রসূলের প্রতি কটূক্তির জবাব দেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা

0

রসূলের প্রতি কটূক্তির জবাব দেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা-
মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস আলকাদেরী >
রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ তা’আলার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহ্ তা’আলা স্বয়ং তাঁর রাসূলের প্রশংসা করেন বিধায় তাঁর নাম হলো মুহাম্মদ (অতি প্রশংসিত)। আল্লামা সৈয়্যদ আযিযুল হক শেরে বাংলা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-
هم قران بتوصيف محمد براو نازل چه گوئم وصف احمد
‘‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিলকৃত সম্পূর্ণ ক্বোরআন তাঁরই গুণাবলীতে ভরপুর। তাই আমি (আযিযুল হক) সে আহমদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র কী গুণ-প্রশংসা বর্ণনা করব।’’
মুফতি আমিমুল ইহসান রাহমাতুল্লাহি আলায়হিالتنوير فى اصول التفسير কিতাবে ক্বোরআনুল করিমের আয়াত সমূহকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-
১. ايات الاحكام (বিধি-বিধানের আয়াত)
২. ايات المخاصمة(কটূক্তি খন্ডনের আয়াত)
৩.ايات التذكير بايام الله (আল্লাহ্ ত’আলার বিশেষ বিশেষ দিবস সমূহ স্মরণ কয়ে দেয়ার আয়াত)
৪.ايات التذكير بالاى الله (আল্লাহ্ তা’আলার বিশেষ নেয়ামত সমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়ার আয়াত)
৫. ايات التذكير بما بعد الموت (মৃত্যুর পর যা হবে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আয়াত)
ক্বোরআনুল করিমের সূরা আলে ইমরানের ৭নম্বর আয়াত-
هوا الذى انزل عليك الكتاب منه ايات محكمات هن امُّ الكتاب واخر متشابهات-
এর বর্ণনা মতে ক্বোরআনুল করিমের আয়াত সমূহ দু’প্রকার। যথা ১- ايات محكمات যা আল্লাহ্র কিতাবের মূল আহকামের ক্ষেত্রে যার উপর নির্ভর করা যায়। ২. متشابهات ايات যেগুলোর অর্থ বুঝা যায় না। যেমন অনেক সূরার শুরুতে থাকা خروف مقطعات (বিচ্ছিন্ন হরফ সমূহ)।
এ ছাড়াও ক্বোরআনুল করিমের আরো দু’প্রকার আয়াত রয়েছে। যেমন ১. ايات القصص (গল্পের আয়াত), ২. ايات الامثال (উপমার আয়াত)।
প্রথম পাঁচ প্রকারের দ্বিতীয় প্রকার আয়াত হলো ايات المخاصمة (কটূক্তি খন্ডনের আয়াত)। মুফতি আমিমুল ইহসান রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, যখনই কোন পথভ্রষ্ট দল ইহুদি কিংবা খ্রিস্টান কিংবা মুশরিক কিংবা কাফির কিংবা মুনাফিক আল্লাহ্ তা’আলার শানে, রাসূল-নবীগণের শানে, বিশেষ করে আমাদের নবীজীর শানে, পরকালের ব্যাপারে, সাহাবায়ে কেরামের শানে, কোন কটূক্তি, মিথ্যাচার করেছে তখনই আল্লাহ্ তা’আলা আয়াত নাযিল করে সে কটূক্তি ও মিথ্যাচারের খন্ডন করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রতি কাফির, মুনাফিকদের কৃত কটূক্তির জবাবে পবিত্র ক্বোরআনের যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে তা আলোচনার প্রয়াস পাব ইন্শাআল্লাহ।
لَسْتَ مُرْسَلًا (তুমি রাসূল নও)
আল্লামা জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল মহল্লী আশ্শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ‘সূরা ইয়াসিন’-এর প্রথম চার আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-رَدٌّ لِقول الكفار لَسْتَ مُرْسَلًا অর্থাৎ এ আয়াত يسٓ- والقران الحكيم أنك لمرسلين على صراط مستقيم নাযিল করেছেন কাফিরদের কটূক্তি لَسْتَ مُرْسَلًا (তুমি রাসূল নও) এর খন্ডন করার জন্য। অর্থাৎ মক্কার কাফিররা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল لَسْتَ مُرْسَلًا (তুমি রাসূল নও)। তাদের এ কথাকে খন্ডন করার জন্য আল্লাহ্ তা’আলা ক্বোরআনুল করিমের শপথ সহ চারটি তাগিদ দিয়ে বলেন, হে মানব জাতির শ্রেষ্ঠ! ক্বোরআনুল হাকিমের শপথ, নিশ্চয় আপনি একজন রাসূল। আপনি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা আপনার পূর্ববর্তী নবীগণের পথ তাওহিদ ও হেদায়তের উপর আছেন।
