সরকারি খাস জায়গায় মসজিদ : শর‘ঈ ফয়সালা

0

সরকারি খাস জায়গায় মসজিদ : শর‘ঈ ফয়সালা
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান
মসজিদ আল্লাহর ঘর, মুসলমানদের পবিত্র স্থান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, وان المساجد لله الاية.. ‘মসজিদগুলো মহান আল্লাহরই জন্য।’
[সূরা জ্বিন, আয়াত-১৮] মসজিদ নির্মাণ করা, মসজিদের আদব রক্ষা করা, মসজিদের যথার্থ সংরক্ষণে ইসলামী নির্দেশনা ও মুজতাহিদ ফক্বীহগণের নীতিমালা অনুসরণ করা সকল মুসলমানের উপর অপরিহার্য। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে-
اِنَّمَا یَعْمُرُ مَسٰجِدَ اللّٰهِ مَنْ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ وَ اَقَامَ الصَّلٰوةَ وَ اٰتَى الزَّكٰوةَ وَ لَمْ یَخْشَ اِلَّا اللّٰهَ فَعَسٰۤى اُولٰٓىٕكَ اَنْ یَّكُوْنُوْا مِنَ الْمُهْتَدِیْنَ
তরজমা: নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি এবং যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ্ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, তারা সুপথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সূরা তাওবা, আয়াত-১৮]

মসজিদ আল্লাহর জন্য ওয়াক্বফকৃত হওয়া শর্ত
ইসলামী শরীয়তে মসজিদ হলো মুসলমানদের ইবাদতের সুনির্দিষ্ট স্থান। যেটি আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য ওয়াক্বফকৃত সেখানে বান্দার কোন মালিকানা ও অধিকার থাকতে পারবে না। [ফতোওয়ায়ে ফয়জুর রসূল, খন্ড-২, পৃ. ৬৫০, কৃত. মুফতি জালাল উদ্দিন আমজাদী] এতে আরো উল্লেখ রয়েছে, মসজিদ হওয়ার জন্য ওয়াক্বফ করা অপরিহার্য। ওয়াক্বফ’র ক্ষেত্রে লিখিত রেজিষ্ট্রীকৃত হওয়া শর্ত নয়, তবে পরবর্তিতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি না হওয়ার জন্য লিখিত ওয়াক্বফ হওয়া উত্তম। ওয়াক্বফবিহীন মসজিদে নামায পড়লে হয়ে যাবে তবে এটাকে শরয়ী মসজিদ বলা যাবে না। ওয়াক্বফকৃত স্থানে মসজিদ নির্মিত হলে সেখানে নামায আদায় করা হলে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে স্থান মসজিদ হিসেবে নির্ধারিত থাকবে। সে স্থান অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
সরকারী জায়গায় সরকারের অনুমতি ব্যতীত মসজিদ বানানো শরীয়ত সম্মত নয়। তবে সরকারের দায়িত্ব হলো জনস্বার্থে একান্ত অপরিহার্য হলে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান বজায় রেখে সরকারী ব্যবস্থাপনায় এলাকার মুসল্লিদের সহযোগিতায় সেখানে মসজিদ নির্মাণ করে নামায প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে সরকারী জায়গায় রাস্তার পার্শ্বে অনুমতি ছাড়া কেউ মসজিদ নির্মাণ করলে সেখানে জনস্বার্থে প্রয়োজনে রাস্তা প্রশস্ত করে পার্শ্ববর্তী সুবিধাজনক স্থানে মসজিদ স্থানান্তর করতে অসুবিধা নেই। এ প্রসঙ্গে হিজরি নবম শতকের প্রখ্যাত ফক্বীহ্ আল্লামা মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম হালভী হানফী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর প্রণীত ‘মুনীয়াতুল মুসল্লী’ ফাতওয়া গ্রন্থের ৪৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,
رجل بنى مسجد اعلى سور المدينة لاينبغى ان يصلى فيه لانه حق العامة فلم يخلص لله تعالى كالمبنى فى ارض مغصوبة
অর্থাৎ কোন ব্যক্তি শহরের যাতায়াত বা চলাচলের পথের উপর মসজিদ নির্মাণ করলে তাতে নামায আদায় করা সমীচিন নয়। কেননা সেটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট। এটা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য বিবেচিত হবে না। জবরদখলকৃত সরকারি ভূমির উপর নির্মিত স্থাপনার হুকুম একই অর্থাৎ সরকার তা দখল করে জনস্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে। অন্যের সম্পত্তিতে কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে মসজিদ বা অন্য কিছু প্রতিষ্ঠা করা বা ব্যবহার করা জায়েয নেই।
[প্রখ্যাত ফাত্ওয়া গ্রন্থ ‘দুররুল মুখতার’ কৃত. ইমাম আলাউদ্দিন খাচকাপী, হানাফী রহ. ৯ম খন্ড, ২৯১ এ অভিমত উল্লেখ করেছেন।] সুতরাং সরকারী জায়গায় কেউ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া স্বেচ্ছায় মসজিদ নির্মাণ করলে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন জনস্বার্থে বিশেষ প্রয়োজনে সেখানে রাস্তা সম্প্রাসরণ করতে পারবে। তবে পার্শ্ববর্তী নিকটতম স্থানে এলাকার মুসলমানদের ইবাদত ও নামায কায়েমের জন্য মসজিদ নির্মাণ করে দিবে। যাতে এলাকার মুসলমান ও মুসল্লীদের অন্তরে ক্ষোভ ও ফিত্না সৃষ্টি না হয়। উপরোক্ত বিষয়ে এটাই ইসলামী শরীয়তের ফয়সালা।
আল্লামা মুফতি কাজী মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াজেদ, প্রধান ফকিহ্, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া, আল্লামা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি অধ্যক্ষ মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া (ফাযিল)সহ বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম উপরোক্ত মাসআলায় একমত পোষণ করেছেন।

লেখক: অধ্যক্ষ- জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম।