কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে করণীয়

0

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে করণীয়-
খন্দকার ফারজানা রহমান >
দ্বিমত করার কোনো উপায় নেই যে, বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ, কিশোর-কিশোরীদের ঘরে বসে সময় কাটাতে হচ্ছে। বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা সেই সময়কে বিনোদনমুখর করে তোলার জন্য সন্তানদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ট্যাব, অ্যান্ড্রয়েড ফোন ইত্যাদি তুলে দিচ্ছেন। ফলে এসব শিশু-কিশোর ইউটিউব, ভায়োলেন্ট (সহিংসতা উসকানিমূলক) গেমস, পর্নোগ্রাফি ও সামাজিক মাধ্যমে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং এ আসক্তিই মূলত তাদের মাঝে ডেভিয়্যান্ট বিহ্যাভিয়ার (Deviant Behavior) বা সমাজবিচ্যুত ব্যবহারকে প্ররোচিত করে। এ ছাড়া আমরা গঠনমূলক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে তাদের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত করতে পারছি না, ফলে তারা নেতিবাচক ও সমাজবিচ্যুত কাজে আরও বেশি জড়িত হয়ে পড়ছে। স্বভাবতই অনেক সময় বাবা-মা প্রাইভেসি বা পারসোনাল স্পেসের নামে সন্তানদের আলাদা কক্ষ দিচ্ছেন এবং সেখানে তারা কী করছে তা খেয়ালও রাখছেন না। সে ক্ষেত্রে আমি মনে করি পরিবারের এবং খুব নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বাবা-মারই প্রধান দায়িত্ব সন্তানদের গতিপ্রকৃতি দেখাশোনা অথবা বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনা বা সুপথে পরিচালিত করা।
একজন শিশু বা কিশোরের বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায় তার কিশোর অপরাধী হওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধ থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করতে পারে। যেমন বাবা-মায়ের মধ্যে যদি সব সময়ই উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক থাকে, তাদের মধ্যে যদি পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সম্মানসূচক সম্পর্ক না থাকে তারা যদি সব সময়ই ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত থাকেন; তাহলে সন্তানরা নেতিবাচক ব্যবহার থেকে এ ধরনের আচরণ শিখেই বড় হয়। একে আমরা বলি ‘সোশ্যাল লার্নিং থিওরি’ (Social Learning Theor), যেখানে মূলত শিশুরা তাদের বেড়ে ওঠার সময় আশপাশের মানুষের ব্যবহার ও কাজগুলো দেখে এবং শেখে। তার ব্যবহারের একটি বড় অংশ হলো ‘সোশিয়ালি লার্নেড বিহ্যাভিয়ার’ (Socially Learned Behaviour) বা সামাজিকভাবে শেখা আচরণ, যা তারা অর্জন করে অভিভাবক, সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সমাজব্যবস্থা থেকে। একইভাবে পরিবারের ভিতরে স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক এবং বাবা-মার প্রতিক্রিয়াশীল (responsive) প্যারেন্টিং সন্তানদের দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিভিন্নমুখী মেলামেশা (Differential Association) তত্ত্বানুযায়ী আইন-শৃঙ্খলাবদ্ধ রীতিনীতি বা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ যেমন শেখানো হয় তেমন অপরাধমূলক আচরণও শেখানোর মাধ্যমেই অর্জিত হয় এবং এ শিখন কার্যক্রমটি বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা অথবা অন্তরঙ্গ দলগত সম্পর্কের মধ্যে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নীতিবহির্ভূত আচরণ সামাজিকীকরণ করা যায়। অর্থাৎ পরিবারের বাইরেও কিশোররা বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে অনেক সময় অপরাধমূলক আচরণের শিক্ষা পায়।
এবার আসা যাক সামাজিক গণ্ডির বাইরে আর কী কী সংগঠন কিশোর অপরাধ বিস্তারে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। এক গবেষণায় দেখলাম, ঢাকার ১০টি কুখ্যাত কিশোর গ্যাংয়ের আটটিই দুর্বৃত্ত রাজনীতির ‘বড় ভাইদের’ সঙ্গে জড়িত। কি ভয়ংকর! এসব সন্তান বয়সের প্রাণশক্তি অপ্রত্যাশিতভাবে রাজনৈতিক বা এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা এবং প্রভাবের বলি হচ্ছে। ১৮ বছর বা তার চেয়েও কম বয়সী কিশোররা ভালো খারাপ কাজের পরিণাম কী হতে পারে তা বোঝে না। ফলে কিশোর-কিশোরীদের অপরিপক্ব মনোবৃত্তির সুযোগ নিয়ে একদল লোক বিশেষত স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ তাদের অবস্থান ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে। পেশিশক্তি আমাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নোংরা অনুশীলনের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য থাকে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নেতাদের কাছে একটি পলিটিক্যাল ইমেজ (Political Image) তৈরি। তা করতেই তারা কিশোর দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, এ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন মনোভাব ও প্রক্রিয়াই প্রকৃতপক্ষে কিশোর অপরাধীদের অনৈতিক চর্চা এবং অপরাধকর্ম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উৎসাহ দেয়।
