ক্বাদিয়ানী মতবাদ ও ব্রিটিশ সরকার

0

খতমে নুবূয়ত ও ক্বাদিয়ানী ফির্ক্বা…(ধারাবাহিক-৫)
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
মহাপরিচালক-আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

ক্বাদিয়ানী মতবাদ ও ব্রিটিশ সরকার

ঐতিহাসিকভাবে এ বাস্তবতা এতই স্পষ্ট হয়েছে যে, এখন তাতে এ মর্মে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ক্বাদিয়ানী মতবাদের জন্ম বৃটিশ সরকারের কোলেই হয়েছে। আর বৃটিশ সরকারেরই পৃষ্ঠপোষকতায় সেটা লালিত-পালিত হয়েছে। ইংরেজগণ তাদের করায়ত্বের তথাকথিত নবীকে দু’টি উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছিলোঃ
প্রথম উদ্দেশ্য এ ছিলো যে, খতমে নুবূয়তের যেই আক্বীদা ক্বোরআন মজীদ থেকে প্রমাণিত, সেটাকে এক নতুন নবী (!) পাঠিয়ে মিথ্যা ও ভুল বলে প্রমাণ করার অপচেষ্টা, আর সমগ্র দুনিয়ায় একথা প্রসিদ্ধ করে দেওয়া যে, ক্বোরআনে বর্ণিত কথা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। (না‘ঊযুবিল্লাহ্) আর এ অজুহাতে একথা প্রচার করার অপচেষ্টা যে, ক্বোরআন আল্লাহর কিতাব নয়; কেননা আল্লাহ্ তা‘আলার কথা ভুল হতে পারে না।
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য এ ছিলো যে, নবীর মুখে ও লেখনী থেকে যে কথা বের হয়, দুনিয়া সেটাকে ‘ওহী’ মনে করে কোনরূপ আপত্তি ছাড়া গ্রহণ করে নেয়। সুতরাং এমন এক নবী প্রেরণ করা হোক, যে বৃটিশ সরকারের ক্বসীদা বা প্রশংসা গাঁথা কবিতা আবৃত্তি করতে থাকবে, ফলশ্রুতিতে তারা মুসলমানদেরকে মানসিকভাবে বৃটিশ সরকারের গোলাম বানিয়ে রাখবে আর মুসলমানদের মধ্য থেকে জিহাদের প্রেরণা ও উদ্দীপনা খতম করা যাবে। এ’তে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে মুসলমানদের দিক থেকে জিহাদ ও বিদ্রোহের সম্ভাবনা চিরতরে খতম হয়ে যাবে।
এসব কথার পক্ষে প্রমাণের জন্য আমাদেরকে বাইরে কোথাও গিয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ অন্বেষণ করার প্রয়োজন নেই, খোদ্ মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী তার কলম দ্বারা এসব কথার পক্ষে প্রমাণ সরবরাহ করেছে। কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব ছাড়া, সত্য অনুধাবনের মন-মানসিকতা নিয়ে মির্যা ক্বাদিয়ানীর নি¤œলিখিত লেখনী পড়ুন! আপন মুনিব বৃটিশ সরকারের প্রশংসা করে মির্যা ক্বাদিয়ানী লিখেছে-
میں اپنے کام کو نہ مکہ میں اچھی طرح چلا سکتا ہوں نہ مدینے میں نہ روم میں نہ شام میں
نہ ایران میں نہ کابل میں ـ مگر اس گورنمنٹ میں جس كے اقبال کیلئے دعا کرتاہوں –
(اشتہار مرزاجی مندرجہ تبلیغ رسالت;ج ৬: صفحہ৬৯)
অর্থঃ আমি আমার কাজ না মক্কায় উত্তমরূপে করতে পারি, না মদীনায়, না সিরিয়ায়, না ইরানে, না কাবুলে, কিন্তু এ (ইংরেজ) সরকারের দেশেই (একমাত্র তা উত্তমরূপে সমাধা করতে পারি), যার উন্নতির জন্য আমি দো‘আ করি।
[সূত্রঃ মির্যাজীর রিসালত প্রচার : ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ.৬৯, এর বরাতে প্রচারপত্র] মির্যা ক্বাদিয়ানীর আরেকটি প্রচারপত্র পড়–ন! সে তাতে তার মদদদাতার অমনযোগিতার অভিযোগ সে কত দুঃখজনক সুরে করেছে-
بارہا بے اختیار دل میں یہ بھی خیال گزرا ہے کہ جس گورنمنٹ کی اطاعت اور خدمت گزاری کی نیت سے ہم نے کئ کتابیں مخالف جہاد اور گورنمنٹ کی اطاعت میں لکھ کر دنیا میں شائع کیں اور کافر وغیرہ اپنے نام رکھوائے اسی گورنمنٹ کو اب تک معلوم نہیں کہ ہم دن رات کیا خدمت کررہے ہیںـ میں یقین رکھتاہوں کہ ایک دن یہ گورنمنٹ عالیہ میری خدمات کی قدر کریگی (تبليغ رسالت ج- ১০ -صفحہ ২৮)
অর্থঃ অনেকবার আমার লাগামহীন হৃদয়ে এ ধারণা-কল্পনাও এসেছে যে, যে সরকারের আনুগত্য ও সেবার মানসে আমি কেয়কটা বই-পুস্তক জিহাদের বিরুদ্ধে ও সরকারের আনুগত্যের পক্ষে লিখে দুনিয়াব্যাপী প্রচার করেছি আর নিজের নাম ‘কাফির’ ইত্যাদি রাখিয়েছি, ওই সরকারের এখনো জানা নেই যে, আমি দিনরাত কত খিদমত করে যাচ্ছি! তবুও আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি যে, একদিন এ মহান সরকার আমার খিদমতগুলোর মূল্যায়ন করবে।
[সূত্র. তাবলীগে রিসালত: ১০ম খন্ড, পৃ. ২৮] ষাট বর্ষপূর্তি উদ্যাপনের সময় মির্যা ক্বাদিয়ানী বৃটেনের রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রতি এক অভিনন্দন/শুভেচ্ছাপত্র লিখেছিলো। সেটার জবাব না পেয়ে সে যেই মানসিক অস্থিরতায় ভুগেছিলো, তার বর্ণনা দেখুন-
اس عاجزکو وہ اعلی درجہ کا اخلاص اور محبت اور جوش اطاعت جو حضور مکہীء معظمہ اور اس کے معزز افرہوں کی نسبت حاصل ہے جو میں ایسے الفاظ نہیں پاتا جن میں اس اخلاص کا اندازہ بیان کرسکوں اس سچی محبت اور اخلاص کی تحریک سے جشن شصت سالہ جو بلی کی تر یب پر میں نے ایک رسالہ حضرت قیصرۃ ہند (۱) اقبالہا کے نام سے تالیف کرکے اور اس کا نام تحفئه قیصریہ رکھ کر جناب ممدوحہ کی خدمت میں بطور درذیشانہ تحفہ کے ارسال کیا تھا اور مجھے قوی یقین تھا کہ اس کے جواب سے مجھے عزت دی جائیگی اور امید سے بڑھ کر میری سرفرازی کا موجب ہوگا مگر مجھے نہایت تعجب ہے کہ ایک کلمه شاہانہ سے بھی ممنون نہیں کیا گیا (ستارئه قیصرہ صفحہ ۲ مصنفہ مرزاغلام احمد قادیانی)
অর্থঃ এ অক্ষমের মধ্যে ওই উচ্চতর স্তরের নিষ্ঠা, ভালবাসা এবং আনুগত্যের জোশ, যা সম্মানিত রাণী ও তাঁর সম্মানিত অফিসারদের প্রতি অর্জিত হয়েছে, বর্ণনার জন্য আমি এমন শব্দাবলী পাচ্ছিনা, যেগুলোতে এ নিষ্ঠার পরিমাণ বর্ণনা করতে পারবো এবং ওই ভালবাসা, নিষ্ঠার অনুমান-আন্দাজ করা যেতে পারে। এ সাচ্চা ভালবাসা ও নিষ্ঠার উচ্ছ্বাস সহকারে ষাটতম জুবিলী উপলক্ষে আমি একটি পুস্তিকা হযরত ‘ক্বায়সারাহ্-ই হিন্দ’ (ভারতের স¤্রাজ্ঞী)’র নামে রচনা করে এবং সেটার নাম ‘তোহফা-ই ক্বায়সারিয়্যাহ্’ রেখে শ্রদ্ধেয়া রাণীর দরবারে তোহফা হিসেবে প্রেরণ করেছিলাম। আর আমার মধ্যে অতিমাত্রায় ইয়াক্বীন (বিশ্বাস) ছিলো যে, সেটার উত্তর দিয়ে আমার সম্মান করা হবে, আমার আশা অপেক্ষাও বেশী পুরস্কৃত করা হবে; কিন্তু আমি আশ্চর্যান্বিত হলাম যে, আমাকে একটি রাজকীয় শব্দ দ্বারাও উপকৃত করা হয়নি। [সেতারাহ্-ই ক্বায়সারাহ্: পৃ. ২, লেখক মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী] মির্যা ক্বাদিয়ানীর উপরিউক্ত লেখনী থেকে একথা অতি উত্তমরূপে স্পষ্ট হলো যে, ক্বাদিয়ানী মতবাদের সাথে ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষক সুলভ সম্পর্ক কেমন ছিলো আর কেমন গভীর বিনয়ের প্রেরণার সাথে সে তার বানোয়াট ও বাতিল নুবূয়তকে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য ইংরেজ সরকারের থালা লেহন করেছিলো। এখন হতভম্ব নয়ন যুগল খুলে খতমে নুবূয়তের আক্বীদার বিরুদ্ধে ইংরেজদের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের আরেক হৃদয় বিদারক কাহিনী দেখুন সেটার শিরোনাম নি¤œরূপঃ

দেওবন্দ ও ক্বাদিয়ান
ক্বাদিয়ান থেকে একজন ভন্ড নবী দাঁড় করানো এবং তার আহ্বানকে ব্যাপকতর করার জন্য যেখানে ইংরেজগণ তাদের সরকারী মাধ্যমগুলো ব্যবহার করেছে, সেখানে জ্ঞানগত ও চিন্তাগতভাবে নতুন নুবূয়তের রাস্তা সুগম করার জন্য শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দীদের জ্ঞানগত ও ধর্মীয় প্রভাবাদিকেও কাজে লাগিয়েছে। এ সংক্রান্ত কথার ব্যাখ্যা এযে, কোন নতুন নুবূয়তের রাস্তায় খতমে নুবূয়তের এ ক্বোরআনী আক্বীদা সর্বদা বাধা হয়ে এসেছে। আর এ প্রসঙ্গে সঠিক আক্বীদা হচ্ছে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হলেন ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ (সর্বশেষ নবী); তাঁর পরে কোন নতুন নবী পয়দা হতে পারে না।
এখন নতুন নুবূয়তের পথে ক্বোরআনের দিক থেকে যে বাধা দন্ডায়মান ছিলো, সেটাকে দূরীভূত করার জন্য দু’টি রাস্তা ছিলো, হয়তো ক্বোরআনের ওই আয়াতকে বদলে ফেলা, যা’তে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর শব্দ দু’টি মওজূদ রয়েছে, যার অর্থ ‘আখেরী নবী’ অথবা অতঃপর ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর শব্দ দু’টি যেমন আছে তেমনি রেখে দিয়ে, সেগুলোর অর্থ বদলে ফেলা।
প্রথম রাস্তাটি সম্ভব ছিলো না। কারণ ভূ-পৃষ্ঠের উপর পবিত্র ক্বোরআনের কোটি কোটি নোসখা (কপি) এবং লাখো হাফিযে ক্বোরআন মওজূদ ছিলো এবং আছে। শাব্দিক পরিবর্তন গোপন করলেও গোপন থাকবে না। এজন্য অর্থগত পরিবর্তনের রাস্তা অবলম্বন করা হয়েছে। আর তারা বসে সিদ্ধান্ত নিলো যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ দু’টির অর্থ ‘আখেরী নবী’কে, যা সাহাবা-ই কেরামের যুগ থেকে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত সমগ্র উম্মতে প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত, বদলে ফেলা হবে আর ওই শব্দ দু’টির ওই অর্থ তালাশ করা হবে, যা কোন নতুন নবী আসার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। সুতরাং পথ থেকে এ পাথর অপসারণের জন্য ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মৌঃ ক্বাসেম নানূতবীর তথাকথিত সেবাকর্ম হাসিল করা হয়েছে। আমি নিজ থেকে তার বিরুদ্ধে কোন দোষ চাপিয়ে দিচ্ছি না, বরং খোদ্ এক ক্বাদিয়ানী পুস্তক রচয়িতা তার পুস্তক ‘ইফাদাতে ক্বাসেমিয়াহ’য় পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিতভাবে ঘটনা বর্ণনা করেছে। এ পুস্তক বছরের পর বছর ধরে ছাপানো হচ্ছে; কিন্তু দেওবন্দ থেকে এ পর্যন্ত কোন খন্ডন প্রকাশ করা হয়নি, যা থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, ‘ক্বাদিয়ানীর দিক থেকে নানূতবী সাহেবের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রচনা করা হয়েছে।’
এখন ক্বাদিয়ানী লেখক আবুল আত্বা জালন্ধরীর এ ইবারতের একেকটা লাইন গভীর মনযোগ সহকারে পড়–ন এবং মেধা ও চিন্তার সর্বনি¤œ স্তরে নেমে অতি গোপন ষড়যন্ত্রের হদিস বের করুন-
یوں محسوس ہوتاہے کہ چودھویں صدی کے سر پر آنے والا مجدد وامام مہدی اور مسیح موعود بھی تھا اور اسے امتی نبوت کے مقام سے سرفراز کیا جانے والاتھا -اس لئے اللہ تعالٰی نے اپنی خاص مصلحت سے حضرت مولوی محمد قاسم صاحب نانوتوی (بانی دار العلوم دیوبند ) کو خاتمیت محمدیہ کے اصل مفہوم کی وضاحت کے لئے رہ نمائی فرمائی اور آپ نے اپنی کتابوں اور اپنے بیانات میں آنحضرت صلی اللہ علیہ وسلم کے خاتم النبیین ہونے کی نہایت دل کش تشریح فرمائی-بلاشبہ آپ کی کتاب تحذیر الناس اس موضوع پر خاص اہمیت رکھتی ہے –
(افادات قاسمیہ صفحہ -۱ مطبوعہ ربوہ -پاکستان)
অর্থঃ এমন অনুভূত হচ্ছে যে, চতুর্দশ শতাব্দির মাথায় আগমনকারী মুজাদ্দিদ ইমাম মাহদী এবং প্রতিশ্রুত মসীহও ছিলো। আর তাকে ‘উম্মতী নুবূয়ত’-এর আসনে আসীন করে ধন্য করার ছিলো। এ জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা আপন বিশেষ স্বার্থে হযরত মৌলভী মুহাম্মদ ক্বাসেম সাহেব নানূতভী (প্রতিষ্ঠাতা, দারুল উলূম, দেওবন্দ)-কে ‘খাতামিয়াত-ই মুহাম্মাদিয়াহ্’ (হযরত মুহাম্মদ শেষ নবী হবার) আসল অর্থ সুস্পষ্ট করার জন্য পথ-প্রদর্শন করেছেন। আর তিনিও তাঁর কিতাবগুলো এবং বক্তব্যগুলোতে আঁ-হযরত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ (সর্বশেষ নবী) হবার হৃদয়গ্রাহী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তাঁর কিতাব ‘তাহযীরুন্ নাস’ এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। [ইফাদাত-ই ক্বাসেমিয়্যাহ্: পৃ.-১, রাব্ওয়াহ, পাকিস্তান-এ মুদ্রিত] دیکھ رہے ہیں آپ ساحران افرنگ کا یہ تماشا!
অর্থঃ আপনারা দেখছেন তো ইংরেজ যাদুকরদের এ তামাশা! কতই চতুরতার সাথে এক অতি লজ্জাজনক ষড়যন্ত্রকে ‘ইলহাম’ (খোদায়ী প্রেরণা)’র রং দেওয়া হচ্ছে? তারা এমনভাবে দেখাচ্ছে যেন এসব ব্যবস্থাপনা সর্বশক্তিমান খোদা তা‘আলার পক্ষ থেকেই ছিলো! অর্থাৎ মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর ভন্ড নুবূয়তের দাবীর পূর্বে নানূতভী যেন ‘তাহযীরুন্ নাস’ নামের একটি পুস্তক লিখে আর তাতে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ ‘আখেরী নবী’ কে অস্বীকার করে এক নতুন নবীর আগমনের জন্য রাস্তা সুগম করে দেয়। নানূতভী তার কিতাব (পুস্তক) ‘তাহযীরুন্ নাস’-এ একথার পরিপূর্ণ চেষ্টা করেছে যেন ‘সাপও মরে যায়, লাঠিও না ভাঙ্গে’। অর্থাৎ ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দের অস্বীকৃতিও প্রকাশ না পায়; নতুন নবীর আগমনের জন্য রাস্তাও সুগম হয়ে যায়; যাতে ইংরেজদের নিমকের হক্বও আদায় হয়ে যায়, মুসলমানদেরকেও যেন ধোঁকা-প্রতারণার শিকার করে রাখা যায়। আর যাতে তারা একথাও বলতে পারে, ‘আমরা তো খতমে নুবূয়তের অস্বীকার করছিনা।’
পক্ষান্তরে, আল্লাহ্ তা‘আলা শুভ প্রতিদান দিন ওইসব সত্যপন্থী আলিমকে, যাঁরা ‘তাহযীরুন্ নাস’-এর ধোঁকার পর্দা ছিঁড়ে ফেলেন, ‘খতমে নুবূয়ত’ আর আক্বীদার বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রকে সবসময়ের জন্য ফাঁশ করে দিয়েছেন।
সম্মানিত পাঠকগণ, আপনারা যদি একথা জানতে চান যে, ‘তাহযীরুন্ নাস’ নামক কিতাব বা পুস্তকে কি আছে? ক্বাদিয়ানী লেখকগণ এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ কেন? আর এ কিতাব দ্বারা নানূতভী নতুন নবীর আগমনের জন্য পথ কিভাবে সুগম করলো? তাহলে সব ধরনের পক্ষপাতিত্ব থেকে ঊর্ধ্বে উঠে, অতি সরল মন নিয়ে সামনে কৃত আলোচনা পড়–ন! ষড়যন্ত্রের এ কাহিনী অতি দীর্ঘ এবং অতি ধোঁকাপূর্ণ!

‘তাহযীরুন নাস’-এর ধোঁকাপূর্ণ ষড়যন্ত্রের কাহিনী
আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছুই না বলে এ পূর্ণ কাহিনী ক্বাদিয়ানী লেখকদের মুখ তথা লেখনী থেকে শুনুন/দেখুন! ভূমিকা স্বরূপ এক ক্বাদিয়ানী লেখক এ কাহিনীর সূচনা করেছে। তার বক্তব্য হচ্ছে-
بعض لوگ یہ خیال کرتے ہیں کہ احمدی (یعنی قادیانی) ختم نبوت کے قائل نہیں ہیں اور رسول کریم ﷺ کو خاتم النبیین نہیں مانتے – یہ مخص دھوکے اور ناواقفیت کا نتیجہ ہے -جب احمدی اپنے آپ کو مسلمان کہتے ہیں اور کلهبء شہادت پر یقین رکھتے ہیں تو یہ کیونکر ہوسکتاہے کہ وہ ختم نبوت کے منکر ہوں اور رسول کریم ﷺ کو خاتم النبیین نہ مانیں ؟
قرآن کریم میں صاف طور پر اللہ تعالٰی فرماتاہے -وَخَاتَمَ النَّبِیِّینَ – (سورہ احزاب : آیت ৩০) یعنی محمد رسول اللہ ﷺ تم میں سے نه کسی جوان مرد کے باپ ہیں نہ آئندہ ہونگے لیکن اللہ تعالٰی کے رسول اور خاتم النبیین هیں ـقرآن کریم پر ایمان رکھنے والا آدمی اس آیت کا انکار کس طرح کرسکتاہے -پس احدنیوں کا ہرگز یہ عقیدہ نہیں ہے کہ رسول کریم ﷺ (نعوذباللہ) خاتم النبیین نہیں تھے –
অর্থঃ কিছুলোক মনে করে যে, আহমদী (অর্থাৎ ক্বাদিয়ানী ফির্ক্বার লোকেরা) ‘খতমে নুবূয়তে’ বিশ্বাসী নয় বরং রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ মানে না। এটা অত্যন্ত ধোঁকা ও অজ্ঞতার ফলশ্রুতি। যখন আহমদীরা নিজেরা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করে এবং কলেমা-ই শাহাদতে বিশ্বাসী, তখন এটা কিভাবে হতে পারে যে, তারা খতমে নুবূয়তে বিশ্বাস করে না? আর রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ মানে না?
ক্বোরআন করীমে পরিষ্কার ভাষায় এরশাদ হয়েছে- ‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে কোন যুবক পুরুষের পিতা নন। (না আগামীতেও হবেন), কিন্তু তিনি আল্লাহ্ তা‘আলার রসূল ও ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ (সর্বশেষ নবী)।
ক্বোরআন করীমের উপর ঈমান রাখে এমন মানুষ এ আয়াতে করীমাকে অস্বীকার কীভাবে করতে পারে? সুতরাং আহমদীদের মোটেই এ আক্বীদা নয় যে, রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, না‘ঊযুবিল্লাহ্, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ ছিলেন না।
جو کچھ احمدی کہتے ہیں وہ صرف يه کہ خاتم النبیین کے وہ معنی جو اس وقت مسلمانوں میں رائج ہیں نہ توقرآن کریم کی مذکورہ بالا آیت پر چساکن ہوتے ہیں اورنہ ان سے رسول کریم ﷺ کی عزت اور شان اس طرح ظاہر ہوتی ہے جس عزت اور شان کی طرف اس آیت میں اشارہ کیا گیاہے – (پیغام احد یت -صفحہ ۱۰ (
অর্থঃ যা কিছু আহমদিরা বলে, তা শুধু এ যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর ওই অর্থ, যা এ সময়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত আছে, না ক্বোরআনে করীমের উপরিউল্লিখিত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, না তা থেকে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ইয্যাত ও শান এভাবে প্রকাশ পায়, যেই ইয্যাত ও শানের দিকে এ আয়াতে ইশারা করা হয়েছে। [পয়গামে আহমদিয়াত: পৃ. ১০] উপরিউক্ত ইবারত বা বচনের লাইনগুলো সহকারে আরো একবার গভীরভাবে পড়–ন! আলোচনার এ অংশটাই ষড়যন্ত্রের বুনিয়াদ। এখন থেকেই ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর ওই অর্থের অস্বীকারের রাস্তা খুলেছে, যা নতুন নবীর পথে বাধা।
উপরোক্ত ইবারতের আলোকে ক্বাদিয়ানীদের এ দাবী অতি উত্তমরূপে আপনাদের হৃদয়ঙ্গম হবে যে, তারা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ হবার বিষয়টি অস্বীকার করছে না, বরং ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর ওই অর্থ অস্বীকার করছে, যা আম মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত। আর এ অস্বীকারের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে ‘খতমে নুবূয়তের’ অস্বীকারকারী বলা হয়।
এখন এটা দেখতে হবে যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর ওই কোন্ অর্থ, যা আম মুসলমানদের নিকট প্রচলিত? আর সর্বপ্রথম এ অর্থের অস্বীকার কে করেছে? এতটুকু বিস্তারিত আলোচনার পর এখন চতুর্দিক থেকে মনকে মুক্ত করে ‘তাহযীরুন নাস’-এর লেখক মৌং মুহাম্মদ কাসেম নানূতভীর কর্মকান্ড সম্পর্কে এক ক্বাদিয়ানী লেখকের এ বর্ণনা পড়–ন আর ‘খতমে নুবূয়ত’-এর আক্বীদার অস্বীকারের ধারাবাহিকতায় আসল অপরাধী কে তার হদিস বের করুন!
ওই ক্বাদিয়ানী লেখকের বক্তব্য হচ্ছে-
تمام مسلمان فرقوں کا اس پر اتفاق ہے کہ سرورکائنات حضرت محمد مصطفے ﷺ خاتم النبیین ہیں -کیونکہ قرآن مجید کی نص وَلَکِن رَّسُولَ اللہِ وَخَاتَمَ النَّبِیینَ میں آپ کو خاتم النبیین قرار دیاگیاہے -نیز اس امر پر بھی تمام مسلمانوں کا اتفاق ہے کہ حضور علیہ الصلواۃ والسلام کے لئے لفظ خاتم النبیین بطور مدح وفضیلت ذکر ہواہے -اب سوال صرف یہ ہے کہ لفظ خاتَمُ النَّبِیِّینَ کے کیا معنی ہیں- -یقینًا اسکے معنی ایسے هی ہونی چاہئے جن سے آنحضرت صلى الله عليه وسلم كي فضيلت اور مدح ثابت ہو-
اس بناپر حضرت مولوی محمد قاسم صاحب نانوتوی بانی مدرسہ دیوبند نے عوام کے معنوں کو نادرست قرار دیاہے- آپ تحریر فرماتے ہیں -عوام کے خیال میں تو رسول اللہ ﷺ کا خاتم ہونا بایں معنی ہے کہ آپ کا زمانہ انبیاء سابق کے زمانے کے بعد ہے اور آپ سب میں آخری نبی ہیں – مگر اہل فہم پر روشن ہوگا کہ تقدم اور تاخرزمانی میں بالذات کچھ فضیلت نہیں -پھر مقام مدح میں ولکن رسول اللہ وخاتم النبیین فرمایا – اس صورت میں کیونکرصحیح ہوسکتاہے -(تحذیر الناس صفحہ ۳اوررسالۃ خاتم النبیین کے بہترین معنی صفحہ ۴ شائع کردہ قادیانی)

অর্থঃ মুসলমানদের মধ্যে সকল দল উপদল একথার উপর একমত যে, সরওয়ার-ই কায়েনাত হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’। কেননা, ক্বোরআন মজীদের ‘নাস্’ (বর্ণনা) وَلكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ -এর মধ্যে তাঁকে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাছাড়া একথার উপরও সমস্ত মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর জন্য ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ দু’টি প্রশংসা ও ফযীলতরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু এটাই যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ দু’টির অর্থ কি? নিশ্চয় এ দু’টির অর্থ এমন হওয়া চাই, যা দ্বারা আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ফযীলত ও প্রশংসা প্রমাণিত হয়।
এতদ্ভিত্তিতে হযরত মৌলভী মুহাম্মদ ক্বাসেম সাহেব নানূতভী, দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা, সাধারণ লোকদের কৃত অর্থকে অশুদ্ধ সাব্যস্ত করেছেন, তিনি লিখেছেন- ‘আওয়াম (সাধারণ লোক)-এর ধারণায় তো রসূলুল্লাহ্ সাল‘আম (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ হওয়া এ অর্থে যে, তাঁর যমানা (যুগ) পূর্ববর্তী নবীগণের পর আর তিনি সবার মধ্যে সর্বশেষ নবী; কিন্তু বিশেষ উল্লেখযোগ্য বুঝশক্তিসম্পন্নদের নিকট একথা সুস্পষ্ট হবে যে, যমানা (যুগ) আগে/পরে হবার মধ্যে স্বত্ত্বাগতভাবে কোন ফযীলত নেই। তারপর প্রশংসার স্থলে وَلكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ এরশাদ করেছেন। এটা এমতাবস্থায় কীভাবে শুদ্ধ হতে পারে?
[তাহযীরুন্ নাস: পৃ. ৩, রিসালা-ই খাতামুন্ নবিয়্যীন কে বেহতরীন মা’না: পৃ.৪, কাদিয়ান থেকে প্রকাশিত] সহজ শব্দাবলীতে নানূতবী সাহেবের এ ইবারতের মর্মার্থ এ যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ দু’টির অর্থ ‘আখেরী নবী’ সাব্যস্ত করা মুর্খ আওয়ামের ধারণা, যা কোন মতেই বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখার উপযোগী নয়। বুঝ শক্তি সম্পন্ন শ্রেণীর লোকেরা এ শব্দ দু’টির অর্থ ‘আখেরী নবী’ মনে করেন না। কেননা যমানা অনুসারে কারো পূর্বে আসা অথবা পরবর্তীতে আসা কোন বিশেষ প্রশংসা ও ফযীলতের বিষয় নয়। এ শব্দ দু’টির অর্থ ‘আখেরী নবী’ সাব্যস্ত করার মধ্যে যেহেতু হুযূর-ই আক্রামের কোন খাস ফযীলত বের হয় না, সেহেতু এ অর্থ যদি নেওয়া হয়, তবে প্রশংসার স্থলে وَلكِنْ رَّسُوْلَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ উল্লেখ করা নিষ্ফল হয়ে যাবে।
গভীরভাবে লক্ষ্য করুন! প্রায় দেড় হাজার বছরের দীর্ঘ সময়-সীমায়, সাহাবা-ই কেরামের যুগ থেকে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে সমগ্র উম্মতের একথার উপর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ আখেরী নবী। এ শব্দ যুগল দ্বারা যদি হুযূর-ই আক্রামকে ‘আখেরী নবী’ না মানা হয়, তবে নতুন নবীর আগমনের পথ কোন দলীল দ্বারা বন্ধ করা যাবে?
সমগ্র উম্মতের মধ্যে নানূতবী সাহেব ওই প্রথম ব্যক্তি, যে ইংরেজদের নিমক হালালী করার জন্য হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আখেরী নবী মানতে অস্বীকার করেছে; যাতে ক্বাদিয়ান থেকে এক নতুন নবীর আগমনের জন্য পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।
নানূতবী সাহেবের সমর্থকদের মুখ বন্ধ করার জন্য আমি এ মাসআলায় তারই ঘরের এক মজবুত সাক্ষ্য পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি। দেওবন্দী জমা‘আতের নির্ভরযোগ্য উকিল মৌং মনযূর নো’মানী তার পুস্তক ‘ইরানী ইনক্বিলাব’-এ লিখেছেন-
یہ عقیدہ کہ نبوت کا سلسلہ ختم نہیں ہوا ، رسول للہ ﷺ کے بعد بھی کوئی نبی آسکتاہے – ان آیات قرآنی اور احادیث متواتر ہ کی تکذیب هے جن میں رسول اللہ ﷺ کا خاتم النبیین اور آخری نبی ہونا بیان فرمایا گیا -(ايرانی انقلاب صفحہ۱ ۸)
অর্থঃ নবী আসার পরম্পরা (সিলসিলাহ্) খতম হয়নি, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পরও কোন নবী আসতে পারে বলে বিশ্বাস করা ক্বোরআনের ওইসব আয়াত ও মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীসসমূহকে অস্বীকার করার নামান্তর, যেগুলোতে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম খাতামুন্ নবিয়্যীন বা আখেরী নবী হবার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
[ইরানী ইন্ক্বিলাব: পৃ.-৮১] এ ইবারত উচ্চস্বরে বলছে যে, যে ব্যক্তি হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আখেরী নবী মানে না, সে ক্বোরআনের বহু আয়াত ও মুতাওয়াতির পর্যায়ের বহু হাদীসকে অস্বীকার করে আর অন্য ভাষায় নতুন নবীর আগমনের দরজা খোলা রাখতে চাচ্ছে।
এটাও নাকি ওই মূল্যবান খিদমত, যার পুরষ্কার স্বরূপ ক্বাদিয়ানী জমা‘আতের দিক থেকে মৌং ক্বাসেম নানূতভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হচ্ছে! যেমন এক ক্বাদিয়ানী লেখক লিখেছে-
جماعت احمدیہ خاتم النبیین کے معنوں کی تشریح میں اسی مسلک پر قائم ہے جو ہم نے مسطور بالا میں جناب مولوی محمد قاسم نانوتوی کے حوالہ جات سے ذکر کیا ہے –
(افادات قاسمیہ صفحہ۶ ۱)
অর্থঃ আহমদিয়া জমা‘আত, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থের ব্যাখ্যায়, ওই মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, যা আমি উপরোক্ত লাইনগুলোতে জনাব মৌলভী কাসেম নানূতভীর বরাতে উল্লেখ করেছি। [ইফাদাতে ক্বাসেমিয়াহ: পৃ.১৬] এক মা’মূলী মন-মানসিকতার মানুষও এতটুকু কথা সহজে বুঝতে পারে যে, কেউ তার বিরোধী মতবাদের উপর ক্বায়েম থাকার অঙ্গিকার মোটেই করতে পারে না। পেছনে পেছনে চলার নিষ্ঠাপূর্ণ প্রেরণা ওই ব্যক্তির অন্তরে সৃষ্টি হতে পারে, যাকে নিজের সফরসঙ্গী ও নেতা মনে করা হয়।

একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ
ইতোপূর্বে ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থের পরম্পরায় ক্বাদিয়ানী লেখকদের ইবারতগুলো আপনাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে আর মৌং কাসেম নানূতভীর ওই লেখনীও আপনারা পড়েছেন, যার সমর্থনে ক্বাদিয়ানী পুস্তক-প্রণেতা ‘তাহযীরুন্ নাস’- থেকে উদ্ধৃত করেছে। এখন ওই ফলাফলে গভীরভাবে দৃষ্টি দিন, যা ওই ইবারতগুলো বিশ্লেষণ করার ফলে সামনে আসে, যাতে এ বাস্তবাবস্থা ও আপনার সামনে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, দেওবন্দ ও ক্বাদিয়ানের মধ্যে চিন্তাও দলীল গ্রহণের মধ্যে কত গভীর মিল রয়েছে! আর দেওবন্দ শুধু ওহাবী মতবাদেরই নয় বরং ক্বাদিয়ানী মতবাদেরও ‘মুহসিন-ই আ’যম’ (বড় সমর্থক বরং পৃষ্ঠপোষক)ঃ
১. প্রথম কথা হচ্ছে- ‘‘মাওলানা ক্বাসেম নানূতভীর স্পষ্ট বর্ণনানুসারে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ দু’টি থেকে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ‘শেষ নবী’ মনে করা মা‘আযাল্লাহ্, জ্ঞানহীন ও বুঝ শক্তিহীন সাধারণ লোকদেরই প্রথা। উম্মতের সমঝদার পর্যায়ের লোকেরা ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ শব্দ দু’টি দ্বারা ‘আখেরী নবী (সর্বশেষ নবী) অর্থ বুঝে না।’’ ওইসব সমঝদার লোকদের মধ্যে একজন মৌং ক্বাসেম নানূতবীও আছে।
২. দ্বিতীয় কথা হচ্ছে- ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর ঐকমত্যের অর্থকে পরিবর্তিত করে হুযূর-ই আক্রামের আখেরী নবী হওয়াকে অস্বীকার সর্বপ্রথম মৌং ক্বাসেম নানূতভী করেছে। কেননা, ক্বাদিয়ানীরা যদি অস্বীকারের সূচনা করতো, তবে তারা কখনো একথা ঘোষণা করতো না যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থের ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় আহমদিয়া জামা‘আত (ক্বাদিয়ানী সম্প্রদায়) মৌং ক্বাসেম নানূতভীর মতবাদের উপর ক্বায়েম রয়েছে।
৩. তৃতীয় কথা হচ্ছে- ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর অর্থ ‘আখেরী নবী’র অস্বীকার করার ধারাবাহিকতায় মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী ও মৌং নানূতভীর চিন্তার ধরণ ও দলীল গ্রহণে পূর্ণ ঐক্য রয়েছে।
সুতরাং ক্বাদিয়ানীদের এখানেও ‘খাতামুন নবিয়্যীন’-এর মূল মর্মার্থকে বিকৃত করার জন্য হুযূর-ই পূরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মহা মর্যাদার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। আর নানূতভী সাহেবও ‘প্রশংসার স্থান’ বলে আখেরী নবীর অর্থ অস্বীকার করার জন্য হুযূর-ই আক্রামের মহা মর্যাদাকেই বুনিয়াদ বানাচ্ছে।
ওখানেও বলা হয়েছে যে, ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’-এর শব্দ থেকে হুযূর-ই আক্রামকে ‘আখেরী নবী’ মনে করা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত। আর এখানেও বলা হচ্ছে যে, ‘এ অর্থ সাধারণ মানুষের ধারণারই ফসল।’
এত বিরাট সামঞ্জস্য বা মিলগুলোর পর এখন কে বলতে পারে যে, এ মাসআলায় উভয়ের চিন্তা ও চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দু পৃথক পৃথক? দুনিয়া থেকে ন্যায় বিচার যদি চিরতরে বিদায় না নিয়ে থাকে, তবে এ কথা অস্বীকারের অবকাশই নেই যে, ক্বাদিয়ানী ও দেওবন্দী একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ অথবা একই গন্তব্যস্থলের দিকে দু’জন মুসাফির; কেউ তাতে পৌঁছে গেছে, অন্যজন পথে আছে।
সুতরাং ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ মানে ‘আখেরী নবী’ অস্বীকারের ভিত্তির উপর যদি ক্বাদিয়ানী জমা‘আতকে ‘খতমে নুবূয়ত’-এর অস্বীকারকারী বলা বাস্তব হয়, তবে এ অস্বীকারের ভিত্তির উপর দেওবন্দী জামা‘আতকেও ‘খতমে নুবূয়ত’-এর অস্বীকারকারী সাব্যস্ত না করার কোন উপায় নেই।
ৃاگر بفرض آپ کے زمانے میں بھی کہیں اور نبی ہوجب
بھی آپ کا خاتم ہونا بدستور قائم رهابہے -(تحذیر الناس صفحہ۲ ۱)
অর্থঃ যদি কল্পনা করা হয় যে, হুযূর-ই আক্রামের যমানায়ও কোথাও অন্য নবী এসে যায়, তবুও তাঁর ‘খাতাম’ (শেষ নবী) হওয়া নিয়ম মাফিক কায়েম থাকে।
[তাযীরুন্ নাস: পৃ.-১২] اگر بفرض بعد زمانئه نبوت صلعم بھی کو ئی نبی پیدا ہوتو پھر
بھی خاتمیت محمدی میں کوئی فرق نہ آئیگا (صفحہ۸ ۲)
অর্থঃ যদি কল্পনা করা হয় যে, নবী করীমের যমানার পরও কোন নবী পয়দা হয়, তবুও হযরত মুহাম্মদের ‘শেষ নবী’ হবার ক্ষেত্রে কোন ক্ষতি হবে না। [প্রাগুক্ত:পৃ.-২৮] গভীরভাবে লক্ষ্য করুন, যখন দেওবন্দী জমা‘আতের নিকটও কোন অসুবিধা ছাড়াই হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নতুন নবী পয়দা হতে পারে, তখন শুধু ক্বাদিয়ানীদেরই অপরাধ হবে কেন? যে বিষয়টি দেওবন্দীদের মতে জায়েয ও সম্ভবপর ছিলো, তাতো ক্বাদিয়ানীদের দ্বারা সংঘটিত হয়। মূল কুফর তো নতুন নবী আসা বৈধ ও সম্ভবপর মানার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। যখন তা কুফর থাকেনি, তখন কোন নতুন নবীর দাবীদারকে তার দাবী থেকে বিরত রাখার আমাদের নিকট উপায়ই বা কী রইলো?
কেননা, এ পথে আক্বীদার, যা সর্বাপেক্ষা মজবুত দেয়াল বা অন্তরায় ছিলো, তা তো এটাই ছিলো যে, ক্বোরআন ও হাদীসের ‘নুসূস’ (দলীলগুলো) এবং উম্মতের ইজমা’। যেহেতু হুযূর-ই আক্রাম আখেরী নবী, সেহেতু হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর আর কোন নতুন নবী কখনো পয়দা হতে পারে না; কিন্তু যখন দেওবন্দী জমা‘আতের মতে হুযূর-ই আক্রাম আখেরী নবীও নন, আর কোন নতুন নবী আসলেও হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘খাতামিয়াত’ (শেষ নবী হওয়া)’র মধ্যে কোন বাধা আসবে না, তখন আপনিই ইনসাফ করুন! এখন, বলুন, কোন্ ভিত্তির উপর কোন ভন্ড নুবূয়তের দাবীদারকে তার দাবী থেকে বিরত রাখা যাবে? আর কোন দলীল দ্বারা কোন নতুন ও ভন্ড নবীর উপর ঈমান আনা কুফরী সাব্যস্ত হবে? এ জন্য একথা মানতে হবে যে, বুনিয়াদী প্রশ্ন অনুসারে দেওবন্দী জমা‘আত ও ক্বাদিয়ানী জমা‘আতের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আর উপরোক্ত সপ্রমাণ বর্ণনা ও মত প্রকাশের সাথে যদি দেওবন্দী ধর্মের আলিমদের বিরোধ বা দ্বিমত থাকে, তবে তারা যেন প্রকাশ্যে এ কথার ঘোষণা দেয় যে, ‘তাহযীরুন্ নাস’ তাদের পুস্তক (কিতাব) নয়। আর যদি এটা সম্ভবপর না হয়, তবে যেন ‘তাহযীরুন্ নাস’-এ কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা’-ই উম্মত দ্বারা প্রমাণিত যে দু’টি বুনিয়াদী আক্বীদাকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং যার ফলশ্রুতিতে হুযূর খাতেমে পয়গম্বরাঁ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর কোন নতুন নবী (!) আসার দরজা খুলে যায়, সেটার বিরুদ্ধে ফাত্ওয়ার ভাষায় নিজেদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অসন্তুষ্টি বা সম্পর্কহীনতার পরিষ্কারভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়!
প্রকাশ থাকে যে, ওই দু’টি বুনিয়াদী আক্বীদা, যেগুলো ‘তাযীরুন্ নাস’-এ অস্বীকার করা হয়েছে, ‘নি¤œরূপঃ
প্রথম আক্বীদাঃ ‘খাতামুন্ নবিয়্যীন’ মানে আখেরী নবী।
দ্বিতীয় আক্বীদাঃ কোন নতুন নবী আসলে হুযূর-ই আক্রামের ‘খাতামিয়াত’ (শেষ নবী হওয়া) অবশিষ্ট থাকতে পারে না।
কিন্তু আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আছে যে, দেওবন্দী আলিমগণ ‘তাহযীরুন্ নাস’-এর বিরুদ্ধে এ ঘোষণা কখনো দেবে না। কেননা, তারা ইসলামের এ দু’টি বুনিয়াদী আক্বীদা এখনো পোষণ করেনি। মোটকথা, কোন কারণে যদি তারা এমনটি করতে প্রস্তুত না হয়, তবে ইসলামী দুনিয়া ক্বাদিয়ানী জমা‘আতকে যে অপরাধে অপরাধী করছে, ওই অপরাধে দেওবন্দী জমা‘আতকেও অপরাধী সাব্যস্ত করবে।