খতমে নুবূয়ত ও কাদিয়ানী ফের্ক্বা

0

হাদীস শরীফের আলোকে মাদানী চাঁদ
সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম
খাতামুুল আম্বিয়া (সর্বশেষ নবী)
সম্মানিত পাঠক সমাজ!
মাদানী চাঁদ, আল্লাহর প্রিয়তম, আরশে মু‘আল্লার নক্ষত্র হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী। তাঁর পরে কোন প্রকারের কোন নবী (কিংবা স্বতন্ত্র, অধীনস্থ, বরূযী যিল্লী) আসতেই পারে না। এর অকাট্য প্রমাণ ক্বোরআনে মজীদ ফোরক্বানে হামীদ থেকে এবং প্রাসঙ্গিকভাবে হাদীস শরীফ থেকে এ নিবন্ধেও ইতোপূর্বে দেওয়া হয়েছে। এর উপর আরো বহু হাদীস শরীফও সাক্ষী রয়েছে। সংক্ষেপে ওইগুলো থেকে নি¤েœ আরো কয়েকটা হাদীস শরীফ উল্লেখ করার প্রয়াস পাচ্ছি-
হাদীস শরীফ-১
ইমাম তিরমিযী ও আবূ দাঊদ সাইয়্যেদুনা হযরত সাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, সাইয়্যেদুল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
سَيَكُوْنُ فِىْ اُمَّتِىْ كَذَّابُوْنَ ثَلثُوْنَ كُلُّهُمْ يَزْعَمُ اَنَّه نَبِىُّ اللهِ وَاَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ –[مشكوة شريف : صفحه : ৪৬৫] অর্থ: নিশ্চয় আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মহামিথ্যাবাদী দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবে। তাদের প্রত্যেকে মনে করবে যে, সে আল্লাহ্ তা‘আলার নবী; অথচ আমি হলাম আখেরী নবী। আমার পর কোন নবী আসবে না।
পর্যালোচনা
এ হাদীস শরীফে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে নি¤œলিখিত বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়- প্রথমত, ফখরে দু’ আলম তাজদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, তাঁর পর নিরেট মিথ্যা ও ভন্ড নুবূয়তের দাবীদারই আত্মপ্রকাশ করবে; কিন্তু কোন নবী পয়দা হবে না। নবূয়ত আমারই উপর সমাপ্ত করা হয়েছে।
অসম্ভব কল্পনায়, যদি কোন প্রকারের নুবূয়ত অবশিষ্ট থাকতো, তবে এভাবে এরশাদ হতো, ‘আমার পর নবীও আসবে, দাজ্জাল-কায্যাবও আসবে; যদি নবী তাশরীফ আনে, তবে তাঁর আনুগত্য করবে, আর যদি দাজ্জাল ও কায্যাব (মহামিথ্যুক) আসে, তবে তার খপ্পর থেকে বাঁচবে। কিন্তু সরকার-ই মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপন উম্মতকে শুধু এ হিদায়ত করেছেন যে, ‘‘যে কেউ আমার পরে নুবূয়তের দাবী করবে, তাহলে নির্দ্বিধায় তোমরা তাকে দাজ্জাল ও কায্যাব মনে করবে।’’ এটা এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, এখন সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন প্রকারের নুবূয়ত অবশিষ্ট নেই। হুযূর-ই আক্রাম-ই সর্বশেষ নবী। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি সমস্ত জগতের মালিক, প্রতিপালক।
দ্বিতীয়ত, ওই দাজ্জাল ও কায্যাব শেষ যামানার নবীর উম্মত তথা মুহাম্মদী হবারও দাবী করবে। যেমনটি سَيَكُوْنُ فِىْ اُمَّتِىْ كَذَّابُوْنَ (অবিলম্বে আমার উম্মতের মধ্যে মহামিথ্যাবাদীগণ আত্মপ্রকাশ করবে) থেকে বুঝা যায়। বস্তুত ‘মুহাম্মদী’ ও ‘উম্মত’ হবার দাবীও এ জন্য করবে যে, যদি তারা হুযূর-ই আক্রামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের নুবূয়তের ঘোষণা দেয়, তবে কেউই তাদের ধোঁকা ও প্রতারণার ফাঁদে আটকা পড়বে না। এ কারণে, তারা নিজেদেরকে হুযূর-ই আক্রামের সাথে সম্পৃক্ত বলে দেখাবে। তারপর তারা এ ধোঁকা ও প্রতারণার সাথে লোকজনের সামনে তাদের মিথ্যা নুবূয়তের দাবী পেশ করবে; যেমন মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী দাহ্ক্বানী করেছে। প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের আক্বা ও মাওলা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র ইলমে ছিলো যে, মির্যা ক্বাদিয়ানী নিজে নিজেকে তাঁর দিকে সম্পৃক্ত করে লোকজনকে ধোঁকা দিয়ে নুবূয়তের দাবী করবে।
তৃতীয়ত, মাহবূবে রাব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ওই কায্যাব বা মিথ্যা দাবীদার মির্যা ক্বাদিয়ানী ভন্ড নবী হবার প্রমাণ এটাও বর্ণনা করেছেন যে, ‘সে একথার ধারণা করবে যে, সে নবী; অথচ আমিই সর্বশেষ নবী।’ সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, দাজ্জাল ও কায্যাব হবার জন্য শুধু নুবূয়তের দাবীদার হওয়াই যথেষ্ট। অন্য কোন প্রমাণের প্রয়োজন হবে না। কাজেই, মির্যা ক্বাদিয়ানী মিথ্যাবাদী হবার জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে নুবূয়তের দাবী করেছে।
চতুর্থত, لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ ইবারতটা اَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ-এর তাফসীর বা ব্যাখ্যা। আর لاَ পদটি نفى جنس -এর, যা نكره -এর উপর আসে; যার মর্মার্থ হয়, ‘আমার পরও এ جنس (জাতি)টাই খতম হয়ে গেছে। جنس نبى (নবী নামক জাতি)’র কোন ব্যক্তিই আমার পর মওজূদ থাকবে না। আর যেহেতু ‘নবী’ শব্দটি عام (ব্যাপকার্থক), চাই শরীয়ত বিশিষ্ট বলে দাবীদার হোক কিংবা কারো অনুগামী হোক আর رسول (রসূল) শব্দটি খাস, তাই রসূলে মু‘আয্যম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম مطلق نبى (শর্তহীনভাবে নবী)’র অস্বীকৃতি এরশাদ করেছেন, অর্থাৎ আমার পর কোন নবী আসবে না, চাই সে শরীয়ত বিশিষ্ট বলে দাবী করুক কিংবা শরীয়তবিহীন বলে দাবী করুক। কেননা, শরীয়ত বিশিষ্ট ও শরীয়তবিহীন مطلق نبى (শর্তহীন নবী) শব্দের বিভিন্ন প্রকার। আর যখন মৌলিকভাবে مُقَسَّمْ (যার প্রকারভেদ করা হয়)-এর অস্তিত্বই থাকবে না, তখন সেটার প্রকারগুলো কোত্থেকে আসবে? আর ‘মানতিক্ব’ বা যুক্তিশাস্ত্রের নিয়ম আছে যে, اقسام (প্রকারগুলোর)’র অস্তিত্ব مُقَسَّمْ (যার প্রকারভেদ করা হয়) ব্যতীত এবং افراد (ব্যক্তিগুলো)’র অস্তিত্ব كُلِّىْ (যার অধীনে ব্যক্তিগুলো আছে)-এর অস্তিত্ব ব্যতীত যুক্তিগত দিক (عقلاً) দিয়েও অসম্ভব। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী চাই স্বতন্ত্র নবী হবার দাবী করুক অথবা অধীন নবী, যিল্লী কিংবা বরূযী নবী হবার দাবী করুক, সরকারে দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উক্ত হাদীস শরীফের আলোকে মহা মিথ্যুকই।
পঞ্চমত, এ হাদীস শরীফ থেকে এতটুকু সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, ‘খাতামুন্নবিয়্যীন’ মানে ‘আখেরী নবী’। এর এ অর্থ নয় যে, তিনি সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর নিছক মোহর ও সৌন্দর্য (শোভা)। এ জন্য হাদীস শরীফের এ বাক্য, তিনি নুবূয়তের দাবীদারগণ মিথ্যুক হবার দলীল হিসেবে এরশাদ করেছেন যে, ওইসব নুবূয়তের দাবীদার মিথ্যুক হবার দলীল এ যে, ‘‘আমি খাতামুন নবিয়্যীন’, আমার পরে কোন নবী নেই।’’ সুতরাং তাদের নবী হবার দাবীই তাদের মিথ্যুক হবার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
অতঃপর যদি ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ ‘মোহর’ কিংবা ‘শোভা’ নেওয়া হয়, তবে সেটাকে ওইসব ভন্ড দাবীদার মিথ্যুক হবার প্রমাণ কীভাবে দাঁড় করানো যাবে? বরং তখন হাদীস শরীফের অর্থ, ‘আমার পর অনেক মিথ্যুক (কায্যাব) ও দাজ্জাল নুবূয়তের দাবী করবে; অথচ আমি নবীগণের মোহর। আমার মোহর দ্বারা নবী হবে।’ সুতরাং একথা সুস্পষ্ট হলো যে, এ অর্থ অকেজো; ‘লা নবিয়্যা বা’দী’ (আমার পরে কোন নবী নেই)-এর সুস্পষ্ট বিরোধী ও এর সাথে সাংঘর্ষিক; বরং ‘আনা খাতামুন্ নবিয়্যীন’ (আমি সর্ব শেষ নবী)-এর পর ‘লা-নবিয়্যা বা’দী’ (আমার পর কোন নবী নেই) বর্দ্ধিত করা এ বিষয়ের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এখানে ‘খাতাম’ মানে ‘মোহর’ নয়; বরং ‘আখির’ (সর্বশেষ)। অতএব, মির্যা ক্বাদিয়ানী তার নবী হবার দাবীতে কায্যাব বা মহা মিথ্যুক।
হাদীস শরীফ-২
ইমাম বোখারী ও মুসলিম সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বরাতে বর্ণনা করেন-
مَثَلِىْ وَمَثَلُ الْاَنْبِيَآءِ كَمَثَلِ قَصَرٍ اُحْسِنَ بُنْيَانُه تُرِكَ مِنْهُ مَوْضَعُ لَبِنَةٍ فَطَافَ بِهِ النَّظَّارُ يَتَعَجَّبُوْنَ مِنْ حُسْنِ بُنْيَانِه اِلاَ مَوْضَعَ تِلْكَ اللَّبِنَةِ فَكُنْتُ اَنَا سَدَدْتُ مَوْضَعَ اللَّبِنَةِ خُتِمَ بِىَ الْبُنْيَانُ وَخُتِمَ بِىَ الرُّسُلُ وَفِىْ رِوَايَةٍ فَاَنَا اللَّبِنَةُ وَاَنَا خَاتَمُ النَّبِيَّيْنَ –[رواهُ الْبخارى ومسلم والمشكواة صفحه ৫১১] অর্থঃ আমার ও পূর্ববর্তী নবীগণের উপমা এমন এক অট্টালিকার মত, যাকে অতি সুন্দর করে নির্মাণ করা হয়েছে; কিন্তু তাতে একটি মাত্র ইটের জায়গা রেখে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর পরিদর্শনকারীরা তা ঘুরে ঘুরে দেখে এবং সেটার সৌন্দর্য নিয়ে আশ্চর্যবোধ করে; কিন্তু ওই ইটের স্থান দেখে (হতবাক হয়)। সুতরাং আমি ওই ইটের জায়গাটুকু পূর্ণ করে দিয়েছি। আর ওই অট্টালিকা আমার দ্বারা সমাপ্ত হয়েছে এবং রসূলগণের আগমনের ধারাও আমার উপর সমাপ্ত হয়েছে। অন্য এক বর্ণনা এসেছে, (হুযূর-ই আকরাম এরশাদ করেছেন) ‘‘আমি (নুবূয়তের অট্টালিকার সর্বশেষ) ইট, আমি নবীগণের আগমনের ধারা সমাপ্তকারী। [বোখারী, মুসলিম, মিশকাত-পৃ. ৫৫১]
হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা
প্রত্যেক বস্তুর একটা আরম্ভ আছে এবং একটি শেষ। এভাবে নুবূয়তরূপী ইমারতেরও একটি শুরু এবং একটি শেষ আছে। এ দুনিয়ায় ওই ইমারতের আরম্ভ হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর মাধ্যমে হয়েছে আর সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে এ ইমারত সমাপ্ত বা পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। একটি মাত্র ইট নুবূয়তের অট্টালিকার পরিপূর্ণতার জন্য অবশিষ্ট ছিলো। তাঁর প্রশংসিত স্বত্তা ওই জায়গা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। সুতরাং এভাবে নুবূয়তরূপী অট্টালিকা একেবারে পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে। এখন তাতে কোন ইট সংযোজনের জায়গা বাকী নেই যে, তাতে কোন শরীয়তধারী কিংবা শরীয়তবিহীন নুবূয়তের ইট প্রবেশ করতে পারবে। আফিমখোর গ্রাম্য অশিক্ষিত গোঁয়ার মির্যা ক্বাদিয়ানী ওই নুবূয়তরূপী অট্টালিকায় একটি ইট প্রবেশ করানোর অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তাতে আর কোন জায়গায়ই নেই। সুতরাং যেহেতু মির্যা কাদিয়ানীরূপী ওই তথাকথিত ইটটি নুবূয়তরূপী অট্টালিকার অংশ হবার কোন সুযোগ নেই, সেহেতু সেটাকে অন্য কোথাও ছুঁড়ে মারা হবে বৈ-কি?
গভীরভাবে চিন্তার বিষয় যে, যখন মাহবূবে রাব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাহেবযাদাগণ, সাইয়্যেদুনা হযরত সিদ্দীক্ব-ই আকবর, হযরত ফারূক্বে আ’যম এবং সাইয়্যেদুনা হযরত ওসমান এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম-এর জন্য নুবূয়তরূপী অট্টালিকায় কোন প্রকারের অবকাশ খোঁজা হয়নি, তখন মুসায়লামাতুল হিন্দ ও আসওয়াদ-ই ক্বাদিয়ানীর জন্য কোত্থেকে জায়গা বের করা যাবে? অবশ্য কুফর ও দাজজাল (কাফির ও দাজ্জাল) রূপী বালাখানায় ওই আফীমী ক্বাদিয়ানীকে এক কোণে একটি ইটের মতো ঢুকিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
আফসোস শত আফসোস যে, শাহে আরব ও আজম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তো সুস্পষ্ট ভাষায় এরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ্ সুবহা-নাহু ওয়া তা‘আলা নুবূয়তরূপী অট্টালিকা (ইমারত)কে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন; কিন্তু মির্যা ক্বাদিয়ানী প্রলাপ বকছে যে, ‘না, এখনো নুবূয়তের অট্টালিকা অসম্পূর্ণ রয়েছে, তাতে আরো অনেক ইট সংযোজনের অবকাশ রয়েছে।’ না‘ঊযুবিল্লাহ্! সুম্মা না‘ঊযুবিল্লাহ্!
হাদীস শরীফ-৩
ইমাম মুসলিম সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, হুযূর সাইয়্যেদুল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
فُضِّلْتُ عَلَى الْاَنْبِيَآءِ بِسِتٍّ اُعْطِيْتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ وَاُحِلَّتْ لِىَ الْغَنَآئِمُ وَجُعِلَتْ لِىَ الْاَرْضُ مَسْجِدًا وَطُهُوْرًا وَاُرْسِلْتُ اِلَى الْخَلْقِ كَآفَّةً وَخُتِمَ بِىَ النَّبِيُّوْنَ -থ[رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَالْمِشْكواة ـ صفحه ৫১২] অর্থঃ আমাকে সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালাম-এর উপর ছয়টি জিনিস দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছেঃ ১. আমাকে ‘জামি‘ই কলেমাত’ (ব্যাপক অর্থ বিশিষ্ট বাণীসমূহ) দান করা হয়েছে, ২. আতঙ্ক দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে, ৩. আমার জন্য গণীমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হালাল করা হয়েছে, ৪. আমার জন্য গোটা যমীনকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বানানো হয়েছে, ৫. আমাকে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে এবং ৬. আমাকে সর্বশেষ নবী করা হয়েছে; নুবূয়তের ধারা আমার মাধ্যমে সমাপ্ত করা হয়েছে। [মুসলিম, মিশকাত, পৃ. ৫১২]
হাদীস শরীফ-৪
ইমাম দারেমী সাইয়্যেদুনা হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, মাহবূবে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
اَنَا قَائِدُ الْمُرْسَلِيْنَ وَلاَ فَخْرَ وَاَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ وَلاَفَخْرَ
وَاَنَا اَوَّلُ شَافِعٍ وَمُشَفَّعٍ وَلاَ فَخْرَ ـ [رواه الدرامىُ وَالْمِشْكواةُ صفحه : ৫১৪] অর্থঃ আমি সমস্ত রসূলের ক্বা‘ইদ (পরিচালনাকারী) আর একথা নিছক গর্বের নয় (বরং বাস্তব), আমি সমস্ত নবীর আগমনের ধারা সমাপ্তকারী। আর এটা নিছক গর্ব-অহংকারের কথা নয় এবং আমি প্রথম সুপারিশকারী ও আমার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য; আর এটাও নিছক গর্ব অংহকারের কথা নয়। [দারেমী, মিশকাত, পৃ. ৫১৪]
উক্ত হাদীস দু’টির সারকথা
উপরিউক্ত অতি উঁচু মানের দু’টি হাদীস শরীফ থেকে একথা মধ্যাহ্ণ সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়েছে যে, মানব-দানবের সরদার, মাহবূবে রব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হলেন খাতামুল আম্বিয়া আর নবীগণের শুভাগমনের সিলসিলা (ধারা) তাঁরই দ্বারা সমাপ্ত হয়েছে। এখন তাঁরই নুবূয়ত ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে।
আশ্চর্যবোধ হয় মির্যাঈ ফির্ক্বার উপর, এতগুলো স্পষ্ট বর্ণনার পরও গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীকে তারা তাদের নবী বলে মান্য করে। হাবীবে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্পষ্ট অর্থবোধক হাদীস শরীফগুলোকে অস্বীকার করছে। আরো আশ্চর্যের কথা হচ্ছে তারা সরকার-ই মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত হবারও দাবীকে বহাল রাখছে। لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِيْنَ (মিথ্যা দাবীদারদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত অবধারিত)।
হাদীস শরীফ-৫
হুযূর সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমায়েছেন-
لَوْكَانَ بَعْدِىْ نَبِىٌّ لَكَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ
অর্থ: ‘যদি আমার পরে কোন নবী হতো, তবে অবশ্যই ওমর ইবনে খাত্তাবই হতো।’ [তিরমিযী, মিশকাত, পৃ. ৫৫৮]
হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা
এ হাদীস শরীফ থেকে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রিসালাতের সূর্য হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী। অর্থাৎ তাঁর পরে আর কোন নবী পয়দা হবে না। কেননা, হাদীস শরীফে لو শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর ‘বালাগাত’ ও আরবের পরিভাষায় لَو শব্দটি অসম্ভব বিষয়াদি বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন নি¤œলিখিত আয়াত দু’টিতে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-لَوْكَانَ فِيْهِمَا الِهَةٌ اِلاَّ اللهُ لَفَسَدَتَا
তরজমা: যদি আসমান ও যমীনে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো ইলাহ্ থাকতো, তবে সে দু’টি ধ্বংস হয়ে যেতো। [সূরা আম্বিয়া: আয়াত-২২] অন্য আয়াতে এরশাদ করেন-
قُلْ لَوْكَانَ مَعَه الِهَةٌ كَمَا يَقُوْلُوْنَ اِذًا لاَ بْتَغَوا اِلى ذِى الْعَرْشِ سَبِيْلاً
তরজমা: আপনি বলুন, ‘যদি তাঁর সাথে আরো খোদা থাকতো যেমন এরা বকছে, তবে তারা আরশ অধিপতির দিকে কোন পথ খুঁজে বের করতো।’ [সূরা ইসরা: আয়াত-৪২, কানযুল ঈমান] পক্ষান্তরে, সম্ভব বিষয়াদির জন্য اِنْ (যদি) এবং اِذَا (যখন) ব্যবহৃত হয়। সুতরাং এ হাদীস শরীফে لو শব্দের ব্যবহার বুঝায় যে, হুযূর আপদমস্তক শরীফ নূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নবী আসা অসম্ভব (محال)। এ কারণে এগুলো অসম্ভব কল্পনায় (بطور فرض محال) বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ যদি আমার পর নবী আসা সম্ভবপর হতো, তবে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু)ই হতো; কিন্তু আমার পর কোন প্রকারের নবী হতে পারে না।
সুতরাং যদি মাহবূবে রাব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন প্রকারের নুবূয়ত বাকী থাকতো, তবে সাইয়্যেদুনা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর জন্য তা অবশ্যই সাব্যস্ত হতো। কারণ, খোদ সরওয়ার-ই দু’ আলম তাজদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সাইয়্যেদুনা ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে ‘ফারূক্ব’, ‘মুহাদ্দিস মিনাল্লাহ্’ এবং ‘মুতাকাল্লিম বিস্ সাওয়াব’-এর মতো সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করেছেন। সুতরাং যদি নুবূয়তের ধারা জারী থাকতো তবে সাইয়্যেদুনা হযরত ওমর ফারূক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অবশ্যই নবী হতেন। যখন এমন বুযুর্গ ব্যক্তি নবী হতে পারেননি, তখন এক কাদিয়ানী ও গ্রাম্য মুর্খ ব্যক্তি কিভাবে নবী পেতে পারে?
হাদীস শরীফ-৬
ইমাম বোখারী ও ইমাম মুসলিম সাইয়্যেদুনা হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্বক্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু থেকে বর্ণনা করেন, সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাইয়্যেদুনা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে এরশাদ করেছেন-
اَنْتَ مِنِّىْ بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنْ مُّوْسى اِلاَّ اَنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ
[بخارى ـ مسلم ـ مشكوة ـ صفحه ـ ৫৬৩] অর্থঃ তোমার সাথে আমার ওই সম্পর্ক রয়েছে, যা (সাইয়্যেদুনা) হযরত হারূনের হযরত মূসার সাথে ছিলো; কিন্তু আমার পরে কোন নবী নেই। (আলায়হিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম)
হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা
সব জ্ঞানীই জানে যে, সাইয়্যেদুনা হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাম স্বতন্ত্র নবী ছিলেন না বরং হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর উজির ও তাঁর অনুগামী ছিলেন; যেমন ক্বোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন- (হযরত মূসা ফরিয়াদ করছিলেন)
وَاجْعَلْ لِىْ وَزِيْرًا مِّنْ اَهْلِىْ هَارُوْنَ اَخِىْ [سورة طه : ايت ـ২৯-ـ৩০] তরজমাঃ ২৯।। এবং আমার জন্য আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে একজনকে উযীর করে দাও। ৩০।। সে কে? আমার ভাই হারূন। [সূরা ত্বোয়াহা: আয়াত-২৯-৩০, কানযুল ঈমান] এ কারণে সাইয়্যেদুনা হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম তাওরীত ও হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর শরীয়তের অনুসারী ছিলেন; যদিও মূল নুবূয়তের মধ্যে উভয়ে শরীক ছিলেন। মোটকথা, সাইয়্যেদুনা হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাম দু’টি জিনিষের অধিকারী ছিলেনঃ ১. তিনি হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর সাথে নুবূয়তে শরীক ছিলেন এবং ২. তিনি তাঁর উজীর ও নায়েব (প্রতিনিধি) ছিলেন। শাহানশাহে দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাবূকে তাশরীফ নিয়ে যাবার সময় যখন সাইয়্যেদুনা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে একথা বলেছিলেন, ‘‘আমি চলে যাবার পর তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত হবে, যেমনিভাবে সাইয়্যেদুনা হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাম হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর স্থলাভিষিক্ত ছিলেন, যখন হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম তূর পর্ব্বতে তাশরীফ নিয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, কেউ যেন ভুল না বুঝে, তজ্জন্য সাথে সাথে একথাও বলেছিলেন- اِلاَّ اَنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ(তবে আমার পরে কোন নবী নেই)। অর্থাৎ তুমি শুধু আমার প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত হয়েছো, নবী হওনি। হযরত হারূন আলায়হিস্ সালাম-এর সাথে তোমার শুধু স্থলাভিষিক্ত ও নায়েব হবার মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে; কিন্তু নুবূয়তের মধ্যে কোন সাদৃশ্য নেই। কারণ, আমার পরে কোন নবী আসতে পারে না। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, اِلاَّ اَنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ -এর মধ্যে হযরত আলী অধীনস্থ নবী হওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। কারণ হযরত আলী মুরতাদ্বার জন্য স্বতন্ত্র নবী হবার কথা বিন্দুমাত্র কল্পনাও করা যায় না। আবার বিশেষত সাইয়্যেদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপস্থিতি ও জীবদ্দশায় কার মধ্যে এ সন্দেহ বা আশঙ্কা থাকতে পারে যে, সাইয়্যেদুনা হযরত আলী মুরতাদ্বা কাররামাল্লাহু তা‘আলা ওয়াজহাহুল করীমকে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র কিতাব ও স্বতন্ত্র শরীয়ত দান করা হবে? এবং স্বাধীনভাবে তাঁর উপর আল্লাহ তা‘আলার ওহী আসতে শুরু করবে? তাছাড়া স্বতন্ত্র নবীর কারো স্থলাভিষিক্ত হওয়া তো তাঁর স্বতন্ত্র হবার পরিপন্থী (বিরোধী)!
এখন এ বক্তব্য থেকে একথা সুস্পষ্ট হলো যে, اِلاَّ اَنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ (তবে আমার পরে কোন নবী নেই)-এর মধ্যে অধীনস্থ নবী হবার কথাও অস্বীকার করা হয়েছে মর্মে বুঝা যায়, যার মির্যা ক্বাদিয়ানী দাবী করছে। সুতরাং ক্বাদিয়ানী কর্তৃক ‘অধীনস্থ নবী’ হবার দাবী করাও সম্পূর্ণ বাতিল ও অনর্থক হলো।
মির্যা ক্বাদিয়ানীর ধোঁকা
মির্যা ক্বাদিয়ানী কখনো নিজেকে ‘যিল্লী নবী’ (ছায়া নবী) বলে দাবী করেছিলো, কখনো ‘বরূযী নবী’ বলে দাবী করতো, যাতে সাধারণ ও সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে এ ধোঁকায় ফেলতে পারে যে, তার নুবূয়ত তো খাতামুন্ নবিয়্যীন সাল্লাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধী নয়! অথচ যিল্লী (ছায়া), রূপক ও বরূযী নুবূয়তের পরিভাষাগুলো নিছক মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীরই আবিষ্কার; কিতাব, সুন্নাহ, সাহাবা-ই কেরামের অভিমতগুলো এবং সলফে সালেহীনের মধ্যে কোথাও এর নাম-নিশান পর্যন্ত নেই। কোন প্রকারের নুবূয়তেরও যদি কোন দরজা খোলা থাকতো, তবে ওইসব পবিত্র মনের ব্যক্তিদের জন্য খোলা হতো, যাঁরা নুবূয়তের প্রদীপের উপর পতঙ্গের ন্যায় গিয়ে পড়তেন এবং তাঁর ইশক্ব ও মুহাব্বতের মধ্যে এমনই নিমজ্জিত ও বিলীন ছিলেন যে, পূর্ব ও পরবর্তীদের মধ্যে কোথাও এর নযীর নেই। সুতরাং যেভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নুবূয়তের ধারা সমাপ্ত হয়েছে, তেমনি তাঁর উপর মাহবূবিয়াত (আল্লাহর খাস বন্ধু হবার মর্যাদা) সমাপ্ত হয়েছে। সুতরাং না আসমান ও যমীন এমন ‘মাহবূব’ দেখেছে, না এমন আশিক্ব ও প্রাণ উৎসর্গকারী দেখেছে, না এমন নুবূয়ত-প্রদীপ দেখেছে, না এমন পতঙ্গ দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
যদি কোন প্রকার নুবূয়তের দরজাও খোলা থাকতো, তবে ওই ইয়ারে গার, রফীক্বে জাঁ-নেসার হযরত আবূ বকর, যাঁকে আল্লাহ্ তা‘আলা আপন কিতাবে মুবীনে ‘সানী-ই ইসনা‘ঈন’ (দু’জনের দ্বিতীয়), ‘আত্বকা’ ও উলুল ফদ্বল’-এর মতো উপাধিতে ভূষিত করেছেন, এর জন্য খোলা থাকতো। তখন তিনি তথাকথিত ‘যিল্লী’ কিংবা ‘বরূযী’র মতো কোন না কোন নুবূয়ত তো অবশ্যই পেয়ে যেতেন। অথবা হযরত ওমর ফারূক্বের জন্য নবূয়তের দরজা খুলে যেতো। কেননা, সরওয়ারে দু’ আলম সাল্লাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁরা দু’জনকেই নিজের উজির বলেছেন। যেমন হযরত আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে খোদা সাল্লাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
مَامِنْ نَبِىٍّ اِلاَّ وَلَه وَزِيْرَانِ مِنْ اَهْلِ السَّمَآءِ وَوَزِيْرَانِ مِنْ اَهْلِ الْاَرْضِ فَاَمَّا وَزِيْرَاىَ مِنْ اَهْلِ السَّمَآءِ فَجِبْرَائِيْلُ وَمِيْكَائِيْلُ وَاَمَّا وَزِيْرَاىَ مِنْ اَهْلِ الْاَرْضِ فَأَبُوْ بَكْرٍ وَعُمَرُ ـ [ترمذى : مشكوة صفحه ـ ৫৬০] অর্থঃ এমন কোন নবী নেই, যাঁর দু’জন উজির আসমান থেকে এবং দু’জন উজির যমীনবাসীদের থেকে নেই। সুতরাং আসমানগুলো থেকে আমার দু’জন উজির হচ্ছে- হযরত জিব্রাঈল ও হযরত মীকাঈল (আলায়হিমাস্ সালাম) আর যমীনবাসীদের থেকে আমার দু’জন উজির হচ্ছেন (হযরত) আবূ বকর সিদ্দীক্ব ও (হযরত) ওমর ফারূক (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা)।
এ হাদীস শরীফ থেকে বুঝা গেলো যে, সাইয়্যেদুনা সিদ্দীক্বে আকবার ও সাইয়্যেদুনা ফারূক্বে আ’যম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা হলেন যমীনে হযরত জিব্রাঈল ও হযরত মীকাঈলের নমুনা এবং হুযূর-ই আক্রামের কর্ম ব্যবস্থাপনার উজিরদ্বয়; কিন্তু কোন প্রকারের নবী নন। যদি, অসম্ভব কল্পনায়ও তাঁরা নবী হতেন, তবে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অনুগামী ও উম্মতই হতেন; কিন্তু এ দু’জন হযরতকে তো নবী বলেন নি; কেননা, নুবূয়তের ধারা একেবারে খতমই হয়ে গিয়েছিলো। মোটকথা, যখন হযরত জিব্রাঈল ও মীকাঈলের ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বদ্বয় নবী হননি, তখন কি মির্যা ক্বাদিয়ানীর মতো শয়তান আযাযীলের দোসর নবী হতে পারে? মোটেই না।
—০—
খতমে নুবূয়তের উপর সাহাবা-ই কেরাম
এবং সলফে সালেহীনের ইজমা’ প্রতিষ্ঠিত
সাহাবা-ই কেরামের নিকট খতমে নুবূয়তের গুরুত্ব
খতমে নুবূয়তের মাসআলায় সমস্ত সম্মানিত সাহাবী আলায়হিমুর রিদ্বওয়ান একমত। কোন সাহাবীর এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই। অনেক নির্ভরযোগ্য শীর্ষস্থানীয় সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম খতমে নুবূয়তের অগণিত হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু)-এর খিলাফতামলের শুরুতে অনেক লোক ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ্দ্ হয়ে গিয়েছিলো। এ নাজুক সময়ে কিছুলোক এ অবস্থাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে ভন্ড নুবূয়তের দাবীদার হয়ে বসেছিলো। যেমন-সাজাহ্ বিনতে হারিস, যে এক ইহুদী গণক নারী ছিলো। সে নুবূয়ত দাবী করেছিলো। একটি জনগোষ্ঠী তার এ মিথ্যা দাবীকে সত্য বলে বিশ্বাসও করেছিলো। এভাবে আস্ওয়াদ আনাসী, যে ইয়ামনের বাসিন্দা ছিলো, ভন্ড নুবূয়তের দাবীদার হয়ে বসেছিলো, অনুরূপ মুসায়লামা কায্যাবও, যে ইয়ামামাহর বাসিন্দা ছিলো, নবী বলে দাবী করেছিলো এবং তার খুব চর্চাও হচ্ছিলো।
খলীফাতুল মু’মিনীন সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব-ই আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হুকুম জারী করলেন যেন সর্বপ্রথম ওই বানোয়াট ও ভন্ড নবীদের দমন করা হয়। তখন আস্ওয়াদ আনাসী, মতান্তরে তাওবা করে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়; কিন্তু মুসায়লামা কায্যাব ততদিনে যথেষ্ট সংখ্যক লোককে পথভ্রষ্ট করে নিয়েছিলো এবং এক বিরাট সৈন্যবাহিনীও গঠন করেছিলো। তার মূলোৎপাটনের জন্য প্রথমে সাইয়্যেদুনা হযরত ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসলেন।
এরপর সাইয়্যেদুনা হযরত শারজীল রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান; কিন্তু তিনিও সফল হননি। পরিশেষে, হযরত খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধে গেলেন। তুমুল যুদ্ধ হয়েছিলো। একুশ হাজার মুরতাদ্দ্ জাহান্নামে পৌঁছেছিলো। আর এক হাজার মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন; যাঁদের একটি বিরাট অংশ পবিত্র ক্বোরআনের হাফেয ছিলেন।
এ যুদ্ধে মুসায়লামা কায্যাবের গর্দান উড়ানোর মতো বাহাদুরীর মুকুট হযরত ওয়াহ্শীর মাথায় শোভা পেলো। তিনি তাকে জাহান্নামে পৌঁছিয়ে উহুদ যুদ্ধে হযরত হামযাহ্কে শহীদ করার প্রায়শ্চিত্ত (কাফ্ফারা) করেছিলেন। এ যুদ্ধের নাম ইতিহাসে ‘ইয়ামামাহ্র যুদ্ধ’। মোটকথা, হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কারো নুবূয়ত দাবী করা হযরত সাহাবা-ই কেরাম সহ্য করেননি। সাজাহ্ ও তুলায়হারও একই ধরনের পরিণতি হয়েছিলো। তারাও বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি।
সাহাবা-ই কেরামের ইজমা’ (ঐকমত্য)
যেসব হযরত নিজ নিজ শির হাতে নিয়ে ইয়ামামার যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন, যাঁরা শাহাদাতের সুধা পান করে তৃপ্ত হয়েছিলেন, তাঁরা সবাই সাহাবী ছিলেন এবং নবী করীমের দরসপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁদেরকে মুসায়লামা কাযযাবের মোকাবেলায় পাঠানো এবং তাঁদেরও যুদ্ধ করা ও শহীদ হওয়া একথা প্রমাণ করে যে, সম্মানিত সাহাবীদের সবার মতে হুযূর সাইয়্যেদুল ‘আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী। তাঁর পরে কোন প্রকারের নবী হবার দাবী করা কুফরী ও মুরতাদ্দ হয়ে যাওয়াই। আর নুবূয়তের ওই মিথ্যা দাবীদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জরুরী। প্রমাণিত হলো যে, সমস্ত সম্মানিত সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম খতমে নুবূয়তের মাসআলায় একমত ছিলেন। আর আজ পর্যন্ত সত্যপন্থীদের এই মসলক (মতাদর্শ)ই চলে আসছে যে, রাব্বুল আলামীনের মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী।
—০—
খতমে নুবূয়তের উপর সল্ফে সালেহীন
(ইসলামের অগ্রণী বুযুর্গগণ)-এর ঐকমত্য (ইজমা’)
প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ’ বছরের দীর্ঘ সময়ে আজ পর্যন্ত মুসলমানগণ ‘খতমে নুবূয়ত’-এর মাসআলায় একমত হয়েছেন; এ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে সলফে সালেহীনের কয়েকজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তির ‘খতমে নুবূয়ত’ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ও আক্বীদা সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি-
ইমাম গাযালী
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, ‘‘সুতরাং এ কারণেই হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে নুবূয়তের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আর তিনি এরশাদ করেছেন-لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ (আমার পরে কোন নবী নেই।) [ত্বিব্বে জিসমানী ও ত্বিব্বে রূহানী, কৃত. ইমাম গাযালী]
ইমাম রাব্বানী
হযরত ইমাম রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী ক্বুদ্দিসা র্সিরুহু বলেন, ‘‘খাতামুল আম্বিয়া মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ হাস্ত ওয়া ঈসা নুযূল খা-হাদ নমূদ ওয়া আমল বশরী‘আতে ঊ-খাহাদ করদ।’’ অর্থাৎ ‘‘হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসূল, সর্বশেষ নবী, হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম অবশ্যই অবতরণ করবেন এবং তাঁর (হুযূর-ই আক্রাম)-এর শরীয়ত অনুসারে কাজ করবেন।’’
তিনি অন্য এক জাযগায় বলেছেন, اول ایشاں آدم است وخاتم ایشاں محمد رسول اللہ ﷺ অর্থাৎ নবীগণের মধ্যে দুনিয়ার সর্বপ্রথম হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম তাশরীফ এনেছেন এবং সব শেষে তাশরীফ এনেছেন আল্লাহর রসূল হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। [মাক্বতূবাত শরীফ]
মাওলানা রূমী
জনাব মাওলানা রূমী কুদ্দিসা র্সিরুহুল আযীয বলেছেন-
یارسول اللہ رسالت را تمام -تونو دي سمچو شمس بے گماں [مثنوی شریف] অর্থ: হে আল্লাহর রসূল! আপনি রিসালতের ধারাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। একথা আপনি মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন। [মসনভী শরীফ]

হযরত মাহবূবে সুবহানী
হযরত পীরানপীর দস্তগীর সাইয়্যেদুনা মাওলানা হযরত আবদুল ক্বাদের জীলানী ক্বুদ্দিসা সিররুহুল আযীয এরশাদ ফরমান-
سب اہل اسلام کا عقیدہ ہے کہ محمد بن عبد اللہ بن عبد المطلب بن ہاشم (ﷺ) خداوند تعالی کے رسول اور رسولوں کے سردار اور نبوت ان پر ختم ہے -[غنیہ الطالبین صفحہ ۱۱۴] অর্থ: সকল মুসলমানের আক্বীদা বা দৃঢ় বিশ্বাস হচ্ছে- হযরত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার রসূল, রসূলগণের সরদার এবং নুবূয়ত তাঁরই উপর সমাপ্ত হয়েছে। [গুনিয়াতুত্ ত্বা-লেবীন, পৃ. ১১৪]

বেরাদরানে ইসলাম!
সাইয়্যেদুনা ওয়া মাওলানা ক্বুত্ববুল আক্বতাব ওয়া শায়খুশ্ শুয়ূখ হযরত আবদুল ক্বাদির জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কতই উৎকৃষ্ট ফয়সালা শুনিয়েছেন! তিনি বলেছেন, ‘খতমে নুবূয়ত’ মুসলমানদের ইজমা’ বা ঐকমত্য বিশিষ্ট মাসআলা। যেসব লোক খতমে নুবূয়তের আক্বীদা পোষণ করে না এবং নবী আসার পরম্পরা জারী রয়েছে বলে বিশ্বাস করে ও বলে তারা ইসলামের গন্ডি থেকে বেরিয়ে গেছে।’’ এটা কতই স্পষ্ট কথা!
হে মির্যাঈ ক্বাদিয়ানীরা! আল্লাহকে ভয় কর! খতমে নুবূয়তের উপর ঈমান এনে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নে! অন্যথায় জাহান্নামে প্রবিষ্ট হবার জন্য প্রস্তুতি নে!
সাইয়্যেদুনা ইমাম আ’যম
ইমামুল আইম্মাহ্ কাশিফুল গুম্মাহ্ সাইয়্যেদুনা হযরত ইমাম আবূ হানীফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মতে, নুবূয়তের ধারা হাবীবে রব্বে আনাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া বারাকা ওয়াসাল্লাম-এর উপর খতম হয়েছে। তাঁর মতে, নুবূয়তের ভন্ড দাবীদাররা নিশ্চিত কাফির। যারা এমন ভন্ড নবীর নিকট তার নুবূয়তের পক্ষে দলীল তলব করবে সেও কাফির।
সুতরাং তাঁর যুগে এক ব্যক্তি নুবূয়ত দাবী করেছিলো এবং তার নুবূয়তের পক্ষে দলীলাদি পেশ করার জন্য সময় ও সুযোগ চাইলো। তখন সাইয়্যেদুনা ইমাম আ’যম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ফাতওয়া আরোপ করলেন, যে ব্যক্তি তার নুবূয়তের দলীল চাইবে সেও কাফির। কারণ, সে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এরশাদ মুবারক (বাণী শরীফ) لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ(আমার পরে কোন নবী নেই)-কে অস্বীকার করে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
[খায়রাতুল হিসান, কৃত. ইবনে হাজর হায়তামী, পৃ. ৫০] মোটকথা, সমস্ত মুহাদ্দিস (হাদীস বিশারদগণ), মুতাকাল্লিমীন (ইসলামী দার্শনিকগণ), ফোক্বাহা (ফিক্বহ্ বিশারদগণ) ও মাশা-ইখের মধ্যে এ মর্মে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, হাবীবে রব্বে আনাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নুবূয়তের দরজা বন্ধ। আর যে ব্যক্তি নবী আসার পরম্পরা জারী রয়েছে বলে বিশ্বাস করবে সে ইসলামের গন্ডি থেকে সম্পূর্ণ খারিজ।
মির্যাঈদের সন্দেহরাজি ও সেগুলোর অপনোদন
আমরা মুসলমান-মু’মিনরা তো আয়াতাংশ ‘খাতামুন নবিয়্যীন’ দ্বারা, নির্ভরযোগ্য তাফসীরগুলোর বরাতে প্রমাণ করে দিয়েছি যে, মাহবূবে রাব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নুবূয়ত খতম হয়েছে। আর এ মাসআলায় কোন প্রকারের সন্দেহের অবকাশ নেই।
কিন্তু মির্যাঈরা সত্য সুস্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সন্দেহের অন্ধকাররাশিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। সুতরাং মির্যাঈদের সন্দেহগুলো উল্লেখ করে সেগুলোর অপনোদন করা প্রয়োজন; তখন হয়তো তারা, আল্লাহ্ সার্মথ্য দিলে সত্য বিষয়টি বুঝে সঠিক পথে এসে যাবে।
মির্যাঈদের সন্দেহ-১
যদি ‘খাতামুন নবিয়্যীন’-এর এ অর্থ হয় যে, হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নবী আসবে না, তাহলে শেষ যুগে সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণ, মুসলমানদের সর্বসম্মত আক্বীদা, কিভাবে শুদ্ধ ও সঠিক হতে পারে?
জবাব (খন্ডন)
‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ এ যে, হুযূর-ই আক্রামের পর কোন নবী পয়দা হবে না; যেমন- ‘আখেরী আওলাদ’ এবং ‘আখেরী পুত্র’-এর অর্থ এ-ই হয় যে, তার পরে আর কোন সন্তান কিংবা পুত্র পয়দা হয়নি। বাকী রইলো হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণের কথা। তিনি হুযূর-ই আক্রামের পূর্বে দুনিয়ায় পয়দা হয়েছিলেন এবং তাঁর শুভাগমনের পূর্বে নবী হয়েছিলেন।
অবশ্যই মির্যা ক্বাদিয়ানী, সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পরে পয়দা হয়েছে। সুতরাং মির্যা ক্বাদিয়ানীর অস্তিত্ব খতমে নুবূয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা, সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণ খতমে নুবূয়তের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না। কারণ, সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম হুযূর-ই আক্রামের অনেক পূর্বে পয়দা হয়েছেন এবং পূর্বে নবী হয়েছেন তারপর তাঁকে আসমানের উপর জীবিত তুলে নেয়া হয়েছে, এখনো জীবিত আছেন, শেষ যমানায় উম্মতে মুহাম্মদীর একজন মুজাদ্দিদ হিসেবে নাযিল হবেন, তাঁর অবতরণও নবী হিসেবে হবে না, নাযিল হবার পর নিজের নুবূয়ত ও রিসালত এবং নিজের কিতাব ইনজীল এবং নিজের শরীয়তের দিকে কাউকে দাওয়াতও দেবেন না; বরং ইমামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিনিধি (নায়েব) হয়ে লোকজনকে নিরেট ক্বোরআন ও হাদীসের বিধানাবলী অনুসারে চালাবেন এবং নিজেও শরীয়ত-ই মুহাম্মাদিয়ার অনুসরণ ও পায়রভীকে নিজের জন্য শত গর্বের কারণ মনে করবেন, আর সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শরীয়তের ঢঙ্কা বাজাবেন। যেমন তাফসীরকারকগণ বলেছেন-
فَاِنْ قُلْتَ قَدْ صَحَّ اَنَّ عِيْسى عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَنْزِلُ فِىْ اخِرِ الزَّمَانِ بَعْدَه وَهُوَ نَبِىٌّ قُلْتُ اِنَّ عِيْسَى عَلَيْهِ السَّلاَمُ مِمَّنْ نُبِّئَ قَبْلَه وَحِيْنَ يَنْزِلُ فِىْ اخِرِ الْزَّمَانِ يَنْزِلُ عَامِلاً بِشَرِيْعَةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمُصَلِّيًا اِلى قِبْلَتِه كَأَنَّه بَعْضُ اُمَّتِه ـ
[تفسير خازن : جلد سوم صفحه ـ৪৭১ـ مدارك صفحه ৪৭১] অর্থ: যদি তুমি এ আপত্তি করো যে, একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, নিশ্চয় সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম শেষ যামানায় হুযূর-ই আক্রামের পরে তাশরীফ আনবেন (নাযিল হবেন) অথচ তিনি নবী, তবে আমি এর জবাবে বলছি, নিশ্চয় সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম তাঁর পূর্বে নবী হয়েছেন, আর যখন শেষ যমানায় নাযিল হবেন, তখন শরীয়তে মুহাম্মদিয়াহ্ অনুসারে আমল করবেন, তাঁর ক্বেবলার দিকে মুখ করে নামায পড়বেন, তাঁরই একজন উম্মত হবেন। [তাফসীর-ই খাযিন: ৩য় খন্ড, পৃ. ৪৭১, মাদারিক: পৃ. ৪৭১]
সন্দেহ-২
মির্যাঈরা বলে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ এ যে, তিনি নবীগণের মোহর। তাঁরপর তাঁর মোহর ও সত্যায়ন এবং অনুসরণ দ্বারা নবী হতে থাকবে।’’
জবাব (খন্ডন)
মির্যাঈদের এ সংশয় ও সন্দেহ একেবারে অনর্থক ও অকেজো। আরবী ভাষা এবং আরবী ব্যাকরণের নিয়মাবলীর পরিপন্থী। অন্যথায় একথা অনিবার্য হয়ে যাবে যে, ‘খাতামুল ক্বওম’-এর অর্থ হবে ওই ব্যক্তি, যার মোহর দ্বারা সম্প্রদায় হতে থাকবে। আর ‘খাতামুল মুহাজিরীন’ মানে হবে ওই ব্যক্তি, যার মোহর দ্বারা ‘মুহাজির’ হবে। অনুরূপ ‘খাতামুল আওলাদ’ মানে হবে ওই ব্যক্তি যার মোহর ও সত্যায়ন-প্রত্যয়ন দ্বারা এবং অনুসরণ দ্বারা ‘আওলাদ’ (সন্তান-সন্তুতি) হবে।
সুবহানাল্লাহ্! মির্যাঈদের নিকট কেমন কেমন আশ্চর্যজনক হাক্বীক্বত ও মা‘আরিফ (জ্ঞান-বিজ্ঞান) রয়েছে! তাছাড়া, ‘খাতামুন নবিয়্যীন’-এর তাদের কৃত এ অর্থ আল্লাহর কালামের উদ্দেশ্যের একেবারে বিপরীতও। কেননা, মহান রবের উদ্দেশ্য এ শব্দযুগল দ্বারা এ’যে, হুযূর-ই আক্রামকে এজন্য ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ করে পাঠিয়েছেন যেন নুবূয়তের ধারা তাঁর মাধ্যমে খতম হয়ে যায়। কিন্তু মির্যাঈ বলে, ‘হুযূর-ই আক্রামকে এজন্য প্রেরণ করা হয়নি যে, নুবূয়তের ধারা তাঁর মাধ্যমে খতম হবে, বরং তাঁকে নবী বানানোর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, যেন ভবিষ্যতেও তাঁর পরে নবী হতে থাকে।’ এ অর্থ আল্লাহ্ তা‘আলার উদ্দেশ্যের একেবারে বিপরীত। সুতরাং এটা প্রত্যাখ্যানযোগ্য ও বাতিল বা ভিত্তিহীন।
তাছাড়া, এ অনর্থক ব্যাখ্যা (তা’ভীল) সাইয়্যেদুনা হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস‘ঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ‘ক্বিরাআত’ وَلكِنْ نَبِيَّنا خَتَمَ النَّبِيِّيْنَ (কিন্তু আমার নবী নবীগণের ধারাকে খতম করে দিয়েছেন) এবং ওইসব বরকতময় হাদীসের মধ্যে, যেগুলোতে ‘আ-খিরুল আম্বিয়া’ (اخِرُ الْاَنْبِيَآءِ) ও ‘লা-নাবিয়্যা বা’দী’ (আমার পরে কোন নবী নেই)-এর বচনগুলো এসেছে, এর মোকাবেলায় চলতে পারে না। তাছাড়া, ‘খা-তিম’ (خاتم) মানে খতমকারী, সমাপ্তকারী, সুতরাং যদি তাঁর মোহর ও অনুসরণ দ্বারা নবী হতে থাকে, তবে তো তিনি নবীগণের শুভাগমনের ধারা সমাপ্তকারী (সর্বশেষ নবী) হবেন না!
সংশয়-৩।।
মির্যাঈ বলে (خَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ)বিশিষ্ট আয়াত শরীফে (النَّبِيِّيْنَ)-এর উপর যেই (الف لام) রয়েছে তা (عهد خارجى) অর্থে ব্যবহৃত। এর অর্থ হবে তিনি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট কতিপয় শরীয়ত বিশিষ্ট নবীর খাতাম (সমাপ্তকারী), শর্তহীনভাবে সকল সম্মানিত নবী, আলায়হিমুস্ সালাম-এর ‘খাতাম’ (সমাপ্তকারী) নন।
খন্ডন
আমরা ইতোপূর্বে একথা প্রমাণ করেছি যে, (النَّبِيِّيْنَ)-এর মধ্যে الف لام -استغراقى; যা সব নবী আলায়হিমুস্ সালাম বুঝানোর জন্যই। আরবী ভাষা ও পরিভাষা অনুসারে خَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ মানে ‘আখেরুন নবিয়্যীন’ (সর্বশেষ নবী)। অর্থাৎ সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালাম-এর আগমনের ধারা সমাপ্তকারী। সুতরাং الف لام عهدى বলা মারাত্মক ভুল। কারণ الف لام عهدى হবার জন্য পূর্বশর্ত হলো (معهود) (আলিফ-লাম দ্বারা যাকে বুঝানো উদ্দেশ্যে)-এর উল্লেখ ইতোপূর্বেকার বাক্যে স্পষ্টভাবে কিংবা ইঙ্গিতে করা। বস্ততঃ এ আয়াত শরীফের পূর্বাপর কোন বাক্যে কোন শরীয়তসম্মত নবীর উল্লেখ নেই; বরং শর্তহীনভাবে নবীগণের উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং এরশাদ হচ্ছে-
سُنَّةَ اللهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلُ وَكَانَ أَمْرُ اللهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا ط الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلاَّ اللهَ ط وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا [سوره احزاب : ايات :৩৮ـ৩৯] তরজমা: আল্লাহর বিধান চলে আসছে তাদের মধ্যে, যারা পূর্বে অতীত হয়েছে এবং আল্লাহর কাজ সুনির্দ্ধারিত; তারাই, যারা আল্লাহর বাণী প্রচার করে এবং তাঁকে ভয় করে আর আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না এবং আল্লাহ যথেষ্ট হিসাব গ্রহণকারী। [সূরা আহযাব: আয়াত-৩৮-৩৯, কানযুল ঈমান] এখানে اَلَّذِيْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ (যাঁরা পূর্বে গত হয়েছে)-এর মধ্যে সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালাম শামিল রয়েছেন আর খোদা তা‘আলার পয়গাম পৌঁছানো এবং আল্লাহ্ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় না করা মূল নুবূয়তের জন্য অপরিহার্য ও জরুরী। অন্যথায় الف لام কে عهدى ধরা হলে আয়াত শরীফের অর্থ হবে আল্লাহর বিধানাবলীর প্রচার ও আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় না করা শুধু শরীয়তসম্মত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর উপর ফরয, যারা শরীয়ত সমর্থিত নবী নয়, তাদের জন্য এসব বিষয় জরুরী নয়; অথচ এটা আয়াতের মর্মার্থের পরিপন্থী, বাতিল ও ভিত্তিহীন ব্যাখ্যা।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, মির্যাঈদের একথা বলা যে, خَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ-এর উপর আলিফ-লাম عهدى (বিশেষ কতিপয় নবী বুঝানো) মারাত্মক ভুল ও না-দুরস্ত।
সংশয়-৪।।
মিযাঈ আরেক সংশয় এটা পেশ করে যে, ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’-এর মর্মার্থ তেমনি যেমন কাউকে ‘খাতিমুল মুহাদ্দিসীন’ অথবা ‘খাতিমুল মুফাস্সিরীন’ লেখা হয়; অথচ তখন কারো মতে এর অর্থ এ নয় যে, এখন তাঁর পরে কোন মুহাদ্দিস কিংবা মুফাস্সির পয়দা হবে না; বরং একথা অতিশয় উক্তি হিসেবে (بطور مبالغه) বলা হয়। মির্যাঈদের এটা বড় গৌরবজনক সংশয়। আর তারা এর সমর্থনে এ বর্ণনা পেশ করে যে, সাইয়্যেদুল আরব ওয়াল ‘আজম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপন চাচাজান হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে বলেছিলেন-
اِطْمَئِنَّ يَاعَمِّ فَاِنَّكَ خَاتَمُ الْمُهَاجِرِيْنَ فِى الْهِجْرَةِ كَمَا اَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ فِى النُّبُوَّةِ ـ[كنز العمال جلد ششم ـ صفحه ـ ১৭৮] অর্থ: হে আমার চাচাজান! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন! কারণ হিজরতের ক্ষেত্রে আপনি এমন ‘খাতামুল মুহাজিরীন’, যেভাবে আমি নবূয়তের ক্ষেত্রে ‘খাতামুন্নবিয়্যীন’। [কানযুল উম্মাল: ষষ্ঠ খন্ড, পৃ. ১৭৮]
খন্ডন
এ সংশয়ের জবাব এ যে, খাতামুল মুহাদ্দিসীন, খাতামুল মুফাস্সিরীন এবং খাতামুল মুহাক্বক্বিক্বীন-এর মধ্যেও ‘খাতাম’ মানে আখেরী’ই। কেননা, মানুষের যেহেতু ভবিষ্যতের খবর থাকে না, সেহেতু সে আপন ধারণানুসারে এটা মনে করে যে, ইনিই আখেরী মুহাদ্দিস, ইনিই আখেরী মুফাস্সির। তাঁকে সে খাতামুন্ মুহাদ্দিসীন ও খাতামুল মুফাস্সিরীন বলে দেয়। এ পরিভাষা ওই স্থানে ব্যবহৃত হয়, যেখানে কারো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা উদ্দেশ্য হয়। প্রকাশ থাকে যে, শ্রেষ্ঠত্ব তখনই প্রমাণিত হতে পারে, যখন শ্রেষ্ঠত্বের আখেরী সর্বশেষ স্থানটি তাঁর জন্য প্রমাণ করা যায়। যেহেতু এ ধরনের শব্দাবলী নিজের জ্ঞানানুসারে ব্যবহার করে, সেহেতু এ ধরনের শব্দাবলীকে ‘মাজায’ ও ‘মুবালাগাহ্’ (রূপক ও অতিশয়তা) বলে ধরে নেওয়া হয়। কেননা, প্রত্যেকে জানে যে, ‘মুহাদ্দিস হওয়া’, ‘মুহাক্বক্বিক্ব হওয়া’ এবং অন্যান্য গুণাবলী নিজ নিজ উপার্জনই। অর্থাৎ এগুলো বান্দার উপার্জন ও ইচ্ছা দ্বারাই অর্জিত হতে পারে। ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের জন্য দরজা খোলা থাকবে। কাউকে ‘খাতামুল মুহাদ্দিসীন’ বলার পর কারো তো দূরের কথা, স্বয়ং যে বলেছে তারও এ ধারণা হয় না যে, এখন তার পরে কোন মুহাদ্দিস পয়দা হবে।
সুতরাং এতটুকু জেনে নেয়ার পর, এ পরিভাষা হয়তো মুবালাগাহ্ বা অতিশয়তা বশতঃ বলা হয় অথবা তা’ভীল বা ভিন্ন ব্যাখ্যা যোগ্য হিসেবে বলা হয় যে, ইনি তাঁর যুগের আখেরী মুহাক্বক্বিক্ব, আখেরী মুফাস্সির, আখেরী মুহাদ্দিস, অন্যথায় যদি এ ধরনের ভিন্ন ব্যাখ্যা (তা’ভীল) করা না হয়, তবে এ কথা অকেজো ও অনর্থক বরং স্পষ্ট মিথ্যা হয়ে যাবে।
সারকথা হলো এ যে, এ যুক্তি বা কথা এমন এক মানুষের, যার এ খবর নেই যে, আগামীকাল কোন মুহাদ্দিস, কোন মুফাস্সির ও কোন মুহাক্বক্বিক্ব পয়দা হবে। এতদ্সত্ত্বেও নিজের খেয়াল অনুসারে কাউকে ‘খাতামুল মুহাদ্দিসীন’ অথবা ‘খাতামুল মুফাস্সিরীন’ বলে ফেলে, পক্ষান্তরে সমস্ত অদৃশ্যজ্ঞাতা হলেন খোদা তা‘আলা। একটা অনু-পরামণু পর্যন্ত তাঁর ইলমের বাইরে নেই। তিনি বলেছেন যে, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা খাতামুন্নবিয়্যীন। তাঁর কথা তো বাস্তব ও প্রকৃত সত্য। সুতরাং ওই অজ্ঞ বান্দার বেশীর ভাগ ধারণ প্রসূত, আন্দাযকৃত ও অতিশয়তা মিশ্রিত কথা ক্বিয়াস বা অনুমান কীভাবে গ্রহণা করা যেতে পারে?
কখনো না; বরং ওই সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময় সত্তার কালামকে ‘হাক্বীক্বত’ (প্রকৃত) হিসেবে ধরে নেয়া হবে। কাজেই ওই সর্বজ্ঞ সর্ব বিষয়ে অবগত সত্তা, যিনি ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ যুগল এরশাদ করেছেন, তা অবশ্যই হাক্বীক্বত বা প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হবে। আল্লাহ্ তা‘আলার কালামকে কোন মতে মাজায (রূপকার্থে) ও কবিত্বপূর্ণ অতিশয়তার অর্থে ব্যবহার করা যাবে না। বিনা প্রয়োজনে হাক্বীক্বতকে বাদ দিয়ে মাজায (রূপক)কে ইখতিয়ার করা আরবী ভাষার মূলনীতিবিদদের মতে জায়েয নয়। তাছাড়া, যখন ক্বোরআনের আয়াতসমূহ, হাদীসসমূহ, সাহাবা-ই কেরামের অভিমতগুলো, তাবে‘ঈন এবং সমস্ত মুফাস্সির ও মুহাদ্দিসের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকে একথা প্রমাণিত হলো যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ মানে আখেরী নবী, তখন এরপরে কারো এর বিপক্ষে মুখ খোলার বা কথা বলার কোন সুযোগই বাকী থাকেনি।
বাস্তব কথা হচ্ছে- যেই বরকতমন্ডিত সত্তার উপর ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-সম্বলিত আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে, ওই পবিত্র যাতের বর্ণনাকৃত অর্থই গ্রহণযোগ্য হবে।
যদি কিছুক্ষণের জন্য কাল্পনিকভাবে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর এ ওরফী, রূপক ও ভিন্ন ব্যাখ্যাকৃত অর্থ ধরে নেওয়া হয়, তাহলে হযরত আপাদমস্তক নূর, রোজ হাশরে সুপারিশকারী, মাহবূবে রব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্যই বা কি থাকবে? বরং কেউ সাইয়্যেদুনা হযরত মূসা ও সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস সালামকেও এ ওরফী অর্থে ‘খাতামুন নবিয়্যীন’ বলে বসবে।
হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর হাদীসের মর্মার্থ
বাকী রইলো সাইয়্যেদুনা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর হাদীসের মর্মার্থ। হ্যাঁ, ওখানেও ‘খাতাম’ আখেরী- অর্থে ব্যবহৃত। এর প্রমাণ এ যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে হিজরত ফরয ছিলো। মক্কা মুকাররামাহ্ বিজয়ের পর হিজরত ফরয থাকেনি। যেমন বোখারী শরীফের হাদীসে আছে لاَ هِجْرَةَ بَعْدَ الْفَتَحْ অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পর হিজরত নেই। হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে হিজরত করেছিলেন। ‘ইসাবাহ্’ তে আছে-
هَاجَرَ قَبْلَ الْفَتْحَ بِقَلِيْلٍ وَشَهِدَ الْفَتْحَ —[اصابة : جلد سوم ـ صفحه ـ ৬৬৮] অর্থঃ হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে হিজরত করেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ে হাযির ছিলেন। [ইসাবাহ্: ৩য় খন্ড, পৃ. ৬৬৮] এ কারণে সাইয়্যেদুনা আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মনে এ দুঃখ ও বেদনা ছিলো যে, তিনি হিজরতে প্রথম বা অগ্রণী হননি বরং অগ্রণীদের (سابقين) মধ্যে প্রথম (اولين) হওয়ার ফযীলত তিনি অর্জন করতে পারেননি। সুতরাং সাইয়্যেদে দু’ আলম রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সান্ত¦না দেওয়ার জন্য এরশাদ করেছিলেন, যদিও আপনার প্রথম অগ্রণী হবার ফযীলত হাতছাড়া হয়েছে; কিন্তু ‘খাতেম’ হবার ফযীলত তো আপনার জন্য রয়েছে। সুতরাং তিনি এরশাদ ফরমায়েছেন- ‘আপনি খাতামুল মুহাজিরীন’ যেভাবে আমি ‘খাতামুন নবিয়্যীন’। অর্থাৎ আপনি আখেরী মুহাজির, যেমন আমি আখেরী নবী। সুতরাং মির্যাঈদের দলীল গ্রহণ ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সংশয় (সন্দেহ)-৫
ভ্রান্ত ক্বাদিয়ানী বলে- উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন,
قُوْلُوْا خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ وَلاَ تَقُوْلُوْا لاَ نَبِىَّ بَعْدَه
অর্থ: তোমরা বলো, তিনি ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ (সর্বশেষ নবী), কিন্তু ‘লা নবিয়্যা বা’দাহু’ (তাঁর পরে কোন নবী নেই) বলোনা, সুতরাং বুঝা গেলো যে, সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্র হাদীস শরীফ অনুসারে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পরে নবী আসতে পারবে; নুবূয়তের ধারা এখনো শেষ হয়নি।
খন্ডন
সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার এরশাদ বা বাণী পূর্ণাঙ্গরূপে ‘মাজমা‘উল বিহার’-এ উল্লেখ করা হয়েছে। মির্যাঈরা এটাকে অসম্পূর্ণভাবে উদ্ধৃত করেছে। সুতরাং আমি বর্ণনাটা পূর্ণাঙ্গরূপে উল্লেখ করছি। আর সেটা নি¤œরূপ-
وَفِىْ حَدِيْثِ عِيْسى اَنَّه يَقْتُلُ الْخِنْزِيْرَ وَيَكْسِرُ الصَّلِيْبَ وَيَزِيْدُ فِى الْحَلاَلِ اَىْ يَزِيْدُ حَلاَلَ نَفْسِه بِاَنْ يَتَزَوَّجَ وَيُوْلَدَ لَه وَكَانَ لَمْ يَتَزَوَّجْ قَبْلَ رَفْعِه اِلَى السَّمَآءِ فَزَادَ بَعْدَ الْهُبُوْطِ فِى الْحَلَالِ فَحِيْنَئِذٍ يُؤْمِنْ كُلَّ اَحَدٍ مِنْ اَهْلِ الْكِتَابِ يَتَيَقَّنُ بِاَنَّه بَشَرٌ وَعَنْ عَآئِشَةَ قُوْلُوْا اِنَّه خَاتَمُ الْاَنْبِيَآءِ وَلاَ تَقُوْلُوْا لاَ نَبِىَّ بَعْدَه وَهذَا نَاظِرٌ اِلى نُزُوْلِ عِيْسى وَهذَا اَيْضًا لاَيُنَافِىْ حَدِيْثَ لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ لِاَنَّه اَرَادَ لاَ نَبِىَّ يَنْسَخُ شَرْعَه [تكمله مجمع الْبحار ـ صفحه ـ ৮৫] অর্থ: সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম সম্পর্কিত ক্বিসসায় আছে, তিনি নাযিল হবার পর শূয়রকে হত্যা করবেন, ক্রুশ ভাঙ্গবেন, নিজের নাফসের হালাল জিনিসগুলো বৃদ্ধি করবেন অর্থাৎ বিবাহ্ করবেন, তাঁর সন্তান হবেন। কেননা সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলা-নাবিয়্যিনা ওয়া আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম আসমানের উপর উঠিয়ে নেয়ার পূর্বে বিবাহ্ করেননি; আসমান থেকে নেমে আসার পর বিবাহ করবেন। সুতরাং ওই সময় আহলে কিতাবের প্রত্যেকে তাঁর নুবূয়তের উপর ঈমান আনবে আর এ কথায় বিশ্বাস করবে যে, তিনি মানুষ (খোদা নন), আর হযরত সাইয়্যেদা আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে এ-ই যা বর্ণনা করা হয়েছে, ‘‘তাঁকে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ বলো, ‘এটা বলো না যে, তাঁর পরে কোন নবী আগমনকারী নেই’ তাঁর এ বাণী হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণকে সামনে রেখেই ছিলো। বস্তুত: হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম পুনরায় দুনিয়ায় আসা হাদীস-‘লা নবিয়্যা বা’দী’ (আমার পরে কোন নবী আসবে না)-এর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম নাযিল হবার পর হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শরীয়তেরই অনুসারী হবেন। আর ‘লা নবিয়্যা বা’দী’ মানে এমন কোন নবী আসবে না, যে হুযূর-ই আক্রামের শরীয়তকে রহিত করবে; নিজের শরীয়তকে জারী করবে।
এ ইবারত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যে, সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার এ উদ্দশ্য মোটেই ছিলোনা যে, হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ নন; না তিনি হুযূর-ই আক্রামের পরে কোন প্রকার নবী আসা বৈধ মনে করেন; বরং মর্মার্থ এ যে, ‘লা-নবিয়্যা বা’দী’ বাক্যটার বাহ্যিক ব্যাপকতা থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, তাঁরপর পূর্ববর্তী, পরবর্তী, নতুন, পুরাতন কোন নবীই আসবে না; অথচ সহীহ্ হাদীসগুলো থেকে সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম আসমান থেকে নাযিল হওয়া অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এ কারণে সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার এ খেয়াল এসেছে যে, কখনো এ প্রকাশ্য ব্যাপক অর্থের কারণে সাধারণ মানুষ হাদীসাংশ ‘লা-নবিয়্যা বা’দী’কে হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণের বিরোধী (পরিপন্থী) ও সেটার সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে বসে কিনা। এ কারণে, সতর্কতা স্বরূপ এ বাক্যাংশ বলতে নিষেধ করেছেন।
