ভাস্কর্য ও মূর্তি স্থাপন : প্রেক্ষিত ইসলাম

0

ভাস্কর্য ও মূর্তি স্থাপন : প্রেক্ষিত ইসলাম-
মাওলানা মুহাম্মদ জিয়াউল হক রিযভি >
ভূমিকা
পৃথিবীতে ইসলাম ব্যতীত সকল ধর্ম ও মন্ত্র-তন্ত্রের মূলোৎপাঠন হয়ে চির নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইসলাম ধর্মের বিধান চির শাশ্বত ও চিরস্থায়ী। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ ‘নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট মনোনিত ধর্ম।’
ইসলাম ধর্মের ঐশী গ্রন্থ কুরআনুল করিমে মানব জাতির প্রতিটি বিষয়ের উপর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে ইহ-পরকালীন কোন বিষয় বাদ দেয়া হয়নি। তাইতো কুরআনুল করিমকে আল্লাহ তা‘আলা তিবয়ান (সাবির্ক বর্ণনা জ্ঞাপক) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইরশাদ হচ্ছে: وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ
‘আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিমদের) জন্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথ নির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদ স্বরূপ আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি।’
চিত্রাংকন বা চিত্রকলা প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে চলমান একটি শিল্প। চিত্রাংকন সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে স্পষ্ট দৃর্ষ্টিভঙ্গী ব্যক্ত করা হয়েছে। চিত্রাংকন ইসলাম ধর্মে কতটুকু বৈধ বা অবৈধ কুরআন ও হাদিস, সাহাবা কিরামের উদ্ধৃতি এবং ইসলামী মনীষীগণের মতামতের আলোকে একটি স্বচ্ছ ধারণা আলোচনা করাই এ প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।
চিত্রাংকন বা চিত্রকলার মর্মার্থ
আরবিতে চিত্র’র প্রতিশব্দ হলো: صورة (সূরাতুন) আর অংকনের আরবি শব্দ হলো: تصوير (তাসভির)। এখন صورة (সূরাতুন) বিষয় নিয়ে কুর’আনুল করিম এবং রাসূলের হাদিসে কি হুকুম বা বিধান দেয়া হয়েছে, তা আলোচনা করার প্রয়াস পাব। অতীত কাল থেকে সাধারণত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে চিত্রাংকন শিল্প প্রচলন আছে। যেমন: ১. প্রতিমা অংকন, ২. ভাস্কর্য অংকন এবং ৩. দৃশ্য (জীববিশিষ্ট ও জীববিহীন) অংকন। এসবের বিধান এক ও অভিন্ন নয়, বরং ইসলাম ধর্মে প্রতিটি বিষয়ের স্বতন্ত্রভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রতিমা অংকনে ইসলামের বিধান
প্রতিমা পূজা বা আরাধনা সরাসরি শিরক এবং কুফরি। তাছাড়া ইসলামে প্রতিমা নির্মাণ বা মূর্তির চিত্রাংকন সম্পূর্ণ হারাম। মূর্তি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি সকল বিষয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
‘তোমরা অপবিত্র বস্তু তথা মূর্তিসমূহ পরিহার করো এবং পরিহার করো মিথ্যাকথন।’
উক্ত আয়াতে প্রতিমাকে ‘রিজস’ বলা হয়েছে। আর আরবিতে রিজস শব্দের অর্থ নোংরা ও অপবিত্র। প্রতিমার জন্য রিজস তথা অপবিত্র ব্যবহার করে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, মূর্তির সংশ্রব পরিহার করা পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত রুচিবোধের পরিচায়ক। ইমাম কুরতুবি বলেন, আরবরা ইবাদাত ও সম্মানার্থে কাঠ, লৌহা, স্বর্ণ এবং রৌপ্য ইত্যাদি পদার্থ দিয়ে মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করতো। আর খ্রিষ্টানেরা ক্রুশ তৈরী করে ভাস্কর্য স্বরূপ দাঁড় করিয়ে রাখতো এবং ইচ্ছামতো পূজা করতো। তাই আয়াতে সব ধরণের প্রতিমা অংকন এবং নির্মাণ হতে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হযরত নূহ আলাইহিসস্ সালাম নিজ সম্প্রদায়কে একত্ববাদের বিশ্বাসী করে তোলার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রায় সাড়ে নয়শত বছর যাবৎ তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য দ্বীনী কর্মকাণ্ডে ব্যস্ততম সময় অতিবাহিত করেন। কিন্তু তাদের কম সংখ্যক লোকই তাঁর প্রতি ঈমান আনে। তাদের সমাজপতিরা মৃত্যুবরণকারী পূণ্যবান ব্যক্তিদের প্রতিমা তৈরী করে শিরকী কাজে লিপ্ত থাকতো। তাই পূণ্যবান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরীর নিন্দা জ্ঞাপন করে তাদেরকে পূজা করতে সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