এখন আসা যাক আমাদের বিচারব্যবস্থায়। যদি কোনো কিশোর বা কিশোরী আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয় তবে তাকে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে কিশোর অপরাধীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার তুলনায় এ জাতীয় কেন্দ্রের সংখ্যা দেশে কখনই পর্যাপ্ত নয়। সারা দেশে কেবল তিনটি সংশোধন কেন্দ্র রয়েছে। তার ওপর আমাদের কিশোর সংশোধন কেন্দ্রগুলোয় অসংখ্য সমস্যাও কম নয়। এ কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠার প্রধান লক্ষ্য ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সঠিক পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা সংশোধন পদ্ধতি অনুসরণ করে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে সমাজে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ কিশোর-কিশোরীদের সংশোধনের পরিবর্তে এসব কেন্দ্রের কর্মকর্তারা তাদের নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করেন। তাদের পর্যাপ্ত খাবার এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ করেন না। একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল যেখানে একদল কিশোর অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেছিল। আবার একজন মেয়ে সংশোধন কেন্দ্রে তার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। মূলত দুর্বল প্রশাসনিক সহযোগিতা, অপর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা, যথাযথ কাউন্সেলিং এবং দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে এ জাতীয় সমস্যা ঘটেই চলছে।
অধিকাংশ উঠতি বয়সীর বিপথগামী হওয়ার জন্য আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ দায়ী। রাজনৈতিক নেতাদের দায় রয়েছে, তবে অভিভাবকদের দায়দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আমি মনে করি কিশোর অপরাধ নির্মূলে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পরিবারের। কারণ পরিবারই একটি শিশুর বেড়ে ওঠার প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার যদি তার সন্তানদের ব্যবহার ও আচরণ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, সন্তানের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কী কী দরকার সে অনুযায়ী তাদের লালনপালন করে তাহলে সেগুলো একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একটি পরিবারের প্রবীণদের উচিত অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা, নৈতিকতা শেখানো এবং তাদের ক্রিয়াকলাপের ওপর নজর রাখা।
আমাদের বর্তমান সমাজে পাঠাগার, বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রম কমে গেছে এবং তাকে দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন ও আধুনিক প্রযুক্তি। ফলে বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আমাদের সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বাড়াতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের সামাজিকীকরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কারণে কিশোর অপরাধ রোধ করার দায়বদ্ধতার একটি বড় অংশ স্কুলব্যবস্থার ওপর পড়ে বলে ধারণা করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার যা বিদ্যালয়গুলোকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনে সহায়ক হবে। প্রথমত এবং সর্বাগ্রে, বিদ্যালয়গুলো অবশ্যই শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের সেলফ-ইমেজ উন্নত করার জন্য একটি সক্রিয় পন্থা অবলম্বন করবে, যা তাদের সাফল্য ও অসামাজিক আচরণ প্রতিরোধের জন্য উৎসাহ প্রদান করবে। সহিংস আচরণ, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং কিশোর অপরাধমূলক আচরণের ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক ও জ্ঞানভিত্তিক বিকাশের দিকেও মনোনিবেশ করা উচিত। এ ছাড়া ইতিমধ্যে আচরণগত সমস্যা প্রকাশ পেয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার জন্য কাউন্সেলিং পরিষেবা অবশ্যই থাকতে হবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রকে শিশুবান্ধব নীতি তৈরি ও তা কার্যকর করতে হবে বলে আমি মনে করি। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন সাধন ও সেখানে শিশুর চারিত্রিক উন্নয়নমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং শিশুর জন্য উপযোগী বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলে কিশোর অপরাধ কমে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তার ওপর নীতিনির্ধারকদের মূল কারণগুলো শনাক্ত ও উত্তরণের উপায়ের জন্য বিশদ (comprehensive) গবেষণা এবং পরিকল্পনা (master plan) গ্রহণ সময়ের দাবি। কেননা ভুল পথে যাওয়া কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। [সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন]
লেখক : চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •