: ১ম খণ্ড: পৃ. ৪২১, মিশরে মুদ্রিত]
তাফসীর-ই মাদারিক
وَمَنْ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ حَدِيْثًا ـ تَمِيْزٌ وَهُوَ اسْتِفْهَامٌ بِمَعْنى النَّفِىِّ اَىْ لاَ اَحَدٌ اَصْدَقَ مِنْهُ فِىْ اِخْبَارِه وَوَعْدِه وَوَعِيْدِه لِاِسْتِحَالَةِ الْكِذْبِ عَلَيْهِ لِقُبْحِه لِكَوْنِه اِخْبَارًا عَنِ الشّئِ بِخِلاَفِ مَا هُوَ عَلَيْهِ
অর্থাৎ এ আয়াত শরীফে, প্রশ্নের উত্তর না বোধক। অর্থাৎ খবর, প্রতিশ্র“তি ও শাস্তির হুমকি কোন বিষয়ে কেউ আল্লাহ্ তা‘আলা অপেক্ষা বেশী সত্যবাদী নেই। মিথ্যা বলা তাঁর পক্ষে কোন মতেই সম্ভবপর নয়। কারণ, তা (মিথ্যা বলা) নিজের অর্থ অনুসারেই মন্দ। কারণ, বাস্তবতা বিরোধী খবর দেওয়াকেই ‘মিথ্যা’ বলে।
তাফসীর-ই বায়দ্বাভী
وَمَنْ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ حَدِيْثًا ـ اِنْكَارُ اَنْ يَكُوْنَ اَحَدٌ اَكْثَرَ صِدْقًا مِّنْهُ فَاِنَّه لاَ يَنْطَرِقُ الْكِذْبُ اِلى خَبَرِه بِوَجْهٍ لِاَنَّه نَقْصٌ عَلَى اللهِ تَعَالى مُحَالٌ
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা এ আয়াতে একথার অস্বীকৃতি প্রকাশ করছেন যে, কেউ আল্লাহ্ তা‘আলা অপেক্ষা বেশী সত্যবাদী হবে। তাঁর খবরে তো কোন প্রকার মিথ্যার লেশ মাত্রও নেই। কারণ, মিথ্যা হচ্ছে দোষ, আর দোষ-ত্র“টি আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব।
তাফসীর-ই আবুস্ সা‘ঊদ
وَمَنْ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ حَدِيْثًا ـ انِكَارٌ لِاَنْ يَّكُوْنَ اَحَدٌ اَصْدَقَ مِنْهُ تَعَالى فِىْ وَعْدِه وَسَائِرِ اَخْبَارَه وَبَيَانٌ لاِسْتِحَالَتِه كَيْفَ لاَ وَالْكِذْبُ مُحَالٌ عَلَيْهِ سُبْحَانَه دُوْنَ غَيْرِه
অর্থাৎ এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, ওয়াদা ও যে কোন ধরনের খবর প্রদানে আল্লাহ্ তা‘আলা অপেক্ষা বেশী সত্যবাদী আর কেউ নেই। আর এটা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হবার পক্ষে স্পষ্ট বিবরণও রয়েছে। তা হবেও না কেন? মিথ্যা বলা আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব। অন্য কারো বেলায় এর ব্যতিক্রমও হতে পারে।
তাফসীর-ই কবীর
وَلَنْ يُخْلِفَ اللهُ وَعْدَهَ يَدُلُّ عَلَى اَنَّه سُبْحَانَه مُنَزَّهٌ عَنِ الْكِذْبِ فِىْ وَعْدِه وَوَعِيْدِه قَالَ اَصْحَابُنَا لِاَنَّ الْكِذْبَ صِفَةُ نَقْصٍ وَالنَّقْصُ عَلَى اللهِ تَعَالى مُحَالٌ وَقَالَتِ الْمُعْتَزِلَةُ لِاَنَّ الْكِذْبَ فَيَسْتَحِيْلُ اَنْ يَفْعَلَه فَدَلَّ عَلى اَنَّ الْكِذْبَ مِنْهُ مُحَالٌ الخـ مخُلصا
অর্থাৎ এবং তিনি কখনো তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করবেন না। এটা এ বিষয়ের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর প্রত্যেকটা ওয়াদা ও শাস্তির প্রতিশ্র“তিতে মিথ্যা থেকে পবিত্র। আমাদের আহলে সুন্নাত এ দলীল থেকে আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব বলে দাবীদার। কারণ, মিথ্যা হচ্ছে দোষ। দোষত্র“টি থাকা আল্লাহর জন্য অসম্ভব। আর মু’তাযিলা সম্প্রদায়ও এ দলীল থেকে তা ‘মুমতানি’ (অসম্ভব) বলে বিশ্বাস করে। কারণ, ‘মিথ্যা’ হচ্ছে সত্তাগতভাবে মন্দ (قبيح لذاته)। সুতরাং এটা আল্লাহ্ তা‘আলা দ্বারা সম্পন্ন হওয়া অসম্ভব।
তাফসীর-ই রূহুল বয়ান
وَمَنْ اَصْدَقُ مِنَ اللهِ حَدِيْثًا ـ اِنْكَارٌ لِأَن يَّكُوْنَ اَحَدٌ اَكْثَرَ صِدْقًا مِّنْهُ فَاِنَّ الْكِذْبَ نَقْصٌ وَهُوَ عَلَى اللهِ مُحَالٌ دُوْنَ غَيْرِه
অর্থাৎ এ আয়াত থেকেও স্পষ্ট হচ্ছে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা অপেক্ষা বেশী সত্যবাদী কেউ নেই। কেননা মিথ্যা বলা একটি দোষ। আর দোষত্র“টি থাকা আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব; অন্য কারো জন্য নয়।
এগুলো এমন সব তাফসীরগ্রন্থ, যেগুলো গোটা দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। এমনকি যারা আল্লাহর জন্য মিথ্যা ও ওয়াদা ভঙ্গ করা সম্ভব বলে (না‘ঊযু বিল্লাহ্) বিশ্বাস করে তাদের পক্ষেও এসব গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতাকে অস্বীকার করার জো নেই। এমন সব কিতাবের উদ্ধৃতি ও প্রমাণ সত্ত্বেও কি কারো জন্য ‘আল্লাহ্ মিথ্যা বলতে পারেন না, ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারেন না’ মর্মে সংশয় থাকতে পারে? এতদ্সত্ত্বেও কি কেউ আরো প্রমাণ চাইতে পারে? সুতরাং এমন বাস্তব সত্য বিষয়টিকে অস্বীকার করা তেমনি হলো যেন সূর্য উদিত হয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করছে, আর কেউ বলছে এখনো রাতের কিছু অংশ বাকী আছে। সত্য প্রকাশ পাবার পর ‘বাতিল’ (মিথ্যা)’র উপর হঠ ধরে থাকা যদি ইসলামই হয়, তাহলে বলুন গোমরাহী কোন্ চিড়িয়াটির নাম? বরং একথা বলা সমীচিন হবে যে, দেওবন্দীদের আবিষ্কৃত এমন গোমরাহীপূর্ণ আক্বীদা (ভ্রান্ত বিশ্বাস) দীর্ঘদিন যাবৎ যেসব কওমী-ওহাবীদের মধ্যে বাসা বেঁধে ফেলেছে, তা আর যেতে পারছে না।
এখন দেখুন আমাদের পূর্ববর্তী শতাব্দিগুলোতে ইসলামের ইমামগণ, দ্বীনের জ্ঞানী-গুণী ও ইসলামী জ্ঞানজগতের সুলতানগণ এ মাসআলায় কী আক্বীদা পোষণ করতেন? এ প্রসঙ্গে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি কি ছিলো?
জমহুর (প্রায় সব) ওলামা ও মাশা-ইখের দৃষ্টিভঙ্গি
শরহে মাওয়াক্বিফ-এ উল্লেখ করা হয়েছে-
اِنَّه تَعَالى يَمْتَنِعُ عَلَيْهِ الْكِذْبُ اِتِّفِاقًا اَمَّاعِنْدَ الْمُعْتَزِلَةِ فَاِنَّ الْكِذْبَ قَبِيْحٌ وَهُوَ سُبْحَانَه لاَ يَفْعَلُ اَمَّا اِمْتِنَاعُ الْكِذْبِ عَلَيْهِ عِنْدَنَا فَاِنَّه نَقْصٌ وَالنَّقْصُ عَلَى اللهِ تَعَالى مُحَالٌ اِجْمَاعًا
অর্থাৎ শরহে মাওয়াক্বিফে ‘মু’তাযিলাহ্ সম্প্রদায়ের আলোচনায় রয়েছে যে, আহলে সুন্নাত ও মু’তাযিলা এ মাসআলায় একই ধ্যান-ধারণা রাখে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব। মু’তাযিলার মতে এ জন্য যে, মিথ্যা বলা মন্দ কাজ। আল্লাহ্ তা‘আলা মন্দ থেকে পবিত্র। আর আমরা আহলে সুন্নাতের মতে এজন্য অসম্ভব যে, মিথ্যা বলা একটি দোষ, আর একথার উপর ইজমা’ (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য যে কোন দোষ-ত্র“টি অসম্ভব।
قَدْ مَرَّ فِىْ مَسْئَلَةِ الْكَلاَمِ مِنْ مَوْقِفِ الْاِلهِيَّاتِ اِمْتِنَاعُ الْكِذْبِ عَلَيْهِ سُبْحَانَه وَتَعَالى
অর্থাৎ ‘শরহে মাওয়াক্বিফ’-এ ‘মাওক্বিফে ইলা-হ্যিাত’ (ইলাহ্ সম্পর্কিত বর্ণনা)-এ মাসআলা আলোচনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা কখনো সম্ভবপর নয়।
‘মুসায়ারাহ’য় উল্লেখ করা হয়েছে
يَسْتَحِيْلُ عَلَيْهِ سُبْحَانَه تَعَالى اَسْمَاتُ النَّقْصِ كَالْجَهْلِ وَالْكِذْبِ
অর্থাৎ দোষ-ত্র“টির সমস্ত নিশানা, যেমন মূর্খতা ও মিথ্যা, আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব। [মুসায়ারাহ্, কৃত. আল্লামা কামাল উদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আবূ শরীফ: পৃ. ৮৪] শরহে মুসায়ারায় বর্ণিত হয়েছে-
لاَخِلاَفَ بَيْنَ اَلاَ شْعَرِيَّةِ وَغَيْرِهِمْ فِىْ اَنَّ كُلَّ مَا كَانَ وَصْفُ نَقْصٍ فَالْبَارِىْ تَعَالى عَنْهُ مُنَزَّهٌ هُوَ مُحَالٌ عَلَيْهِ تَعَالى وَالْكِذْبَ وَصْفُ نَقْصٍ
অর্থাৎ আশা‘ইরা ও আশা-‘ইরাহ্ নন এমন (আহলে সুন্নাতের দু’ ধারা) সবার এতে কোন দ্বিমত নেই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা প্রত্যেক দোষ-ত্র“টি থেকে পবিত্র। বস্তুতঃ তা আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য সম্ভবই নয়। মিথ্যা একটি দূষণীয় বিশেষণ।
শরহে আক্বাইদ-এ উল্লেখ করা হয়েছে, كِذْبُ كَلاَمِ اللهِ تَعَالى مُحَالٌ
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার কথা মিথ্যা হওয়া অসম্ভব। [আল্লামা তাফতাযানী কৃত. শরহে আকাইদে নসফী: পৃ. ১৫৩] ত্বাওয়ালি‘উল আন্ওয়ার-এ উল্লেখ করা হয়েছে- اَلْكِذْبُ نَقْصٌ وَالنَّقْصُ عَلَى اللهِ تَعَالى مُحَالٌ
অর্থাৎ মিথ্যা একটি দোষ; আর দোষ থাকা আল্লাহর জন্য অসম্ভব।
‘কান্যুল ফারাঈদ’-এ উল্লেখ করা হয়েছে-
قُدِّسَ تَعَالى شَانُه عَنِ الْكِذْبِ شَرْعًا وَعَقْلاً اِذْ هُوَ قَبِيْحٌ بِدَرْكِ الْعَقْلِ قُبْحَةٌ مِّنْ غَيْرِ تَوَقُّفٍ عَلى شَرْعٍ فَيَكُوْنُ مُحَالاً فِىْ حَقِّهِ تَعَالى عَقْلاً وَّ شَرْعًا كَمَا حَقَّقَه اِبْنُ الْهُمَّامِ وَغَيْرُه
অর্থাৎ যুক্তি ও শরীয়তের দাবী অনুসারে আল্লাহ্ তা‘আলা প্রত্যেক প্রকারের মিথ্যা থেকে পবিত্র। কেননা, শরীয়তের অবগতি ছাড়াও মিথ্যা বিবেক বা যুক্তিতর্কের দিক দিয়েও অপছন্দনীয়। সুতরাং মিথ্যা যুক্তি ও শরীয়ত উভয় দিক থেকে আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব। যেমন ইমাম ইবনে হুম্মাম প্রমুখ এ বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।
‘মুসাল্লামুস্ সুবূত’-এ উল্লেখ করা হয়েছে-
اَلْمُعْتَزِلَةُ قَالُوْا لَوْ لاَ كَوْنُ الْحُكْمِ عَقْلِيًّا لَمَا اِنْتَفَعَ الْكِذْبُ مِنْهُ تَعَالى عَقْلاً وَالْجَوَابُ اَنَّه، نَقْصٌ فَيَجِبُ تَنْزِيْهُه تَعَالى عَنْهُ كَيْفَ وَقَدْ مَرَّ اَنَّه عَقْلِىٌّ بِاتِّفَاقِ الْعُقَلاَءِ لِاَنَّ مَا يُنَافِى الْجَوْبُ الذَّاتِىُّ مِنْ جُمْلَةِ النَّقْصِ فِىْ حَقِّ الْبَارِىْ تَعَالى ـ وَمِنْ اِسْتِحَالاَتِ الْعَقْلِيَّةِ عَلَيْهِ سُبْحَانَه
অর্থাৎ মু‘তাযিলা সম্প্রদায় বলেছে- ‘‘হুকুম যদি ‘আক্বলী’ (যুক্তিগ্রাহ্য) না হয়, তবে আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য ‘ইমতিনা’ই কিয্ব’ (মিথ্যা বলা অসম্ভব হওয়া) ‘আক্বলী’ (যুক্তিগ্রাহ্য) থাকবে না।’’
আহলে সুন্নাতের জবাব এ যে, আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য মিথ্যা এজন্য অসম্ভব যে, তা একটি দোষ। বস্তুতঃ আল্লাহ্ তা‘আলার তা থেকে পবিত্র হওয়া ‘ওয়াজিব’ (অপরিহার্য)। ‘মিথ্যা অসম্ভব হওয়া’ (امتناع كذب) বিবেক বা যুক্তিগ্রাহ্য (عقلى) হওয়ার উপর সমস্ত দ্বীনদার ও জ্ঞানীর ‘ঐকমত্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দলীল হচ্ছে- ‘মিথ্যা’ ইলাহ্ হওয়া ‘(الوهيت) -এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আর যে জিনিষ আল্লাহর শানের বিপরীত হয়, তা আল্লাহর জন্য দোষ এবং তাঁর শানে বিবেক বা যুক্তিগ্রাহ্যভাবেও অসম্ভব।
মালিকুল ওলামা বাহরুল উলূম আবদুল আলী (১২২৫হি.) তাঁর ‘ফাওয়াতিহুর রাহমূত’-এ লিখেছেন- اَللهُ تَعَالى صَادِقٌ قَطْعًا لِاِسْتِحَالَةِ الْكِذْبِ هُنَاكَ অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা মহা সত্যবাদী। এখানে মিথ্যার অবকাশ নেই; (সম্ভাবনাই নেই)।
শরহে ফিক্বহে আকবার-এ উল্লেখ করা হয়েছে- اَلْكِذْبُ عَلَيْهِ تَعَالى مُحَالٌ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব।
[ফিক্বহে আকবর, কৃত. ইমামে আ’যম আবূ হানীফা ও শরহে ফিক্বহে আকবার, কৃত. মোল্লা আলী ক্বারী আলায়হিমার রাহমাহ্, পৃ. ২]
اِنَّه لَا يُوْصَفُ اللهُ تَعَالى بِالْقُدْرَةِ عَلَى الظُّلْمِ لِاَنَّ الْمُحَالَ لَا يَدْخُلُ تَحْتَ الْقُدْرَةِ وَعِنْدَ الْمُعَتَزِلَةِ اَنَّه يَقْدِرُ وَلَكِنْ لَا يَفْعَلُ – (شرح فقه الاكبر: صـ ١٣٨)
অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলাকে ‘যুল্ম করতে সক্ষম’ বলা যাবে না। কারণ এটা (আল্লাহ্ তা‘আলার পবিত্র সত্তার জন্য) অসম্ভব। অসম্ভব বস্তু আল্লাহর ক্বুদরতের অন্তর্ভুক্ত নয়; কিন্তু মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের মতে, তিনি তা করতে পারেন কিন্তু করেন না। [শরহে ফিক্বহে আকবর, পৃ. ১৩৮] ‘শরহে আক্বাইদে জালালী’তে আছে-
اَلْكِذْبُ نَقْصٌ وَالنَّقْصُ عَلَيْهِ مُحَالٌ ـ فَلاَ يَكُوْنُ مِنَ الْمُمْكِنَاتِ وَلاَ تَشْمَلُهُ الْقُدْرَةُ كَسَائِرِ وُجُوْهِ النَّقْصِ عَلَيْهِ تَعَالَى كَالْجَهْلِ وَالْعِجْزِ
অর্থাৎ ‘মিথ্যা’ দোষ। মিথ্যা আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব। সুতরাং মিথ্যা বলা আল্লাহ তা‘আলার জন্য সম্ভবই নয়। আল্লাহ্র ক্বুদরতেও তা শামিল (অন্তর্ভুক্ত) নয়; যেমনিভাবে সমস্ত দোষ-ত্র“টি, যেমন- মিথ্যা ও অক্ষমতা। আর এসবই আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য অসম্ভব এবং ক্ষমতার যোগ্যতা বহির্ভূত।
‘আক্বাইদে আদ্বদিয়াহ্’তে আছে-
مُتَّصِفٌ بِجَمِيْعِ صِفَاتِ الْكَمَالِ وَمُنَزَّهٌ عَنْ سِمَاتِ النَّقْصِ ـ اَجْمَعَ عَلَيْهِ الْعُقَلاَءُ
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা সমস্ত উত্তম গুণে গুণান্বিত এবং দোষ-ত্র“টির চি‎হ্নাদি থেকে পবিত্র। এর উপর যুগের সমস্ত জ্ঞানী ও যুক্তিবিদ একমত।
এভাবে আরো বহু উদ্ধৃতি দেওয়া যাবে; কিন্তু কলেবর বৃদ্ধি এড়ানোর জন্য আর কোন উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ করলাম না। উল্লিখিত উদ্ধৃতি ও অন্যান্য কিতাবাদির স্পষ্ট বর্ণনাদি একথা উচ্চস্বরে ঘোষণা করছে যে, ইসলামের প্রতিটি যুগের ইমামগণ, ইলমে কালামের বিজ্ঞ ওলামা, ফক্বীহ্গণ ও মুহাদ্দিসবৃন্দের সর্বসম্মত ও বিরোধহীন আক্বীদা হচ্ছে- আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা কোনভাবেই সম্ভব নয়; বরং শরীয়ত ও যুক্তির নিরীখেও অসম্ভব। সুতরাং যারা ‘আল্লাহ্ মিথ্যা বলতে পারেন’ বলে বিশ্বাস করে তারা আপাদমস্তক পথভ্রষ্টতা ও বে-দ্বীনীর মধ্যে আটকা পড়ে আছে। তাদের অন্তরের উপর ‘মোহর’ অঙ্কিত না হলে তাদের হিদায়ত নসীব হোক-এ প্রার্থনাই করি।
এখন দেখুন সর্বজন মান্য বুযুর্গানে দ্বীনের এ প্রসঙ্গে আক্বীদা কি
হযরত গাউসুল আ’যম শায়খ আবদুল ক্বাদির জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আক্বীদা
قَوْلُه اُجِيْبَ وَاسْتُجِيْبَ خَبَرٌ ـ وَالْخَبَرُ لاَ يَعْتَرِضُ عَلَيْهِ النُّسْخُ ـ لِاَنَّه اِذَا نُسِخَ صَارَ بِخَبَرٍ كَاذِبًا وَتَعَالى الله ُ عَنْ ذلِكَ عُلُوًّا كَبِيْرًا وَخَبَرُ اللهِ تَعَالى لاَ يَقَعُ بِخَلاَفِ مُخْبَرِه
অর্থাৎ ‘জবাব দেওয়া হয়েছে’ ‘কবুল করা হয়েছে’- খবর (সংবাদ)-ই। আর এ খবরের সাথে ‘রহিত হওয়া’ সম্পৃক্ত হতে পারে না। কারণ, তা যদি রহিত হয়ে যায়; তবে ওই খবর মিথ্যা হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তা‘আলা মিথ্যার বহু ঊর্ধ্বে। আল্লাহ্ তা‘আলার খবর তার বাস্তবতার বিপরীত হতে পারে না।
[গুনিয়াতুত্ ত্বালেবীন: পৃ. ৬৫১]
‘ফাতাওয়া-ই আলমগীরী’র মুফতীগণের আক্বীদা
‘‘যদি কেউ আল্লাহ্ তা‘আলাকে এমন বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করে, যা আল্লাহর শানের উপযোগী নয়, অথবা আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে মূর্খতা, অক্ষমতা কিংবা কোন দোষ-ত্র“টির সম্পর্ক রচনা করে, তবে সে কাফির হয়ে যায়।
[ফাতাওয়া-ই আলমগীরী: ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৩৫]
ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানীর আক্বীদা
او تعالى از جميع نقائص وسمات حدوث منزه ومبئرأست
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা সমস্ত দোষ-ত্র“টি ও নশ্বরতার চি‎‎হ্নাদি থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধ্বে। [মাকতূবাত নং-১৬৬]
শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভীর আক্বীদা
وَلاَ يَصِحُّ عَلَيْهِ الْحَرْكَةُ وَالْاِنْتِقَالُ وَالتَّبَدُّلُ فِىْ ذَاتِه وَلاَ صِفَاتِه وَالْجَهْلُ وَالْكِذْبُ
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার যাত ও সিফাতের জন্য নড়াচড়া, স্থানান্তর গ্রহণ, পরিবর্তন, মূর্খতা ও মিথ্যার সম্পর্ক রচনা মোটেই ঠিক হবে না। [হুসনুল আক্বীদা: পৃ. ৬]
শাহ্ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভীর আক্বীদা
خبراو تعالى كلام ازل است وكذب دركلام نقصانيست عظيم كه هرگزبصفات او نيابد درحق او تعالى كه مبرا ازجميع عيوب ونقائص است خلاف خبر نقصان محض است
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার খবর অনাদি বাণী (كلام ازلى)। মিথ্যা হচ্ছে মহা দোষের কথা, যা তাঁর গুণাবলীর মোটেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। তিনি সমস্ত দোষ-ত্র“টি থেকে পবিত্র। খবরের বিপরীত বাস্তবতা হচ্ছে-পূর্ণাঙ্গ নিছক দোষই। [তাফসীর-ই আযীযী: প্রথম পারা, পৃ. ২১৪]
আল্লামা শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ তামারতাশীর আক্বীদা
لاَ يُوْصَفُ الله ُ تَعَالى بِالْقُدْرَةِ عَلَى الظُّلْمِ وَالسَّفْهِ وَالْكِذْبِ لِاَنَّ الْمُحَالَ لاَ يَدْخُلُ تَحْتَ الْقُدْرَةِ
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা যুল্ম-অত্যাচার, বোকামী ও মিথ্যার ক্ষমতার গুণে গুণান্বিত নন। কেননা, অসম্ভব বস্তু আল্লাহর ক্ষমতাধীন হয় না।
আল্লামা ইব্রাহীম বা-জূরীর আক্বীদা
اَلْقُدْرَةُ لاَ تَتَعَلَّقُ بِالْمُسْتَحِيْلِ فَلاَ ضَيْرَ فِىْ ذلِكَ كَمَا لاَ ضَيْرَ فِىْ اَنْ يُّقَالَ لاَ يَقْدِرُ الله ُ عَلى اَنْ يَّتَّخِذَ وَلَدًا اَوْ زَوْجَةً اَوْ نَحْوَ ذلِكَ
অর্থাৎ অসম্ভবের সাথে আল্লাহর ক্ষমতার কোন সম্পর্ক নেই। সুতরাং তিনি মিথ্যা বলতে সমর্থ নয় বলায় কোন ক্ষতি নেই। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তান-সন্তুতি ও স্ত্রী নেই বললে কোন ক্ষতি নেই। এমনটি বললে আল্লাহর ক্ষমতার কোন ক্ষতি হবে না।
ইমাম আহমদ রেযা আ’লা হযরত বেরলভী আলায়হির রাহমার আক্বীদা
আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা কোন ভাবেই সম্ভব নয়; বরং এ আক্বীদা পোষণ করা (তিনি মিথ্যা বলতে পারেন, ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা) পূর্ণাঙ্গ পথভ্রষ্টতা।
তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সুবহানুস্ সুব্বূহু ‘আন ‘আয়বি কিয্বিম্ মাক্ববূহ্’-এ শতশত উদ্ধৃতিগত ও যুক্তিগ্রাহ্য দলীল প্রমাণ দিয়ে একথা প্রমাণ করেছেন যে, ‘আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব’-এ আক্বীদার উপর সমস্ত আশ‘আরী ও মাতুরীদী’র ইজমা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাছাড়া, একথা বলা যে, এ মাসআলায় পূর্ববতী যুগগুলো থেকে মতবিরোধ চলে আসছে সম্পূর্ণ ভুল এবং পূর্ববর্তী বুযুর্গদের প্রতি অমূলক অপবাদ দেওয়ারই সামিল; বরং সঠিক কথা হচ্ছে- ‘আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব ইত্যাদি’ বলা যে একটা জঘন্য বাতিল বা ভ্রান্ত আক্বীদা তার উপর হক্বপন্থীদের ইজমা’ বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি এ মাসআলায় তো (আরেক বাতিল সম্প্রদায়) মু’তাযিলা প্রমুখও হক্বপন্থী আলিমদের (আহলে সুন্নাত) সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে।
[সুবহানুস্ সুব্বূহ আন আয়বি কিযবিম্ মাকবূহ, কৃত. আ’লা হযরত, আল আযাবুশ্ শাদীদ, কৃত. হাফেযে মিল্লাত, আন্ওয়ার-ই আফতাব-ই মাদাক্বত, কৃত. ক্বাযী ফযলে আহমদ নক্বশবন্দী, ফয়সালা-ই হক্ব ও বাতিল, কৃত. মুফতী আজমল শাহ্ এবং তাসবীহুর রাহমান, কৃত. আল্লামা আহমদ সা‘ঈদ কাযেমী ইত্যাদি]
আলহামদু লিল্লাহ্! আল্লাহ ্তা‘আলার শানে এহেন বাতিল ও ঈমান-বিধবংসী আক্বীদা ওহাবী মোর্চা থেকে সংক্রমিত হবার সাথে আমাদের আহলে সুন্নাতের তরফ থেকে তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে অকাট্য পুস্তক-পুস্তিকা লেখা হয়েছে, যার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা আমার এ নিবন্ধে ইতোপূর্বে পাওয়া গেছে। আরো সৌভাগ্যের বিষয় যে, এসব ক’টি কিতাবের সারকথা এবং এ প্রসঙ্গে সঠিক আক্বীদার বিবরণ পাওয়া যায় হযরত মাওলানা মুফতী খলীল আহমদ সাহেব ক্বাদেরী বরকাতী আলায়হির রাহমাহ্, হায়দারাবাদ, পাকিস্তান-এর একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে, যা প্রকাশিত হয়েছে, ‘মাসিক ইস্তিক্বামাত’ ডাইজেট, কানপুর, ভারত-এ রবিউল আউয়াল, ১৪১৭ হিজরী, মোতাবেক জুলাই, ১৯৯৬ ইংরেজী সংখ্যায়। নিম্নে নিবন্ধটির মূল বক্তব্য তুলে ধরা হলো-
মাওলানা মুফতী খলীল আহমদ ক্বাদেরী বরকাতী
মিথ্যা বলা ও ওয়াদা খেলাফ করা আল্লাহর জন্য অসম্ভব। প্রতিটি মুসলমানের ঈমান হচ্ছে- আল্লাহ্ তা‘আলা ‘আলা-কুল্লি শায়ইন ক্বাদীর’ অর্থাৎ -প্রতিটি ‘শাই’-এর উপর আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমতাবান। অর্থাৎ তিনি প্রত্যেক ‘মুমকিন শাই’ (সম্ভাব্য বস্তু)’র উপর শক্তিমান। কোন ‘মুমকিন’ (সম্ভাব্য বস্তু) তাঁর ক্বুদরতের বাইরে নয়। প্রত্যেক ‘মওজূদ’ ও ‘মা’দূম’ (অস্তিত্ববিশিষ্ট ও অস্তিত্বশূন্য) জিনিষ এ ‘ক্ষমতা’র অন্তর্ভুক্ত; তবে এ শর্তে যে, যদি তা ‘হুদূস’ ও ‘ইমকান’ (নতুনভাবে সৃষ্টি হওয়া ও সম্ভাবনাময় হওয়া)-এর উপযোগী হয়। অর্থাৎ কোন ‘হা-দিস’ ও ‘মুমকিন’ (নশ্বর ও সম্ভব বস্তু বা বিষয়) তাঁর ক্ষমতার আওতার বাইরে নয়। পক্ষান্তরে, যা কিছু অসম্ভব (محال) তা আল্লাহ্ তা‘আলার ক্বুদরতের ‘আওতাভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র। আবার এ ‘মুহাল’ বা ‘অসম্ভব’ মানে হচ্ছে- তা কোন মতেই ‘মওজূদ’ হতে বা অস্তিত্বে আসতে পারবে না। আর যখনই তা তাঁর ক্বুদরতভুক্ত হবে, তখন তা ‘মওজূদ’ (অস্তিত্ব বিশিষ্ট) হবেই। ‘এ ক্বুদরত ভুক্ত’ (মাক্বদূর) হচ্ছে তাই, যা মহা শক্তিমান সত্তা চাইলে অস্তিত্বে এসে যায়। আর যদি কোন জিনিষ এমন হয়, তখন তা আর ‘মুহাল’ বা অসম্ভব থাকে না। বিষয়টি এভাবে বুঝে নিন- অন্য কোন খোদা থাকা ‘মুহাল’ (অসম্ভব); অর্থাৎ হতেই পারে না। কিন্তু যদি এটা আল্লাহ্র ক্বুদরতভুক্ত হয়, তবে তো (অন্য খোদা) অস্তিত্বে আসতে পারবে; তা আর ‘মুহাল’ (অসম্ভব) থাকবে না। অথচ এটাকে ‘মুহাল’ (অসম্ভব) বলে বিশ্বাস না করা আল্লাহর একত্বকে অস্বীকার করার সামিল, যা প্রকাশ্য ও স্পষ্ট কুফর ও ইরতিদাদ (কাফির ও মুরতাদ্দ্ হওয়া)-রই নামান্তর। (নাঊযুবিল্লাহ্)
অনুরূপ, আল্লাহর জন্য বিলীন বা ধবংশ হওয়াও অসম্ভব; যদি এটা তাঁর কুদ্রতভুক্ত হয়, তবে তাও সম্ভব হবে; অথচ যার জন্য বিলীন (ধবংস) হয়ে যাওয়া সম্ভব, তিনি খোদা নন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, ‘মুহাল’ (অসম্ভব)-এর উপর আল্লাহর ক্বুদ্রত আছে বলে বিশ্বাস করা আল্লাহ্ তা‘আলার উলূহিয়্যাৎ (খোদা হওয়া)-কে অস্বীকার আর নামান্তর মাত্র।