وَقالُوا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَلا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلا سُواعاً
وَلا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْراً
‘এবং তারা (সমাজপতিরা) বলেছিল, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে এবং কখনো পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুও‘আ, ইয়াগুস, ইয়া‘উক ও নাস্রকে।
বিশিষ্ট সাহাবি হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা উক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন, হযরত নূহ আলাইহিস্ সালামের যুগে কিছু পূণ্যবান মহা মনীষীর মৃত্যু হলে শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে কুমন্ত্রণা দিয়েছিলো যে, তাদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোতে মূর্তি স্থাপন করা হোক এবং তাদের নামে সেগুলোকে নামকরণ করা হোক। সম্প্রদায়ের লোকেরা এমনই করলো। ওই প্রজন্ম যদিও তাদের পূজা করেনি কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম তাদের পূজায় লিপ্ত হলো। তাই উক্ত আয়াতে পূজার উদ্দেশ্য প্রতিমা তৈরী করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কুর’আনুল করিমে মূর্তি ও প্রতিমাকে পথভ্রষ্টতার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ اٰ مِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَصْنَامَ رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ
‘স্মরণ করুন, ইবরাহীম যখন বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! এ শহরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মুর্তি পূজা হতে দুরে রাখুন। আমার প্রতিপালক! এ সব মূর্তি বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।’
হযরত ইবরাহিম আলাইহিস্ সালাম কা‘বা শরিফ নির্মাণ করার পর আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজ সন্তান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে মূর্তি পূজা থেকে বিরত রাখার জন্য প্রার্থনা করেন। দ্বিতীয় আয়াতে মূর্তিপূজার কুফল বর্ণনা করা হয়েছে, আল্লাহর একত্ববাদ পরিহার করে শিরক তথা প্রতিমাপূজা মানুষকে অধিকহারে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়। তাফসিরবিদ সমরকন্দি বলেন, শয়তান মানব জাতির পরম শত্রু। সে কষ্মিনকালেও মানবজাতির শুভ কামনা করেনা। শয়তান পাথর বা জড় পদার্থ নির্মিত প্রতিমার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পূজারীদের মন দারুণভাবে আকৃষ্ট করে; যদ্দরুণ তারা বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে যায়। তাই আয়াতে কারিমায় বিভ্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সরাসরি প্রতিমাগুলোর প্রতি সম্পৃক্ত করা হয়েছে। অতএব কুরআনুল কারিমে একটি বস্তুকে ভ্রষ্টতার মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করার পর তা মনের কোঠায় এনে কল্পনা করা এবং তা অতি ভক্তি নিয়ে অংকন করা ইসলামি শারি‘আতে কখানো গ্রহণযোগ্য ও বৈধ হতে পারেনা। এভাবে অপর আয়াতে মুর্তিপূজাকে সকল মিথ্যা ও উদ্ভবের উৎস বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে:
إِنَّما تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثاناً وَتَخْلُقُونَ إِفْكاً
‘তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত শুধু মূর্তি পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ।’
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, মুশরিকরা ইবাদাত ও আরাধনার নিমিত্তে নিখুঁত তুলি দিয়ে ইচ্ছামতো দেব-দেবীর আকৃতি অংকন করে লোকজন সমবেত করত। এতে তাদের নির্মাণকৃত প্রতিমাগুলো নিজেদের ইলাহ বা উপাস্য নির্ধারণ করত। মূলত এটি তাদের মিথ্যা দাবি। তাই আয়াতে কারিমায় প্রমাণিত হয়, মূর্তি নির্মাণ এবং দেব-দেবীর সূরত অংকনই সকল অবান্তর ও উদ্ভবের মূল উৎস।
অতএব, উপরে বর্ণিত কুর’আনুল করিমের আয়াতে প্রতীয়মাণ হয়, মূর্তি ও প্রতিমাপূজা শিরক ও নিষিদ্ধ, সুতরাং ইবাদাতের উদ্দেশ্যে হোক কিংবা ভক্তির উদ্দেশ্যে হোক বা চিত্রকর্মে বা নির্মাণ করা পারদর্শিতা অর্জনের উদ্দেশ্যে হোক তা অংকন ও চিত্রকরা ইসলামি শারি‘আতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, গর্হিত এবং নিন্দনীয়।
চিত্রাংকনে আল হাদিসের দিক-নির্দেশনা
আল্ হাদিস ইসলামি শারি‘আতের দ্বিতীয় দলিল। কুরআনুল কারিমে সংক্ষেপ বিষয়টিকে বিস্তারিত ও স্পষ্ট করা হয়েছে রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস শরিফে। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি কথা, কর্ম এবং মৌনসম্মতিই হাদিস; যা অহি তথা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحٰى
‘তিনি মনগড়া কথা বলেননি। যা বলতেন তা প্রত্যাদেশই মাত্র।’
নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসংখ্য হাদিস দ্বারা মূর্তি তৈরী করা কিংবা মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার ব্যাপারে কঠোর সতর্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
ইমাম মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ আল্ কুশাইরি রহমাতুল্লাহি আলায়হি হযরত আমার ইবনে আবাসা আস্ সুলামি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: أَرْسَلَنِي بِصِلَةِ الْأَرْحَامِ، وَكَسْرِ الْأَوْثَانِ، وَأَنْ يُوَحَّدَ اللهُ لَا يُشْرَكُ بِهِ شَيْءٌ،
‘আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার, প্রতিমাসমূহ ভেঙ্গে ফেলার এবং আল্লাহ তা‘আলার সাথে কোন বস্তুকে অংশীদার না করার বিধান দিয়ে প্রেরণ করেছেন।’
প্রতিমার ছবি ও আকৃতি যেহেতু র্শিক ও বাতুলতার দিকে ধাবিত করে এবং আল্লাহ্ তা‘আলার একত্ববাদে অনীহা সৃষ্টি করে তাই তা সমূলে বিনাশ করার আদেশ দেয়া হয়েছে।
কোন কর্মের ফলে যদি শাস্তি নির্ধারিত থাকে তাহলে তা অবশ্যই গর্হিত, নিষিদ্ধ এবং পরিত্যাজ্য। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিকৃতি এবং প্রতিমা অংকনকারীর জন্য ক্বিয়ামতের দিন কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদিসে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللهِ يَوْمَ القِيَامَةِ المُصَوِّرُونَ
‘কিয়ামত দিবসে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি যাদের হবে তারা হলো প্রতিকৃতি তৈরিকারী (চিত্রকর ও মুর্তিগর)।
প্রতিকৃতিকারী এবং চিত্রকর আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ গুণবাচক নাম; যাকে আরবিত আল্ মুসাব্বির (المُصَوِّرُ) বলে। তাই আল্লাহ ছাড়া যেহেতু কারো প্রাণীর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার সম্ভব নয়, তাই কোন মানুষের উচিত নয় এমনি প্রতিকৃতি ও চিত্র তৈরী করা। ক্বিয়ামতের দিন প্রত্যেক চিত্রকরকে বলা হবে তার চিত্রিত মূর্তিতে প্রাণ সৃষ্টি করতে; অথচ সে অপারগ হয়ে সেদিন সত্যিই লজ্জিত হবে।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে: إِنَّ الَّذِينَ يَصْنَعُونَ هَذِهِ الصُّوَرَ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
এ প্রতিকৃতি নির্মাতাদের তথা চিত্রকরদের কিয়ামত দিবসে শাস্তিতে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাদেরকে এ বলে সম্বোধন করা হবে, ‘যা তোমরা তৈরি করেছিলে তাতে প্রাণ সঞ্চার কর।’ প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আল্ ‘আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, চিত্রকরদের চিত্রকর্ম ও চিত্রশিল্পী সর্বদা পরিত্যাজ্য, কারণ তারা সবসময় হারাম তথা নিষিদ্ধ কাজের মধ্যে লিপ্ত। আর যে ব্যক্তির পেশা ও কাজ পূজার মতো শিরক কাজ করা, তার পরিণামতো অত্যন্ত ভয়াবহ হবেই। তাছাড়া, যে ব্যক্তি ¯্রষ্টার সামঞ্জস্য গ্রহণের মানসিকতা পোষণ করে সে নিঃসন্দেহে কাফির।
