হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

0

হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র
দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবা-ই কেরামের মধ্যে সাইয়্যেদুনা সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র সব দিক দিয়ে যেই প্রথম হবার মর্যাদা ও বিশেষত্ব অর্জিত হয়েছে, তা সম্পর্কে মুসলমানগণ সর্বান্তকরণে অবগত আছেন। এমনকি অমুসলিম ও বিরোধীদের নিকটও তাঁর অবদানগুলো বিশেষ গুরুত্বের সাথে স্বীকৃত। ইসলামের ইতিহাসে রসূল-ই করীম খাতামুন্ নবিয়্যীন হুযূর-ই পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ওই একমাত্র ব্যক্তি দৃষ্টি গোচর হন, যিনি মজবুত দ্বীন-ইসলামের বাগানের এমন পরিচর্যা করেছেন যে, দুনিয়া যতদিন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত সেটার ফুল ও ফল দ্বারা তামাম দুনিয়ার মুসলমানগণ উপকৃত হতে থাকবে।
মূলত: খাতামুন্ নবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর এ বরকতময় সত্তা হিদায়তের ফোয়ারা হয়েছেন। নবী-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গ, এরপর প্রতিনিধিত্বের যেই হক্ব বা প্রাপ্য এ মহান ব্যক্তি আদায় করেছেন, সেটার উপর হতভম্ব ও আশ্বর্যান্বিত হয়ে যায়। ঈমান, ইয়াক্বীন, সমবেদনা, প্রাণ উৎসর্গ করণ, প্রেম ও ভালবাসার যেই মানদন্ড সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পেশ করেছেন, তা উপস্থাপন করা সাধারণ তো সাধারণ, বিশেষ ব্যক্তিবর্গের জন্যও সম্ভব হবার কথা নয়। যদি কাউকে রসূল-ই আকরামের পবিত্র মন-মেজাজ অনুধাবনকারী বলা যায়, তবে সেটার সর্বাধিক উপযোগী সিদ্দীক্ব আকবারই হতে পারেন।
দুনিয়ার সমস্ত পয়গাম্বরের সাথী সহচরদের মধ্যে এমন কোন সাথী সহচরের উপমা-উদাহরণ পাওয়া যাবে না, যিনি নিজের সব কিছু- জান-মাল, পরিবার-পরিজন নিজ পয়গম্বরের উপর উৎসর্গ করে দিয়েছেন; এতদ্সত্ত্বেও যিনি একেবারে নিশ্চিন্ত ও প্রশান্তচিত্ত। ঈমান ও প্রাণোৎসর্গ করণে এমন উদাহরণ পাওয়া মুশকিল ব্যাপার যে, রসূল-ই পাকের ভালবাসায় নিজের যুবক ছেলের সামনে তাকে পিতা কতল করার জন্য শানিত তরবারি নিয়ে দন্ডায়মান হয়ে যাবেন।
প্রথম খোৎবা
খলীফাতুল মুসলিমীন হবার পর সিদ্দীক্ব-ই আকবার সর্বপ্রথম যে খোৎবা দিয়েছেন (যেই বক্তব্য পেশ করেছিলেন), তা তাঁর রাজনৈতিক কার্যতঃ প্রজ্ঞা ও চিন্তাধারার উন্নততম দৃষ্টান্তই এবং সারা দুনিয়ার শাসকদের জন্য জাজ্বল্যমান শিক্ষা। তিনি বলেন-
* হে লোকেরা! আল্লাহরই শপথ! আমার মধ্যে কখনোই আমীর কিংবা খলীফা হবার ইচ্ছা না কোন দিনে ছিলো, না কোন রাতে, না আমার ঝোঁক সেদিকে কখনো ছিলো আর না আমি কখনো আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য দো‘আ-প্রার্থনা করেছি। অবশ্য আমার মনে এ ভয় জেগেছিলো যে, অন্যথায় কোন ফিৎনা উঠে দাঁড়িয়ে যাবে। (এ কারণে আমি এ গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছি।)
* আমার মধ্যে হুকুমত (রাজ্য শাসন) করার জন্য কোন আনন্দ নেই, বরং আমার উপর এমন এক মহা দায়িত্ব বর্তানো হয়েছে, যা পালন করার শক্তি আমার মধ্যে নেই। আর আমি আল্লাহ্ তা‘আলার সাহায্য ব্যতীত, সেটাকে আমার আয়ত্বে আনতে পারবো না।
* আমার একান্ত ইচ্ছা ছিলো যে, আমার স্থলে কোন উত্তম ও জোরালো ব্যক্তি থাকবেন, যিনি এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আমার দুর্বল স্কন্ধযুগল এ বোঝা উঠাতে পারে না। আমাকে তোমাদের সরদার বানানো হয়েছে, অথচ আমি তোমাদের থেকে উত্তম নই।
* সুতরাং আমি যদি ভাল কিংবা উপকারী কাজ করি, তবে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে। আর যদি আমি মন্দ কিংবা ক্ষতিকর কাজ করি, তবে সে সম্পর্কে অবহিত করবে। সততা হচ্ছে আমানত, মিথ্যা হচ্ছে খিয়ানত।
* তোমাদের মধ্যে যে দুর্বল, সে আমার নিকট সবল যে পর্যন্ত না আমি তার প্রাপ্য উদ্ধার করে দিই। আর সবল ব্যক্তি আমার নিকট দুর্বল যে পর্যন্ত না তার নিকট থেকে অপরের হক নিয়ে নিই।
* ইন্শা-আল্লাহ্, তোমরা জিহাদ বর্জন করবে না। কেননা, যে কেউ তা বর্জন করেছে তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা অবশ্যই অপমাণিত করেছেন। আর যে সম্প্রদায়ে ব্যভিচার আম হয়ে যায়, খোদা তার মুসীবতকেও আম করে দেন।
আমি আল্লাহ্ ও রসূলের আনুগত্য করলে, তোমরাও আমার আনুগত্য করবে, কিন্তু যদি খোদা ও রসূলের নির্দেশ অমান্য করি, তবে তোমাদের উপর আমার আনুগত্য করা ওয়াজিব নয়। আচ্ছা! এখন তোমরা নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে যাও! আল্লাহ্ তোমাদের উপর দয়া করুন।’’
এটা তাঁর ওই রাজনৈতিক কার্যত: প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ছিলো, যার ফলে শত্রু ও বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো এবং গোটা সম্প্রদায় বা জাতি তাঁর ইমামত ও খিলাফতের উপর একমত হয়ে গিয়েছিলো।
অমুসলিমদের সাক্ষ্য
খিলাফতের গুরু দায়িত্ব পালনের পর রাজ্যে যেই অভ্যন্তরীণ ও বাইরের বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি হয়েছে সেগুলোরে বিস্তারিত বিবরণ ইতিহাস ও সিয়রের কিতাবগুলোতে মওজুদ রয়েছে। কিন্তু যে কার্যত কৌশলের মাধ্যমে সমস্ত ফিৎনা ও বিশৃঙ্খলা দমন ও দূরীভূত করে হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবার পুরো রাজ্যে শান্তি বহাল করেছিলেন তা ইসলামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। উইলিম ম্যুরের মতো ইতিহাসবিদও তাঁর পুস্তকে একথা না বলে ক্ষান্ত হননি যে, হযরত আবূ বকর (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) বড় জ্ঞানী, সমঝদার এবং দুনিয়ার ঘটনাবলী সংকটপূর্ণ অবস্থাদি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, বরং তিনি নিজ জাতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা তীক্ষèবুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন।
হুযূর-ই আকরামের ওফাতের পরবর্তী ঘটনাবলী
হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত শরীফ কোন মা‘মুলী ঘটনা ছিলো না। একদিকে মুসলমানগণ শোকে মুহ্যমান ছিলেন, অন্যদিকে মুনাফিকগণ ফ্যাসাদ সৃষ্টির জন্য তৎপর হয়ে ওঠে, মদীনা মুনাওয়ারার চতুর্পাশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে, অনেক দুর্বল ঈমানের গোত্র দ্বীন-ইসলাম ত্যাগ করতে লাগলো, ভণ্ড নবীগণ লোকজনকে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছিলো। এমতাবস্থায় বড় থেকে বড়তর কর্মব্যবস্থাপক এবং রাজনীতিবিদও সাময়িকভাবে হলেও দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেতে থাকেন, যেগুলো অবস্থাদি সংশোধনের পরিবর্তে আরো বিগড়ে ফেলে। এমন সময় রাজ্য শাসন ও রাজনীতিবিদদের চরম পরীক্ষা হয়। কিন্তু সাইয়্যেদুনা আবূ বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিজের দূরদর্শিতা, কার্যতঃ কৌশল এবং পূর্ণাঙ্গ স্থিরতা (দৃঢ়তা) দ্বারা সব সমস্যার সমাধান এমনভাবে সফল হয়েছিলেন যে, দুনিয়ার সব শাসক ও রাজনীতিবিদও হতবাক হয়ে যান। কখনো তিনি নিজের মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি। নবী-ই আকরাম হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের উপর আমল করার জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর অবস্থার মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন।
উসামা বাহিনী প্রেরণ
গোটা রাজ্য বিভিন্ন বিপদে বেষ্টিত, অভ্যন্তরীন ও বহিঃশত্রুরা সুযোগের সন্ধানে অপেক্ষা রত, কিন্তু যে সৈন্য বাহিনীকে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত উসামার নেতৃত্বে রওনা করেছিলেন, সেটাকে রওনা করেই দিচ্ছেন। অথচ শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণও এটার বিপক্ষে পরামর্শ দিচ্ছিলেন। কিন্তু উম্মতে মুসলিমার সিদ্দীক্বের বক্তব্য শুনুন। তিনি বলেন, ‘‘যদি নেকড়েগুলোও আমাকে তুলে নিয়ে যায়, তবুও আমি এ সৈন্য বাহিনীকে প্রেরণ করবোই। আর যে সিদ্ধান্ত রসূলে আকরাম হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিয়েছেন, তা আমি পূরণ (বাস্তবায়ন) করবোই। যদিও এসব বস্তিতে আমি ব্যতীত অন্য কেউ নাও থাকে, তবুও এ বাহিনী প্রেরণ করবোই।
এদিকে যখন হযরত উসামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নেতৃত্বের বিপক্ষে তাঁর স্বল্প-বয়ষ্কতার কারণে আশংকাদি প্রকাশ করা হচ্ছিলো, তখন হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবার বললেন, ‘‘এক ও লা শরীক আল্লাহ্রই শপথ! যদি রসূলে পাকের পবিত্র বিবিগণের পাগুলোকে কুকুরগুলো টানতে থাকে, তবুও আমি, যে সৈন্য বাহিনীকে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রেরণ করেছেন, সেটাকে কখনো ফিরিয়ে আন্বোনা। আর যেই পতাকা খোদ হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বেঁধে দিয়েছেন, সেটাকে আমি কখনো খুলবো না।’’ সুতরাং উসামা-বাহিনী চলে গেলো। আর চল্লিশ দিন পর বিজয়ী বেশে ফিরে আসলো। চতুর্দিকে খুশীর ফোয়ারা প্রবাহিত হতে লাগলো। সাহাবা-ই কেরাম হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবারের দূরদর্শিতা, সুনিপূণ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক কর্মগত কৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। ওদিকে ইসলামের শত্রুদের অন্তরে এ সৈন্যবাহিনীর সাফল্য দাগ কাটছে। কেউ মদীনা মুনাওয়ারার দিকে চোখ তুলে দেখার দুঃসাহস করেনি।
খত্মে নুবূয়তের অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ
সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কর্মগত হিকমত বা কৌশল অনেক বৈশিষ্ট্যের ধারক ছিলো। তাঁর সময়ে যখন নুবূয়তের মিথ্যা দাবীদাররা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, তখন তাদের দৃঢ় পদে মোকাবেলা করা হলো, যদিও তাদের দমন করতে গিয়ে অনেক জান ও মালের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। ভণ্ডনবী মুসায়লামা কায্যাবকেও দমন করতে গিয়ে হাজারো মুসলমান, যাঁদের মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক হাফেযে ক্বোরআন শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু বিজয় মুসলমানরাই অর্জন করেছিলেন। আর এভাবে ‘খতমে নুবূয়ত’-এর আক্বীদা স্থায়িত্ব লাভ করলো। ক্বিয়ামত পর্যন্ত মিথ্যা নুবূয়তের দাবীদাররা শিক্ষা পেয়ে গেলো, মুসলিম উম্মাহ্ হযরত আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র সুন্নাত অনুসারে আমল করতে গিয়ে কোন ভণ্ড নবীকে সহ্য করবেন না। এ পদক্ষেপেএ দৃষ্টান্ত কায়েম করা হয়েছে। আর মুসলমান শাসকদেরকে একথা বলে দেওয়া হয়েছে যে, দ্বীন ইসলামের বুনিয়াদ আক্বাইদ ও আমলগুলোতে কোন প্রকারের শিথিলতা অবলম্বন করা যাবে না। দ্বীনকে সেটার সহীহ বুনিয়াদের উপর কায়েম করা এবং সেটার নবীতিমালা অনুসারে কাজ করা প্রত্যেক মুসলমান শাসকের জন্য জরুরী।
যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ
এ বিষয়ে হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কোনরূপ ছাড় দেননি; সাহাবা-ই কেরাম, যাঁদের মধ্যে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও ছিলেন, বিরুদ্ধবাদীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে সঠিক পথে আনার (تاليف قلوب) পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর তাঁরা বলেছিলেন, ‘‘যেসব লোক তাওহীদ ও রিসালতকে স্বীকার করছে, শুধু যাকাৎ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তাদের উপর কিভাবে তলোয়ার উঠানো যাবে?’’ কিন্তু সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু জবাবে বললেন, ‘‘আল্লাহরই শপথ! যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র জীবদ্দশায় ছাগলের বাচ্চা যাকাৎ হিসেবে দিতো, যদি সে তা দিতেও অস্বীকার করে, তবে আমি তার বিরুদ্ধে জিহাদ করবো।’’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘‘যদি আজ তাদেরকে যাকাৎ না দেওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়; তবে তারা আগামীতে নামায-রোযাকে অস্বীকার করবে। এভাবে দ্বীন একটি তামাশার বস্তু হয়ে যাবে।’’
মোটকথা, সাইয়্যেদুনা হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকাবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রস্তুতি গ্রহণের সাথে যাকাৎ প্রদানে অস্বীকারকারী সকল গোত্রের মোকাবেলায় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। এ ব্যাপারে তাঁর মধ্যে এমন জোশ্ ছিলো যে, বনু আবাস ও বনু যুবিয়ানের মোকাবেলায় তিনি নিজে গিয়েছিলেন এবং তাদেরকে পরাজয়ে বাধ্য করেছিলেন। তাঁর প্রস্তুতি ও দৃঢ়তার কারণে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সমস্ত যাকাৎ অস্বীকারকারী যাকাৎ পরিশোধ করে দিলো। কেউ কেউ তো নিজেরাই মদীনা মুনাওয়ারায় এসে ‘বায়তুল মাল’-এ তা জমা করে দেয়।
এভাবে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্বের ধর্মীয় সুক্ষদৃষ্টি, সিদ্ধান্তের বিশুদ্ধি, দৃঢ়তা ও স্থিরতা দ্বারা তিনি সমস্ত ফিৎনা ও বিদ্রোহগুলো হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত শরীফের পর এক সাথে দূরীভূত ও দমিত হয়ে গিয়েছিলো।
বিভিন্ন রাজ্য বিজয়
সিদ্দীক্ব-ই আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কার্যত কৌশল ও সুনিপুণ ব্যবস্থা দ্বারা শুধু ইসলামী রাষ্ট্রের ভিতরে বাইরে বিরাজিত যাবতীয় ফিৎনা ও বিশৃঙ্খলাকে পদ দলিত করে দেশে শান্তি পুন:প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং বিভিন্ন রাজ্য জয়ের বিজয় নিশানও উড্ডীন করেছেন। তিনি হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ, ইয়াযীদ ইবনে আবূ সুফিয়ান, আবূ ওবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ্, শুরাহ্বীল ইবনে হাসানাহ্ এবং আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম এবং অন্যান্য সিপাহসালারের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছেন। বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়া বিজয় সম্পন্ন করেছিলেন। ইরানে সৈন্য পাঠিয়ে সেখানকার কিল্লাগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলমান শাসকদেরও হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্বের কর্ম পদ্ধতি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অবলম্বন করার তাওফীক দান করুন। অবশ্য সেটা তখনই সম্ভব হবে, যখন শাসকগণ সৎ কর্মপরায়ণ ও যোগ্য হন এবং তাঁদের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফার ইশ্ক্ব ও ভালবাসা এবং সাহাবা-ই কেরামের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আস্থা বদ্ধমূল থাকে। সর্বোপরি তারা যদি বিশ্ব নবী ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শ বাস্তবায়নে আন্তরিক হন।

লেখক: মহাপরিচালক-আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।