অনুরূপ, আল্লাহ্ তা‘আলার কুদরতের ‘সালব’ (কুদ্রত তিনি শূন্য হয়ে যাওয়া)ও অসম্ভব বা মুহালগুলোর অন্যতম। সুতরাং যদি আল্লাহ্ তা‘আলাকে ‘সালবে ক্বুদ্রত’ বা ক্বুদরত শূন্য হওয়ার উপরও শক্তিমান মেনে নেওয়া হয়, তাহলে একথা মেনে নেওয়াও অনিবার্য হয়ে যায় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা আপন ক্বুদ্রত হারিয়ে ফেলতে ও নিজেকে নিছক অক্ষম বানিয়ে নিতেও সক্ষম। তখন এটাও একটা বাতিল ও চরম ভ্রান্ত বিশ্বাস হবে।
সুতরাং আল্লাহ্ তা‘আলার প্রশংসাক্রমে, একথা স্পষ্ট হলো যে, কোন ‘মুহাল’ বা অসম্ভব বস্তুর উপর আল্লাহর ক্বুদ্রত আছে মর্মে বিশ্বাস করা- আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি জঘন্য দোষ-ত্র“টি আরোপ করার সামিল। আর ‘যুক্তি ও বিবেকগত অসম্ভব’ (محال عقلى) ও ‘সত্তাগতভাবে অসম্ভব’ (ممتنع ذاتى)-কে আল্লাহর ক্বুদ্রতভুক্ত বলে বিশ্বাস করার অন্তরালে, ‘মূল ক্বুদ্রত’ বরং ‘আসল উলূহিয়াত’ (نفس الوهيت)- কে অস্বীকারকারী হওয়ারই নামান্তর মাত্র। আমাদের দ্বীনী- ঈমানী ভাইদের এ মাসআলা বা বিষয় অতি উত্তমরূপে বুঝে নেওয়া চাই, যাতে তারা ওহাবী-দেওবন্দী (হেফাযতী, ক্বওমী) প্রমুখের কুপ্ররোচণা ও পথভ্রষ্ট করা থেকে নিরাপদে থাকেন।
অনুরূপ, প্রত্যেক মুসলমানের আক্বীদা হচ্ছে- আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা প্রত্যেক উত্তম গুণের অধিকারী। তাঁর সব গুণ উত্তম গুণই। তিনি ওইসব কিছু থেকে, যাতে দোষ-ত্র“টি ও গুণের পরিপন্থী কিছুর লেশ মাত্রও থাকে, সম্পূর্ণ পবিত্র। সুতরাং যেভাবে কোন উত্তম গুণ (صفت كمال)-এ ‘সালব’ বা অনুপস্থিতি তাঁর বেলায় অসম্ভব, তেমনি আল্লাহরই পানাহ্, কোন দোষ-ত্র“টির উপস্থিতিও সম্ভবপর নয়। অর্থাৎ কোনরূপ দোষ-ত্র“টি তাঁর মধ্যে থাকা অসম্ভব; বরং যে বিষয়ে না আছে গুণ, না আছে ত্র“টি এমন এমন অনর্থক বিষয় থাকাও তার জন্য ‘মুহাল’ (অসম্ভব)। যেমন, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, খিয়ানত করা, যুল্ম করা, অজ্ঞ হওয়া এবং বেহায়াপনা ইত্যাদি দোষ-ত্র“টি তাঁর জন্য সম্পূর্ণরূপে অকাট্যভাবে অসম্ভব। আর একথা বলা যে, তিনি নিজে মিথ্যা বলতে পারেন, একটি অসম্ভব বস্তুকে সম্ভব সাব্যস্ত করা এবং আল্লাহ্ তা‘আলাকে দোষ-ত্র“টিপূর্ণ বলা বরং আল্লাহ্ তা‘আলাকে অস্বীকার করারই সামিল। কারণ, যখন কেউ ‘মুহাল’ (অসম্ভব)-কে আল্লাহর কুদরতভুক্ত মানলো, তখন তো ‘মুহাল’ ও ‘ওয়াজিব’ (যথাক্রমে অসম্ভব ও চিরস্থায়ী ও চিরন্তন সত্তা) উভয়কে সমানভাবে তাঁর কুদরতভুক্ত বলে মানছে মর্মে সাব্যস্ত হলো। তখন তো আল্লাহ্ তা‘আলা, নাঊযুবিল্লাহ্, ‘ওয়াজিবুল ওয়াজূদ’ (চিরস্থায়ী, চিরন্তন সত্তা) থাকবেন না। সুতরাং এমন ব্যাপকভাবে কুদরত মানার কারণে আল্লাহর ‘উলূহিয়্যাত’-এর উপরও ঈমান অবশিষ্ট থাকবে না। تَعَالَى اللهُ عَمَّا يَقُوْلُ الظَّالِمُوْنَ عُلُوًّا كَبِيْرًا (এ যালিমগণ যা বলছে তা থেকে আল্লাহ্ তা‘আলা বহু বহু ঊর্ধ্বে।)
এবার দেখুন, ‘এসব মুহাল বা অসম্ভব বস্তুর উপর আল্লাহকে শক্তিমান না মানলে তাঁর ক্বুদ্রত অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে’ বলাও নিছক বাতিল। কারণ, এতে ক্বুদ্রতের ত্র“টিই বা কোথায়? ত্র“টি তো ওই ‘মুহাল’ বা অসম্ভব বস্তুরই, যার মধ্যে ক্বুদ্রতের অন্তর্ভুক্ত হবার যোগ্যতা নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে ইন্সাফের দৃষ্টিতে দেখুন! আহলে সুন্নাত ‘আল্লাহ্ মিথ্যা বলতে পারেন না’ বলে বিশ্বাস ও দাবী করে বিধায় ওহাবীরা, না‘ঊযুবিল্লাহ্, সুন্নীদের প্রতি আল্লাহ্কে অক্ষম বলে অপবাদ দিলে তা কি সঠিক হবে? নাকি ওইসব অপবাদ রটনাকারীদের দ্বীন, ঈমানেরই গোড়ায় গলদ হবে! তদুপরি, এটা তাদের প্রবৃত্তিপূজা ও ধিক্কৃত শয়তানের অনুসরণ বৈ- আর কি হতে পারে? এ মর্মে যাকে তারা ঈমান বলে নাম রেখেছে, তা তো ঈমান নয় বরং ঈমান বর্জন করা ও ঈমান থেকে বহু দূরে সিটকে পড়াই।
এখন ওহাবী (হেফাযতী ও কওমী) সম্প্রদায়ের দিক থেকে ওই নাপাক থেকে নাপাকতর কথার পটভূমিকা ও নেপথ্য দৃশ্যও দেখে নিন-
ইসলামের সঠিক আদর্শের অনুসারীগণ দলীল পেশ করলেন যে, আল্লাহ্ আয্যা ওয়া জাল্লা এরশাদ করেছেন- وَلكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ অর্থাৎ ‘‘কিন্তু তিনি আল্লাহর রসূল ও সমস্ত নবীর মধ্যে সর্বশেষ নবী।’’ সুতরাং অন্য কেউও যদি হুযূর-ই আক্রাম হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ হয়, তবে তো হুযূর-ই আক্রাম ‘খাতামুন্নবিয়্যীন’ হবেন না। আর আল্লাহর মহান বাণী, আল্লাহরই পানাহ্, মিথ্যা হয়ে যাবে।
ওহাবীদের ইমাম এর এক জবাব তো এটা দিলেন যে, আল্লাহর জন্য মিথ্যা বলা অসম্ভব হবে কেন? সুতরাং ইসমাঈল দেহলভী সাহেবের ‘একরূযী: পৃ.১৪৫-এ আছে- ‘‘আমরা মানিনা যে, আল্লাহর পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব।’’ মৌলভী খলীল আহমদ আম্বেঠভী সাহেব তার ‘বারাহীনে ক্বাতি‘আহ্’য়। যার টাইটেল পেজে লিখা হয়েছে- এটা মৌং রশীদ আহমদ সাহেবের নির্দেশে লেখা হয়েছে এবং যার পক্ষে শেষভাগে তার এ কিতাবের প্রশংসা মাখা অভিমত রয়েছে, লিখেছেন, ‘ইমকান-ই কিয্ব’ (আল্লাহ্র পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব) মর্মে মাসআলাটা নাকি এখনকার কেউ নতুনভাবে বের করে নি, পূর্ববর্তীদের মধ্যেও এ সম্পর্কে মতবিরোধ ছিলো। অথচ এটাও ‘সলফে সালেহীন’-এর প্রতি একটা জঘন্য অপবাদ; যেমনটি এ নিবন্ধেও ইতোপূর্বে এটা প্রমাণ করা হয়েছে।
সম্মানিত মুসলিম সমাজ! ‘মিথ্যা’ হচ্ছে একটি জঘন্য দোষ। আর কোন প্রকারের দোষ-ত্র“টি থাকা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব। আর পবিত্র শরীয়তে এ মাসআলা ‘দ্বীনের জরুরী বিষয়াদি’ (ضروريات دين)’র অন্তর্ভুক্ত। ক্বোরআন ও হাদীস যেভাবে আল্লাহ্ তা‘আলার ‘তাওহীদ’ (একত্ব) প্রতিষ্ঠা করেছে, অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে যে, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তেমনিভাবে প্রত্যেক দোষ, ত্র“টি ও কমতি ইত্যাদি থেকেও তাঁর পবিত্রতার সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে। খোদ্ কলেমা-ই তৈয়্যবাহ্- ‘সুবহা-নাল্লাহ্’ এবং তাঁর আসমা-ই হুস্না (সুন্দরতম নামগুলো)র মধ্যে ‘সুব্বূহুন’,‘ক্বুদ্দূসুন’-এর অর্থও এটাই যে, মহান রব সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে পাক-পবিত্র।
সম্মানিত মুসলিম সমাজ! আমাদের সত্য খোদা, সত্তাগতভাবে, যেকোন দোষ-ত্র“টি থেকে পবিত্র। মিথ্যা ইত্যাদি কোন দোষ-ত্র“টি তাঁর পবিত্র দরবারের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারে না। আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মিথ্যা বলা ‘মুহাল বিয্যাত’ (সত্তাগতভাবে অসম্ভব)। আর এটা তাঁর জন্য ‘মুহাল বিয্যাত’ হওয়ার উপর উম্মতের সমস্ত ইমামের ঐকমত্য (اجماع) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মুসলমান মাত্রই, যার অন্তরে তার রবের প্রতি সম্মান ও তাঁর কালাম বা বাণীর উপর বিশ্বাস আছে, যার মধ্যে সামান্যটুকু বুঝশক্তিও আছে, তার জন্য নিম্নলিখিত দু’টি কথাই যথেষ্টঃ
এক. ‘মিথ্যা’ এমন অপবিত্র ও ঘৃণিত দোষ, যা থেকে প্রত্যেক যৎসামান্য বাহ্যিক ইয্যাতদার ব্যক্তিও বাঁচতে চায়। প্রত্যেক ভাঙ্গী-চামারও নিজের দিকে এর সম্পর্ককে লজ্জাষ্কর মনে করে। যদি তা আল্লাহ্ আয্যা ওয়া জাল্লার জন্য সম্ভব হয় তবে তো তিনি ত্র“টিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ, পঙ্কিলতা বেষ্টিত, ঘৃণিত ও অপবিত্রতা ক্লিষ্টও হতে পারবেন, না‘ঊযুবিল্লাহ্! কোন মুসলমানও কি আপন রবের প্রতি এমন ধারণা রাখতে পারে? মুসলমানতো মুসলমানই। তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা রয়েছে। কোন নগন্য বুঝ শক্তি বিশিষ্ট ইহুদী কিংবা খ্রিস্টানও এমন কথা আপন রব সম্পর্কে সহ্য করবে না। পবিত্রতা ওই মহান সত্তার, যিনি সম্পূর্ণ দোষ-ত্র“টি মুক্ত; না তাঁর জন্য অজ্ঞতা সম্ভব, না তার মধ্যে কোনরূপ দোষ-ত্র“টি থাকা সম্ভব।
দুই. আল্লাহ্ পাকের জন্য মিথ্যা বলা সম্ভব হলে, তাঁর জন্য সত্যবাদিতা অনিবার্য থাকে না। তখন তাঁর কোন কথার উপর ভরসাটুকুও অবশিষ্ট থাকতে পারে না। তাঁর প্রতিটি কথায় এ সম্ভাবনা ওই বদ-আক্বীদাসম্পন্নকে পেয়ে বসবে, ‘হয়তো তিনি মিথ্যা বলে ফেলেছেন; যখন তিনি মিথ্যা বলতে পারেন।’ যেমনটি ওহাবী, (হেফাযতী-কওমী)দের আক্বীদা রয়েছে। তখন এ বিশ্বাসটুকু অর্জনের উপায়ই কি থাকবে যে, তিনি কখনো মিথ্যা বলেন নি, কিংবা বলবেন না? সে (ওই ওহাবী) ভাববে, আল্লাহর কি কারো ভয় আছে, না তাঁর উপর কোন অফিসার বা হাকিম আছে, যে তাঁকে মিথ্যা কিংবা ওয়াদা খেলাফের জন্য পাকড়াও করবে? এমন তো কেউ নেই যে, তিনি যে কথা বলতে পারেন, তা না বলার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে? অবশ্য উপায় শুধু এটাই থাকতে পারে যে, যদি তাঁর এ মর্মে ওয়াদা থাকে যে, ‘তাঁর সব কথা সত্য, তিনি না মিথ্যা বলেছেন, না বলবেন।’ কিন্তু যখন তাঁর পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব বলে কেউ সাব্যস্ত করে বসে, তবে তো গোড়া থেকেই ওই ওয়াদা ও বাণীর সত্যতার উপর থেকে ভরসাটুকু চলে যাবে। যদি তিনি মিথ্যা বলতে পারেন, তাহলে কে জানে তাঁর এ ওয়াদা ও কথাটুকুই প্রথম মিথ্যা কিনা! না‘ঊযুবিল্লাহ্! সুম্মা না‘ঊযুবিল্লাহ্।
সম্মানিত মুসলিম সমাজ! যখন ‘কিযবে ইলাহী’ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা মিথ্যাবাদী হওয়া সম্ভব হয়, তবে তাঁর কোন কথারই নির্ভরযোগ্যতা অবশিষ্ট থাকবে না। মোটকথা, আল্লাহরই পানাহ্, তাঁর জন্য মিথ্যা বলা ইত্যাদি সম্ভব বলে মেনে নিলে, দ্বীন, শরীয়ত, ইসলাম ও মিল্লাত কোনটার প্রতি বিশ্বাসকে অবশিষ্ট রাখা যাবে না। প্রতিদান ও শাস্তি, জান্নাত ও দোযখ, হিসাব-নিকাশ, হাশর-নশর, কোনটার উপরই নিশ্চিত বিশ্বাসের কোন উপায়টুকু থাকবে না। তখন তো না ক্বোরআন থাকছে ও না ঈমান বাঁচছে, না ইয়াক্বীন রক্ষা পাচ্ছে। ওহাবী (হেফাযতী-কওমী)দের একটা ছোট্ট কারিশ্মা হচ্ছে- তাদের একটি/দু’টি মাত্র বাক্য সমস্ত দ্বীন, ঈমান, নবী ও ক্বোরআন- সব কিছুকেই নিশ্চি‎হ্ন করে দিলো। তাই আবারো বলি- تَعَالى اللهُ عَمَّا يَقُوْلُ الظَّالِمُوْنَ عُلُوًّا كَبِيْرًا (যালিমগণ যা বলছে, আল্লাহ্ তা‘আলা তা থেকে বহু বহু ঊর্ধ্বে)। আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলমানদেরকে শয়তানদের কুপ্ররোপচনা থেকে রক্ষা করুন! আ-মী-ন।
পরিশেষে, ওহে দেওবন্দী, ওহাবী, কওমী, হেফাযতীরা! আল্লাহর ওয়াস্তে একটু ইনসাফের দৃষ্টি দিন, আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি লজ্জাবোধ করুন! দেখেছেন কি কার প্রতি মিথ্যা ও ওয়াদা খেলাফের অপবাদ দিচ্ছেন? কোন্ সম্পূর্ণ পবিত্র সত্তার প্রতি মিথ্যা ও ওয়াদাভঙ্গের মতো দোষের আশংকা ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করছেন? আর তিনি হলেন ওই মহান আল্লাহ্, যিনি সমস্ত প্রশংসা ও উত্তমগুণের ধারক; সমস্ত দোষ-ত্র“টি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। যিনি জিহ্বা দিয়েছেন, তাঁর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে মুখকে সামলান!
তাঁরই যথাযথ প্রশংসা করে সৌভাগ্যবান হবার চেষ্টা করুন, স্বেচ্ছায় ‘আহম্মক শক্বী’ বা ‘বিবেকহীন হতভাগা’ হবেন না। আপনাদেরকে কেউ মিথ্যুক কিংবা মিথ্যা বলার পাত্র বললে তো নিজেদের সামলাতে পারেন না! বিগত ১৯৮০’র দশকে হাটহাজারীর রফীক্বকে হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়ে নিমর্মভাবে খুন করিয়েছেন, ইদানিং (২৬ এপ্রিল ২০১৩) হাটহাজারীর সুন্নী মেধাবী নিরীহ্ ছাত্র সাইফুল ইসলামকে, হেফাযতে ইসলামের নামে লেলিয়ে দেওয়া হামলাকারীদের দ্বারা নিষ্ঠুরের ন্যায় মাথা থেত্লিয়ে দিয়েছেন, গত ৫ মে সে শাহাদত বরণ করেছে। তাছাড়া কখনো কি চিন্তা করেছেন এ পর্যন্ত এহেন জঘন্য আক্বীদা প্রচার করে কতজন মানুষকে ঈমানহারা করেছেন? আর বড় বড় ওহাবী মাদরাসা করে কত হাজার ছাত্রকে এহেন জঘন্য আক্বীদা শিক্ষা দিয়ে মানুষকে তা শিক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরী করছেন? সুতরাং আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করলাম। আর আপনাদের পরামর্শ দিচ্ছি আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা বেরলভীসহ সুন্নী ওলামা ও ইমামদের কিতাবগুলো, বিশেষ করে ‘সুবহানুস্ সুব্বূহ ‘আন আয়বি কিয্বিম্ মাক্ববূহ’ কিতাবটা নির্জনে ঈমানী দৃষ্টিতে পাঠ-পর্যালোচনা করুন। তাতে তিনি ২০০ দলীল ও বহু আপত্তির জবাব দিয়েছেন। সত্যের সন্ধান পাবেন, নসীবে থাকলে হিদায়তও নসীব হবে। অন্যথায় নাস্তিক ব্লগারদের সাথে সাথে আপনারাও ইসলামী লেবেলের আরো মারাত্মক নাস্তিক ও খোদাদ্রোহী হলে থেকে যাবেন বৈ-কি।
তাছাড়া, হাটহাজারী ওহাবী মাদরাসার ফাত্ওয়া বিভাগ ‘ভ্রান্তি নিরসন ও আক্বীদা সংশোধন’ নামের পুস্তিকায় আল্লাহর জন্য মিথ্যাবাদী ও ওয়াদা খেলাফ করার ক্ষমতা ও শক্তি প্রমাণ করার জন্য যেসব তথাকথিত যুক্তি প্রমাণ দিয়েছে সেগুলোর খণ্ডনও আমার এ পুস্তুকে হয়ে গেছে। এখন আহমদ শফী সাহেব ‘কিন্তু তিনি (আল্লাহ্) মিথ্যা বলেন না’ ও ‘কিন্তু ওয়াদা খেলাফ করেন না’ বলে পার পাওয়ারও কোন সুযোগ আর থাকছে না। কারণ, যা (মিথ্যা বলা ও ওয়াদা খেলাফ করা) আল্লাহর ক্বুদরত বা ক্ষমতা ও শক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়, তা আল্লাহর ক্ষমতাধীন বলে অপবাদ দিয়ে, ‘কিন্তু করেন না’-এর ব্যণ্ডিজ দেয়ার কোন অথ্যই হয় না। আর যা আল্লাহর পক্ষে সম্ভব নয়; তা তিনি করতে পারেন না বললেও যে আল্লাহর মানহানি করা হয় না তাও এ পুস্তিকায় প্রমাণ করা হয়েছে। আর আল্লাহ্ কারো শাস্তি ক্ষমা করে দিলে যে, তাঁর ওয়াদা খেলাফী নয় বরং তাঁর বদান্যতা ও পূর্ব ঘোষণারই বাস্তবায়ন-তা বুঝতেও এ পুস্তক এবং উল্লিখিত কিতাবগুলো আপনাদের সাহায্য করবে।
আরেকটা পরামর্শ দিয়ে এ কিতাবের কলেবর বৃদ্ধি এড়াতে চাই যে, আপনারা যেসব আয়াত ও হাদীস আল্লাহকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করার জন্য উক্ত পুস্তিকায় (ভ্রান্তি নিরসন ও আক্বীদা সংশোধন) এনেছেন সেগুলোর প্রকৃত তাফসীর নির্ভরযোগ্য সুন্নী মুফাস্সিরদের তাফসীর গ্রন্থাদিতে দেখুন। তবুও যদি আপনাদের কোন আপত্তি থেকে যায়, তাহলে ইন্-শাআল্লাহ্ সেগুলোর সঠিক তাফসীর অন্য পুস্তকে দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি বৈ-কি। সেগুলোর সঠিক জবাব আমাদের নিকট আছে।
তাছাড়া, পুস্তিকাটার ১৩নং পৃষ্ঠায় ‘আশারা-ই মুবাশ্শারায়’ (জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবী) সম্পর্কে লেখা হয়েছে- ওই সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীগণ নাকি জান্নাত পাবেন কি, পাবেন না মর্মে উৎকণ্ঠায় ছিলেন। কারণ, তাঁরা নাকি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। (না‘ঊযুবিল্লাহ্) এখানে কি নবী করীমের সহীহ্ হাদীসের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা হয়নি? দ্বিতীয়তঃ নবী করীমের প্রতি সাহাবা-ই কেরামের আস্থাকে অস্বীকার করে সাহাবা-কেরামের প্রতি অপবাদ দেওয়া হয়নি? কারণ, ‘আশরা-ই মুবাশ্শারাহ্’ সম্পর্কিত হাদীস শরীফে যেমন কোনরূপ সন্দেহ নেই, তেমনি সাহাবা-ই কেরামও কখনো নবী করীমের প্রতি বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করেন নি। আপনারাও তো মওদূদীর মতো এ প্রসঙ্গে ভ্রান্ত আক্বীদায় তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করলেন। কারণ, সাহাবা-ই কেরামের প্রতি অপবাদ দেওয়া মওদুদী-জামাতীদেরই কাজ। আর প্রমাণ করলেন যে, আপনারা ‘হেফাজতে ইসলাম’ নন, বরং ‘হেফাযতে জামাতে ইসলামী’।
হুযূর-ই আকরাম নিজের ও মু’মিনদের পরিণতি সম্পর্কে জানেন
পুস্তিকাটার একই পৃষ্ঠায় (১৩পৃ.) وَاللهِ مَا اَدْرِىْ وَاَنَا رَسُوْلُ اللهِ مَا يَفْعَلُ بِىْ وَلاَ بِكُمْ হাদীস শরীফটা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, রসূল করীম নিজের এবং সাহাবা কেরাম ও মু’মিনদের পরিণাম সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। না‘ঊযুবিল্লাহ্! এর জবাবে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- এ হাদীস শরীফখানা পবিত্র ক্বোরআনের আয়াত- قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعًا مِنَ الرُّسُلِ وَمَا اَدْرِىْ مَا يُفْعَلُ بِىْ وَلاَ بِكُمْ
অর্থাৎ ‘‘হে হাবীব! আপনি বলে দিন, আমি কোন অদ্ভূত (নতুন) রসূল নই; আর আমি জানিনা আমার সাথে কি ধরনের আচরণ করা হবে এবং হে আমার সাহাবী মু’মিনরা তোমাদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হবে। (তাও জানিনা)’’-এর অনুরূপ। এ আয়াতের সঠিক তাফসীর নিম্নে উল্লেখ করা হলো। তাতে উক্ত হাদীস শরীফেরও সঠিক সমার্থ সুস্পষ্ট হবেঃ
বস্তুতঃ আয়াতের প্রথমাংশটা নাযিল হয়েছে মক্কার মুশরিকদের প্রসঙ্গে। তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুবূয়তকে অস্বীকার করতো। তখন তাদের উদ্দেশে এরশাদ হলো- হে হাবীব! আপনি বলুন, ‘নবীতো এভাবে আরো এসেছেন। তাঁদেরকে তো মান্য করতে তাঁদের উম্মতরা দ্বিধাবোধ করেনি। তোমরা আমার নবূয়তকে কেন অস্বীকার করছো?’
আর আয়াতের পরবর্তী অংশ (আমার এবং হে মু’মিনরা তোমাদের পরিণতি কি হবে আমি জানিনা।) এ প্রসঙ্গে তাফসীরে ‘খাযাইনুল ইরফান’-এ কী উল্লেখ করা হয়েছে দেখুনঃ
১. আয়াতের অর্থ যদি এ নেয়া হয়- ‘ক্বিয়ামতে তোমাদের সাথে এবং আমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে তা আমার জানা নেই’, তাহলে আয়াতের হুকুম যে মান্সূখ (রহিত) হয়ে গেছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বর্ণিত আছে যে, যখন এ আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছিলো তখন মক্কার মুশরিকরা খুশী হয়ে এটাকে এ মর্মে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করতে লাগলো, ‘‘লাত্ ও ওয্যার শপথ, আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট আমাদের ও মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর মধ্যে আর কোন পার্থক্য থাকছে না। সুতরাং আমাদের উপর তাঁর কোনরূপ শ্রেষ্ঠত্ব নেই। যদি এ ক্বোরআন তাঁর গড়া না হতো, তবে সেটার নাযিলকারী তাঁকে নিশ্চয়ই খবর দিতেন, তিনি তাঁদের সাথে কিরূপ আচরণ করবেন।’’ এখন আল্লাহ্ তা‘আলা অন্য আয়াত নাযিল করে এদের জবাব দিলেন। আয়াতখানা হচ্ছে- لِيغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ অর্থাৎ ‘‘(আমি নিশ্চয়ই আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি) যাতে আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন আপনারই কারণে আপনার পূর্ব ও পরবর্তী উম্মতের গুনাহ্। (কারণ, আপনি তো নিস্পাপ।)’’ [সূরা ফাত্হ: কান্যুল ঈমান] এ আয়াতে আল্লাহ ্তা‘আলা তাঁকে নিষ্পাপ বলে সুসংবাদ দিয়েছেন, তখন সাহাবা কেরাম আরয করলেন, হে আল্লাহর নবী, আপনার মঙ্গল হোক, আপনি তো অবহিত হয়ে গেলেন আপনার সাথে ক্বিয়ামতে কিরূপ সুন্দর ব্যবহার করা হবে। এখন শুধু এটারই অপেক্ষা যে, আল্লাহ্ পাক এ খবরও দেবেন, আমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে! অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা এ আয়াত শরীফ নাযিল করলেন-
لِيُدْخِلَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنّتٍ تَجْرِىْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهَارُ
অর্থাৎ ‘‘তিনি মু’মিন নর-নারীকে এমনসব জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর নিম্নদেশে বিভিন্ন প্রকারের নদী প্রবাহিত।’’
আরো নাযিল করলেন-
وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ بِاَنَّ لَهُمْ مِنَ اللهِ فَضْلاً كَبِيْرًا
অর্থাৎ ‘‘হে হাবীব, আপনি মু’মিনদেরকে এ সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে রয়েছে মহা অনুগ্রহ (জান্নাত)।’’
মোটকথা, এখনতো দেখলেন যে, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন দিলেন, ক্বিয়ামতে হুযূর করীম-ই সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে, আর মু’মিনদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে।
২. আয়াতের তাফসীরকারদের ২য় অভিমত হচ্ছে- আখিরাতের অবস্থা সম্পর্কে হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অবগত হলেন যে, তাঁর সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে, মু’মিনদের অবস্থা কি হবে এবং এর অস্বীকারকারীদের অবস্থা কিরূপ হবে! সুতরাং আয়াতের ما يفعل بى ولابكم -এর অর্থ হবে- ‘‘ দুনিয়ায় আমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে আর মু’মিনদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হবে তা আমার জানা নেই।’’ যদি আয়াতের এ অর্থও গ্রহণ করা হয়, তবুও এ আয়াতের হুকুম মান্সুখ বলে গণ্য হবে। কারণ, অপর আয়াতে তো আল্লাহ্ তা‘আলা হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, لِيُظْهِرَه عَلى الدِّيْنِ كُلّه অর্থাৎঃ ‘‘তিনি তাঁর দ্বীনকে (তথা তাঁকে) অন্যান্য সমস্ত ধর্মের (তথা ধর্মাবলম্বীদের) উপর বিজয়ী করবেন।’’ আর মু’মিন সহ সকলের অবস্থা সম্পর্কে বলে দিলেন- مَا كَانَ اللهُ لِيعَذِّبَهُمْ وَاَنْتَ فِيْهِمْ অর্থাৎ ‘‘হে রাসূল! আপনি যতদিন তাদের মধ্যে আছেন ততদিন তাদেরকে আযাব দেয়া আমার জন্য শোভা পায় না।’’
মোটকথা, আল্লাহ ্তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতের সম্মুখে উপস্থিত হবে এমন সব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন।
৩. আয়াতের অর্থ হচ্ছে- ‘‘এসব অবস্থা অনুমান করে জানার বস্তু নয়; বরং এগুলো সম্পর্কে জানার জন্য ওহীর মাধ্যম নিতান্ত প্রয়োজন। যেমন- আয়াতের পরবর্তী অংশ একথা সমর্থন করছে। আয়াতাংশটা নিম্নরূপঃ اِنْ اتبِعْ اِلاَّ مَا يُوْحى اِلَىَّ অর্থাৎ ‘‘আমি একমাত্র সেটারই অনুসারী, যা আমার প্রতি ওহী করা হয়।’’ [তাফসীরে সাভী ও জালালাঈন]
উপসংহার
সুতরাং এ আয়াত শরীফের সঠিক তাফসীর বা ব্যাখ্যা থেকে হেফাজতীদের উপস্থাপিত উক্ত হাদীস শরীফের সঠিক ব্যাখ্যাও স্পষ্ট হলো। বস্তুতঃ উক্ত হাদীস শরীফ এরশাদ করার প্রেক্ষাপট ও উক্ত আয়াত শরীফের শানে নুযূল হচ্ছে- ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগে, তখন পর্যন্ত হুযূর (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট স্বীয় পরকালীন মর্যাদার কথা, মু’মিনদের পরকালীন অবস্থা এবং কাফিরদের ভয়াবহ পরিণতির কথা সম্পর্কে কোন আয়াত আসেনি, মক্কার মুশরিকরা যখন হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করতে লাগলো, তখন তাদেরকে সম্বোধন করে এ আয়াত শরীফ নাযিল করা হলো। আর হুযূর করীমও ঘোষণা করলেন যে, হে কাফিররা! আমি কোন অদ্ভূত কিছু নই; আমি পূর্ববর্তী রসূলদের মত একজন রসূল। আর আমার নিজের এবং তোমাদের যেই পরকালের কথা বলা হচ্ছে, সেখানকার অবস্থাদি তো অনুমানের মাধ্যমে বলার মত নয়; বরং সেগুলো হচ্ছে ওহীর মাধ্যমে জানার কথা।’’ যা পরবর্তীতে ওহীর মাধ্যমে হুযূর-ই আকরামকে জানানো হয়েছিলো।
বলা বাহুল্য যে, আঃ আহমদ শফী দা.বা. ‘আল্লাহ মিথ্যা বলার ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু বলেন না, আল্লাহ্ পাক ওয়াদা খেলাফ করার ক্ষমতা বা শক্তি রাখেন, কিন্তু খেলাফ করেন না।’ (নাঊযুবিল্লাহ্)-এর মতো জঘন্য দাবীর সমর্থনে ‘ভ্রান্তির নিরসন ও আক্বীদা সংশোধন’ নামক পুস্তিকাটার উক্ত দাবী সম্পূর্ণ ভুল ও ঈমান বিধবংসী। তাদের উক্ত দাবীর খণ্ডন করতে গিয়ে তাদের উক্ত পুস্তিকায় উক্ত দাবীর সমর্থনে যেসব খোঁড়া যুক্তি ও তথাকথিত যুক্তি প্রমাণ দেওয়া হয়েছে প্রায় সব ক’টির খণ্ডন ও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে করা হয়েছে। বাকীগুলোর প্রসঙ্গে আমাদের একথাই যথেষ্ট যে, যেহেতু তাদের দাবীই ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো, সেহেতু তাদের উপস্থাপিত সব যুক্তি-প্রমাণও, আয়াত হাদীসের অপব্যাখ্যাইও এমনটি তাদের সব বাতিল মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে। তাই, উক্ত পুস্তিকার দাবী ও আহ্বান কোনটাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিতও নয়; সত্যের প্রতি আহ্বানও নয়। তাদের ধোঁকা-প্রতারণা থেকে নিজের ঈমান, আক্বীদা রক্ষার জন্য সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আর এসব কওমী মাদরাসাগুলোতে কী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং সেগুলোর চার দেয়ালের ভিতরে ও বাইরে আরো কি কি চলছে সে সম্পর্কেও খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য অভিভাবক, ছাত্রবৃন্দ এবং দেশবাসী সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
— সমাপ্ত —

সম্পূর্ণ পূত-পবিত্র আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি হেফাজতে ইসলাম নেতা চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মৌং আহমদ শফী কর্তৃক মিথ্যা ও ওয়াদা ভঙ্গের অপবাদের খণ্ডন?

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •