খতমে নুবূয়তকে অস্বীকার করার অশুভ পরম্পরা!

0

খতমে নুবূয়তকে অস্বীকার করার অশুভ পরম্পরা!
‘খতমে নুবূয়ত’কে অস্বীকার করার যেই ভিত্তিপ্রস্তর মৌং ক্বাসেম নানূতভী স্থাপন করেছিলো, সেটাকে তাদের পরবর্তীতে আগমনকারীরা শুধু সংরক্ষণই করেনি বরং সেটার উপর দালানও নির্মাণ করে রেখেছে। এ ধারাবাহিকতায় দারুল উলূম দেওবন্দের প্রাক্তন মুহতামিম ক্বারী ত্বাইয়্যেব সাহেবের কর্মকান্ড সবিশেষ প্রনিধানযোগ্য। তিনি তার দাদাজানের এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার-প্রসারে এমনভাবে সোচ্চার ছিলেন যে, তাকে ঘৃণা করা ও ধিক্কার দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না।
নমুনাস্বরূপ, তার বক্তৃতা-বক্তব্যের কয়েকটা উদ্ধৃতি লক্ষ করুন! যেগুলো দেওবন্দের মুফতীগণ ‘ইনকিশাফ’ নামক পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যগুলো নি¤œরূপঃ
।। এক।।
نبی کریم ﷺ اس عالم امکان میں سرچشمۃ علوم وکمالات ہیں حتی کہ انبیاء علیہم السلام کی نبوتیں بھی فیض ہیں خاتم النبین کی نبوت کا-درحقیقت حقیقی نبی آپ ہیں -آپ کی نبوت کے فیض سے انبیاء بنتے چلے گئے – (انکشاف مطبوعہ دیوبند صفحہ۴ ۲۶ (
অর্থঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ নশ্বর জগতে জ্ঞান ও পূর্ণতার উৎস; এমনকি নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর নুবূয়তও ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর নুবূয়তের ফয়য (কল্যাণধারা)’র ফসল। বাস্তবিকপক্ষে প্রকৃত নবী তিনিই। তাঁর নুবূয়তের ফয়য থেকে অন্য নবীগণ হয়ে এসেছেন।
[ইনকিশাফ: দেওবন্দ থেকে মুদ্রিত, পৃ. ২৬৪] পর্যালোচনা
উপরোক্ত বর্ণনা মতে, যখন প্রকৃত নবী তিনিই (হুযূর-ই আক্রাম), তখন একথা সুস্পষ্ট যে, অন্যান্য নবীগণ মাজাযী নবী (রূপক নবী) ও যিল্লী নবী (ছায়ানবী) হবেন। এটা হচ্ছে ওই ফর্মুলা, যা মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী ‘যিল্লী নবী’, ‘বরূযী নবী’, ‘উম্মতী নবী’ নামে নিজেকে আখ্যায়িত (!) করার জন্য আবিষ্কার করেছিলো।
উপরোক্ত নাপাক বক্তব্য ছাড়াও উক্ত ক্বারী ত্বাইয়্যেব ‘আফতাবে নুবূয়ত’ নামে এ বিষয়বস্তুর উপর একটি পুস্তকও রচনা করেছে, যা পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়। এ’তে এক স্থানে সে বক্তব্য রেখেছে-
حضور کی شان مضে نبوت ہی نہیں نکلتی بلکہ نبوت بخش بھی نکلتی ہے کہ جوبھی نبوت کی استعداد پایا ہوافرد آپ کے سامنے آگیا -نبی ہوگیا-(آفتاب نبوت : صفحہ ۱۹)
অর্থঃ হুযূরের শান শুধু নুবূয়তই প্রকাশ পায় না, বরং ‘নুবূয়তদাতা’ও প্রকাশ পায়। সুতরাং নুবূয়তের যোগ্যতা পেয়েছে এমন যে কোন ব্যক্তি তাঁর সামনে এসে গেছে, সে নবী হয়ে গেছে। [আফতাবে নুবূয়ত: পৃ.১৯] এ ইবারতের উপর ‘তাজাল্লী’র সম্পাদক জনাব মাওলানা আমির ওসমানীর পর্যালোচনা দেখুন! বস্তুতঃ এটা পর্যালোচনা নয়; বরং দেওবন্দী জমা‘আতের পিঠের উপর আল্লাহর ক্বহর ও গযবের একটি দৃষ্টান্তমূলক আঘাত স্বরূপ। তিনি লিখেছেন-
قادیانیوں کو اس سے استدلال ملاکہ روح محمدی تو بہر حال فنانہیں ہوئی وہ آج بھی کہیں نہ کہیں موجود ہے -کوئی وجہ نہیں کہ پہلے اس نے ہزاروں انسانوں کو نبوت بخشي تواب نہ بخشے- (تجلی دیوبند : نقدونظر نمبر-৭)
অর্থঃ ক্বাদিয়ানীরা এ থেকে এ মর্মে দলীল পেশ করার সুযোগ পেয়েছে যে, ‘রূহে মুহাম্মদী’ তো কখনো বিলীন হয়নি; বরং সেটা আজও কোন না কোন স্থানে মওজুদ আছে। সুতরাং যেহেতু সেটা ইতোপূর্বে হাজারো মানুষকে নুবূয়ত দান করেছে, সেহেতু এখন কাউকে নুবূয়ত না দেয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না।
[সূত্র. তাজাল্লী-ই দেওবন্দ: নক্বদ ও নযর, সংখ্যা-৭] এখন এর সাথে ‘তাজাল্লী’র বরাতে মির্যা আহমদ ক্বাদিয়ানীর এ দাবীও পড়ে নিন, যাতে এ বাস্তবতাও একেবারে স্পষ্টভাবে সামনে এসে যায় যে, দেওবন্দের মুহতামিম সাহেব ‘আফতাবে নবূয়ত’ নামের পুস্তকটি লিখে নেপথ্যে কার নিমককে হালাল করতে চেয়েছেন। মির্যা ক্বাদিয়ানী লিখেছে-
اللہ جل شانہ نے آنحضرت ﷺ کو خاتم بنایا یعنی آپ کو افاضۃ کمال کیلئے مہردی جو کسی اور نبی کو نہیں دی گئی -اس وجہ سے آپ کانام خاتم النبیین ٹھہرا-یعنی آپ کی پیروی کمالات نبوت بخشی ہے اور آپ کی توجہ روحانی نبی تراش ہے اور یہ قوت قدسیہ کسی اور کونہیں ملی- (حقیقۃ الوحی سجوالۃ تجلی :نقدونظر نمبر :৩৭)
অর্থঃ আল্লাহ্ জাল্লা শানুহূ আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘খাতাম’ করেছেন। অর্থাৎ তাঁকে কাউকে পূর্ণতা প্রদানের জন্য মোহর দিয়েছেন, যা অন্য কোন নবীকে দেওয়া হয়নি। এ কারণে তাঁর নাম ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ সাব্যস্ত হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর অনুসরণ ‘নুবূয়তের গুণাবলী দান করেছে’ এবং তাঁর রূহানী তাওয়াজ্জুহ্ (আত্মিক কৃপাদৃষ্টি) নবী বানায়। বস্তুতঃ এ পবিত্র ক্ষমতা অন্য কেউ পায়নি। [হাক্বীক্বতে ওহী: তাজাল্লী নক্বদ ও নযর, সংখ্যা-৭৩ এর বরাতে] এখন একেবারে মধ্যাহ্ণ সূর্যের আলোকে দেওবন্দের মুহতামিম সাহেবের আসল চেহারা দেখতে চাইলে উক্ত মুহতামিম সাহেব ও মির্যা সাহেবের লেখনীগুলোকে এক চৌকাঠের উপর রেখে ‘তাজাল্লী’র সম্পাদকের এ বিস্ফোরণ সম বর্ণনা দেখুন-
حضرت مہتمঠ صاحب نے حضور کو نبوت بخش کہاتھامیرزا صاحب نبی تراش کہہ رہے ہیں -حرفوں کا فرق ہے معنی کا نہیں-(تجلی نقدونظر نمبر ۷۸)
অর্থঃ হযরত মুহতামিম সাহেব হুযূরকে ‘নুবূয়তবখশ’ (নুবূয়তদাতা) বলেছিলেন, আর মির্যা সাহেব ‘নবীতরাশ (নবী হিসেবে প্রস্তুতকারী) বলছে। শুধু হরফ বা বর্ণের পার্থক্য, অর্থের নয়। [তাজাল্লী: নক্বদ ও নযর সংখ্যা-৭৮]
সম্মানিত পাঠক!
আপনি কি বুঝলেন? তারা বলতে চাচ্ছে, যেভাবে মির্যা সাহেবের আক্বীদা (বিশ্বাস) আছে যে, নুবূয়তের দরজা বন্ধ হয়নি, বরং আজও হুযূর-ই পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষ দৃষ্টি নুবূয়তের যোগ্যতাধারী যেকোন মানুষের উপর পড়–ক না কেন, তবে সে নবী হতে পারে।
এভাবে মুহতামিম সাহেবও হুযূরকে ‘নুবূয়ত বখশ’ (নবূয়তদাতা) বলে হুবহু ওই আক্বীদা বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি উচ্চারণ করেছেন। বর্ণনা ভঙ্গি ও শব্দাবলীর ব্যবহারে ভিন্নতা থাকতে পারে; কিন্তু দাবী উভয়ের এক ও অভিন্ন।
প্রকাশ থাকে যে, ‘তাজাল্লী’র সম্পাদকের এ পর্যালোচনা কোন নিছক সমালোচনা নয়; বরং বাস্তবাবস্থার বর্ণনাই। কেননা, উভয়ের চিন্তাধারায় ধরনের মধ্যে এমন বিরাট সামঞ্জস্য রয়েছে যে, উভয়ের মধ্যে কোন বিরোধ-রেখা অঙ্কন করা যায় না।
উদাহরণস্বরূপ, মির্যা ক্বাদিয়ানী তার ভন্ড নুবূয়তের দাবীর বৈধতা প্রকাশার্থে রূপক (মাজাযী), যিল্লী (ছায়া বিশেষ)ও ‘উম্মতী’ (উম্মতরূপী) নবী হবার ফর্মূলা তৈরী করেছিলো, আর মুহতামিম সাহেবের বক্তৃতার যে গুপ্ত মর্মার্থ দেওবন্দের মুফতীগণ ‘ইনকিশাফ’ নামক পুস্তকে পেশ করেছে, তাতে মুহতামিম সাহেবও ওই ফর্মূলার ভাষা ব্যবহার করেছেন যেমন ওই বক্তব্যের একটি প্যারা নি¤œরূপ-
درحقیقت حقیقی نبی آپ ہیں -آپ کی نبوت کے فیض سے انبیاء بنتے چلے گئے
অর্থঃ বাস্তবিকপক্ষে প্রকৃত নবী তিনিই (হুযূর-ই আক্রাম), তাঁর নুবূয়তের ফয়য (কল্যাণধারা) থেকে নবীগণ হয়েই এসেছে।
ভুল পক্ষপাতিত্ব থেকে ঊর্ধ্বে রয়ে ইনসাফ করুন, এটা একেবারে হুবহু মির্যা সাহেবের বক্তব্য (ভাষা) কিনা? ‘বাস্তবিকপক্ষে, প্রকৃত নবী তিনিই’-এর মর্মার্থ এটা ব্যতীত আর কি হতে পারে যে, ‘তিনি ব্যতীত অন্য সব নবী মাযাযী (রূপক) ও যিল্লী (ছায়া) নবী? এটাইতো মির্যা ক্বাদিয়ানী বারংবার বলেছে। আর একথাই মুহতামিম সাহেবও বললেন! উভয় বচনের মধ্যে শুধু শব্দের পার্থক্য হতে পারে, অর্থের নয়।
آپ کی نبوت کے فیض سے انبیاء بنتے چلے گئے
(হুযূর-ই আক্রামের নুবূয়তের কল্যাণ দ্বারা নবীগণ নবী হয়ে এসেছেন)- এ কথাটাও ক্বাদিয়ানীদের ওই দাবীর পক্ষে দৃঢ় সমর্থন যোগাচ্ছে যে, ‘যখন তাঁর নুবূয়তের ফয়য দ্বারা ইতোপূর্বেও নবী হয়ে এসেছেন, তখন এর কোন কারণই নেই যে, এখন এ সিলসিলাহ্ (ধারাবাহিকতা বা পরম্পরা) বন্ধ হয়ে যাবে!’
ছবির সুন্দর অবয়ব!
দেওবন্দ মাদরাসার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে ক্বাদিয়ানী ধর্ম কি পরিমাণ শক্তি পেয়েছে, এ বিষ বৃক্ষ পাতা-পল্লবে ভারী হবার কত সুযোগ তাদের হাতে এসেছে এবং তাদের মনে ভরসা যোগানের জন্য তারা কেমন কেমন ঈমান-বিধ্বংসী লেখনী উপস্থাপন করেছে, এর কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে আপনাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, এখন বেরিলী শরীফের হিদায়ত বা সঠিক দিক নির্দেশনার একটা ঝলকও দেখে নিন।
ওই বৃটিশ সা¤্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, যার বিশাল পরিধিতে সূর্য অস্ত যেতোনা, না বেরিলী শরীফের ক্ষুরধার কলমকে ক্রয় করতে পেরেছে, না এ ফিৎনার মূলোৎপাটনের ধারাবাহিকতায় ইংরেজ সরকারের ক্ষমতার দাপটের কোন ভয়াতঙ্ক বাধা হতে পেরেছে। এদিকে ফিৎনা জন্ম নিয়েছে, ওদিকে সেনাধ্যক্ষের চলমান সুন্নাত বা নিয়ম হিসেবে মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযার অসিরূপী মসি সেটার খাপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। এর পূর্ণাঙ্গ ঘটনা মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভীর ভাষায় দেখুন! এটাকে বস্তুতঃ বন্ধুর নয় বরং শত্রুর স্বীকারোক্তিই বলা যায়।
জনাব নদভী তার পীর ও মুর্শিদ শাহ্ আবদুল ক্বাদির রায়পুরীর এক ঘটনা উদ্ধৃত করতে গিয়ে লিখেছেন-
حضرت نے میرزا صاحب کی تصنیفات میں کہیں پڑھا تھا کہ ان کو خدا کی طرف سے الہام ہوا کہ اُجِیبُ کُلَّ دُعَاءِکَ اِلاَّ فِی شُرَکَاءِکَ ( میں تاِیری ہردعا قبول کرونگا سوا ان دعاؤں کے جو تمہارے شریک داروں کے بارمے ہیں ہو(-
حضرت نے میرزا صاحب کو اسی الہام اور وعدہ کا حوالہ دیکر افضل گڑھ سے خط لکھا – جس میں تحریر فرمایا کہ میري آپ سے کسی طرح كي کبھی شرکت نہیں ہے – اس لئے آپ میری ہدایت اور شرح صدر کے کیلئے دعا کریں -وہاں سے عبد الکریم صاحب کے ہاتھ کالکھاہوا جواب ملاکہ تمہارا خط پہنچا-تمہارے لئے خوب دعا کرائی گئی – تم کبھی کبھی اس کی یاددہانی کردیاکرو-حضرت فرماتے تھے که اس زمانے میں ایک پسہ کا کارڈتھا- میں تھوڑےتھوڑے وقےت کے بعد ایک کارڑدعا کی ورخواست کا ڈال دیتا-
অর্থঃ হযরত (আবদুল ক্বাদির রায়পুরী) মির্যা সাহেবের লেখনীগুলোর এক জায়গায় পড়েছিলেন, ‘তাকে খোদার তরফ থেকে ইলহাম হয়েছে যে, ‘আমি তোমার প্রত্যেক দো‘আ কবূল করবো ওই দো‘আগুলো ব্যতীত, যেগুলো তোমার শরীকদারদের সম্পর্কে করা হবে’।
হযরত (আবদুল ক্বাদির রায়পুরী) মির্যা সাহেবকে ওই ইলহাম ও ওয়াদার বরাত দিয়ে আফযালগড় থেকে চিঠি লিখলেন। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘‘আপনার সাথে আমার কোনরূপ অংশীদারিত্ব নেই। এ কারণে, আপনি আমার হিদায়ত-প্রাপ্তি ও বক্ষ সম্প্রসারণের জন্য দো‘আ করুন!’’
ওদিক থেকে আবদুল করীম সাহেবের হাতে লিখিত জবাব পেয়েছেন- ‘তোমার চিঠি পৌঁছেছে। তোমার জন্য খুব দো‘আ করা হয়েছে। তুমি কখনো কখনো এটা স্মরণ করিয়ে দিও।’
হযরত (রায়পুরী) বলছিলেন, ‘ওই যুগে এক পয়সায় পোস্টকার্ড পাওয়া যেতো। আমি কিছুদিন পরপর দো‘আর আবেদন জানিয়ে একটি করে কার্ড ডাকবাক্সে ফেলতাম।’
একদা তিনি বলেছেন, মৌলভী আহমদ রেযা খান সাহেব একবার মির্যাঈদের কিতাবগুলো সংগ্রহ করলেন। তাও এ জন্য যে, সেগুলোর খন্ডন লিখবেন। আমিও দেখেছি যে, জনাব আবদুল কাদির সাহেবের হৃদয়ের উপর ক্বাদিয়ানীর চিঠিগুলো এমন প্রভাব ফেলেছিলো যে, তিনি সেদিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। আর এমন মনে হচ্ছিলো যে, তার মতে সে সত্যবাদী ছিলো।
[সাওয়ানিহে হযরত মাওলানা আবদুল ক্বাদির রায়পুরী, পৃ.৫৫-৫৬, লেখক-মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী] এ কিতাবে আরো লেখা হয়েছে যে, কিছুদিন শাহ্ আবদুল ক্বাদির সাহেব আ’লা হযরতের দরবারেও ছিলেন; কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে আ’লা হযরতের দৃঢ় অবস্থান তার পছন্দ হয়নি। সুতরাং তিনি অন্যত্র চলে গেছেন।
উক্ত ইবারতে একদিকে মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর সাথে মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভীর পীর-মুর্শিদের কর্মকান্ড দেখুন, একজন জঘন্য মিথ্যুক ও ভন্ড নুবূয়তের দাবীদারের সাথে তার কত ভক্তি ও ভালবাসা রয়েছে! আর অন্যদিকে আ’লা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাতের ঈমান ও ইয়াক্বীনের অন্তর্দৃষ্টি, সত্য অনুধাবন এবং বাতিল দমনে প্রশস্তমনের দৃঢ়তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে। কারণ, তিনি বলেছেন যে, আ’লা হযরত দ্বীন-ইসলামের ওই শত্রু মির্যা ক্বাদিয়ানীর খন্ডনের জন্য তার লেখনীগুলো সংগ্রহ করেছিলেন।
—০—
।। দুই।।
আরেকটা তাজা কিতাব
‘খোৎবাতে হাকীমুল ইসলাম’ নামে মুহতামিম (ক্বারী ত্বাইয়্যেব) সাহেবের বক্তব্যগুলোর এক নতুন সংকলন অতি সাম্প্রতিককালে দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ ও ‘খতমে নুবূয়ত’ শিরোনামে মুহতামিম সাহেবের বক্তব্যগুলোর অবস্থা দেখুন! তিনি বলেন-
خاتم النبیین کا مطلب یہ ہے کہ نبوت ،علم اور اخلاق کے جتنے مراتب ہیں
وہ آپ کی ذات بابرکات کے اوپر ختم ہوچکے ہیں
অর্থঃ ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ এ যে, নবূয়ত, জ্ঞান ও চরিত্রের যত উচুঁ স্তর রয়েছে ওই সব ক’টি তাঁর বরকতময় সত্ত্বার উপর খতম হয়েছে।
পর্যালোচনা
তার মতে-
-ختم نبوت کا مفہوم اس اقتباس میں کتنی صفائی کے ساتھ مسخ کیا گیا ہے
(خطبات صفحہ -۴۶-قسط اول)
অর্থঃ খতমে নুবূয়তের মর্মার্থকে এ উদ্ধৃতিতে কতই পরিষ্কারভাবে বিকৃত করা হয়েছে, [খোৎবাত: প্রথম কিস্তি: পৃ. ৪৬] ختم نبوت کا معنی قطع نبوت کا نہیں کہ نبوت قطع ہوگئی ختم کے معنی تکمیل نبوت
یعنی نبوت کامل ہوگئی -(خطبات قسط اور صفحہ ۵۰ (
অর্থ: ‘খতমে নুবূয়ত’ মানে নুবূয়ত বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, ‘খতম হওয়া’ মানে নুবূয়ত পরিপূর্ণ, অর্থাৎ নুবূয়ত কামিল হয়ে গেছে। [খোৎবাত: প্রথম কিস্তি, পৃ.৫০] আর এখানে পৌঁছে মুহতামিম সাহেব তার চেহারা থেকে মুখোশটুকু একেবারে উন্মুক্ত করে ফেলেছেন। তিনি বলেছেন-
ختم نبوت کا یہ معنی لینا کہ نبوت کا دروازہ بند ہوگیا ،یہ دنیا کو دھوکا دینا ہے
-(خطبات حکیم الاسلام صفحہ۰ ۵(
অর্থঃ ‘‘খতমে নুবূয়তের এ অর্থ গ্রহণ করা যে, নবূয়তের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, দুনিয়াকে ধোঁকা দেওয়ার সামিল।’’ [খোতবাতে হাকীমুল ইসলাম, পৃ. ৫০] এখন আপনিই ইনসাফ করুন যে, যখন নুবূয়তের দরজা, তাদের মতে উন্মুক্ত রয়েছে, তখন যত নবীই এসে যাক, তাদেরকে কে বাধা দিতে পারে? (না‘ঊযুবিল্লাহ্)
সম্মানিত মুসলিম সমাজ!
আল্লাহ্ তা‘আলার মহান দরবারে অগণিত অসংখ্য হামদ ও সানা এবং হাজারো শোকর যে, তিনি আপন হাবীব-ই পাক সাহেবে লাউলাক হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আপন রিসালত ও নুবূয়তে বে-মেসাল, অনুপম এবং তাঁকে এমন সব গুণ ও বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যেগুলোতে আম ইনসান তো দূরের কথা, নবী ও রসূল পর্যন্ত শরীক নন। যেমন, সশরীর মি’রাজ তাঁকে দান করেছেন, যা কোন নবী ও রসূলকে দান করেননি। ‘শাফা‘আত-ই কুবরা’ (সর্ববৃহৎ সুপারিশ)-এর মুকুট তাঁরই শির মুবারকে রেখেছেন, খতমে নুবূয়তের মোহর তাঁরই দু’ স্কন্ধ মুবারকের মধ্যভাগে অংকন করেছেন। সুতরাং তাঁর পর কোন নবী কিংবা রসূল পয়দা হবে না। ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাঁরই রিসালতের সূর্য চমকিত থাকবে এবং তাঁর কলেমাই সমস্ত সৃষ্টির মুখে উচ্চারিত হতে থাকবে।
আমাদের আক্বা ও মাওলা হযরত আহমদ মুজতাবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘খতমে নুবূয়ত’ (সর্বশেষ নবী হওয়া) এমন গুণ ও বৈশিষ্ট্য যে, নবী করীমের পবিত্র যুগ থেকে আরম্ভ করে এ পর্যন্ত প্রত্যেক মুসলমানই এর উপর ঈমান রাখে যে, আমাদের পরম সম্মানিত রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কোন প্রকার ভিন্ন ব্যাখ্যা (তা’ভীল) ও বিশেষীকরণ ছাড়া শেষ নবী। আর সরকার-ই দু’ আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এ পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য ক্বোরআন মজীদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, আহাদীস-ই মুতাওয়াতিরাহ্ (মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীস শরীফসমূহ) ও ইজমা’-ই উম্মত দ্বারা প্রমাণিত। যে ব্যক্তি ‘খতমে নুবূয়ত’রূপী এ পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করবে, সে বাস্তবিকপক্ষে হুযূর মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যাত (সত্ত্বা) মুবারককেই অস্বীকার করে। সুতরাং সে অকাট্যভাবে কাফির। আর যে ব্যক্তি তার কুফরের মধ্যে (কাফির হবার মধ্যে) সন্দেহ করবে সেও কাফির।
এ ফিৎনাপূর্ণ যমানায় ক্বাদিয়ান অঞ্চলের এক হতভাগা, যে বিবেকভ্রষ্ট ও কান্ডজ্ঞানহীন হওয়া স্বত্ত্বেও আরবী ভাষায় একেবারে অজ্ঞ, নুবূয়তের ভন্ড দাবীদার হয়ে মুসলমানদের পরম শ্রদ্ধেয় রসূলের ‘খতমে নুবূয়ত’কে অস্বীকার করেছে আর কাফির হয়ে জাহান্নামে পৌঁছেছে। তার কোট-প্যান্ট পরিহিত ফ্যাশনী দাড়িবিশিষ্ট চেলা-চামুন্ডুরা এবং কিছুকিছু মুসলমান নামধারী ও ইসলামী আল-খেল্লা পরিহিত বে-ঈমানগণ ‘খতমে নুবূয়ত’-এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আল্লাহর ক্বহর ও গযবের অবতরণস্থল হয়েছে। না‘ঊযুবিল্লাহ্!
শেষ নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আল্লামা ড. ইক্ববাল বলেছেন-
وہ دانائے سہل ختم رسل مولائے کل +جس نے غبارراہ کو بخشافروغ وادی سینا
نگاہ عشق مستی میں وہی اول وہی آخر+ وہی قرآن وہی فرقان وہی یس وہی طہ (اقبال(
অর্থঃ বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার তিনিই (হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম), সর্বশেষ রসূল, সমস্ত সৃষ্টির মুনিব, যিনি পথের ধূলিকণাকে দান করেছেন সীনা উপত্যকার আলো।
খোদা-প্রেমে বভোর দৃষ্টিতে তিনিই সর্বপ্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনি ক্বোরআন, তিনিই ফোরক্বান, তিনিই ইয়াসীন, তিনিই ত্বোয়াহা। [আল্লামা ইক্ববাল] —০—
একটি আবেদন
বেরাদরানে ইসলাম! ‘খতমে নুবূয়ত’ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেটার গুরুত্বের অনুমান একথা থেকে অতি উৎকৃষ্টভাবে করা যেতে পারে যে, বিষয়টি ওই সব বুনিয়াদী ও মৌলিক আক্বীদাগুলোর অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো স্বীকার করে নেওয়া ব্যতীত কেউ ইসলামের গন্ডিতে প্রবেশ করতে পারে না। এ বিষয়বস্তু যদিও অত্যন্ত ব্যাপক; কিন্তু পরিসর দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গভঙ্গিতে কয়েকটা অধ্যায়ে উপস্থাপন করার প্রয়াস পাচ্ছি-। যেমন-
১. খতমে নুবূয়ত ক্বোরআনে পাকের আলোকে,
২. খতমে নুবূয়ত হাদীস শরীফের আলোকে,
৩. খতমে নুবূয়ত ইজমা’-ই সাহাবার আলোকে,
৪. খতমে নুবূয়ত ইজমা’-ই সলফে সালেহীনের আলোকে এবং
৫. বিভিন্ন সন্দেহের অপনোদন।