انه لمجنون (নিশ্চয় সে পাগল)
আল্লামা জালাল উদ্দীন মহল্লী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সূরা নূন (সূরা কলম)’র প্রথম চার আয়াত-
نٓ والقلم وما يَسْطُرُوْنَ- مَا اَنْتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بمجنون وان لك لاجرًا غير ممنون وانك لعلى خُلُقٍ عظيم-
-এর শানে নুযূলে তাফসীরে জালালাইনে লিখেন, কাফিরদের কটূক্তি ‘নিশ্চয় সে পাগল’ প্রত্যাখ্যান ও খন্ডন করা। অর্থাৎ মক্কার কাফিররা আল্লাহ্ তা’আলার প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল انه لمجنون (নিশ্চয় সে পাগল) আল্লাহ্ তা’আলা সাথে সাথে তাদের এ জঘন্য কটূক্তি ও মিথ্যাচার খন্ডন করেছেন। আল্লাহ্ বলেন, ‘‘নূন, ক্বলম ও তাঁরা (ফেরেশতাগণ) যা লিখেন সেগুলোর শপথ, আপনি (হে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আপনার প্রভুর নেয়ামত তথা নবূয়ত, রেসালত ইত্যাদি দানের মাধ্যমে পাগল নন। নিশ্চয় আপনার জন্য এমন প্রতিদান রয়েছে যা নিঃশেষ হবে না। নিশ্চয়-ই আপনি মহান চরিত্রের উপর আছেন।’’ অর্থাৎ এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে কাফিরদের কটূক্তি-মিথ্যাচার প্রত্যাখ্যান করেছেন। বলেছেন যাঁকে তিনি (আল্লাহ্) নবূয়ত এবং রিসালতের মতো সর্বোচ্চ নেয়ামত ও মর্যাদা দান করেছেন তিনি পাগল হতে পারেন না। কেননা কোন উম্মাদকে আল্লাহ্ তা’আলা নবূয়ত দান করেননি। বরং যাঁদেরকে আল্লাহ্ তা’আলা নবূয়ত ও রিসালতের মতো নেয়ামত দান করেরেছন তাঁদেরকে সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা দিয়েছেন। তাঁরা প্রত্যুতপন্নমতি তথা উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী। মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি তাফসীরে নঈমীতে বলেন, যে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে পাগল বলেছিল, সে হলো ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা নামক কাফির। রাসূলে পাকের শানে এ বেয়াদবি করার কারণে উক্ত সূরা নূ-ন (ক্বলমে দশম নম্বরে তাকে জারজ সন্তান বলেছেন) সে কাফিরের দশটি অভ্যন্তরিন দোষ তুলে ধরেছেন। জারজ সন্তান হওয়াটা কেউ জানত না। নবীজীর শানে বেয়াদবি করার কারণে তার এ দোষ ক্বোরআনে পাকের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে আল্লাহ্ তা’আলা জানিয়ে দিয়েছেন।
تَبَّالك يا محمّد (হে মুহাম্মদ তুমি ধ্বংস হয়ে যাও)।
তাফসীরে জালালাইনে ও আসাহ্হুস সিয়র কিতাবের বর্ণনা মতে যখন اَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الاقربين (আপনি আপনার নিকটতম লোকদের জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করুন) নাযিল হলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উপলব্ধি করলেন যে, এখন আর গোপনে নয় বরং প্রকাশ্যে ঈমানের দাওয়াত দিতে হবে এবং জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করতে হবে। তাই তৎকালীন নিয়মানুযায়ী নবূয়ত প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পর সাফা পাহাড়ে আরোহন করে নবীজি (النَّجَاءُ النَّجَاءُ) (মুক্তি হাসিল কর, মুক্তি হাসিল কর) বলে আহ্বান করলেন। এতে কুরাইশ লোকেরা অবশ্যই বিশ্বাস করলো যে, মুহাম্মদ নিশ্চয় বিপদের কথা বলার জন্য আমাদেরকে ডাকছেন। তারা সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত হলো, তখন নবীজি বললেন-
انى نذير لكم بنى يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيْدٍ-
(অবশ্যই আমি তোমাদেরকে ভবিষ্যত প্রবল আযাবের ভীতি প্রদর্শনকারী) তখন নবীজীর চাচা আবু লাহাব বললো- تبّالك الهذا دعوتنا (হে মুহাম্মদ! তুমি ধ্বংস হও, এজন্যই কি আমাদেরকে ডেকেছো?) তখন আল্লাহ্ তা’আলা আবু লাহাবের সে কটূক্তি খন্ডন করার জন্য নাযিল করলেন- تَبَّتْ يَدَا اَبِىْ لَهَبِ আবু লাহাবের দু’হাত তথা আপাদমস্তক ধ্বংস হউক।
ان محمّدًا قاله من عند نفسه (নিশ্চয় মুহাম্মদ ক্বোরআনকে নিজের পক্ষ হতে বলেছে)
জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ক্বোরআনে পাকের আয়াত-
وان كنتم فى ريب ممّا نزلنا على عبدنا فاتوا بسورة من مثله وادعوًا شهداء كم من دون الله ان كنتم صادقين—
এর শানে নুযূলে লিখেছেন, মদীনার কাফিররা বলেছিল যে, ان محمّدًا قاله من عند نفسه অর্থাৎ এ ক্বোরআনকে মুহাম্মদ নিজের পক্ষ হতে রচনা করে বলেছে, তখন আল্লাহ্ তা’আলা উপরিউক্ত আয়াতটি নাযিল করে বলেছেন, ‘‘তোমরা যদি এ ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে হও যা আমি আমার বিশেষ বান্দা (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের) উপর নাযিল করেছি, তাহলে তোমরা এটার অনুরূপ একটি ছোট সূরা রচনা করে আন এবং তোমাদের মুর্তি যাদের তোমরা ইবাদত কর আল্লাহ্কে ত্যাগ করে ডাক তোমাদের সাহায্য করার জন্য, যদি তোমরা (তোমাদের মিথ্যা উক্তি- নিশ্চয় ক্বোরআন মুহাম্মদ-এর নিজের পক্ষ হতে) সঠিক হয়ে থাকে।’’
(هيهات هيهات من اين لمحمد ملك فارس والرّوم) অসম্ভব, অসম্ভব, মুহাম্মদের জন্য পারস্য এবং রোম রাজ্য দুটি কোত্থেকে হবে?
সদরুল আফাযিল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি খাযাইনুল ইরফান তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন স্বীয় উম্মতকে পারস্য ও রোম সা¤্রাজ্য দু’টি বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তখন মুনাফিকরা বলল, (هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ اَيْنَ لمحمد مُلْكُ فارس والرّوم) অর্থাৎ অসম্ভব, অসম্ভব, মুহাম্মদের জন্য পারস্য এবং রোম রাজ্য দু’টি কোত্থেকে বিজয় হবে? তখন আল্লাহ্ তা’আলা নি¤েœাক্ত আয়াত নাযিল করে মুনাফিকদের কটূক্তির জবাব দেন –
قل اللهمّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُوتِىْ الملك مَنْ تَشَاءُ وتَنْزِعُ الملك ممن تَشاءُ وتُعِزُّ من تشاء وتُذِلُّ من تشاء بيدك الخير انّك على كلّ شئ قَدِيْر-
এবং বলেন, হে রাসূল! আপনি বলুন, হে আল্লাহ্! আপনি সকল রাজ্যের রাজা। নির্দিষ্ট রাজ্য আপনি যাকে চান তাকে দান করেন। নির্দিষ্ট রাজ্য যার থেকে চান তার থেকে কেড়ে নেন, যাকে চান তাকে সম্মান দান করেন এবং যাকে চান, তাকে অপমানিত করেন। আপনার হাতে সকল কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সর্বশক্তিমান।
নবীজীকে ধোকা দেওয়ার অপকৌশল অবলম্বন, আল্লাহ্ তা’আলাকে ধোকা দেওয়ার শামিল
মুনাফিকরা নবীজীর নিকট গিয়ে বলে, امنّا بالله وباليوم الاخر (আমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি) সাথে সাথে আল্লাহ্ তা’আলা নবীজীকে জানিয়ে দেন وماهم بمؤمنين (তারা ঈমানদার নয়)। এরপর আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
يخادعون الله والذين امنوا وما يخدعون اِلَّا أنفسهم وما يشعرون-
‘‘তারা (মুনাফিকরা) আল্লাহ্ তা’আলা ও ঈমানদারদেরকে ধোকা দিতে চায়, তবে তারা নিজদেরকেই ধোকা দেয় আর তারা তা বুঝতে পারে না।’’ মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রাহমাতুল্লাহ্ িআলায়হি এ আয়াতের তাফসীরে লিখেনে- يخادعون الله মানে يخادعون الرسول অর্থাৎ মুনাফিকরা আল্লাহ্ তা’আলাকে নয় বরং রাসূলে পাককে ধোকা দিতে চায়। কেননা ধোকা দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যরূপে সামনে পেতে হয়। আল্লাহ্ তা’আলাকে তো প্রকাশ্য রূপে সামনে পাওয়া সম্ভব নয়। কেননা তিনি অদৃশ্য। অতএব, এখানে يخادعون الله মানে يخادعون الرسول অর্থাৎ মুনাফিকরা রাসূলে পাককে প্রকাশ্য রূপে সামনে পেয়ে امنا بالله وباليوم الاخر (আমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি) একথাটি মুখে বলে (অন্তরে কুফরকে গোপন রেখে) রাসূলে পাককে ধোকা দিতে চায়। তবে আল্লাহ্ তা’আলা يخادعون الرسول না বলে يخادعون الله বলে এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, রাসূলে পাককে ধোকা দেওয়ার অপচেষ্টা আল্লাহ্্ তা’আলাকে ধোকা দেওয়ার শামিল। রাসূলকে কষ্ট দেওয়া স্বয়ং আল্লাহ্কে কষ্ট দেওয়া। রাসূলকে খুশি করা স্বয়ং আল্লাহকে খুশি করা।
أن كان ابن عمتك فتلوّن وجه رسول الله صلى الله عليه وسلم
আপনার ফুফাত ভাই হওয়ার সুবাধে রায় তার পক্ষে হলো। তাফসীরে ইবনে কাসির এর বর্ণনা মতে, ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সনদসহকারে হাদীস বর্ণনা করেন যে, পাহাড় হতে আসা পানি গ্রহণ করার ব্যাপারে রাসূলে পাকের ফুফাত ভাই হযরত যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এবং আনসারীর মধ্যে ঝগড়া হলো। মামলাটা রাসূলে পাকের নিকট আসলে রাসূলে পাক বলেন, اسق يازبير ثم ارسل الماء الى جارك হে যুবাইর তুমি প্রথমে তোমার বাগানে পানি দাও। এরপর তোমার প্রতিবেশীর বাগানের দিকে পানি ছেড়ে দাও। আনসারী বললো হে আল্লাহর রাসূল যুবাইর আপনার ফুফাত ভাই (সে কারণে তার পক্ষে রায় হলো) তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম রাগে রঙ্গিন হয়ে গেল। তখন সাথে সাথে আল্লাহ্ তা’আলা সূরা নিসার ৬৫ নম্বর আয়াত-
فلا وربّك لايُؤمنون حتّى يُحكموك فيما شَجَرَ بينهم ثم لا يجدوا وافى أنفسهم حرجًا مما قضيت ويسلّموا تسليمًا-
নাযিল করলেন এবং আয়াতে বললেন, ‘‘সুতরাং হে মাহবুব! আপনার প্রভুর শপথ, তারা ততক্ষণ মু’মিন হবে না, যথক্ষণ তারা আপনাকে তাদের পরস্পরের ঝগড়ার ক্ষেত্রে বিচারক মানবে না। অতঃপর যা আপনি নির্দেশ দেবেন তা তাদের অন্তর সমূহে কোন দ্বিধা ব্যাতীত সর্বান্তঃকরণে মেনে নেবে না।’’ আনসারীর মুখ হতে (যুবাইর আপনার ফুফাত ভাই) এ কটূক্তি বের হওয়ার কারণে উপরিউক্ত আয়াত নাযিল করে এর জবাব দিলেন। এবং বললেন, রাসূলে পাককে বিচারক না মানলে, এবং তাঁর রায় মানার ব্যাপারে দ্বিধা থাকলে ঈমানদার হতে পারবে না, যা শপথ করে দৃঢ়ভাবে বললেন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের ফায়সালা না মানার পরিণাম
সূরা নিসার ৬০ নম্বর আয়াতের শানে নুযূল স্বরূপ আল্লামা নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন যে, বিশর নামক একজন মুনাফিক এবং একজন ইহুদীর মধ্যে ঝড়গা হলো। এর মীমাংসার জন্য ইহুদি বললো, চলো আমরা সৈয়্যদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের নিকট যাই। ওই মুনাফিক ঈমানের দাবী করা সত্ত্বেও বললো, চলো আমরা কা’ব বিন আশরাফ ইহুদির নিকট যাই। পরিশেষে সে বাধ্য হয়ে রাসূলে পাকের কাছে গেল। কিন্তু রসূলে পাকের ফায়সালা তার অনুকূলে না হলে সে বললো, আমরা সঠিক ফায়সালার জন্য হযরত ওমরের কাছে যাই। উভয়ে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর নিকট পুন ফায়সালার জন্য গেল। ইহুদি বলেন, আমাদের দু’জনের মামলার ফায়সালা সৈয়্যদে আলম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম করে দিয়েছেন। কিন্তু এ লোকটি (মুনাফিক) সে ফায়সালা না মেনে আপনার কাছে পুনঃ ফায়সালার জন্য এসেছে। এ কথা শুনে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন, হ্যাঁ এক্ষুণি আমি ফায়সালা করে দিচ্ছি এ কথা বলে ঘরের ভেতর প্রেবেশ করে একটি তরবারী নিয়ে আসলেন এবং তা দ্বারা মুনাফিককে কতল করে ফেললেন এবং বললেন, যে ‘‘আল্লাহ্ তা’আলা এবং রাসূলে পাকের ফায়সালা না মেনে আমার কাছে ফায়সালা জন্য আসবে তার ফায়সালা এটাই। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে আল্লাহ্ তা’আলা সূরা নিসার ৬০, ৬১ ও ৬২ নম্বর আয়াত নাযিল করেন।
انُؤمِنُ كما امن السفهاء আমরা কি ঈমান আনব, যেভাবে বোকারা ঈমান এনেছে?
হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সূরা বাকারার ১৩ নম্বর আয়াতের তাফসীরে বলেন, যখন আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ হতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কাফিরদেরকে বলেন, ‘তোমরা ঈমান আন, যেভাবে সাহাবায়ে কেরাম ঈমান এনেছেন। তখন তারা বললো, আমরা কি ঈমান আনব যেমন বোকারা ঈমান এনেছে। (আল্লাহ্ তা’আলা তাদের এ কথার উত্তরে বলেন), ‘‘শুন, নিশ্চয় তারাই বোকা। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারছে না।’’ উপরিউক্ত আয়াতে কাফিররা সাহাবায়ে কেরামকে বোকা ও নির্বোধ বলেছে। কেননা তাদের মতে যারা পরকালের বাকির আশায় নগদকে ছেড়ে দেয়- তারা নির্বোধ। আল্লাহ্ তা’আলা কাফিরদের এ কটূক্তি প্রত্যাখ্যান ও খন্ডন করে বলেন-
الا انّهم هم السفهاء ولكن لايعلمون-
শাহ্ অলি উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি স্বীয় রচিত الفوز الكبير فى اصول التفسير কিতাবে লিখেছেন যে, ক্বোরআনুল করিম নাযিলের সময় এবং এর পূর্বে পৃথিবীর জমিনে পাঁচটি পথভ্রষ্ট দল ছিল। যথা- ১. ইহুদি, ২. নাসারা, ৩. মুশরিক, ৪. কাফির এবং ৫. মুনাফিক। তবে একটি হেদায়ত প্রাপ্ত দল ছিল সেটা হলো হানিফ। এ দলকে মুয়াহ্হিদও বলা হতো। অর্থাৎ যাঁরা সকল বাতিল মতবাদ ও ধর্ম হতে মুখ ফিরিয়ে সত্য ধর্মমুখী ছিলেন এবং এক আল্লাহকে বিশ্বাস করতেন। কোন ধরনের মূর্তিপূজা করতেন না। প্রথম পাঁচটি (পথভ্রষ্ট দল) এর কটূক্তি, মিথ্যাচার, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন উক্তি, অসত্য মনগড়া উক্তি এবং অপবাদ ও অশালীন আচরণ করেছে সেগুলোর খন্ডনে আল্লাহ্ তা’আলা সাথে সাথে নাযিল করেছেন জিবরাঈল আলায়হিস্ সালামের মাধ্যমে ও তাঁর তেলাওয়াতে যাকে ওহিয়ে মতলু (পঠিত ওহি) বলা হয়। আবার মাধ্যম ছাড়া সরাসরি রাসূলে পাকের অন্তরে ওহি ঢেলে দিয়েছেন যাকে ওহিয়ে গায়রে মতলু (অপঠিত) বলা হয়। এ ওহিয়ে গায়রে মতলু তথা হাদিসে পাকের মাধ্যমেও রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ফেরকায়ে দ্বোয়াল্লার (পথভ্রষ্টদের) কটূক্তির জবাব দিয়েছেন। যে আয়াত সমূহের মাধ্যমে আল্লাহ্ উপরিউক্ত পাঁচটি বাতিল ফেরকার সাথে মোনাযারা করে তাদেরকে পরাজিত করে দিয়েছেন।

লেখখ: সহকারী অধ্যাপক জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া, চট্টগ্রাম।