খতমে নুবূয়ত ক্বোরআন মজীদের আলোকে

0

খতমে নুবূয়ত ক্বোরআন মজীদের আলোকে
।। এক।।
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَ لٰكِنْ رَّسُوْلَ اللّٰهِ وَ خَاتَمَ النَّبِیّٖنَؕ-
وَ كَانَ اللّٰهُ بِكُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمًا۠ (۴۰)
তরজমাঃ মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নন; হ্যাঁ, আল্লাহর রসূল হন এবং সমস্ত নবীর মধ্যে সর্বশেষ। আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা সব কিছু জানেন। [সূরা আহযাব: আয়াত-৪০, কানযুল ঈমান]
আয়াতের শানে নুযূল
সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ ইবনে হারিসাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, যিনি আসলে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন, শৈশবে কেউ তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং গোলাম বানিয়ে তাঁকে মক্কা মুকাররামার বাজারে বিক্রি করে দেয়।
হযরত সাইয়্যেদাহ্ খদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা হযরত যায়দকে কিনে নিলেন এবং কিছুদিন পর হুযূর সাইয়্যেদ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দান করে দিলেন। যখন সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সাবালক হলেন এবং ব্যবসার কাজে সিরিয়া গেলেন এবং নিজের পিতৃপুরুষদের ভূ-খন্ড অতিক্রম করছিলেন, তখন তাঁর নিকটাত্মীয়রা তাঁকে চিনতে পারলো। যখন তারা জানতে পারলো যে, তিনি হযরত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর গোলাম (ক্রীতদাস) হয়ে আছেন, তখন তাঁর পিতা, চাচা ও ভাই হুযূর সাইয়্যেদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে হাযির হলো। আর আরয করলো, ‘‘হুযূর, আমাদের থেকে কিছু বিনিময় মূল্য নিয়ে যায়দকে আমাদের সাথে যেতে দিন!’’
হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘বিনিময় মূল্যের তো কোন কথা নেই, অবশ্য আমি তাকে ইখতিয়ার দিচ্ছি, যদি সে চায় তবে তোমাদের সাথে চলে যেতে পারে আর যদি চায়, তবে আমার সাথে থেকে যেতে পারবে।’’
এ এরশাদ মুবারক শুনে হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নিকটাত্মীয়রা খুব খুশী হলো। আর বলতে লাগলো-
جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا لَقَدْ اَحْسَنْتَ يَارَسُوْلَ اللهِ
(আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন! আপনি আমাদের বড় উপকার করেছেন।)
তখন বিশ্বকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে ডেকে বললেন, ‘‘এরা হলো তোমার পিতা, চাচা ও সহোদর (ভাই)। এখন তোমার মর্জি! তাদের সাথে চলে যাও অথবা আমার সাথে থেকে যাও!’’
সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরয করলেন, ‘‘এয়া রাসূলাল্লাহ্! (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়কা ওয়াসাল্লাম) আমি আমার আক্বা (মুনিব) রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ছেড়ে আমার পিতা, চাচা ও সহোদর (ভাই)-এর সাথে চলে যাওয়া পছন্দ করছি না। কারণ, সরকার-ই দু’ আলম আমার বাপ, চাচা ও ভাই অপেক্ষা বেশী ¯েœহপরায়ণ ও দয়াবান।’’
এ কথা শুনে রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে আযাদ করে দিলেন এবং নিজের পালকপুত্র করে নিলেন। আর লোকেরাও তাঁকে ‘যায়দ ইবনে মুহাম্মদ’ বলতে লাগলো। এ প্রসঙ্গে এর পরবর্তী আয়াত শরীফ নাযিল হলো।
[তাফসীর-ই দুররে মানসূর: ৫ম খন্ড: ১৮১পৃ.] وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَآءَكُمْ أَبْنَآءَكُمْ ط ذٰلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ ط وَاللهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِى السَّبِيلَ ড় اُدْعُوْهُمْ لِاٰبَآئِهِمْ هُوَ اَقْسَطُ عِنْدَ اللهِ ج
তরজমাঃ আর তোমাদের পোষ্য পুত্রদেরকে তিনি (আল্লাহ্) তোমাদের পুত্র করেননি। এতো তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহ্ সত্য বলেন এবং তিনিই সৎ পথ দেখান। তাদেরকে তাদের প্রকৃত পিতারই বলে ডাকো। এটা আল্লাহর নিকট বেশী ঠিক। [সূরা আহযাব: আয়াত, ৪-৫, কান্যুল ঈমান] এ আয়াত শরীফ নাযিল হবার পর সাহাবা-ই কেরাম হযরত যায়দকে ‘যায়দ ইবনে মুহাম্মদ’ বলা পরিহার করলেন এবং যায়দ ইবনে হারিসাহ্ বলতে আরম্ভ করলেন। এরপর তাজদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বিবাহ্ আপন ফুফাত বোন সাইয়্যেদাহ্ হযরত যয়নাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার সাথে করিয়ে দিলেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে মিল-মুহাব্বতের কোন পন্থা সৃষ্টি হয়নি। শেষ পর্যন্ত সাইয়্যেদুনা যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সাইয়্যেদাহ্ হযরত যয়নাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে তালাক্ব দিয়ে দিলেন। সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁকে তালাক্ব দিয়ে দেওয়ার পর সরওয়ার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে সাইয়্যেদাহ্ হযরত যয়নাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে বিবাহ্ করে নিলেন।
এ দিকে হুযূর সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নাবকে বিবাহ্ করলেন, অন্যদিকে মূর্খ ও মুনাফিক্বরা সমালোচনা আরম্ভ করে দিলো- হুযূর সরওয়ার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আপন পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ্ করেছেন। তখন সেটার খন্ডনে নি¤œলিখিত আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে-
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِّجَالِكُمْ وَلٰكِنْ رَّسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ط وَكَانَ اللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا [سوره احزاب : ايت :৪০] তরজমাঃ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন। হ্যাঁ, তিনি আল্লাহ্ তা‘বারাকা ওয়া তা‘আলার রসূল হন এবং তিনি সমস্ত রসূলের পর এসেছেন (সর্বশেষ নবী হয়ে)। আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা সব কিছু জানেন। [সূরা আহযাব: আয়াত-৪০] মোটকথা, এ আয়াত শরীফে মুনাফিক্বদের সমালোচনার জবাব দেওয়া হয়েছে, যার সারকথা হচ্ছে- আমার মাহবূব, মাদানী চাঁদ, মক্কী সূর্য- সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কোন পুরুষের দৈহিক পিতা নন, বরং রূহানী পিতা। কোন এক বা দু’জনের নন; বরং সমগ্র বিশ্বের রূহানী পিতা। আর বিবাহ্ হারাম হওয়া নির্ভর করে দৈহিক পিতা হবার উপর; রূহানী পিতা হবার উপর নয়। রূহানী পিতা হবার উপর মহত্ব ও ¯েœহের বিধানাবলী বর্তায়। যেমন- ওস্তাদ ও মুর্শিদ রূহানী পিতা, আর শাগরিদ, মুরীদ হলো রূহানী সন্তান; কিন্তু বিবাহ্ হারাম হবার বিধানাবলী এখানে জরুরী ও কার্যকর হয় না; এখন দেখুন لٰكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ (কিন্তু আল্লাহর রসূল হন) কেন এরশাদ করলেন? এর জবাব এ যে, ‘ইলমে নাহ্ভ’-এর ইমামগণ বলেছেন, لكن (লা-কিন) শব্দটি আসে استدراك (প্রতিকার)-এর জন্য। অর্থাৎ পূর্ববর্তী বাক্যে কোন অস্পষ্টতা সৃষ্টি হলে لكن (লা-কিন) শব্দ দ্বারা তা দূরীভূত করা হয়। বস্তুতঃ এখানেও অনুরূপ। পূর্ববর্তী বাক্য مَاكَانَ مُحَمَّدٌ اَبَا اَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ (হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন)-এর মধ্যে পিতা হওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। আর পিতা হওয়ার অস্বীকৃতি থেকে এ অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়েছে যে, হয়তো যখন ‘পিতা হওয়া’র বিষয়টি অস্বীকার করা হলো, তখন পিতৃসূলভ ¯েœহকেও, যা পিতা হওয়ার অনিবার্য বৈশিষ্ট্য, অস্বীকার করা হয়ে গেছে।’ সুতরাং لكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ (কিন্তু তিনি আল্লাহর রসূল) দ্বারা ওই সন্দেহ দূরীভূত করে দিয়েছেন। তাও এভাবে যে, আমার হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর, তোমাদের সাথে যদিও দৈহিকভাবে পিতা হবার সম্পর্ক নেই, কিন্তু নুবূয়ত ও রিসালতের সম্পর্ক তো অবশ্যই রয়েছে। বস্তুতঃ রসূল আপন উম্মতের রূহানী পিতা হয়ে থাকেন; যিনি ¯েœহ ও বদান্যতায় দৈহিক পিতা থেকে বহুগুণ বেশী হয়ে থাকেন।
এবার দেখুন, ‘খাতামুন্নবিয়্যীন’ শব্দযুগল এরশাদ করার হিকমত। যখন একথা প্রমাণিত হলো যে, সরওয়ার-ই কাইনাত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদের রূহানী পিতা, তখন এ সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে যে, পুত্র যেহেতু পিতার ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী) হয়, সেহেতু উম্মতের মধ্যে কেউ হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুবূয়তের ওয়ারিস হয়ে নবী হয়ে যেতে পারে কিনা? এ কারণে আল্লাহ্ জাল্লা মাজদুহূ ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ উল্লেখ করে সন্দেহের অপনোদন করেছেন। অর্থাৎ যদিও মুসলিম উম্মাহ্ আমার মাহবূবের রূহানী সন্তান, কিন্তু নুবূয়তের পদ মর্যাদার ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হবে না। কেননা, নুবূয়তের পদ মর্যাদার ধারা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে খতম হয়ে গেছে। উম্মত থেকে কেউই ক্বিয়ামত পর্যন্ত এ পদ মর্যাদার ওয়ারিস হবে না।
নবূয়ত ও রিসালত আমার মাহবূবের উপর সমাপ্ত হয়ে গেছে। ক্বিয়ামত পর্যন্ত এ সর্বোচ্চ পদ মর্যাদা আর কাউকেও দেওয়া হবে না। আর এ পদ মর্যাদা অন্য কেউ কিভাবে পেতে পারে, যখন হুযূর-ই আক্রামের শরীয়ত পূর্ণাঙ্গভাবে মওজূদ রয়েছে। আর তিনি ও আপন উম্মতের নিকট হাযির-নাযির। সুতরাং তিনি মওজূদ থাকাবস্থায় কেউ নবূয়তের ভন্ড দাবীদার হওয়া তার চূড়ান্ত নির্লজ্জতা ও ইতরতাই।
خاتم (খাতাম) শব্দের বিশ্লেষণ
خَاتِمَ দু’ভাবে পড়া হয়েছে, ১. ت (তা) বর্ণে যবর সহকারে এবং ২. ت (তা)-তে যের সহকারে। শব্দটির মূল হচ্ছে خَتْمٌ (খাতমুন)। এর অর্থ ‘খতম করা’ অথবা ‘মোহর লাগানো’। আর মোহর লাগানোর অর্থ হয়-কোন জিনিষকে এমনভাবে বন্ধ করা যেন ভিতরের জিনিষ বাইরে আসতে না পারে এবং বাইরের জিনিষও ভিতরে যেতে না পারে। যেমন- আল্লাহ্ তা‘আলার এরশাদ-خَتَمَ اللهُ عَلى قُلُوْبِهِمْ (আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের হৃদয়গুলোর উপর মোহর ছেপে দিয়েছেন), ফলে তাদের কুফর ভিতরে আটকে গেছে। এখন তা ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। আর বাইরে থেকেও কোন হিদায়ত ভিতরে যেতে পারে না। অনুরূপ, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন- يُسْقُوْنَ مِنْ رَحِيْقٍ مَّخْتُوْمٍ অর্থাৎ জান্নাতবাসীদেরকে যে পানীয় পান করানো হবে, সেটার মুখে মোহর লাগানো থাকবে। ফলে ভিতরের খুশবু ও মজা বাইরে আসতে পারবেনা এবং বাইরের কোন জিনিষ সেটার ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না, যাতে সেটার মজা কমে যায়।
দিওয়ান-ই মুতানাব্বীতে আছে-
اَرُوْحُ وَقَدْ خَتَمْتَ عَلى فُوَادِىْ بِحُبِّكَ اَنْ يَّحُلَّ بِه سِوَاكَ
অর্থঃ আমি এমতাবস্থায় চলি যে, তুমি আমার হৃদয়ের উপর তোমার ভালবাসার মোহর এমনভাবে ছেপে দিয়েছো যে, ভিতর থেকে তো তোমার ভালবাসা বের হতেই পারে না, আর বাইরে থেকেও অন্য কারো ভালবাসা ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না।
সুতরাং যদি خَاتِمٌ (ت তে যের সহকারে) পড়া হয়, তবে অর্থ হবে- হুযূর পুরনূর শাফি‘ই ইয়াউমিন নুশূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র স্বত্ত্বা সম্মানিত নবীগণের আগমনের ধারা সমাপ্তকারী।
আর যদি خَاتَمٌ (ت যে যবর সহকারে) পড়া হয়, তবে অর্থ হবে- সাইয়্যেদুল মুরসালীন সালাওয়াতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ওয়া সালা-মুহূ হলেন নবীগণের মোহর। অর্থাৎ তাঁর পরে কেউ নবীগণের এ পরম্পরায় প্রবেশ করতে পারবে না। আর যেসব নবী আলায়হিমুস্ সালাম তাঁর পূর্বে নুবূয়তের ধারা বা পরম্পরায় প্রবেশ করেছেন, তারা এ ধারা থেকে বেরও হতে পারবেন না।
মোটকথা, এ দু’ প্রকারে পাঠ করার সারকথা হলো একটি। তা হচ্ছে- সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নবী নতুনভাবে আসবে না।
‘রসূল’ ও ‘নবী’র মধ্যে পার্থক্য
‘জমহুর’ (প্রায় সব) আলিমের অভিমত হচ্ছে- রসূল ও নবীর মধ্যে عام خاص مطلق -এর সম্পর্ক বিদ্যমান। ‘নবী’ আম এবং ‘রসূল’ খাস। কারণ রসূল হবার জন্য নুবূয়ত ছাড়াও নতুন কিতাব ও নতুন শরীয়ত থাকা জরুরি; কিন্তু নবীর জন্য নতুন কিতাব ও নতুন শরীয়ত থাকা জরুরী নয়। সুতরাং প্রত্যেক রসূল নবী হন আর প্রত্যেক নবী রসূল হওয়াও জরুরী নয়।
এখন ‘আল্লাহর কালাম’-এর একটু মু’জিযা দেখুন! আয়াত শরীফে خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ এরশাদ হয়েছে, خَاتَمُ الْمُرْسَلِيْنَ এরশাদ হয়নি; অথচ প্রকাশ্য বক্তব্যের দাবী ছিলো خَاتَمُ الْمُرْسَلِيْنَ (খাতামুন্ মুরসালীন) বলা। এ জন্য প্রথমে وَلكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ (কিন্তু আল্লাহর রসূল) উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং এর উপযোগী ছিলো خَاتَمُ الْمُرْسَلِيْنَ; কিন্তু খাস শব্দ رَسُوْل (রসূল)-এর পরিবর্তে আম শব্দ نبى (নবী) উল্লেখ করেছেন। এরশাদ করেছেন خَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ (সর্বশেষ নবী) যাতে একথা প্রমাণিত হয় যে, তিনি শর্তহীনভাবে সমস্ত সম্মানিত নবী আলায়হিমুস্ সালাম-এর আগমনের ধারা সমাপ্তকারী। আর তাঁর নূবুয়তের ধারা সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই স্বতন্ত্র নবী হোক কিংবা অধীনস্থ নবী হোক, যিল্লী নবী হোক কিংবা বরূযী নবী হোক, প্রত্যেক প্রকারের নুবূয়তের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আর যখন নুবূয়ত খতম হয়ে গেছে, তখন তো রিসালতও খতম হয়ে যাওয়া আরো উত্তমরূপে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ যখন ‘আম’কে অস্বীকার করা হয়, তখন ‘খাস’-এর অস্বীকার অনিবার্য হয়ে যায়।
সুতরাং মাদানী চাঁদ মাহবূবে কিবরিয়া সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যেমন ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’, তেমনি ‘খাতামুল মুরসালীন’ও। (তিনি যেমন সর্বশেষ নবী, তেমনি সর্বশেষ রসূলও)।
এ অর্থ সম্মানিত তাফসীরকারকগণও বলেছেন। যেমন- ‘তাফসীর-ই ইবনে কাসীর’ এ বর্ণনা করা হয়েছে-
فَهذِهِ الْايَةُ نَصٌّ فِىْ اَنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدَه وَاِذَا كَانَ لاَ نَبِىَّ بَعْدَه فَلاَ رَسُوْلَ بَعْدَه بِالطَّرِيْقِ الْاُوْلى وَالْاَحْرٰى لِاَنَّ مَقَامَ الرِّسَالَةِ اَخَصُّ مِنْ مَّقَامِ النُّبُوَّةِ ـ
অর্থঃ এ আয়াত এ মর্মে প্রকাশ্য দলীল যে, হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নবী আসবে না। যখন তাঁর পরে কোন নবী হতে পারে না, তখন আরো উত্তমভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর পরে কোন রসূলও হতে পারে না। কারণ, রিসালতের স্তর নবূয়তের স্তর অপেক্ষা অধিকতর খাস।
অনুরূপ, ‘তাফসীর-ই খাযিন’-এ আছে- ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ হচ্ছে- خَتَمَ اللهُ بِهِ النُّبُّوَّةَ فَلاَ نُبُوَّةَ بَعْدَه অর্থাৎ আল্লাহ্ জাল্লা শানুহূ আপন হাবীব-ই পাক, সাহেবে লাউলাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাথে নুবূয়ত খতম করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর পর নুবূয়ত আর নেই। কেউ নবী হতে পারবে না।
اَلنَّبِيِّيْنَ Ñএর الف لام -এর বিশ্লেষণ
নাহ্ভ (আরবী ব্যাকরণ) বেত্তাগণ লিখেছেন- الف لام চার প্রকার-১. জিনসী, ২. ইস্তিগরাক্বী, ৩. আহদে খারেজী ও ৪. আহদে যেহনী।
اَلنَّبِيِّيْنَ -এর মধ্যে যে الف لام রয়েছে, তা استغراقى (ইস্তিগরাক্বী)। কারণ যে الف لام – বহুবচনের উপর আসে তা ‘ইস্তিগরাক্বী’ হয়। এটা আরবী ভাষাবিদগণের অভিমত। [কুল্লিয়াত-ই আবুল বাক্বা: পৃ. ৫৬২] তাছাড়া, আরবী ভাষায় স্বল্প জ্ঞান রাখে এমন ব্যক্তিও জানে যে, اَلنَّبِيّيْنَ -এর উপর الف لام টি عهدى হতে পারে না। যদি তা হয়, তবে অর্থ হবে সরওয়ার-ই দু’ জাহান সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট ও অনুমিত নবীগণের ধারা সমাপ্তকারী; সমস্ত নবীর ধারা সমাপ্তকারী নন। একথাও প্রকাশ পাবে যে, এমতাবস্থায় ইমামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষত্বটুকু অবশিষ্ট থাকে না। কারণ এ অর্থের ভিত্তিতে যে কোন নবী ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন; ‘আখেরুন্ নবিয়্যীন’ হতে পারবেন; কাজেই, তখন হুযূর সরওয়ার-ই কা-ইনাত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কি বিশেষত্ব বাকী থাকছে?
استغراق (ইস্তিগরাক্ব)-এর প্রকারভেদ
ইস্তিগরাক্ব আবার দু’ প্রকার-১. হাক্বীক্বী এবং ২. ইদ্বাফী বা ওরফী। এখানে خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ -এ ইদ্বাফী কিংবা ওরফী হতে পারে না। কারণ, ইস্তিগরাক্বে ওরফী মূলতঃ মাজায বা রূপকই। মাজায বা রূপক সেখানেই হয়, যেখানে হাক্বীক্বী হওয়া অসম্ভব হয়।
এখানে ‘ইস্তিগরাক্বে হাক্বীক্বী’র অর্থ গ্রহণে কোন যৌক্তিক বাধাও নেই; বরং বেশী উপকারীই। কেননা, এটা প্রশংসার স্থান। আর ‘ইস্তিগরাক্ব-ই হাক্বীক্বী’ প্রশংসার স্থানে বেশী উপযোগী। বস্তুতঃ ‘ইস্তিগরাক্ব-ই ওরফী’ হলে তাজেদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষত্ব বাকী থাকে না।
সুতরাং বুঝা গেলো যে, এখানে ‘ইস্তিগরাক্ব-ই হাক্বীক্বী’ই প্রযোজ্য। এখন আয়াত শরীফটির অর্থ দাঁড়ায় তিনি (হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) নুবূয়তের সমস্ত ব্যক্তি-স্বত্ত্বার আগমনের ধারাকেই সমাপ্তকারী। চাই স্বতন্ত্র হোক কিংবা অধিনস্থ হোক; হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন প্রকারের কোন নবী আসবে না। সুতরাং এ আয়াত শরীফ দ্বারা সকল প্রকারের নবীর দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে আর এর বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা বা অবকাশ বাকী থাকেনি। কারণ সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হলেন স্বতন্ত্র নুবূয়তের ধারার সমাপ্তকারীই।
—০—
।। দুই।।
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ
نِعْمَتِىْ وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ۚ [سوره مائده : ايت ৩] তরজমাঃ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম। আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন মনোনীত করলাম। [সূরা মা-ইদাহ্: আয়াত-৩, কানযুল ঈমান]
দ্বীনকে পরিপূর্ণ করা
পূর্ববর্তী কিতাবগুলো ও আসমানী সহীফাগুলোতে সংশ্লিষ্ট দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার উল্লেখ মোটেই করা হয়নি। কেননা, নুবূয়তের ধারা জারী বা অব্যাহত ছিলো। যেমন, হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম ঘোষণা করেছিলেন-
وَمُبَشِّرًا م بِرَسُوْلٍ يَأْتِىْ مِنْ بَعْدِى اسْمُه اَحْمَدُ
তরজমাঃ আমি এক মহান রসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আসবেন, তাঁর নাম আহমদ। [সূরা সফ: আয়াত-৬] নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কোন নবী তাঁর দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে মর্মে সুসংবাদ পাননি। শুধু শাহে কাওন ও মকান সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতময় স্বত্ত্বার জন্যই এ সুসংবাদ নির্দিষ্ট ছিলো। সুতরাং বিদায় হজ্জের সময় আরাফাতের ময়দানে আরফাহ্ দিবসে জুমার দিনে আসরের সময় লক্ষাধিক সাহাবা-ই কেরামের মুবারক জমায়েতে তাঁদের সামনে আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে দ্বীনের পরিপূর্ণতার এ ঘোষণা দেওয়া হয়-
اَلْیَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِیْنَكُمْ وَ اَتْمَمْتُ عَلَیْكُمْ نِعْمَتِیْ
وَ رَضِیْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِیْنًاؕ-
তরজমাঃ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নি’মাতকেই পূর্ণাঙ্গ করলাম। আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন (হিসেবে) পছন্দ করলাম। [সূরা মা-ইদাহ্: আয়াত-৩]
আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা
এ আয়াত শরীফের মর্মার্থ এ যে, আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করছেন, আজকের দিনে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে কামিল ও মুকাম্মাল করে দিয়েছি। আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনী ও দুনিয়াবী প্রয়োজনে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান দান করেছি, যা’তে জ্ঞানগত, কর্মগত, রাজনীতিগত, নাগরিক, আক্বাইদগত, আমলগত, হালাল ও হারামের বিধানাবলী রয়েছে। এমন কোন বিধান তাতে বাদ পড়েনি, যা তাতে প্রকাশ্যভাবে কিংবা ইঙ্গিতে বর্ণনা করেননি।
আর যে সব জ্ঞান-বিজ্ঞান পূর্ববর্তী দ্বীনগুলোতে মওজুদ ছিলো, ওই সবের সারবস্তু এ মজবূত দ্বীনে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেসব বস্তু বা বিষয় প্রকাশ্যভাবে বর্ণনা করা উচিৎ ছিলো, সেগুলো প্রকাশ্যভাবে বর্ণনা করেছেন, আর যা ইঙ্গিতে বর্ণনা করা উচিৎ ছিলো, তা ইঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। মোটকথা, কোন বস্তু এমনভাবে রাখা হয়নি, যার প্রয়োজন হয় অথচ বর্ণনা করা হয়নি।
সুতরাং এ মজবূত দ্বীনে না কোন পরিবর্দ্ধন, না কোন মেরামতের অবকাশ আছে, না এতে কোন হ্রাসবৃদ্ধি করা যেতে পারে। এ কারণে দ্বীন-ই মুহাম্মদী (‘আলা সাহিবিহিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম) সমস্ত পূর্ববর্তী ধর্ম অপেক্ষা উত্তম এবং সব ক’টির নাসিখ (রহিতকারী)। এ থেকে এ মাসআলা প্রমাণিত হলো যে, এ দ্বীন সর্বশেষ দ্বীন, এ উম্মত আখেরী উম্মত এবং এ নবী হযরত মুহাম্মদ-ই আরবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী। কেননা, নাসিখ ওটাই হবে, যা আখেরী হবে। সুতরাং ক্বিয়ামত পর্যন্ত দ্বীন-ই মুহাম্মদী (আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম)-এর বাহারই থাকবে। এরপর কোন নতুন দ্বীন আসবেনা, যা সেটাকে মানসূখ (রহিত) করতে পারে।
গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়
যখন এ মজবূত দ্বীন পূর্ণতার শিখরে পৌঁছেছে, এখন এ মর্মে একটু গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন যে, এখন আর কোন পথপ্রদর্শক ও নবীর কি প্রয়োজন আছে? মোটেই না। সুতরাং বে-দ্বীন ক্বাদিয়ানী মির্যাঈদের জিজ্ঞাসা করুন, যদি হুযূর সরকারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীকে নবী বলে মানা হয়; তবে ওই ভন্ড নবী কি করবে ও কি বলবে? কারণ, দ্বীন ইসলাম তো পরিপূর্ণতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে; প্রয়োজন তো কিছুরই অবশিষ্ট থাকেনি।
অসম্ভব কল্পনায়, যদি সে নবী হয়, তবে তা হবে নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয় এবং সে হবে একেবারে অকেজো ও অপদার্থ। বস্তুতঃ প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি জানে যে, অনর্থক ও অকেজো লোক, যার কোন প্রয়োজন নেই, সে কখনো নবী হতে পারে না।
হাফেয ইবনে কাসীর রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এ আয়াতে পাকের তাফসীরে লিখেছেন-
هذَا اَكْبَرُ نِعَمِ اللهِ تَعَالى عَلى هذِهِ الْاُمَّةِ حَيْثُ اَكْمَلَ اللهُ تَعَالى لَهُمْ دِيْنَهُمْ فَلاَ يَحْتَاجُوْنَ اِلى دِيْنِ غَيْرِه وَلاَ اِلى نَبِىٍّ غَيْرِ نَبِيِّهِمْ صَلوَاتُ اللهِ وَسَلاَمُه عَلَيْهِ وَلِهذَا جَعَلَهُ اللهُ تَعَالى خَاتَمَ الْاَنْبِيَآءِ وَبَعَثَه اِلَى الْاِنْسِ وَالْجِنِّ ـ[تفسير ابن كثير : جلد ثانى : صفحه ১২] অর্থঃ আল্লাহ্ তা‘আলার, এ উম্মতের উপর সর্বাপেক্ষা বড় নি’মাত হচ্ছে- তিনি তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে কামিল (পূর্ণাঙ্গ) করে দিয়েছেন। সুতরাং তারা না অন্য কোন দ্বীনের, না তাদের নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কোন নবীর মুখাপেক্ষী। এ জন্যই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা হুযূর-ই পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘খাতামুল আম্বিয়া’ (সর্বশেষ নবী) করেছেন এবং তাঁকে সকল মানুষ ও সকল জ্বিনের প্রতি নবীরূপে প্রেরণ করেছেন। [তাফসীর-ই ইবনে কাসীর, ২য় খন্ড:পৃ. ১২] এ তাফসীর থেকেও মধ্যাহ্ণ সূর্যের মতো সুষ্পষ্ট হয়েছে যে, দ্বীন-ই মুহাম্মদী (আলা সা-হিবিহিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম) পূর্ণতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে। সুতরাং শাহে আরব ও আজম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কোন নবীর প্রয়োজন বাকী থাকেনি; না আস্ওয়াদ-ই আনাসীর, না মির্যা ক্বাদিয়ানীর, না অন্য কোন আসলীর, না যিল্লীর, না নাফলীর। কারণ, ফখরে দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামই আখেরী নবী। আর কানা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর নুবূয়তের দাবী সম্পূর্ণরূপে বাতিল।
ক্বোরআনের হিফাযত
এ আখেরী কিতাব ক্বোরআন মজীদের পূর্বে যত কিতাব নাযিল হয়েছে, আল্লাহ্ তা‘আলা কোনটার হিফাযত বা সংরক্ষণের যিম্মাহ-ই করম (বদান্যতার দায়িত্ব) নেন নি। এর কারণে প্রত্যেক রসূলের ওফাত শরীফের পর তাঁর কিতাবও হারিয়ে যেতো অথবা তাতে রদ্দ্ বদল হয়ে যেতো; কিন্তু ক্বোরআন-ই করীম যেহেতু আল্লাহ্ তা‘আলার সর্বশেষ কিতাব আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব উদ্দেশ্য ছিলো, সেহেতু আল্লাহ্ তা‘আলা সেটার হিফাযত নিজের বদান্যতার দায়িত্বে নিয়ে নিয়েছেন। আর ঘোষণা করেছেন-
اِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَاِنَّا لَه لَحَافِظُوْنَ
তরজমাঃ আমি ক্বোরআন মজীদ নাযিল করেছি এবং আমি নিজেই সেটার হিফাযতকারী। [সূরা হিজর: আয়াত-৯] এ কারণেই আজ প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ’ বছরের এক দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু ক্বোরআন-ই করীমের প্রত্যেক কলেমা (পদ/শব্দ), প্রত্যেক যের, যবর, পেশ সেভাবেই সংরক্ষিত রয়েছে, যেভাবে সাইয়্যেদুল আনাম খাতামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র মুখ থেকে বের হয়েছিলো। ক্বোরআন-ই করীমের শব্দ শব্দ সংরক্ষিত থাকা তাঁর খতমে নুবূয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। ক্বোরআন মজীদের প্রতিটি আয়াত সংরক্ষিত রয়েছে। সুতরাং ক্বোরআন মজীদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আয়াত খতমে নুবূয়তের প্রমাণ।
সরকার-ই দু’ আলমের পর খলীফা হবেন, নবী হবে না
যেহেতু হুযূর নবী করীম রউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নুবূয়তের দরজা সব সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, সেহেতু হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর তাঁর খলীফা প্রতিনিধিগণ তো এসেছেন ও আসবেন; কিন্তু কোন নবী আসবেনা। আল্লাহ্ তা‘আলা খোদ্ ক্বোরআন মজীদে এরশাদ ফরমাচ্ছেন-
وَعَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِى الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ ـ[سوره نور : ايت : ৫৫] তরজমাঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা ওয়াদা দিয়েছেন তাদেরকে, যারা তোমাদের মধ্যে ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে, অবশ্যই তাদেরকে খিলাফত দান করবেন, যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে খিলাফত দিয়েছেন। [সূরা নূর: আয়াত-৫৫] এ আয়াত শরীফে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু উম্মতে মুহাম্মদিয়াহ্র উপর এক খাস পুরস্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আর ওই পুরস্কার হচ্ছে নুবূয়তের খিলাফত ও প্রতিনিধেত্বেরই, যার প্রকাশ খোলাফা-ই রাশেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম দ্বারা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, খিলাফত মানে প্রতিনিধিত্ব সুতরাং এ আয়াত শরীফে মুসলিম উম্মাহর সাথে নুবূয়তের ওয়াদা করা হয়নি; বরং খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের ওয়াদা করা হয়েছে। (অর্থাৎ খলীফা পাঠানোর ওয়াদা করা হয়েছে, নবী পাঠানোর ওয়াদা করা হয়নি।) বস্তুত: এ মর্মে কোন আয়াত কিংবা হাদীস শরীফ আসেনি যে, খোদা তা‘আলা নবী করীমের পর অন্য কাউকে নুবূয়তও দান করেছেন।
অথচ এ আয়াত শরীফে এ কথা উল্লেখ করার সুযোগ ছিলো, কেননা, আল্লাহ্ জাল্লা জালালুহু নিজের পুরস্কার ও উপকারের বর্ণনা করেছেন। সুতরাং যদি ভবিষ্যতে কাউকে নুবূয়ত প্রদানের ইচ্ছা থাকতো, তবে খিলাফত ও হুকুমতের স্থলে নুবূয়ত ও রিসালতের ওয়াদা করতেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, নুবূয়তের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু খিলাফত অবশিষ্ট রয়েছে।
স্বয়ং খাতামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘নুবূয়ত খতম হয়েছে, খিলাফত বাকী রয়েছে’। দেখুন- ইমাম বোখারী ও ইমাম মুসলিম (শায়খাঈন) সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
كَانَتْ بَنُوْآ اِسْرَائِيْلَ تَسُوْسُهُمُ الْاَنْبِيَآءُ ـ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِىُّ خَلَفَه نَبِىٌّ وَاِنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ وَسَيَكُوْنُ خُلَفَاءَ فَيَكْثُرُوْنَ قَالُوْا فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ فُوْا بَيْعَةَ الْاَوَّلِ فَالْاَوَّلِ اعْطُوْهُمْ حَقَّهُمْ فَاِنَّ اللهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرْعَاهُمْ ـ
[رواه البخارى ومسلم والمشكوة صفحه ـ ৩২০] অর্থঃ বনী ইসরাঈলের রাজনীতি ও ব্যবস্থাপনা খোদ তাদের নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম সম্পন্ন করতেন। যখন কোন নবীর ইনতিক্বাল হতো তখন অন্য নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। নিঃসন্দেহে আমার পর কোন নবী নেই। অবিলম্বে খলীফাগণ নিযুক্ত হবে। (যাঁরা কর্ম ব্যবস্থাপনা করবে।) আর তারা সংখ্যায় অনেক হবে। সাহাবা-ই কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম আজমা‘ঈন আরয করলেন, ‘‘তখন আমাদের জন্য কি হুকুম?’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, প্রথমে প্রথমের বায়‘আত পূর্ণ করো তারপর প্রথমে তাদের হক (আনুগত্য) আদায় করো। নিঃসন্দেহে খোদ্ আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে তাদের প্রজাদের সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। [বোখারী, মুসলিম, মিশকাত, পৃ. ৩২০] এ হাদীস শরীফ থেকে একথা স্পষ্ট হয়েছে যে, শাহে কওন ও মাকান সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নুবূয়ত সমাপ্ত হয়েছে। তাঁর পর কোন নবী আসবে না। অবশ্য খলীফা ও আমীর-উমারা আসবেন। আর প্রত্যেক জ্ঞানী জানেন বনী ইসরাঈলের নবীগণের শরীয়ত স্বতন্ত্র ছিলোনা; বরং তাঁরা হযরত দাঊদ, মূসা এবং হযরত ঈসা আলায়হিমুস্ সালাম-এর শরীয়তের অনুগামী (অনুসারী) ছিলো। অতঃপর সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, বনী ইসরাঈলের নবীগণের উপমা দিয়ে এরশাদ করেছেন,اِنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدِىْ (আমার পর কোন নবী আসবে না।)
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, ফখরে আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন অধিনস্থ, শরীয়তবিহীন ও যিল্লী নবীই আসবে না, যেভাবে বনী ইসরাঈলে নিজস্ব শরীয়তবিহীন নবী তাশরীফ আনতেন।
কিন্তু আফসোস! মির্যাঈরা মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীকে যিল্লী নবী (ছায়া নবী) ইত্যাদি মেনে নিয়ে উক্ত বরকতময় আয়াত ও হাদীস শরীফকে অস্বীকার করছে ইত্যাদি এবং আল্লাহর ক্বহর ও গযবের পাত্র হচ্ছে। আল্লাহ্ তা‘আলা এসব কাফিরকে ঈমান আনার তাওফিক্ব দিন! আ-মী-ন।
—০—
।। তিন।।
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِى الْأَمْرِ مِنْكُمْ ج فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ ط ذٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ড় [سورة النساء : ايت ৫৯] তরজমা: হে ঈমানদারগণ, নির্দেশ মান্য করো আল্লাহর, নির্দেশ মান্য করো রসূলের এবং তাদেরই, যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ ঘটে, তবে সেটাকে আল্লাহ্ ও রসূলের সম্মুখে রুজূ’ করো যদি আল্লাহ্ ও ক্বিয়ামতের উপর ঈমান রাখো। এটা উত্তম এবং এর পরিণাম সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। [সূরা নিসা: আয়াত-৫৯, কানযুল ঈমান]
আল্লাহ্, রসূল ও শাসকের আনুগত্য
উপরোল্লিখিত আয়াত শরীফে তিন সত্ত্বার আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেনঃ ১. মহামহিম রব্বুল ইয্যাতের, ২. রসূলে মু‘আয্যম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এবং ৩. উলিল আমরের।
প্রমাণিত হলো যে, সরওয়ার-ই কা-ইনাত হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর যাঁদের আনুগত্য করা জরুরী, তাঁরা উলিল আমর হবেন, নবী হবেন না।
যদি ধরে নেয়া হয় যে, শাহে আরব ও ‘আজম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নবী আসা জরুরী হতো কিংবা এর অবকাশ থাকতো, তবে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু আগমনকারী কোন নবীর আনুগত্যের হুকুম দিতেন; কিন্তু তেমনটি করেননি।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, ইমামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নবী তাশরীফ আনবে না। আর নুবূয়তের ধারা হুযূর পুরুনূর শাফে’-ই ইয়াউমিন নুশূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর সমাপ্ত হয়ে গেছে।
যদি গোঁয়ার ও আফিমখোর মির্যা ক্বাদিয়ানীকে, অসম্ভব কল্পনায়, নবী বলে মেনে নিয়ে ‘উলিল আমর’-এর মধ্যে গণ্য করে তার আনুগত্যকে জরুরী মনে করা হয়, তবে তা হবে বড় মূর্খতা। এর কয়েকটা কারণ নি¤েœ উল্লেখ করা হলো-
১. এ জন্য যে, সামনে এরশাদ হচ্ছে-فَاِنْ تَنَازَعْتُمْ فِىْ شَيْءٍ (অর্থাৎ যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে ঝগড়া বা বিরোধ পয়দা হয়)। বুঝা গেলো যে, সাধারণ মানুষ ও উলিল আমরের মধ্যেও বিরোধ-ঝগড়া হবে, অথচ কোন নবীর সাথে ঝগড়া ও বিরোধ করা জায়েয বা বৈধ নয়; বরং কুফর। সুতরাং বুঝা গেলো যে, কানা ও আফিমখোর মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী উলিল আমরের মধ্যেও মোটেই সামিল নয়। সুতরাং না সে খোদা, না রসূল, না উলিল আমর হলো। কাজেই তার কথা মানা ওয়াজিব বা জরুরীও নয়।
২. এজন্য যে, উলিল আমর দ্বারাও নির্দেশ অমান্য করা সম্পন্ন হতে পারে। আর অন্য কাউকে নির্দেশ অমান্য করার নির্দেশ দেওয়ার মতো ত্রুটি-বিচ্যুতিও সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে; যখন খোদ্ শাহে কওন ও মাকান সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘উলিল আমর’ সম্পর্কে এরশাদ করেছেন-
اَلسَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيْمَا اَحَبَّ وَكَرِهَ مَالَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَاِذَا اُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ وَلاَ طَاعَةَ ـ
অর্থ: মুসলমান ব্যক্তির উপর তার প্রতিটি পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় বিষয়ে (আপন) ইমামের আনুগত্য করা ওয়াজিব- যতক্ষণ না তাকে (আল্লাহ্ ও রসূলের) নির্দেশ অমান্যের নির্দেশ দেওয়া না হয়। যদি তাকে পাপকার্যের নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন আনুগত্য করা ওয়াজিব বা অপরিহার্য নয়।
যদি গোলাম আহমদকে ‘উলিল আমর’-এর মধ্যে গণ্য বলে মেনে নেওয়া হয় এবং নবীও মেনে নেওয়া হয়, তবে একথা অনিবার্য হয়ে যাবে যে, না‘ঊযুবিল্লাহ্, নবীও নাফরমানী করার হুকুম দিতে পারেন! আর এ অনিবার্য বিষয়টি বাতিল হওয়া সুস্পষ্ট। অবশ্য মির্যায়ীদের জন্য সম্ভব যে, তারা তাদের বানোয়াট (ভন্ড) নবীর জন্য গুনাহ্ সম্পন্ন হওয়াকে অপরিহার্য বলে মেনে নেবে; কিন্তু আমরা মুসলমান। আমাদের এমন পাপী নবীর প্রয়োজন নেই। এমন ভন্ড নবী মির্যাঈদের ভাগ্যেই জুটেছে।
।। চার।।
রসূলে আরবী সর্বশেষ রসূল
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন-
وَإِذْ أَخَذَ اللهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَّحِكْمَةٍ ثُمَّ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِه وَلَتَنْصُرُنَّه ط قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلىٰ ذٰلِكُمْ إِصْرِىْ ط قَالُوا أَقْرَرْنَا ط قَالَ فَاشْهَدُوْا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ ড়فَمَنْ تَوَلّىٰ بَعْدَ ذٰلِكَ فَأُولٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَড়
[سورة ال عمران : ايت :৮২ـ-৮১-] তরজমা: ৮১।। এবং স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ্ তা‘আলা নবীগণের নিকট থেকে তাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের নিকট রসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁকে সাহায্য করবে। এরশাদ করলেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করলে?’ সবাই আরয করলো, ‘আমরা স্বীকার করলাম।’ এরশাদ করলেন, ‘তবে (তোমরা) একে অপরের উপর সাক্ষী হয়ে যাও এবং আমি নিজেও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।’
৮২।। সুতরাং যে কেউ এর পরে ফিরে যাবে, তবে ওইসব লোক ফাসিক্ব। [সূরা আ-লে ইমরান, আয়াত-৮১-৮২, কানযুল ঈমান] এ আয়াত শরীফে ওই অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আল্লাহ্ তা‘আলা জাল্লা মাজদুহূ রূহ জগতে সমস্ত সম্মানিত নবী আলায়হিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম থেকে আপন হাবীবে পাক সাহেবে লাউলাক হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে নিয়েছেন, ‘আমার হাবীব-ই লাবীব মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, যিনি তোমাদের সবার পরে তাশরীফ আনবেন, যদি তোমাদের থেকে কেউ তাঁর যুগ পাও, তবে অবশ্যই তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং তাঁর সাহায্য করবে।’ এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যে, সাইয়্যেদুল ইনসে ওয়াল জা-ন্ন, সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভাগমন সমস্ত সম্মানিত নবী আলায়হিমুস্ সালাম-এর পরে হবে। এ কারণে আল্লাহ্ তা‘আলা সমস্ত সম্মানিত নবী আলায়হিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালামকে সম্বোধন করে এরশাদ করেছেন-ثُمَّ جَآءَ كُمْ رَسُوْلٌ (তোমরা সবার পর এ রসূল তাশরীফ আনবেন) এটা একথার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণবহ যে, এ মহান রসূলের শুভাগমন সমস্ত সম্মানিত নবী ও রসূলের পরে হবে। আর এ রসূল আখেরী নবী ও আখেরী রসূল হবেন।
যদি মির্যা ক্বাদিয়ানীকে, কাল্পনিকভাবে, নবী মেনে নেওয়া হয়, তবে সরওয়ারে কা-ইনাত তাজদারে মদীনা হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী থাকেন না। আর আল্লাহরই পানাহ্! সুম্মা মা‘আযাল্লাহ্ আল্লাহ তা‘আলার কালাম (বাণী শরীফ, ক্বোরআন শরীফ) মিথ্যা হয়ে যাবে।
—০—
।। পাঁচ।।
হাবীবে খোদা আখেরী উম্মতের আখেরী রসূল
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ ط رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ط إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ ড়رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَآ ط إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُড় رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوْا عَلَيْهِمْ ايٰتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ط إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيْمُড় [سوره بقره :ايت ـ ১২৭ـ১২৯] তরজমা: ১২৭।। এবং যখন উঠাচ্ছিলো ইব্রাহীম এ ঘরের ভিত্তিগুলো এবং ইসমাঈল, এ প্রার্থনারত অবস্থায়- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে গ্রহণ করো। নিশ্চয় তুমিই শ্রোতা, জ্ঞাতা।
১২৮।। হে প্রতিপালক আমাদের! এবং আমাদেরকে তোমারই সামনে গর্দান অবনতকারী এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকে একটা উম্মতকে তোমারই অনুগত করো। আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের নিয়ম-কানুন বলে দাও এবং আমাদের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহ সহকারে দৃষ্টিপাত করো। নিশ্চয় তুমিই অত্যন্ত তাওবা কবূলকারী, দয়ালু।
১২৯।। হে প্রতিপালক আমাদের! এবং প্রেরণ করো তাদের মধ্যে একজন রসূল তাদেরই মধ্য থেকে, যিনি তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলাওয়াত করবেন এবং তাদেরকে তোমার কিতাব ও পরিপক্ক জ্ঞান শিক্ষা দেবেন আর তাদেরকে অতি পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[সূরা বাক্বারা: আয়াত-১২৭-১২৯, কানযুল ঈমান] বেরাদরানে ইসলাম! এ আয়াত শরীফগুলোতে মহান ¯্রষ্টা সাইয়্যেদুনা হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর কয়েকটা দো‘আর উল্লেখ করেছেন। ওইগুলোর মধ্যে একটা দো‘আ উম্মতে মুসলিমার আত্মপ্রকাশ সম্পর্কে, যা দ্বারা ‘মুসলিম উম্মাহ’ বুঝানো হয়েছে, যারা আখেরী উম্মত। আরেকটি দো‘আ সাইয়্যেদে দু’আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানী শুভাগমন সম্পর্কে। এ থেকে বুঝা গেলো যে, মুসলিম উম্মাহ অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত সর্বশেষ উম্মত। আর তাদের রসূল ও সর্বশেষ রসূল। সুতরাং সরওয়ার-ই দু’ আলম মাহবূবে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নুবূয়তের ধারা সমাপ্ত হয়েছে। আর তাঁর পরে কোন নবী আসবে না। কেননা সাইয়্যেদুনা ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর দো‘আর শব্দগুলো হচ্ছে-رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيْهِمْ رَسُوْلاً (হে আমাদের রব! এ মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যে এক মহান রসূল প্রেরণ করো) এবং একথা বলেননি, رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيْهِمْ رُسُلاً (হে আমাদের রব! তাদের মধ্যে অনেক রসূল প্রেরণ করো!)
প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যেদুনা হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাওয়া-তু ওয়াস্ সালাম শুধু এমন একজন রসূলের শুভাগমনের দো‘আ করেছেন, যাঁর শুভাগমনের পর অন্য কোন নবী ও রসূলের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে না। হাফেয ইবনে কাসীর রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এর তাফসীরে লিখেছেন-
عَنْ اَبِى الْعَالِيَّةِ فِىْ قَوْلِه رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيْهِمْ رَسُوْلاً مِّنْهُمْ يَعْنِىْ اُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقِيْلَ لَه قَدْ اُسْتُجِيْبَ لَكَ وَهُوَ كَائِنٌ فِىْ اخِرِ الزَّمَانِ وَكَذَا قَالَ السُدِّىُّ وَقَتَادَةُ -[ابن كثير جلد اول :صفحه ১৮৪] অর্থঃ হযরত আবুল আলিয়া থেকে বর্ণিত, সাইয়্যেদুনা হযরত খলীলুল্লাহ্ আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এ দো‘আ করেছেন, ‘হে আমাদের রব! তাদের মধ্যে প্রেরণ করো, এক মহান রসূল, অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার পক্ষ থেকে এ ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার দো‘আ কবূল হয়েছে।’ এবং তিনি হবেন শেষ যমানায়। ইমাম সুদ্দী ও ক্বাতাদাহ্ থেকে এমনটি বর্ণিত হয়েছে।
[ইবনে কাসীর: ১ম খন্ড, পৃ. ১৮৪] এ মহা মর্যাদাবান ব্যক্তিদের তাফসীরগুলো থেকে প্রমাণিত হলো যে, সরওয়ার-ই দু’ আলম তাজদারে মদীনা সাইয়্যেদুনা ওয়া মাওলানা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামই আখেরী যুগে তাশরীফ আনবেন; যাঁর পরে অন্য কোন নবী আসবে না।
।। ছয়।।
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমাচ্ছেন-
اَوَلَمْ يَكُنْ لَّهُمَ ايَةً اَنْ يَعْلَمَه عُلَمَآءُ بَنِىْ اِسْرَائِيْلَ ড়
[سورة شعراء : ايت ১৯৭] তরজমা: এবং এটা কি তাদের জন্য নিদর্শন ছিলো না যে, এ নবীকে জানে বনী ইসরাঈলের আলিমগণ? [সূরা শু‘আরা: আয়াত-১৯৭, কানযুল ঈমান] বুঝ ও জ্ঞান সম্পন্ন লোকদের জন্য, ইসলাম ও ইসলামের প্রবর্তক হুযূর-ই পুরনূর শাফে-‘ই ইয়াউমিন্ নুশূর হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সত্যতার পক্ষে অন্যতম বড় দলীল এ যে, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও এর সত্যতাকে স্বীকার করে। আমাদের রসূলে পাক সাহেবে লাউলাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সত্যতা বনী ইসরাঈলের আলিমগণও স্বীকার করতো। সুতরাং কেউ কেউ তো তাঁর বিশেষ বিশেষ মজলিসেই এটা স্বীকার করতো; কিন্তু কোন পার্থিব স্বার্থে সত্যকে গ্রহণ করতো না। কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেছেন এবং ইসলাম কবূল করেছেন, যেমন সৈয়্যদুনা হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম এবং তাঁর সাথীরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম। এর কারণ এ ছিলো যে, তাঁদের কিতাবে মাদানী চাঁদ আফতাবে রিসালত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভাগমনের সুসংবাদ এবং উল্লিখিত গুণাবলী লিপিবদ্ধ ছিলো। যেমন- ক্বোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে-
اَلَّذِيْنَ يَتَّبِعُوْنَ الرَّسُوْلَ النَّبِىَّ الْاُمِّىَّ الَّذِىْ يَجِدُوْنَه مَكْتُوْبًا عِنْدَهُمْ فِى التَّوْرَاةِ وَالْاِنْجِيْلِ [سورة اعراف : ايت : ১৫৭] তরজমা: ওইসব লোক, যারা দাসত্ব করবে এ রসূল, পড়াবিহীন অদৃশ্যের সংবাদদাতার, যাঁকে তারা লিপিবদ্ধ পাবে নিজেদের নিকট তাওরীত ও ইনজীলের মধ্যে। [সূরা আ’রাফ: আয়াত-১৫৭, কানযুল ঈমান] এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাওরীত, ইন্জীল এবং অন্যান্য আসমানী কিতাবে শাহে কাউনাঈন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসনীয় গুণাবলীর উল্লেখ ছিলো। আর ওইসব গুণের মধ্যে একটি ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ও লিপিবদ্ধ ছিলো। এ কারণে সরওয়ার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভাগমনের পূর্বে বনী ইসরাঈলের সমস্ত আলিম শুধু শেষ যমানার নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অপেক্ষায় ছিলো। আর ওইসব আলিমের এটাই সর্বসম্মত আক্বীদা ছিলো যে, ফখরে কা-ইনাত রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর অন্য কোন নবী আসবে না।
তাবরানী শরীফে সাইয়্যেদুনা হযরত জুবাইর ইবনে মুত্ব‘ইম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, ‘আমি ব্যবসার কাজে সিরিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে এক ব্যক্তিকে পেলাম, যে কিতাবী সম্প্রদায়ের ছিলো। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমাদের দেশে কি কোন নবী আত্মপ্রকাশ করেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, সে বললো, ‘‘তুমি কি তাঁর আকৃতি চিনো?’’ আমি বললাম, ‘‘হ্যাঁ, আমি তাঁকে চিনি।’’ তারপর ওই লোক আমাকে তার ঘরে নিয়ে গেলো। অতঃপর সাহাবী যা কিছু দেখেছেন, তা নি¤œলিখিত বচনে লিখেছেন-
فَسَاعَةَ مَا دَخَلْتُ نَظَرْتُ اِلى صُوْرَةِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاِذَا رَجُلٌ اٰخِذٌ بِعَقْبِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ هذَا الرَّجُلُ الْقَابِضُ عَلى عَقْبِه قَالَ اِنَّه لَمْ يَكُنْ نَبِىٌّ اِلاَّ كَانَ بَعْدَه نَبِىٌّ اِلاَّ هذَا النَّبِىُّ فَاِنَّه لاَ نَبِىَّ بَعْدَه وَهذَا الْخَلِيْفَةُ بَعْدَه وَاِذَا صِفَةُ اَبِىْ بَكْرٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ
[تفسير ابن كثير : جلد ثانى صفحه ـ ২৫৩] অর্থ: অতঃপর যখনই আমি প্রবেশ করলাম, তখন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ছবি দেখতে পেলাম এবং আরো একজনের ছবি, যিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পা মুবারকের মুড়ি ধরে আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইনি কে, যিনি হুযূর-ই আক্রামের পা মুবারকের মুড়ি ধরে আছেন? সে বললো, এ পর্যন্ত এমন কোন নবী অতিবাহিত হননি কিন্তু তাঁর পরে নবী হয়েছেন; এ-ই নবী এমনি যে, তাঁর পরে কোন নবী নেই। আর এ ব্যক্তি তাঁর পরে খলীফা হবেন। আমি গভীরভাবে তাকালাম। দেখতে পেলাম, সেটা তো হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্বের ছবি ছিলো।
[তাফসীর-ই ইবনে কাসীর, ২য় খন্ড, পৃ. ২৫৩] সম্মানিত পাঠক! এ বর্ণনা থেকে বুঝা গেলো যে, কিতাবী সম্প্রদায়ের মতেও তাজদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরপর কোন নবী হবে না। কিন্তু হতভাগা মির্যাঈ প্রলাপ বকছে যে, হুযূর পুরনূর শাফি‘ই ইয়াউমিন্ নুশূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর নবী আসতে পারে। অথচ সে ক্বোরআন মজীদ ও হাদীস শরীফ পাঠ করে এবং মুসলমান বলেও দাবী করে। কবি বলেন-
وه عبده ورسوله وه اسمه احمد ـ كتاب وحكم نبوت كا خاتم وخاتم
অর্থ: তিনি হলেন আল্লাহর খাস বান্দা, তিনি তাঁর রসূল এবং তাঁর সম্পর্কেই হযরত ঈসা (আলায়হিস্ সালাম) বলেছেন, ‘‘তাঁর নাম আহমদ! সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। কিতাব ও নুবূয়তের দিক দিয়ে তিনি খাতিম ও খাতাম (সর্বশেষ)।
—০—
।। সাত।।

সূরা-ই বনী ইসরাঈলে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন-
سُبْحَانَ الَّذِىْ أَسْرٰى بِعَبْدِه لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِىْ بَارَكْنَا حَوْلَه لِنُرِيَه مِنْ ايَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
[سورة بنى اسرائيل : ايت ـ১] তরজমা: পবিত্রতা তাঁরই, যিনি আপন বান্দাকে রাতারাতি নিয়ে গেছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আক্বসা পর্যন্ত, যার আশে পাশে আমি বরকত রেখেছি, যাতে আমি তাঁকে আপন মহান নিদর্শনসমূহ দেখাই। নিশ্চয় তিনি শুনেন, দেখেন। [সূরা বনী-ইসরাঈল: আয়াত-১, কানযুল ঈমান] আর আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা নাজমে এরশাদ ফরমায়েছেন-
ثُمَّ دَنَا فَتَدَلّٰى ড় فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنٰى ড় فَأَوْحٰى إِلٰى عَبْدِه مَا أَوْحٰى ড়
তরজমা: ৮।। অতঃপর ওই জ্যোতি নিকটবর্তী হলো। তারপর খুব নেমে আসলো। ৯।। অতঃপর ওই জ্যোতি ও এ মহাবূবের মধ্যে দু’ হাতের ব্যবধান রইলো; বরং তদপেক্ষাও কম। ১০।। তখন ওহী করলেন আপন খাস বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিলো। [সূরা আন্ নাজম: আয়াত, ৮-১০, কানযুল ঈমান] উপরোক্ত আয়াত ও অকাট্য দলীলাদিতে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহূ ইসরা ও মি’রাজের ঘটনাকে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন, যা দ্বারা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওই শ্রেষ্ঠত্ব ও সরদারী প্রকাশ করা উদ্দেশ্য, যা ফরশ থেকে আরশ পর্যন্ত সাইয়্যেদুল আওয়ালীন ওয়াল আ-খিরীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কোন নবী ও রসূলের অর্জিত হয়নি। ইসরা ও মি’রাজের ঘটনা তো হাদীস শরীফ ও সীরাতের কিতাবগুলোতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিবন্ধেও কতিপয় রেওয়ায়ত বর্ণনা করার প্রয়াস পাচ্ছি, যেগুলো দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, আমাদের আক্বা-ই রহমত হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী, তাঁর পরে আর কোন প্রকারের কোন নবী আসবে না।

রেওয়ায়ত-১
সাইয়্যেদুনা হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, যখন রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বোরাক্বে আরোহণ করার পর সাইয়্যেদুনা হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর সাথে রওনা হলেন, তখন এমন জমা‘আতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা তাঁকে নি¤œলিখিত বচনে সালাম আরয করলেন-
اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا اَوَّلُ ـ اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا ا خِرُ ـ اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا حَاشِرُ
অর্থ: সালাম আপনার উপর হে প্রথম, সালাম আপনার উপর হে সর্বশেষ, সালাম আপনার উপর হে একত্রকারী।
হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়কাস ওয়াসাল্লাম) আপনি তাদের সালামের জবাব দিন! তারপর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম আরয করলেন, ‘‘যে সব হযরত আপনাকে সালাম বলেছেন তাঁরা হলেন, হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্, হযরত মূসা কলীমুল্লাহ্ ও হযরত ঈসা রূহুল্লাহ্ আলায়হিমুস্ সালাম।
[বাহয়হাক্বী-দালাইলুন নুবূয়ত, তাফসীর-ই ইবনে কাসীর: ৩য় খন্ড: পৃ. ৫, মাদারিজুন্ নুবূয়ত:২য় খন্ড, পৃ. ১৯৫] এ মহা মর্যাদাবান নবীগণ তাজদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘প্রথম হওয়া’ ও ‘সর্বশেষ হওয়া’র দু’টি গুণও উল্লেখ করেছেন। বুঝা গেলো যে, সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর আক্বীদা এটাই ছিলো যে, সাইয়্যেদুল আউয়ালীন ওয়াল আখেরীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী, তাঁর পরে অন্য কোন নবী আসবে না।
রেওয়ায়ত-২
যখন শবে আসরার দুলহা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মসজিদে আক্বসায় পৌঁছেছেন, তখন সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালাম তাঁর অপেক্ষায় রত ছিলেন। সেখানে ফেরেশতাদের এক বিরাট দলও ছিলো। এক মুআয্যিন আযান দিলেন। তারপর ইক্বামত বলা হলো। সরদার-ই আম্বিয়া আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম সম্মানিত নবীগণ ও ফেরেশতাদের ইমামত করলেন। যখন নামায পরিপূর্ণ হয়ে গেলো, তখন ফেরেশতারা হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে? তখন সাইয়্যেদুনা হযরত জিব্রাঈল বললেন-هذَا مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ অর্থ: আল্লাহর রসূল সর্বশেষ নবী।
[মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়ার বরাতে আনওয়ারে মুহাম্মাদিয়্যাহ্; পৃ. ৩৩৪] সম্মানিত মুসলিম সমাজ! একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন, সরকার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খতমে নুবূয়তের ঘোষণা কেমন মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে দেওয়া হচ্ছে। সমস্ত সম্মানিত নবী ও শীর্ষস্থানীয় ফেরেশতাদের মাহফিলে সাইয়্যেদুনা হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম ঘোষণা করছেন যে, মাদানী চাঁদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী।
রেওয়ায়ত-৩
বায়তুল মুক্বাদ্দাসে নামায শেষে প্রত্যেক নবী পালা পালা করে একেকটা সুন্দর বক্তব্য পেশ করেন, যা’তে প্রত্যেকে আল্লাহ্ তা‘আলার প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদের উপর আল্লাহ তা‘আলার বিভিন্ন অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। সবার শেষে সাইয়্যেদুল ইন্সি ওয়াল জান্ন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম খোৎবা পড়লেন (বক্তব্য পেশ করলেন)। তা নি¤œরূপ-
اَلْحَمْدُ للهِ الَّذِىْ اَرْسَلَنِىْ رَحْمَةً لِّلْعَالِمِيْنَ وَكَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيْرًا وَّنَذِيْرًا وَاَنْزَلَ عَلَىَّ الْفُرْقَانَ فِيْهِ تِبْيَانٌ لِكُلِّ شَيْءٍ وَجَعَلَ اُمَّتِىْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ وَجَعَلَ اُمَّتِىْ اُمَّةً وَّسَطًا وَّجَعَلَ اُمَّتِىْ هُمُ الْاَوَّلُوْنَ وَهُمُ الْاخِرُوْنَ وَشَرَحَ لِىْ صَدْرِىْ وَوَضَعَ عَنِّىْ وِزْرِىْ وَرَفَعَ لِىْ ذِكْرِىْ وَجَعَلَنِىْ فَاتِحًا وَّخَاتِمًا
[تفسير ابن كثير : جلد ثالث : صفحه ১৮ـ تفسير درمنثور ـ جلد رابع : صفحه ১৪৫] অর্থ: ওই আল্লাহ্ তা‘আলারই হামদ, যিনি আমাকে সমস্ত জগতের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছেন এবং সমস্ত মানুষের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করেছেন। আমার উপর ক্বোরআন মজীদ নাযিল করেছেন, যা’তে প্রত্যেক কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। আর আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত করেছেন, যাদেরকে লোকজনের জন্য বের করা হয়েছে। আমার উম্মতকে মধ্যবর্তী উম্মত করেছেন। আমার উম্মতকে এমন অবস্থায় (ধন্য) করেছেন যে, তারা প্রথমও শেষও। আমার পবিত্র বক্ষকে খুলে দিয়েছেন। আমার থেকে আমার বোঝা নামিয়ে ফেলেছেন। আমার জন্য আমার যিকরকে সমুন্নত করেছেন। আমাকে সূচনাকারী ও সমাপ্তকারী করেছেন।
হযরত আবূ জা’ফর রাযী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেছেন,فاتحًا (উন্মুক্ত বা সূচনাকারী) করেছেন মানে ‘হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ক্বিয়ামতের দিনে সুপারিশের দরজা খুলবেন’ আর خاتِمًا (সমাপ্তকারী) করেছেন মানে ‘নুবূয়তের ধারা সমাপ্তকারী’। গভীরভাবে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে-‘খতমে নুবূয়ত’-এর মাসআলা (বিষয়) এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, শাহে কাউনাঈন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর বিশাল মজলিসে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সর্বশেষ নবী এবং তাঁর উপরই নুবূয়তের ধারা সমাপ্ত হয়েছে। সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালাম নিশ্চুপ ছিলেন, তখন তো সমস্ত নবী আলায়হিমুস্ সালামের আক্বীদা এটাই যে, সরকারে দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আখেরী নবী।
রেওয়ায়ত-৪
সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে মি’রাজের দীর্ঘ হাদীস শরীফ বর্ণিত। তা হচ্ছে যখন আল্লাহ্ রব্বুল ইয্যাত আপন মাহবূবে পাক, সাহিবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে নিজের নৈকট্য ও সরাসরি কথোপকথন দ্বারা ধন্য করেছেন, তখন তিনি এ ইরশাদ করেছেন-
وَجَعَلْتُ اُمَّتَكَ الْاَوَّلِيْنَ وَالْاخِرِيْنَ وَجَعَلْتُ مِنَ اُمَّتِكَ اَقْوَامًا قُلُوْبُهُمْ اَنَاجِيْلُهُمْ وَجَعَلْتُكَ اَوَّلَ النَّبِيِّيْنَ خَلْقًا وَاٰخِرَهُمْ بَعْثًا وَجَعَلتُكُ فَاتحًا وخَاتِمًا [تفسير ابن كثير جلد سوم صفحه ـ ২০ـ ] অর্থঃ এবং আমি আপনার উম্মতকে প্রথম উম্মত ও সর্বশেষ উম্মত করেছি; অর্থাৎ ফযীলত (মর্যাদা) অনুসারে সর্বপ্রথম, আর প্রকাশ পাওয়া অনুসারে সর্বশেষ উম্মত। আর আপনার উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায় (জনগোষ্ঠী) তৈরি করেছি, যাদের হৃদয় ইনজীল হবে, অর্থাৎ ক্বোরআনকে হিফাযতকারী। আপনাকে সৃষ্টিতে সর্বপ্রথম নবী এবং প্রেরণ অনুসারে সর্বশেষ নবী করেছি। আপনাকেই সূচনাকারী ও সমাপ্তকারী করেছি। [তাফসীর-ই ইবনে কাসীর: ৩য় খন্ড, পৃ. ২০] এ বর্ণনা দ্বারা একথা মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মাদানী চাঁদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপরই নুবূয়তের সূচনা ও সমাপ্তি ঘটেছে; সুতরাং আপনার পরে কোন নবী আসবে না।
—০—
।। আট।।
খতমে নুবূয়ত সম্পর্কে এ নিবন্ধে উল্লেখিত সর্বশেষ আয়াতঃ
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমাচ্ছেন-
عَسى اَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا ـ [سورة بنى اسرائيل : ايت ৭৯] তরজমাঃ অবিলম্বে আপনার রব আপনাকে ‘মাক্বামে মাহমূদ’ (প্রশংসিত স্থানে) দন্ডায়মান করবেন। [সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৭৯] সাহাবা-ই কেরাম ও তাবে‘ঈন এ মর্মে একমত যে, ‘মাক্বামে মাহমূদ’ মানে এখানে ‘মাক্বামে শাফা‘আত’ (সুপারিশের স্থান)।
বর্ণিত আছে-
قَالَ اِبْنُ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا هذَا الْمَقَامُ الْمَحْمُوْدُ مَقَامُ الشَّفَاعَةِ
[تفسير ابن كثير:جلد سوم : صفحه : ৫৫] অর্থঃ সাইয়্যেদুনা ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বলেছেন, এ ‘মাক্বামে মাহমূদ’ মানে ‘মাক্বামে শাফা‘আত’। [তাফসীর-ই ইবনে কাসীর: ৩য় খন্ড, পৃ. ৫৫] عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اَلْمَقَامُ الْمَحْمُوْدُ الشَّفَاعَةُ ـ [درمنثور : جلد چهارم : صفحه : ১৯৭] অর্থঃ হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘মাক্বামে মাহমূদ’ হচ্ছে ‘শাফা‘আত’(মাক্বামে শাফা‘আত)। [তাফসীর-ই দুররে মানসূর: ৪র্থ খন্ড, পৃ. ১৯৭] আর একথাও ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত যে, ক্বিয়ামত দিবসে শাফা‘আতের জন্য দরখাস্ত করার পরম্পরা সাইয়্যেদুনা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম থেকে আরম্ভ হবে আর খাতিমুল আম্বিয়া আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর খতম হবে। অর্থাৎ সকল মাহশারবাসী (পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল উম্মত) হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর নিকট গিয়ে সুপারিশ করার জন্য দরখাস্ত করবে। তখন তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানাবেন। তারপর তারা অন্যান্য নবীর নিকট যাবে। আর সবার নিকট (একই ধরনের) জবাব পেয়ে সবশেষে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাযির হয়ে এভাবে আরয করবে-
يَا مُحَمَّدُ اَنْتَ رَسُوْلُ اللهِ وَخَاتَمُ الْاَنْبِيَآءِ وَغَفَرَ اللهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ وَمَا تَأَخَّرَ اِشْفَعْ لَنَا اِلى رَبِّكَ -ـ
অর্থঃ হে মহান প্রশংসিত (মুহাম্মদ)! আপনি আল্লাহ্ তা‘আলার রসূল ও সর্বশেষ নবী। আল্লাহ্ তা‘আলা আপনার কারণে পূর্ব ও পরবর্তী সকল উম্মতকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন!
এ হাদীস শরীফ থেকেও প্রমাণিত হলো যে, কাল ক্বিয়ামতের দিনে পূর্ব ও পরবর্তী সকলে দরবারে রিসালতে হাযির হয়ে হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘খতমে নুবূয়ত’-এর কথা স্বীকার করবে। মজার কথা এ যে, হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খতমে নুবূয়তের কথা স্বীকারকারীদের মধ্যে সেদিন মির্যা-ক্বাদিয়ানীও থাকবে। কিন্তু ওই সময়ের স্বীকারোক্তি সেদিন তাদের চূড়ান্ত মুক্তির ব্যাপারে কোন কাজে আসবে না, কোন উপকার করবে না।
তাই আজকের মির্যাঈদেরকে বলছি- কাল ক্বিয়ামতের দিনে কোন্ মুখে বলবেاَنْتَ رَسُوْلُ اللهِ وَخَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ (আপনি আল্লাহর রসূল এবং সর্বশেষ নবী)? এবং শাফা‘আত করার জন্য দরখাস্ত করবে? যেহেতু তোমরা এ দুনিয়ায় তাঁর খতমে নুবূয়তকে স্বীকার করতে না? তোমাদের জন্য তো উচিৎ হবে এমন সময় তোমাদের বানোয়াট ও ভন্ড নবী মির্যা কাদিয়ানীকে তালাশ করা! তখন তার দ্বারা কি কোন কাজ হবে? ক্বাদিয়ানী সম্প্রদায়ের উচিৎ এর জবাব খুঁজে বের করা! (অর্থাৎ তাওবা করে খাঁটি অন্তরে শেষ যামানার নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঈমান আনার বিকল্প পথ তাদের জন্য নেই।) ওয়ামা ‘আলায়না ইল্লাল বালাগুল মুবীন। আমাদের উপর সঠিক বিষয়টি পৌঁছিয়ে দেয়া আমাদের কর্তব্য ছিলো, তা আমরা করলাম। গ্রহণ করা তোমাদের দাযিত্ব।
—০—