বিশুদ্ধ ঈমান ইবাদত গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি

0

বিশুদ্ধ ঈমান ইবাদত গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি

হাফেয কাজী আবদুল আলীম রিজভী

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا نُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ وَاللهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ ﴿١١﴾ لَئِنْ أُخْرِجُوا لَا يَخْرُجُونَ مَعَهُمْ وَلَئِن قُوتِلُوا لَا يَنصُرُونَهُمْ وَلَئِن نَّصَرُوهُمْ لَيُوَلُّنَّ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ ﴿١٢﴾ لَأَنتُمْ أَشَدُّ رَهْبَةً فِي صُدُورِهِم مِّنَ اللهِ ۚ ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ ﴿١٣﴾ لَا يُقَاتِلُونَكُمْ جَمِيعًا إِلَّا فِي قُرًى مُّحَصَّنَةٍ أَوْ مِن وَرَاءِ جُدُرٍ ۚ بَأْسُهُم بَيْنَهُمْ شَدِيدٌ ۚ تَحْسَبُهُمْ جَمِيعًا وَقُلُوبُهُمْ شَتَّىٰ ۚ ذٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ ﴿١٤﴾

আল্লাহ্র নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়
তরজমা ঃ (মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন) আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেননি? যারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদের কে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে (দেশ থেকে) বের হয়ে যাবো এবং অবশ্যই আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনো কারো কথা মান্য করব না। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধ বাধঁলে আমরা অবশ্য তোমাদেরকে সাহায্য করব এবং মহান আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। যদি তারা (অর্থাৎ কিতাবধারী কাফিরগণ) নির্বাসিত হয় তবে তারা (অর্থাৎ মুনাফিকরা ) তাদের সাথে বের হবেনা এবং তাদের সাথে যুুদ্ধ বাঁধলে, তবে তারা তাদের সাহয্য করবেনা। যদি তাদের সাহায্যও করতে আসে, তবে অবশ্যই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করবে। অতঃপর তারা কোন সাহায্য পাবেনা। নিশ্চয় তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের (অর্থাৎ মুমিনগণের) ভয় অধিক রয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা বোধশক্তিহীন সম্প্রদায়। তারা সংঘবদ্ধভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবেনা। কিন্তু দুর্গ-ঘেরা জনপদসমূহে অথবা প্রাচীরের আড়ালে থেকে পরষ্পরের মধ্যে তাদের যুদ্ধ ভীষণ। আপনি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ মনে করবেন। কিন্তু তাদের অন্তর সমূহ শতধা বিচ্ছিন্ন। এটা এজন্য যে, তারা বিবেকহীন সম্প্রদায়।
[সূরা আল হাশর- ১১ থেকে ১৪ নং আয়াত]
আনুষঙ্গিক আলোচনা
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا نُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ وَاللهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
শানে নুযুল
উদ্ধৃত আয়াতের শানে নুযুল বর্ননায় মুফাসসেরীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন-পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় বসবাসরত মুনাফিকরা পাশর্^বর্তী ইয়াহুদী গোত্র বনী নজীরের সাথে এ মর্মে গোপন অঙ্গীকার করেছিল যে-যদি তোমাদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ সংঘঠিত হয় তবে আমরা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবো। আর যদি মুসলমানগণ বিজয়ী হয়ে তোমাদের কে নির্বাসিত করে দেয়, তবে আমরাও তোমাদের সাথে চলে যাব। মহান আল্লাহ তখনই আয়াত অবতীর্ণ করে মুনাফিকদের এ গোপন অঙ্গীকার ফাঁস করে দিলেন। [তাফসীরে নূরুল ইরফান]
মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য
পবিত্র কোরআনে করিমের আয়াত ও হাদীছে নববী শরীফের রেওয়ায়তের মর্মবাণীর আলোকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম ও মুসলমানের সবচেয়ে ক্ষতিকর, ভয়ংকর ও নিকটতম ঘর-শত্রু হলো মুনাফিক সম্প্রদায়। এরা প্রকাশ্যে টুপি-দাঁড়ি পাগড়ী ধারী নামাযি মুসলমান। আর অপ্রকাশ্যে নির্ভেজাল কাফির। তারা দিনের আলোতে আল্লাহর নবীর মজলিশে ছাহাবায়ে কেরামের সাথে অবস্থান করে, আর রাতের আঁধারে মদীনার ইয়াহুদীগণ ও মক্কায় কাফিরগণের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এসব মুনাফিকরা প্রকাশ্যে দ্বীনদার-নামাজি রূপ ধারণ করলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তারা মোটেও মুমিন নয়। এ কারণে আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাদের প্রকৃত পরিচয় ও আসল স্বরূপ উন্মোচন করার লক্ষ্যে কুরআনে মজীদে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা আল-মুনাফিকুন নাযিল করেছেন। তাছাড়া কুরআনে করীমের বৃহত্তম সূরা আল বাক্বারার প্রারম্ভিক পর পর চার আয়াত অবতীর্ণ করেছেন আল্লাহ সর্বাবস্থায় সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য কাফিরদের প্রসঙ্গে। অতঃপর আল্লাহ পর পর তের আয়াত নাযিল করেছেন মুনাফিকদের প্রকৃত স্বরূপ, চরিত্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট বর্ণনা প্রসঙ্গে। মুফাসসেরীনে কেরাম বর্ণনা করেছেন-কাফির-মুশরিকদের পরে মুনাফিকদের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে- মুনাফিকরা اخبث الخبائث অর্থাৎ সর্বনিকৃষ্ট, ঘৃন্য ও ধীকৃত শ্রেণি। (নাউজুবিল্লাহ) কুরআনে করীমে তাদের এহেন নিকৃষ্টতম অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে সূরা আন-নিছার ১৪৫ নং আয়াতে- ان المنافقين في الدرك الاسفل من النار অর্থাৎ মুনাফিকরা নিঃসন্দেহে জাহান্নামের নি¤œতম স্তরে অবস্থান করবে। (নাউজুবিল্লাহ)
হাদিছে নববী শরিফে এরশাদ হয়েছে
عن عبد الله بن عمرو رضي الله عنهما عن النبي -صلى الله عليه وسلم- قال: أربع من كن فيه كان منافقا، ومن كانت خصلة منهن فيه كانت فيه خصلة من النفاق حتى يدعها: من إذا حدث كذب، وإذا وعد أخلف، وإذا خاصم فجر، وإذا عاهد غدر- متفق عليه
অর্থাৎ সাহাবীয়ে রাসূল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-রাসূলে করিম রউফুর রহিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- চারটি বৈশিষ্ট্য যে ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক হিসাবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তির মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে তার মধ্যে মুনাফিকীর একটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান বলে গণ্য হবে। উপরোক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য নি¤œরূপ। যথাক্রমে (এক) কোন কিছু আমানত রাখা হলে আত্মসাৎ করে। (দুই) কথোপকথনে মিথ্যাচার করে (তিন) অঙ্গিকার করলে ভঙ্গ করে (চার) ঝগড়া বিবাদ হলে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে। মুনাফিকীর এ চার বৈশিষ্ট্য থেকে মহান আল্লাহ মুমিনদের কে হেফাজত করুন। আমীন।
রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত হাদীছ শরীফ যেন আলোচ্য ১১নং আয়াত এর তাফসির। উক্ত ১১নং আয়াতাখানার ভাষ্য হলো – মুনাফিকরা মদীনার ইয়াহুদীগোত্র বনু নজীর এর সাথে গোপনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল যে, মুসলমানরা তাদের কে বহিষ্কার করলে মদীনা শরীফ হতে মুনাফিকরাও তাদের সাথে বের হয়ে যাবে। আর যুদ্ধ হলে মুনাফিকরা ইয়াহুদীগণের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবে। আল্লাহ বলেন- মুনাফিকরা নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদী। কেনন, ইয়াহুদীরা মদীনা শরীফ থেকে বহিস্কৃত হলেও মুনাফিকরা কখনো মদীনা ত্যাগ করে নাই। তাই হাদীছে নববী শরীফ এর ভাষ্যানুযায়ী মুনাফিকদের মিথ্যাচার ও ওয়াদা ভঙ্গ করার বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হল।
يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا
সূরা হাশর এর ১১নং আয়াতের উপরোক্ত অংশ বিশেষ এর মর্মানুযায়ী কাফিরগণই হলো মুনাফিকদের ভাই, মুসলমানরা নয়। (নাউজুবিল্লাহ) সুতরাং মুনাফিকরাও কাফির। বাহ্যিক বেশ-ভূষায় মুসলমানের অভিনয় করলেও কুরআনের ভাষ্যানুযায়ী তারা আক্বিদা-বিশ^াসে কাফির। তাই মুনাফিক-কাফির পরষ্পর ভাই-ভাই।
অন্য আয়াতের ঘোষণা হলো- انما المومنون اخوة অর্থাৎ মুমিনগণ পরষ্পর ভাই-ভই। সুতরাং ভ্রাতৃত্বের বুনিয়াদ হলো ঈমান-আক্বিদা। আমল-ইবাদত আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার ভিত্তি হলো ঈমান-আক্বিদা। এ জন্য কুরআনে করীমের সর্বত্র মহান আল্লাহ আমল এর পূর্বে ঈমান কে উল্লেখ করেছেন।
الا الذين امنوا و عملوا ان الذين امنوا و عملوا الصالحات
এর দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়-ঈমান-আক্বিদা শুদ্ধ ও সৃদৃঢ় হওয়া ব্যতিরেকে আমল-ইবাদত-রেয়াজত এর কোনরূপ গ্রহণযোগ্যতা আল্লাহর দরবারে হবে না। মহান আল্লাহ সকল কে উপরোক্ত দরছে কোরআনের উপর আমল করার সৌভাগ্য নসীব করুন। আমীন।
লেখক: অধ্যক্ষ-কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া কামিল মাদরাসা,
মুহাম্মদপুর এফ ব্লক, ঢাকা।