পুণ্যের বারতাবহ রজব মাস

0

পুণ্যের বারতাবহ রজব মাস

আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

আল্লাহ এক, তিনি অদ্বিতীয়। তিনিই একমাত্র উপাস্য। তাঁর কোন শরীক নাই। মুমিন শুধু তাকেই উপাস্য জানে। তার ইবাদতে কারো অংশীদারিত্ব নেই। আমাদের পথের দিশা, মুক্তির নির্দেশক সাইয়্যিদুনা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল।
মাস যায়, মাস আসে। কালের চক্রে বিবর্তনধর্মি এ সৃষ্টি জগতের সবকিছুই ক্রমান্বয়ে নিজ নিজ পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। দিন রাতের পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে আমরাও সেভাবেই এগিয়ে চলি অবধারিত গন্তব্যের পথে। দিন-মাস-বছর শেষে হিজরী বর্ষের চান্দ্রমাস মাহে রজব আমাদের জীবনে আরো একবার উপস্থিত হলো।
এ মাস সমূহ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। এ মাসে অনুভব করা যায় আসন্ন মাহে রমাদ্বানের প্রাথমিক আবহ। এ চাঁদ সূচনা করে বরকত, ফযীলত ও মহিমার বিশেষ মাসত্রয়ের যা ক্রমান্বয়ে মুমিন বান্দাকে পর্যায়ক্রমে আকৃষ্ট করে মহান আল্লাহর একান্ত নৈকট্যের। বলা হয়ে থাকে, রজব মাস্ গাফিল বান্দাকে আল্লাহর দুয়ারে উপনীত করে। শা’বান
মাস সর্বাধিপতি, দানশীল মুনিবের নৈকট্যের অনুভূতি জাগায়। আর তাঁকে ক্ষমাশীল প্রভু আল্লাহর সামনে নিয়ে যেতে আসে মাহে রমাদ্বান শরীফ, নেকীর বীজ বপনের মাস রজব, এতে পানি সেচনের মাস শাবান, আর রহমতের ফসল ঘরে তোলার উৎসবমুখর মাস হলো রমাদ্বান মুবারাক। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বিশেষ সম্মানিত যে চারটি মাস রয়েছে, রজব সেগুলোর অন্যতম। কথিত আছে, “মাহে রজব অতিবাহিত হওয়ার পর আসমানে উত্থিত হয়। তখন আল্লাহ্ তাকে বলেন, আমার
বান্দারা কি তোমাকে তা’যীম করেছিল? রজব থাকে নিশ্চুপ। এভাবে আল্লাহ তাকে তিনবার প্রশ্ন করার পর সে বলে, হে ইলাহী। আপনি হলেন দোষ গোপনকারী, আপনার বান্দাদেরকে অপরের দোষত্রুটি গোপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার রাসূল আমাকে বধির আখ্যা দিয়েছে তাই আমি তাদের আনুগত্য করার কথা শুনেছি, পাপের কথা শুনিনি । [সুত্র: খুতবায়ে ইবনে নাবাতা] এ মাসে সংঘটিত হয়েছিল পেয়ারা নবীর ঐতিহাসিক শ্রেষ্ঠতম মু’জিযা পবিত্র মেরাজ। যা তাঁর উম্মতেরও শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম স্মারক। পবিত্র মে’রাজের চাঁদ এ মাহে রজব। প্রিয়নবীর অতুলনীয় মর্যাদা, অনতিক্রম্য স্বকীয় উচ্চমান, আল্লাহ্র একান্ত নৈকট্যের নিবিড়তম সোপান লাভে ধন্য হওয়ার পুণ্য স্মৃতিবহ মাস মাহে রজব। যেখান
হতে উম্মতের জন্য দৈনন্দিন মে’রাজের আস্বাদন জাগানো শ্রেষ্ঠতম ইবাদত পঞ্জেগানা নামাযের খোদায়ী তোহ্ফা আসে, সেই অনন্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে পুণ্যময় এ মাসটি। এ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার দিবাগত জুমা’র রাত হল বিশেষ রাত, যার নাম লাইলাতুল রাগায়িব।

নফল ইবাদত দ্বারা বান্দা আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠে, লাভ করে তার নৈকট্য। এক পর্যায়ে এমনও হয়ে ওঠতে পারে যে, তার অস্তিত্বের প্রতিটি অঙ্গে লীলায়িত হয় মহান কুদরতের অপার শক্তি। নূরের নবী মানবীয় অবয়বে দৃশ্যমান হওয়ার প্রথম প্রক্রিয়ার সুচনা হয় এ মাসের প্রথম জুমা’র পবিত্র রাতে। তাই, এ আবহে আত্মস্থ হতে আমাদের এ মাস থেকেই নফল ইবাদত তথা নামায, রোযা, তাসবীহ, তাহলীল, তিলাওয়াত, সদকা ও খয়রাত’র প্রতি অধিকতর মনোযোগী ও আন্ত—রিক হওয়া উচিত। মাহে রজবের প্রথম রাত বছরের বিশেষ পাঁচ রাতের অন্যতম রাত। এ মাসে অন্ততঃ একটি হলেও নফল রোযা পালন করা, এক রাত নফল ইবাদতে অতিবাহিত করার ফযীলত সাহাবীয়ে রাসূল হযরত সওবান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনামতে পূর্ণ এক বছরে দিনে যাও রাতে নামায আদায়ের সমপরিমাণ পুণ্য অর্জন করা যাবে।[প্রাগুক্ত]

পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলিম মিল্লাতের নিকট এ মাসের বাড়তি আকর্ষণ হলো, এ চাদের ৬ তারিখ গরীব-নওয়ায হযরত খাজা মুঈন উদ্দীন চিশতী আলাইহির রাহমাহর উরস মোবারক। এ তারিখেই তিনি ৫৩০, মতান্তরে, ৫৬৭ হিজরী সনের ১৪ রজব সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তার ওয়াফাত শরীফের তারিখ হল ৬৩২ হি. সনের ৬ রজব। এ উপমহাদেশে ইসলাম তথা দ্বীন ও ঈমানের আলো জ্বালিয়েছিল খাজা গরীব নওয়াজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। শুধু এ কারণেই এতদঞ্চলের সকল মুসলমান তার নিকট চিরকাল খণী হয়ে থাকবে।

পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ্ তাবা-রাকা ওয়া তাআ-লা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারেরা, তোমরা আল্লাহকে ভয়. করো এবং সত্যনিষ্ঠদের সাহচর্ষে বা সংস্পর্শে থেকো। (৯:১১৯) সত্যের ধারক- বাহক পুণ্যাত্মা বান্দাগণের সাহচর্ষে দাখিল হলে ঈমান ও তাকওয়ার সংরক্ষণে সহায়তা অর্জিত হয়। আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা তথা আউলিয়ায়ে কেরাম শয়তানী ইন্ধন. ও জাহান্নামী তৎপরতা হতে আল্লাহর বান্দাদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম। এজন্য আল্লাহ্ তাআ-লার নির্দেশ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের নিকটজনদের দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও। (৬৬:৬) জাহান্নামের আগুন হতে বাচাঁনো এবং পরিবার ও নিকটস্থদের বাঁচানো মূলতঃ আল্লাহরই ইচ্ছা ও দয়া নির্ভর। তবুও এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, আপনজনদের বাঁচানোর নির্দেশ হওয়াকে নিঃসন্দেহে পরম্পরে বাঁচানোর তৎপরতা, ক্ষমতা, অনুমোদনও প্রমাণিত হয়। আর এ আগুন হতে বেঁচে জান্নাতে প্রবেশ করাতেই মানবজীবনের সার্থকতা। যেমন ইরশাদ হয়েছে, অতঃপর যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই হবে সফলকাম। (৩:১৮৫) বলা যেতে পারে গরীব নওয়াষ’র মাধ্যমে এ অঞ্চলের অসংখ্য লোক আগুন থেকে মুক্তি পেয়ে জীবনের স্বার্থকতা লাভ করেছে। অন্যথায় তারা ধ্বংসে পতিত হতো। এ কারণেই খাজা গরীব-নওয়াযের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, কৃতজ্ঞ থাকা উচিত আমাদের সকলের। সাফল্যের পথ ছেড়ে যারা নিজ খেয়াল খুশী মতে চলে, তারা বিফল মনোরথ, তাদের গন্তব্য জাহান্নাম। যা থেকে বাঁচার জন্য এবং এর ভয়াবহতার কথা বর্ণনা এসেছে কুরআন ও হাদীসের” বহু জায়গায়। “ওয়া কিনা আযাবান না-র’’। এর ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য এ আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে দিকভ্রান্ত বহু মানুষ “আগুন কেই দেবতা উপাস্য জ্ঞানে পূজা দেয়’’। ভাবে, পরকালে আগুনের শান্তি থেকে রেহাই পাবে। অথচ এ আগুনও আল্লাহরই সৃষ্টি এবং তার অনুগত। সুরা ইয়াসীন শরীফে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ থেকে আগুন উৎপন্ন করেন, যখন তোমরা তা থেকে আগুন জ্বালাও’। [আয়াত : ৮০]

গরীব-নওয়ায ভারতবর্ষে আসেন, আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে । যে সময় মানুষ আল্লাহ ও রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করত না, ধর্মের মনগড়া অলীক ও উদ্ভট ধর্মাচার পালন করত মানুষ। শির্ক, কুফর, ইলহাদ প্রভৃতি সহ অগ্নি পূজারও ব্যাপক প্রচলন ছিল ভারতে। খাজা মুঈন উদ্দীন চিশতি যখন আজমীরে এসে আস্তানা গড়েন। অসংখ্য অলীক ধর্মাবলম্বী মানুষ পথের দিশা খুঁজে পান। একবার তিনি বিশাল মরু তেপান্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন। দূর থেকে আগুনের ধোঁয়া দেখতে পেয়ে মানুষজনের আভাস অনুমানে তিনি সেখানে উপস্থিত হন। তারা এক বিরাট অগ্নির চারগাশে ধ্যান হয়ে বসা। তিনি তাদের কাছে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা জানাল, আমরা পরকালে অগ্নিদগ্ধ না হওয়ার আশায় অগ্নি দেবতার পূজা করছি। খাজা গরীব নাওয়ায বললেন আগুন তোমাদের কোন উপকার করতে পারবে না বরং আগুনকে যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই একক উপাস্যকে মান্য কর। তারা তাকে উল্টো উপহাস করে বলল, আগুন কিছুই করতে পারে না, তার প্রমাণ দিন। তিনি বললেন, আগুন আল্লাহর নির্দেশ না হলে আমাকে তো দূরে আমার জুতাও (পোড়াতে পারবে না এইবলে তিনি তার জুতা মুবারাক অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করলেন। তারা সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখল, বহুদিন ধরে প্রজ্জ্বলিত আগুন মুহুর্তের মধ্যেই নিভে গেল; এ অসাধারণ ক্ষমতা দেখে তারা সদলবলে খাজার হাতে ইসলাম গ্রহণ করে সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর উপাসনায় আত্মনিয়োগ করল।

লেখক : আরবী প্রজষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদরাসা।
খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (রহ.) মাজার জামে. মসজিদ ।