সৃষ্টিকুলে সর্বাধিক সম্মানের অধিকারী প্রিয় নবি

0

সৃষ্টিকুলে সর্বাধিক সম্মানের অধিকারী প্রিয় নবি-
মুফতি মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান আল ক্বাদেরী >
সম্মানিত নবিগণ অধিক সম্মান ও মর্যাদার উপযোগী সৃষ্টিকুলে। সৃষ্টির মাঝে সর্বাধিক সম্মান-তাযীমের অধিকারী আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হাবিব মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কারণ যে যত বেশি মহান রবের তরফ থেকে সম্মানিত, তাঁর প্রতি সম্মান প্রকাশের মাত্রাও ততবেশি। যেহেতু সকল সৃষ্টির মাঝে সর্বাধিক সম্মানের অধিকারী প্রিয় নবিজি, সে কারণে তাঁর প্রতি তাযীম ও শ্রদ্ধার মাত্রা সর্বোচ্চ হওয়াই যুক্তিযুক্ত। নবিজির ক্ষেত্রে সাধারণ তা’যীম প্রদর্শনের ধারণা মারাত্মক ও ভয়াবহ। কুরআনের চাহিদা প্রিয় নবিজিকে তাযীম করা ফরয, আর তা’যীমের বিপরীত কিছু করা বা বলা তথা ধৃষ্টতা প্রদর্শন কুফরী।
তাযীমে রাসুল সংক্রান্ত এবং ঈমানদারের জন্য ইহকালীন ও পরকালীন জগতের সফলতার শর্ত ও চাবিকাঠি উল্লেখ করে মহান রব সূরা আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, “সুতরাং যারা ত্রা (সম্মানিত রাসুল) প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে, এবং যে নূর (আল কুরআন) তাঁর সঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে এর অনুসরণ করে তারাই সফল।” উক্ত আয়াতের আলোকে উভয় জগতে সফলতা ও মুক্তির অন্যতম শর্ত তা’যীমে রাসুল। দয়াল নবিজির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও আদব প্রদর্শন প্রসংগে এতদব্যতিত সূরা ফাতাহ এ ৮-৯ নং আয়াতে উল্লেখ করেন, “নিশ্চয় আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর, সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।
উদ্ধৃত আয়াতের ধারাবাহিকতায় প্রতীয়মান যে, ঈমানের পর প্রথম আমল ও কর্তব্য নবিজিকে সর্বোচ্চ ও সীমাহীন সম্মান করা এবং সর্বাধিক আদব প্রদর্শন করা। তা’যীমে রাসুলের পরে মহান রবের তাসবীহ, ইবাদত, বন্দেগী করা, যা অত্র আয়াতের ক্রমধারায় সহজে অনুমেয়। আরও অনুমেয় যে, ঈমানের পর ইবাদাত-বন্দেগীর পূর্বে কঠিন দায়িত্ব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি উচ্চতর মর্যাদা প্রকাশ এবং এটা পালনে ইবাদাত আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হবে সন্দেহাতীত ভাবে যা ঈমানেরই দাবী। নবিজির সম্মান এড়িয়ে ইবাদাত-বন্দেগীর কথা যেমনি ভাবা যায় না, তেমনি ইবাদাত যেমন অত্যাবশ্যকীয় বিধান, তা’যীমে রাসুল অনুরূপ অবশ্য পালনীয় আমল। এর বিপরীত আক্বিদা-বিশ্বাস পোষণ আয়াতের বরখেলাপ। তা’যীমে রাসুলের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা পৃথিবীর কারো হাতে নেই, এটা একমাত্র মহান রবের হুকুম ও মর্জি। কাজেই দয়াল নবিজিকে কেন তাযীম করতে হয়, এবং কিভাবে করতে হয় অত্র আয়াত থেকে শিক্ষা নেওয়া সকল ঈমানী মুসলমানের ঈমানের দাবী।
স্মর্তব্য যে, উল্লেখিত আয়াতে মাহান রব নবিজির সম্মানের ক্ষেত্রে যে দু’টা শব্দ উল্লেখ করেছেন আদতে তা রহস্যভরা ও ব্যপক অর্থবোধক। কেননা তা’যীম শব্দের অর্থ স্বাভাবিক ও সাধারণ সম্মান প্রদান হলেও তা’যীর ও তাওক্বীর শব্দদ্বয়ের মর্ম সীমাহীন সম্মান দান। কাজেই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, পৃথিবীতে সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য যেই সম্মান, সেই সম্মানের মাত্রা ও সীমা অতিক্রম করে সর্বোচ্চ তা’যীম ও ভক্তি করা নবিজিকে, ঈমানের পূর্ণতা। পার্থক্য কেবল মহান রব মা’বুদ আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানিত ও প্রিয় বান্দা, আল্লাহ তায়ালা খালিক তথা ¯্রষ্টা, নবিজি মাখলুক তথা সৃষ্টি। তাই তা’যীমের যে স্তর ও ধাপ ইবাদাতের চেয়ে নি¤েœÑ তা হচ্ছে তাযির যা সৃষ্টির মাঝে কেবল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অধিকার। পক্ষান্তরে ইবাদাত ¯্রফে আল্লাহ তায়ালার এমন হক, যা’তে সম্মানিত ব্যক্তি এমনকি কোন নবি-রাসুলও শামিল নয়।
পবিত্র কুরআনের বার্তা হচ্ছে- তোমরা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুলের ওপর ঈমান পাকাপোক্ত কর। আল্লাহ ও রাসুলের সাথে সম্পর্ক যত গাঢ় হবে ঈমান তথ দৃঢ় হবে। কাজেই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর তার ঈমান সুদৃঢ় না হয়। পবিত্র কুরআনের তালিম, হৃদয়ের সত্যায়ন ও মৌখিক স্বীকৃতির পরেই মুসলমান যেন সম্মানিত নবিজির সম্মান-ইজ্জতকে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শান-শওকতের সাথে প্রকাশ ও পালন এবং সকাল-সন্ধ্যায় মহান রবের মহিমা বর্ণনা করে, যা উম্মতের জন্য অপরিহার্য ও কুরআনের নির্দেশ ও চাহিদা।
মহান রবের ইবাদাত ও তাওহীদের পাশাপাশি নবিজির প্রতি সম্মান প্রদান মোটেই পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ নয়, যা উল্লেখিত আয়াতের নিরেখে সুস্পষ্ট। তাছাড়া অত্র আয়াতের সাথে অন্যান্য আয়াতকে সামনে আনলে বিষয়টা আরও প্রস্ফুটিত হয়। যেমন সূরা হুজরাতের সূচনায় উল্লেখ হয়েছে যে, “হে মুমিনগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হইও না এবং আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মুমিনগণ,তোমরা নবির কন্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কন্ঠস্বর উঁচু কর না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল বা ডাকাডাকি তাঁর সঙ্গে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না, (তাকে আহ্বান করোনা) কারণ এতে তোমাদের কর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে।”
উপর্যুক্ত আয়াত থেকে প্রতিভাত হয় যে, সাহাবীগণ প্রত্যেকটি আমলকে নবিজির সাথে সম্পৃক্ত করেছেন এমনিভাবে যে, প্রিয় নবিজিকে সীমাহীন সম্মান ইজ্জত করা বস্তুত আল্লাহ তায়ালার প্রতি সম্মান আদায় করা, নবিজির প্রতি আদব-ভক্তি মূলত আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভক্তি তাঁর প্রেম-ভালবাসা আল্লাহর ভালবাসা, তাঁর আনুগত্য মহান রবের আনুগত্য, তাঁর যিকির আল্লাহর যিকির। স্বীয় হাবিব থেকে নিজের দূরত্বের কল্পনাকে মিটিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আল্লাহ তায়ালা নবিজির হাত মোবারককে নিজের হাত (কুদরতি) বলেছেন। সকল কাজ কর্মে নবিজির সন্তুষ্টিতে মহান রবের সন্তুষ্টি বিদ্যমান। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নিজের প্রধান প্রতিনিধি স্থির করেছেন। কেবল একটি বিষয়ের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন যে নবিজির ইবাদাত করার জন্য কারও অনুমতি নেই, অন্যথায় সকল বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মাঝে দূরত্ব ও পার্থক্য নেই। এ সূক্ষ¥ বিষয়টা ইবনে তাইমিয়্যার কলমে ‘আসসারিমুল মাসলুল’ কিতাবেও প্রকাশ পেয়েছে।
ইবাদতের একমাত্র যোগ্য মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তা। সমগ্র সৃষ্টির মাঝে ইবাদতের যোগ্য কেউ না। ইবাদাত এমন আমল যা আল্লাহ তায়ালা নিজের সত্তার জন্য সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ বান্দার তরফ থেকে আল্লাহ তায়ালার জন্য এমন সীমাহীন সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শন, ইবাদাতের সূরতে, যা সৃষ্টির কারও জন্য প্রযোজ্য নয়। অনেকেই ইবাদত ও তা’যীমের মধ্যে পার্থক্য না বুঝে একটার সাথে অন্যটাকে গুলে ফেলে, ফলে সকল প্রকার তাযীম-সম্মানকে ইবাদত মনে করে সেটাকেও শির্ক ফাতওয়া দিয়ে বেড়ায়, যা চরম ভুল এবং ইসলামে বিশৃংখলা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।
সম্মানিত নবিগণ, অলি-আউলিয়া, সালেহীন, মাতা-পিতা, শিক্ষক-গুরুসহ সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান, আদব, আনুগত্য, অনুসরণ,নির্দেশ পালন ও তা’যীম। যেহেতু এ আমল ইবাদাত তথা অক্ষমতা, ন¤্রতা, বিনয়ের শেষ সীমা থেকে নি¤œ ও কর্মপর্যায়ের, সেহেতু এটা ইবাদাতের পর্যায়ভুক্ত নয়। এ ধরণের তা’যীম শরিয়ত অনুমোদিত বিধায় শিরকের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই এবং তাওহীদের সাথে সংঘাতপূর্ণ নয়। মোদ্দাকথা, ইবাদাত ও তাযীম দু’টা ভিন্ন বিষয়, দু’টাকে এক করে দেখা সাংঘাতিক ভুল। বিষয়টা সঠিক না বুঝার কারণে একটি মহল ত’যীমে রাসুলকে শিরক, বিদ্আত বলে মুখের বুলি আওড়ায়, যা কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবী ও সলফে সালেহীনদের আমল ও বক্তব্যের সরাসরি পরিপন্থি।
নামাযের বাহিরে নয় কেবল, নামায অবস্থায়ও প্রিয় নবিজিকে সীমাহীন তা’যীম করেছেন সম্মানিত সাহাবীগণ। সম্মানিত সাহাবীগণ কেবল প্রিয় নবিজিকে সম্মান-তাযীম করেননি, সর্বোচ্চ সম্মান করেছেন নবিজির সাথে সম্পর্কিত প্রত্যেকটি বস্তুকেও। এমনকি নবিজির অযুর ব্যবহৃত পানি, চুল মোবারক, থুথু-শ্লেষ্মা মোবারক, ঘাম মোবারক ইত্যাদির প্রতি সর্বাধিক সম্মান প্রদর্শন করেছেন যা সহীহ বুখারিসহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে বিদ্যমান। বর্ণিত আছে যে, প্রিয় নবিজির খেদমতে মে’রাজের রজনীতে বোরাক হাযির করা হলে তাতে আরোহন করার সময় তা নিজের সৌন্দর্য ও মনোহরিত্বের জন্য অঙ্গ-ভঙ্গী প্রদর্শন করছিল। তখন হযরত জিব্রাইল আলায়হিস্ সালাম বললেন, তুমি হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে এমন করছো? তোমার উপর তো এমন কেউ আরোহনই করেননি যিনি মহান রবের নিকট তাঁর চাইতে বেশী সম্মানিত ও মর্যাদাশীল হতে পারেন! তখন সে লজ্জায় ঘর্মাক্ত হয়ে পড়ল।
যিনি কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালার হামদের পতাকাবাহী, যিনি সর্বপ্রথম শাফায়াতকারী, যিনি সর্বপ্রথম জান্নাতের দুয়ারে করাঘাতকারী, যিনি সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী, তিনি আল্লাহ তায়ালার প্রিয় মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাইতো তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, “আমি আগের পরের সকলের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী আর একথা গর্ব করে বলছিনা”। নি:সন্দেহে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সর্বোচ্চ মর্যাদার আরো একটি অন্যতম প্রমাণ যে, আল্লাহ তায়ালার পবিত্র নামের পাশাপাশি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক নামও স্থান পেয়েছে।
কাজেই, আল্লাহর পর সর্বোচ্চ সম্মান-মর্যাদার অধিকারী প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সীমাহীন সম্মান-ইজ্জত করা উম্মতের জন্য অপরিহার্য ও অলংঘনীয় আমল। পক্ষান্তরে তা’যীমে রাসুলের ব্যাপারে বিরূপ মন্তব্য কিংবা তা না করার জন্য বিভিন্ন টালবাহানা ও ছলছাতুরীর আশ্রয় নেওয়া অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার নামান্তর নিঃসন্দেহে। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন সত্যিকার উম্মতেরই পরিচয়। এটাই অমোঘ সত্য।
লেখক: প্রধান মুফতি-কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া কামিল মাদরাসা, মুহাম্মদপুর এফ ব্লক, ঢাকা।