এ কথার উদ্দেশ্য এটা মোটেই নয় যে, হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা হুযূর পুরনূর, শাফি‘ই ইয়াউমিন্ নুশূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন প্রকারের নুবূয়তকে বৈধ মনে করতেন। কেননা এ-ই হযরত সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَآئِشَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنَّه قَالَ لاَ يَبْقى بَعْدَه مِنَ النُّبُوَّةِ اِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَا الْمُبَشِّرَاتُ؟ قَالَ اَلرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ يَرَاهَا الْمُسْلِمُ اَوْ تُرى لَه ـ [رَوَاهُ الْبُخَارِىُّ وَالْمِشْكَواةُ صفحه ـ ৩৯৪] অর্থ: হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা সরওয়ার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করছেন, তিনি এরশাদ করেছেন, আমার পর নুবূয়তের অংশগুলো থেকে ‘মুবাশশিরাত’ ব্যতীত কোন অংশ অবশিষ্ট থাকবে না। সাহাবা-ই কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম আরয করলেন, ‘‘ইয়া রসূলাল্লাহ্! ‘মুবাশশিরাত’ কি?’’ তিনি এরশাদ করলেন, ‘ভাল স্বপ্ন, যা মুসলমান নিজে দেখে অথবা অন্য কেউ তার জন্য দেখে।’’
সুতরাং যখন সাইয়্যেদাহ্ আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা খোদ মাহবূব-ই রাব্বিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করছেন যে, নুবূয়তের ধারা সমাপ্ত হয়ে গেছে, তখন একথা কিভাবে বলা যেতে পারে যে, হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা ‘লা-নবিয়্যা বা’দাহূ’ বলতে এ জন্য নিষেধ করেছেন যে, তিনি নবী-ই আক্রামের পর নুবূয়তের ধারা জারী আছে বলে মনে করতেন? তাছাড়া, ‘লা- নবিয়্যা বা’দী-’ এবং ‘খাতামুন্ নাবিয়্যীন’-এর মর্মার্থ বা ভাবার্থের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আর ‘লা-নাবিয়্যা বা’দাহূ’র হুবহু ওই মর্মার্থই, যা- ‘খাতামুন্ নাবিয়্যীন’-এর-ই। নুবূয়তের ধারা খতম হবার ক্ষেত্রে উভয় শব্দ সমানভাবে প্রযোজ্য।
বুঝা গেলো যে, নিষেধের কারণ ওটা নয়, যা মির্যা ক্বাদিয়ানী বর্ণনা করছে, বরং মূল কারণ হচ্ছে- ‘লা- নাবিয়্যা বা’দাহূ’ বচনটির মধ্যে ব্যাপকতার কারণে বাহ্যতঃ সাধারণ মানুষের জন্য এ সন্দেহের আশংকা ছিলো যে, কেউ আবার ভুল বুঝে সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণকেও অস্বীকার করে কিনা। এ কারণে সাধারণ লোকজনের আক্বীদার হিফাযতের জন্য সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা একথা বলেছেন যে, শুধু ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ শব্দযুগল বলে ক্ষান্ত হও; কেননা এ শব্দযুগলই রিসালত ও নবূয়তের ধারা খতম হয়েছে বুঝানোর জন্য যথেষ্ট। আর এ দু’টি শব্দ তাঁর ফযীলত ও সর্দারীকেও প্রকাশ করে। তাই ‘লা- নাবিয়্যা বা’দী’ শব্দযুগল ব্যবহার করোনা; যা’তে সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।
সাইয়্যেদাহ্ হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা যদি ‘খতমে নুবূয়ত’-এর বিষয়টি অস্বীকার করতেন, তবে ‘খাতামুন্ নাবিয়্যীন’ বলতে কেন নির্দেশ দিতেন, যা প্রকাশ্যভাবে ‘খতমে নুবূয়ত’-এর অর্থ প্রকাশ করে?
সন্দেহ-৬।।
মির্যাঈরা বলে, ‘‘শায়খ মুহি উদ্দীন ইবনে আরবী এবং অন্যান্য বুযুর্গের কথায় বুঝা গেল যে, সরওয়ার-ই কা-ইনাত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নুবূয়তের ধারা সমূলে বন্ধ করা হয়নি বরং ‘তাশরী‘ঈ নুবূয়ত’ (শরীয়তসম্মত নুবূয়ত) তুলে নেওয়া বা বন্ধ করা হয়েছে। আর হাদীস ‘লা-নাবিয়্যা বা’দী’র মর্মার্থ এ’যে, আমার পর এমন কোন নবী হবে না, যা আমার শরীয়তের বিরোধী হবে; বরং তাঁর শরীয়তের অধীনে হবে। শায়খ ইবনে আরবীর ইবারত নি¤œরূপঃ
اِعْلَمْ اَنَّ النُّبُوَّةَ لَمْ تُرْفَعْ مُطْلَقًا بَعْدَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاِنَّمَا اِرْتَفَعَ نُبُوَّةَ التَّشْرِيْعِ فَقَطْ —-থ[اليواقيت والجواهير : جلد دوم ـ صفحه ৩৯] অর্থ: ‘‘জেনে রাখুন যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নুবূয়তকে সম্পূর্ণরূপে (শর্তহীনভাবে) তুলে নেওয়া হয়নি; নিঃসন্দেহে ‘তাশরী‘ঈ নুবূয়ত’-ই শুধু তুলে নেওয়া হয়েছে।’’ এ থেকে বুঝা গেলো যে, ‘গায়র তাশরী‘ঈ নুবূয়ত’ এখনো বাকী আছে। সুতরাং মির্যা ক্বাদিয়ানীও ‘গায়র তাশরী‘ঈ’ নবী ছিলো।
খন্ডন
হযরত শায়খ মুহি উদ্দীন ইবনে আরবী ক্বুদ্দিসা সিররুহ, সমস্ত সম্মানিত ওলী এবং সমস্ত সম্মানিত সূফী এ মাসআলার উপর একমত যে, নুবূয়ত একেবারে সব ধরনেরই খতম হয়ে গেছে। আর সাইয়্যেদুনা মাদানী তাজদার হাবীবে কির্দগার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘খাতামুল আম্বিয়া’ বা আখেরী নবী। আর যে ব্যক্তি সরওয়ার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নুবূয়তের দাবী করে বসে সে কাফির ও মুরতাদ্দ্। তাকে কতল করা ওয়াজিব। হাক্বীক্বত (বাস্তবাবস্থা) এ যে, নুবূয়তের ধারা একেবারে খতম হয়ে গেছে, তাঁর পর কোন প্রকারের নুবূয়ত অবশিষ্ট থাকে নি।
অবশ্য নুবূয়তের কিছু প্রভাব, কিছু পূর্ণতা (গুণ) কোন কোন উম্মতের মধ্যে বাকী থাকে। যেমন হাদীস শরীফে আছে-ذَهَبَتِ النُّبُوَّةُ وَبَقِيَتِ الْمُبَشِّرَاتُ অর্থাৎ নুবূয়ত তো খতম হয়েছে, সুসংবাদদাতা স্বপ্ন অবশিষ্ট রয়ে গেছে। অন্য হাদীস শরীফে আছে- ‘‘ভাল স্বপ্ন নুবূয়তের চল্লিশ কিংবা ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।’’ [মিশকাত-পৃ. ৩৯৪] উল্লেখ্য, শায়খ ইবনুল আরবী আলায়হির রহমাহর ইবারতটির মর্মার্থও এটাই; মির্যাঈদের বর্ণিত অর্থ-মোটেই নয়। উল্লেখ্য, নুবূয়তের গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত হওয়াকে ‘নবী হওয়া’ বলা যাবে না। যেমন মাথা মানুষের একটি অঙ্গ বা অংশ; কিন্তু নিছক মাথাকে মানুষ বলা যাবে না। অনুরূপ, ভাল স্বপ্ন নুবূয়তের (ছেল্লিশ ভাগের এক) ভাগ বা অংশ; কিন্তু সেটাকে নুবূয়ত বলা যাবে না। সুতরাং নিছক সত্য স্বপ্নদ্রষ্টাকেও নবী বলা যাবে না। সম্মানিত সূফীগণের একথা একেবারে শরীয়তের অনুরূপ; শরীয়তের কোন আলিম সেটার অস্বীকারকারী নন।
‘খতমে নুবূয়ত’ সম্পর্কে দু’ ধরনের আলোচ্য বিষয়
‘খতমে নুবূয়ত’ সম্পর্কে ক্বোরআন ও হাদীসে দু’ ধরনের বিষয়বস্তু এসেছেঃ
এক. এ পদবী সব সময়ের জন্য খতম (বিলুপ্ত) করে দেওয়া হয়েছে। ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর কেউই ‘নবী’ পদে ভূষিত হবে না। এ বিষয় নি¤œভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ اِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ قَالُوْا وَمَا الْمُبَشِّرَاتُ قَالَ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ ـ رَوَاهُ الْبُخَارِىُّ فِى كِتَابِ الْتَعْبِيْرِ ـ وَزَادَ مَالِكٌ بِرَوَايَةِ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ يَرَاهَا الْمُسْلِمُ اَوْ تُرى لَه
[مشكوة شريف : صفحه ৩৯৪] অর্থ: সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, নুবূয়ত থেকে ‘মুবাশ্শিরাত’ ব্যতীত আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনি। সাহাবা-ই কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম আরয করলেন, ‘‘মুবাশ্শিরাত’ কি?’’ তিনি এরশাদ করেন, ‘‘উত্তমস্বপ্ন, যা খোদ্ মুসলমান দেখে অথবা তার জন্য অন্য কেউ দেখে।’’ [মিশকাত শরীফ: ৩৯৪ পৃষ্ঠা] অন্য এক হাদীস শরীফে আছে-ذَهَبَتِ النُّبُوَّةِ وَبَقِيَتِ الْمُبَشِّرَاتُ অর্থাৎ: নুবূয়তের ধারা খতম হয়ে গেছে, মুবাশ্শিরাত বাকী রয়েছে। এ ধরনের হাদীস শরীফগুলো দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ‘নবী’ পদবীটা সব সময়ের জন্য খতম হয়ে গেছে। এখন এ পদটি আর কাউকে দেওয়া হবে না।
দুই. মাহবূবে রব্বে আনাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। নবীগণের আগমনের ধারা সমাপ্তকারী। এটাকে ক্বোরআন-ই করীম ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শিরোনামে এবং হাদীস শরীফ ‘খাতামুল আম্বিয়া’, ‘আখেরুল আম্বিয়া’ এবং ‘লা-নাবিয়্যা বা’দী’ শিরোনামে বর্ণনা করেছে। প্রকাশ থাকে যে, এ শিরোনামগুলো প্রথমোক্ত শিরোনামের পরিপন্থী নয়; বরং সেটার সমর্থক।
হযরত শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী ক্বুদ্দিসা র্সিরুহুল আযীয একথা বুঝিয়েছেন যে, নুবূয়ত তো খতম হয়ে গেছে; কিন্তু নুবূয়তের কিছু অংশ, কিছু গুণ ও কিছু প্রভাব, মুবাশ্শিরাত অবশিষ্ট রয়েছে। সুতরাং শায়খ মুহি উদ্দীন ক্বুদ্দিসা সিররুহু তাঁর ‘ফুতূহাত’ শরীফে লিখেছেন-
اَخْبَرَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنَّ الرُّؤْيَا جُزْءٌ مِنْ اَجْزَاءِ النُّبُوَّةِ فَقَدْ بَقِىَ لِلنَّاسِ فِى النُّبُوَّةِ هذَا وَمَعَ هذَا لاَ يُطْلَقُ اِسْمُ النُّبُوَّةِ وَلاَ النَّبِىُّ اِلَّاَعَلَى الْمُشَرِّعِ خَاصَّةً فَحُجِزَ هذَا الْاِسْمُ لِخُصُوْصِ وَصْفٍ مُعَيَّنٍ فِى النُّبُوَّةِ
[فتوحات : جلد : ২: صفحه ৪৯০] অর্থ: রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, সত্য স্বপ্ন নুবূয়তের অংশগুলোর মধ্যে একটি অংশ। সুতরাং নিঃসন্দেহে লোকজনের জন্য এ অংশই বাকী রয়ে গেছে; কিন্তু এতদসত্ত্বেও ‘নুবূয়ত’ ও ‘নবী’ শব্দের ব্যবহার ‘মুশাররি’ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে শরীয়তের বিধানাবালী আনয়নকারী ব্যতীত অন্য কারো উপর হতে পারে না। এ নামকে নুবূয়তের ক্ষেত্রে কোন বিশেষ গুণের র্ভিত্তিতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
এ-ই শায়খ ইবনে আরবী ক্বুদ্দিসা সিররুহুল আযীয অন্য এক স্থানে বলেছেন-
فَمَا تُطْلَقُ النُّبُوَّةُ اِلاَّ لِمَنِ اتَّصَفَ بِالْمَجْمُوْعِ فَذلِكَ النَّبِىُّ وَتِلْكَ النُّبُوَّةُ الَّتِىْ حُجِزَتْ عَلَيْنَا وَانْقَطَعَتْ فَاِنَّ مِنْ جُمْلَتِهَا التَّشْرِيْعُ بِالْوَحْى الْمَلَكِىِّ وَذلِكَ لاَ يَكُوْنُ اِلاَّ لِلنَّبِىِّ خَاصَّةً ـ [فتوحات : جلد سوم : صفحه ৫৬৮] অর্থ: নবী শব্দটি তখনই প্রযোজ্য হতে পারে, যখন কেউ নুবূয়তের সমস্ত অংশ দ্বারা গুণান্বিত হন। সুতরাং তেমনি ‘নবী’ এবং ‘নুবূয়ত’, যা তার সমস্ত অংশের ধারক হয়, আমাদের জন্য, (অর্থাৎ ওলীগণের জন্যও) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেটার ধারা সমাপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণে নুবূয়ত হচ্ছে সেটার সমাস্ত অংশ সহকারে শরীয়তসম্মত বিধানাবলীই; যা ফেরেশতা কর্তৃক আনীত ‘ওহী’ থেকে পাওয়া যায়। আর এ বিষয়টি নবীর সাথেই খাস; অন্য কারো জন্য হতে পারে না। [ফুতূহাত:৩য় খন্ড:পৃ.৪৬৮] হযরত শায়খ ইবনুল আরবী ক্বুদ্দিসা সিররুহু অন্য এক স্থানে বলেছেন, ‘‘এর উদাহরণ হচ্ছে তেমনি, যেমন হুযূর পুরনুর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
اِذَا هَلَكَ كِسْرى فَلاَ كِسْرى بَعْدَه وَاِذَا هَلَكَ قَيْصَرُ فَلاَ قَيْصَرَ بَعْدَه –[اليواقيت والجواهير : جلد دوم : صفحه ـ ৩৯] অর্থ: যখন ইরানের বাদশাহ্ কিসরা মারা যাবে, তারপরে আর কোন কিসরা হবে না, আর যখন রোমের বাদশাহ্ কায়সার মারা যাবে, তার পরে আর কোন কায়সার হবে না। [আল ইয়াওয়াক্বীত ওয়াল জাওয়াহীর: ২য় খন্ড, পৃ. ৩৯] সুতরাং যেভাবে কিসরা ও ক্বায়সার মারা যাওয়ার পর ক্বায়সার ও কিসরার নাম শেষ হয়ে গেছে; কিন্তু পারস্য ও রোম সা¤্রাজ্য মওজূদ রয়েছে, তেমনি আরব ও অনারবের বাদশাহ্ হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্য ‘নবূয়ত’ ও ‘নবী’ নামও উঠে গেছে; কিন্তু নুবূয়তের কিছু অংশ মুসলমানদের মধ্যে অবশিষ্ট রয়ে গেছে; আর তাও হচ্ছে শুধু ‘মুবাশশিরাত’ (উত্তম স্বপ্ন), ক্বোরআন, হাদীস ও গুণাবলী।
‘শায়খ’-এর বাণীর সারকথা
হযরত শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনে আরবী ক্বুদ্দিসা সিররুহুর কথা বা বাণীর সারকথা হচ্ছে- ‘নুবূয়ত’ তো খতম হয়ে গেছে, অবশ্য নুবূয়তের কিছু অংশ, গুণাবলী ও মুবাশশিরাত অবশিষ্ট রয়েছে, যেমন হাদীস শরীফ-ذَهَبَتِ النُّبُوَّةُ وَبَقِيَتِ الْمُبَشِّرَاتُ (নুবূয়ত খতম হয়ে গেছে, মুবাশশিরাত বাকী আছে) থেকে সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পাচ্ছে যে, ‘নবী’ ও ‘নুবূয়ত’-এ শব্দযুগলের ব্যবহার ততক্ষণ পর্যন্ত হতে পারে না, যতক্ষণ না নুবূয়তের সমস্ত অংশ, যেগুলোর মধ্যে শরীয়তের বিধানাবলী ফেরেশতার মাধ্যমে আসা ওহীও সামিল রয়েছে, পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাবে। আর শরীয়তের বিধানাবলী ফেরেশতার ওহী দ্বারা ‘নবী’ ও ‘নুবূয়ত’-এর মর্যাদার জন্য আবশ্যকীয়। এ ধরনের শরীয়তের বিধানাবলী ছাড়া নুবূয়ত পাওয়া যেতে পারে না; বস্তুত: শায়খ-ই আকবার (হযরত ইবনুল আরবী)-এর বক্তব্য দ্বারা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর অবতরণের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সাইয়্যেদুনা হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম যদিও অবতরণের পর নবী থাকবেন; কিন্তু তিনি তখন শরীয়ত বিশিষ্ট নবী হবেন না। অর্থাৎ তাঁর পূর্ববর্তী শরীয়ত অনুসারে তিনি আমলকারী হবেন না, বরং তিনি ‘শরীয়তে মুহাম্মদিয়াহ’ (হযরত মুহাম্মদ মোস্তফার শরীয়ত)-এর অনুসারী হবেন।
এতদ্ব্যতীত, যখন শত শত ‘নাস’ বা (ক্বোরআনী দলীল) ও বরকতময় হাদীস এবং সাহাবা-ই কেরামের বাণী, তাবে‘ঈদের বাণী আর শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের সমস্ত আলিমের স্পষ্ট বর্ণনাদি দ্বারা একথা প্রমাণিত হলো যে, ‘খতমে নুবূয়ত’ ‘উম্মতে মুহাম্মাদিয়াহ্’ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর ইজমা’ বিশিষ্ট আক্বীদা, আর খোদ্ শায়খ-ই আকবার ক্বুদ্দিসা র্সিরুহুর অগণিত বর্ণনা তাঁর ‘ফুসূসুল হিকাম’ ও ‘ফুতূহাত-ই রব্বানিয়াহ্’য় এ মর্মে মওজূদ রয়েছে যে, ‘নুবূয়ত’ শাহানশাহে দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর খতম হয়ে গেছে। আর তিনিই সর্বশেষ নবী। সুতরাং এসব সুস্পষ্ট বর্ণনা সত্ত্বেও শায়খ ইবনে আরবীর একটি ‘মুজমাল’ (সংক্ষিপ্ত) ইবারত পেশ করা এবং খতমে নুবূয়ত সম্পর্কে শায়খের সুস্পষ্ট ইবারতকে উপেক্ষা করা, শরীয়তের নাস (দলীল)গুলো এবং ‘ইজমা’-ই উম্মতের বিপরীত পথ বের করা কোন ধরনের দ্বীন ও যুক্তি হলো? আল্লাহ্ হক্ব বুঝা এবং তদনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন। আ-মী-ন।
তদুপরি, হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর পর নুবূয়তকে তাঁর আওলাদের সাথে খাস করে দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন- وَجَعَلْنَا فِىْ ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ
(এবং আমি তার বংশধরদের মধ্যে নুবূয়ত ও কিতাব নির্দ্ধারণ করে রেখেছি। [২৯:২৭, কানযুল ঈমান] সুতরাং মির্যা ক্বাদিয়ানী নবী নয়; কেননা সে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর বংশধর নয়। [তাফসীর-ই নুরুল ইরফান] এ আয়াত দ্বারা বুঝা গেলো যে, হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর পর যত নবী হয়েছেন সবই তাঁর বংশ থেকে হয়েছেন। [তাফসীর-ই খাযাইনুল ইরফান] অতএব, মির্যা ক্বাদিয়ানী’ যে নবী নয়, বরং নুবূয়তের ভন্ড দাবীদার তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, সে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর বংশধর না হওয়াও একথার অকাট্য প্রমাণ। সে এমন জঘন্য দাবীটি করে নিরেট কাফির, মুরতাদ্দ্ ও চির জাহান্নামী হয়েছে, এতে সন্দেহ কিসের? সুতরাং তার অনুসারীরা এবং তাকে যারা নবী বলে বিশ্বাস করে তারাও কাফির, মুরতাদ্দ এবং নির্ঘাত জাহান্নামী।
আল্লাহ্ তা‘আলা এমন জঘন্য ফির্ক্বা থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করুন। আ-মী-ন। বিরহুমতে খাতামিন্নবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম।
—০—