শুধু তা নয়, প্রতিকৃতি নির্মাণকারী আল্লাহ তা‘আলার পরম শত্রু ও যালিম হিসাবে বিবেচিত হবে। তাদের কৃতকর্ম আল্লাহ তা‘আলার সমপর্যায়ের আসনে যে আসীন করছে এতটুকু উপলব্ধিও তার হয় না, বরং সে ভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে চলে যায়। হযরত আবূ হুরায়রাহ্ বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ হচ্ছে: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي، فَلْيَخْلُقُوا
ذَرَّةً أَوْ لِيَخْلُقُوا حَبَّةً أَوْ شَعِيرَةً ‘ঐ লোকের চেয়ে বড় অত্যচারী কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করার ইচ্ছা করে? তাদের যদি সামর্থ থাকে তবে তারা একটি কণা, একটি শষ্য কিংবা একটি যব সৃষ্টি করুক।’
এভাবে মুর্তি প্রস্তুতকারীদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার অভিসম্পাত অবধারিত হয়ে থাকে। আর আল্লাহর লা’নত তথা অভিসম্পাতকৃত ব্যক্তিরা অনেক সময় কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ اٰكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ، وَالوَاشِمَةَ وَالمُسْتَوْشِمَةَ وَالمُصَوِّرَ
‘নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ ভক্ষণকারী ও সুদ প্রদানকারী, উল্কি অংকনকারী ও উল্কি গ্রহণকারী এবং প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারীদের (চিত্রকরদের) উপর অভিসম্পাত করেছেন।’
মৃত ব্যক্তিকে স্মরণ ও ভক্তির উদ্দেশ্যে তার কবরে কিংবা যে কোন স্থানে ভাস্কর্য ও প্রতিকৃতি স্থাপন করা ইসলামি শারিআতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানেরা তাদের পদস্থ ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্মরণ করার জন্য এমন নীতি গ্রহণ করে থাকে; যা তাদের চলমান সনাতন সংস্কৃতি। উম্মুল মুমিনীন হযরত আ‘য়িশাহ্ সিদ্দিকাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বর্ণিত হাদিসে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুঠে উঠে। যেমন :
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ أُمَّ حَبِيبَةَ، وَأُمَّ سَلَمَةَ ذَكَرَتَا كَنِيسَةً رَأَيْنَهَا بِالْحَبَشَةِ فِيهَا تَصَاوِيرُ لِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ أُولَئِكَ، إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ، فَمَاتَ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكِ الصُّوَرَ، أُولَئِكِ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘উম্মুল ম’মিনীন হযরত আ‘য়িশা সিদ্দিক্বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতার সময় তাঁর কাছে হযরত উম্মে হাবিবাহ ও উম্মে সালামাহ্ একটি গির্জার (মারিয়া গির্জা) কথা উল্লেখ করলেন। (তারা উভয়ে ইতোপূর্বে হাবশায় গিয়েছিলেন) গির্জাটির কারুকার্য ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিসমূহের কথা তারা নবীজীর কাছে উল্লেখ করলেন। রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শয্যা হতে মাথা মোবাকর উত্তোলন করে বললেন, ওই জাতির পূণ্যবান লোক যখন মারা যেত, তখন তারা তার কবরের উপর ইবাদাতখানা নির্মাণ করত এবং তাতে প্রতিকৃতি স্থাপন করত। ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার সামনে এরাই (প্রতিকৃতি স্থাপনকারীরা) হবে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি।
প্রাণীর ছবি ঝুলিয়ে রাখা
বা উন্মুক্ত রাখার বিধান
যে কোন প্রাণীর ছবি ঘরের দেয়াল কিংবা ছাদে ঝুলিয়ে রাখা হাদিস শরিফে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাদিসবিশারদের দৃষ্টিতে প্রাণী বলতে সাধারণত মানুষ সহ সব ধরণের স্থলজ ও জলজ প্রাণীই বুঝায়। এ সকল ঘরে বা আবাসস্থলে রাহমাত ও শান্তির ফিরিশতা প্রবেশ করেননা। ফিরিশতাদের প্রবেশ না করার মূল কারণই হল বস্তুটি তাদের কাছে ঘৃণিত ও নিন্দিত হওয়া। কারণ, ইসলামি শারিআতে অনুমোদিত আমল ও কর্ম হলো ফিরিশতাদের কাছে প্রিয়। নি¤েœ এ সংক্রান্ত কতিপয় বিশুদ্ধ হাদিস পাঠক সমীপে পেশ করা হলো :
عَنْ أَبِي طَلْحَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَة
‘হযরত আব্ ূতালহা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, কুকুর ও প্রাণীর ছবি যে ঘরে বিদ্যমান থাকে, সে ঘরে ফিরিশতা প্রবেশ করেননা।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ تَمَاثِيلُ أَوْ تَصَاوِيرُ
‘হযরত আবূ হুরায়রাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ঘরে কোন প্রতিকৃতি কিংবা ছবি থাকে, তাতে ফিরিশতা প্রবেশ করেননা।’ [ইমাম মুসলিম, আস্ সাহিহ, হাদিস নং. ২১১২।] لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ صُورَةُ تَمَاثِيلَ. ‘নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ঘরে কুকুর এবং কোন প্রতিকৃতির ছবি থাকবে, তাতে ফিরিশতা প্রবেশ করেননা।’  [ইমাম তিরমিযি, আস্ সুনান, হাদিস নং. ২৮০৪]
প্রাণীর ছবিযুক্ত পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান
কিংবা ব্যবহারে শারিআতের বিধান
প্রাণীর ছবিযুক্ত পোষাক পরিধান করা সর্ব সাধারণ মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। এ সব কাপড় পরিধান করে নামায আদায় করা শারিআতে নিষিদ্ধ। প্রাণীর ছবি, এবং মূর্তি ও প্রতিকৃতি সম্বলিত কাপড় পরিধান করা, এসব ছবি সম্বলিত চাদর বিছিয়ে নামায আদায় করা কিংবা কক্ষে বা ঘরের চতুর্দিকে প্রাণী, ভাস্কর্য এবং মূর্তির ছবি বাঁধানো কিংবা ঝুলন্ত থাকাবস্থায় নামায আদায় করা মাকরূহে তাহরিমি বা নিষিদ্ধ। [ইমাম কাসানি, বাদাঈ‘য়ুস্ সানা‘ঈ, ১ম খ-, পৃ. ১১৬] হানাফি মাযহাবের প্রাজ্ঞ ফিকহবিদ ইমাম কাসানি রহমাতুল্লাহি আলায়হি এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। যেমন:
رُوِيَ أَنَّ جِبْرِيلَ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – اسْتَأْذَنَ رَسُولَ اللهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – فَأَذِنَ لَهُ فَقَالَ كَيْفَ أَدْخُلُ وَفِي الْبَيْتِ قِرَامٌ فِيهِ تَمَاثِيلُ خُيُولٍ وَرِجَالٍ؟
‘বর্ণিত আছে, একদা হযরত জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসতে অনুমতি চাইলেন। নবিজি তাঁকে কাছে আসতে অনুমতি দিলেন। তখন তিনি বললেন, আমি কিভাবে ঐ ঘরে প্রবেশ করবো, যে ঘরের পর্দায় ঘোড়া এবং মানুষের ছবি থাকে? [পূর্বোক্ত, পৃ. ১১৬।] তবে অতীব ক্ষুদ্র, মাথাবিচ্ছিন্ন এবং অস্পষ্ট ছবিযুক্ত কাপড়ে নামায আদায় করতে দূষণীয় নয় বলে ফোকহা কিরাম মত প্রদান করেছেন। কিন্তু ছবি ছাড়া স্বচ্ছ কাপড় থাকলে উপরোক্ত কাপড় পরিধান এড়িয়ে যাওয়া বাঞ্জনীয়।[পূর্বোক্ত, পৃ. ১১৬]
ড্রয়িং ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা
আমাদের দেশের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন এবং শিশু নিকেতনসহ সবকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক হিসাবে ড্রয়িং বিষয়টি সিলেবাসভুক্ত করা হয়। এমনকি কিছু কিছু মাদরাসার ইবতেদায়ী স্তরে এটিকে গুরুত্বসহকারে পাঠ্য তালিকায় আনা হয়। শিক্ষার্থীদের চিত্রলিপিতে পারদর্শিতা অর্জনের লক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাসিক এবং বাৎসরিক চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব ও পুরস্কার লাভের প্রয়াসে অভিভাবকগণও নিজ সন্তান-সন্ততিদের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে। এ সকল ড্রয়িং এবং চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় অবশই ব্যক্তি ও প্রাণীর ছবি অংকন বিষয়টি এড়িয়ে যেতে হবে। কারণ, মুসলিম কচি শিক্ষার্থীরা যদি ব্যক্তি বা ছবি অংকন করতে অভ্যস্থ হয়, তাহলে তারা পরবর্তীতে ইসলাম বিরোধী মনোভাব ও চিন্তাধারার দিকে ধাবিত হবে। তাই মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই প্রাণীর ছবি অংকন বিষয়টি সিলেবাস থেকে বাদ দিতে হবে এবং এর পরিবর্তে কা‘বা শরীফ ও মদিনাহ্ শরিফের দৃশ্যসহ প্রাকৃতিক দৃশ্য অংকন বিষয়টি সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আধুনিকতার বশবর্তী হয়ে ইসলামি শারি‘আতের বিধি-বিধান লংঘন কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান- আল্ কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •