খতমে নুবূয়ত ও ক্বাদিয়ানী ফির্ক্বা

0

খতমে নুবূয়ত ও ক্বাদিয়ানী ফির্ক্বা…(ধারাবাহিক-4)
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
মহাপরিচালক-আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

পক্ষান্তরে, মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর জঘন্য কান্ড!
‘খতমে নুবূয়ত’-এর আক্বীদা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার পর এখন আমি ‘খতমে নবূয়ত’-এর অস্বীকারকারীদের নেতা মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানীর দাবীগুলো(!)’রও পুংখানুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করতে চাই, যাতে যেসব লোক অজ্ঞতা ও কুফরের অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছে, তারা ঈমান ও হিদায়তের আলোয় এসে যেতে পারে।
প্রথমে দেখুন মির্যা গোলাম আহমদের দাবীগুলো। সে দাবী করেছে, ‘‘১. আমি নবী, ২. খোদ্ খোদা আমার নাম নবী ও রসূল রেখেছেন, ৩. আমি যিল্লী নবী (ছায়ানবী), ৪. আমি বুরূযী নবী, ৫. আমি প্রতিশ্রুত মসীহ্ (মসীহ-ই মও‘ঊদ), ৬. আমি মাহদী, ৭. আমি মুজাদ্দিদ, ৮. আমি (হযরত) মুহাম্মদ-এর দ্বিতীয় প্রেরণ। (অর্থাৎ আমার দেহে খোদ্ হযরত মুহাম্মদ আত্মপ্রকাশ করেছেন), ৯. আমি হযরত ঈসা মসীহের সুসংবাদ এবং ‘ইসমুহূ আহমদ’ (হযরত ঈসা তাঁর পরে যে নবী ‘আহমদ’-এর শুভাগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন তিনি) আমিই। সেটা আমার নাম।’’ না‘ঊযু বিল্লা-হি মিন যালিকা। [ক্বাদিয়ানীর পুস্তক- পুস্তিকাদি থেকে সংকলিত] ওইগুলো হচ্ছে ওইসব দাবী, যেগুলো মির্যা গোলাম আহমদ করেছিলো। এ দাবীগুলো এক ধরনের পরস্পর বিরোধীও। কারণ, এগুলো এক ব্যক্তির মধ্যে এক সাথে প্রাপ্ত হওয়া সম্ভবপর নয়; কিন্তু তবুও তার এক মুখে এতসব দাবী উচ্চারিত হয়েছে।
এখন গোলাম আহমদের ওই দাবীগুলোর যাচাই-বাছাই করা যাক! তার কোন অপরিচিত মানুষ তার এসব দাবীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হবে সেগুলো হচ্ছে-
১. অসম্ভব কল্পনায়, যদি সে খোদা তা‘আলার পক্ষ থেকে ওইসব অর্থে নবী ও রসূল হয়, যে সব অর্থে পূর্ববর্তী সকল নবী ও রসূল (আলায়হিমুস্ সালাম) ছিলেন, তাহলে সে ‘যিল্লী’ ও ‘বুরূযী’ নবী হবার মতো তালি-জোড়া দিলো কেন? যখন পূর্ববর্তী নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর মধ্যে প্রত্যেকে প্রকৃত ও আসলী নবী ছিলেন, কেউ তো নিজেকে ‘যিল্লী’ ও ‘বুরূযী’ নবী হবার দাবী করেননি!
২. যদি যিল্লী ও বুরূযী নবী ওইসব অর্থে নবীই না হয়, যেসব অর্থে পবিত্র ক্বোরআন ‘নবী’ শব্দ ব্যবহার করেছে, তাহলে ক্বোরআনী নবীর মতো, তার উপর ঈমান আনার জন্য আহ্বানই বা কেন করা হয়? আর এমন এক পরিভাষা, যা নবীগণের ইতিহাসেও পাওয়া যায় না, কেন বের করা হলো?
৩. মির্যা ক্বাদিয়ানী তার দাবী অনুসারে যদি প্রতিশ্রুত মসীহ্ হয়, তাহলে যিল্লী ও বুরূযী নবী হবার দাবী করাই ভুল। কেননা, প্রতিশ্রুত মসীহ্ তো একজন স্বতন্ত্র নবী; যিল্লী ও বুরূযী নবী নন। তাছাড়া, প্রতিশ্রুত নিছক মসীহই নন; বরং তিনি হলেন হযরত মসীহ্ ইবনে মরিয়াম। সুতরাং তার সম্পর্কে আরো একটি প্রশ্ন জাগে যে, এ ‘গোলাম ইবনে চাঁন্দ বিবি’ মসীহ ইবনে মরিয়াম হয়ে গেলো কিভাবে?
৪. যদি সে ‘মাহদী’ হয়, তবে তো ‘মসীহ্-ই মাও‘ঊদ’ হতে পারে না। কেননা, এ দু’ নামের নামীয় ব্যক্তি এক নন; পরস্পর পৃথক পৃথক। অর্থাৎ মাহদী এবং মসীহ-ই মাও‘ঊদ দু’জন পৃথক পৃথক ব্যক্তি। আর হাদীস শরীফসমূহের বর্ণনা মোতাবেক উভয়ের প্রকাশও পৃথক পৃথক যুগে। তাছাড়া, হযরত মসীহ্-ই মাও‘ঊদ আলায়হিস্ সালাম হবেন পয়গাম্বর। যখন হযরত ইমাম মাহদী পয়গাম্বর নন; বরং উম্মতে মুহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর এক ব্যক্তি, তখন এ কারণে দু’জন পৃথক পৃথক ব্যক্তিকে একজন লোক বলে সাব্যস্ত করা নিতান্তই প্রতারণা ও ডাহা মিথ্যা।
৫. যদি মির্যা ক্বাদিয়ানী ‘মুজাদ্দিদ’ হয়, তাহলে নবী হবার দাবী করা মারাত্মক ভুল। কেননা, হাদীস শরীফের স্পষ্ট বর্ণনানুসারে, মুজাদ্দিদ নবী হন না; বরং উম্মতের লোকদের মধ্যে তাঁর অবস্থান হচ্ছে শুধু একজন ধর্মীয় সংস্কারকেরই। সুতরাং ‘মুজাদ্দিদ’ হবার দাবী যদি শুদ্ধ বলে কিছুক্ষণের জন্য মেনেও নেওয়া হয়, তাহলে তার নবী হবার দাবীকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে মেনে নিতেই হবে। আর অসম্ভব কল্পনায়, যদি নবী ও রসূল হবার দাবীকে বিশুদ্ধ বলে মেনেও নেওয়া হয়, তবে তার ‘মুজাদ্দিদ’ হবার দাবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতেই হবে। কেননা, এ দু’টি দাবী এক সাথে করাই যেতে পারে না। সুতরাং ক্বাদিয়ানীর উভয় দাবীই ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য।
৬. যদি মির্যা ক্বাদিয়ানীর দাবী অনুসারে তাকে (হযরত) মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর দ্বিতীয়বার প্রেরণই বলা হয়, তাহলে তো, আল্লাহরই পানাহ্! সে মুহাম্মদই হলো, কেননা, ক্বিয়ামতের দিনে আদম সন্তানদের যেই পুনরুত্থান হবে, সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার মূল অস্তিত্বের সাথে উত্থিত হবে, ছায়ারূপে হবে না। সুতরাং এমতাবস্থায় হয়তো যিল্লী ও বুরূযী হবার দাবী ভুল অথবা (হযরত) মুহাম্মদ মোস্তফার দ্বিতীয়বার প্রেরিত হবার দাবীও মিথ্যা এবং অমূলক।
৭. বাকী রইলো মির্যা ক্বাদিয়ানীর এ দাবী- সে নাকি হযরত ঈসা মসীহ্ আলায়হিস্ সালাম-এর সুসংবাদ এবং ‘ইসমুহু আহমদ’-এর বাস্তবায়নও। সুতরাং মির্যা ক্বাদিয়ানীর এ দাবীর অসারতার কোন পর্যালোচনা করারও কোন দরকার নেই। কেননা, যদি হযরত মসীহ্ ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর সুসংবাদ ও তাঁর বাণী ‘ইসমুহূ আহমদ’ মীর্জা ক্বাদিয়ানীর বেলায় প্রযোজ্য হয়, তাহলে সে নিজেকে নিজে ‘গোলাম আহমদ’ বলে দাবী বা সাব্যস্ত করাও ভুল। কারণ, এ দাবী করে তো, আল্লাহরই পানাহ্’, সে নিজে ‘আহমদ’ ও ‘মুহাম্মদ’ হবার দাবীদার হলো। আর যদি তার নাম ‘গোলাম আহমদ’ হওয়াকে সঠিক মেনে নেওয়া হয়, তবে ‘তাঁর নাম আহমদ’ বাক্যটি তার বেলায় প্রযোজ্য বলা ভিত্তিহীন হবে, কারণ এর অর্থ ‘আহমদের গোলাম’।
মোটকথা, মির্যা ক্বাদিয়ানীর এ দাবীগুলোকে যদি দ্বীন ও যুক্তির নিরীখেও যাচাই করা হয়, তবে তার প্রতিটি দাবী অপর দাবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে বলে প্রতীয়মান হয়। তার কোন দাবী এমন নয়, যাকে মেনে নেওয়া যায়; বরং প্রতিটি দাবীই পর্যালোচনাকারীর হাত ধরে একথা বলবে- ‘আমাকে মিথ্যুক প্রতিপন্ন করুন!’
এসব অবস্থায় এ ফয়সালা করা সম্মানিত পাঠকদেরই কাজ যে, মির্যা ক্বাদিয়ানী আসলে কি? নবী হবার কথা তো তার একটি দুঃস্বপ্নই। এখন তো এ প্রশ্নটাই আলোচনা করা দরকার যে, তার বিবেক সুস্থ ছিলো কিনা? কেননা যার মাথা তথা বিবেক ঠিক থাকে, সে তো এ ধরনের পরস্পর বিরোধী দাবী করতেই পারে না। এ ধরনের কথা তো কোন পাগলই বলতে পারে অথবা একজন আস্ত নিলর্জ্জই বলতে পারে। এ কারণে মির্যা ক্বাদিয়ানীর এসব অবাস্তব দাবী দেখে স্বয়ং তার অনুসারীরাও লজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, একটি দল এমন আছে যারা তাকে নবী হিসেবে মেনে নেয় (মা‘আযাল্লাহ)। আরও একটি দল আছে, যারা তাকে নবী মানে না, বরং তার জন্য পূর্ণ রূপে মাথাও ঝুকায় না। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট হলো যে, যখন যারা তাকে মানে, তারাও একথার উপর একমত নয়, তখন অন্যরা মানা, না মানার প্রশ্ন থাকছে কোথায়?
পরিশেষে, যেসব হতভাগা ও বিবেকের অন্ধ মির্যা ক্বাদিয়ানীকে নবী বলে মানে, তাদেরকে কয়েকটা প্রশ্ন করার প্রয়াস পাচ্ছি-
প্রায় দেড় হাজার বছরের দীর্ঘ সময়ে সর্বশেষ নবী সরওয়ার-ই কাওন ও মকান হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য ও ভালবাসার কল্যাণধারা থেকে উম্মত-ই মুহাম্মাদিয়াহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) থেকে কোন নবী পয়দা হলে তার নাম ও ঠিকানা বলো! এর সাথে এ প্রশ্নেরও জবাব দাও যে, সহীহ্ হাদীস শরীফগুলোতে নবূয়তের ভন্ড দাবীদার ত্রিশজন দাজ্জাল ও মিথ্যাবাদী সম্পর্কে যেই খবর দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে মির্যা গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী থাকবেনা কেন? তাছাড়া, এ প্রশ্নের জবাবও চাই যে, হাদীস শরীফগুলোর আলোকে মসীহ্-ই মাও‘ঊদ (প্রতিশ্রুত মসীহ্) কি পুনরায় মায়ের গর্ভ থেকে পয়দা হবেন, না কি আসমান থেকে তিনি সোজাসুজি নাযিল হবেন। আর যদি তিনি নাযিল হন, তবে কি তিনি ক্বাদিয়ানে নাযিল হবেন, না দামেস্কের জামে মসজিদের মিনারার উপর তাশরীফ আনবেন?
প্রকাশ থাকে যে, এসব প্রশ্ন দ্বারা আমার উদ্দেশ্য কোন দীর্ঘ আলোচনা ও মুনাযারার দরজা উন্মুক্ত করা নয়; কেননা, আলোচনার প্রশ্ন ওখানে ওঠে যেখানে, মাঝখানে দলীল-যুক্তির হাত থাকে, বাতাসের উপর পুল নির্মাণের কল্পনাকারীদের সাথে আলোচনা করবে কোন্ পাগল? বরং আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু এটাই যে, যেসব লোক ভুল বুঝে কিংবা তাদের বাপদাদার অন্ধ অনুসরণে একটি কাল্পনিক কিচ্ছা-কাহিনী অথবা এক উন্মাদের প্রলাপকে ‘ধর্ম’ মনে করে বিশ্বাস করে বসেছে, তাদেরকে বাস্তব ও সঠিক বিষয় অনুধাবনের দিকে আহ্বান করা। আর তারাও যেন এসব প্রশ্নের আলোকে সত্যের অনুসন্ধানের জন্য দাঁড়িয়ে যায়।